📄 বিদআতের উৎস
ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে আমাদের দ্বীনের মধ্যে যে বিদআতের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, আমি একদিন তার উৎস ও কারণ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলাম। এরপর অনুধাবন করলাম, এই বিদআত অনুপ্রবেশ করেছে দু-ভাবে এবং এটা এখন দ্বীনের চেয়ে অগ্রগামী হয়ে আছে এবং মানুষজন সেগুলোর প্রতি ঝুঁকছে।
প্রথম বিষয়:
ইলম ও বিশ্বাসের মধ্যে বিদআতের প্রথম প্রবেশ ঘটেছে দর্শনের হাত ধরে। এটির কারণ হলো, আমাদের ধর্মের কিছু পণ্ডিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কোরআন ও হাদিসের প্রতি সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত ছিলেন, তারা যেন শুধু এ দুটির ওপর সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত থাকতে পারছে না। সে কারণে তারা দার্শনিকদের বিভিন্ন যুক্তি দর্শন ও মতবাদের দিকে অগ্রসর হয়েছে। যুক্তিশাস্ত্রের মধ্যে মনোনিবেশ করেছে- যা তাদেরকে খুবই তুচ্ছ ও নিম্নতম এক মতবাদের দিকে নিয়ে গেছে। এতে করে তাদের বিশ্বাস ও আকিদা হয়ে গেল নষ্ট ও বিনষ্ট। প্রবেশ করল নতুন ধরনের বিভিন্ন বিদআত।
দ্বিতীয় বিষয়:
আর আমলের ক্ষেত্রে যে বিদআতটি এলো, সেটি এলো খ্রিষ্টান রাহেবদের কৃচ্ছতাসাধনের বিশ্বাস থেকে। এ কারণে জাহেদগণ খ্রিষ্টানদের এই কৃচ্ছতাসাধনের পদ্ধতি অনুযায়ী নিজেদের বিভিন্ন কষ্টের মধ্যে ফেলতে লাগল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিদের জীবনাদর্শের দিকে তারা দৃষ্টি দিলো না। জাহেদরা শুধু দুনিয়ার নিন্দার কথাই শুনল, কিন্তু এর উদ্দেশ্য অনুধাবন করল না। সুতরাং তারা ভুল উদ্দেশ্য নিয়ে শরিয়তের ইলম থেকে বহুদূরে ছিটকে পড়ল। এভাবেই সৃষ্টি হলো আমলের মধ্যে বিদআত।
এ ক্ষেত্রে ইবলিস প্রথম যে কাজটি করল তা হলো, তাদেরকে ইলম থেকে দূরে সরিয়ে রাখার আদেশ করল। এ কারণে তারা তাদের কিতাবসমূহ দাফন করে দিলো। সেগুলো পানিতে মিশিয়ে ফেলল। এরপর নিজেদের উদ্ভাবিত পদ্ধতি অনুযায়ী ইবাদতের মধ্যে লাগিয়ে দিলো। সাধারণ লোকজন নতুন এই জিনিসে আমোদিত হয়ে উঠল। মূর্খ আবেদগুলোও আপ্লুত হলো। এভাবে তারা নিজেরাই নিজেদের নফসকে ইলাহ বা উপাস্য বানিয়ে নিল।
কিন্তু তারা যদি জানত, যখনই তারা তাদের কিতাব ও ইলম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তখনই তাদের অভ্যন্তরের প্রদীপসমূহ নিভে গেছে। এভাবে ইবলিস তার সূক্ষ্ম চাল চেলেছে।
ইলম দ্বারা পথের ভ্রান্তি চেনা যায় এবং সঠিক পথে পরিচালিত হওয়া যায়। আল্লাহ তাআলার নিকট আকুল প্রার্থনা- তিনি যেন আমাদেরকে ইলম থেকে বঞ্চিত না করেন। কারণ, ইলম হলো অন্ধকারের মধ্যে আলোর প্রদীপ, একাকিত্বের সঙ্গী এবং বিপদে পরামর্শদানকারী।
📄 অকর্মণ্য ব্যক্তিদের বিচ্যুতিগুলো
