📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 গোপন বিষয়ের গোপনীয়তা

📄 গোপন বিষয়ের গোপনীয়তা


আমি দেখেছি, অধিকাংশ মানুষই তাদের গোপন বিষয় গোপন রাখতে সক্ষম হয় না। বিশেষ করে যখন সেটা হয়ে থাকে কোনো অসুস্থতা, দুঃখ কিংবা সম্পদ ও ভালোবাসার বিষয়। এগুলো উল্লেখ করতে এক ধরনের সুখ অনুভব হয়।
কিন্তু মানুষের চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচায়ক হলো, যে ক্ষেত্রে সে কোনো উদ্দেশ্য অর্জন করতে চায়, তা গোপন করে রাখা। আর দুর্বলতার প্রকাশ হলো, তা অর্জনের আগেই প্রকাশ করে দেওয়া। তখন অনেক সময় তার এই প্রকাশের কারণে কাজটি আর অর্জিত করা সম্ভব হয় না। অন্যদের নিকট যে ব্যক্তি কথাটি প্রকাশ করে দিয়েছে, তার ওপরও কোনো ওজর-আপত্তি চলে না। কারণ, প্রথম প্রকাশক তো তুমি নিজেই।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত যখন কোনো গাজওয়া বা লড়াইয়ের জন্য বের হতেন, তখন তিনি তার সঠিক দিকের কথা উল্লেখ করতেন না।
এখন কেউ যদি বলে, আমি তো আমার খুব আস্থাভাজন ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করেছিলাম। এখানে আমার দোষ কী?
আমি তাকে বলি, যে কথাটি দ্বিতীয় ব্যক্তির কানে চলে যায়, সেটাই আসলে প্রকাশমান কথা হয়ে যায়। তোমার বন্ধু তো সর্বক্ষণ সে কথা গোপন রাখতে পারে না—তুমি নিজেই যেহেতু পারোনি।
এমন অনেক ঘটনার কথা শুনেছি, বাদশাহ হয়তো কাউকে পাকড়াও করবেন। এই কথা তার বিশ্বস্ত কোনো ব্যক্তির কাছে গোপনে প্রকাশ করেছেন। দেখা গেছে, সে কথা নির্দিষ্ট অপরাধীর কানেও পৌঁছে গেছে। তখন সে ব্যক্তি পলায়ন করেছে। বাদশাহ আর তাকে ধরতে সক্ষম হয়নি। কিংবা নিজের কোনো বিশেষ পরিকল্পনা বিনষ্ট হয়েছে এই কথা ছড়ানোর কারণে।
সন্তান বা স্ত্রীর নিকটও গোপন বিষয় উল্লেখ করা এক ধরনের দুর্বলতা। তাদের থেকে সম্পদের কথাও গোপন রাখা উচিত। সম্পদ যদি বেশি হয়, তবে পরিচিতদের মনে হিংসার উদ্রেক করবে। কাউকে কষ্টে ফেলে দেবে। কেউ আবার উত্তরাধিকারীদের মৃত্যু কামনা করবে—এমনকি তোমারও।
কখনো আবার এটার কারণে ডাকাতি, ছিনতাই বা লুণ্ঠনের শিকার হতে পারে। আবার বিভিন্ন প্রার্থনাকারীরা বেশি সম্পদশালীদের নিকট সম্পদের পরিমাণ অনুপাতে বেশি বেশি প্রার্থনা করতে পারে। তাহলে দেখা যাবে, তাদের দিতে দিতেই তোমার সম্পদ নিঃশেষ হয়ে পড়বে।
একইভাবে বিপদাপদের কথাও গোপন রাখা উচিত। কারণ, এর প্রকাশ শত্রুকে ও প্রতিদ্বন্দ্বীকে আনন্দিত করবে। আর প্রিয় ব্যক্তিদের ফেলবে কষ্টে।
এমনকি নিজের বয়সের বিষয়টিও গোপন রাখা উচিত। কারণ, বয়সটি যদি উপস্থিত ব্যক্তিদের চেয়ে বেশি হয়, তবে তারা তোমাকে অথর্ব ও জরাগ্রস্ত ভেবে বসবে। আর যদি কম হয়, তবে তারা তোমাকে নিতান্তই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞা করবে।
যে বিষয়টিতে অনেকেই অবহেলা করে, তা হলো, নিজেদের আড্ডায় ও বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে আমির বা সুলতান সম্পর্কে এমন গোপন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা, অবশেষে এটা তাদের কানে পৌঁছে যায় এবং এটা তখন কথকের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কখনো কখনো কাছের কোনো বন্ধু ব্যক্তির একনিষ্ঠতা, সততা, আমানতদারি ও গোপন আমলের কথাও মানুষের কাছে প্রচার করে দেয়।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষ যখন তার গোপন বিষয় তার স্ত্রী কিংবা বন্ধুর কাছে প্রকাশ করে দেয়, তখন সে সেই স্ত্রী ও বন্ধুর কাছে বন্দি হয়ে পড়ে। স্ত্রীর গুরুতর কোনো অপরাধেও তখন সে সেই স্ত্রীকে তালাক দিতে সক্ষম হয় না। আবার সেই বন্ধুর অপরাধেও তাকে ত্যাগ করতে সাহস পায় না। কারণ, তাদের বিরোধিতা করতে গেলে তারা গোপন কথা প্রকাশ করে দেবে।
সুতরাং সুদৃঢ় মনোবলের মানুষ হলো সেই ব্যক্তি, যে মানুষদের সাথে বাহ্যিকতায় স্বাভাবিক আচরণ করে চলে। তাদের কাছে তার গোপন কথা প্রকাশ করে না। এ অবস্থায় তার কোনো স্ত্রী কিংবা বন্ধু কিংবা সেবকের সাথে তার বিচ্ছেদ ঘটে, তাহলেও তাদের কেউ তার গোপন বিষয় প্রকাশ করতে সক্ষম হবে না।
সবচেয়ে বড় গোপন বিষয় হলো নিজের নির্জন ও একান্ত বিষয়গুলো। সুতরাং সুদৃঢ় চরিত্রের ব্যক্তির জন্য উচিত হবে- তার এই নির্জনতার কোনো বিষয় যেন মানুষের কাছে প্রকাশ না পায়। তবে গোনাহের কাজ সে কোথাও করবে না। নির্জনে কিংবা প্রকাশ্যে।
তবে যে ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন একটি মস্তিষ্ক রয়েছে, তাকে এগুলো বলার আগেই সে নিজের কাজ সম্পর্কে সচেতন হয়ে থাকে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 কল্যাণকর নির্জনতা

