📄 তাফাক্কুর ‘স্কৃতি স্থায়ী মর্যাদাকে রহিত করে
আমি একবার আমাদের শ্রেষ্ঠ মানুষগুলো এবং খারাপ লোকদের বিষয়ে চিন্তা করলাম। তাদের মাঝে এই পার্থক্যের কারণ কী? কোন মৌলিকতার কারণে মানুষের মাঝে এই পার্থক্য সূচিত হয়?
আমি বুঝতে পারলাম, এর কারণ হলো বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি। যে মানুষের মৌলিক বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি ভালো, সে অপরিহার্যভাবেই ভালো পথে চলে এবং ভালো হয়। আর যার বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি বিনষ্ট ও বিভ্রান্ত, সে অনিবার্যভাবেই খারাপ পথে চলে এবং খারাপ হয়।
এই বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয় কীভাবে?
একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি যখন চিন্তা করে, তখন সে বুঝতে পারে- অবশ্যই এই বিশ্বজগতের একজন স্রষ্টা রয়েছেন। এবং তার আনুগত্য করা অতি আবশ্যক। এরপর সে তার রাসুলের ব্যাপারেও চিন্তা-ভাবনা করে। এবং তার মুজিজা ও সিরাত দেখে বুঝতে পারে- তিনি অবশ্যই আল্লাহর রাসুল। এবং তাঁর অনুসরণ আমাদের জন্য আবশ্যক।
এরপর সে এমন কাজগুলোই করার চেষ্টা করে, যে কাজগুলো তার স্রষ্টার নৈকট্য অর্জনে সহায়ক হয়। অর্থাৎ স্রষ্টার পছন্দ অনুযায়ী আমল করে। ইলম অন্বেষণের বিষয়টি যদি তার কাছে কঠিনও মনে হয়, কিন্তু যখন সে এর প্রতিদান ও প্রতিফল নিয়ে চিন্তা করে, তখন এটি তার কাছে সহজ হয়ে যায়। রাতের নির্জন ইবাদতও যদি তার কাছে কখনো কষ্টকর হয়, তখনও এটি তার পুরস্কারের আশায় সহজ হয়ে যায়।
যখন সে কোনো লোভনীয় জিনিস দেখে, তাতে লিপ্ত হওয়ার আগে সে তার পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করে। এরপর যখন সে বুঝতে পারে এটি হারাম এবং এটি সম্পাদনের স্ফূর্তি ও স্বাদ তো দ্রুতই নিঃশেষ হবে, কিন্তু তার প্রভাব ও শাস্তি স্থায়ীভাবে রয়ে যাবে তখন সে এটিকে বর্জন করে। এবং এই সুচিন্তার কারণে এটা বর্জন করতে তার সহজ হয়। এভাবে যখন সে এমন ব্যক্তির থেকে প্রতিশোধ নিতে চায়, যে তাকে কষ্ট দিয়েছে, তখন সে ধৈর্যধারণের প্রতিদানের কথা চিন্তা করে এবং রাগান্বিত অবস্থায় কোনো মানুষের কাজের ওপর পরবর্তী আফসোসের কথা চিন্তা করে- তখন সে এই প্রতিশোধ থেকে ফিরে আসে। এভাবে এই পার্থিব জীবনের সংক্ষিপ্ততা নিয়েও সে চিন্তা করে- সময় খুবই অল্প, সুতরাং সে এই অল্প সময়ের মধ্যে যথাসম্ভব সবচেয়ে ভালো কাজগুলো করে নেওয়ার চেষ্টা করে- যাতে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তি গাফেল, নির্বোধ ও বুদ্ধিহীন- সে শুধু তাৎক্ষণিক আনন্দ-স্ফূর্তির কথাই চিন্তা করে এবং সেগুলো নিয়েই মজে থাকে। তার কোনো দূরদর্শিতা নেই।
এদের মধ্যে কেউ কেউ এই বিশ্বজগৎ ও তার স্রষ্টা নিয়ে কোনো চিন্তা-ভাবনাই করে না। সুতরাং তারা স্রষ্টাকে অস্বীকার করে বসে এবং তার কোনো হুকুমের গুরুত্ব দেয় না। এভাবে তারা তাঁর রাসুলকেও অস্বীকার করে এবং তার আনীত বিধানকে স্বীকার করে না। তারা শুধু বর্তমান ও তাৎক্ষণিক বিষয়গুলোর দিকে দৃষ্টি দেয়। এগুলোর সূচনা ও সমাপ্তি নিয়ে কোনো দৃষ্টিপাত করে না। সুতরাং তাদের নিকট খাদ্যদাতা নিয়ে কোনো জ্ঞান নেই-শুধু খাবারের দিকে তাদের দৃষ্টি। যদি তারা একবারও চিন্তা করত—তিনি তাদের কীভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং প্রতিপালন করেছেন? কেন তিনি পৃথিবীতে মানুষের শরীর সংরক্ষণের এত এত উপাদান জড়ো করে দিয়েছেন? তাহলেই তারা সকল জিনিসের বাস্তবতা অনুধাবন করতে সক্ষম হতো।
