📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 কল্যাণকর নির্জনতা

📄 কল্যাণকর নির্জনতা


মাঝেমধ্যে সকল মানুষ থেকে নির্জনতা অবলম্বন আমার কাছে খুবই উপকারী মনে হয়- বিশেষ করে আলেম ও জাহেদের জন্য। কারণ, সেখানে তুমি তোমার বিপদে আনন্দিত ব্যক্তিকে পাবে না। নিয়ামতে হিংসাকারী দেখবে না। কিংবা তোমার দোষ অন্বেষণকারী পাবে না। নির্জনতা কতই না চমৎকার!
তুমি সেখানে গিবতের কদর্যতা থেকে মুক্ত থাকবে। মানুষের সৃষ্ট বিপদাপদ থেকে নিরাপদ থাকবে। কপটতাপূর্ণ অবস্থা থেকে রেহাই পাবে। তোমার সময় কেউ নষ্ট করতে পারবে না।
এরপর অন্তর এই নির্জনতার মধ্যে কতই না চিন্তায় নিমগ্ন হবে। কারণ, চিন্তাশীল অন্তর মানুষের এত ভিড়ভাট্টার চেয়ে নির্জনতাকেই বেশি পছন্দ করে। সেখানেই তার শান্তি। তখন সে চিন্তায় মগ্ন হয় তার দুনিয়া ও আখেরাতের বিষয়াবলি সম্পর্কে। এ যেন সেই জ্বরাক্রান্ত ব্যক্তির মতো- যে নির্জনে তার উত্তাপ অনুভব করে, ধমনীর উঠানামা দেখতে থাকে। নিজের শরীরের মধ্যে যেন নিজেই তখন নিমজ্জিত হয়ে সকল কিছু পরখ করে দেখতে থাকে।
আর মানুষের সীমাহীন মিশ্রণ ব্যক্তিকে যে ভীষণ ক্ষতি করে- তার ভয়াবহতা বলে শেষ করার নয়। কারণ, মানুষ তখন সর্বক্ষণ তার বর্তমান অবস্থার দিকে চেয়ে থাকে কিংবা বর্তমান নিয়েই ব্যস্ত থাকতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন মানুষের সাথে তার সাক্ষাৎ করতে হয়। তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে হয়। আসে বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধানের ব্যস্ততা। এসব করতে গিয়ে সে তখন তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করারই যেন সুযোগ পায় না। তার অবস্থা হয় সেই ব্যক্তির মতো, যে সফর করতে চায় এবং সময়ও অতি নিকটে এসে গেছে- এই সময় সে কিছু মানুষের সাথে গল্প করতে বসে গেছে। তাদের সাথে বিভিন্ন আলাপ-আলোচনা জুড়ে দিয়েছে। নানা রকম কথাবার্তায় সময় অতিবাহিত হয়েছে। এর মাঝেই জাহাজ ছাড়ার ভেঁপু বেজে উঠেছে; অথচ এদিকে তার এখনো সফরের কোনো পাথেয় জোগাড় হয়নি।
তাছাড়া নির্জনতায় কিছুই যদি অর্জিত না হয়, তাতে যদি শুধু আখেরাতের যাত্রার পাথেয় নিয়ে চিন্তা করা হয় এবং সংমিশ্রণের খারাবি থেকে বেঁচে থাকা যায়, এটাও কম প্রাপ্তি নয়। আর প্রকৃত নির্জনতা অর্জিত হতে পারে শুধু আলেম ও জাহেদের জন্যই। যদিও তাদের নির্জনতা নিছক আর নির্জনতা থাকে না। নির্জনতাগুলো ভরে ওঠে কত রকম ভাবনা ও নিমগ্নতায়।
প্রথমে আলেমের কথা ধরা যাক-
