📄 মৃত্যুর এক অন্যরকম রহস্য
অনেক নির্বোধ ব্যক্তিকেই আমি তাকদির বা ভাগ্যের ওপর ক্রোধ বা ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখি। এদের মধ্যে কারও ঈমান হয়তো দুর্বল—তাই এ ধরনের অভিযোগ ও আপত্তি করে। আর কেউ আছে, কুফরির দিকেই ধাবিত হয়ে গেছে। জগতের সৃষ্টি হওয়া, ধ্বংস হওয়া এবং বর্তমানেও জগৎজুড়ে যা কিছু হচ্ছে ও চলছে—এই ব্যক্তির দৃষ্টিতে সবকিছুই অনর্থক। অকারণ। সে বলে বেড়ায়—সৃষ্টির পর এই ধ্বংসের মধ্যে কী কল্যাণ নিহিত? আমাদের কষ্টে যার কোনো লাভ নেই, তবু সেই কষ্ট ও শান্তির মধ্যেই বা তার কী কল্যাণ নিহিত?
এ ধরনের কথার প্রতিনিধিত্ব করে, এমন একজনকে আমি একদিন ডেকে বললাম, তোমার যদি বুদ্ধি ও বিবেক থাকে, তবে আমি তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই। আর যদি তুমি অনর্থক দুনিয়ার বাহ্যিক ঘটনাবলি দেখে কোনো রকম চিন্তা ও যুক্তি ছাড়া এগুলো বলে বেড়াও, তাহলে তোমার সাথে কথা বলা অনর্থক হবে। অযথা সময় নষ্ট হবে।
লোকটি সম্মত হলে আমি তাকে বললাম, তাহলে বুদ্ধি ও বিবেক খাটিয়ে আমি যা বলি সেগুলো শোনো—
এটা কি সাব্যস্ত হয়ে যায়নি যে আল্লাহ তাআলা হলেন সকলের মালিক ও প্রতিপালক? আর মালিকের জন্য অধিকার রয়েছে তিনি যেভাবে চাইবেন সেভাবেই পরিচালনা করবেন? আর এটাও কি প্রমাণিত হয়ে যায়নি যে, তিনি হলেন হাকিম, প্রজ্ঞাবান; আর প্রজ্ঞাবান কখনো অনর্থক কাজ করেন না?
আমি বুঝতে পারছি, আমার এই কথার ক্ষেত্রে তোমার মনে কিছুটা আপত্তি হতে পারে। তুমি বলতে পারো—আমরা দার্শনিক 'জালিনুস' থেকে একটি বক্তব্য পাই। তিনি বলেন, ‘তিনি [স্রষ্টা] আসলেই প্রজ্ঞাবান কি না, তা আমি নিশ্চিতভাবে জানি না।’ তাঁর এ কথা বলার কারণ হলো, তিনি সবকিছুতেই গড়ার পর ভাঙার উৎসব দেখেন। তিনি স্রষ্টার এই অবস্থাকে সৃষ্টির বিভিন্ন অবস্থার ওপর তুলনা করেন। অর্থাৎ কেউ যখন কোনো জিনিস তৈরি করে, আবার সেটা ভেঙে ফেলে, তাহলে নিশ্চয় সে প্রজ্ঞাবান নয়। স্রষ্টার বিষয়ও তিনি অনেকটা সেরকম মনে করেন।
দার্শনিক জালিনুস—তিনি যদি আজ জীবিত থাকতেন, তবে আমি তার এ কথার উত্তরে তাকেই বলতাম, কীভাবে আপনি দাবি করেন যে, গড়ার পর কিছু ভেঙে ফেলা প্রজ্ঞাপূর্ণ নয়? জগতেই এর অনেক উদাহরণ আছে। তাছাড়া আপনি যে আকল ও মস্তিষ্ক দিয়ে কথা বলছেন, এটা কি স্রষ্টাই আপনাকে প্রদান করেননি? তাহলে কীভাবে তিনি আপনাকে একটি পূর্ণ সম্পূর্ণ শক্তিশালী মেধা দিলেন আর তার নিজেরই পূর্ণ মেধা ও প্রজ্ঞা নেই? এটা তো এক উদ্ভট দাবি!