আল্লাহ মানুষের জন্য যে সকল বিষয়ে আকর্ষণ ও আগ্রহ তৈরি করে দিয়েছেন, এগুলোর প্রতিফল ও পরিণাম সম্পর্কেও তারা চিন্তা করে না। তারা শুধু তাৎক্ষণিক স্বাদ আস্বাদন করেই ক্ষান্ত থাকে।
দুনিয়াতেও এমন কত ব্যক্তি তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় কোনো অপরাধ করায় তার হয়তো হাতকাটা যায়, হদ আপতিত হয়, কিসাস নেওয়া হয় কিংবা অপমানিত হতে হয়। এভাবেই তাৎক্ষণিক আনন্দ-স্ফূর্তি অনেক সময়ই স্থায়ী মর্যাদাকে বিনষ্ট করে। করে লাঞ্ছিত।
এগুলোর কারণ হলো, পরিণামের দিকে দৃষ্টিপাত না করা। এর সূচনা হয় মস্তিষ্ক থেকে। সমাপ্তি হয় প্রবৃত্তির অনুসরণের মধ্য দিয়ে।
আল্লাহ তাআলার নিকট আকুল প্রার্থনা- তিনি যেন আমাদের এমন সচেতনতা প্রদান করেন, যার মাধ্যমে আমরা পরিণাম দেখতে পাই। এবং আমাদের কাছে কোনো জিনিসের শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা কদর্যতা প্রকাশিত হয়ে যায়। তিনি সকল বিষয়েই ক্ষমতাবান।
📄 উচ্চাকাঙ্ক্ষার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
আমাকে এমন এক উচ্চ হিম্মত প্রদান করা হয়েছে- যা তার শেষসীমায় পৌঁছতে চায়। কিন্তু সেই তুলনায় মানুষের জীবন খুবই ছোট। আমি যা চাই, তাতে এই সময়ে পৌঁছানো সম্ভব নয়। সুতরাং এ নিয়ে আমি আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করতে থাকি একটি অতি দীর্ঘ জীবনের, শারীরিক সুস্থতার এবং আমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছবার।
কিন্তু মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতি ও ব্যবস্থাদি এটার ক্ষেত্রে বাধ সেধে বলল, তুমি যা প্রার্থনা করছ, সাধারণভাবে এটা কখনো হওয়ার নয়।
আমি বললাম, আমি তো এমন সত্তার নিকটই প্রার্থনা করছি, যিনি এই সকল স্বাভাবিকতার বাইরেও ক্ষমতা রাখেন। অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন।
একবার এক ব্যক্তির নিকট কিছুলোক এসে বলল, আমাদের সামান্য কিছু প্রয়োজন রয়েছে।
সেই ব্যক্তি বলল, অসুবিধা কী! আমি একটি আস্ত তেজি ঘোড়া প্রদান করে দিলাম।
আরেক ব্যক্তির নিকট প্রার্থনা করা হলো, আমাদের খুবই সামান্য কিছু প্রয়োজন- আপনার যাতে কষ্ট না হয়।
সেই ব্যক্তি বললেন, অসুবিধা কী! তোমাদের সকলের জন্যই আমার দ্বার খোলা।
এখন কথা হলো, দুনিয়াবাসীর একজন আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ব্যক্তিই যদি কারও প্রার্থনার ক্ষেত্রে এমন উদারহস্ত হয়ে থাকেন, তাহলে কেন আমরা এমন সত্তার নিকট আমাদের উচ্চ প্রার্থনার ক্ষেত্রে আশা রাখব না? অথচ তিনি অতি সম্মানিত এবং শক্তিমান।
