📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 অভাবগ্রস্তকে সংশোধন করা

📄 অভাবগ্রস্তকে সংশোধন করা


কোনো আলেমের নিয়ত যদি বিশুদ্ধ থাকে, তবে তিনি লৌকিকতার কষ্ট থেকে মুক্ত থাকেন। কারণ, অনেক আলেম আছে, তারা যেন কিছুতেই ‘আমি জানি না’ কথাটা বলতে চান না। তাই নিশ্চিত উত্তর না জানা সত্ত্বেও তারা মানুষদের বিভিন্ন ফতোয়া প্রদান করে। এতে করে তারা মানুষদের নিকট নিজেদের সম্মান রক্ষা করেন; যেন মানুষরা বলতে না পারে- অমুক আলেম উত্তর জানে না।
এটা একটি সীমাহীন খিয়ানত ও লাঞ্ছনার বিষয়।
হজরত মালেক ইবনে আনাস রহ.-এর ক্ষেত্রে বর্ণিত আছে-একবার একলোক তাকে একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করল। মালেক বিন আনাস রহ. বললেন, আমি এটা জানি না।
লোকটি বলল, আমি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আপনার নিকট এসেছি মাসআলাটি জানার জন্য- আর আপনি বলছেন, জানেন না। আমি ফিরে গিয়ে আমাদের লোকদের কী বলব?
মালেক বিন আনাস রহ. বললেন, তুমি তোমার দেশে গিয়ে বলো, আমি মালেককে একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করেছিলাম। উত্তরে তিনি বললেন, আমি জানি না।
তুমি এই মহান ব্যক্তিত্বের দ্বীন ও বিবেচনাবোধের দিকে লক্ষ করো- কী চমৎকারভাবে তিনি সকল লৌকিকতা ও লোকদেখানো কষ্ট থেকে নিজেকে মুক্ত রাখলেন। আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখলেন।
একজন আলেম আল্লাহর দিকে চেয়ে ফতোয়া দেবেন। মানুষদের সম্মান ও বাহবা প্রাপ্তির জন্য নয়। কিন্তু যদি এমনটি করা হয়, তাহলে আলেমদের অন্তর নিয়ন্ত্রণ করবে মানুষদের ইচ্ছা, মানুষদের বাসনা। মানুষ যেভাবে কামনা করবে, লোভী আলেম ঠিক সেভাবেই চলবে এবং বলবে!
আল্লাহর কসম, আমি এমন অনেককে দেখেছি, যারা অনেক নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, চুপচাপ থাকে। পোশাকে-আচরণে বিনয়ী ভাব প্রকাশ করে; কিন্তু মানুষের অন্তর তবুও তার দিকে আকর্ষণবোধ করে না। মানুষের অন্তরে তার প্রতি তেমন একটা সম্মানবোধ জাগ্রত হয় না।
আবার এমন অনেক মানুষকে দেখেছি, যারা পরিপাট্য অভিজাত পোশাক পরিধান করে, খুব বেশি বিনয়ী ভাব প্রকাশ করে না। আবার খুব বেশি নফল ইবাদত করে- এমনও না। কিন্তু মানুষের অন্তরসমূহ তার ভালোবাসায় পাগলপারা। তার জন্যে সবার অন্তরে একটি অন্য ধরনের সম্মানবোধে স্থান দখল করে রাখে।
আমি এই পার্থক্যের কারণ সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করলাম। আমি একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় অনুধাবন করলাম। যেমন হজরত আনাস ইবনে মালেক রহ. সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়- তিনি খুব বেশি নফল নামাজ পড়তেন না বা খুব বেশি নফল রোজা রাখতেন না। কিন্তু তার অভ্যন্তরীণ আমল ছিল অতি শক্তিশালী। তাতে কোনো লৌকিকতা ও শিরকের মিশ্রণ ছিল না।
এভাবে যে ব্যক্তি তার গোপনীয় আমলকে বিশুদ্ধ করে নেয়, তার শ্রেষ্ঠত্বের সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অন্তরসমূহ তার ছড়ানো সুভাসে সুভাসিত হয়ে ওঠে।
আল্লাহর দোহাই! নিজেদের অভ্যন্তরকে বিশুদ্ধ করে নাও। বাহ্যিক যতই চাকচিক্যময় ও উজ্জ্বল হোক- অভ্যন্তর যদি সঠিক না হয়, তবে এগুলো কোনোই কাজে আসবে না।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 দুআ কবুল না হওয়ার কারণসমূহ

📄 দুআ কবুল না হওয়ার কারণসমূহ


আমি একবার একটি কঠিন বিষয়ে আপতিত হই। আমি এর থেকে মুক্তি ও নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য অনেক দুআ করতে থাকি। কিন্তু তা কবুলে বিলম্ব হয়। নফস এতে অধৈর্য ও অস্থির হয়ে উঠতে থাকে।
আমি নফসকে ধমক দিয়ে বলে উঠলাম, তোমার ধ্বংস হোক, তুমি কি তোমার নিজের বিষয়টি একটুও চিন্তা করে দেখেছ? তুমি তার বান্দা নাকি স্বাধীন মালিক? তুমিই কি পরিচালক না তার দ্বারা পরিচালিত?