ঠিক এ ধরনের পরীক্ষাতেই আক্রান্ত হয়েছিল ইবলিস। সে তার নিজের আকল-বুদ্ধি দিয়ে স্রষ্টার প্রাজ্ঞতার দোষ ধরতে চেয়েছিল। কিন্তু চিন্তা করে দেখেনি- আকল-বুদ্ধির প্রদাতা আল্লাহ তাআলা সেই আক্কলের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে। তার প্রজ্ঞা সকল জ্ঞানবানদের চেয়ে পূর্ণ ও সম্পূর্ণ। কারণ, তিনি তার সীমাহীন সম্পূর্ণ প্রজ্ঞার মাধ্যমেই মানুষের এই আকল-বুদ্ধি সৃষ্টি করেছেন। যদি সেই দার্শনিক লেখক এই বিষয়টি চিন্তা করতেন, তবে তার সন্দেহ দূর হয়ে যেত। আল্লাহ তাআলা মানুষের এই ধরনের অসম্পূর্ণ বিভ্রান্তির দিকে ইশারা করে বলেছেন—
﴿أَم لَهُ الْبَنَاتُ وَلَكُمُ الْبَنُوْنَ)
তবে কি কন্যা সন্তান পড়ল আল্লাহর ভাগে আর পুত্র সন্তান তোমাদের ভাগে? [সুরা তুর: ৩৯]
অর্থাৎ তিনি কি নিজের জন্য রেখেছেন অসম্পূর্ণতা আর তোমার জন্য দিয়েছেন সম্পূর্ণতা?!
একটু ভেবে বলো তো দেখি, তোমাদের এ কেমন দাবি!
সুতরাং যে সকল বিষয় আমাদের বোঝার বাইরে, সেগুলো আমাদের অক্ষমতার কারণেই হয়ে থাকে। অতএব আমরা বলব, এটা সর্বজ্ঞাত ও প্রজ্ঞাবান এক সত্তার কাজ। কিন্তু তিনি আমাদের জন্য তার সম্পূর্ণতা বর্ণনা করেননি। আর গড়ার পর ভাঙা—এ ধরনের বিষয় সংঘটিত হওয়া আশ্চর্যের কিছু নয়। অস্বাভাবিকও নয়। যেমন, হজরত মুসা আলাইহিস সালামের নিকট ভালো নৌকাটি ভেঙে ফেলা এবং সুন্দর ছেলেটিকে হত্যা করার হিকমত বা রহস্য জানা ছিল না। তাই তিনি এগুলোকে অন্যায় ভাবছিলেন। কিন্তু যখন হজরত খাজির আলাইহিস সালাম তাকে এর হিকমত জানিয়ে দিলেন, তখন তিনি মেনে নিলেন। স্রষ্টার সাথে আমাদের অবস্থাও অনেকটা খাজিরের সাথে মুসার অবস্থার মতো।
আমরা কি আমাদের দস্তরখানায় অনেক সুন্দর সুন্দর সজ্জিত খাবার পরিবেশিত হতে দেখি না? সেগুলো কাটা হয়, চূর্ণ করা হয়। আস্ত সবজি ও ফলগুলো কীভাবে টুকরো টুকরো করা হয়। আবার কিছু রান্না করা হয়। আরও অনেক কিছু হয়। কিন্তু এগুলো করতে আমরা বাধা দিই না। বলি না যে, এগুলো নষ্ট করা হচ্ছে। কারণ, আমরা জানি, এসব কাটা-চেরার মধ্যেই রয়েছে এর সর্বাধিক কল্যাণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা।
সুতরাং স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ক্ষেত্রে এমন অনেক বিষয় থাকতেই পারে—যেগুলোর ভাঙা-গড়ার অভ্যন্তরীণ কল্যাণ তিনিই শুধু জানেন—আমরা এখনো জানি না।
সেই বান্দার চেয়ে মূর্খ ও নির্বোধ বান্দা কে আছে, যে তার প্রভুর গোপন বিষয় অবগত হতে চায়? বরং বান্দার কর্তব্য হলো আনুগত্য করা। মেনে নেওয়া। আপত্তি বা অভিযোগ না করা।
যুক্তি বা বিবেক বাহ্যিকভাবে যেগুলোকে মেনে নিতে চায় না, সেখানেই তো তার পরীক্ষা— নিঃশর্তভাবে মেনে নাও কি না? এখানে মানাটা যেমন কঠিন; আবার উৎরে গেলে পুরস্কারও তেমন অঢেল ও সীমাহীন।