আমি সাধারণত অকেজো অকর্মণ্যদের সংশ্রব এড়িয়ে চলি। কারণ, আমি দেখেছি, অধিকাংশ মানুষ অনর্থক দেখা-সাক্ষাতে আসে। এবং তাদের এই বারবার আসাকে তারা একটা খেদমত ও সম্প্রীতি নাম দিয়ে থাকে। বসে বসে গল্প করতে থাকে। অনর্থক আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে; এমনকি গিবতও চলে আসে।
আমাদের সময়ে এই অন্যায় ও অযথা কাজটি অনেক মানুষও করছে। বরং তারা তো সব সময় একজন গল্পের লোক খুঁজতে থাকে। তার প্রতি আগ্রহ দেখায়। নতুবা একাকিত্ব বোধ করতে থাকে। বিশেষ করে অবসর সময়গুলোতে। কোনো উৎসব ও আনন্দের সময়গুলোতে। তারা তখন একে অপরের সাথে মিলিত হয়। দেখা-সাক্ষাৎ করে। আর শুধু সামান্য স্বাগত- অভিবাদন ও সালামের মধ্যেই কথাকে সংক্ষিপ্ত রাখে না। কথার ফুলঝুরি ছুটতে থাকে। সেই সাথে চলতে থাকে গিবত ও অনর্থক আলোচনা।
আমি যেহেতু জেনেছি, সময় হলো সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এবং তাকে ব্যয় করতে হবে সবচেয়ে ভালো কাজে, সে কারণে আমি তাদের সাথে এভাবে সময় নষ্ট করার কাজে যোগ দিতে পারি না। এ কারণে আমাকে তাদের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষ রাখতে হয়।
এক. আমি যদি তাদের সাথে কিছুই সময় না দিই, তাহলে সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে পড়ে, বিভিন্ন খারাপ মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়।
দুই. আবার যদি তাদের সাথে একেবারে মিশে যাই, তাহলে আমার মূল্যবান সময় বিনষ্ট হয়। সুতরাং যতদূর সম্ভব তাদের সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। আর যখন এবং যেসব ক্ষেত্রে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না, তখন এবং সেসব ক্ষেত্রে কথা খুবই সংক্ষিপ্ত করি- যাতে দ্রুতই আগন্তুক চলে যায়। এবং এমন কিছু কাজ আমি প্রস্তুত করে রাখি, যার কারণে সাক্ষাতের সময় তেমন কথা জমে ওঠে না। আমার সময়ও অনর্থক নষ্ট হয় না। সুতরাং সেই সময়গুলোতে আমি বসে বসে আমার কাগজ কাটি, কলম চাঁছি, খাতা বাঁধাই করি ইত্যাদি। কারণ, এ কাজগুলো আমাকে কখনো না কখনো করতেই হয়। এগুলো করতে তেমন চিন্তা-ফিকির ও মনোযোগের দরকার পড়ে না। তাই সাক্ষাতের সময়গুলো আমি এগুলো করার সাথে সাথে সামান্য কথাও চালিয়ে যাই আগন্তুকের সাথে-যাতে আমার সময় একেবারে নষ্ট না হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা-তিনি যেন আমাদের জীবনের মূল্যবান সময়গুলোর মর্যাদা বোঝার তাওফিক দেন এবং সেগুলোকে যথার্থভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা দেন।
অনেক মানুষকে দেখি, তারা যেন জীবনের অর্থই বোঝে না। কিছু মানুষ আছে, পারিবারিকভাবে গচ্ছিত সম্পদের কারণে উপার্জনের জন্য কর্ম করতে হয় না। সে কী করে? দিনের অধিকাংশ সময় বাজারে বসে থাকে। গল্প-গুজব করে। হাসি-মজাক করে। মানুষ দেখে। মানুষের আনাগোনা দেখে। এতে তো কত অপ্রীতিকর দৃশ্যও তার নজরে পড়ে। কেউ কেউ বসে বসে দাবা খেলে। কিংবা বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ, জিনিস-পত্রের মূল্য বৃদ্ধি-হ্রাস নিয়ে অথবা অন্যকোনো অনর্থক কথাবার্তায় সময় নষ্ট করে।
