📄 প্রথম প্রাধান্য হবে স্রষ্টা
যিনি বুদ্ধিমান, তিনি স্রষ্টার কথাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, যদিও এতে কোনো সৃষ্টি অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি রাগান্বিত হয় কিংবা অসন্তুষ্ট হয়। কিন্তু এর ব্যতিক্রম, যে ব্যক্তি মানুষের কথাকে প্রাধান্য দিয়ে স্রষ্টার কথাকে দূরে সরিয়ে রাখে, আল্লাহ হয়তো একসময় যাকে সে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিল, তাকেই তার ওপর অসন্তুষ্ট করে দেবেন।
খলিফা মামুন একবার তার এক মন্ত্রীকে বলেছিলেন,
لا تعص الله بطاعتي فيسلطني عليك.
'আমার আনুগত্য করতে গিয়ে তুমি আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা করো না। তাহলে হয়তো তিনি আমাকেই আবার তোমার ওপর চাপিয়ে দেবেন।'
তাহের ইবনে হুসাইনের কথা আমরা জানি। সে খলিফা মামুনের ভাই মুহাম্মদ আমিনকে হত্যা করেছিল এবং তার মাথা শূলে চড়িয়েছিল। যদিও সবকিছু করেছিল খলিফা মামুনের ইচ্ছাতেই। কিন্তু তবুও এই বিষয়টি বাদশাহর অন্তরের মধ্যে একটি ক্ষতের মতো জ্বলজ্বল করত। এ কারণে তিনি তাহেরকে মুখোমুখি দেখতে চাইতেন না।
একদিন তাহের ইবনে হুসাইন খলিফা মামুনের নিকট এলো। খলিফা তাকে দেখে কাঁদতে শুরু করে দিলেন। তাহের তাকে বলল, আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহ আপনার চোখকে কাঁদাবেন না। আপনার এই বিশাল সাম্রাজ্য অর্জিত হয়েছে। আপনার এখন সুখ ও প্রতাপের দিন।
খলিফা বললেন, আমি কাঁদছি এমন এক বিষয়ের স্মরণে- যার উচ্চারণও লজ্জাজনক। যার অভ্যন্তরে রয়েছে দুঃখ। এবং যার কষ্ট থেকে কেউ রক্ষা পাবে না।'
এর কিছুক্ষণ পর তাহের খলিফার নিকট থেকে বের হয়ে এলো। সে ছিল খুবই ধুরন্ধর একলোক। সে বিপদের গন্ধ টের পায়। তৎক্ষণাৎ খলিফার খাদেম হুসাইনের হাতে দুই হাজার দিরহাম দিয়ে বলল, তুমি যেভাবেই হোক খবর সংগ্রহ করবে খলিফা কেন কাঁদলেন?
দুপুরে খলিফা মামুন খাবার খেতে বসেছেন। পাশে হুকুমের আশায় বসে আছে খাদেম হুসাইন। খলিফা পানি পান করতে চাইলেন। তিনি খাদেমকে বললেন, হে হুসাইন, পানি পান করাও।
খাদেম হুসাইন বলল, হে মহামান্য খলিফা, আমি অবশ্যই আপনাকে পানি পান করাব। কিন্তু তার আগে আপনাকে বলতে হবে, আপনি তখন কেন কাঁদলেন, যখন তাহের এসেছিল আপনার নিকট?
খলিফা বিস্মিত হয়ে বললেন, হে হুসাইন, তোমার এমন কি হলো যে, তুমি আমাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছ?