আমি একটি নতুন বিষয় চিন্তা করলাম। হতে পারে মানুষের মৃত্যুর উদ্দেশ্য সেটাই। কথা হলো, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের থেকে অদৃশ্যে রয়েছেন। আমাদের ইন্দ্রিয়শক্তি দিয়ে তাকে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এখন কথা হলো, আল্লাহ তাআলা যদি শারীরিক এই গঠনকে ভেঙে না দিতেন, তাহলে মানুষের বদ্ধমূল ধারণা থাকত যে, সে কোনো স্রষ্টা ছাড়াই একটি সৃষ্টি। কিন্তু যখন তার মৃত্যু সংঘটিত হয়ে যায়, তখন নফস তার নিজেকে নিজরূপে দেখতে পায়— যা আগে শরীরের মধ্যে আড়াল হওয়ার কারণে নিজেকে আলাদাভাবে চিনতে পারত না। কিন্তু এভাবে মৃত্যুর পর আরও অনেক আশ্চর্য বিষয় সে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়। এরপর আবার যখন তাকে শরীরের মধ্যে প্রবেশ করানো হয়, তখন সে অনিবার্যভাবেই বুঝতে পারে যে, সে নিছক একটি সৃষ্টি। যিনি তাকে পুনর্বার সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তার স্রষ্টা। তখন দুনিয়ার বিষয়াবলিও তার স্মরণে আসতে থাকে। কারণ, শরীর পুনর্বার গঠনের মতো মানুষের স্মৃতিশক্তিও আবার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তখন সে বলে উঠবে—
إِنَّا كُنَّا قبل في أهلنا مُشْفِقِين)
আমরা পূর্বে আমাদের পরিবারবর্গের মধ্যে (অর্থাৎ দুনিয়ায়) বড় ভয়ের ভেতর ছিলাম। [সুরা তুর: ২৬]
এমনিভাবে যখন সে আখেরাতের ওয়াদাকৃত সকল বিষয় দেখতে পাবে, তখন তার এমন ইয়াকিন ও বিশ্বাস সৃষ্টি হবে, যার মধ্যে সামান্যতমও সন্দেহ নেই। মৃত্যুর পর পুনর্বার তাকে সৃষ্টি করা ব্যতীত এটা কখনো তার বাস্তবে অর্জিত হওয়া সম্ভব ছিল না। নিজে এগুলো দেখার মাধ্যমেই তার এই ইয়াকিন অর্জিত হয়েছে। এই ইয়াকিন অর্জিত হওয়ার পর তার এমন শারীরিক গঠন প্রদান করা হবে, যা আর কখনো ধ্বংস হবে না। এই শরীরেই সে চিরদিন জান্নাতে বসবাস করবে। এবার নিষ্কলুষ নিঃশঙ্ক ইয়াকিনের মাধ্যকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে দেখতে সক্ষম হবে। কারণ, সে দুনিয়ায় থাকতেই স্রষ্টার পক্ষ থেকে যা কিছু ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোতে বিশ্বাস করেছিল। যে বিপদ ও কষ্ট এসেছিল- সেগুলোর ওপর ধৈর্যধারণ করেছিল। তাকদিরের ওপর বিশ্বাস করেছিল। কোনো আপত্তি ও অভিযোগ করেনি।
এভাবে সে দুনিয়াতে অন্যের মৃত্যু দেখে শিক্ষা গ্রহণ করেছে আর আখেরাতে নিজেরটা দেখে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। আর এই অবস্থাতেই তাকে বলা হবে—
ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي )
তোমার প্রতিপালকের দিকে ফিরে আসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে এবং আমার নেক বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। আর প্রবেশ করো আমার জান্নাতে। [সুরা ফাজর: ২৮-৩০]