📄 কল্যাণকর নির্জনতা


মাঝেমধ্যে সকল মানুষ থেকে নির্জনতা অবলম্বন আমার কাছে খুবই উপকারী মনে হয়- বিশেষ করে আলেম ও জাহেদের জন্য। কারণ, সেখানে তুমি তোমার বিপদে আনন্দিত ব্যক্তিকে পাবে না। নিয়ামতে হিংসাকারী দেখবে না। কিংবা তোমার দোষ অন্বেষণকারী পাবে না। নির্জনতা কতই না চমৎকার!
তুমি সেখানে গিবতের কদর্যতা থেকে মুক্ত থাকবে। মানুষের সৃষ্ট বিপদাপদ থেকে নিরাপদ থাকবে। কপটতাপূর্ণ অবস্থা থেকে রেহাই পাবে। তোমার সময় কেউ নষ্ট করতে পারবে না।
এরপর অন্তর এই নির্জনতার মধ্যে কতই না চিন্তায় নিমগ্ন হবে। কারণ, চিন্তাশীল অন্তর মানুষের এত ভিড়ভাট্টার চেয়ে নির্জনতাকেই বেশি পছন্দ করে। সেখানেই তার শান্তি। তখন সে চিন্তায় মগ্ন হয় তার দুনিয়া ও আখেরাতের বিষয়াবলি সম্পর্কে। এ যেন সেই জ্বরাক্রান্ত ব্যক্তির মতো- যে নির্জনে তার উত্তাপ অনুভব করে, ধমনীর উঠানামা দেখতে থাকে। নিজের শরীরের মধ্যে যেন নিজেই তখন নিমজ্জিত হয়ে সকল কিছু পরখ করে দেখতে থাকে।
আর মানুষের সীমাহীন মিশ্রণ ব্যক্তিকে যে ভীষণ ক্ষতি করে- তার ভয়াবহতা বলে শেষ করার নয়। কারণ, মানুষ তখন সর্বক্ষণ তার বর্তমান অবস্থার দিকে চেয়ে থাকে কিংবা বর্তমান নিয়েই ব্যস্ত থাকতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন মানুষের সাথে তার সাক্ষাৎ করতে হয়। তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে হয়। আসে বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধানের ব্যস্ততা। এসব করতে গিয়ে সে তখন তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করারই যেন সুযোগ পায় না। তার অবস্থা হয় সেই ব্যক্তির মতো, যে সফর করতে চায় এবং সময়ও অতি নিকটে এসে গেছে- এই সময় সে কিছু মানুষের সাথে গল্প করতে বসে গেছে। তাদের সাথে বিভিন্ন আলাপ-আলোচনা জুড়ে দিয়েছে। নানা রকম কথাবার্তায় সময় অতিবাহিত হয়েছে। এর মাঝেই জাহাজ ছাড়ার ভেঁপু বেজে উঠেছে; অথচ এদিকে তার এখনো সফরের কোনো পাথেয় জোগাড় হয়নি।
তাছাড়া নির্জনতায় কিছুই যদি অর্জিত না হয়, তাতে যদি শুধু আখেরাতের যাত্রার পাথেয় নিয়ে চিন্তা করা হয় এবং সংমিশ্রণের খারাবি থেকে বেঁচে থাকা যায়, এটাও কম প্রাপ্তি নয়। আর প্রকৃত নির্জনতা অর্জিত হতে পারে শুধু আলেম ও জাহেদের জন্যই। যদিও তাদের নির্জনতা নিছক আর নির্জনতা থাকে না। নির্জনতাগুলো ভরে ওঠে কত রকম ভাবনা ও নিমগ্নতায়।
প্রথমে আলেমের কথা ধরা যাক-
তার নির্জনতায় তার সঙ্গী হয়ে ওঠে তার ইলম। তার কিতাবগুলো হয়ে ওঠে তার কথক। সালাফদের বিভিন্ন ঘটনাবলি হয়ে ওঠে তার শক্তিদাতা। অতীতের বিভিন্ন ঘটনাবলি তার সাহস জোগায়। আর যদি সে আল্লাহ তাআলার মারেফাতের স্তরে পৌঁছে যায়, তার মুহাব্বতের দরিয়ার কিনারা পেয়ে যায়, তবে তো তার স্বাদ ও আস্বাদ বেড়ে যায় বহুগুণ। তখন সে এই মারেফাতের দৃষ্টি দিয়ে তাকাতে থাকে পুরো বিশ্বজগতের দিকে। তার মাঝের সকল বস্তুর দিকে। এভাবে সে যেন তার অতি বন্ধুর সান্নিধ্য পেয়ে ধন্য হয়। তার ইলম ও মারেফাতের চাহিদামাফিক আমলে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হয়।