খাদেম হুসাইন কাঁচুমাচু হয়ে বলল, হুজুর, তেমন কিছু না- তবে আপনার ক্রন্দনে আমিও ভীষণ ব্যথিত হয়েছি। এ জন্যই তার কারণ জানতে ইচ্ছে করছে।
খলিফা বললেন, হে হুসাইন, এটি এমন এক বিষয়, তুমি যদি কাউকে বলো, তাহলে তোমাকে হত্যা করে ফেলব।'
খাদেম হুসাইন এবারও বিনয়ে গদগদ হয়ে বলল, 'হে মহামান্য খলিফা, আমি কখনো আপনার কোনো গোপন বিষয় কোথাও প্রকাশ করেছি কি! এটা হতেই পারে না।'
খলিফা বললেন, আমার ভাই মুহাম্মদের কথা আমার স্মরণে এসেছিল। এবং তাকে যে লাঞ্ছনার সাথে হত্যা করা হয়েছিল- সে কথাও আমার খুব মনে পড়ছিল। দুঃখে কষ্টে আমার শ্বাস যেন রুদ্ধ হয়ে আসছিল। কান্নার মাধ্যমে যেন তার কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। অবশ্যই তাহেরকে আমার পক্ষ থেকে এর প্রতিকার পেতে হবে।'
এরপর হুসাইন যথারীতি এই কথা গোপনে তাহেরকে জানিয়ে দেয়। তাহের বিপদের গন্ধ টের পেল। তখনই সে ঘোড়া ছুটিয়ে আহমদ ইবনে আবি খালেদের নিকট চলে এলো। এবং তাকে ঘটনা বর্ণনা করে বলল, 'আমি আপনার কাজের প্রতিদান দেবো। আপনি আমাকে খলিফার চোখ থেকে দূরে সরিয়ে দিন।'
আহমদ বলল, 'অসুবিধা নেই, অচিরেই আমি তার ব্যবস্থা করছি।'
এরপর একদিন আহমদ খলিফা মামুনের নিকট এসে বলল, গতরাতে দুঃশ্চিন্তায় আমি একটুও ঘুমোতে পারিনি।
খলিফা বললেন, কেন, কিসের চিন্তা?
আহমদ বলল, আপনি গাসসান ইবনে আব্বাদকে খোরাসানের গভর্নর নিযুক্ত করেছেন। অথচ তার এবং তার সাথিদের মাথায় বুদ্ধি বলতে কিছু নেই। আমি তুর্কিদের আক্রমণের ভয় করছি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ব্যাপক ধ্বংসের আশঙ্কা করছি।
খলিফা বললেন, তবে তুমি কাকে সেখানে নিযুক্ত করতে চাও?
আহমদ বলল, তাহের ইবনে হুসাইনকে।
খলিফা আহমদের কথা গ্রহণ করে নিলেন। এভাবেই আহমদ ইবনে আবি খালেদের সুপারিশে তাহেরকে খোরাসানের গভর্নর নিযুক্ত করা হলো। তাহের খোরাসানে এসে নিরাপদে শাসনকার্য চালাতে লাগল।
অনেক দিন অতিবাহিত হলো। এরপর একদিন তাহের জুমার দিন খুতবার সময় খলিফার নামে দোয়া করা বর্জন করল।
খলিফার গুপ্তচর এসে তাকে বলল, আপনি তো খলিফার নামে দুআ করেননি। আমি কি খলিফাকে এ কথা জানিয়ে দেবো?
তাহের বলল, আমার ভুল হয়ে গেছে। আপনি লিখে দিয়েন না।
কিন্তু তাহের দ্বিতীয় ও তৃতীয় জুমাতেও একই কাজ করল। খলিফার নামে দুআ পড়ল না।
এবার গুপ্তচর খলিফার কাছে বিষয়টা লিখে জানিয়ে দিলো। খবর শুনে খলিফা আগে আহমদ ইবনে আবি খালেদকে ডেকে আনলেন। এবং তাকে বললেন, 'তোমার কৌশলেই তাহের এখান থেকে পলায়ন করতে পেরেছে। আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, তুমি যেভাবে তাকে আমার আয়ত্ব থেকে বের করে নিয়ে গেছ, সেভাবে যদি তাকে আবার আমার নিকট ফিরিয়ে আনতে না পারো, তবে এর শাস্তি তোমাকেই ভোগ করতে হবে। এখন যাও। দ্রুত ব্যবস্থা করো।'
আহমদ খলিফার দরবার থেকে বের হয়ে এলো এবং নিজেই তার দলবল নিয়ে খোরাসানের দিকে রওনা করল। পথের মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়ল। তবুও এই অসুস্থতা নিয়েই সে চলতে লাগল। অবশেষে যখন তারা রায় নামক স্থানে পৌঁছল, তখন সংবাদ এলো—তাহের মৃত্যুবরণ করেছে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংবাদ নিয়ে জানা গেল আসলেও তা-ই। বেচারা মারা গেছে।
বন্ধুদের থেকে এই ঘটনা শোনার পর আমিও এ-জাতীয় একটি ঘটনা তাদের নিকট বর্ণনা করলাম। হারুনুর রশিদ একবার বাগদাদের বাইরে ভ্রমণে বের হলেন। এই সুযোগে লোকজন মুকতাফিকে শাসক নিযুক্ত করার ইচ্ছা করল। এবং কিছু লোক এসে সাক্ষ্য দিলো যে, হারুনুর রশিদ খলিফা হওয়ার উপযুক্ত নয়। সুতরাং লোকজন তাকে বাদ দিয়ে মুকতাফিকেই শাসক নিযুক্ত করে নিল।
এর কিছুদিন পর একদিন সেই সাক্ষ্যদাতাদের একজনের কথা মুকতাফির নিকট ওঠানো হলো। কিন্তু তিনি তার নিন্দা করে বললেন, এই লোক তো হারুনুর রশিদের বিপক্ষে আমাকে সাহায্য করেছিল। ব্যাটা সুবিধাবাদী!
