📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আচার-আচরণের ক্ষেত্রে সতর্কতা

📄 আচার-আচরণের ক্ষেত্রে সতর্কতা


বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত হবে- কোনো মানুষের নীতি-নৈতিকতার দিকে লক্ষ করা। সেটা লেনদেন, ওঠাবসা, মেলামেশা ও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে হতে পারে। হতে পারে বিয়ে করা বা বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও। এরপর দৃষ্টি দেবে মানুষের বাহ্যিক আকার-গঠনের দিকে। বাহ্যিক গঠন ভালো হলে আশা করা যায় তার অভ্যন্তরও ভালো হবে।
কিন্তু মৌলিক নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি এমন যে, সকলেই এটা অনুযায়ী তার জীবনযাপন করে। সুতরাং যার মধ্যে নীতি-নৈতিকতার অভাব রয়েছে, তার ওপর কখনো ভালো কিছুর আস্থা রাখা যায় না।
কোনো নারী যতই সুন্দরী রূপসী হোক, সে যদি একটি নিম্ন বংশীয় পরিবার থেকে আসে, তবে তার সভ্য ভদ্র হওয়া খুবই দুর্লভ ব্যাপার। এই একই কথা নিজেদের সঙ্গী সাথি বন্ধু ও কারবারকারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সুতরাং তোমার চলাফেরা হওয়া উচিত ভদ্র পরিবারের ব্যক্তির সাথে। তাহলেই তুমি নিরাপদ থাকবে। তবে হ্যাঁ, ব্যতিক্রম সকল জায়গাতেই থাকে।
খলিফা হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. একবার এক বিচক্ষণ ব্যক্তিকে পরামর্শের জন্য জিজ্ঞাসা করলেন, 'বলুন দেখি, কো ধরনের ব্যক্তিদের আমি কাজে লাগাতে পারি?
লোকটি বলল, যারা দ্বীনদার, তারা তো আপনার নিকট কোনো পদ চাইতে আসবে না। আর যারা দুনিয়াদার আপনি তাদেরকে কোনো পদে বসাবেন না। তবে আপনি সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের কাজে লাগাতে পারেন। তারা কখনো এমন কাজ করবে না- যা তাদের মর্যাদা ও আভিজাত্যকে ক্ষুণ্ণ করে।
হুসাইন ইবনে ইয়াহইয়া ইসহাক থেকে বর্ণনা করেন। ইসহাক বলেন, একবার খলিফা মুতাসিম আমাকে প্রাসাদে ডেকে নিলেন। এরপর আমাকে একেবারে এক নির্জন কামরায় নিয়ে গিয়ে বসিয়ে বললেন, হে আবু ইসহাক, বহুদিন যাবৎ আমার অন্তরের মধ্যে একটি বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছে। বিষয়টা সম্পর্কে আমি তোমার থেকে কিছু শুনতে চাই। বিষয়টা হলো, আমার ভাই মামুন এমন কিছু লোক তৈরি করে গেছেন, যারা খুবই উদার উন্নত ও আনুগত্যশীল। তার মতো আমিও কিছু লোক তৈরি করেছি, কিন্তু এরা আচরণে তাদের মতো নয়। ব্যাপারটা কী, বলো তো।
আমি বললাম, আপনার ভাই কাদেরকে নির্বাচন করেছিলেন?
