📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আলেমের একাকিত্ব থাকার ফজিলত

📄 আলেমের একাকিত্ব থাকার ফজিলত


আমি মনে করি, একজন আলেমের জন্য নির্ঝঞ্ঝাট একাকিত্বে থাকার চেয়ে বড় কোনো সুখ আনন্দ সম্মান মর্যাদা স্বস্তি ও নিরাপত্তা হতে পারে না। এর মাধ্যমে সে নিজের শরীর ও দ্বীন- উভয়টিই নিরাপদ রাখতে পারে এবং একই সাথে আল্লাহ ও তার বান্দাদের কাছে নিজের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়।
কারণ, মানুষের স্বভাব হলো এমন, যে ব্যক্তি তাদের সাথে বেশি মেলামেশা করে, তাকে তারা তেমন একটা মর্যাদা প্রদান করে না। তাদের সাথে মিলেমিশে থাকা ব্যক্তির কথাকেও তারা তেমন গুরুত্ব দেয় না।
এছাড়া যখন সাধারণ ব্যক্তিরা কোনো আলেমকে দ্বীনের কোনো বিষয়ে শিথিল অথচ বৈধ বিষয় গ্রহণ করতে দেখে, তাদের নিকট তার সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে না। এ কারণে একজন আলেমের জন্য উচিত- নিজের ইলমকে সংরক্ষণ করা এবং সাধারণ মানুষদের সাথে মেশার ক্ষেত্রে একটি সীমানা নির্ধারণ করে রাখা।
আমাদের এক সালাফ বলেছেন, 'আমরা আগে হাসি-মজাক করতাম, যেমন-তেমনভাবে চলাফেরা করতাম, কিন্তু যখন দেখলাম লোকেরা আমাদের অনুসরণ করা শুরু করেছে, তখন আমরা এগুলো বর্জন করে দিলাম।'
হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ. বলেন, 'তোমরা এই ইলম শিক্ষা করো এবং নিজেদের অভ্যন্তরে সংরক্ষণ করো। এটাকে কখনো ঠাট্টা-তামাশার সাথে মিশ্রণ ঘটিয়ো না, তাহলে মানুষের অন্তর তোমাদের ইলম বর্জন করা শুরু করবে।'
সুতরাং বোঝা যায়, মানুষের মানসিকতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্তব্যের বিষয়। এটাকে এড়িয়ে চলা উচিত নয়।
হাদিসে এসেছে- عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عنها أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهَا أَلَمْ تَرَيْ أَنَّ قَوْمَكِ لَمَّا بَنَوْا الْكَعْبَةَ اقْتَصَرُوا عَنْ قَوَاعِدِ إِبْرَاهِيمَ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلَا تَرُدُّهَا عَلَى قَوَاعِدِ إِبْرَاهِيمَ قَالَ لَوْلَا حِدْثَانُ قَوْمَكِ بِالْكُفْرِ لَفَعَلْتُ.
হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার তাকে বললেন, তুমি তো জানো, তোমার সম্প্রদায় [মক্কার কোরাইশ বংশধর] যখন কাবা পুনর্নির্মাণ করে, তখন তারা হজরত ইবরাহিমের নির্মিত ভিত্তি থেকে কমিয়ে নির্মাণ করে।'
হজরত আয়েশা রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি তো এখন ইচ্ছা করলেই হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের নির্মিত পরিমাণের ওপর ফিরিয়ে আনতে পারেন!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'যদি তোমার সম্প্রদায়ের কুফরির দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কা না থাকত, তবে আমি তা-ই করতাম। ৮৫
হজরত আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. মাগরিবের আগে দু-রাকাত নামাজ পড়ার প্রবক্তা ছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি বলেন, 'আমি যখন দেখলাম মানুষ এটাকে পছন্দ করছে না, তখন আমি এটা থেকে আমার মত ফিরিয়ে নিলাম।'
আবার জাহেলদের কথা শুনে মনে করো না যে, এগুলো হলো লোক দেখানো বিষয়। না, বরং এগুলো ইলমের মর্যাদা রক্ষা। যেমন দেখো, কোনো আলেম যদি মানুষদের মাঝে খোলামাথায় চলাফেরা করে কিংবা হাতে কিছু নিয়ে খেয়ে বেড়ায়, তবে অবশ্যই মানুষদের নিকট তার মর্যাদা কমে যায়। অথচ এটা তো বৈধ বিষয়।
সুতরাং আলেমের জন্য উচিত হবে- সাধারণ ব্যক্তিদের থেকে কিছুটা সংরক্ষিত অবস্থা নিয়ে চলা। বৈধ কিন্তু সামাজিকভাবে দৃষ্টিকটু- এ ধরনের বিষয় একান্তে নির্জনে সম্পন্ন করা উচিত।
এই সামাজিকতাটুকু হজরত আবু উবাইদা রা. খেয়াল রেখেছিলেন। যখন হজরত উমর রা. শামে [সিরিয়ায়] এলেন, তখন তিনি একটি গাধার পিঠে চড়ে আসছিলেন। আর তার দু-পা গাধার এক পাশে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। এটা হজরত আবু উবাইদা রা.-এর নিকট তার পরিবেশ অনুযায়ী কিছুটা দৃষ্টিকটু মনে হয়েছিল। সে কারণে তিনি হজরত উমর রা.-কে বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন, আপনার সাথে অনেক সম্মানিত ব্যক্তি সাক্ষাৎ করতে আসছেন... যদি একটু...।
কী চমৎকার পরিবেশদর্শিতা!