এমনই হয়- আল্লাহকে সন্তুষ্ট না করে বান্দাকে সন্তুষ্ট করতে গেলে, আল্লাহ একসময় সেই ব্যক্তিকেই তার প্রতি অসন্তুষ্ট করে তুলতে পারেন। এটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ, অন্তরের মালিক আল্লাহ।
আর এর বিপরীত- যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয় এবং সঠিক পথে থাকে, হয়তো একসময় আল্লাহ তাআলা সেই অসন্তুষ্ট ব্যক্তিকে তার প্রতি সন্তুষ্ট করে দেন।
যেমন, মন্ত্রী ইবনে হুবাই আমাকে একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, 'খলিফার পুত্র আল মুসতানজিদ বিল্লাহ একবার আমার নিকট একটি চিঠি লিখে বললেন, আমি যেন তাকে তার বাবার গোপন বিষয়গুলো জানিয়ে দিই।' আমি তার বার্তাবাহককে বললাম, আল্লাহর কসম, আমার দ্বারা সেগুলো পড়াও সম্ভব নয়, আর কাউকে জানানোও সম্ভব নয়।'
আমার এ কথায় খলিফাপুত্র ভীষণ রাগান্বিত হলেন। এবং কিছুদিন পর খলিফার ইন্তেকাল হলে তিনি নিজেই তখন খলিফা নিযুক্ত হলেন। আমি তখন তার নিকট গিয়ে বললাম, আমার সততা ও একনিষ্ঠতার বড় প্রমাণ হলো যে, আমি সেদিন আপনাকে খলিফার গোপন বিষয় জানাতে রাজি হইনি।'
খলিফা মুসতানজিদ বিল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, মন্ত্রী সাহেব, আপনি সত্য বলেছেন। যতই আমি ক্রুদ্ধ হই, কিন্তু সেটাই ছিল আমানতদারি। আমারও তা-ই প্রয়োজন।
আমার একবন্ধু আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, একবার কিছুলোক রাজ্যের কোষাধ্যক্ষের নিকট এসে বলল, রাজ-ভান্ডার থেকে আপনি আমাদের জন্য কিছু ঋণের ব্যবস্থা করে দিন।
কোষাধ্যক্ষকে গভর্নর বললেন, আপনি তাদের ঋণের ব্যবস্থা করে দিন। আর তারা যতটুকু জামানত হিসেবে প্রদান করে, তা-ই রেখে দিন।
অনুমোদনের জন্য বিচারক ইবনে রুতাবির নিকট বিষয়টি পেশ করা হলো। তিনি বললেন, না, আমি কিছুতেই এটা অনুমোদন করব না। এটা একটি জুলুম। আমি এর হুকুম দিতে পারি না।
লোকেরা বলল, আপনার আগেই তো গভর্নর অনুমোদন করে দিয়েছেন। আপনি দেবেন না কেন?