কিন্তু যারা ছিল সংশয়বাদী ও কাফের- তাদের জন্য ফায়সালা করা হবে জাহান্নামে প্রবেশের এবং চিরদিন সেখানেই তারা শাস্তি ভোগ করবে। কারণ, দুনিয়াতে তারা অনেক প্রমাণ দেখেছে; কিন্তু শিক্ষা গ্রহণ করেনি। তারা বরং প্রজ্ঞাবান আল্লাহর ব্যাপারে তর্কে লিপ্ত হয়েছিল। তার ওপর বিভিন্ন অভিযোগ ও আপত্তি উত্থাপন করেছিল। সুতরাং আখেরাতে তাদের সেই কুফরির কদর্যতা ফিরে আসবে। তাদের অন্তরগুলো অন্ধ করে দেবে। সুতরাং তাদের অন্তরগুলো আগের সেই কুফরির অবস্থায় বিরাজ করবে। যেহেতু দুনিয়াতে কোনো প্রমাণ তাদের উপকার করেনি, তাই আখেরাতের কোনো প্রমাণও তাদের উপকৃত করবে না। এমনকি তাদের পুনরায় দুনিয়াতে ফিরিয়ে দিলেও তারা বিশ্বাসী হবে না। তাদের অন্তরের এই কদর্যতার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَلَوْ رُدُّوا لَعَادُوا لِمَا نُهُوا عَنْهُ وَإِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ ۞ وَقَالُوا إِنْ هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ ۞ وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى رَبِّهِمْ قَالَ أَلَيْسَ هَذَا بِالْحَقِّ ۞ قَالُوا بَلَى وَرَبِّنَا قَالَ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ﴾
সত্যিই যদি তাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়, তবে পুনরায় তারা সে সবই করবে, যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। নিশ্চয়ই তারা ঘোর মিথ্যাবাদী।
তারা বলেছিল, যা কিছু আছে তা কেবল আমাদের এই পার্থিব জীবনই। (মৃত্যুর পর) আমরা পুনর্জীবিত হওয়ারই নই।
তুমি যদি সেই সময় দেখতে পাও, যখন তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে। তিনি বলবেন, এটা (এই দ্বিতীয় জীবন) কি সত্য নয়? তারা বলবে, আমাদের প্রতিপালকের শপথ, নিশ্চয়ই। আল্লাহ বলবেন, তবে তোমরা শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করো। কারণ, তোমরা অস্বীকার করেছিলে।
[সুরা আনআম: ২৮-৩০]
আল্লাহ তাআলার নিকট আমাদের আকুল প্রার্থনা- তিনি যেন আমাদের একটি অনুগত বিবেক দেন; যেই বিবেক তার স্রষ্টা ও প্রতিপালকের ওপর কোনো অভিযোগ ও আপত্তি না করে।
আর আপত্তিকারীদের জন্যই দুর্ভোগ! সে কি তার আপত্তির মাধ্যমে তার ভাগ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে? এতে শুধু লাঞ্ছনা ও শাস্তিই বৃদ্ধি পাবে।
📄 সকল প্রকার গোনাহই নিকৃষ্ট
মানুষের সকল প্রকার গোনাহই নিকৃষ্ট। তবে কিছু গোনাহ হলো নিকৃষ্টতম- বেশি বড়। যেমন জিনা হলো একটি নিকৃষ্টতম গোনাহ। এতে সেই নারীটি নষ্ট হয়। পুরুষটি নষ্ট হয়। সন্তান জন্ম নিলে পুরো বংশের মধ্যে বিঘ্ন ঘটে। জিনা তো নিকৃষ্টতম- আর প্রতিবেশিনীর সাথে জিনা করা আরও নিকৃষ্টতম। বোখারি ও মুসলিমের হাদিসে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর বর্ণনায় এসেছে- তিনি একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, সবচেয়ে বড় গোনাহ কী?
উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলার সাথে কোনো শরিক সাব্যস্ত করা, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।
এরপর সবচেয়ে বড় গোনাহ কী? উত্তরে তিনি বললেন, তোমার সন্তানকে হত্যা করা-এই ভয়ে যে, সে তোমার সঙ্গী হয়ে খানা খাবে।
এরপর সবচেয়ে বড় গোনাহ কী? উত্তরে তিনি বললেন, প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে জিনা করা। এছাড়া ইমাম বোখারি রহ. মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ রা.-এর সূত্রে আরেকটি হাদিস বর্ণনা করেছেন—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لَأَنْ يَزْنِي الرَّجُلُ بِعَشْرَةِ نِسْوَةٍ أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَزْنِيَ بِامْرَأَةِ جَارِهِ ... لَأَنْ يَسْرِقَ الرَّجُلُ مِنْ عَشْرَةِ أَبْيَاتٍ أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَسْرِقَ مِنْ جَارِهِ.
কোনো লোক অন্য দশজন নারীর সাথে জিনা করার চেয়েও তার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে জিনা করা অধিক নিকৃষ্টতর। কোনো লোক অন্য দশজনের বাড়িতে চুরি করার চেয়েও তার প্রতিবেশীর বাড়িতে চুরি করা অধিক নিকৃষ্টতর। ৯১
এটা হওয়ার কারণ হলো, এটাতে আল্লাহ তাআলার হুকুমের অবাধ্যতার সাথে সাথে প্রতিবেশীরও হক নষ্ট করা হয়।
আরেকটি নিকৃষ্টতম গোনাহ হলো, বৃদ্ধ মানুষের জিনা করা। হাদিসে এসেছে, আল্লাহ বৃদ্ধ জিনাকারীকে খুবই অপছন্দ করেন। এর কারণ, এমনিতেই এই বয়সে শরীরের স্বাভাবিক শক্তি আর থাকে না। প্রবল কোনো চাহিদাও থাকে না। তবুও আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা করার জন্য যেন সে নিজের মধ্যে এই চেতনা জাগিয়ে তুলেছে এবং জিনা করেছে। সুতরাং তার গোনাহ হলো ঔদ্ধত্যপূর্ণ গোনাহ। এটা খুবই মারাত্মক।
আরেকটি ঔদ্ধত্যপূর্ণ গোনাহ হলো, পুরুষের রেশমি পোশাক ও সোনা ব্যবহার করা। বিশেষ করে সোনার আংটি ব্যবহার করা।
আরও কিছু অপরাধ হলো, অহংকার করা, বিনয়ের ভান করা, মানুষের সামনে মিথ্যাভাবে নিজের বুজুর্গি প্রকাশ করা। এটা যেন মানুষের দৃষ্টিতে ইবাদত-অথচ প্রকৃতপক্ষে এগুলো আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা। এমনিভাবে স্পষ্ট সুদের কারবার করাও নিকৃষ্টতম গোনাহ-বিশেষ করে যে ব্যক্তি স্বচ্ছল, বহু সম্পদের মালিক।
আর মানুষের একটি নিকৃষ্টতম অবস্থা হলো, বৃদ্ধ বয়সে দীর্ঘ অসুস্থতায় ভোগা সত্ত্বেও অতীত গোনাহ থেকে তাওবা না করা। নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য প্রভুর দরবারে মিনতি না করা। ঋণগুলো পরিশোধ না করা। তার ওপর অর্পিত হকগুলোর প্রদানের ওসিয়ত না করা।
নামাজ ও জাকাতের ক্ষেত্রে অবহেলা করাও নিকৃষ্টতম গোনাহ- যা আর আদায় করা হয় না। সেইসাথে কেউ হয়তো চুরি করার পর তাওবা করল; কিন্তু চুরিকৃত বস্তু ফেরত দিলো না। কিংবা কোনো জালেম তার জুলুমের পর তাওবা করল; কিন্তু সে মাজলুমের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করল না- এটাও নিকৃষ্টতম গোনাহ।
আরেকটি নিকৃষ্টতম গোনাহ হলো, কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর তালাকের ব্যাপারে কসম কেটে তা ভঙ্গ করল। অথচ সে তার স্ত্রীর সাথে বসবাস করতে থাকল।