হ্যাঁ, তবে হজরত উমর রা.-ও তাকে কিছু শেখাতে চাইলেন। সেটা হলো, ইসলামের মৌলিকতা। এ কারণে হজরত উমর রা. বললেন,
إن الله أعزكم بالإسلام فمهما طلبتم العز في غيره أذلكم.
'আল্লাহ তোমাদেরকে ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। এরপর যখনই তোমরা ইসলামের বাইরে সম্মান অন্বেষণ করবে, তখনই আল্লাহ তোমাদের লাঞ্ছিত করবেন।'
এর দ্বারা উদ্দেশ্য, তোমাদের উচিত হবে দ্বীন পালনের মাধ্যমে সম্মান অন্বেষণ করা- শুধু বাহ্যিক আমলের মাধ্যমে নয়। যদিও বাহ্যিক বিষয়াবলিও ধর্তব্যের মধ্যে রাখতে হবে। যেমন, একজন মানুষ তার বাড়িতে একান্তে বস্ত্রহীনও হতে পারে। কিন্তু বাইরে মানুষের সামনে আসতে গেলে তাকে অবশ্যই পোশাক পরিধান করে আসতে হবে। সম্ভব হলে সবচেয়ে ভালো পোশাক পরে আসবে।
এটা কোনো লৌকিকতা নয় কিংবা অহংকারেরও বিষয় নয়। এটা হলো সামাজিক সৌন্দর্যবোধ। তবে হ্যাঁ, শরিয়তের বাইরে গিয়ে কোনো সামাজিকতাই পালন করা যাবে না।
যেমন, হজরত মালেক বিন আনাস রহ. গোসল করতেন, আতর লাগাতেন, সুন্দর পোশাক পরিধান করতেন এবং খুব জাঁক-জমকের সাথে হাদিসের দরসে বসতেন।
সুতরাং হে আলেম, নিজেরমতো নিজের সৌন্দর্য সম্মান ও ইলম নিয়ে চলো। রাজা-বাদশাহদের দরবারে যে সকল আলেমগণ ধরনা দিচ্ছে, তাদের দিকে কখনো ঈর্ষার চোখে তাকিয়ো না। দরবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাই আলেম ও ইলমের জন্য নিরাপদ। যারা দরবারে আসে, তারা বাহ্যিকভাবে যতটুকু প্রাপ্ত হয় কিংবা আশা করে, তার চেয়ে বহু বহু গুণ তারা নিজেদের সম্মান মর্যাদা ও ইলমের নূর থেকে বঞ্চিত হয়।
হাদিস ও ফিকহের সম্রাট হজরত সাইদ ইবনে মুসাইয়িব রহ. কখনো রাজা-বাদশাহর দরবারে আগমন করেননি। তারাও তাকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়নি। এটি খুবই দৃঢ় মনের মানুষের কাজ। এর জন্য সাহস ও হিম্মত লাগে।
সুতরাং হে আলেম, আপনি যদি সুখ শান্তি ও স্বস্তি চান, তবে আপনার ঘরের প্রান্তে বসে যান। নিজের কাজ-কর্ম করুন। আর নিজের স্ত্রী-পরিবারের সাথে সাক্ষাতের জন্য সময় নির্ধারণ করে রাখুন। আপনার বাড়িতে আপনার একটি নিজস্ব কামরা থাকবে। সেখানে একান্তে আপনি আপনার ইলম চর্চা করবেন। কিতাব নিয়ে আলোচনা করবেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবেন। এবং বাইরের সাধারণ মানুষদের সাক্ষাৎ ও আলোচনার জন্য সময় নির্বাচন করে রাখুন।
কিছুটা উপার্জনের চেষ্টা করুন, যাতে অন্যের সম্পদের আশা করতে না হয়। এটিই হলো দুনিয়াতে একজন আলেমের হৃদয়ভরা সুখ ও আনন্দের পরিবেশ।
একবার হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ.কে কিছু সাধারণ ব্যক্তি বলল, আপনার কী অসুবিধা হবে? আমাদের সাথে আরও কিছুক্ষণ বসে যান!