তবুও ইবনে রুতাবি তার মতের ওপর অটল রইলেন। এরপর আরেকজন বিচারককে ডাকা হলো। তিনি এটাকে অনুমোদন করে দিলেন। কিন্তু বিষয়টা একসময় খলিফার কানে গেল। বিচার বসল খলিফার দরবারে। খলিফা ইবনে রুতাবির ক্ষেত্রে বললেন, তিনি অবশ্যই প্রশংসা পাওয়ার মতো কাজ করেছেন। কারণ, তিনি সত্যকথা বলেছেন। তার প্রশংসা জ্ঞাপন করছি। এরপর তিনি অন্য বিচারককে বরখাস্ত করে দিলেন- যিনি অন্যায়ভাবে গভর্নরকে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিল।
এছাড়াও আরেকটি ঘটনা আমি জানি। ঘটনাটি হলো, একবার এক সুলতান তার নিজের জন্য 'মালিকুল মুলুক- রাজাদের রাজা' উপাধিটি ব্যবহার করতে চাইলেন। এ ব্যাপারে তিনি ফকিহদের নিকট ফতোয়া প্রার্থনা করলেন- জায়েয হবে কি না? সুবিধাবাদী সকল ফকিহ বললেন, জায়েয হবে। তাদের মধ্য থেকে একমাত্র হজরত মাওয়ারদি বললেন, জায়েয হবে না। জায়েয না হওয়ার কারণগুলোও তিনি বললেন। এতে সুলতান রাগান্বিত হওয়ার পরিবর্তে খুশিই হলেন। কারণ, তিনি সত্য জানতে সক্ষম হলেন। এ ঘটনায় সুলতানের নিকট মাওয়ারদির মর্যাদা অনেকগুণ বেড়ে গেল।
এমন আরও অনেক ঘটনা রয়েছে- বলতে গেলে অনেক লম্বা হয়ে যাবে। এখানেই আপাতত থাক। তবে মূলকথা হলো, কোনো অকাট্য ফরজ বিধানের হুকুম পালনের ক্ষেত্রে কোনো মানুষ যদি অসন্তুষ্টও হয়, তবুও আনুগত্যের মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য প্রদান করাই উচিত হবে। কারণ, মানুষ তো অতি তুচ্ছ, সে তো কখনো স্রষ্টাকে তোমার প্রতি রাগিয়ে তুলতে পারবে না। কিন্তু তুমি যদি স্রষ্টাকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করতে চাও কিংবা করো, তবে এমন হওয়া খুবই স্বাভাবিক, একদিন স্রষ্টা তাকে তোমার প্রতি ক্ষুব্ধ করে তুলবেন। তখন তোমার উপায়টা হবে কী? তীর তো আগেই হারিয়েছ- এবার খড়কুটোও হারাবে!
📄 আচার-আচরণের ক্ষেত্রে সতর্কতা
বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত হবে- কোনো মানুষের নীতি-নৈতিকতার দিকে লক্ষ করা। সেটা লেনদেন, ওঠাবসা, মেলামেশা ও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে হতে পারে। হতে পারে বিয়ে করা বা বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও। এরপর দৃষ্টি দেবে মানুষের বাহ্যিক আকার-গঠনের দিকে। বাহ্যিক গঠন ভালো হলে আশা করা যায় তার অভ্যন্তরও ভালো হবে।
কিন্তু মৌলিক নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি এমন যে, সকলেই এটা অনুযায়ী তার জীবনযাপন করে। সুতরাং যার মধ্যে নীতি-নৈতিকতার অভাব রয়েছে, তার ওপর কখনো ভালো কিছুর আস্থা রাখা যায় না।
কোনো নারী যতই সুন্দরী রূপসী হোক, সে যদি একটি নিম্ন বংশীয় পরিবার থেকে আসে, তবে তার সভ্য ভদ্র হওয়া খুবই দুর্লভ ব্যাপার। এই একই কথা নিজেদের সঙ্গী সাথি বন্ধু ও কারবারকারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সুতরাং তোমার চলাফেরা হওয়া উচিত ভদ্র পরিবারের ব্যক্তির সাথে। তাহলেই তুমি নিরাপদ থাকবে। তবে হ্যাঁ, ব্যতিক্রম সকল জায়গাতেই থাকে।
খলিফা হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. একবার এক বিচক্ষণ ব্যক্তিকে পরামর্শের জন্য জিজ্ঞাসা করলেন, 'বলুন দেখি, কো ধরনের ব্যক্তিদের আমি কাজে লাগাতে পারি?
লোকটি বলল, যারা দ্বীনদার, তারা তো আপনার নিকট কোনো পদ চাইতে আসবে না। আর যারা দুনিয়াদার আপনি তাদেরকে কোনো পদে বসাবেন না। তবে আপনি সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের কাজে লাগাতে পারেন। তারা কখনো এমন কাজ করবে না- যা তাদের মর্যাদা ও আভিজাত্যকে ক্ষুণ্ণ করে।
হুসাইন ইবনে ইয়াহইয়া ইসহাক থেকে বর্ণনা করেন। ইসহাক বলেন, একবার খলিফা মুতাসিম আমাকে প্রাসাদে ডেকে নিলেন। এরপর আমাকে একেবারে এক নির্জন কামরায় নিয়ে গিয়ে বসিয়ে বললেন, হে আবু ইসহাক, বহুদিন যাবৎ আমার অন্তরের মধ্যে একটি বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছে। বিষয়টা সম্পর্কে আমি তোমার থেকে কিছু শুনতে চাই। বিষয়টা হলো, আমার ভাই মামুন এমন কিছু লোক তৈরি করে গেছেন, যারা খুবই উদার উন্নত ও আনুগত্যশীল। তার মতো আমিও কিছু লোক তৈরি করেছি, কিন্তু এরা আচরণে তাদের মতো নয়। ব্যাপারটা কী, বলো তো।
আমি বললাম, আপনার ভাই কাদেরকে নির্বাচন করেছিলেন?