খলিফা বললেন, যেমন তাহের, তার ছেলে ইসহাক। সাহলের পরিবার। তুমি দেখেছ, তারা কেমন ছিল। আমিও এভাবে নির্বাচন করেছি আশফিন- সে কোনো কাজের নয়। আসনাশকে নির্বাচন করেছি। তার মধ্যেও তেমন কিছু পাইনি। একইভাবে ইতাখ ও ওয়াসিফ।
আমি বললাম, হে আমিরুল মুমিনিন, এখন আমি একটি উত্তর দিতে পারি, তবে তার আগে আমার নিরাপত্তা দিতে হবে যে, আপনি রাগান্বিত হলেও আমাকে কিছু বলবেন না।
খলিফা বললেন, ঠিক আছে, তুমি নির্ভয়ে বলতে পারো। কিছুই বলা হবে না। আপনার ভাই উত্তম বীজের দিকে দৃষ্টি দিয়েছিলেন, এ কারণে তা থেকে তৈরি শাখাগুলো অভিজাত ও ভদ্র হয়েছে। আর আপনি ব্যবহার করেছেন এমন শাখাকে- যার কোনো মূল নেই। এ কারণে তা থেকে উদ্গত শাখা-প্রশাখাতেও কোনো কল্যাণ নেই।
আমার এ কথা শুনে খলিফা বললেন, হে আবু ইসহাক, এ তুমি কী বললে! এতদিন- এই দীর্ঘ সময় আমি যে কষ্ট বয়ে চলেছিলাম, তোমার এই উত্তরের কাছে সে কষ্টও যেন তুচ্ছ হয়ে গেল।
অবশ্য বাহ্যিক গঠন-আকৃতিরও একটা প্রভাব থাকে মানুষের মাঝে। সে কারণে যার গঠন-আকৃতি সুন্দর, কোনো ত্রুটি নেই, সাধারণত তার অভ্যন্তরও ভালো হয়ে থাকে। আচরণ ভালো হয়। আর বাহ্যিকতায় ত্রুটি থাকলে, সাধারণত ভেতরগত আচরণও ভালো হয় না। একারণে বিকলাঙ্গ, অন্ধ ও এ ধরনের শারীরিক ত্রুটিযুক্ত মানুষ থেকে সতর্ক থাকা উচিত। তাদের অধিকাংশের অভ্যন্তরীণ আচরণ থাকে নিম্নমানের। নীচু মানসিকতাপূর্ণ।
তবে একটা কথা- কারও সাথে বন্ধুত্ব করা, মেলামেশা করা কিংবা লেনদেন করা- সকল ক্ষেত্রেই সকলকে যাচাই করে নেওয়া উচিত এবং যথাসম্ভব সতর্ক থাকা উচিত।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 শত্রুর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া

📄 শত্রুর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া


বুদ্ধিমানের জন্য উচিত- পরিণামের দিকে খেয়াল করা এবং ভবিষ্যতে যা হতে পারে সে সম্পর্কে সতর্ক থাকা। আর ভুল পদ্ধতি হলো, তাৎক্ষণিক যা উপকারী, যুৎসই ও শরীরের জন্য আরামদায়ক, পরিণামের কথা না ভেবে সেটাকেই গ্রহণ করা। কারণ, এটা তো তার সঙ্গে সব সময় সম-উপযুক্ত হবে না, তখন এগুলো ছাড়াই তাকে জীবনধারণ করতে হবে। এভাবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির জন্য একটা প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন।
এভাবে সেই তাৎক্ষণিক আনন্দ-স্ফূর্তির ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন, যার স্বাদ তো চলে যায়, কিন্তু প্রভাব ও শান্তি অবশিষ্ট থেকে যায়। তাৎক্ষণিক আরামপ্রদ অবহেলা ও অলসতার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা চাই- কারণ, এটা তো তোমাকে স্থায়ী মূর্খতার দিকে ঠেলে দেবে। এবং যে-সকল উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য খুবই সূক্ষ্ম কৌশলের প্রয়োজন হয়, সেগুলোর সম্পর্কেও সতর্ক থাকা উচিত। বিশেষ করে যদি কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির থেকে কিছু অর্জন করতে হয়। কারণ, সে অল্পতেই তোমার উদ্দেশ্য বুঝে ফেলবে। সুতরাং কেউ যদি কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির ওপর বিজয়ী হতে চায়, তবে তাকে তার চেয়েও আরও সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