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. বললেন, 'আমাকে এখনই যেতে হবে। সাহাবি ও তাবেয়িদের বিভিন্ন মজলিসে বসতে হবে।' তিনি এর দ্বারা উদ্দেশ্য করেন কিতাবের পাতায় চোখ বোলানো, অধ্যয়ন করা- যেখানে সাহাবি ও তাবেয়িদের কথা রয়েছে।
আর যদি কোনো আলেমের সচ্ছলতা অর্জিত হয়। যার কারণে মানুষের ওপর আর নির্ভর করতে হয় না এবং নির্জনতাও লাভ হয়। সেই সাথে যদি কিতাব লেখার যোগ্যতাও থাকে- তবে তো তার সুখ ও আনন্দের ঝরনা বয়ে যাওয়ার কথা। আর এর সাথে যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সাথে তার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। নির্জন মোনাজাত ও প্রার্থনায় আনন্দ অনুভব হয়- তবে তো মৃত্যুর আগে দুনিয়াতেই সে যেন জান্নাত প্রাপ্ত হয়ে যায়- জগতে এরচেয়ে আনন্দ ও খুশির কিছু থাকে না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট আমাদের প্রার্থনা- তিনি যেন আমাদের পূর্ণতার হিম্মত প্রদান করেন এবং সৎকর্মের সক্ষমতা দান করেন। আমিন।

টিকাঃ
৮৫ সহিহ বোখারি: ৭/২৩৬৮, পৃষ্ঠা: ২৬- মা. শামেলা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আত্মকথন

📄 আত্মকথন


জীবনের বিভিন্ন অবস্থানে যারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তাদের অবস্থা নিয়ে আমি একদিন চিন্তা করলাম। দেখলাম, অধিকাংশ মানুষই একটি সময়ে এসে আফসোস প্রকাশ করছেন।
এদের মধ্যে কেউ যৌবনে গোনাহের মধ্যে সময় কাটিয়েছে। কেউ ইলম অর্জনে অলসতা করেছে। কেউ অন্যায়ভাবে জীবন উপভোগ করেছে। এদের সকলেই বার্ধক্যে এসে আফসোস-অনুশোচনায় আক্রান্ত হয়েছে। আফসোসের কারণ- অতীতের সেই গোনাহের আস্বাদ এখন আর নেই। কিংবা সেই শক্তিও আজ রহিত। কিংবা মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত না হওয়া। এখন তাই বার্ধক্যের সময়গুলো অনুশোচনা ও আফসোসের মধ্যে অতিবাহিত করছে।
শেষ বয়সে কোনো বৃদ্ধের যদি গোনাহের সম্পর্কে সচেতনতা আসে- তখন সে আফসোস করে- হায়! কত অপরাধই না করেছি। আর যদি তখনো গোনাহের প্রতি অনুশোচনা না আসে, তবুও তাকে আফসোস করতে হয়- হায়! সেই আস্বাদন ও মজা তো আর নেই। আর আসবেও না কখনো!
কিন্তু যে ব্যক্তি তার যৌবনকাল ইলম অর্জনের জন্য ব্যয় করেছে, বার্ধক্যে এসে সে তার আহৃত ইলমের ফল ভোগ করবে এবং সে যা অর্জন করেছে তা রচনা করার স্বাদ উপভোগ করবে। এবং ইলমের যে স্বাদ সে লাভ করেছে তার তুলনায় দেহের হারানো সুখ-সম্ভোগকে কিছুই মনে করবে না। সাথেসাথে তার মাঝে রয়েছে এমন একটি আগ্রহ ও আকর্ষণ- যার মাধ্যমে সে উদ্দিষ্ট ইলমের প্রত্যাশা করে। এই তলবের স্বাদ কখনো কখনো অর্জিত উদ্দিষ্টের চেয়েও উপভোগ্য হয়ে থাকে। যেমনটি কবি বলেছেন-
اهتز عند تمني وصلها طريا ... ورب أمنية أحلى من الظفر
আমি আমার কাঙ্ক্ষিত জিনিসের আকাঙ্ক্ষাকালে আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছি বেশি। কারণ, অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা তো তা লাভ করার চেয়েও অনেক বেশি স্বাদের ও উপভোগের।
আমি আমার ওই সকল আত্মীয়স্বজনের অবস্থার সাথে নিজের অবস্থাকে তুলনা করে দেখেছি, যারা তাদের জীবনকে দুনিয়ার উপার্জন ও অর্জনের জন্য ব্যয় করেছে। আমি আমার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনকে ইলম অন্বেষণের পেছনে ব্যয় করেছি। আমি দেখলাম তারা যা অর্জন করেছে তা আমার একেবারে হাত ছাড়া হয়ে যায়নি- তবে এমন জিনিস ব্যতীত যদি তা আমার অর্জিত হতো, তাহলে তার জন্য আমাকে আফসোসই করতে হতো।
এরপর আমি আমার অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করলাম। আমি দেখলাম, পৃথিবীতে আমার জীবনযাত্রা তাদের জীবনযাত্রার চেয়ে অনেক ভালো। মানুষের মাঝে আমার যশখ্যাতি তাদের যশখ্যাতির চেয়ে বেশি। আর আমি ইলমের গুণে যা অর্জন করেছি, তার মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এ সময় শয়তান আমাকে বলল, এর জন্য তুমি কি তোমার ক্লান্তি ও বিনিদ্র রজনীর কথা ভুলে গেছ?