খলিফা বললেন, যেমন তাহের, তার ছেলে ইসহাক। সাহলের পরিবার। তুমি দেখেছ, তারা কেমন ছিল। আমিও এভাবে নির্বাচন করেছি আশফিন- সে কোনো কাজের নয়। আসনাশকে নির্বাচন করেছি। তার মধ্যেও তেমন কিছু পাইনি। একইভাবে ইতাখ ও ওয়াসিফ।
আমি বললাম, হে আমিরুল মুমিনিন, এখন আমি একটি উত্তর দিতে পারি, তবে তার আগে আমার নিরাপত্তা দিতে হবে যে, আপনি রাগান্বিত হলেও আমাকে কিছু বলবেন না।
খলিফা বললেন, ঠিক আছে, তুমি নির্ভয়ে বলতে পারো। কিছুই বলা হবে না। আপনার ভাই উত্তম বীজের দিকে দৃষ্টি দিয়েছিলেন, এ কারণে তা থেকে তৈরি শাখাগুলো অভিজাত ও ভদ্র হয়েছে। আর আপনি ব্যবহার করেছেন এমন শাখাকে- যার কোনো মূল নেই। এ কারণে তা থেকে উদ্গত শাখা-প্রশাখাতেও কোনো কল্যাণ নেই।
আমার এ কথা শুনে খলিফা বললেন, হে আবু ইসহাক, এ তুমি কী বললে! এতদিন- এই দীর্ঘ সময় আমি যে কষ্ট বয়ে চলেছিলাম, তোমার এই উত্তরের কাছে সে কষ্টও যেন তুচ্ছ হয়ে গেল।
অবশ্য বাহ্যিক গঠন-আকৃতিরও একটা প্রভাব থাকে মানুষের মাঝে। সে কারণে যার গঠন-আকৃতি সুন্দর, কোনো ত্রুটি নেই, সাধারণত তার অভ্যন্তরও ভালো হয়ে থাকে। আচরণ ভালো হয়। আর বাহ্যিকতায় ত্রুটি থাকলে, সাধারণত ভেতরগত আচরণও ভালো হয় না। একারণে বিকলাঙ্গ, অন্ধ ও এ ধরনের শারীরিক ত্রুটিযুক্ত মানুষ থেকে সতর্ক থাকা উচিত। তাদের অধিকাংশের অভ্যন্তরীণ আচরণ থাকে নিম্নমানের। নীচু মানসিকতাপূর্ণ।
তবে একটা কথা- কারও সাথে বন্ধুত্ব করা, মেলামেশা করা কিংবা লেনদেন করা- সকল ক্ষেত্রেই সকলকে যাচাই করে নেওয়া উচিত এবং যথাসম্ভব সতর্ক থাকা উচিত।
📄 শত্রুর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া
বুদ্ধিমানের জন্য উচিত- পরিণামের দিকে খেয়াল করা এবং ভবিষ্যতে যা হতে পারে সে সম্পর্কে সতর্ক থাকা। আর ভুল পদ্ধতি হলো, তাৎক্ষণিক যা উপকারী, যুৎসই ও শরীরের জন্য আরামদায়ক, পরিণামের কথা না ভেবে সেটাকেই গ্রহণ করা। কারণ, এটা তো তার সঙ্গে সব সময় সম-উপযুক্ত হবে না, তখন এগুলো ছাড়াই তাকে জীবনধারণ করতে হবে। এভাবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির জন্য একটা প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন।
এভাবে সেই তাৎক্ষণিক আনন্দ-স্ফূর্তির ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন, যার স্বাদ তো চলে যায়, কিন্তু প্রভাব ও শান্তি অবশিষ্ট থেকে যায়। তাৎক্ষণিক আরামপ্রদ অবহেলা ও অলসতার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা চাই- কারণ, এটা তো তোমাকে স্থায়ী মূর্খতার দিকে ঠেলে দেবে। এবং যে-সকল উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য খুবই সূক্ষ্ম কৌশলের প্রয়োজন হয়, সেগুলোর সম্পর্কেও সতর্ক থাকা উচিত। বিশেষ করে যদি কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির থেকে কিছু অর্জন করতে হয়। কারণ, সে অল্পতেই তোমার উদ্দেশ্য বুঝে ফেলবে। সুতরাং কেউ যদি কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির ওপর বিজয়ী হতে চায়, তবে তাকে তার চেয়েও আরও সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