তার নির্জনতায় তার সঙ্গী হয়ে ওঠে তার ইলম। তার কিতাবগুলো হয়ে ওঠে তার কথক। সালাফদের বিভিন্ন ঘটনাবলি হয়ে ওঠে তার শক্তিদাতা। অতীতের বিভিন্ন ঘটনাবলি তার সাহস জোগায়। আর যদি সে আল্লাহ তাআলার মারেফাতের স্তরে পৌঁছে যায়, তার মুহাব্বতের দরিয়ার কিনারা পেয়ে যায়, তবে তো তার স্বাদ ও আস্বাদ বেড়ে যায় বহুগুণ। তখন সে এই মারেফাতের দৃষ্টি দিয়ে তাকাতে থাকে পুরো বিশ্বজগতের দিকে। তার মাঝের সকল বস্তুর দিকে। এভাবে সে যেন তার অতি বন্ধুর সান্নিধ্য পেয়ে ধন্য হয়। তার ইলম ও মারেফাতের চাহিদামাফিক আমলে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হয়।
এবার জাহেদের কথা বলি-
নির্জনতার সময় তার ইবাদতগুলোই যেন তার সঙ্গী ও সহচর হয়ে যায়। তার মাবুদই যেন তার সাথি। এরপর যদি তার মারেফাতের স্তর আরও উন্নত হয়ে তার দৃষ্টি সকল সৃষ্টি ও আসবাব থেকে সরে এসে স্রষ্টার প্রতি নিবদ্ধ হয়, তখন তো তার সমুখ থেকে সকল সৃষ্টি অদৃশ্য হয়ে যায়। সৃষ্টির কিছুই যেন তার সমুখে থাকে না। সকল দুঃখ, কষ্ট ও বেদনার ঊর্ধ্বে সে উঠে যায়। স্রষ্টার সান্নিধ্যে নিমগ্ন হয়। জগৎজোড়া মানুষের মাঝ থেকে সে যেন একাকী একক এক সত্তার সমুখে দণ্ডায়মান। আর যেন কোথাও কেউ নেই। কিছু নেই।
এই যে দু-ধরনের লোক—তারা নিজেরা মানুষদের কষ্ট দেওয়া থেকে মুক্ত। এবং মানুষরাও তাদের কষ্ট থেকে নিরাপদ। বরং তারা সকল আবেদের জন্য আদর্শ। সকল সালেকের জন্য নিদর্শন। শ্রোতা তাদের কথায় উপকৃত হয়। তাদের ওয়াজে চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়। সমাজের মাঝে তাদের মর্যাদা ও গাম্ভীর্য সম্প্রচারিত হয়।
কেউ যদি তাদের মতো হতে চায়, তবে অবশ্যই তাকে নির্জনতা অবলম্বন করতে হবে—তা যত কষ্টকরই মনে হোক না কেন। তাহলে একদিন এই ধৈর্যের বেদনা মধু উৎপাদন করবে।
তবে আল্লাহর নিকট তেমন আলেম থেকে আশ্রয় চাই, যে সারা জগতের মানুষের সাথে মিশে বেড়ায়। বিশেষ করে দুনিয়াদার ও রাজা-বাদশাহর সাথে। তাদের সাথে দ্বীন ও সম্পদের লেনদেন করে। প্রতারণা করে এবং প্রতারিত হয়। অবশেষে দুনিয়াদারদের থেকে যতটুকু তার দুনিয়া অর্জন হয়, তার চেয়ে বহু বহু গুণ তার দ্বীন বিনষ্ট হয়।
এসব ফাসেকদের সেই আত্মসম্মানবোধ কোথায় থাকে? যে আলেম এই সম্মানবোধের তোয়াক্কা করে না, সে তো কখনো ইলমের স্বাদ চাখতে পারে না। ইলমের উদ্দেশ্যও সে বোঝে না। সে যেন বিশাল মরুভূমিতে মরীচিকার পানি দেখে দেখে সেখানেই জীবন নিঃশেষ করল।
এমনিভাবে যেই জাহেদ ব্যক্তি সর্ব জায়গায় মিশে চলে—তারও একই অবস্থা। তখন তার মধ্যে অহংকার কাজ করে। আচরণে লৌকিকতা ও মুনাফেকি দেখা দেয়। হরেক রকম পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রকম ভান ধরে। এভাবে তার দু-কূলই হারায়। দুনিয়া এবং তার নগদ নিয়ামতও অর্জন হয় না। আবার আখেরাতও বিনষ্ট হয়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট আমাদের প্রার্থনা—তিনি যেন আমাদের সুমিষ্ট নির্জনতা প্রদান করেন। খারাবি থেকে বিরত থাকার মাঝে মিষ্টতা দান করেন। একান্তে তাঁর নিকট প্রার্থনা ও নিমগ্নতার সৌভাগ্য দান করেন।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 দুনিয়ার প্রকৃত সুখ