আমি আল্লাহ তাআলার নিকট এই প্রার্থনা করেছিলাম ৫৭৫ হিজরির রবিউস সানি মাসে। এখন কথা হলো, যদি আমার জীবনসীমা বাড়িয়ে দেওয়া হয় আর আমি যদি আমার সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি তবে তো একদিন এই বিষয়ে আলোচনা করব। আমার অভিষ্ট লক্ষ্যের কথাও বলব। আর যদি কোনোটিই না হয়, তবে তো আমার প্রভুই কল্যাণের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জ্ঞাত। তিনি অতি কৃপণকেও বঞ্চিত করেন না। তাকে ছাড়া কোনো শক্তি নেই।
📄 শরিয়তের প্রচারে ইলম একটি পদ্ধতি
আল্লাহর প্রশংসা- যিনি আলেম ও ফকিহদের মাধ্যমে এই উম্মতের ওপর বড় অনুগ্রহ করেছেন। তারা আল্লাহ তাআলার আদেশের উদ্দেশ্য বোঝেন এবং তার লক্ষ্য সম্পর্কে অবগত হন। এভাবেই তারা দ্বীন ও শরিয়তের সংরক্ষণ করেন। আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দেন।
শয়তান তাদের ব্যাপারে খুবই কঠোর আচরণ করে এবং তাদেরকে ভয়ও পায়। কারণ, এঁরা তাকে কষ্ট দিতে এবং তার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম। কিন্তু সে তাদেরকে কষ্ট দিতে এবং বিভ্রান্ত করতে সক্ষম নয়। শয়তান তার ষড়যন্ত্রের খেলায় বিজয়ী হয় শুধু মূর্খদের এবং যাদের বুঝ-বুদ্ধি কম, তাদের নিয়ে। এবং তার সবচেয়ে ভয়ংকর খেলা হলো, সে একটি সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে ইলম বর্জন করাকে সুশোভিত করে তোলে। এমনকি তারা তখন এতেই শুধু ক্ষান্ত থাকে না- বরং যারা ইলমের চর্চায় নিমগ্ন রয়েছে, তাদেরকে নিন্দা-মন্দ করে। হায়, তারা যদি বুঝত, এর দ্বারা মূলত দ্বীন ও শরিয়তকেই নিন্দা-মন্দ করা হয়! কারণ, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে বলছেন,
(يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ)
'হে রাসুল, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার ওপর যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে, তুমি তা প্রচার করো।'
এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও উম্মতদের বলেছেন, بلغوا عنى ولو آية -'তোমরা আমার পক্ষ থেকে প্রচার করো, যদি একটি আয়াতও শেখো।' এখন কথা হলো, তারা যদি ইলম চর্চায় নিমগ্নই না হয়, তাহলে মানুষদের নিকট তারা শরিয়ত পৌঁছাবে কীভাবে? দ্বীনের জ্ঞানই যদি তাদের অর্জিত না হয়, তাহলে তারা মানুষের কাছে পৌঁছাবেটা কী?
ঠিক এই বিভ্রান্তিমূলক কথা কিছু বড় জাহেদদের থেকেও প্রকাশিত হয়েছে। যেমন, বিশর হাফি রহ.। তিনি একদিন আব্বাস ইবনে আবদুল আজিমকে উপদেশ দিয়ে বললেন, 'তুমি হাদিস চর্চাকারীদের নিকট বসবে না।'
আরেক দিন ইসহাক ইবনে যাইফকেও তিনি বলেন, 'তুমি হলে একজন হাদিস চর্চাকারী, সুতরাং তুমি আমার নিকট আর আসবে না।' অবশ্য এ কথা বলার পর একটু সহজ করার জন্য বললেন,
إنما الحديث فتنة إلا لمن أراد الله به. وإذا لم يعمل به فتركه أفضل.
'হাদিস হলো মানুষের জন্য একটি ফিতনা- যদি না সে তার মাধ্যমে আল্লাহকে পাওয়ার ইচ্ছা করে। আর যদি তার ওপর আমলই না করা হয়, তবে তার চর্চা বর্জন করাই ভালো।'
বিশর হাফি রহ. থেকে এটি এক আশ্চর্যজনক বক্তব্য! তিনি কীভাবে মনে করলেন যে, হাদিসের অধ্যয়নকারীরা এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রার্থনা করবে না? এবং তারা এর ওপর আমল করবে না?