এর দ্বারাই আমি বুঝতে পারি-জীবনের মর্যাদা এবং সময়ের মূল্যায়ন করার জ্ঞান আল্লাহ তাআলা সকলকে প্রদান করেন না। যাদেরকে প্রদান করেন, তারা যথাযথভাবে এগুলো কাজে লাগায় এবং গুরুত্ব দেয়। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
(وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ)
আর এ গুণ কেবল তাদেরকেই দান করা হয়, যারা সবর করে এবং এ গুণ কেবল তাদেরকেই দান করা হয় যারা মহাভাগ্যবান।
[সুরা হা-মীম সাজদা : ৩৫]
📄 জীবনের সময়গুলোর মূল্যায়ন করো
আমি আমার সুচিন্তিত মত ও অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, মুখোমুখি শিক্ষা প্রদানের চেয়ে কিতাবের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান অনেক বেশি উপকারী। কারণ, আমি আমার এ দীর্ঘ জীবনে সীমিত সংখ্যক ছাত্রকে শিক্ষা দিতে পেরেছি, অথচ আমার লেখার মাধ্যমে অগণিত ছাত্রের নিকট পৌছুতে পেরেছি এবং অনাগত পাঠকের কথা তো হিসাব করাও সম্ভব নয়। আর এটার প্রমাণ আমরা ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছি। যেমন, আমাদের পূর্ববর্তী আলেমদের মাধ্যমে মুখোমুখি যতজন উপকৃত হয়েছে, এখন তাদের লিখিত কিতাব থেকে বহুগুণ বেশি উপকৃত হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।
সুতরাং একজন যোগ্য ও দূরদর্শী আলেমের জন্য উচিত হবে, সে যদি সুন্দরভাবে লিখতে পারে, তবে লেখার ক্ষেত্রেও তার মনোনিবেশ করা। কারণ, যারা লেখে, তাদের সকলেও তো ভালোভাবে লিখতে পারে না। সুতরাং যোগ্যতা থাকলে অবশ্যই সেটা প্রয়োগ করা উচিত।
আর এই লেখা দ্বারা নিছক কিছু বিষয় একত্র করা বা জমা করা উদ্দেশ্য নয়। এটা এমন কিছু অবর্ণনীয় বোধ ও বুদ্ধিমত্তা, আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে যাকে চান শুধু তাকেই প্রদান করেন। তার কাছেই শুধু এই রহস্য-বোধ উন্মোচন করেন। তখন সে লেখক বিচ্ছিন্ন বিষয়গুলোকে একত্র করতে সক্ষম হন। বিক্ষিপ্ত বিষয়গুলোকে বিন্যাস করতে সক্ষম হন। অথবা অবহেলা অনাদরে ফেলে রাখা বিষয়গুলোকে সামনে আনেন এবং অধরা অভাবিত বিষয়গুলো প্রকাশ করেন- মানুষরা দেখতে পান এক নতুন বিন্যাস। চিন্তা ও প্রজ্ঞার সাথে হৃদয়ের গভীরতম কথা...।
এটাই হলো উপকারী লেখা।
আর লেখার ক্ষেত্রে বেছে নিতে হবে মধ্যবয়সকে। কারণ, জীবনের প্রথম ভাগ তো অতিবাহিত হবে নিজের ইলম অর্জনের পেছনে। আর শেষভাগে যেহেতু চলে আসে শারীরিক শিথিলতা ও দুর্বলতা। কখনো কখনো আবার বয়স বাড়ার অনুপাতে জ্ঞান বুদ্ধি ও বোধের মধ্যেও শিথিলতা ও বিভ্রম চলে আসে।
আর তাকদির বা ভাগ্য সাধারণ স্বাভাবিক জীবনযাপনেরই অনুকূলে হয়ে থাকে। আর সে যেহেতু গায়েব বা নিজের ভবিষ্যৎ জানে না, তাই স্বাভাবিক জীবন-পরিমাণকে বেছে নেওয়াই উত্তম। সে হিসেবে চল্লিশ বছর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন, সংরক্ষণ, অনুধাবন ও বিশ্লেষণের মধ্যে অতিবাহিত করবে। এরপর চল্লিশ থেকে লেখালেখি ও তালিমের দিকে মনোনিবেশ করবে। নিজের জ্ঞান ও উপকরণের প্রাচুর্যে যারা চল্লিশের মধ্যে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে পারবে, তাদের জন্য এই কথা।