বুদ্ধি ও কৌশল অবলম্বনের বিভিন্ন কিতাবে এই ধরনের অনেক বিষয় ও কলাকৌশল উল্লেখিত রয়েছে- যেগুলো মস্তিষ্ককে আরও শান্তি ও ধারালো করে। আমি নিজেও 'كتاب الأذكياء' নামক কিতাবে এ বিষয়ে কিছু ঘটনা উল্লেখ করেছি। ৮৮
যেমন, এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির কথা পাওয়া যায়। সে কারও পক্ষে দাঁড়াত না। কাউকে ভয়ও করত না। একবার এক মন্ত্রী তাকে নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করল। কিন্তু লোকটি তাকে কোনো পাত্তাই দিলো না। তার পক্ষেও গেল না। এরপর একদিন সেই মন্ত্রী একলোককে বলল, তুমি অমুক লোককে গিয়ে বলো, আমি তার ব্যাপারে আমিরুল মুমিমিনের সাথে কথা বলেছি। তিনি তার জন্য এক হাজার দিরহাম প্রদান করেছেন। সুতরাং সে যেন এসে আমার থেকে দিরহামগুলো নিয়ে যায়।'
মন্ত্রীর কথামতো লোকটি সেই সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির নিকট এসে সংবাদ পৌঁছে দিলো। সম্ভ্রান্ত লোকটি তখন বলল, আমিরুল মুমিনিন যদি আমার জন্য কোনোকিছু প্রদান করেই থাকে, তাহলে তিনি সেটা আমার নিকট পাঠিয়ে দিলেই হয়। আমাকে তার কাছে যেতে বলবেন কেন? আসলে তার উদ্দেশ্য হলো, এর মাধ্যমে তার ওপর আমার সহানুভূতি তৈরি করে তার পক্ষে নেওয়া।'
এ কারণে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির সাথে কারবার করতে গেলে নিজেকেও ব্যাপক সতর্ক থাকতে হবে-যেমন কোনো দাবারু তার চালের ক্ষেত্রে চারপাশে সজাগ সতর্ক দৃষ্টি রাখে।
আবার কিছু বুদ্ধিমান লোক যখন আরেক বুদ্ধিমান লোকের থেকে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করতে অক্ষম হয়, তখন তাকে শিকার করার জন্য আরেক রকম কৌশল অবলম্বন করে। হাদিয়া প্রদান করে। সামনাসামনি খুব ভক্তি ও শ্রদ্ধা দেখায়। লোকটি যদি সামান্য বুদ্ধির অধিকারী হয়ে থাকে, তবে সে এই কৌশলের জালে সহজেই আটকে যায়। আর বুদ্ধিতে যদি তার চেয়েও শক্তিশালী হয়, তবে সে বুঝতে পারে এই আচরণের আড়ালে লুকিয়ে আছে স্বার্থসিদ্ধির লোভাতুর বাসনা। তখন সে তার থেকে আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করে।
খুব সতর্ক থাকা দরকার সেই ব্যক্তির থেকে, যাকে তুমি কোনোদিন কোনো ক্ষেত্রে কষ্ট দিয়েছ। নিশ্চয় তার অন্তরে তোমার প্রতি শত্রুতার বীজ বপন হয়ে গেছে। এখন সেই গাছের কাঁটা থেকে তুমি নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারো না। তুমি কিছুতেই তার বাহ্যিক আনুগত্য ও হৃদ্যতা দ্বারা প্রতারিত হয়ো না। তার সাথে সাক্ষাতের ক্ষেত্রে সব সময় সতর্ক থাকবে। এখানে অসতর্ক হলেই মরেছ। যেমনটি ঘটেছিল জুব্বাই-এর সাথে কুসাই-এর। ঘটনাটি খুবই প্রসিদ্ধ।৮৯