হ্যাঁ, হাদিসের ক্ষেত্রে আমল দুই প্রকার।
এক. ওয়াজিব বা আবশ্যক আমল। এটা বর্জন করা কারও জন্য জায়েয নয়।
দুই. নফল বা ঐচ্ছিক আমল। যার ওপর আমল করা আবশ্যক নয়- এগুলো ঐচ্ছিক বিষয়। আর হাদিস নিয়ে চর্চা করা এই ধরনের নফল নামাজ ও রোজার চেয়েও অনেক উত্তম। আমার ধারণা, তিনি সম্ভবত তার কথা দিয়ে অব্যাহত রোজা, জিকির ও জুহুদকে বুঝিয়েছেন। কিন্তু কথা হলো, এগুলো বর্জনকারীকে তো নিন্দা-মন্দ করার কিছু নেই। আর যদি তিনি বোঝাতে চান যে, এভাবে হাদিসের জ্ঞানের মধ্যে মগ্ন থাকা যাবে না- তাহলে তার কথা সম্পূর্ণই ভুল। কারণ, ইলমের এই সকল শাখাই প্রশংসনীয়।
আচ্ছা, তোমার কি মনে হয়, আলেমরা যদি এই হাদিস ও ফিকাহচর্চা ছেড়ে দেয়, তবে কি বিশর হাফি রহ. ফতোয়া দিয়ে বেড়াবে? মানুষকে মাসআলা- মাসাইল বলে বেড়াবে?
আল্লাহর ওয়াস্তে এমন কারও কথার দিকে দৃষ্টি দেবে না- যে ফকিহ নয়। এমনকি বিশর হাফি রহ.-এর মতো মহান ব্যক্তির নামও যেন তোমাকে বিভ্রান্ত করতে না পারে! আল্লাহ তাকে মাফ করুন। আমিন।
📄 প্রথম প্রাধান্য হবে স্রষ্টা
যিনি বুদ্ধিমান, তিনি স্রষ্টার কথাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, যদিও এতে কোনো সৃষ্টি অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি রাগান্বিত হয় কিংবা অসন্তুষ্ট হয়। কিন্তু এর ব্যতিক্রম, যে ব্যক্তি মানুষের কথাকে প্রাধান্য দিয়ে স্রষ্টার কথাকে দূরে সরিয়ে রাখে, আল্লাহ হয়তো একসময় যাকে সে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিল, তাকেই তার ওপর অসন্তুষ্ট করে দেবেন।
খলিফা মামুন একবার তার এক মন্ত্রীকে বলেছিলেন,
لا تعص الله بطاعتي فيسلطني عليك.
'আমার আনুগত্য করতে গিয়ে তুমি আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা করো না। তাহলে হয়তো তিনি আমাকেই আবার তোমার ওপর চাপিয়ে দেবেন।'
তাহের ইবনে হুসাইনের কথা আমরা জানি। সে খলিফা মামুনের ভাই মুহাম্মদ আমিনকে হত্যা করেছিল এবং তার মাথা শূলে চড়িয়েছিল। যদিও সবকিছু করেছিল খলিফা মামুনের ইচ্ছাতেই। কিন্তু তবুও এই বিষয়টি বাদশাহর অন্তরের মধ্যে একটি ক্ষতের মতো জ্বলজ্বল করত। এ কারণে তিনি তাহেরকে মুখোমুখি দেখতে চাইতেন না।
একদিন তাহের ইবনে হুসাইন খলিফা মামুনের নিকট এলো। খলিফা তাকে দেখে কাঁদতে শুরু করে দিলেন। তাহের তাকে বলল, আপনি কাঁদছেন কেন? আল্লাহ আপনার চোখকে কাঁদাবেন না। আপনার এই বিশাল সাম্রাজ্য অর্জিত হয়েছে। আপনার এখন সুখ ও প্রতাপের দিন।
খলিফা বললেন, আমি কাঁদছি এমন এক বিষয়ের স্মরণে- যার উচ্চারণও লজ্জাজনক। যার অভ্যন্তরে রয়েছে দুঃখ। এবং যার কষ্ট থেকে কেউ রক্ষা পাবে না।'
এর কিছুক্ষণ পর তাহের খলিফার নিকট থেকে বের হয়ে এলো। সে ছিল খুবই ধুরন্ধর একলোক। সে বিপদের গন্ধ টের পায়। তৎক্ষণাৎ খলিফার খাদেম হুসাইনের হাতে দুই হাজার দিরহাম দিয়ে বলল, তুমি যেভাবেই হোক খবর সংগ্রহ করবে খলিফা কেন কাঁদলেন?
