📄 নবী সা. ও তাঁর সাহাবিদের আদর্শ গ্রহণ
সবচেয়ে নিরাপদ ও শক্তিশালী পথ হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ গ্রহণ করা এবং সে অনুযায়ী আমল করা। কারণ, এটি এমন একটি পথ- যাতে কোনো ত্রুটি নেই। যাতে কোনো ভ্রান্তি নেই। যাতে কোনো বক্রতা নেই।
অথচ অনেক মানুষ দুনিয়াবিমুখতার পথ অবলম্বন করেছে এবং এটি করতে গিয়ে তারা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। খাদ্য-খাবারের প্রতি, নিজের প্রতি এবং অন্যদের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করেছে। অবশেষে যখন শেষ বয়সে হুঁশ হয়েছে, ততদিনে তো শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। ইলম অর্জন এবং এ-জাতীয় বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ তার ছুটে গেছে।
আবার কিছু মানুষ ছুটেছে বাহ্যিক ইলমের দিকে এবং এ ক্ষেত্রেও তারা এতটাই নিমগ্ন ও বাড়াবাড়ি করেছে যে, তারা যেন এগুলোর ওপর আমল করারও সুযোগ পায়নি। শেষ সময়ে যখন হুঁশ হয়, ততদিনে সক্ষম সময়গুলো পেরিয়ে গেছে জীবন থেকে।
কিন্তু আমাদের নবীর জীবনাদর্শ হলো ইলম ও আমল- দুটোর প্রতিই এবং এর পাশাপাশি শরীরের প্রতিও যত্নবান হওয়া।
যেমন তিনি হজরত আমর ইবনুল আসকে নির্দেশ দিয়ে বলেন,
إِنَّ لِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقّاً، وَلِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقّاً।
নিশ্চয় তোমার ওপর তোমার শরীরের হক রয়েছে এবং তোমার ওপর তোমার স্ত্রীরও হক রয়েছে। ৮২
এটাই হলো মধ্যপন্থা এবং সঠিক কথা। আর শুধুই স্বেচ্ছার নির্বাসন ও কষ্ট-সাধন, সেগুলো হয়ে থাকে ইলম ও জ্ঞানের কমতির কারণে। নতুবা তার যদি ইলম থাকত, তবে তার আমলের মাধ্যমে সে আরও বেশি সওয়াব ও নৈকট্য অর্জনে সক্ষম হতো।
একজন আলেমের দৃষ্টান্ত হলো একজন পথচেনা পথিকের মতো। আর একজন মূর্খ আবেদ হলো পথ-অচেনা পথিকের মতো। মূর্খ আবেদ যদি ফজর থেকে আসর পর্যন্ত এলোমেলো চলতে থাকে আর একজন আলেম যদি আসরের কিছু পূর্বেও চলতে শুরু করে, তাহলে কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন এক জায়গায় এসে মিলিত হবে। আলেম তার পরিচিতির কারণে খুব সহজে ও দ্রুত পথ চিনে চলে আসতে পেরেছে। কিন্তু মূর্খ আবেদ তার অচেনা পথে পদে পদে বিভ্রান্ত হয়েছে, খানা-খন্দরে পড়েছে, পথ হারিয়েছে। মানুষকে জিজ্ঞাসা করেছে। এভাবে এলোমেলো ক্ষত-বিক্ষত হয়ে কোনোরকম এখানে এসে পৌঁছেছে।
এখন কেউ যদি বলে বসেন, বিষয়টি একটু স্পষ্ট করে বলুন তো!
আমি তাহলে বলব, দেখুন, ইবাদত একটি বাহ্যিকতা। এর আসল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর হুকুম মান্য করা। তার নিকট বিনয়ী হওয়া। তাকে সকল কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার একক মালিক হিসেবে স্বীকার করা। ইবাদত হলো এগুলোরই বাহ্যিক একটি প্রকাশ। কিন্তু মূর্খ আবেদ কখনো কখনো এই বাহ্যিক ইবাদতের অর্থই বোঝে না। সে ইবাদত করে; কিন্তু আল্লাহ তাআলার হুকুম এবং তার উদ্দেশ্য বোঝে না।
এ কারণে কখনো কখনো তার এই ব্যাপক ইবাদতের কারণে নিজেকে সে অনেক সম্মানিত ভাবতে থাকে। অনেক মানুষ থেকে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে থাকে। এমনকি সে তখন ভাবতে থাকে, বরকতের জন্য লোকজন এখন তার হাতে চুম্বন করার পর্যায়ে সে পৌঁছে গেছে। হাতে চুম্বনের জন্য সাগ্রহে সে হাত বাড়িয়ে দেয়।