আমি তাকে বললাম, হে মূর্খ, ইউসুফকে দেখার তুলনায় হাত কাটার কষ্ট তো কিছুই নয়। বন্ধুর বাড়ির পথ কখনো দীর্ঘ ও কষ্টকর হয় না।
আমি আমার ইলম তলবের স্বাদের মাঝে যে সকল কষ্ট ও কঠিনতার মুখোমুখি হয়েছি, সেগুলো আমার কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত বিষয়ের তুলনায় মধুর চেয়ে মিষ্টি মনে হতো।
শৈশবে আমি আমার সাথে কিছু শুকনো রুটি রাখতাম। এরপর হাদিসের অন্বেষণে বের হয়ে যেতাম। একসময় বাগদাদে ঈসা নদীর তীরে এসে বসতাম। কারণ, রুটিগুলো এমনই শক্ত ও শুষ্ক হয়ে থাকত যে, আমি পানি ছাড়া রুটিগুলো খেতে পারতাম না। যখনই আমি একটি লোকমা খেতাম, তখনই এক ঢোক পানি পান করতাম। আমার আকাঙ্ক্ষা সব সময় ইলম অর্জনের স্বাদ উপভোগ করত। আমার মনে হয় সেই স্বাদ ও মনোবল আমার জীবনে এই ফল বয়ে এনেছে যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস, হাদিসের বিভিন্ন বিষয় এবং সাহাবি ও তাবেয়িদের জীবনী সর্বাধিক শুনেছি বলে পরিচিতি লাভ করেছি। তার আদর্শ সম্পর্কে অবগতির ক্ষেত্রে ইবনে আযওয়াদের মতো পাণ্ডিত্য লাভ করেছি।
এগুলো আমার আচরণ ও আমলের ক্ষেত্রেও প্রভাব রেখেছে। আমি আজ স্মরণ করতে পারি- আমার সেই শৈশবে, তারুণ্যে ও কৌমার্য সময়ে এক পিপাসার্ত ব্যক্তি যেমন রক্ষিত ঠান্ডা পানির দিকে ধাবিত হয়, আমার নফসও তেমন বিভিন্ন দিকে ছুটতে চেয়েছিল। কিন্তু নিজের ব্যাপক ইলমের ফলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতি আমার যে সমীহ ও ভয়ের সৃষ্টি হয়েছিল, তার কারণে আমি এগুলো থেকে বিরত থাকতে সক্ষম হই।
হ্যাঁ, মানুষ ভুল করে। ভুলের ঊর্ধ্বে সে নয়। আমিও আমার নিজের ক্ষেত্রে সেই বিভিন্ন ভুলে জড়িয়ে পড়ার ভয় করতাম। কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানি- তিনি আমাকে সেই বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন। তিনি আমাকে ইলমের অভ্যন্তরীণ মারেফাত সম্পর্কে অবহিত করেছেন। এবং নির্জন নিরালায় ইলম অর্জনের বিপুল আস্বাদন দান করেছেন। এমনকি আমি তখন ইলমের মধ্যে এতটাই বেশি নিমগ্ন হয়ে থাকতাম যে, তখন যদি হজরত মারুফ কারখি রহ. এবং বিশর হাফি রহ.ও আমার সাথে দেখা করতে আসতেন, তবুও আমি হয়তো বিরক্তই হতাম। ইলম আমাকে পেয়ে বসেছিল। নিমজ্জিত করে রেখেছিল। এমনকি আমাকে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। প্রতিফলে তখন আমি খুব কম মানুষকেই আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতাম। কখনো ইলম আমাকে রাতের নামাজে এবং প্রভুর সাথে একান্ত প্রার্থনায় দাঁড় করিয়ে দিত। আবার কখনো শারীরিক পূর্ণ সুস্থতা সত্ত্বেও এটা থেকে বঞ্চিত রাখত। ইলমের মধ্যেই ডুবে থাকতাম।
আমি যদি আমার ইলমের প্রাজ্ঞতা দিয়ে না জানতাম যে, এটাই মানুষের প্রকৃতি। মানুষের অভ্যাস ও সংস্কৃতি। কখনো উত্থান, কখনো পতন। এটা না জানলে হয়তো আমি আমার রাত্রজাগরণ নিয়ে গর্ববোধ করতাম। কিংবা কখনো সেটা সম্ভব না হলে হতাশ হতাম। কিন্তু তার প্রতি আমার যেমন ভয় রয়েছে, ঠিক সেই পরিমাণ আশাও রয়েছে। অবশ্য কখনো কখনো আমার আশার পাল্লাটাই বেশি ভারি হয়ে ওঠে। কেননা, আমি আমার শৈশব থেকেই আমার প্রতি তার দয়া ও অনুগ্রহের বহর দেখে আসছি। আমার অবুঝ বয়সেই আমার পিতা মারা যান। মা আমাদের প্রতি তেমন লক্ষ রাখতে পারতেন না। তখনই আল্লাহ আমার স্বভাবে ইলমের ভালোবাসা গেঁথে দেন। আমার যাত্রা শুরু ইলমের সাথে। ইলমের সুবাস মেখে মেখে।