আর যদি তোমার কোনো শত্রুকে দেখ তোমাকে আর ঘাটাচ্ছে না, তাহলে তুমিও দ্বিতীয়বার তার সাথে শত্রুতা দেখিয়ো না। তার সাথে ভালো ব্যবহার করো। সে-ও তোমার শত্রুতা ভুলে যাবে। সে-ও ধারণা করবে না যে, তুমি তার খারাপ আচরণের জন্য গোপনে তার প্রতিশোধ নিতে চাও।
তবে মানুষের সবচেয়ে দুর্বলতা হলো, শত্রুর প্রতি তার শত্রুতা প্রকাশ করে ফেলা। উত্তম ও শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হলো, যথাসম্ভব শত্রুর প্রতিও সহানুভূতিশীল আচরণ করা। যাতে তার শত্রুতার ধার কমে আসে। এটা যদি পরিপূর্ণ কাজে না-ও লাগে, তবুও এটা তাদের অত্যাচার থেকে বিরত রাখবে। নিশ্চয় শত্রুদলের মাঝেও এমন কেউ থাকবে- যে তোমার এই ভালো আচরণে লজ্জাবোধ করবে। হয়তো তোমার প্রতি তার অন্তর পরিবর্তন হয়ে যাবে।
আমাদের সালাফে সালেহিনের মধ্যে কিছু মানুষ তো এমন ছিলেন, তাদের যদি কেউ গালি দিত, তবে তারা তার নিকট হাদিয়া পাঠিয়ে দিতেন। এর দ্বারা তারা হয়তো তাৎক্ষণিক ফায়দা পেয়ে যেতেন। কিংবা তার অন্তর পরিবর্তনের জন্য কোনো কৌশল অবলম্বন করতেন।
শেষকথা, এসকল ক্ষেত্রে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হয়। এর জন্য পরিণাম সম্পর্কে দৃষ্টিপাতকারী এবং চিন্তাশীল একটি মস্তিষ্ক থাকাই যথেষ্ট। প্রতিটি সংকটেরই সম্ভাব্য একটি সমাধান রয়েছে। শুধু বের করার মতো একটি সজাগ মস্তিষ্ক প্রয়োজন।

টিকাঃ
৮৮. আমার দুটি বই- 'বুদ্ধির গল্প'র অধিকাংশ এবং 'বুদ্ধির জয়'-এর অনেকগুলো গল্প এখান থেকেই উৎকলিত- অনুবাদক। ৮৯. ঘটনাটি আমার 'বুদ্ধির জয়' গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে- অনুবাদক।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 গোপন বিষয়ের গোপনীয়তা

📄 গোপন বিষয়ের গোপনীয়তা


আমি দেখেছি, অধিকাংশ মানুষই তাদের গোপন বিষয় গোপন রাখতে সক্ষম হয় না। বিশেষ করে যখন সেটা হয়ে থাকে কোনো অসুস্থতা, দুঃখ কিংবা সম্পদ ও ভালোবাসার বিষয়। এগুলো উল্লেখ করতে এক ধরনের সুখ অনুভব হয়।
কিন্তু মানুষের চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচায়ক হলো, যে ক্ষেত্রে সে কোনো উদ্দেশ্য অর্জন করতে চায়, তা গোপন করে রাখা। আর দুর্বলতার প্রকাশ হলো, তা অর্জনের আগেই প্রকাশ করে দেওয়া। তখন অনেক সময় তার এই প্রকাশের কারণে কাজটি আর অর্জিত করা সম্ভব হয় না। অন্যদের নিকট যে ব্যক্তি কথাটি প্রকাশ করে দিয়েছে, তার ওপরও কোনো ওজর-আপত্তি চলে না। কারণ, প্রথম প্রকাশক তো তুমি নিজেই।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত যখন কোনো গাজওয়া বা লড়াইয়ের জন্য বের হতেন, তখন তিনি তার সঠিক দিকের কথা উল্লেখ করতেন না।
এখন কেউ যদি বলে, আমি তো আমার খুব আস্থাভাজন ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করেছিলাম। এখানে আমার দোষ কী?