দুপুরে খলিফা মামুন খাবার খেতে বসেছেন। পাশে হুকুমের আশায় বসে আছে খাদেম হুসাইন। খলিফা পানি পান করতে চাইলেন। তিনি খাদেমকে বললেন, হে হুসাইন, পানি পান করাও।
খাদেম হুসাইন বলল, হে মহামান্য খলিফা, আমি অবশ্যই আপনাকে পানি পান করাব। কিন্তু তার আগে আপনাকে বলতে হবে, আপনি তখন কেন কাঁদলেন, যখন তাহের এসেছিল আপনার নিকট?
খলিফা বিস্মিত হয়ে বললেন, হে হুসাইন, তোমার এমন কি হলো যে, তুমি আমাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছ?
খাদেম হুসাইন কাঁচুমাচু হয়ে বলল, হুজুর, তেমন কিছু না- তবে আপনার ক্রন্দনে আমিও ভীষণ ব্যথিত হয়েছি। এ জন্যই তার কারণ জানতে ইচ্ছে করছে।
খলিফা বললেন, হে হুসাইন, এটি এমন এক বিষয়, তুমি যদি কাউকে বলো, তাহলে তোমাকে হত্যা করে ফেলব।'
খাদেম হুসাইন এবারও বিনয়ে গদগদ হয়ে বলল, 'হে মহামান্য খলিফা, আমি কখনো আপনার কোনো গোপন বিষয় কোথাও প্রকাশ করেছি কি! এটা হতেই পারে না।'
খলিফা বললেন, আমার ভাই মুহাম্মদের কথা আমার স্মরণে এসেছিল। এবং তাকে যে লাঞ্ছনার সাথে হত্যা করা হয়েছিল- সে কথাও আমার খুব মনে পড়ছিল। দুঃখে কষ্টে আমার শ্বাস যেন রুদ্ধ হয়ে আসছিল। কান্নার মাধ্যমে যেন তার কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। অবশ্যই তাহেরকে আমার পক্ষ থেকে এর প্রতিকার পেতে হবে।'
এরপর হুসাইন যথারীতি এই কথা গোপনে তাহেরকে জানিয়ে দেয়। তাহের বিপদের গন্ধ টের পেল। তখনই সে ঘোড়া ছুটিয়ে আহমদ ইবনে আবি খালেদের নিকট চলে এলো। এবং তাকে ঘটনা বর্ণনা করে বলল, 'আমি আপনার কাজের প্রতিদান দেবো। আপনি আমাকে খলিফার চোখ থেকে দূরে সরিয়ে দিন।'
আহমদ বলল, 'অসুবিধা নেই, অচিরেই আমি তার ব্যবস্থা করছি।'
এরপর একদিন আহমদ খলিফা মামুনের নিকট এসে বলল, গতরাতে দুঃশ্চিন্তায় আমি একটুও ঘুমোতে পারিনি।
খলিফা বললেন, কেন, কিসের চিন্তা?
আহমদ বলল, আপনি গাসসান ইবনে আব্বাদকে খোরাসানের গভর্নর নিযুক্ত করেছেন। অথচ তার এবং তার সাথিদের মাথায় বুদ্ধি বলতে কিছু নেই। আমি তুর্কিদের আক্রমণের ভয় করছি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ব্যাপক ধ্বংসের আশঙ্কা করছি।
খলিফা বললেন, তবে তুমি কাকে সেখানে নিযুক্ত করতে চাও?
আহমদ বলল, তাহের ইবনে হুসাইনকে।
খলিফা আহমদের কথা গ্রহণ করে নিলেন। এভাবেই আহমদ ইবনে আবি খালেদের সুপারিশে তাহেরকে খোরাসানের গভর্নর নিযুক্ত করা হলো। তাহের খোরাসানে এসে নিরাপদে শাসনকার্য চালাতে লাগল।
অনেক দিন অতিবাহিত হলো। এরপর একদিন তাহের জুমার দিন খুতবার সময় খলিফার নামে দোয়া করা বর্জন করল।
খলিফার গুপ্তচর এসে তাকে বলল, আপনি তো খলিফার নামে দুআ করেননি। আমি কি খলিফাকে এ কথা জানিয়ে দেবো?