এবার জাহেদের কথা বলি-
নির্জনতার সময় তার ইবাদতগুলোই যেন তার সঙ্গী ও সহচর হয়ে যায়। তার মাবুদই যেন তার সাথি। এরপর যদি তার মারেফাতের স্তর আরও উন্নত হয়ে তার দৃষ্টি সকল সৃষ্টি ও আসবাব থেকে সরে এসে স্রষ্টার প্রতি নিবদ্ধ হয়, তখন তো তার সমুখ থেকে সকল সৃষ্টি অদৃশ্য হয়ে যায়। সৃষ্টির কিছুই যেন তার সমুখে থাকে না। সকল দুঃখ, কষ্ট ও বেদনার ঊর্ধ্বে সে উঠে যায়। স্রষ্টার সান্নিধ্যে নিমগ্ন হয়। জগৎজোড়া মানুষের মাঝ থেকে সে যেন একাকী একক এক সত্তার সমুখে দণ্ডায়মান। আর যেন কোথাও কেউ নেই। কিছু নেই।
এই যে দু-ধরনের লোক—তারা নিজেরা মানুষদের কষ্ট দেওয়া থেকে মুক্ত। এবং মানুষরাও তাদের কষ্ট থেকে নিরাপদ। বরং তারা সকল আবেদের জন্য আদর্শ। সকল সালেকের জন্য নিদর্শন। শ্রোতা তাদের কথায় উপকৃত হয়। তাদের ওয়াজে চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়। সমাজের মাঝে তাদের মর্যাদা ও গাম্ভীর্য সম্প্রচারিত হয়।
কেউ যদি তাদের মতো হতে চায়, তবে অবশ্যই তাকে নির্জনতা অবলম্বন করতে হবে—তা যত কষ্টকরই মনে হোক না কেন। তাহলে একদিন এই ধৈর্যের বেদনা মধু উৎপাদন করবে।
তবে আল্লাহর নিকট তেমন আলেম থেকে আশ্রয় চাই, যে সারা জগতের মানুষের সাথে মিশে বেড়ায়। বিশেষ করে দুনিয়াদার ও রাজা-বাদশাহর সাথে। তাদের সাথে দ্বীন ও সম্পদের লেনদেন করে। প্রতারণা করে এবং প্রতারিত হয়। অবশেষে দুনিয়াদারদের থেকে যতটুকু তার দুনিয়া অর্জন হয়, তার চেয়ে বহু বহু গুণ তার দ্বীন বিনষ্ট হয়।
এসব ফাসেকদের সেই আত্মসম্মানবোধ কোথায় থাকে? যে আলেম এই সম্মানবোধের তোয়াক্কা করে না, সে তো কখনো ইলমের স্বাদ চাখতে পারে না। ইলমের উদ্দেশ্যও সে বোঝে না। সে যেন বিশাল মরুভূমিতে মরীচিকার পানি দেখে দেখে সেখানেই জীবন নিঃশেষ করল।
এমনিভাবে যেই জাহেদ ব্যক্তি সর্ব জায়গায় মিশে চলে—তারও একই অবস্থা। তখন তার মধ্যে অহংকার কাজ করে। আচরণে লৌকিকতা ও মুনাফেকি দেখা দেয়। হরেক রকম পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রকম ভান ধরে। এভাবে তার দু-কূলই হারায়। দুনিয়া এবং তার নগদ নিয়ামতও অর্জন হয় না। আবার আখেরাতও বিনষ্ট হয়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট আমাদের প্রার্থনা—তিনি যেন আমাদের সুমিষ্ট নির্জনতা প্রদান করেন। খারাবি থেকে বিরত থাকার মাঝে মিষ্টতা দান করেন। একান্তে তাঁর নিকট প্রার্থনা ও নিমগ্নতার সৌভাগ্য দান করেন।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 দুনিয়ার প্রকৃত সুখ