আমি তাকে বলি, যে কথাটি দ্বিতীয় ব্যক্তির কানে চলে যায়, সেটাই আসলে প্রকাশমান কথা হয়ে যায়। তোমার বন্ধু তো সর্বক্ষণ সে কথা গোপন রাখতে পারে না—তুমি নিজেই যেহেতু পারোনি।
এমন অনেক ঘটনার কথা শুনেছি, বাদশাহ হয়তো কাউকে পাকড়াও করবেন। এই কথা তার বিশ্বস্ত কোনো ব্যক্তির কাছে গোপনে প্রকাশ করেছেন। দেখা গেছে, সে কথা নির্দিষ্ট অপরাধীর কানেও পৌঁছে গেছে। তখন সে ব্যক্তি পলায়ন করেছে। বাদশাহ আর তাকে ধরতে সক্ষম হয়নি। কিংবা নিজের কোনো বিশেষ পরিকল্পনা বিনষ্ট হয়েছে এই কথা ছড়ানোর কারণে।
সন্তান বা স্ত্রীর নিকটও গোপন বিষয় উল্লেখ করা এক ধরনের দুর্বলতা। তাদের থেকে সম্পদের কথাও গোপন রাখা উচিত। সম্পদ যদি বেশি হয়, তবে পরিচিতদের মনে হিংসার উদ্রেক করবে। কাউকে কষ্টে ফেলে দেবে। কেউ আবার উত্তরাধিকারীদের মৃত্যু কামনা করবে—এমনকি তোমারও।
কখনো আবার এটার কারণে ডাকাতি, ছিনতাই বা লুণ্ঠনের শিকার হতে পারে। আবার বিভিন্ন প্রার্থনাকারীরা বেশি সম্পদশালীদের নিকট সম্পদের পরিমাণ অনুপাতে বেশি বেশি প্রার্থনা করতে পারে। তাহলে দেখা যাবে, তাদের দিতে দিতেই তোমার সম্পদ নিঃশেষ হয়ে পড়বে।
একইভাবে বিপদাপদের কথাও গোপন রাখা উচিত। কারণ, এর প্রকাশ শত্রুকে ও প্রতিদ্বন্দ্বীকে আনন্দিত করবে। আর প্রিয় ব্যক্তিদের ফেলবে কষ্টে।
এমনকি নিজের বয়সের বিষয়টিও গোপন রাখা উচিত। কারণ, বয়সটি যদি উপস্থিত ব্যক্তিদের চেয়ে বেশি হয়, তবে তারা তোমাকে অথর্ব ও জরাগ্রস্ত ভেবে বসবে। আর যদি কম হয়, তবে তারা তোমাকে নিতান্তই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞা করবে।
যে বিষয়টিতে অনেকেই অবহেলা করে, তা হলো, নিজেদের আড্ডায় ও বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে আমির বা সুলতান সম্পর্কে এমন গোপন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা, অবশেষে এটা তাদের কানে পৌঁছে যায় এবং এটা তখন কথকের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কখনো কখনো কাছের কোনো বন্ধু ব্যক্তির একনিষ্ঠতা, সততা, আমানতদারি ও গোপন আমলের কথাও মানুষের কাছে প্রচার করে দেয়।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষ যখন তার গোপন বিষয় তার স্ত্রী কিংবা বন্ধুর কাছে প্রকাশ করে দেয়, তখন সে সেই স্ত্রী ও বন্ধুর কাছে বন্দি হয়ে পড়ে। স্ত্রীর গুরুতর কোনো অপরাধেও তখন সে সেই স্ত্রীকে তালাক দিতে সক্ষম হয় না। আবার সেই বন্ধুর অপরাধেও তাকে ত্যাগ করতে সাহস পায় না। কারণ, তাদের বিরোধিতা করতে গেলে তারা গোপন কথা প্রকাশ করে দেবে।
সুতরাং সুদৃঢ় মনোবলের মানুষ হলো সেই ব্যক্তি, যে মানুষদের সাথে বাহ্যিকতায় স্বাভাবিক আচরণ করে চলে। তাদের কাছে তার গোপন কথা প্রকাশ করে না। এ অবস্থায় তার কোনো স্ত্রী কিংবা বন্ধু কিংবা সেবকের সাথে তার বিচ্ছেদ ঘটে, তাহলেও তাদের কেউ তার গোপন বিষয় প্রকাশ করতে সক্ষম হবে না।
সবচেয়ে বড় গোপন বিষয় হলো নিজের নির্জন ও একান্ত বিষয়গুলো। সুতরাং সুদৃঢ় চরিত্রের ব্যক্তির জন্য উচিত হবে- তার এই নির্জনতার কোনো বিষয় যেন মানুষের কাছে প্রকাশ না পায়। তবে গোনাহের কাজ সে কোথাও করবে না। নির্জনে কিংবা প্রকাশ্যে।
তবে যে ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন একটি মস্তিষ্ক রয়েছে, তাকে এগুলো বলার আগেই সে নিজের কাজ সম্পর্কে সচেতন হয়ে থাকে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 কল্যাণকর নির্জনতা

📄 কল্যাণকর নির্জনতা


মাঝেমধ্যে সকল মানুষ থেকে নির্জনতা অবলম্বন আমার কাছে খুবই উপকারী মনে হয়- বিশেষ করে আলেম ও জাহেদের জন্য। কারণ, সেখানে তুমি তোমার বিপদে আনন্দিত ব্যক্তিকে পাবে না। নিয়ামতে হিংসাকারী দেখবে না। কিংবা তোমার দোষ অন্বেষণকারী পাবে না। নির্জনতা কতই না চমৎকার!