আমি এখানে যেগুলো উল্লেখ করলাম, সেগুলোর সাথে তুমি অন্যগুলো তুলনা করে নাও। এছাড়াও আরও অনেক নিকৃষ্টতম গোনাহ রয়েছে। তবে কিছু গোনাহের সাথে জড়িত রয়েছে মানুষের ঔদ্ধত্য। এতে মানুষ অভিশপ্ত হয় এবং স্থায়ী আজাবের মুখোমুখি হয়। যেমন, মদ পান। আমি যতটুকু জানি, এটা স্বাদযুক্ত নয়, সুঘ্রাণ নয় এবং সুখকরও নয়। এটা পান করার মধ্যে রয়েছে আল্লাহ তাআলার হুকুম মান্য না করার একধরনের বুনো উল্লাস ও ঔদ্ধত্য। তাই এর শাস্তিও হবে ভয়াবহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের এসকল গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
১১. আল-আদাবুল মুফরাদ : ১/১৯৩/১০৩। মুসনাদে আহমদ : ৬/৮। হাদিসটি বিশুদ্ধ এবং এর বর্ণনাকারীগণও ছিকা। তবে বর্ণনার ভিন্নতায় হাদিসের শব্দে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। মুসনাদে আহমাদের হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
سَمِعْتُ الْمِقْدَادَ بْنَ الْأَسْوَدِ يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَصْحَابِهِ مَا تَقُولُونَ فِي الرِّنَا قَالُوا حَرَّمَهُ اللهُ وَرَسُولُهُ فَهُوَ حَرَامٌ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ قَالَ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَصْحَابِهِ لَأَنْ يَزْنِيَ الرَّجُلُ بِعَشْرَةِ نِسْوَةٍ أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَزْنِي بِامْرَأَةِ جَارِهِ قَالَ فَقَالَ مَا تَقُولُونَ فِي السَّرِقَةِ قَالُوا حَرَّمَهَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ فَهِيَ حَرَامٌ قَالَ لَأَنْ يَسْرِقَ الرَّجُلُ مِنْ عَشْرَةِ أَبْيَاتٍ أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَسْرِقَ مِنْ جَارِهِ
মুসনাদে আহমদ: ৪৮/২২৭৩৪, পৃষ্ঠা: ৩৮০- মা. শামেলা।
📄 অহংকার ও তার ক্ষতিসমূহ
আমি অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি, অধিকাংশ আলেম ও জাহেদ নিজেদের অভ্যন্তরে অহংকার লালন করে।
এ অহংকারী আলেম বা জাহেদ সব সময় তার নিজের অবস্থানের ব্যাপারে তীক্ষ্ণ নজর রাখে। তার চেয়ে কেউ ওপরে উঠে যাচ্ছে কি না- সে বিষয়েও খেয়াল রাখে। সে কোনো দরিদ্র অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যায় না। নিজেকে তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে।
এমনকি একটি শ্রেণিকে দেখেছি, যাদেরকে অনেকেই চেনে, তাদের মধ্যে একজন বলে, আমাকে দাফন করবে আহমদ ইবনে হাম্বল র.-এর কবরের নিকট। অর্থাৎ সে নিজেকে তার যোগ্য মনে করে। আরেকজন বলে বেড়ায়, আমাকে দাফন করবে আমার মসজিদের পাশে। সে ধারণা করে, তার মৃত্যুর পর তার কবরও হজরত মারুফ কারখি রহ.-এর মতো লোকজনের দশর্নীয় স্থানে পরিণত হবে।
এই সবগুলোই মারাত্মক ধ্বংসাত্মক স্বভাব ও মানসিকতা। কিন্তু তারা যেন তা জানে না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
من ظن أنه خير من غيره فقد تكبر.
'যে ব্যক্তি ধারণা করল যে, সে অন্যের চেয়ে উত্তম সে অহংকার করল। ৯২
আমি দেখেছি, খুব কম মানুষই এমনটি করে না। বরং প্রায় সকলেই নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে।
কিন্তু তুমি কি জানো, সে নিজেকে নিয়ে এমনটি মনে করে কেন? সে যদি নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করে ইলমের কারণে, তবে তো তার আগেও অনেক শ্রেষ্ঠ আলেম অতিবাহিত হয়েছেন। ইবাদতের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই। আর যদি সম্পদের কারণে শ্রেষ্ঠ মনে করে, তবে তো বলতে হয়, দ্বীনের ক্ষেত্রে সম্পদ দ্বারা কীভাবে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে?