📄 দুনিয়ার প্রকৃত সুখ


দুনিয়া প্রত্যাশীগণ দুনিয়ার সুখ আস্বাদনে বিভ্রান্তিতে রয়েছে। এখানে প্রকৃত সুখ হলো ইলমি মর্যাদা, ক্ষমা, আত্মসম্মানবোধ ও অল্পতুষ্টিতে এবং এগুলোর মাধ্যমে সকল মানুষের ওপর শ্রেষ্ঠ হওয়ার মধ্যে।
তাছাড়া খাদ্য-খাবারের আস্বাদন এবং যৌন রমণের তৃপ্তি- এগুলোতে শুধু মূর্খরাই লিপ্ত থাকে। এগুলোর স্থায়িত্ব কতটুকু? এগুলোর দ্বারা উদ্দেশ্য কী? এর দ্বারা নিজের কিছু অর্জিত হয় না। বরং কিছু গ্রহণ করা আর কিছু পরিত্যাগ করা হয়। সন্তান উৎপাদন হয়। এবং কত দ্রুতই না রমণের আস্বাদন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তার প্রভাব থেকে যায়। শরীর দুর্বল হয়।
আর প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ জমা করার মধ্যেই বা কিসের সুখ? এর মাধ্যমে তো সে সম্পদের গোলামে পরিণত হয়। দিনরাত তার সংরক্ষণে সতর্ক থাকতে হয়। তখন সম্পদের স্বল্পতা আরও বৃদ্ধির দিকে প্রতিনিয়ত খোঁচাতে থাকে।
আর খাদ্য-খাবারে সুখই বা কতটুকু এবং কেমন? ক্ষুধার্ত অবস্থায় ভালো-মন্দ সব একই লাগে। খাওয়া একটু বেশি হয়ে গেলে, সেটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তারপর একটা মানুষ আর কতটুকুই বা খেতে পারে? পেট পূর্ণ হওয়ার পর সবকিছুই বিস্বাদ ও অরুচি লাগে।
হজরত আলি রা. বলেন, তিনটি জিনিস মানুষকে বিপদে ফেলে—
১. নারী—তারা যেন শয়তানের পাতানো জ্বলন্ত ফাঁদ।
২. মদ—এটা যেন শয়তানের খোলা তরবারি।
৩. দিনার ও দিরহাম—এ দুটো যেন শয়তানের বিষ মেশানো তির।
যে ব্যক্তি নারীর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, তার জীবনযাপন বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। আর যে ব্যক্তি মদের প্রতি আসক্ত হয়, তার স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি রহিত হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি দিনার ও দিরহামের অর্থাৎ সম্পদের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, সে আজীবন এই দুটোর দাস হয়ে জীবন কাটায়। সুতরাং প্রকৃত সুখ হলো ইলমি যোগ্যতায় এবং চারিত্রিক উৎকর্ষে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 প্রকৃত জীবন মৃত্যুর পর