তুমি সেখানে গিবতের কদর্যতা থেকে মুক্ত থাকবে। মানুষের সৃষ্ট বিপদাপদ থেকে নিরাপদ থাকবে। কপটতাপূর্ণ অবস্থা থেকে রেহাই পাবে। তোমার সময় কেউ নষ্ট করতে পারবে না।
এরপর অন্তর এই নির্জনতার মধ্যে কতই না চিন্তায় নিমগ্ন হবে। কারণ, চিন্তাশীল অন্তর মানুষের এত ভিড়ভাট্টার চেয়ে নির্জনতাকেই বেশি পছন্দ করে। সেখানেই তার শান্তি। তখন সে চিন্তায় মগ্ন হয় তার দুনিয়া ও আখেরাতের বিষয়াবলি সম্পর্কে। এ যেন সেই জ্বরাক্রান্ত ব্যক্তির মতো- যে নির্জনে তার উত্তাপ অনুভব করে, ধমনীর উঠানামা দেখতে থাকে। নিজের শরীরের মধ্যে যেন নিজেই তখন নিমজ্জিত হয়ে সকল কিছু পরখ করে দেখতে থাকে।
আর মানুষের সীমাহীন মিশ্রণ ব্যক্তিকে যে ভীষণ ক্ষতি করে- তার ভয়াবহতা বলে শেষ করার নয়। কারণ, মানুষ তখন সর্বক্ষণ তার বর্তমান অবস্থার দিকে চেয়ে থাকে কিংবা বর্তমান নিয়েই ব্যস্ত থাকতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন মানুষের সাথে তার সাক্ষাৎ করতে হয়। তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে হয়। আসে বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধানের ব্যস্ততা। এসব করতে গিয়ে সে তখন তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করারই যেন সুযোগ পায় না। তার অবস্থা হয় সেই ব্যক্তির মতো, যে সফর করতে চায় এবং সময়ও অতি নিকটে এসে গেছে- এই সময় সে কিছু মানুষের সাথে গল্প করতে বসে গেছে। তাদের সাথে বিভিন্ন আলাপ-আলোচনা জুড়ে দিয়েছে। নানা রকম কথাবার্তায় সময় অতিবাহিত হয়েছে। এর মাঝেই জাহাজ ছাড়ার ভেঁপু বেজে উঠেছে; অথচ এদিকে তার এখনো সফরের কোনো পাথেয় জোগাড় হয়নি।
তাছাড়া নির্জনতায় কিছুই যদি অর্জিত না হয়, তাতে যদি শুধু আখেরাতের যাত্রার পাথেয় নিয়ে চিন্তা করা হয় এবং সংমিশ্রণের খারাবি থেকে বেঁচে থাকা যায়, এটাও কম প্রাপ্তি নয়। আর প্রকৃত নির্জনতা অর্জিত হতে পারে শুধু আলেম ও জাহেদের জন্যই। যদিও তাদের নির্জনতা নিছক আর নির্জনতা থাকে না। নির্জনতাগুলো ভরে ওঠে কত রকম ভাবনা ও নিমগ্নতায়।
প্রথমে আলেমের কথা ধরা যাক-
তার নির্জনতায় তার সঙ্গী হয়ে ওঠে তার ইলম। তার কিতাবগুলো হয়ে ওঠে তার কথক। সালাফদের বিভিন্ন ঘটনাবলি হয়ে ওঠে তার শক্তিদাতা। অতীতের বিভিন্ন ঘটনাবলি তার সাহস জোগায়। আর যদি সে আল্লাহ তাআলার মারেফাতের স্তরে পৌঁছে যায়, তার মুহাব্বতের দরিয়ার কিনারা পেয়ে যায়, তবে তো তার স্বাদ ও আস্বাদ বেড়ে যায় বহুগুণ। তখন সে এই মারেফাতের দৃষ্টি দিয়ে তাকাতে থাকে পুরো বিশ্বজগতের দিকে। তার মাঝের সকল বস্তুর দিকে। এভাবে সে যেন তার অতি বন্ধুর সান্নিধ্য পেয়ে ধন্য হয়। তার ইলম ও মারেফাতের চাহিদামাফিক আমলে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হয়।