📄 দুনিয়ার প্রকৃত সুখ


দুনিয়া প্রত্যাশীগণ দুনিয়ার সুখ আস্বাদনে বিভ্রান্তিতে রয়েছে। এখানে প্রকৃত সুখ হলো ইলমি মর্যাদা, ক্ষমা, আত্মসম্মানবোধ ও অল্পতুষ্টিতে এবং এগুলোর মাধ্যমে সকল মানুষের ওপর শ্রেষ্ঠ হওয়ার মধ্যে।
তাছাড়া খাদ্য-খাবারের আস্বাদন এবং যৌন রমণের তৃপ্তি- এগুলোতে শুধু মূর্খরাই লিপ্ত থাকে। এগুলোর স্থায়িত্ব কতটুকু? এগুলোর দ্বারা উদ্দেশ্য কী? এর দ্বারা নিজের কিছু অর্জিত হয় না। বরং কিছু গ্রহণ করা আর কিছু পরিত্যাগ করা হয়। সন্তান উৎপাদন হয়। এবং কত দ্রুতই না রমণের আস্বাদন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তার প্রভাব থেকে যায়। শরীর দুর্বল হয়।
আর প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ জমা করার মধ্যেই বা কিসের সুখ? এর মাধ্যমে তো সে সম্পদের গোলামে পরিণত হয়। দিনরাত তার সংরক্ষণে সতর্ক থাকতে হয়। তখন সম্পদের স্বল্পতা আরও বৃদ্ধির দিকে প্রতিনিয়ত খোঁচাতে থাকে।
আর খাদ্য-খাবারে সুখই বা কতটুকু এবং কেমন? ক্ষুধার্ত অবস্থায় ভালো-মন্দ সব একই লাগে। খাওয়া একটু বেশি হয়ে গেলে, সেটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তারপর একটা মানুষ আর কতটুকুই বা খেতে পারে? পেট পূর্ণ হওয়ার পর সবকিছুই বিস্বাদ ও অরুচি লাগে।
হজরত আলি রা. বলেন, তিনটি জিনিস মানুষকে বিপদে ফেলে—
১. নারী—তারা যেন শয়তানের পাতানো জ্বলন্ত ফাঁদ।
২. মদ—এটা যেন শয়তানের খোলা তরবারি।
৩. দিনার ও দিরহাম—এ দুটো যেন শয়তানের বিষ মেশানো তির।
যে ব্যক্তি নারীর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, তার জীবনযাপন বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। আর যে ব্যক্তি মদের প্রতি আসক্ত হয়, তার স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি রহিত হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি দিনার ও দিরহামের অর্থাৎ সম্পদের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, সে আজীবন এই দুটোর দাস হয়ে জীবন কাটায়। সুতরাং প্রকৃত সুখ হলো ইলমি যোগ্যতায় এবং চারিত্রিক উৎকর্ষে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 প্রকৃত জীবন মৃত্যুর পর

📄 প্রকৃত জীবন মৃত্যুর পর


পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয় কিংবা প্রিয় কেউ মৃত্যুবরণ করলে তার ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ আমাদের এক স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমরা চিন্তা করি না- মৃত্যুর মাধ্যমে কবরের মধ্যে শুধুমাত্র তার শরীরটা নষ্ট হলো। আর এ জন্যই আমরা দুঃখ করি।
এমন অনেক কিছুই আমাদের চারপাশে সংঘটিত হয়, যেগুলোর গভীর অর্থ নিয়ে আমরা কখনো চিন্তা-ভাবনা করি না। যেমন হাদিসের এই বাণী- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ أَرْوَاحَ الْمُؤْمِنِينَ فِي طَيْرٍ خُضْرٍ تَعْلُقُ بِشَجَرِ الْجَنَّةِ)
নিশ্চয় মুমিনদের আত্মাসমূহ সবুজ পাখিদের শরীরে প্রবেশ করে থাকে, যেগুলো জান্নাতের গাছে গাছে উড়ে বেড়ায়।১০
তাহলে তো আমরা ভেবে দেখতে পাই, আমাদের দেহের মুসাফির আত্মা তো শান্তিতেই রয়েছে। আর মানুষের এই দুনিয়ার শরীর-এটা তো কিছু নয়। এটা নিছক একটি বাহন-যা নষ্ট হয়ে যায়। পচে গলে শেষ হয়ে যায়। কিয়ামতের দিন তাকে আবার নতুন করে তৈরি করা হয়। সুতরাং এটার বিনষ্ট হওয়ার ব্যাপারে আমাদের দুঃখ করা উচিত নয়। বরং অন্তরের মধ্যে এই প্রশান্তি আনা উচিত যে, আত্মাসমূহ এখন একটি শান্তিময় জায়গায় অবস্থান করছে। কোনো দুঃখের বিষয় সেখানে নেই। আর অন্যদেরও তাদের সাথে সাক্ষাতের সময় অতি নিকটেই।
হ্যাঁ, তারপরও মানুষের এই বাহ্যিক শরীরের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে এবং সেটা আমাদের চোখের সামনে থেকে তিরোহিত হওয়ার কারণে আফসোস হয় এবং কষ্ট লাগে। তাকে একসময় সুন্দর গঠন ও আকৃতিতে পৃথিবীতে হাঁটাচলা করতে দেখা গেছে। তার এই শোভিত শরীরটা বিনষ্ট হওয়ার কারণেই দুঃখ বেদনা ভর করছে। কিন্তু কথা হলো, শুধু এই শরীরটাই তো সেই মানুষ নয়। এটা তো নিছক তার বাহন। তার রুহ বা তার মৌলিক সত্তার তো কোনো ক্ষয় হয়নি। সেটাই আসল। সেটাই হলো সেই মানুষ। শরীর কিছু নয়।
তুমি এটি একটি উদাহরণের মাধ্যমে বুঝতে পারো। যেমন তোমার যখন দাঁত পড়ে গেছে। তখন তুমি সেটা হয়তো কোনো গর্তে ফেলে রেখে এসেছ। বাকি জীবনে তুমি কি আর কখনো সেটার খবর নিয়ে থাকো? নাকি তোমার প্রাত্যহিক জীবনের সাথে তার কোনো সম্পর্ক থাকে? থাকে না।
ঠিক একইভাবে মানুষের এই বাহ্যিক শরীর ও গঠনটা ওই দাঁতের মতো। তার বদল ঘটে। মৌলিক আত্মার সাথে তখন আর তার কোনো সম্পর্ক থাকে না। সুতরাং তোমার কোনো ব্যক্তির শুধু শরীর অপসারিত হওয়া এবং তা বিনষ্ট হওয়াতে তোমার দুঃখ করার কিছু নেই। বরং তুমি তার রুহ বা আত্মার স্বস্তি ও শান্তির বিষয়ে চিন্তা করো। নতুন বিষয়ের কথা ভাবো। আর অচিরেই তার সাথে তোমারও সাক্ষাতের কথা ভাবো।
ঠিক মৃত্যুর বিষয়টা যদি এভাবে চিন্তা করা যায় ও ভাবা যায়, তাহলে আমাদের অনেক দুঃখ লাঘব হবে। বিষয়টাকে সহজভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হবে। আল্লাহই তাওফিকদাতা।