📄 প্রকৃত জীবন মৃত্যুর পর


পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয় কিংবা প্রিয় কেউ মৃত্যুবরণ করলে তার ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ আমাদের এক স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমরা চিন্তা করি না- মৃত্যুর মাধ্যমে কবরের মধ্যে শুধুমাত্র তার শরীরটা নষ্ট হলো। আর এ জন্যই আমরা দুঃখ করি।
এমন অনেক কিছুই আমাদের চারপাশে সংঘটিত হয়, যেগুলোর গভীর অর্থ নিয়ে আমরা কখনো চিন্তা-ভাবনা করি না। যেমন হাদিসের এই বাণী- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ أَرْوَاحَ الْمُؤْمِنِينَ فِي طَيْرٍ خُضْرٍ تَعْلُقُ بِشَجَرِ الْجَنَّةِ)
নিশ্চয় মুমিনদের আত্মাসমূহ সবুজ পাখিদের শরীরে প্রবেশ করে থাকে, যেগুলো জান্নাতের গাছে গাছে উড়ে বেড়ায়।১০
তাহলে তো আমরা ভেবে দেখতে পাই, আমাদের দেহের মুসাফির আত্মা তো শান্তিতেই রয়েছে। আর মানুষের এই দুনিয়ার শরীর-এটা তো কিছু নয়। এটা নিছক একটি বাহন-যা নষ্ট হয়ে যায়। পচে গলে শেষ হয়ে যায়। কিয়ামতের দিন তাকে আবার নতুন করে তৈরি করা হয়। সুতরাং এটার বিনষ্ট হওয়ার ব্যাপারে আমাদের দুঃখ করা উচিত নয়। বরং অন্তরের মধ্যে এই প্রশান্তি আনা উচিত যে, আত্মাসমূহ এখন একটি শান্তিময় জায়গায় অবস্থান করছে। কোনো দুঃখের বিষয় সেখানে নেই। আর অন্যদেরও তাদের সাথে সাক্ষাতের সময় অতি নিকটেই।
হ্যাঁ, তারপরও মানুষের এই বাহ্যিক শরীরের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে এবং সেটা আমাদের চোখের সামনে থেকে তিরোহিত হওয়ার কারণে আফসোস হয় এবং কষ্ট লাগে। তাকে একসময় সুন্দর গঠন ও আকৃতিতে পৃথিবীতে হাঁটাচলা করতে দেখা গেছে। তার এই শোভিত শরীরটা বিনষ্ট হওয়ার কারণেই দুঃখ বেদনা ভর করছে। কিন্তু কথা হলো, শুধু এই শরীরটাই তো সেই মানুষ নয়। এটা তো নিছক তার বাহন। তার রুহ বা তার মৌলিক সত্তার তো কোনো ক্ষয় হয়নি। সেটাই আসল। সেটাই হলো সেই মানুষ। শরীর কিছু নয়।
তুমি এটি একটি উদাহরণের মাধ্যমে বুঝতে পারো। যেমন তোমার যখন দাঁত পড়ে গেছে। তখন তুমি সেটা হয়তো কোনো গর্তে ফেলে রেখে এসেছ। বাকি জীবনে তুমি কি আর কখনো সেটার খবর নিয়ে থাকো? নাকি তোমার প্রাত্যহিক জীবনের সাথে তার কোনো সম্পর্ক থাকে? থাকে না।
ঠিক একইভাবে মানুষের এই বাহ্যিক শরীর ও গঠনটা ওই দাঁতের মতো। তার বদল ঘটে। মৌলিক আত্মার সাথে তখন আর তার কোনো সম্পর্ক থাকে না। সুতরাং তোমার কোনো ব্যক্তির শুধু শরীর অপসারিত হওয়া এবং তা বিনষ্ট হওয়াতে তোমার দুঃখ করার কিছু নেই। বরং তুমি তার রুহ বা আত্মার স্বস্তি ও শান্তির বিষয়ে চিন্তা করো। নতুন বিষয়ের কথা ভাবো। আর অচিরেই তার সাথে তোমারও সাক্ষাতের কথা ভাবো।
ঠিক মৃত্যুর বিষয়টা যদি এভাবে চিন্তা করা যায় ও ভাবা যায়, তাহলে আমাদের অনেক দুঃখ লাঘব হবে। বিষয়টাকে সহজভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হবে। আল্লাহই তাওফিকদাতা।

টিকাঃ
*১০. সুনানে ইবনে মাজা: ৪/১৪৩৯, পৃষ্ঠা: ৩৮১- মা. শামেলা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00