📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ধৈর্যের প্রতিফল

📄 ধৈর্যের প্রতিফল


আমি একদিন সুরা ইউসুফ তেলাওয়াত করছিলাম। পড়তে পড়তে হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ধৈর্যের প্রশংসা নিয়ে আমি আশ্চর্য বোধ করতে থাকি। তিনি যা থেকে বিরত থেকেছেন, সেটা এখন মানুষের বর্ণনা এবং তার মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আমি বিষয়টার রহস্য নিয়ে চিন্তা করলাম-তিনি কেন এত মর্যাদাশীল ও মানুষের জন্য এমন উত্তম চরিত্রের উদাহরণ হয়ে উঠলেন? আমার কাছে বিষয়টা প্রতিভাত হলো-এগুলোর কারণ হলো তাঁর অবৈধ আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা।
আমি মনে মনে বললাম, কী আশ্চর্য কাণ্ড! তিনি যদি তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে অবৈধ আবেগের ডাকে সাড়া দিতেন, তাহলে আজ তার কোথায় স্থান হতো? কিন্তু তিনি যখন প্রবৃত্তির বিরোধিতা করলেন, তখন এটিই হয়ে উঠল তার মহান এক গুণ। আজ তার ধৈর্যের ঘটনা দিয়ে মানুষের জন্য উদাহরণ পেশ করা হয়। সকল মানুষের উপর তাঁর এই ধৈর্য ও কষ্টস্বীকার একটি গর্বের বিষয় হিসেবে পরিগণিত হয়।
এই সকল কিছু হতে পেরেছে মাত্র কয়েক মুহূর্তের ধৈর্যের কারণে। কত স্বল্প সময়ের ব্যাপার ছিল এটা! মুহূর্তের এই ধৈর্যধারণই হয়ে গেল তার সারাজীবনের বিশাল সম্মান ও মর্যাদার বিষয়। আর তিনি হয়ে উঠলেন অনাগত সকল মানুষের জন্য চারিত্রিক পবিত্রতার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত!
সুতরাং হে সেই ব্যক্তি, যার কিছুটা সম্মান মর্যাদা ও গর্ব করার বিষয় আছে, নিজের এ ধরনের আবেগঘন মুহূর্তে ধৈর্যের পরিচয় দিয়ো। নিরাপদ নিরালায় নিজের প্রিয়তম কিংবা প্রিয়তমা- অথবা কোনো প্রিয়বস্তুর ক্ষেত্রে ধৈর্যহারা হয়ে যেয়ো না।
মুহূর্তের ধৈর্য কিংবা অধৈর্য তোমার পরবর্তী জীবনকে আমূল পাল্টে দিতে পারে!
সুতরাং যারা বুদ্ধিমান, তারা দুটো বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। বিষয় দুটো হলো, সাময়িক মিষ্টতা ও স্থায়ী তিক্ততা এবং সাময়িক তিক্ততা ও স্থায়ী মিষ্টতা।
দুনিয়ার মিষ্টতা কিংবা তিক্ততা- দুটোই সাময়িক। আর আখেরাতের মিষ্টতা কিংবা তিক্ততা- দুটোই স্থায়ী। সুতরাং বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনোই সাময়িক মিষ্টতার বিনিময়ে স্থায়ী তিক্ততা গ্রহণ করতে চাইবে না।
সুতরাং যে ব্যক্তি তার হিসাবের খাতা গোনাহ থেকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণে নিজেকে ঝুঁকিয়ে না দেবে- সে তার জীবনের প্রতিটি ধৈর্যের ক্ষেত্রে বহুগুণ লাভ ও অর্জন দেখতে পাবে। আর প্রতিটি প্রবৃত্তির অনুসরণে দেখতে পাবে অনুশোচনার বিষয়।
এ বিষয়ে যতটুকু আলোচনা করা হলো, প্রবৃত্তির অবৈধ অনুসরণ থেকে বেঁচে থাকার জন্য বুঝমানদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সংযত ব্যক্তির সান্নিধ্য