এই সবকিছুই হয়ে থাকে ইলমের কমতির কারণে। আর আমি ‘ইলম’ বলতে বোঝাতে চাচ্ছি, মৌলিক ইলম। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ইলম। অর্থাৎ অধিক বর্ণনা, মাসআলা-মাসাইল ও মতানৈক্যের ইলমের কথা বলছি না। এগুলো প্রাসঙ্গিক ইলম।
সুতরাং একজন আলেম যখন মৌলিক ইলমগুলো অধিকহারে অধ্যয়ন করে এবং আত্মস্থ করে, তখন সে এই সাধারণ আবেদকে ছাড়িয়ে যায় তার অমায়িক চরিত্রে, আচার-আচরণে, বিনয়ে এবং অন্যদেরকে আল্লাহর পথে আহ্বানের মাধ্যমে। কিন্তু এই আবেদ ব্যক্তির জন্য এগুলোর সঠিক পন্থা অর্জন করা কঠিন। সে তো তার অজ্ঞতার আঁধারে নিমজ্জিত।
কোনো মূর্খ আবেদের ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায়, বিয়ে করেছে; কিন্তু এরপর আবার নিজেকে কৃচ্ছতাসাধনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। স্বল্প খাবার। বেশি ধ্যান। স্ত্রীর সাথে মেলামেশাও নেই। তাহলে এ অবস্থায় সে তার স্ত্রীর অধিকার বা চাহিদাগুলো আদায় করছে না, আবার তালাকও দিচ্ছে না। তাহলে স্ত্রীর চাহিদাগুলো পূরণ হবে কোথা থেকে? এ অবস্থায় ব্যক্তির অবস্থান হলো সেই মহিলার মতো, যে একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখেছিল, নিজেও তাকে খেতে দেয় না, আবার তাকে ছেড়েও দেয় না যে, বিড়ালটি নিজে নিজে খেয়ে বেড়াবে।
কিন্তু যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শের দিকে তাকাবে, সকল দিক দিয়ে তাকে একজন পূর্ণ সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখতে পাবে- তিনি সকল প্রাপককেই তার যথার্থ প্রাপ্য প্রদান করেন। তিনি কখনো হাসি-মজাক করেন। বাচ্চাদের সাথে রসিকতা করেন। কবিতা শোনেন। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের আবেদন-নিবেদন শোনেন। স্ত্রীদের সাথে সুন্দর আচরণ করেন। সক্ষমতা অনুযায়ী খাবার খান। হাদিয়া গ্রহণ করেন। সবচেয়ে সুস্বাদু জিনিসও আহার করেন- যেমন মধু। ঠান্ডা মিষ্টি পানি পান করেন। ছায়ায় বিছানা পাতা হয়- তিনি তাতে আসন গ্রহণ করেন। আদ্র তরমুজ খান। স্ত্রীকে চুমো দেন এবং তার সঙ্গে মেলামেশা করেন।
কিন্তু নবীর ইন্তেকালের পর মূর্খ সুফি ও জাহেদরা যা সৃষ্টি করেছে, তার কোনোকিছুই তাঁর থেকে পাওয়া যায় না। এরা আজ নফসের সকল চাহিদাকে সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। এভাবে শুধুই যবের শুকনো রুটি খাওয়া, শরীরের হক আদায় না করা শরীরকে নষ্ট করে দেয়। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তিই এটাকে ভালো বলবে না। শরিয়তও এটার অনুমোদন করে না। হ্যাঁ, কেউ যদি সন্দেহমূলক খাবার থেকে বেঁচে থাকে, সেটা ভিন্ন কথা। সেটা ভালো কাজ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবাদতের হক আদায় করতেন। বান্দার হক আদায় করতেন। রাত জাগরণ করতেন। নামাজ পড়তেন। জিকির-আজকার করতেন।
সুতরাং তুমিও সেই পথ ও পদ্ধতিই অবলম্বন করো, যাতে কোনো ত্রুটি নেই। যাতে কোনো বক্রতা নেই। আর এ যুগের মূর্খ জাহেদদের কথা ছুড়ে ফেলে দাও। বেশির থেকে বেশি এগুলোকে তাদের 'ওজর-অক্ষমতা' হিসেবে ধরে নাও। যদি ওজর হিসেবে ধরা না যায়, তাহলে অবশ্যই তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের বিপরীত কাজ করছে। এটা কখনোই গ্রহণীয় নয়। অনুসরণীয় তো নয়-ই।
তাদের কেউ কেউ এ ধরনের কাজের মাধ্যমে মুহাব্বত, ইশক ও ভালোবাসার দাবি করে। চিৎকার ও চিল্লা-পাল্লা করে। গায়ের জামা-কাপড় ছিঁড়ে ফেলে। এভাবে তারা শরিয়তের গণ্ডি থেকে বের হয়ে পড়ে। তারা আসলে 'মাহবুব' বা আল্লাহকেই চিনতে পারেনি। তার হুকুমও বুঝতে সক্ষম হয়নি।