তুমি কি জানো না, পৃথিবী হলো পরীক্ষা ও কষ্টের স্থান? যখন তুমি তোমার বাসনার কথা প্রার্থনা করো এবং এরপর তোমার কামনামতো যখন সবকিছু প্রদান করা না হয়, তখন যদি তুমি ধৈর্যধারণ না করো, তবে আর তোমার পরীক্ষার বিষয় থাকল কোথায়? তোমার দাসত্ব ও আনুগত্য থাকল কোথায়? তোমার ইচ্ছা ও কামনার বিপরীত হওয়াটাই তো তোমার পরীক্ষা!
সুতরাং 'তাকলিফ'-এর অর্থ বোঝার চেষ্টা করো। আজ ভারি জিনিস তোমার নিকট হালকা হয়েছে। আর কঠিন জিনিসও তোমার নিকট সহজ হয়েছে। এভাবে আমি যা বললাম, তা নিয়ে নফস যখন চিন্তা-ভাবনা করল, তখন সে কিছুটা চুপ হলো।
এরপর তাকে বললাম, দুআ কবুল না হওয়ার ওপর আমার নিকট আরও অনেক যুক্তি রয়েছে। আর তা হলো—এটা তুমি তোমার নিজের কামনা-বাসনা দিয়ে পাওয়ার ইচ্ছা করছ। অথচ তোমার নিজেকে প্রভুর ইচ্ছার সাথে আবশ্যক করে দিয়ে তা পেতে চাচ্ছ না। এটা তো স্পষ্ট মূর্খতা। বরং বিষয়টি হওয়ার প্রয়োজন ছিল এর উল্টো। কারণ, তুমি হলে তার বান্দা বা দাস। আর একজন বুদ্ধিমান বান্দা সর্বক্ষণ মালিকের ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য তৎপর থাকবে এবং সে জেনে রাখবে, মালিকের জন্য বান্দার সকল কামনা-বাসনা পূরণ করা আবশ্যক নয়।
আমার এ কথায় নফস আগের চেয়ে আরও কিছুটা নরম হলো।
এরপর আবার বললাম, আমার নিকট আরও যুক্তি আছে। আর তা হলো, তুমি নিজেই এই দুআ কবুল হওয়াকে বিলম্বিত করেছ। গোনাহের মাধ্যমে দুআ কবুলের দরজা তুমি নিজেই বন্ধ করে দিয়েছ। তুমি যদি এর দরজা খুলে রাখতে, তবে অনেক দ্রুতই দুআ কবুল হতো। তুমি কি জানো না, শান্তি ও স্বস্তির মাধ্যম হলো তাকওয়ার পথে চলা? যেমন, আল্লাহ তাআলা কোরআনে ইরশাদ করেন-
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ( যে-কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে উত্তরণের কোনো পথ তৈরি করে দেবেন। এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দান করবেন, যা তার ধারণার বাইরে। [সুরা তালাক: ২-৩]
এবং অন্য আয়াতে বলেন,
(وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا)
যে-কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার কাজ সহজে সমাধান করে দেন। [সুরা তালাক: ৪]
নফসকে বললাম, এবার কি বুঝতে পারছ- তোমার উল্টে যাওয়ার কারণে বিষয়টিও উল্টে গেছে? উদাসীনতার অচেতনতা কতটাই না শক্তিশালী হয়ে পড়েছে, তাই আজ শ্যামল বাগানে পানির উৎসমুখ বন্ধ হয়ে গেছে।
এ কথায় নফস বুঝতে পারে- হ্যাঁ, এটাই সত্য। সে বিষয়টা পুরোপুরি মেনে নেয়।
এরপরও আমি তাকে বললাম, দুআ কবুল না হওয়ার ক্ষেত্রে আমার নিকট চতুর্থ আরেকটি যুক্তি আছে। সেটা হলো- তুমি যা কামনা করছ, তার পরিণাম তুমি জানো না। এমনও হতে পারে- এর পরিণাম তোমার জন্য ক্ষতিকর হবে। যেমন, কোনো অবুঝ শিশু এমন খাদ্য কামনা করে, যা আসলে তার জন্য ক্ষতিকর। সুতরাং যারা বুঝমান অভিভাবক, তারা বাচ্চার শত আবদার সত্ত্বেও সে খাবার তাকে প্রদান করে না। যেহেতু এটা পরিণামে ক্ষতিকর। ধ্বংসাত্মক। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
(وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ )
এটা তো খুবই সম্ভব যে, তোমরা একটা জিনিসকে মন্দ মনে করো, অথচ তোমাদের পক্ষে তা মঙ্গলজনক। আর এটাও সম্ভব যে, তোমরা একটা জিনিসকে পছন্দ করো, অথচ তোমাদের পক্ষে তা মন্দ। আর (প্রকৃত বিষয় তো) আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জানো না। [সুরা বাকারা: ২১৬]
এই উত্তরগুলোর মাধ্যমে নফসের নিকট যখন সঠিক বিষয়টি প্রকাশিত হয়ে গেল, তখন সে পুরোপুরি তৃপ্ত হয়ে গেল।
এরপর আমি তাকে আরও বললাম, আমার নিকট আরও উত্তর আছে। সেটা হলো, তোমার এই কাঙ্ক্ষিত বিষয় প্রদত্ত হলে তোমার প্রতিদান তো আরও কম হবে। তোমার মর্যাদার আরও অবনতি হবে। কিন্তু এটার পরিবর্তে আল্লাহ যখন নিজে তোমাকে কিছু দেবেন, সেটা তিনি তার পছন্দমতোই দেবেন। সেটা কত মর্যাদাকর হবে, একবার ভেবে দেখেছ! আর তাছাড়া এটা যদি তোমার দ্বীনের জন্য হয়, তাতেও তো আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারে প্রদান করাটাই তোমার জন্য কল্যাণকর।
আর এতক্ষণ আমি তোমাকে যা বোঝালাম, সেগুলো যদি তুমি বোঝো, তবে তোমার জন্যই কল্যাণকর।
তখন নফস আমাকে বলল, আমি এতক্ষণ তোমার বর্ণনার সুরভিত বাগানে বিচরণ করলাম। তুমি যদি বুঝে থাকো, তাহলে আমিও বুঝলাম।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আলেমের জন্য সম্পদ উপার্জন

📄 আলেমের জন্য সম্পদ উপার্জন


আমরা একবার সম্পদশালীদের একটি দাওয়াতে উপস্থিত হয়েছিলাম। আলেমদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। খাওয়া-দাওয়া হলো। আবার ফিরে এলাম।
এই ঘটনার মাধ্যমে একটা জিনিস আমি বুঝলাম, আলেমগণ আজ সম্পদশালীদের নিকট মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট পর্যায়ের হয়ে আছেন। আলেমগণ তাদের সামনে বিনয়ে গদগদ। অপমানকর ভঙ্গি-ভাব নিয়ে আচরণ করেন। এটা কেন করেন? কারণ, তাদের মন পড়ে আছে এই সম্পদশালীদের সম্পদের দিকে। কিন্তু সম্পদশালীগণ তাদেরকে তেমন পাত্তাই দেন না। তাদের দিকে তেমন আগ্রহ ও যত্ন নিয়ে তাকানও না। কারণ, তারা জানে, এই আলেমদের তাদের নিকট প্রয়োজন আছে। তাদের সম্পদের দিকে এরা মুখাপেক্ষী।
আমি ভেবে দেখলাম, এই অবস্থাটি আলেম ও ধনবান- উভয় শ্রেণির জন্যই ক্ষতিকর। প্রথমত সম্পদশালী দুনিয়াদারদের জন্য ক্ষতিকর এই জন্য যে, তাদের উচিত ছিল- ইলম ও আলেমদের মর্যাদা প্রদান করা। কিন্তু ইলমের মর্যাদা সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা ও মূর্খতার কারণে তারা মর্যাদা দেয়নি। এদিকে নিজেরাও ইলমও অর্জন করেনি। তারা ইলম অর্জনের চেয়ে দুনিয়ার সম্পদ অর্জনকেই প্রাধান্য দিয়েছে। এখন তারা সম্পদ ছাড়া আর কিছুকেই সম্মান প্রদানের যোগ্য মনে করছে না। এই মূর্খতাকে ব্যাখ্যা করার কোনো ভাষা নেই। এটা তাদের নিজেদের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর।