📄 সংযত ব্যক্তির সান্নিধ্য


আমি অনেক দিনের অভিজ্ঞতায় একটি জিনিস বুঝেছি- ফিকহের অব্যাহত চর্চা এবং বিচার-বিশ্লেষণের জন্য বিভিন্ন হাদিস শ্রবণ, এগুলো অন্তরের সংশোধনে যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন অন্তরকে রেকাকের [যে সকল আয়াত ও হাদিসের মাধ্যমে অন্তর ভীত হয়, বিগলিত হয়, নরম হয়, আখেরাতের প্রতি ধাবিত হয়- এমন আয়াত ও হাদিসসমূহ] সাথে সংমিশ্রণ করা এবং সালাফে সালেহিনের জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করা। কারণ, তারা কোরআন ও হাদিসের মৌলিক উদ্দেশ্য ও খাজানা প্রাপ্ত হয়েছেন এবং এগুলোতে আদেশপ্রাপ্ত বিষয়ে আমলের বাহ্যিকতা থেকে বের হয়ে তার প্রকৃত অর্থের মিষ্টতা ও উদ্দেশ্য চেখে দেখেছেন; অথচ কখনো শরিয়তের বাইরে যাননি।
আমি তোমাকে যে কথাগুলো বলছি, এটা আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষ দর্শনের মাধ্যমেই বলছি। আমি অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও হাদিস শিক্ষার্থীদের দেখেছি- তারা সর্বদা হাদিস সংগ্রহ ও বিন্যাস-বিশ্লেষণ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আর অধিকাংশ ফিকাহবিদ বিভিন্ন মাসআলা এবং সেগুলো নিয়ে হরেক রকম তর্ক-বিতর্ক নিয়ে মশগুল থাকে।
এই সকল বিষয়ের সাথে ব্যস্ত থেকে হৃদয়ের কোমলতা ও বিগলন আসবে কীভাবে?
কিন্তু আমাদের সালাফে সালেহিন কোরআন-হাদিসের নস দ্বারা সার্বিকভাবে কোনো দিকে চিন্তা না করে শুধু তার অর্থ, উদ্দেশ্য ও হিদায়েতের দিকে লক্ষ করতেন। এগুলো একত্র করা, বিন্যাস করা, বিশ্লেষণ করা, তর্ক-বিতর্ক করা, নিজের মতের পক্ষে দলিল-প্রমাণ অন্বেষণ করা- এসবের দিকে তারা মন দিতেন না এবং এগুলো এভাবে লোকদের নিকট পৌঁছে দেওয়ার নিয়তও করতেন না। বরং এগুলো তারা তাদের জীবনে আমলে পরিণত করেছেন। তারা শুধু হিদায়েতকে খুঁজেছেন।
প্রথমে কোরআন ও হাদিসের এই বিষয়টা অনুধাবন করো। এরপর তার সাথে চর্চা করো ফিকাহ। এবং চর্চা করো সালাফে সালেহিনের জীবনী, দুনিয়াবিমুখ আবেদ ও জাহেদদের জীবন- যাতে এগুলো তোমার অন্তরের নম্রতা সৃষ্টির মাধ্যম হয়।
এ কারণে আমি আমাদের প্রসিদ্ধ শাইখদের জীবনী- তাদের ঘটনাবলি, আদব, আখলাক ও জীবনাচারগুলো নিয়ে আলাদা আলাদা স্বতন্ত্র কিতাব রচনা করেছি। যেমন, হজরত হাসান বসরি, হজরত সুফিয়ান সাওরি, হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম, হজরত বিশর হাফি, হজরত আহমদ ইবনে হাম্বল, হজরত মারুফ কারখি রহিমাহুমুল্লাহসহ আরও অনেক আলেম ও জাহেদদের।
স্মরণ রাখা দরকার, ইলমের কমতির সাথে কখনো আমল বিশুদ্ধ হতে পারে না। তখন অবস্থা হবে এমন যে, একজন আগে টানবে- অন্যজন টানবে পেছনে- এর মাঝখানে বেচারার আত্মার অবস্থা হবে কাহিল। জীবনভর এই অগ্র ও পশ্চাতে টানাটানি চলতেই থাকবে, কিছুটা সামনে আবার কিছুটা পেছনে- এভাবে কখনো কাঙ্ক্ষিত মানজিলে পৌঁছা সম্ভব হবে না। তাই প্রথমে ইলমে পরিপক্কতা অর্জন করা একান্ত জরুরি।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 তাকওয়াই সবচেয়ে উত্তম পথ