টিকাঃ
*১০. সুনানে ইবনে মাজা: ৪/১৪৩৯, পৃষ্ঠা: ৩৮১- মা. শামেলা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মৃত্যুর এক অন্যরকম রহস্য

📄 মৃত্যুর এক অন্যরকম রহস্য


অনেক নির্বোধ ব্যক্তিকেই আমি তাকদির বা ভাগ্যের ওপর ক্রোধ বা ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখি। এদের মধ্যে কারও ঈমান হয়তো দুর্বল—তাই এ ধরনের অভিযোগ ও আপত্তি করে। আর কেউ আছে, কুফরির দিকেই ধাবিত হয়ে গেছে। জগতের সৃষ্টি হওয়া, ধ্বংস হওয়া এবং বর্তমানেও জগৎজুড়ে যা কিছু হচ্ছে ও চলছে—এই ব্যক্তির দৃষ্টিতে সবকিছুই অনর্থক। অকারণ। সে বলে বেড়ায়—সৃষ্টির পর এই ধ্বংসের মধ্যে কী কল্যাণ নিহিত? আমাদের কষ্টে যার কোনো লাভ নেই, তবু সেই কষ্ট ও শান্তির মধ্যেই বা তার কী কল্যাণ নিহিত?
এ ধরনের কথার প্রতিনিধিত্ব করে, এমন একজনকে আমি একদিন ডেকে বললাম, তোমার যদি বুদ্ধি ও বিবেক থাকে, তবে আমি তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই। আর যদি তুমি অনর্থক দুনিয়ার বাহ্যিক ঘটনাবলি দেখে কোনো রকম চিন্তা ও যুক্তি ছাড়া এগুলো বলে বেড়াও, তাহলে তোমার সাথে কথা বলা অনর্থক হবে। অযথা সময় নষ্ট হবে।
লোকটি সম্মত হলে আমি তাকে বললাম, তাহলে বুদ্ধি ও বিবেক খাটিয়ে আমি যা বলি সেগুলো শোনো—
এটা কি সাব্যস্ত হয়ে যায়নি যে আল্লাহ তাআলা হলেন সকলের মালিক ও প্রতিপালক? আর মালিকের জন্য অধিকার রয়েছে তিনি যেভাবে চাইবেন সেভাবেই পরিচালনা করবেন? আর এটাও কি প্রমাণিত হয়ে যায়নি যে, তিনি হলেন হাকিম, প্রজ্ঞাবান; আর প্রজ্ঞাবান কখনো অনর্থক কাজ করেন না?
আমি বুঝতে পারছি, আমার এই কথার ক্ষেত্রে তোমার মনে কিছুটা আপত্তি হতে পারে। তুমি বলতে পারো—আমরা দার্শনিক 'জালিনুস' থেকে একটি বক্তব্য পাই। তিনি বলেন, ‘তিনি [স্রষ্টা] আসলেই প্রজ্ঞাবান কি না, তা আমি নিশ্চিতভাবে জানি না।’ তাঁর এ কথা বলার কারণ হলো, তিনি সবকিছুতেই গড়ার পর ভাঙার উৎসব দেখেন। তিনি স্রষ্টার এই অবস্থাকে সৃষ্টির বিভিন্ন অবস্থার ওপর তুলনা করেন। অর্থাৎ কেউ যখন কোনো জিনিস তৈরি করে, আবার সেটা ভেঙে ফেলে, তাহলে নিশ্চয় সে প্রজ্ঞাবান নয়। স্রষ্টার বিষয়ও তিনি অনেকটা সেরকম মনে করেন।
দার্শনিক জালিনুস—তিনি যদি আজ জীবিত থাকতেন, তবে আমি তার এ কথার উত্তরে তাকেই বলতাম, কীভাবে আপনি দাবি করেন যে, গড়ার পর কিছু ভেঙে ফেলা প্রজ্ঞাপূর্ণ নয়? জগতেই এর অনেক উদাহরণ আছে। তাছাড়া আপনি যে আকল ও মস্তিষ্ক দিয়ে কথা বলছেন, এটা কি স্রষ্টাই আপনাকে প্রদান করেননি? তাহলে কীভাবে তিনি আপনাকে একটি পূর্ণ সম্পূর্ণ শক্তিশালী মেধা দিলেন আর তার নিজেরই পূর্ণ মেধা ও প্রজ্ঞা নেই? এটা তো এক উদ্ভট দাবি!