কিন্তু কথা হলো, তারা যেহেতু বাস্তবিকভাবে সম্পদকেই প্রাধান্য দেয় বা দিয়েছে, সুতরাং তারা যা জানে না, যার মর্যাদা তারা বোঝে না, তাদের থেকে তার সম্মান অন্বেষণ করে কোনো লাভ নেই। এটা উচিতও নয়। কিন্তু আলেমরা করলটা কী? নিজেদের আচরণের মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে এবং নিজেদের ইলমকে অপমানের স্থানে নিয়ে গেল।
আমি যখন আলেমদের এই দোষের বিষয়টি লক্ষ করি, তখন তাদেরকে তিরস্কার করা ছাড়া কোনো ভাষা পাই না। আমি তাদের বলি, আপনাদের উচিত- যে অন্তরকে আপনারা ইলমের সম্পদে সম্মানিত করেছেন, তাকে অপমানের হাত হতে রক্ষা করা। আপনারা যদি সম্পদশালীদের থেকে অমুখাপেক্ষী থাকতেন, তাহলে ইলমহীনতার অপদস্থতা তাদের জন্যই প্রকাশিত হয়ে পড়ত। ইলমহীনতার লজ্জায় তারাই ম্রিয়মাণ থাকত। কিন্তু আপনারা তাদের নিকট ধরনা দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদেরকে এবং নিজেদের ইলমকে হেয় করে তুলেছেন। এটা জায়েয নয়। আর যদি আপনাদের সামান্য প্রয়োজন থাকে, জীবনধারণের জন্য স্বল্প রিজিকেই সন্তুষ্ট থাকেন, তাহলেই বা কেন আপনারা এই সামান্য তুচ্ছ বস্তু অর্জনের জন্য নিজেদের অসম্মানিত করা থেকে বাঁচিয়ে রাখলেন না?
এরপর একটা জিনিস আমার খেয়ালে এলো, আজ আসলে অন্তরসমূহের স্বল্প রিজিকের ওপর ধৈর্যধারণ করা কমে এসেছে। অতিরিক্তের লোভ থেকে বিরত থাকা মানুষের সংখ্যাও কমে এসেছে। যদি কখনো কখনো এটি স্বল্প সময়ের জন্য সম্ভব হয়ও, কিন্তু দীর্ঘ সময়ের জন্য আর কারও পক্ষে ধৈর্যধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ কারণে আমার মতে, একজন আলেমের জন্য প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ অর্জনের চেষ্টা করা আবশ্যক। তিনি জীবিকার জন্য পরিশ্রম করবেন। এটি করতে গিয়ে যদি তার ইলমচর্চার সময় থেকে কিছুটা সময় নষ্টও হয়ে পড়ে, তবুও এটা তার করা উচিত। কারণ, এর মাধ্যমে তিনি নিজেকে এবং তার ইলমকে হীন করার অবস্থা থেকে মুক্ত রাখতে পারবেন।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 উদ্দেশ্য বোঝা আকলেরই কাজ

📄 উদ্দেশ্য বোঝা আকলেরই কাজ


কোনো আদেশের মূল কেন্দ্রই হলো আকল বা বুদ্ধিমত্তা। যার যে ধরনের বুদ্ধি, তার সে ধরনের বুঝ। একারণে কারও যদি পরিপূর্ণ বুদ্ধি থাকে, তাহলে সে সর্বোচ্চ যুক্তি ও প্রমাণ অনুযায়ী আমল করবে। আর আকলের প্রমাণই হলো সম্বোধন বোঝা এবং আদেশের মৌলিক উদ্দেশ্য বুঝতে পারা।
যে ব্যক্তি মূল লক্ষ্য বুঝেছে এবং তার যুক্তি অনুযায়ী আমল করেছে, সে যেন তার গৃহ নির্মাণ করেছে এক শক্তিশালী ভিত্তির ওপর। কিন্তু আমি বহু মানুষকে দেখেছি, তারা প্রমাণিত যুক্তি বা আদর্শ অনুযায়ী আমল করে না। বরং এলোমেলোভাবে আমল করে। কখনো তাদের আদর্শ হয় অভ্যাস। কখনো প্রবৃত্তি। কখনো পরিবেশ। এটি খুবই খারাপ একটি পদ্ধতি।