কিন্তু শিক্ষার উপকরণের অভাবে কিংবা প্রথম বয়সে শিক্ষার দুর্বলতার কারণে চল্লিশের মধ্যেই যাদের যোগ্যতা তৈরি হবে না, তারা লেখালেখিকে বিলম্বিত করবে পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত। এরপর পঞ্চাশ পূর্ণ হয়ে গেলে লেখালেখি এবং পাঠদানে লেগে যাবে। ষাটের পর পাঠদান, হাদিসের দরস প্রদান এবং ইলমের প্রচার-প্রসারের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেবে। নিজের রচিত বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে দেখবে। এভাবে সত্তর পর্যন্ত চালাবে। এরপর যখন সত্তর অতিক্রম করবে, তখন সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে একনিষ্ঠভাবে আখেরাতের জন্য একান্ত প্রস্তুতি নিতে থাকবে।
তার শিক্ষা প্রদান হবে সওয়াবের উদ্দেশ্যে এবং লেখালেখিও হবে দ্বীনের ঠিক প্রয়োজনীয় বিষয়ে। তাহলে এটাও তার আখেরাতের পথে যাত্রার প্রস্তুতি ও পাথেয় হিসেবেই গণ্য হবে।
নিজেকে সে সব সময় সকল প্রকার লোভ-লালসা থেকে পরিচ্ছন্ন রাখবে। নিজের অভ্যন্তরকে পরিশুদ্ধ করবে। এবং নিজের বিচ্যুতিগুলো অনুধাবন করার চেষ্টা করবে। এরপর যেভাবে সে আশা করেছিল তা যদি পূরণ না-ও হয়, তবুও তো মুমিনের নিয়তই তার কর্মের চেয়ে উত্তম। আর যদি পূরণ করতে সক্ষম হয়, তবে জীবনের প্রতিটি ধাপে তার প্রাপ্য সে তো পাবেই।
ইমাম সুফিয়ান সাওরি রহ. বলেন, যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়সে উপনীত হয়েছে, সে যেন নিজের জন্য একটা কাফন গ্রহণ করে রাখে। আলেমদের অনেকে সাতাত্তর বছর পর্যন্ত দীর্ঘায়ু লাভ করেছেন। যেমন, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.। যদি সে এই বয়সে উপনীত হয়, তাহলে তার জেনে রাখা উচিত যে, সে রয়েছে একেবারে কবরের প্রান্তে। এরপর যে দিনগুলো আসবে, তার প্রতিটি দিনই হবে উৎকৃষ্ট।
📄 মানুষের অভ্যাস এবং তাদের অধার্মিকতা
আমি ভেবে দেখেছি, মানুষ তার শরিয়তের জ্ঞানের চেয়ে নিজের অভ্যাসকেই বেশি এগিয়ে রাখে। হয়তো তারা কিছু বিষয় অপছন্দ করে কিংবা কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকে- কিন্তু এই বিরত থাকা শরিয়তের নিষেধের কারণে নয়; এটা তাদের স্বভাব ও অভ্যাসের কারণে।
এমন কত লোক রয়েছে, যাদেরকে ভালো হিসেবেই ধারণা করা হয়- ব্যবসা- বাণিজ্য করে। তাদের নিকট কোনো খারাপ বা নিম্নমানের কোনো জিনিস আসে, সেটাকেও তারা ভালোর সাথে মিশিয়ে বিক্রয় করে দেয়। এ সম্পর্কে কোনো ইমামের মত গ্রহণ করে না। বরং নিজের পক্ষ থেকেই একটি সহজ পন্থা গ্রহণ করে নেয়। এটা করে থাকে তাদের অভ্যাসের বশে; শরিয়তের বিষয়টাও জানতেও যেন তারা আগ্রহী নয়।