বুদ্ধি ও কৌশল অবলম্বনের বিভিন্ন কিতাবে এই ধরনের অনেক বিষয় ও কলাকৌশল উল্লেখিত রয়েছে- যেগুলো মস্তিষ্ককে আরও শান্তি ও ধারালো করে। আমি নিজেও 'كتاب الأذكياء' নামক কিতাবে এ বিষয়ে কিছু ঘটনা উল্লেখ করেছি। ৮৮
যেমন, এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির কথা পাওয়া যায়। সে কারও পক্ষে দাঁড়াত না। কাউকে ভয়ও করত না। একবার এক মন্ত্রী তাকে নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করল। কিন্তু লোকটি তাকে কোনো পাত্তাই দিলো না। তার পক্ষেও গেল না। এরপর একদিন সেই মন্ত্রী একলোককে বলল, তুমি অমুক লোককে গিয়ে বলো, আমি তার ব্যাপারে আমিরুল মুমিমিনের সাথে কথা বলেছি। তিনি তার জন্য এক হাজার দিরহাম প্রদান করেছেন। সুতরাং সে যেন এসে আমার থেকে দিরহামগুলো নিয়ে যায়।'
মন্ত্রীর কথামতো লোকটি সেই সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির নিকট এসে সংবাদ পৌঁছে দিলো। সম্ভ্রান্ত লোকটি তখন বলল, আমিরুল মুমিনিন যদি আমার জন্য কোনোকিছু প্রদান করেই থাকে, তাহলে তিনি সেটা আমার নিকট পাঠিয়ে দিলেই হয়। আমাকে তার কাছে যেতে বলবেন কেন? আসলে তার উদ্দেশ্য হলো, এর মাধ্যমে তার ওপর আমার সহানুভূতি তৈরি করে তার পক্ষে নেওয়া।'
এ কারণে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির সাথে কারবার করতে গেলে নিজেকেও ব্যাপক সতর্ক থাকতে হবে-যেমন কোনো দাবারু তার চালের ক্ষেত্রে চারপাশে সজাগ সতর্ক দৃষ্টি রাখে।
আবার কিছু বুদ্ধিমান লোক যখন আরেক বুদ্ধিমান লোকের থেকে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করতে অক্ষম হয়, তখন তাকে শিকার করার জন্য আরেক রকম কৌশল অবলম্বন করে। হাদিয়া প্রদান করে। সামনাসামনি খুব ভক্তি ও শ্রদ্ধা দেখায়। লোকটি যদি সামান্য বুদ্ধির অধিকারী হয়ে থাকে, তবে সে এই কৌশলের জালে সহজেই আটকে যায়। আর বুদ্ধিতে যদি তার চেয়েও শক্তিশালী হয়, তবে সে বুঝতে পারে এই আচরণের আড়ালে লুকিয়ে আছে স্বার্থসিদ্ধির লোভাতুর বাসনা। তখন সে তার থেকে আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করে।
খুব সতর্ক থাকা দরকার সেই ব্যক্তির থেকে, যাকে তুমি কোনোদিন কোনো ক্ষেত্রে কষ্ট দিয়েছ। নিশ্চয় তার অন্তরে তোমার প্রতি শত্রুতার বীজ বপন হয়ে গেছে। এখন সেই গাছের কাঁটা থেকে তুমি নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারো না। তুমি কিছুতেই তার বাহ্যিক আনুগত্য ও হৃদ্যতা দ্বারা প্রতারিত হয়ো না। তার সাথে সাক্ষাতের ক্ষেত্রে সব সময় সতর্ক থাকবে। এখানে অসতর্ক হলেই মরেছ। যেমনটি ঘটেছিল জুব্বাই-এর সাথে কুসাই-এর। ঘটনাটি খুবই প্রসিদ্ধ।৮৯