সে যদি দাবি করে, 'আমি যে ইলম অর্জন করেছি, আমার সময়ে তত ইলম কেউ অর্জন করেনি। তাই শ্রেষ্ঠত্বে আমার চেয়ে কেউ অগ্রগামী নয়।'
তাহলে আমরা তাকে বলব, হে কোরআনের হাফেজ, যে ব্যক্তি মাত্র অর্ধেক হিফজ করেছে, তার চেয়েও তুমি নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবি করতে পারো না। কিংবা হে আলেম ও ফকিহ, যে ব্যক্তি অন্ধ, তুমি তার চেয়েও নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করতে পারো না। কিংবা সেই ব্যক্তি থেকেও নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করতে পারো না- যার ইলম তোমার চেয়ে কম। কারণ, শ্রেষ্ঠত্ব তো এই বাহ্যিক ইলম ও আমলের মাধ্যমে হয় না, দ্বীনি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয় অভ্যন্তরীণ তাকওয়া ও আনুগত্যের মাধ্যমে। অথচ তোমার এই কথার মাধ্যমে অহংকার ও অবাধ্যতার আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে।
যে ব্যক্তি তার স্বভাব, চরিত্র ও গোনাহের দিকে লক্ষ করবে, সে তো তার নিজের গোনাহের পরিমাণ ও বিচ্যুতির কথা সবচেয়ে ভালো জানে। তার নিজের জানার মধ্যে কোনো সন্দেহ-সংশয় নেই। কিন্তু অন্যের গোনাহ, তার পরিমাণ ও তাওবার বিষয়ে সে নিশ্চিত নয়। তাহলে কীভাবে সে নিজেকে নিয়ে অহংকার করে? তাহলে সে কীভাবে আখেরাতের বিষয়ে নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ধারণা করে? মুমিন তো সব সময় নিজেকে ছোট ভাববে। বিনয়ী হবে।
একবার হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.কে বলা হলো, 'আপনি ইন্তেকাল করলে আমরা আপনাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুজরাতে দাফন করব।'
এর উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা শিরক ছাড়া সকল গোনাহ মাফ করবেন। আমার এটা চাই না। আমি নিজেকে কখনো তোমাদের এই প্রস্তাবের যোগ্যও মনে করি না।'
একটি বর্ণনা রয়েছে এমন-একবার এক সাধক ব্যক্তি তার স্বপ্নের মধ্যে একজনকে বলতে শুনল, 'অমুক মুচি তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।' হঠাৎ সাধক ব্যক্তির ঘুম ভেঙে গেল। সে তার ইবাদতগার থেকে নেমে মুচি লোকটির সন্ধানে বের হয়ে পড়ল। এরপর মুচিকে পেয়ে তার আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। উত্তরে মুচি যা বলল, তাতে বড় ধরনের কোনো আমলের কথা পাওয়া গেল না।
সাধক লোকটি আবার নিজের জায়গায় ফিরে এলো। রাতে আবার স্বপ্ন দেখল। তাকে নির্দেশ দেওয়া হলো, তুমি আবার তার কাছে যাও এবং জিজ্ঞাসা করো, তোমার চেহারা মলিন কেন?