এমন কত মানুষকে দেখেছি, যারা খুব আগ্রহভরে নিজের ভালো লাগার নামাজগুলো পড়তে থাকে। কিন্তু অনেক ফরজ বিষয়েই সে অলসতা ও অবহেলা দেখায়।
আবার এমন অনেক ভালো মানুষকে দেখা যায়, যারা অন্যের ওপর জুলুম করে, আবার দরিদ্রদের প্রতি দানও করে। আবার কখনো জাকাত দিতে অবহেলা করে। বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও তাবিলের আশ্রয় গ্রহণ করে। আবার যখন কোনো মজলিস, মাহফিল বা ওয়াজে উপস্থিত হয়, তখন আবার কেঁদে-কেটে নিজের দু-চোখ ভাসিয়ে দেয়; যেন কিছুটা লৌকিকতা করছে। তাদের অনেকেই জানে, তার মূল সম্পদ পুরোটাই হারাম। কিন্তু অভ্যাসের কারণে এটাকে হাতছাড়া করতেও কষ্ট হয়। কেউ আবার তালাকের কসম কেটেছে এবং ভঙ্গও করেছে। স্ত্রী হয়ে গেছে তালাক। কিন্তু এখন বিচ্ছিন্ন হতে কষ্ট হয়। হারামভাবেই জীবনযাপন করে।
কখনো কখনো তো নিজে নিজেই অজ্ঞভাবে ব্যাখ্যা করে নেয়। আবার কখনো শুধু আল্লাহ তাআলার রহম ও করমের ওপর নির্ভর করে অবহেলা করে। কখনো ভবিষ্যতে তাওবার ইচ্ছা করে চলতে থাকে।
যখন সে দেখে, শরিয়ত অনুযায়ী চলতে গেলে জীবন-জীবিকা সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে। কিংবা যাদের সাথে সম্প্রীতি স্থাপন করেছে, শরিয়ত অনুযায়ী চলতে গেলে তাদের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হচ্ছে-তখন সে শরিয়তকেই পাশ কাটিয়ে যায়।
মূলকথা- মানুষের এই অভ্যাসগুলো খুবই ক্ষতিকারক এবং তার দাসত্ব করা অতি ধ্বংসাত্মক একটি ব্যাপার।
এ সম্পর্কে একটি ঘটনা বলি- একবার আমার নিকট এক বৃদ্ধলোক এলেন। বয়স আশির কাছাকাছি। তিনি তার একটি দোকান বিক্রয় করতে চাইলেন। আমি তার নিকট থেকে দোকানটি ক্রয় করে নিলাম। আমাদের চুক্তি পাকা হয়ে গেল। কিন্তু এর কিছুদিন পর বৃদ্ধ লোকটি আমার সাথে প্রতারণা করতে লাগলেন। তিনি দোকানটি অন্য একজনের নিকট বিক্রয় করে দিলেন।
আমি বললাম, ‘চলেন, বিচারকের নিকট যাই।’ তিনি অস্বীকৃতি জানালেন। কিন্তু আমিই তাকে বিচারকের নিকট নিয়ে গেলাম। কিন্তু সেখানে তিনি মিথ্যাভাবে কসম করে বললেন, ‘আমি দোকান বিক্রয় করিনি।’ আমি তাকে বললাম, এভাবে কতদিন চলছে? একজনের নিকট দোকান বিক্রয় করে আবার আরেকজনের কাছে বিক্রয় করা! আমি আমার অধিকার ছাড়ব না। এরপর তিনি একজনকে ঘুষ দিয়ে আমার ওপর জুলুম করতে লাগিয়ে দিলেন।
এর দ্বারা আমি বুঝলাম, সাধারণ মানুষ- তাদের ওপর অভ্যাসের প্রভাবই বেশি। তারা তাদের এই অভ্যাসের বিপক্ষে কোনো আলেম বা ফকিহের কথা শুনতেও রাজি নয়। বরং তারা নিজেরাই মুফতি হয়ে একেকজন একেক কথা বলতে লাগে। একজন বলল, যতই চুক্তি হোক, যেহেতু মূল্য গ্রহণ করা হয়নি, তাহলে এই বিক্রয় পূর্ণ হয় কীভাবে? আরেকজন বলল, তিনি যেহেতু আপনাকে দোকান দিতে চান না, তাহলে তার অসন্তুষ্টিতে আপনি দোকান গ্রহণ করবেন কীভাবে? আরেকজন বলল, আপনার ওপর আবশ্যক হলো, তাকে অন্যের কাছে বিক্রয়ের জন্য ছেড়ে দেওয়া। কী সব ফতোয়া!