এদের মধ্যে কেউ আবার নিজেকে সব সময় ক্ষুধার্ত রাখে। অব্যাহত রোজা রাখে। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে আমরকে স্পষ্টভাবে বলেছেন, صم يوماً وأفطر يوماً -একদিন রোজা রাখো, আরেক দিন পানাহার করো।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বললেন, আমি এর চেয়ে আরও শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি চাই।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এর চেয়ে আর কোনো শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি নেই।৮০
তাদের মধ্যে এমনও অনেকে আছে, যারা নির্জনতা অবলম্বন করে। তখন তারা সকল মানুষের সংশ্রব ও মেলামেশা থেকে বঞ্চিত থাকে। নিজেরাও উপকৃত হতে পারে না, আবার অন্যদেরও উপকার করতে পারে না।
কতক আছে, যারা নিজেদের কিতাবগুলো মাটিতে দাফন করে দিয়েছে। এরপর তারা শুধু নামাজ পড়ে, রোজা রাখে- অন্যান্য ইবাদতে মশগুল থাকে। কিন্তু জানতে পারে না, এভাবে কিতাবগুলো দাফন করে ফেলা কত বড় বিপর্যয়ের বিষয়। কারণ, নফস হলো অত্যাধিক গাফেল বস্তু। তাকে সর্বক্ষণ দ্বীনের কথা, আত্মশুদ্ধির কথা স্মরণ করিয়ে রাখতে হয়। আর কিতাবগুলো হলো সর্বোত্তম ও নিরাপদ স্মরণ প্রদানকারী।
ইবলিস এভাবেই তাদের মাঝে যথাসম্ভব প্রবেশ করেছে। এই কিতাব দাফন করে ফেলার ক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানের প্রদীপগুলো নিভিয়ে ফেলা; যাতে ইবাদতকারীগণ অজ্ঞতার অন্ধকারের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে থাকে। এতে বিভ্রান্ত করতে তার সহজ হয়।
প্রকৃত অর্থে এ ধরনের জাহেদগণ অনেকটা বাদুড়ের মতো। নিজেদের লুকিয়ে রাখে। মানুষদের উপকার করা থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখে। তবে এগুলোর সাথে সাথে যদি মানুষের উপকার করা থেকে বিরত না থাকে; জানায়ায় যায়, অসুস্থকে দেখতে যায়- তাদের আচরণ অবশ্য কিছুটা ভালো বলা যায়। কিন্তু প্রকৃত সাহসী ব্যক্তিরা হলেন তারাই, যারা মানুষের মধ্যে থেকে নিজেরা শিক্ষা গ্রহণ করে এবং অন্যদের শিক্ষা প্রদান করে। আর নবীগণের কার্য-পদ্ধতিও ছিল এমনটাই।
তুমি কি দেখেছ, কোনো নতুন বিষয় যখন সংঘটিত হয়, তখন একজন মূর্খ আবেদ আর একজন আলেম-ফকিহের মাঝে কেমন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়?
মূর্খ আবেদ অতি সহজেই বিভ্রান্তির মধ্যে পতিত হয়- যদি না কোনো আলেম-ফকিহের শরণাপন্ন হয়।
আল্লাহর কসম! যদি একাধারে সকল মানুষ ইলম ছাড়া শুধু ইবাদতের মধ্যে নিমগ্ন হয়ে যেত, তাহলে অনেক আগেই ইসলাম বিনষ্ট ও ধ্বংস হয়ে যেত। এ কারণে একজন আবেদ যদি ইলমের বুঝ পেত, তবে আর সে শুধু নামাজ- রোজার ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না। এগুলো ছাড়াও ইবাদতের আরও বহু ক্ষেত্র রয়েছে। যেমন, কোনো ব্যক্তি যদি অন্য কোনো মুসলমানের সাহায্যের জন্য অগ্রসর হয়, সামান্য চেষ্টা করে, এটাই তার পুরো বছরের রোজা রাখার চেয়ে উত্তম ইবাদত।
শারীরিক কোনো কাজ করতে বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো ব্যবহার করতে হয়, আর ইলম দিয়ে কাজ করতে বুদ্ধি বিবেক চিন্তা ও প্রজ্ঞার মতো অভ্যন্তরীণ উপকরণগুলো ব্যবহার করতে হয়। এ কারণেই ইলম হলো সব সময় সবকিছুর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর।
এখন তুমি যদি আমাকে বলো, তবে কি আপনি যারা খারাপ কর্ম থেকে নিজেদের বিরত রাখছে, তাদের নিন্দা করছেন এবং তাদের ইবাদতকে নাচক করে দিচ্ছেন?