আমার প্রতিপালক আমাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সজাগ করেছেন এবং আমাকে এমন বিষয়ে অবহিত করেছেন, যা আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। এভাবে ধীরে ধীরে তিনি আমাকে সর্বদিক দিয়ে শক্তিশালী করেছেন। কত শত্রু অনিষ্ট করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তিনি সেগুলো সব প্রতিহত করে দিয়েছেন। এভাবে যখন একে একে আমার প্রতি তার অনুগ্রহের কথাগুলো ভাবতে থাকি—তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন, রক্ষা করেছেন, নিরাপদ করেছেন, আলেমের মর্যাদা দিয়েছেন ও সম্মানিত করেছেন—তাঁর এই অতীত অনুগ্রহগুলোই আমাকে ভবিষ্যতের দিকে একটু বেশি আশান্বিত করে তোলে।
ওয়াজের মজলিসে এ যাবৎ আমার হাতে দু-লাখের বেশি মানুষ তাওবা করেছে। আমার হাতে দু-শতেরও বেশি মানুষ মুসলমান হয়েছে। কত উদ্ধত অহংকারী মানুষের দু-চোখ আমার ওয়াজে অশ্রু ঝরিয়েছে।
এসকল নিয়ামত ও অনুগ্রহের মধুর প্রাপ্তিতে যার আঁচল ভরে আছে, প্রভু হে, সে আরও পূর্ণতার আশা তো করতেই পারে!
হ্যাঁ, মাঝে মাঝে ভয়ের বিষয়টিও প্রবল হয়ে ওঠে। আমার যত ত্রুটি, কমতি অপরাধ ও গোনাহ—সেদিকে তাকালে শির আপনিই নত হয়ে আসে।
একবার এক মজলিসে বসে আছি। আমার চারপাশে প্রায় দশ হাজারের মতো মানুষ। ওয়াজের প্রভাবে তাদের প্রতিটি হৃদয় বিগলিত। প্রতিটি চোখ থেকে ঝরছে অশ্রু। হঠাৎ আমি আমার নফসের দিকে লক্ষ করে বললাম, এই যে এত মানুষ—সবাই রক্ষা পেয়ে গেল আর হয়তো তুমি ধরা খেয়ে গেলে—তখন তোমার কী অবস্থা হবে?
আমি আমার অস্তিত্বে প্রবল প্রকম্পন নিয়ে বলে উঠলাম, হে আমার প্রভু, আমার প্রতিপালক, আপনি যদি আমার প্রতি আজাবেরও ফয়সালা করে থাকেন, তবুও এই লোকদের আপনি তা কখনো জানতে দেবেন না। এটা আমার জন্য শুধু নয়, আপনার মহান মর্যাদা রক্ষার জন্যও। তাহলে লোকজন বলবে, যার প্রতি সে আহ্বান করে জীবন পার করল, তিনিই তাকে শাস্তি দিলেন!
প্রভু হে, আপনার নবীকে একবার বলা হয়েছিল, 'আপনি মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে হত্যা করতে নির্দেশ দিয়ে দিন।' উত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'বাহ্যিকভাবে তো সে মুসলিম, তাকে হত্যা করা হলে লোকজন বলে বেড়াবে, মুহাম্মদ তাঁর সাথিদের হত্যা করছে।'
প্রভু হে, আমার জীবনের কোনো আমলই যদি কবুল না হয়, তবু আপনি অনুগ্রহ করে আমার প্রতি মানুষের যে ভালো ধারণা—তা রক্ষা করুন। হে রাব্বুল আলামিন, সকল প্রশংসা আপনারই।
حاشا لباني الجود أن ينقضا ... لا تبر عوداً أنت ريشته بصوب إنعامك قد روضا ... لا تعطش الزرع الذي نبته
হৃদয়কাড়া এই পালকগুলো আপনিই দিয়েছেন তাকে, কেটে দিয়েন না। তার কত মহত্ব, বঞ্চনায় সক্ষম হয়েও যিনি করেছেন প্রদান!