তাদের এতসব কথার পরও আমি যখন দোকানের দাবি ছেড়ে দিলাম না, তখন সেই বৃদ্ধ এবং তার আত্মীয়স্বজন আমার সম্মান নিয়ে টানাটানি শুরু করে দিলো। তারা সুলতানের নিকট আমার নামে বিভিন্ন মন্দ-নিন্দা ও মিথ্যা দোষারোপ করতে লাগল। আমি তো তাদের এসকল কর্মকাণ্ডে একেবারে হতভম্ব। এমনকি আমাকে শায়েস্তা করার জন্য কিছু জালেমকে ঘুষ প্রদান করল। গুণ্ডারা বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করল। কিন্তু তারাও সফলকাম হলো না। আল্লাহ তাআলা আমাকে তাদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন।
বিচারের সময় আমি বিচারকের নিকট আমার দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করলাম।
কিন্তু এক প্রভাবশালী দুনিয়াদার বিচারকের নিকট গিয়ে বলল, ‘আপনি তার পক্ষে রায় দেবেন না। আপনার ক্ষতি হবে।’
এ কথায় সেই বিচারক তার নিকট সকল প্রমাণাদি থাকা সত্ত্বেও রায় প্রদান করলেন না। এবার উপরের বিচারকের নিকটা যাওয়া হলো। তিনিও তার চাকরির ভয়ে বিচার করা থেকে বিরত থাকলেন।
আমার নিকট আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেল যে, মানুষের অভ্যাসই হলো মূল প্রভাবক। আর শরিয়ত হলো তার নিকট অবহেলার বিষয়। কিন্তু তার কোনো অভ্যাস যদি শরিয়তের সাথে মিলে যায়, তবে ভালোই; কিন্তু যদি বিপরীত হয়, তখন শরিয়তকেই দূরে ছুড়ে ফেলে।
এটি মানুষজাতির অতি বিপর্যয়কর এক দিক। তুমি যদি কোনো মুসলমানকে চাবুক দিয়ে পেটাতে থাকো, তবুও রমজানের অভ্যাসগত রোজা সে ভাঙতে রাজি হবে না। অথচ তারই অভ্যাস হলো, জোর-জুলুম করে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করা।
যেই বৃদ্ধ লোকটির কথা বলছিলাম- বহুদিন আমি তাকে অতি যত্নের সাথে নামাজ আদায় করতে দেখেছি। বিভিন্ন তাসবিহ-তাহলিল করতে দেখেছি। কিন্তু তিনিই যখন কিছু বাড়তি সম্পদ ছুটে যাওয়ার ভয় করলেন, তখনই শরিয়তের বিধানকে ছুড়ে ফেলে দিতে কোনোই দ্বিধা করলেন না।
একইভাবে এই সকল বিচারককে আমি কত ইবাদত করতে দেখেছি। নামাজ পড়তে দেখেছি। ইলম অন্বেষণ করতে দেখেছি। কিন্তু যখনই তারা নেতৃত্ব ও চাকরি হারানোর ভয় করলেন, তখনই তারা দ্বীনের বিধানকে পেছনে ছুড়ে ফেললেন!
অবশেষে এই বিষয়ে আল্লাহ তাআলা আমাকে সাহায্য করলেন। একজন ন্যায়পরায়ণ বিচারক এসে প্রমাণ অনুযায়ী দোকানের সমাধান করে দিলেন। এরপর একবছর অতিবাহিত হলো। সেই বৃদ্ধ লোকটি খুবই দুরাবস্থা নিয়ে মৃত্যুবরণ করলেন।
শেষমেশ জীবনে কী থাকে! তবুও কেন আমরা এমনটা করি! আল্লাহ আমাদের শরিয়ত অনুযায়ী চলার তাওফিক দান করুন। আমাদের অভ্যাস ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।