উত্তরে আমি বলব, আমি কিছুতেই তাদের নিন্দা করছি না কিংবা তাদের ইবাদতকে অস্বীকারও করছি না। কিন্তু তাদের কারও ক্ষেত্রে যে সকল বাড়াবাড়ি সংঘটিত হচ্ছে, ইলমের অভাবের কারণেই এগুলো হয়েছে। তারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের ওপর এমন কষ্টের বিষয় চাপিয়ে নিয়েছে- যেগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই। এমনকি যার বৈধতাও নেই।
তাদের কেউ কেউ মনে করে, যে কাজ নফসকে কষ্ট দেয়, সার্বিকভাবে সেগুলোই শ্রেষ্ঠ। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তাদের একজন একবার গোসলখানায় প্রবেশ করে ভাবল যে, এই সময়টা তো বৃথাই বিলাসে অপচয় হয়। এ কারণে সে প্রতিজ্ঞা করে নিল, এত সংখ্যক তাসবিহ না পড়ে সে গোসলখানা থেকে বের হবে না। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে লাগল। একসময় এই ধারাবাহিকতার কারণে সে অসুস্থ হয়ে পড়ল।
এই মূর্খ লোকটি নিজের ওপর এমন কষ্ট চাপিয়ে নিয়েছিল, যার কোনো প্রয়োজন ছিল না।
আবার কিছু সুফি রয়েছে, যারা বাহ্যিক পোশাকের মধ্যে তাকওয়া ও দ্বীনদারি অন্বেষণ করে। অথচ তাদের অভ্যন্তরে এমন মুর্খতা ও অজ্ঞতা বিরাজমান- যার বর্ণনা একটি কিতাবেও কুলাবে না।
আল্লাহ এদের থেকে এই জমিন পবিত্র করুন এবং তাদের ওপর আলেমদের সাহায্য করুন। কারণ, অধিকাংশ মূর্খ ব্যক্তিই এসকল মূর্খ সুফি ও জাহেদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে থাকে। অর্থাৎ কোনো আলেম যখন এসব বিদআত ও শরিয়তহীনতার বিষয়ে কথা বলেন, প্রতিবাদ করেন, সাধারণ জনগণ তাদের সেই অসীম মূর্খতা ও অজ্ঞতাসহ আলেমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আজকাল মূর্খতার এতই প্রসার ও শক্তি!
আমি এমন অনেক আবেদকে এমন তাসবিহও পড়তে দেখি, যা মুখে উচ্চারণ করাও উচিত নয়। কিংবা নামাজে এমন কিছু করে, শরিয়তে যার কোনো বর্ণনা ও দলিল নেই।
আমার একবার কিছু আবেদের সাথে দেখা হয়। দেখলাম, কয়েকজন মিলে জামাতের সাথে জোহরের নামাজ আদায় করছে। কিন্তু ইমাম সাহেব কিরাত জোরে পড়ছেন। নামাজ শেষে আমি তাদের বললাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, صلاة النهار عجماء -অর্থাৎ দিবসের নামাজে কিরাত পড়া হবে অনুচ্চ আওয়াজে। '৮৪ অথচ তোমরা পড়ছ উচ্চ আওয়াজে! এ কেমন কথা!
এক জাহেদ আমার প্রতি রেগে উঠে বলল, এ লোকটি আমাদের আর কত দোষ-ত্রুটি ধরে বেড়াবে!
একে একে সবাই এসে তার কথার সমর্থন জোগাল। তারা বলল, আমরা কিরাত জোরে পড়ছি, যাতে আমাদের ঘুম না আসে। আমরা তো আর তোমার মতো ঘুমিয়ে রাত কাটাই না। ইবাদত করি। তাই দিবসে তন্দ্রা আসাই স্বাভাবিক।
আমি বললাম, কী আশ্চর্য ব্যাপার! রাতে তোমাদের ঘুমাতে কে নিষেধ করেছে? ইবনে আমর থেকে সহিহ হাদিসে কি বর্ণিত হয়নি যে, 'তুমি রাত জাগরণ করবে আবার ঘুমাবেও।'? আমাদের নবী সা. নিজেও রাতে ঘুমাতেন। আর সম্ভবত তার জীবনে এমন কোনো রাত অতিবাহিত হয়নি, যে রাতে তিনি ঘুমাননি!
জামে মানসুরে এমন আরেক মূর্খ আবেদের সাথে আমার দেখা। আমি দেখতাম, সে দীর্ঘক্ষণ শুধু অনর্থক হাঁটাচলা করে। আমি একদিন তাকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে বললাম, এভাবে হাঁটার কী কারণ?
লোকটি বলল, 'আমি এভাবে হাঁটি; যাতে ঘুম না আসে। ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করতে চাই না।'
এগুলোর সবই মূর্খতার প্রকাশ। ইলমের স্বল্পতার বিকার। কারণ, নফসকে যদি তার প্রাপ্য ঘুম প্রদান না করা হয়, তবে এটি আকলের মধ্যে, মস্তিষ্কের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে পড়বে। এবং ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যই তখন রহিত হবে।
আমার এক সাথি আমাকে একজন লোকের ঘটনা শুনিয়েছে। লোকটির নাম কাসির। সে তাদের সাথেই মসজিদে প্রবেশ করে। এরপর বলে, আমি আল্লাহ তাআলার সাথে একটি ওয়াদা করেছিলাম। কিন্তু ওয়াদাটা পুরা করতে পারিনি। তাই আমি আমার নিজের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করলাম যে, আমি চল্লিশ দিন কিছু খাব না।'
এরপর থেকে শুধু কিছুটা পানি পান করে থাকে। এভাবে প্রথম দশদিন মোটামুটি চলে গেল। দ্বিতীয় দশদিনে লোকটি দুর্বল হয়ে পড়ল। তৃতীয় দশদিনে আরও দুর্বল হয়ে গেল। আর দাঁড়াতে পারে না। বসে বসে নামাজ পড়ে। শরীর ভীষণ দুর্বল। কিন্তু তবুও কিছু খাবে না। চতুর্থ দশদিনে একেবারে অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। এভাবে চল্লিশ দিন পূর্ণ হওয়ার পর তাকে প্রথমে কিছু তরল জাতীয় জিনিস খেতে দেওয়া হলো। কিন্তু এটি যেন তার গলার মধ্যে ঘড়াৎ ঘড়াৎ করতে লাগল। জীবনী শক্তি শেষ হয়ে আসতে লাগল। এর কিছুক্ষণ পরই লোকটি মারা গেল।
আমি বললাম, হায় আল্লাহ!