সেই তৃণ-ফসলগুলোকে করবেন না বিমর্ষ বিরান, আপনার পরিচর্যা ও অনুগ্রহে হয়ে উঠেছে যা শোভিত মরুদ্যান।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 কল্পিত সুখ ও বাস্তব সুখ

📄 কল্পিত সুখ ও বাস্তব সুখ


মানুষের কয়েকটি গোপন প্রকৃতি রয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো, পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং পেয়ে হারানো।
বিষয়টি একটু গভীর ও সূক্ষ্ম। তাই এটার একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছি। যেমন, কোনো পুরুষের নিকট যখন কোনো কাঙ্ক্ষিত বস্তু- যেমন নারী, না থাকে, তখন সে নিজেকে বঞ্চিত ভাবতে থাকে। একাকী মনে করতে থাকে। যদি কোনো এক মায়াবী নারী তার পাশে থাকত, জীবন যেন তার কানায় কানায় ভরে উঠত। কিন্তু বাস্তবে যখন সে তার কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি পেয়ে যায়, তখন আর সেই কল্পিত সুখ সে বাস্তবে ঠিক সেভাবে অনুভব করে না।
অর্থাৎ মানুষ যখন তার কাঙ্ক্ষিত আরাধ্য বস্তু পেয়ে যায়, কিছুদিনের মধ্যেই সে তার প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে এবং অন্য আরেকটির দিকে ঝুঁকতে থাকে।
এর কারণ কী?
এটা কখনো এ কারণে হতে পারে- জিনিসটি কিংবা মানুষটি পাওয়ার আগে তার দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে সে ছিল অনবহিত কিংবা বাস্তব অভিজ্ঞতা বর্জিত। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন নৈকট্যের কারণে এখন তার সকল দোষ-ত্রুটি ও অসৌন্দর্যগুলো তার কাছে প্রকাশিত, উদ্ভাসিত এবং রীতিমতো পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে।
আবার কখনো এই নিরাসক্তি আসে মানুষের প্রকৃতিগত কারণে। যেমন, মানুষ যখন বড় কোনো সংগ্রাম ও সাধনা করে তার কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি প্রাপ্ত হয়ে যায়, তখন তার প্রতি আকর্ষণও কমে যায়। মানুষ সব সময় তার আয়ত্বের বাইরের জিনিসের দিকে উৎসুক উন্মুখ হয়ে থাকে। এ কারণে কারও ক্ষেত্রে কখনো নিরবচ্ছিন্ন ভালোবাসা সম্ভব নয়।
তাহলে দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসা কীভাবে সম্ভব? এটা সম্ভব হবে মধ্যপন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে। অর্থাৎ মানুষ তার মন যেদিকে এবং যার দিকে আকর্ষিত হয়, তাকেই গ্রহণ করবে। কিন্তু এটাকে ‘ইশক কিংবা পাগল-প্রণয়’ এর দিকে নিয়ে যাবে না। বরং তার অবস্থা হবে- কিছুটা দূরত্ব। কিছুটা নৈকট্য। ভারসাম্য বজায় রাখবে। তাহলে আর পরিমাণে অধিক মিলনে বিরক্ত হবে না এবং কঠিন বিরহে কষ্টও পাবে না।
কিন্তু ‘আশেক কিংবা পাগল-প্রণয়ী’ সকল সময়ই কষ্ট পায়। বিরহে হয় ক্ষত-বিক্ষত আর মিলনে হয় স্বপ্নভঙ্গ।
যেমন কবি বলেন,
وَمَا فِي الْأَرْضِ أَشْقَى مِنْ مُحِب ... وَإِنْ وَجَدَ الْهَوَى عَذْبَ الْمَذَاقِ
فَتَسْخُن عَيْنُه عِنْدَ التَّدَانِي .... وَتَسْخُن عَيْنُه عِنْدَ الْفُرَاق
পৃথিবীতে প্রেমিকের মতো হতভাগা কেউ নন, বিরহ শেষের মিলন হলেও কষ্ট দেবে মনন। ঝরবে অশ্রু বিদায় বেলায়, আবার যখন মিলন।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মুমিনের নিয়ত তার কর্মের চেয়েও উত্তম

📄 মুমিনের নিয়ত তার কর্মের চেয়েও উত্তম


মানুষ তার উচ্চ মনোবলের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় কষ্টের মুখোমুখি হয়। কারণ, যার মনোবল উঁচু হয়, সে সবক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বিষয় অর্জন করতে চায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সময় ও শরীর তাকে সঙ্গ দেয় না। এবং উপায়- উপকরণও তার সহায় হয় না। তখন সে কষ্টে আপতিত হয়।