তাহের বলল, আমার ভুল হয়ে গেছে। আপনি লিখে দিয়েন না।
কিন্তু তাহের দ্বিতীয় ও তৃতীয় জুমাতেও একই কাজ করল। খলিফার নামে দুআ পড়ল না।
এবার গুপ্তচর খলিফার কাছে বিষয়টা লিখে জানিয়ে দিলো। খবর শুনে খলিফা আগে আহমদ ইবনে আবি খালেদকে ডেকে আনলেন। এবং তাকে বললেন, 'তোমার কৌশলেই তাহের এখান থেকে পলায়ন করতে পেরেছে। আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, তুমি যেভাবে তাকে আমার আয়ত্ব থেকে বের করে নিয়ে গেছ, সেভাবে যদি তাকে আবার আমার নিকট ফিরিয়ে আনতে না পারো, তবে এর শাস্তি তোমাকেই ভোগ করতে হবে। এখন যাও। দ্রুত ব্যবস্থা করো।'
আহমদ খলিফার দরবার থেকে বের হয়ে এলো এবং নিজেই তার দলবল নিয়ে খোরাসানের দিকে রওনা করল। পথের মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়ল। তবুও এই অসুস্থতা নিয়েই সে চলতে লাগল। অবশেষে যখন তারা রায় নামক স্থানে পৌঁছল, তখন সংবাদ এলো—তাহের মৃত্যুবরণ করেছে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংবাদ নিয়ে জানা গেল আসলেও তা-ই। বেচারা মারা গেছে।
বন্ধুদের থেকে এই ঘটনা শোনার পর আমিও এ-জাতীয় একটি ঘটনা তাদের নিকট বর্ণনা করলাম। হারুনুর রশিদ একবার বাগদাদের বাইরে ভ্রমণে বের হলেন। এই সুযোগে লোকজন মুকতাফিকে শাসক নিযুক্ত করার ইচ্ছা করল। এবং কিছু লোক এসে সাক্ষ্য দিলো যে, হারুনুর রশিদ খলিফা হওয়ার উপযুক্ত নয়। সুতরাং লোকজন তাকে বাদ দিয়ে মুকতাফিকেই শাসক নিযুক্ত করে নিল।
এর কিছুদিন পর একদিন সেই সাক্ষ্যদাতাদের একজনের কথা মুকতাফির নিকট ওঠানো হলো। কিন্তু তিনি তার নিন্দা করে বললেন, এই লোক তো হারুনুর রশিদের বিপক্ষে আমাকে সাহায্য করেছিল। ব্যাটা সুবিধাবাদী!
এমনই হয়- আল্লাহকে সন্তুষ্ট না করে বান্দাকে সন্তুষ্ট করতে গেলে, আল্লাহ একসময় সেই ব্যক্তিকেই তার প্রতি অসন্তুষ্ট করে তুলতে পারেন। এটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ, অন্তরের মালিক আল্লাহ।
আর এর বিপরীত- যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয় এবং সঠিক পথে থাকে, হয়তো একসময় আল্লাহ তাআলা সেই অসন্তুষ্ট ব্যক্তিকে তার প্রতি সন্তুষ্ট করে দেন।
যেমন, মন্ত্রী ইবনে হুবাই আমাকে একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, 'খলিফার পুত্র আল মুসতানজিদ বিল্লাহ একবার আমার নিকট একটি চিঠি লিখে বললেন, আমি যেন তাকে তার বাবার গোপন বিষয়গুলো জানিয়ে দিই।' আমি তার বার্তাবাহককে বললাম, আল্লাহর কসম, আমার দ্বারা সেগুলো পড়াও সম্ভব নয়, আর কাউকে জানানোও সম্ভব নয়।'
আমার এ কথায় খলিফাপুত্র ভীষণ রাগান্বিত হলেন। এবং কিছুদিন পর খলিফার ইন্তেকাল হলে তিনি নিজেই তখন খলিফা নিযুক্ত হলেন। আমি তখন তার নিকট গিয়ে বললাম, আমার সততা ও একনিষ্ঠতার বড় প্রমাণ হলো যে, আমি সেদিন আপনাকে খলিফার গোপন বিষয় জানাতে রাজি হইনি।'