তোমরা দেখো, মূর্খতা কোনো মূর্খকে কতটা খারাপ অবস্থার মধ্যে ফেলে দিতে পারে! বাহ্যিকভাবে এ ব্যক্তি আত্মহত্যাকারী এবং জাহান্নামী। হ্যাঁ, আল্লাহ যদি ক্ষমা করেন, সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু তার যদি ইলম থাকত কিংবা আলেমদের নিকট জিজ্ঞাসা করত, এ অবস্থায় তার কী করা উচিত, তাহলে অবশ্যই সে জানতে পারত, তার খাওয়াই উচিত ছিল। আর নিজের জন্য সে যা বেছে নিয়েছে, তা ছিল সম্পূর্ণ হারাম।
জেনে রাখা উচিত, সবচেয়ে বড় মূর্খতা হলো ইলমের ক্ষেত্রে একগুঁয়েমি- হয়তো কোনো বিষয় নিজের জানা নেই কিংবা জানার ইচ্ছাও করে না- কিন্তু নিজের মতের ওপর জিদ ধরে থাকে। এই একগুঁয়েমি মানুষের মাঝে ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয়। এরপর কারও কথার দ্বারাই সে ফিরে আসে না। আসতে চায় না। এই হলো মূর্খতার ওপর একগুঁয়েমি। এটা হলো মানুষের সবচেয়ে ক্ষতিকর অবস্থা।
ইসলামের প্রথম যুগে এগুলো ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম এসবের কিছু করেননি। তারা পানাহার করতেন। ঘুমাতেন। হ্যাঁ, তবে পূর্ণ তৃপ্তির চেয়ে একটু কম খেতেন। আবার যখন কিছু পেতেন না, তখন ধৈর্যধারণও করতেন।
সুতরাং কেউ যদি কোনো আদর্শ গ্রহণ করতে চায়, কোনো জীবনপদ্ধতি অবলম্বন করতে চায়, তবে অবশ্যই তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিদের আদর্শ গ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যেই রয়েছে নিরাপদ মুক্তি ও কাঙ্ক্ষিত সফলতা।
টিকাঃ
৮২. সূত্র: পূর্বে চলে গেছে। ৮০. ইমাম বোখারি রহ. 'কিতাবুস সওম' অধ্যায়ে এটি বর্ণনা করেছেন। ফাতহুল বারি-৪/১৯৭২। এবং ইমাম মুসলিম 'কিতাবুস সিয়াম' অধ্যায়ে এটি বর্ণনা করেছেন-২/১৮১/৮১২পৃ./১১৫৯। সহিহ মুসলিমে পুরো হাদিসটি এসেছে এভাবে-
أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ قَالَ أُخْبِرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ يَقُولُ لَأَقُومَنَّ اللَّيْلَ وَلَأَصُومَنَّ النَّهَارَ مَا عِشْتُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْتَ الَّذِي تَقُولُ ذَلِكَ فَقُلْتُ لَهُ قَدْ قُلْتُهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ
فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَإِنَّكَ لَا تَسْتَطِيعُ ذَلِكَ فَصُمْ وَأَفْطِرْ وَنَمْ وَقُمْ وَصُمْ مِنْ الشَّهْرِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فَإِنَّ الْحَسَنَةَ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا وَذَلِكَ مِثْلُ صِيَامِ الدَّهْرِ قَالَ قُلْتُ فَإِنِّي أُطِيقُ أَفْضَلَ مِنْ ذَلِكَ قَالَ صُمْ يَوْمًا وَأَفْطِرْ يَوْمَيْنِ قَالَ قُلْتُ فَإِنِّي أُطِيقُ أَفْضَلَ مِنْ ذَلِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ صُمْ يَوْمًا وَأَفْطِرْ يَوْمًا وَذَلِكَ صِيَامُ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلَامُ وَهُوَ أَعْدَلُ الصِّيَامِ قَالَ قُلْتُ فَإِنِّي أُطِيقُ أَفْضَلَ مِنْ ذَلِكَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا أَفْضَلَ مِنْ ذَلِكَ قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرِو رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا لَأَنْ أَكُونَ قَبِلْتُ الثَّلَاثَةَ الْأَيَّامَ الَّتِي قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَهْلِي وَمَالِي.