ঠিক একইভাবে আমাকেও অতি উচ্চ মনোবল দেওয়া হয়েছে। আমি এটা নিয়ে বড় কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করি। অবশ্য আমি এটা বলি না যে, হায়, আমার যদি উচ্চ মনোবল না থাকত! কারণ, যদিও জ্ঞানহীনতার পরিমাণ অনুযায়ী নির্বোধ মানুষের জীবন আরামদায়ক হয়ে থাকে। তবুও একজন উচ্চ মনোবলসম্পন্ন বুদ্ধিমান ব্যক্তি জ্ঞানহীনতার মাধ্যমে জীবনের নির্বিঘ্ন স্বাদ আস্বাদনের প্রত্যাশী নয়। বরং সে কষ্ট ও পরিশ্রম করতে ভালোবাসে। এতেই তার তৃপ্তি।
তাই যাকে উচ্চ মনোবল দান করা হয়েছে, তাকে তার মনোবলের উচ্চতা অনুযায়ী কষ্ট ভোগ করতে হবে। যেমনটি কবি বলেন,
وإذا كانت النفوس كبارا تعبت في مرادها الأجسام
মনোবল যখন উঁচু হয়, তখন তার উদ্দেশ্য অর্জনে দেহকে ক্লান্ত-শ্রান্ত হতে হয়।
আমি কিছু লোককে দেখেছি, তারা তাদের উচ্চ মনোবল ও উচ্চ আকাঙ্ক্ষার কথা বর্ণনা করেছে। আমি তাদের বিষয় সন্ধান করে দেখলাম- তারা শুধু একটি শাস্ত্রের মাঝেই তাদের মনোবল সীমাবদ্ধ রেখেছে এবং তারা আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের জ্ঞানের স্বল্পতাকে পরোয়া করে না।
যেমন কবি রাজি বলেন,
ولكل جسم في النحول بلية ... وبلاء جسمي من تفاوت همتي
প্রত্যেক দেহের ক্ষয় প্রাপ্তি ও রুগ্নতার বিপদ রয়েছে। আমার দেহের বিপদ হচ্ছে আমার মনোবলের বৈচিত্র্য ও একাধিক্য।
আমার হিম্মতও তাই একইসাথে একাধিক বিষয়ের সর্বোচ্চতা কামনা করে। কিন্তু তাদেরটি তেমন নয়। তাদের হিম্মতের অভীষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে হয়তো দুনিয়ার সামান্য কর্তৃত্ব অর্জন করা। যেমন, আবু মুসলিম খোরাসানি যৌবন বয়সে ঘুমোতে চাইতেন না। তখন তাকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি বললেন, স্বচ্ছ মেধা, উচ্চ মনোবল ও সর্বোচ্চ মর্যাদার আসন নিয়ে জীবনযাপনের প্রত্যাশী মন আমাকে ঘুমোতে দেয় না।
তাকে বলা হলো, কিসে আপনার এই প্রচণ্ড পিপাসা নিবারণ হবে? তিনি বললেন, রাজত্ব ও ক্ষমতা লাভের মাধ্যমে।
তাকে বলা হলো, তাহলে আপনি তার সন্ধান করুন। তিনি বললেন, ভয়-ভীতি ছাড়া তা লাভ করা যায় না।
তখন তাকে বলা হলো, তাহলে আপনি ভয়-ভীতিকে মাড়িয়ে যান। তিনি বললেন, জ্ঞান-বুদ্ধি বাধা সৃষ্টি করে।
এবার তাকে বলা হলো, তাহলে আপনি কী করতে চান? তিনি বললেন, আমি আমার জ্ঞানকে মূর্খতায় পরিণত করব এবং তার মাধ্যমে এমন বিপদ অতিক্রম করব, যা মূর্খতাছাড়া অতিক্রম করা যায় না এবং জ্ঞান ও বুদ্ধির মাধ্যমে এমন কিছু অর্জন করব, যা জ্ঞান-বুদ্ধি ছাড়া রক্ষা করা যায় না। কারণ, মানুষের অখ্যাতি তার অস্তিত্বহীনতার নামান্তর।
আমি এই বেচারার প্রতি লক্ষ করলাম, দেখতে পেলাম, সে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আখেরাতকেই ধ্বংস করে দিয়েছে। ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব লাভে তৎপর হয়েছে। সে কত হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। অবশেষে সে তার প্রত্যাশিত জীবনের কিছু সুখ-সম্ভোগ লাভ করেছে। কিন্তু সে আট বছরের বেশি সেই সুখ লাভ করতে পারেনি। তারপর তাকে অপহরণ করে হত্যা করা হলো এবং সে নিকৃষ্টতম অবস্থায় আখেরাতে পাড়ি জমাল।
আমি এই লোকটির বিষয়ে চিন্তা করে দেখলাম, তার সকল হিম্মত ও চেষ্টার একমাত্র লক্ষ্য ছিল দুনিয়া অর্জন।