খলিফা মুসতানজিদ বিল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, মন্ত্রী সাহেব, আপনি সত্য বলেছেন। যতই আমি ক্রুদ্ধ হই, কিন্তু সেটাই ছিল আমানতদারি। আমারও তা-ই প্রয়োজন।
আমার একবন্ধু আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, একবার কিছুলোক রাজ্যের কোষাধ্যক্ষের নিকট এসে বলল, রাজ-ভান্ডার থেকে আপনি আমাদের জন্য কিছু ঋণের ব্যবস্থা করে দিন।
কোষাধ্যক্ষকে গভর্নর বললেন, আপনি তাদের ঋণের ব্যবস্থা করে দিন। আর তারা যতটুকু জামানত হিসেবে প্রদান করে, তা-ই রেখে দিন।
অনুমোদনের জন্য বিচারক ইবনে রুতাবির নিকট বিষয়টি পেশ করা হলো। তিনি বললেন, না, আমি কিছুতেই এটা অনুমোদন করব না। এটা একটি জুলুম। আমি এর হুকুম দিতে পারি না।
লোকেরা বলল, আপনার আগেই তো গভর্নর অনুমোদন করে দিয়েছেন। আপনি দেবেন না কেন?
তবুও ইবনে রুতাবি তার মতের ওপর অটল রইলেন। এরপর আরেকজন বিচারককে ডাকা হলো। তিনি এটাকে অনুমোদন করে দিলেন। কিন্তু বিষয়টা একসময় খলিফার কানে গেল। বিচার বসল খলিফার দরবারে। খলিফা ইবনে রুতাবির ক্ষেত্রে বললেন, তিনি অবশ্যই প্রশংসা পাওয়ার মতো কাজ করেছেন। কারণ, তিনি সত্যকথা বলেছেন। তার প্রশংসা জ্ঞাপন করছি। এরপর তিনি অন্য বিচারককে বরখাস্ত করে দিলেন- যিনি অন্যায়ভাবে গভর্নরকে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিল।
এছাড়াও আরেকটি ঘটনা আমি জানি। ঘটনাটি হলো, একবার এক সুলতান তার নিজের জন্য 'মালিকুল মুলুক- রাজাদের রাজা' উপাধিটি ব্যবহার করতে চাইলেন। এ ব্যাপারে তিনি ফকিহদের নিকট ফতোয়া প্রার্থনা করলেন- জায়েয হবে কি না? সুবিধাবাদী সকল ফকিহ বললেন, জায়েয হবে। তাদের মধ্য থেকে একমাত্র হজরত মাওয়ারদি বললেন, জায়েয হবে না। জায়েয না হওয়ার কারণগুলোও তিনি বললেন। এতে সুলতান রাগান্বিত হওয়ার পরিবর্তে খুশিই হলেন। কারণ, তিনি সত্য জানতে সক্ষম হলেন। এ ঘটনায় সুলতানের নিকট মাওয়ারদির মর্যাদা অনেকগুণ বেড়ে গেল।
এমন আরও অনেক ঘটনা রয়েছে- বলতে গেলে অনেক লম্বা হয়ে যাবে। এখানেই আপাতত থাক। তবে মূলকথা হলো, কোনো অকাট্য ফরজ বিধানের হুকুম পালনের ক্ষেত্রে কোনো মানুষ যদি অসন্তুষ্টও হয়, তবুও আনুগত্যের মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য প্রদান করাই উচিত হবে। কারণ, মানুষ তো অতি তুচ্ছ, সে তো কখনো স্রষ্টাকে তোমার প্রতি রাগিয়ে তুলতে পারবে না। কিন্তু তুমি যদি স্রষ্টাকে অসন্তুষ্ট করে মানুষকে সন্তুষ্ট করতে চাও কিংবা করো, তবে এমন হওয়া খুবই স্বাভাবিক, একদিন স্রষ্টা তাকে তোমার প্রতি ক্ষুব্ধ করে তুলবেন। তখন তোমার উপায়টা হবে কী? তীর তো আগেই হারিয়েছ- এবার খড়কুটোও হারাবে!