সহিহ মুসলিম: ৬/১৯৬২, পৃষ্ঠা:৪০- মা. শামেলা। ৮৪ ইমাম সুয়তি হাদিসটি তার গ্রন্থ ‘আদদুরারুল মুনতাছিরাতু’ এ উল্লেখ করেছেন-২৭৩। তবে ইমাম দারা কুতনি রহ. এবং ইমাম নববি রহ. বলেন, এটি অশুদ্ধ হাদিস। এর কোনো ভিত্তি নেই।
📄 বিদআতের উৎস
ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে আমাদের দ্বীনের মধ্যে যে বিদআতের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, আমি একদিন তার উৎস ও কারণ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলাম। এরপর অনুধাবন করলাম, এই বিদআত অনুপ্রবেশ করেছে দু-ভাবে এবং এটা এখন দ্বীনের চেয়ে অগ্রগামী হয়ে আছে এবং মানুষজন সেগুলোর প্রতি ঝুঁকছে।
প্রথম বিষয়:
ইলম ও বিশ্বাসের মধ্যে বিদআতের প্রথম প্রবেশ ঘটেছে দর্শনের হাত ধরে। এটির কারণ হলো, আমাদের ধর্মের কিছু পণ্ডিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কোরআন ও হাদিসের প্রতি সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত ছিলেন, তারা যেন শুধু এ দুটির ওপর সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত থাকতে পারছে না। সে কারণে তারা দার্শনিকদের বিভিন্ন যুক্তি দর্শন ও মতবাদের দিকে অগ্রসর হয়েছে। যুক্তিশাস্ত্রের মধ্যে মনোনিবেশ করেছে- যা তাদেরকে খুবই তুচ্ছ ও নিম্নতম এক মতবাদের দিকে নিয়ে গেছে। এতে করে তাদের বিশ্বাস ও আকিদা হয়ে গেল নষ্ট ও বিনষ্ট। প্রবেশ করল নতুন ধরনের বিভিন্ন বিদআত।
দ্বিতীয় বিষয়:
আর আমলের ক্ষেত্রে যে বিদআতটি এলো, সেটি এলো খ্রিষ্টান রাহেবদের কৃচ্ছতাসাধনের বিশ্বাস থেকে। এ কারণে জাহেদগণ খ্রিষ্টানদের এই কৃচ্ছতাসাধনের পদ্ধতি অনুযায়ী নিজেদের বিভিন্ন কষ্টের মধ্যে ফেলতে লাগল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিদের জীবনাদর্শের দিকে তারা দৃষ্টি দিলো না। জাহেদরা শুধু দুনিয়ার নিন্দার কথাই শুনল, কিন্তু এর উদ্দেশ্য অনুধাবন করল না। সুতরাং তারা ভুল উদ্দেশ্য নিয়ে শরিয়তের ইলম থেকে বহুদূরে ছিটকে পড়ল। এভাবেই সৃষ্টি হলো আমলের মধ্যে বিদআত।
এ ক্ষেত্রে ইবলিস প্রথম যে কাজটি করল তা হলো, তাদেরকে ইলম থেকে দূরে সরিয়ে রাখার আদেশ করল। এ কারণে তারা তাদের কিতাবসমূহ দাফন করে দিলো। সেগুলো পানিতে মিশিয়ে ফেলল। এরপর নিজেদের উদ্ভাবিত পদ্ধতি অনুযায়ী ইবাদতের মধ্যে লাগিয়ে দিলো। সাধারণ লোকজন নতুন এই জিনিসে আমোদিত হয়ে উঠল। মূর্খ আবেদগুলোও আপ্লুত হলো। এভাবে তারা নিজেরাই নিজেদের নফসকে ইলাহ বা উপাস্য বানিয়ে নিল।
কিন্তু তারা যদি জানত, যখনই তারা তাদের কিতাব ও ইলম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তখনই তাদের অভ্যন্তরের প্রদীপসমূহ নিভে গেছে। এভাবে ইবলিস তার সূক্ষ্ম চাল চেলেছে।
ইলম দ্বারা পথের ভ্রান্তি চেনা যায় এবং সঠিক পথে পরিচালিত হওয়া যায়। আল্লাহ তাআলার নিকট আকুল প্রার্থনা- তিনি যেন আমাদেরকে ইলম থেকে বঞ্চিত না করেন। কারণ, ইলম হলো অন্ধকারের মধ্যে আলোর প্রদীপ, একাকিত্বের সঙ্গী এবং বিপদে পরামর্শদানকারী।
📄 অকর্মণ্য ব্যক্তিদের বিচ্যুতিগুলো
আমি সাধারণত অকেজো অকর্মণ্যদের সংশ্রব এড়িয়ে চলি। কারণ, আমি দেখেছি, অধিকাংশ মানুষ অনর্থক দেখা-সাক্ষাতে আসে। এবং তাদের এই বারবার আসাকে তারা একটা খেদমত ও সম্প্রীতি নাম দিয়ে থাকে। বসে বসে গল্প করতে থাকে। অনর্থক আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে; এমনকি গিবতও চলে আসে।
আমাদের সময়ে এই অন্যায় ও অযথা কাজটি অনেক মানুষও করছে। বরং তারা তো সব সময় একজন গল্পের লোক খুঁজতে থাকে। তার প্রতি আগ্রহ দেখায়। নতুবা একাকিত্ব বোধ করতে থাকে। বিশেষ করে অবসর সময়গুলোতে। কোনো উৎসব ও আনন্দের সময়গুলোতে। তারা তখন একে অপরের সাথে মিলিত হয়। দেখা-সাক্ষাৎ করে। আর শুধু সামান্য স্বাগত- অভিবাদন ও সালামের মধ্যেই কথাকে সংক্ষিপ্ত রাখে না। কথার ফুলঝুরি ছুটতে থাকে। সেই সাথে চলতে থাকে গিবত ও অনর্থক আলোচনা।