আর যদি তোমার কোনো শত্রুকে দেখ তোমাকে আর ঘাটাচ্ছে না, তাহলে তুমিও দ্বিতীয়বার তার সাথে শত্রুতা দেখিয়ো না। তার সাথে ভালো ব্যবহার করো। সে-ও তোমার শত্রুতা ভুলে যাবে। সে-ও ধারণা করবে না যে, তুমি তার খারাপ আচরণের জন্য গোপনে তার প্রতিশোধ নিতে চাও।
তবে মানুষের সবচেয়ে দুর্বলতা হলো, শত্রুর প্রতি তার শত্রুতা প্রকাশ করে ফেলা। উত্তম ও শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হলো, যথাসম্ভব শত্রুর প্রতিও সহানুভূতিশীল আচরণ করা। যাতে তার শত্রুতার ধার কমে আসে। এটা যদি পরিপূর্ণ কাজে না-ও লাগে, তবুও এটা তাদের অত্যাচার থেকে বিরত রাখবে। নিশ্চয় শত্রুদলের মাঝেও এমন কেউ থাকবে- যে তোমার এই ভালো আচরণে লজ্জাবোধ করবে। হয়তো তোমার প্রতি তার অন্তর পরিবর্তন হয়ে যাবে।
আমাদের সালাফে সালেহিনের মধ্যে কিছু মানুষ তো এমন ছিলেন, তাদের যদি কেউ গালি দিত, তবে তারা তার নিকট হাদিয়া পাঠিয়ে দিতেন। এর দ্বারা তারা হয়তো তাৎক্ষণিক ফায়দা পেয়ে যেতেন। কিংবা তার অন্তর পরিবর্তনের জন্য কোনো কৌশল অবলম্বন করতেন।
শেষকথা, এসকল ক্ষেত্রে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হয়। এর জন্য পরিণাম সম্পর্কে দৃষ্টিপাতকারী এবং চিন্তাশীল একটি মস্তিষ্ক থাকাই যথেষ্ট। প্রতিটি সংকটেরই সম্ভাব্য একটি সমাধান রয়েছে। শুধু বের করার মতো একটি সজাগ মস্তিষ্ক প্রয়োজন।
টিকাঃ
৮৮. আমার দুটি বই- 'বুদ্ধির গল্প'র অধিকাংশ এবং 'বুদ্ধির জয়'-এর অনেকগুলো গল্প এখান থেকেই উৎকলিত- অনুবাদক। ৮৯. ঘটনাটি আমার 'বুদ্ধির জয়' গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে- অনুবাদক।
📄 গোপন বিষয়ের গোপনীয়তা
আমি দেখেছি, অধিকাংশ মানুষই তাদের গোপন বিষয় গোপন রাখতে সক্ষম হয় না। বিশেষ করে যখন সেটা হয়ে থাকে কোনো অসুস্থতা, দুঃখ কিংবা সম্পদ ও ভালোবাসার বিষয়। এগুলো উল্লেখ করতে এক ধরনের সুখ অনুভব হয়।
কিন্তু মানুষের চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচায়ক হলো, যে ক্ষেত্রে সে কোনো উদ্দেশ্য অর্জন করতে চায়, তা গোপন করে রাখা। আর দুর্বলতার প্রকাশ হলো, তা অর্জনের আগেই প্রকাশ করে দেওয়া। তখন অনেক সময় তার এই প্রকাশের কারণে কাজটি আর অর্জিত করা সম্ভব হয় না। অন্যদের নিকট যে ব্যক্তি কথাটি প্রকাশ করে দিয়েছে, তার ওপরও কোনো ওজর-আপত্তি চলে না। কারণ, প্রথম প্রকাশক তো তুমি নিজেই।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত যখন কোনো গাজওয়া বা লড়াইয়ের জন্য বের হতেন, তখন তিনি তার সঠিক দিকের কথা উল্লেখ করতেন না।
এখন কেউ যদি বলে, আমি তো আমার খুব আস্থাভাজন ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করেছিলাম। এখানে আমার দোষ কী?