📄 তাকওয়াই সবচেয়ে উত্তম পথ


আমি একবার এমন একটি বিষয়ে শিথিলতা গ্রহণ করলাম- যা অন্য মাজহাব অনুযায়ী জায়েয ছিল। এরপর আমি আমার অন্তরের মধ্যে এক ধরনের অন্ধকার অনুভব করতে লাগলাম। আমি যেন স্রষ্টার দরবার হতে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা বোধ করতে লাগলাম। অন্ধকারের ওপর অন্ধকার যেন আমার অন্তর ছেয়ে ফেলতে লাগল।
আমার অন্তর বলে বসল, এটা কী শুরু হলো? আমি ফিকাহবিদদের মতের বাইরে তো কিছু করিনি- তাহলে এমন হচ্ছে কেন?
আমি তাকে বললাম, হে দুষ্ট নফস, তোমার এই প্রশ্নের উত্তর দু-ভাবে প্রদান করা যায়।
এক. তুমি নিজের জন্য এমন ব্যাখ্যা বেছে নিয়েছ, যা তুমি নিজেই বিশ্বাস করো না। তোমার নিকট কেউ যদি ফতোয়া জিজ্ঞাসা করত, তাহলে তুমি যা করেছ, তার বিপরীত ফতোয়াই তুমি দিতে।
নফস বলল, আমি যদি এটার জায়েযের বিষয় বিশ্বাস না করতাম, তবে তো আমি এটা করতামই না।
আমি বললাম, তাহলে অবশ্যই তোমার এই বিশ্বাসের ফতোয়া অন্যকে সন্তুষ্ট করত না। এটা তোমার নিজস্ব মত।
দুই. তুমি যে এই কাজটি করার পর তোমার অন্তরের মধ্যে অন্ধকার অনুভব করছ, এ জন্য তোমার খুশি হওয়া উচিত। কারণ, তোমার অন্তরের মধ্যে যদি আলো না থাকত, তাহলে তুমি এই অন্ধকার অনুভব করতে পারতে না।
নফস বলল, কিন্তু নতুন এই অন্ধকারের মাধ্যমে অন্তরের মধ্যে আমি তো স্রষ্টার ভালোবাসা ও নৈকট্য থেকে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করছি।
আমি বললাম, তাহলে এবার এ ধরনের কাজ আর না করার ওপর দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হও এবং বুঝে নাও, তুমি যা বর্জন করেছ, সেটাই ছিল সর্বসম্মতিক্রমে জায়েয। এবং এটা বর্জন করাকে তাকওয়া হিসেবে গণ্য করো। এবার নফস আমার কথা মেনে নিল।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 কারও সাথে শত্রুতা না যাওয়া

📄 কারও সাথে শত্রুতা না যাওয়া


জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমি যেটা বুঝেছি তা হলো, পারতপক্ষে কখনো কারও সাথে শত্রুতা সৃষ্টি করা উচিত নয়। কারণ, ব্যক্তি ও তার সামাজিক অবস্থান যেমনই হোক, হতে পারে তার নিকট কোনো ক্ষেত্রে নিজের প্রয়োজন পড়তে পারে। মানুষের কখনো কখনো এমনও হয়- যার ব্যাপারে কোনো সময় ধারণাই করা হয়নি- জীবনে তার সাহায্য কোনোদিন প্রয়োজন হবে, অথচ তার সাহায্যই একসময় প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। হয়তো কখনো তার দিকে কোনোদিন তাকিয়েও দেখা হয়নি কিংবা ভ্রুক্ষেপও করা হয়নি- এমন কত সামান্য ক্ষুদ্র মানুষের কাছেও কখনো প্রয়োজন পড়ে যায় মানুষের।
এমনকি কখনো তার থেকে কোনো উপকার প্রাপ্তির প্রয়োজন না হলেও, তার ক্ষতি থেকে বাঁচার প্রয়োজন হয়। আমার এই দীর্ঘ জীবনে এমন অনেক মানুষের উপকারের প্রয়োজন পড়েছে, অথচ কোনোদিন মনের কোণে সামান্যতম ধারণাও জাগেনি যে, তার উপকার আমার প্রয়োজন হতে পারে কিংবা তার সহানুভূতি আমার দরকার হতে পারে।
জেনে রেখো, অনর্থক শত্রুতা সৃষ্টি কখনো এমন দিক থেকে ক্ষতি ডেকে আনে, যা কল্পনাও করা যায় না। কারণ, শত্রুতার প্রকাশ তরবারির একটি আঘাতের মতো, যা করে ফেললে বিপরীত আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। কখনো কখনো এই আঘাত আসে খুবই গোপন জায়গা থেকে; নিজের অলক্ষ্যে।
সুতরাং যে ব্যক্তি দুনিয়াতে সুন্দরভাবে বসবাস করার ইচ্ছা রাখে, তার জন্য কখনো কারও সাথে শত্রুতার প্রকাশ না ঘটানোর চেষ্টা করা উচিত। কারণ, এই পৃথিবীতে একজন আরেকজনের নিকট প্রয়োজন পড়াটা খুবই স্বাভাবিক এবং সেই সাথে একজন আরেকজনের ক্ষতি করার বিষয়টিও সাধারণ।
শত্রুতার বহিঃপ্রকাশ না করা- এটি এমন এক বিষয়- মানুষের জীবনে যত দিন যাবে, যত অভিজ্ঞতা বাড়বে, এর উপকারিতা সে ততই বুঝতে শিখবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00