আমি যেহেতু জেনেছি, সময় হলো সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এবং তাকে ব্যয় করতে হবে সবচেয়ে ভালো কাজে, সে কারণে আমি তাদের সাথে এভাবে সময় নষ্ট করার কাজে যোগ দিতে পারি না। এ কারণে আমাকে তাদের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষ রাখতে হয়।
এক. আমি যদি তাদের সাথে কিছুই সময় না দিই, তাহলে সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে পড়ে, বিভিন্ন খারাপ মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়।
দুই. আবার যদি তাদের সাথে একেবারে মিশে যাই, তাহলে আমার মূল্যবান সময় বিনষ্ট হয়। সুতরাং যতদূর সম্ভব তাদের সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। আর যখন এবং যেসব ক্ষেত্রে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না, তখন এবং সেসব ক্ষেত্রে কথা খুবই সংক্ষিপ্ত করি- যাতে দ্রুতই আগন্তুক চলে যায়। এবং এমন কিছু কাজ আমি প্রস্তুত করে রাখি, যার কারণে সাক্ষাতের সময় তেমন কথা জমে ওঠে না। আমার সময়ও অনর্থক নষ্ট হয় না। সুতরাং সেই সময়গুলোতে আমি বসে বসে আমার কাগজ কাটি, কলম চাঁছি, খাতা বাঁধাই করি ইত্যাদি। কারণ, এ কাজগুলো আমাকে কখনো না কখনো করতেই হয়। এগুলো করতে তেমন চিন্তা-ফিকির ও মনোযোগের দরকার পড়ে না। তাই সাক্ষাতের সময়গুলো আমি এগুলো করার সাথে সাথে সামান্য কথাও চালিয়ে যাই আগন্তুকের সাথে-যাতে আমার সময় একেবারে নষ্ট না হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা-তিনি যেন আমাদের জীবনের মূল্যবান সময়গুলোর মর্যাদা বোঝার তাওফিক দেন এবং সেগুলোকে যথার্থভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা দেন।
অনেক মানুষকে দেখি, তারা যেন জীবনের অর্থই বোঝে না। কিছু মানুষ আছে, পারিবারিকভাবে গচ্ছিত সম্পদের কারণে উপার্জনের জন্য কর্ম করতে হয় না। সে কী করে? দিনের অধিকাংশ সময় বাজারে বসে থাকে। গল্প-গুজব করে। হাসি-মজাক করে। মানুষ দেখে। মানুষের আনাগোনা দেখে। এতে তো কত অপ্রীতিকর দৃশ্যও তার নজরে পড়ে। কেউ কেউ বসে বসে দাবা খেলে। কিংবা বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ, জিনিস-পত্রের মূল্য বৃদ্ধি-হ্রাস নিয়ে অথবা অন্যকোনো অনর্থক কথাবার্তায় সময় নষ্ট করে।
এর দ্বারাই আমি বুঝতে পারি-জীবনের মর্যাদা এবং সময়ের মূল্যায়ন করার জ্ঞান আল্লাহ তাআলা সকলকে প্রদান করেন না। যাদেরকে প্রদান করেন, তারা যথাযথভাবে এগুলো কাজে লাগায় এবং গুরুত্ব দেয়। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
(وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ)
আর এ গুণ কেবল তাদেরকেই দান করা হয়, যারা সবর করে এবং এ গুণ কেবল তাদেরকেই দান করা হয় যারা মহাভাগ্যবান।
[সুরা হা-মীম সাজদা : ৩৫]
📄 জীবনের সময়গুলোর মূল্যায়ন করো
আমি আমার সুচিন্তিত মত ও অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, মুখোমুখি শিক্ষা প্রদানের চেয়ে কিতাবের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান অনেক বেশি উপকারী। কারণ, আমি আমার এ দীর্ঘ জীবনে সীমিত সংখ্যক ছাত্রকে শিক্ষা দিতে পেরেছি, অথচ আমার লেখার মাধ্যমে অগণিত ছাত্রের নিকট পৌছুতে পেরেছি এবং অনাগত পাঠকের কথা তো হিসাব করাও সম্ভব নয়। আর এটার প্রমাণ আমরা ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছি। যেমন, আমাদের পূর্ববর্তী আলেমদের মাধ্যমে মুখোমুখি যতজন উপকৃত হয়েছে, এখন তাদের লিখিত কিতাব থেকে বহুগুণ বেশি উপকৃত হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।