ঠিক এ ধরনের পরীক্ষাতেই আক্রান্ত হয়েছিল ইবলিস। সে তার নিজের আকল-বুদ্ধি দিয়ে স্রষ্টার প্রাজ্ঞতার দোষ ধরতে চেয়েছিল। কিন্তু চিন্তা করে দেখেনি- আকল-বুদ্ধির প্রদাতা আল্লাহ তাআলা সেই আক্কলের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে। তার প্রজ্ঞা সকল জ্ঞানবানদের চেয়ে পূর্ণ ও সম্পূর্ণ। কারণ, তিনি তার সীমাহীন সম্পূর্ণ প্রজ্ঞার মাধ্যমেই মানুষের এই আকল-বুদ্ধি সৃষ্টি করেছেন। যদি সেই দার্শনিক লেখক এই বিষয়টি চিন্তা করতেন, তবে তার সন্দেহ দূর হয়ে যেত। আল্লাহ তাআলা মানুষের এই ধরনের অসম্পূর্ণ বিভ্রান্তির দিকে ইশারা করে বলেছেন—
﴿أَم لَهُ الْبَنَاتُ وَلَكُمُ الْبَنُوْنَ)
তবে কি কন্যা সন্তান পড়ল আল্লাহর ভাগে আর পুত্র সন্তান তোমাদের ভাগে? [সুরা তুর: ৩৯]
অর্থাৎ তিনি কি নিজের জন্য রেখেছেন অসম্পূর্ণতা আর তোমার জন্য দিয়েছেন সম্পূর্ণতা?!
একটু ভেবে বলো তো দেখি, তোমাদের এ কেমন দাবি!
সুতরাং যে সকল বিষয় আমাদের বোঝার বাইরে, সেগুলো আমাদের অক্ষমতার কারণেই হয়ে থাকে। অতএব আমরা বলব, এটা সর্বজ্ঞাত ও প্রজ্ঞাবান এক সত্তার কাজ। কিন্তু তিনি আমাদের জন্য তার সম্পূর্ণতা বর্ণনা করেননি। আর গড়ার পর ভাঙা—এ ধরনের বিষয় সংঘটিত হওয়া আশ্চর্যের কিছু নয়। অস্বাভাবিকও নয়। যেমন, হজরত মুসা আলাইহিস সালামের নিকট ভালো নৌকাটি ভেঙে ফেলা এবং সুন্দর ছেলেটিকে হত্যা করার হিকমত বা রহস্য জানা ছিল না। তাই তিনি এগুলোকে অন্যায় ভাবছিলেন। কিন্তু যখন হজরত খাজির আলাইহিস সালাম তাকে এর হিকমত জানিয়ে দিলেন, তখন তিনি মেনে নিলেন। স্রষ্টার সাথে আমাদের অবস্থাও অনেকটা খাজিরের সাথে মুসার অবস্থার মতো।
আমরা কি আমাদের দস্তরখানায় অনেক সুন্দর সুন্দর সজ্জিত খাবার পরিবেশিত হতে দেখি না? সেগুলো কাটা হয়, চূর্ণ করা হয়। আস্ত সবজি ও ফলগুলো কীভাবে টুকরো টুকরো করা হয়। আবার কিছু রান্না করা হয়। আরও অনেক কিছু হয়। কিন্তু এগুলো করতে আমরা বাধা দিই না। বলি না যে, এগুলো নষ্ট করা হচ্ছে। কারণ, আমরা জানি, এসব কাটা-চেরার মধ্যেই রয়েছে এর সর্বাধিক কল্যাণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা।
সুতরাং স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ক্ষেত্রে এমন অনেক বিষয় থাকতেই পারে—যেগুলোর ভাঙা-গড়ার অভ্যন্তরীণ কল্যাণ তিনিই শুধু জানেন—আমরা এখনো জানি না।
সেই বান্দার চেয়ে মূর্খ ও নির্বোধ বান্দা কে আছে, যে তার প্রভুর গোপন বিষয় অবগত হতে চায়? বরং বান্দার কর্তব্য হলো আনুগত্য করা। মেনে নেওয়া। আপত্তি বা অভিযোগ না করা।
যুক্তি বা বিবেক বাহ্যিকভাবে যেগুলোকে মেনে নিতে চায় না, সেখানেই তো তার পরীক্ষা— নিঃশর্তভাবে মেনে নাও কি না? এখানে মানাটা যেমন কঠিন; আবার উৎরে গেলে পুরস্কারও তেমন অঢেল ও সীমাহীন।