আরও কিছু মানুষকে দেখি, যারা সুদৃঢ় প্রমাণসমূহের অনুসরণ করে না। যেমন, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা। কারণ, তারা তাদের আমলের ক্ষেত্রে অন্ধভাবে পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করে। শরিয়তে সেটা হালাল কি হারাম- সেদিকে তারা লক্ষই করে না। মানুষকে তারা 'ইলাহ বা প্রভু' সাব্যস্ত করে। অথচ তার সত্তার ক্ষেত্রে কী কী জিনিস প্রয়োগ শুদ্ধ ও অশুদ্ধ- সেদিকে কোনো লক্ষ করে না। এ কারণে তারা প্রভুর দিকে 'সন্তান' সম্পর্কিত করে। এসকল লোক স্রষ্টার অস্তিত্ব ও তার সত্তার সাথে কোনো গুণ প্রয়োগের ক্ষেত্রে সঠিক কোনো বিষয়ের দিকে লক্ষ করে না এবং নবুয়তের বিশুদ্ধতার ওপর যে সকল প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারেও তারা চিন্তা-ভাবনা করে না। এ কারণে তাদের আমলগুলো বিনষ্ট হয়। এর উদাহরণ হলো বালুর ওপর নির্মিত এমন গৃহ, যার কোনো ভিত্তিমূল নেই।
এ-জাতীয় আরও কিছু লোক আছে, যারা ইবাদত করে, কৃচ্ছসাধন করে এবং অনর্থক শুধু অশুদ্ধ হাদিস জমা করে ইলমের মধ্যে শরীর ক্ষয় করে। অথচ যারা হাদিসগুলোর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে অবগত- তাদের থেকে জিজ্ঞাসা করে না। আরও কিছু মানুষ আছে, যারা দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করে, কিন্তু দলিলটি কোন বিষয়ের ওপর ইঙ্গিত করছে, সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বোঝে না।
এ ধরনের অবুঝ আরও কিছু লোক আছে, যারা দুনিয়ার নিন্দা-মন্দের কথা শোনে। এরপর নিজেরাও দুনিয়া পরিত্যাগ করতে থাকে। কিন্তু দুনিয়াত্যাগের আসল উদ্দেশ্য বোঝে না। তারা ধারণা করে- দুনিয়ার যেকোনো উপভোগই নিন্দনীয় ও পরিত্যাজ্য। এবং মানুষের জন্য উচিত হলো সব সময় নফসের বিরোধিতা করা।
এ ধারণায় চালিত হয়ে তারা নিজেদের নফসের ওপর এমন কঠিন কঠিন বিষয় চাপিয়ে নেয়, যেগুলো বহনের শক্তি নফসের নেই। তাকে বিভিন্ন ধরনের কষ্টে ফেলে রাখে। তার সকল অধিকার ও চাহিদা থেকে তাকে বঞ্চিত রাখে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কথা বলেছেন, 'নিশ্চয়ই তোমার নফসের তোমার ওপর অধিকার রয়েছে'-এ কথা তারা যেন ভুলে থাকে। এভাবে তাদের ক্রম দুর্বলতার কারণে ক্রমেই তারা ফরজ বা আবশ্যক আমলগুলোও করতে পারে না। শরীর ভেঙে পড়ে। শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসে।
এগুলো হয়ে থাকে তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বোঝার অক্ষমতার কারণে।
যেমন দাউদ তাঈর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি একটি পাত্রে করে গরম মাটির নিচে পানি রেখে দিতেন। এরপর পানি প্রচণ্ড গরম হয়ে গেলে, সেই গরম পানি পান করতেন। এবং তিনি সুফিয়ান সাওরি রহ.-কে বলতেন, 'আপনি মজাদার সুস্বাদু খাবার খান, ঠান্ডা শীতল তৃপ্তিদায়ক পানি পান করেন, তাহলে কীভাবে বলা যায়, আপনি মৃত্যুকে ভালোবাসেন এবং আল্লাহ তাআলার দিকে রওনাকে ভালোবাসেন?'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00