এবার জাহেদের কথা বলি-
নির্জনতার সময় তার ইবাদতগুলোই যেন তার সঙ্গী ও সহচর হয়ে যায়। তার মাবুদই যেন তার সাথি। এরপর যদি তার মারেফাতের স্তর আরও উন্নত হয়ে তার দৃষ্টি সকল সৃষ্টি ও আসবাব থেকে সরে এসে স্রষ্টার প্রতি নিবদ্ধ হয়, তখন তো তার সমুখ থেকে সকল সৃষ্টি অদৃশ্য হয়ে যায়। সৃষ্টির কিছুই যেন তার সমুখে থাকে না। সকল দুঃখ, কষ্ট ও বেদনার ঊর্ধ্বে সে উঠে যায়। স্রষ্টার সান্নিধ্যে নিমগ্ন হয়। জগৎজোড়া মানুষের মাঝ থেকে সে যেন একাকী একক এক সত্তার সমুখে দণ্ডায়মান। আর যেন কোথাও কেউ নেই। কিছু নেই।
এই যে দু-ধরনের লোক—তারা নিজেরা মানুষদের কষ্ট দেওয়া থেকে মুক্ত। এবং মানুষরাও তাদের কষ্ট থেকে নিরাপদ। বরং তারা সকল আবেদের জন্য আদর্শ। সকল সালেকের জন্য নিদর্শন। শ্রোতা তাদের কথায় উপকৃত হয়। তাদের ওয়াজে চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়। সমাজের মাঝে তাদের মর্যাদা ও গাম্ভীর্য সম্প্রচারিত হয়।
কেউ যদি তাদের মতো হতে চায়, তবে অবশ্যই তাকে নির্জনতা অবলম্বন করতে হবে—তা যত কষ্টকরই মনে হোক না কেন। তাহলে একদিন এই ধৈর্যের বেদনা মধু উৎপাদন করবে।
তবে আল্লাহর নিকট তেমন আলেম থেকে আশ্রয় চাই, যে সারা জগতের মানুষের সাথে মিশে বেড়ায়। বিশেষ করে দুনিয়াদার ও রাজা-বাদশাহর সাথে। তাদের সাথে দ্বীন ও সম্পদের লেনদেন করে। প্রতারণা করে এবং প্রতারিত হয়। অবশেষে দুনিয়াদারদের থেকে যতটুকু তার দুনিয়া অর্জন হয়, তার চেয়ে বহু বহু গুণ তার দ্বীন বিনষ্ট হয়।
এসব ফাসেকদের সেই আত্মসম্মানবোধ কোথায় থাকে? যে আলেম এই সম্মানবোধের তোয়াক্কা করে না, সে তো কখনো ইলমের স্বাদ চাখতে পারে না। ইলমের উদ্দেশ্যও সে বোঝে না। সে যেন বিশাল মরুভূমিতে মরীচিকার পানি দেখে দেখে সেখানেই জীবন নিঃশেষ করল।
এমনিভাবে যেই জাহেদ ব্যক্তি সর্ব জায়গায় মিশে চলে—তারও একই অবস্থা। তখন তার মধ্যে অহংকার কাজ করে। আচরণে লৌকিকতা ও মুনাফেকি দেখা দেয়। হরেক রকম পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রকম ভান ধরে। এভাবে তার দু-কূলই হারায়। দুনিয়া এবং তার নগদ নিয়ামতও অর্জন হয় না। আবার আখেরাতও বিনষ্ট হয়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট আমাদের প্রার্থনা—তিনি যেন আমাদের সুমিষ্ট নির্জনতা প্রদান করেন। খারাবি থেকে বিরত থাকার মাঝে মিষ্টতা দান করেন। একান্তে তাঁর নিকট প্রার্থনা ও নিমগ্নতার সৌভাগ্য দান করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00