আমি একটি নতুন বিষয় চিন্তা করলাম। হতে পারে মানুষের মৃত্যুর উদ্দেশ্য সেটাই। কথা হলো, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের থেকে অদৃশ্যে রয়েছেন। আমাদের ইন্দ্রিয়শক্তি দিয়ে তাকে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এখন কথা হলো, আল্লাহ তাআলা যদি শারীরিক এই গঠনকে ভেঙে না দিতেন, তাহলে মানুষের বদ্ধমূল ধারণা থাকত যে, সে কোনো স্রষ্টা ছাড়াই একটি সৃষ্টি। কিন্তু যখন তার মৃত্যু সংঘটিত হয়ে যায়, তখন নফস তার নিজেকে নিজরূপে দেখতে পায়— যা আগে শরীরের মধ্যে আড়াল হওয়ার কারণে নিজেকে আলাদাভাবে চিনতে পারত না। কিন্তু এভাবে মৃত্যুর পর আরও অনেক আশ্চর্য বিষয় সে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়। এরপর আবার যখন তাকে শরীরের মধ্যে প্রবেশ করানো হয়, তখন সে অনিবার্যভাবেই বুঝতে পারে যে, সে নিছক একটি সৃষ্টি। যিনি তাকে পুনর্বার সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তার স্রষ্টা। তখন দুনিয়ার বিষয়াবলিও তার স্মরণে আসতে থাকে। কারণ, শরীর পুনর্বার গঠনের মতো মানুষের স্মৃতিশক্তিও আবার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তখন সে বলে উঠবে—
إِنَّا كُنَّا قبل في أهلنا مُشْفِقِين)
আমরা পূর্বে আমাদের পরিবারবর্গের মধ্যে (অর্থাৎ দুনিয়ায়) বড় ভয়ের ভেতর ছিলাম। [সুরা তুর: ২৬]
এমনিভাবে যখন সে আখেরাতের ওয়াদাকৃত সকল বিষয় দেখতে পাবে, তখন তার এমন ইয়াকিন ও বিশ্বাস সৃষ্টি হবে, যার মধ্যে সামান্যতমও সন্দেহ নেই। মৃত্যুর পর পুনর্বার তাকে সৃষ্টি করা ব্যতীত এটা কখনো তার বাস্তবে অর্জিত হওয়া সম্ভব ছিল না। নিজে এগুলো দেখার মাধ্যমেই তার এই ইয়াকিন অর্জিত হয়েছে। এই ইয়াকিন অর্জিত হওয়ার পর তার এমন শারীরিক গঠন প্রদান করা হবে, যা আর কখনো ধ্বংস হবে না। এই শরীরেই সে চিরদিন জান্নাতে বসবাস করবে। এবার নিষ্কলুষ নিঃশঙ্ক ইয়াকিনের মাধ্যকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে দেখতে সক্ষম হবে। কারণ, সে দুনিয়ায় থাকতেই স্রষ্টার পক্ষ থেকে যা কিছু ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোতে বিশ্বাস করেছিল। যে বিপদ ও কষ্ট এসেছিল- সেগুলোর ওপর ধৈর্যধারণ করেছিল। তাকদিরের ওপর বিশ্বাস করেছিল। কোনো আপত্তি ও অভিযোগ করেনি।
এভাবে সে দুনিয়াতে অন্যের মৃত্যু দেখে শিক্ষা গ্রহণ করেছে আর আখেরাতে নিজেরটা দেখে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। আর এই অবস্থাতেই তাকে বলা হবে—
ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً فَادْخُلِي فِي عِبَادِي وَادْخُلِي جَنَّتِي )