সুতরাং একজন যোগ্য ও দূরদর্শী আলেমের জন্য উচিত হবে, সে যদি সুন্দরভাবে লিখতে পারে, তবে লেখার ক্ষেত্রেও তার মনোনিবেশ করা। কারণ, যারা লেখে, তাদের সকলেও তো ভালোভাবে লিখতে পারে না। সুতরাং যোগ্যতা থাকলে অবশ্যই সেটা প্রয়োগ করা উচিত।
আর এই লেখা দ্বারা নিছক কিছু বিষয় একত্র করা বা জমা করা উদ্দেশ্য নয়। এটা এমন কিছু অবর্ণনীয় বোধ ও বুদ্ধিমত্তা, আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে যাকে চান শুধু তাকেই প্রদান করেন। তার কাছেই শুধু এই রহস্য-বোধ উন্মোচন করেন। তখন সে লেখক বিচ্ছিন্ন বিষয়গুলোকে একত্র করতে সক্ষম হন। বিক্ষিপ্ত বিষয়গুলোকে বিন্যাস করতে সক্ষম হন। অথবা অবহেলা অনাদরে ফেলে রাখা বিষয়গুলোকে সামনে আনেন এবং অধরা অভাবিত বিষয়গুলো প্রকাশ করেন- মানুষরা দেখতে পান এক নতুন বিন্যাস। চিন্তা ও প্রজ্ঞার সাথে হৃদয়ের গভীরতম কথা...।
এটাই হলো উপকারী লেখা।
আর লেখার ক্ষেত্রে বেছে নিতে হবে মধ্যবয়সকে। কারণ, জীবনের প্রথম ভাগ তো অতিবাহিত হবে নিজের ইলম অর্জনের পেছনে। আর শেষভাগে যেহেতু চলে আসে শারীরিক শিথিলতা ও দুর্বলতা। কখনো কখনো আবার বয়স বাড়ার অনুপাতে জ্ঞান বুদ্ধি ও বোধের মধ্যেও শিথিলতা ও বিভ্রম চলে আসে।
আর তাকদির বা ভাগ্য সাধারণ স্বাভাবিক জীবনযাপনেরই অনুকূলে হয়ে থাকে। আর সে যেহেতু গায়েব বা নিজের ভবিষ্যৎ জানে না, তাই স্বাভাবিক জীবন-পরিমাণকে বেছে নেওয়াই উত্তম। সে হিসেবে চল্লিশ বছর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন, সংরক্ষণ, অনুধাবন ও বিশ্লেষণের মধ্যে অতিবাহিত করবে। এরপর চল্লিশ থেকে লেখালেখি ও তালিমের দিকে মনোনিবেশ করবে। নিজের জ্ঞান ও উপকরণের প্রাচুর্যে যারা চল্লিশের মধ্যে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে পারবে, তাদের জন্য এই কথা।
কিন্তু শিক্ষার উপকরণের অভাবে কিংবা প্রথম বয়সে শিক্ষার দুর্বলতার কারণে চল্লিশের মধ্যেই যাদের যোগ্যতা তৈরি হবে না, তারা লেখালেখিকে বিলম্বিত করবে পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত। এরপর পঞ্চাশ পূর্ণ হয়ে গেলে লেখালেখি এবং পাঠদানে লেগে যাবে। ষাটের পর পাঠদান, হাদিসের দরস প্রদান এবং ইলমের প্রচার-প্রসারের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেবে। নিজের রচিত বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে দেখবে। এভাবে সত্তর পর্যন্ত চালাবে। এরপর যখন সত্তর অতিক্রম করবে, তখন সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে একনিষ্ঠভাবে আখেরাতের জন্য একান্ত প্রস্তুতি নিতে থাকবে।
তার শিক্ষা প্রদান হবে সওয়াবের উদ্দেশ্যে এবং লেখালেখিও হবে দ্বীনের ঠিক প্রয়োজনীয় বিষয়ে। তাহলে এটাও তার আখেরাতের পথে যাত্রার প্রস্তুতি ও পাথেয় হিসেবেই গণ্য হবে।
নিজেকে সে সব সময় সকল প্রকার লোভ-লালসা থেকে পরিচ্ছন্ন রাখবে। নিজের অভ্যন্তরকে পরিশুদ্ধ করবে। এবং নিজের বিচ্যুতিগুলো অনুধাবন করার চেষ্টা করবে। এরপর যেভাবে সে আশা করেছিল তা যদি পূরণ না-ও হয়, তবুও তো মুমিনের নিয়তই তার কর্মের চেয়ে উত্তম। আর যদি পূরণ করতে সক্ষম হয়, তবে জীবনের প্রতিটি ধাপে তার প্রাপ্য সে তো পাবেই।
ইমাম সুফিয়ান সাওরি রহ. বলেন, যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়সে উপনীত হয়েছে, সে যেন নিজের জন্য একটা কাফন গ্রহণ করে রাখে। আলেমদের অনেকে সাতাত্তর বছর পর্যন্ত দীর্ঘায়ু লাভ করেছেন। যেমন, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.। যদি সে এই বয়সে উপনীত হয়, তাহলে তার জেনে রাখা উচিত যে, সে রয়েছে একেবারে কবরের প্রান্তে। এরপর যে দিনগুলো আসবে, তার প্রতিটি দিনই হবে উৎকৃষ্ট।