সাধক লোকটি আবার সেই মুচির নিকট এসে তাকে প্রশ্ন করল। উত্তরে মুচি লোকটি বলল, 'কারণ, আমি যে মুসলমানকেই দেখি, তাকেই আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করি।'
এবার তাকে বলা হলো, হ্যাঁ, এই কারণেই তার এই উচ্চ মর্যাদা।
টিকাঃ
১২ এটার কোনো সূত্র খুঁজে এখনো পাওয়া যায়নি।
📄 ক্রোধাবিষ্কৃত ব্যক্তির সাথে আচরণ
তুমি যখন দেখো, তোমার কোনো সঙ্গী রেগে গিয়েছে এবং উল্টাপাল্টা অন্যায় কথা বলা শুরু করেছে, তখন তোমার উচিত হবে, তার বলা কথাগুলোকে তোমার কনিষ্ঠ আঙুল পরিমাণও বিশ্বাস না করা। এবং এ কারণে তাকে পাকড়াও না করা। কারণ, এখন তার অবস্থা হলো বেহুঁশি অবস্থা। কী বলছে, তা সে নিজেই জানে না। বরং তুমি তার আকস্মিক এই বিষয়টাতে ধৈর্যধারণ করো। তার ওপর কঠোর হয়ো না। কারণ, শয়তান এখন তার ওপর প্রভাব ফেলছে। তার মেজাজ বিগড়ে গিয়েছে। বুদ্ধি লোপ পেয়েছে।
এখন তুমি যদি তার এই আচরণের কারণে নিজের মনে কোনো বিদ্বেষ রাখো কিংবা তার অসৌজন্য আচরণের মোকাবিলায় তুমিও কঠোরতা অবলম্বন করো, তাহলে এটা তোমার উচিত হবে না। কারণ, এখন তুমি যেন এক বুদ্ধিমান ব্যক্তি এক পাগলের মুখোমুখি হয়েছ। যেন সচেতন এক ব্যক্তি এক বেহুঁশ ব্যক্তির মুখোমুখি হয়েছ। সুতরাং এখন তোমার অসৌজন্যমূলক আচরণটাই অপরাধ হবে; তার নয় বরং এ সময় তুমি তাকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখতে থাকো। তার প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করতে থাকো। সদাচারণ করো।
জেনে রাখো, যখন তার রাগ পড়ে যাবে এবং সে স্বাভাবিক হবে, তখন তার আচরণের জন্য অনুতপ্ত হবে এবং তোমার ধৈর্যের কথাও সে স্বীকার করবে। তোমার প্রতি তার ধারণা অনেক উচ্চ হবে। তোমার প্রতি তার হৃদয় কোমল হবে। আর কিছুই যদি না হয়, তবুও তো এতটুকু তো সে বুঝতে পারবে, তার রাগের সময়ের কর্মকাণ্ডে তুমি তার প্রতি রূঢ় আচরণ করোনি।
মানুষের স্বভাবে রাগের এটি এমন এক অবস্থা, যেটাকে পাশের মানুষকে সয়ে নিতে হয়। পিতার রাগের সময় সন্তানকে। স্বামীর রাগের সময় স্ত্রীকে এবং স্ত্রীর রাগের সময় স্বামীকে। এভাবে প্রতিটি পাশের মানুষকেই অন্যের রাগের সময় সয়ে নিতে হয়। যাতে রাগান্বিত ব্যক্তি তার কথাগুলো বলে স্বস্তি পায় ও শান্ত হয়। তার রাগ প্রশমিত হয়। এ সময় তুমি কিছুতেই তার ওপর চড়াও হবে না। তুমি কড়া কথা বলবে না। তাহলে দেখবে, রাগ প্রশমিত হলে সে নিজেই অনুতপ্ত হবে এবং তার বাড়াবাড়ির জন্য লজ্জিত হবে।
এভাবে যদি কারও ক্রোধান্বিত অবস্থার আচরণ ও কথাগুলো সয়ে যাওয়া হয়, তবে দেখবে কোথাও আর শত্রুতা থাকবে না। এবং তার রাগের অবস্থায় তার সাথে যে আচরণ করা হয়েছে, স্বাভাবিক হয়ে সে এর সুন্দর বদলা প্রদানের চেষ্টা করবে।
কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এই পদ্ধতি অনুসরণ করে না। বরং তারা যখন কাউকে রাগান্বিত হতে দেখে, তারা নিজেরাও রাগান্বিত হয়ে ওঠে। তার মোকাবিলা করে কঠোর কথা বলে ও আচরণ করে। এটা বুদ্ধি ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজ নয়। বরং প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজ সেটাই, যা আমি এতক্ষণ বর্ণনা করলাম। তবে জ্ঞানীরাই শুধু এগুলো অনুধাবন করে ও কাজে পরিণত করে।