তোমার প্রতিপালকের দিকে ফিরে আসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে এবং আমার নেক বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। আর প্রবেশ করো আমার জান্নাতে। [সুরা ফাজর: ২৮-৩০]
কিন্তু যারা ছিল সংশয়বাদী ও কাফের- তাদের জন্য ফায়সালা করা হবে জাহান্নামে প্রবেশের এবং চিরদিন সেখানেই তারা শাস্তি ভোগ করবে। কারণ, দুনিয়াতে তারা অনেক প্রমাণ দেখেছে; কিন্তু শিক্ষা গ্রহণ করেনি। তারা বরং প্রজ্ঞাবান আল্লাহর ব্যাপারে তর্কে লিপ্ত হয়েছিল। তার ওপর বিভিন্ন অভিযোগ ও আপত্তি উত্থাপন করেছিল। সুতরাং আখেরাতে তাদের সেই কুফরির কদর্যতা ফিরে আসবে। তাদের অন্তরগুলো অন্ধ করে দেবে। সুতরাং তাদের অন্তরগুলো আগের সেই কুফরির অবস্থায় বিরাজ করবে। যেহেতু দুনিয়াতে কোনো প্রমাণ তাদের উপকার করেনি, তাই আখেরাতের কোনো প্রমাণও তাদের উপকৃত করবে না। এমনকি তাদের পুনরায় দুনিয়াতে ফিরিয়ে দিলেও তারা বিশ্বাসী হবে না। তাদের অন্তরের এই কদর্যতার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَلَوْ رُدُّوا لَعَادُوا لِمَا نُهُوا عَنْهُ وَإِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ ۞ وَقَالُوا إِنْ هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ ۞ وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى رَبِّهِمْ قَالَ أَلَيْسَ هَذَا بِالْحَقِّ ۞ قَالُوا بَلَى وَرَبِّنَا قَالَ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنْتُمْ تَكْفُرُونَ﴾
সত্যিই যদি তাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়, তবে পুনরায় তারা সে সবই করবে, যা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। নিশ্চয়ই তারা ঘোর মিথ্যাবাদী।
তারা বলেছিল, যা কিছু আছে তা কেবল আমাদের এই পার্থিব জীবনই। (মৃত্যুর পর) আমরা পুনর্জীবিত হওয়ারই নই।
তুমি যদি সেই সময় দেখতে পাও, যখন তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে। তিনি বলবেন, এটা (এই দ্বিতীয় জীবন) কি সত্য নয়? তারা বলবে, আমাদের প্রতিপালকের শপথ, নিশ্চয়ই। আল্লাহ বলবেন, তবে তোমরা শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করো। কারণ, তোমরা অস্বীকার করেছিলে।
[সুরা আনআম: ২৮-৩০]
আল্লাহ তাআলার নিকট আমাদের আকুল প্রার্থনা- তিনি যেন আমাদের একটি অনুগত বিবেক দেন; যেই বিবেক তার স্রষ্টা ও প্রতিপালকের ওপর কোনো অভিযোগ ও আপত্তি না করে।
আর আপত্তিকারীদের জন্যই দুর্ভোগ! সে কি তার আপত্তির মাধ্যমে তার ভাগ্য পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে? এতে শুধু লাঞ্ছনা ও শাস্তিই বৃদ্ধি পাবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00