এরপর আমি আমার হিম্মত ও মনোবলের প্রতি লক্ষ করলাম। দেখলাম, তা খুবই বিস্ময়কর! সেটা হচ্ছে, আমি এই পরিমাণ ইলম অর্জন করতে চাই, আমি নিশ্চিত জানি যে, সে পরিমাণ জ্ঞান আমি অর্জন করতে পারব না। কারণ, আমি বিভিন্ন শাস্ত্রের সকল জ্ঞান অর্জন করতে চাই এবং প্রত্যেক শাস্ত্রের পরিপূর্ণ ও সর্বোচ্চ জ্ঞান অর্জন করতে চাই। এটি এমন একটি বিষয়- যার কিয়দাংশ অর্জনও সম্ভব নয়। যদি আমার সামনে কোনো শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জনে উচ্চ মনোবলের কাউকে দেখি যে, সে শাস্ত্রের সর্বোচ্চ জ্ঞান অর্জন করেছে, তাহলে দেখি যে, সে অন্য শাস্ত্রে অসম্পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। তাই আমি তার মনোবলকে অসম্পূর্ণ মনে করি। যেমন, যিনি মুহাদ্দিস, তার ফিকাহ শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন হয়নি এবং যিনি ফকিহ, তার ইলমুল হাদিসের জ্ঞান অর্জন হয়নি। আমার মনে হয়- মানুষের মনোবলহীনতার কারণেই হয়তো বিভিন্ন শাস্ত্রে জ্ঞানের স্বল্পতাকে মেনে নিতে হয়।
এরপর আমি ইলম অনুযায়ী পরিপূর্ণভাবে আমল করতে চাইলাম। তাই আমি বিশর হাফির পরহেজগারী ও তাকওয়া এবং মারুফ কারখি রহ.-এর নির্মোহতা ও সাধনা অবলম্বন করতে চাইলাম। কিন্তু গ্রন্থ রচনা, লোকদের পাঠদান, তাদের সাথে মেলামেশা ও সম্পর্ক বজায় রেখে তা অবলম্বন করা অসম্ভব বিষয়। এরপর আমি মানুষদের থেকে মুখাপেক্ষীহীন হতে চাইলাম, কিন্তু তাদের দান-দক্ষিণা এর প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল। আর অন্যদের থেকে দান-দক্ষিণা গ্রহণ করাকে উচ্চ মনোবল অপছন্দ করে।
তারপর আমি সন্তান-সন্ততি লাভ করতে চাইলাম, যেমন আমি গ্রন্থাদি রচনা করতে চাই। যাতে আমার মৃত্যুর পর উভয়টি আমার স্থলাভিষিক্ত হয়। কিন্তু এগুলো অর্জন করতে হলে মনের একাকিত্ব ও নির্জনতাকে বেছে নিতে হয়।
এরপর আমি ভালো ও পছন্দনীয় জীবনোপকরণগুলো উপভোগ করতে চাইলাম। কিন্তু সম্পদের স্বল্পতা তাতে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল। অবশ্য যদি তা অর্জিতও হয়, তবুও তা মনোবলের দৃঢ়তাকে বিক্ষিপ্ত করে ফেলে। এভাবে আমি আমার দেহের জন্য উপকারী ও উপযোগী খাদ্য ও পানীয় চাই। কেননা, দেহ বিলাসিতা ও সৌন্দর্যের প্রত্যাশী। কিন্তু এখানেও বাধা হয়ে আছে সম্পদের স্বল্পতা। আর এই সবকিছু একত্র করার চেষ্টা হলো বিভিন্ন বিপরীত জিনিসের একত্রকরণের একটি ব্যর্থ চেষ্টা।
আমি তো চাই না, দুনিয়ার কোনো অর্জন আমার ধর্মীয় উদ্দেশ্যে কোনো প্রকার আঁচড় কাটুক এবং আমার ইলম ও আমলে কোনো প্রকার প্রভাব ফেলুক। কিন্তু বাস্তবতা অতি নির্মম! একটির সাথে আরেকটির যেন সাংঘর্ষিক সম্পর্ক- যেমন, আমার ইলমের মাঝে নিমগ্নতা, গ্রন্থাদি রচনায় হৃদয়ের ব্যস্ততা এবং দেহের উপযোগী ও চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য-খাবার সংগ্রহের সাথে রাতের নামাজ, পরহেজগারি ও তাকওয়া বাস্তবায়নের কষ্টকর সম্পর্ক রয়েছে। একদিকে মানুষের সাথে সাক্ষাৎ এবং তাদেরকে পাঠদান, অন্যদিকে হৃদয়ের পরি শুদ্ধির জন্য নির্জনে ছুটে যাওয়া। একদিকে মানুষের জন্য আমার দরদ, তাদেরকে উপকার করা, অন্যদিকে অধীনস্থ পরিবার-পরিজনের জন্য অপরিহার্য খোরাক সন্ধান- সবকিছু সমন্বয় করতে গিয়ে আমার পরহেজগারির এ কী দূরাবস্থা হয়ে দাঁড়ায়?
তবুও আমি আমার নিজেকে কষ্ট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। সম্ভবত নিজেকে কষ্ট দেওয়ার মাঝেই আমার আত্মার সংশোধন রয়েছে। আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তো এই যে, আমি মহান সত্তার নৈকট্য অর্জনে সহায়ক সর্বোচ্চ সকল বিষয় অর্জন করার চেষ্টা করব। কেননা, কোনো কিছুর প্রতি ব্যাকুলতা অনেক সময় উদ্দেশ্যের দিকে পথ দেখায়। আমি আমার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসকে অনর্থক নষ্ট হওয়া থেকে হেফাজত করি। আমার ইচ্ছা ও অভিলাষ যদি লক্ষ্য পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, তাহলে তো ভালো, অন্যথায় মুমিনের নিয়ত তো তার কর্মের চেয়েও উত্তম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00