আমি তাকে বলি, যে কথাটি দ্বিতীয় ব্যক্তির কানে চলে যায়, সেটাই আসলে প্রকাশমান কথা হয়ে যায়। তোমার বন্ধু তো সর্বক্ষণ সে কথা গোপন রাখতে পারে না—তুমি নিজেই যেহেতু পারোনি।
এমন অনেক ঘটনার কথা শুনেছি, বাদশাহ হয়তো কাউকে পাকড়াও করবেন। এই কথা তার বিশ্বস্ত কোনো ব্যক্তির কাছে গোপনে প্রকাশ করেছেন। দেখা গেছে, সে কথা নির্দিষ্ট অপরাধীর কানেও পৌঁছে গেছে। তখন সে ব্যক্তি পলায়ন করেছে। বাদশাহ আর তাকে ধরতে সক্ষম হয়নি। কিংবা নিজের কোনো বিশেষ পরিকল্পনা বিনষ্ট হয়েছে এই কথা ছড়ানোর কারণে।
সন্তান বা স্ত্রীর নিকটও গোপন বিষয় উল্লেখ করা এক ধরনের দুর্বলতা। তাদের থেকে সম্পদের কথাও গোপন রাখা উচিত। সম্পদ যদি বেশি হয়, তবে পরিচিতদের মনে হিংসার উদ্রেক করবে। কাউকে কষ্টে ফেলে দেবে। কেউ আবার উত্তরাধিকারীদের মৃত্যু কামনা করবে—এমনকি তোমারও।
কখনো আবার এটার কারণে ডাকাতি, ছিনতাই বা লুণ্ঠনের শিকার হতে পারে। আবার বিভিন্ন প্রার্থনাকারীরা বেশি সম্পদশালীদের নিকট সম্পদের পরিমাণ অনুপাতে বেশি বেশি প্রার্থনা করতে পারে। তাহলে দেখা যাবে, তাদের দিতে দিতেই তোমার সম্পদ নিঃশেষ হয়ে পড়বে।
একইভাবে বিপদাপদের কথাও গোপন রাখা উচিত। কারণ, এর প্রকাশ শত্রুকে ও প্রতিদ্বন্দ্বীকে আনন্দিত করবে। আর প্রিয় ব্যক্তিদের ফেলবে কষ্টে।
এমনকি নিজের বয়সের বিষয়টিও গোপন রাখা উচিত। কারণ, বয়সটি যদি উপস্থিত ব্যক্তিদের চেয়ে বেশি হয়, তবে তারা তোমাকে অথর্ব ও জরাগ্রস্ত ভেবে বসবে। আর যদি কম হয়, তবে তারা তোমাকে নিতান্তই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞা করবে।
যে বিষয়টিতে অনেকেই অবহেলা করে, তা হলো, নিজেদের আড্ডায় ও বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে আমির বা সুলতান সম্পর্কে এমন গোপন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা, অবশেষে এটা তাদের কানে পৌঁছে যায় এবং এটা তখন কথকের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কখনো কখনো কাছের কোনো বন্ধু ব্যক্তির একনিষ্ঠতা, সততা, আমানতদারি ও গোপন আমলের কথাও মানুষের কাছে প্রচার করে দেয়।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষ যখন তার গোপন বিষয় তার স্ত্রী কিংবা বন্ধুর কাছে প্রকাশ করে দেয়, তখন সে সেই স্ত্রী ও বন্ধুর কাছে বন্দি হয়ে পড়ে। স্ত্রীর গুরুতর কোনো অপরাধেও তখন সে সেই স্ত্রীকে তালাক দিতে সক্ষম হয় না। আবার সেই বন্ধুর অপরাধেও তাকে ত্যাগ করতে সাহস পায় না। কারণ, তাদের বিরোধিতা করতে গেলে তারা গোপন কথা প্রকাশ করে দেবে।
সুতরাং সুদৃঢ় মনোবলের মানুষ হলো সেই ব্যক্তি, যে মানুষদের সাথে বাহ্যিকতায় স্বাভাবিক আচরণ করে চলে। তাদের কাছে তার গোপন কথা প্রকাশ করে না। এ অবস্থায় তার কোনো স্ত্রী কিংবা বন্ধু কিংবা সেবকের সাথে তার বিচ্ছেদ ঘটে, তাহলেও তাদের কেউ তার গোপন বিষয় প্রকাশ করতে সক্ষম হবে না।
সবচেয়ে বড় গোপন বিষয় হলো নিজের নির্জন ও একান্ত বিষয়গুলো। সুতরাং সুদৃঢ় চরিত্রের ব্যক্তির জন্য উচিত হবে- তার এই নির্জনতার কোনো বিষয় যেন মানুষের কাছে প্রকাশ না পায়। তবে গোনাহের কাজ সে কোথাও করবে না। নির্জনে কিংবা প্রকাশ্যে।
তবে যে ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন একটি মস্তিষ্ক রয়েছে, তাকে এগুলো বলার আগেই সে নিজের কাজ সম্পর্কে সচেতন হয়ে থাকে।