📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সচেতনতার চোখ খুলে রাখো

📄 সচেতনতার চোখ খুলে রাখো


যে ব্যক্তি বৈধভাবে দুনিয়ার স্বাদ অন্বেষণ করে, তার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। কারণ, সকল মানুষই সমানভাবে স্বাচ্ছন্দ্যকে বর্জন করতে সক্ষম হয় না।
কিন্তু দুর্ভাগ্য তার জন্য- যে ব্যক্তি অবৈধভাবে দুনিয়ার অন্বেষণে লিপ্ত হয়। হয়তো সে দুনিয়া পায় কিংবা আরও চায়। দুনিয়ার অন্বেষণে এমনভাবে লিপ্ত হয় যে, সেটা কীভাবে অর্জিত হলো, সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। এই দুর্ভাগ্যটি সংঘটিত হয় নিজের বুদ্ধি বা আকল না খাটানোর কারণে। কিংবা সে তার বুদ্ধি দিয়ে সামান্যতমও উপকৃত হয়নি। কারণ, সে যদি তার বুদ্ধি দিয়ে তার কৃতকর্মের দ্বারা শাস্তির বিষয়টা পরিমাপ করে নিত, তাহলে সে দেখতে পেত, অচিরেই বিদূরীত আনন্দের পাল্লাটি বিশাল শাস্তির কণা পরিমাণও নয়।
কত ব্যক্তিকে দেখেছি, নিজের প্রবৃত্তির চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে নিজের দ্বীন-ধর্মই বিনষ্ট করে ফেলেছে এবং ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়েছে।
এ কারণে সর্বক্ষণ সচেতনতার চোখ খুলে রাখা উচিত। কারণ, তোমরা সর্বক্ষণ অবস্থান করছ জীবন-যুদ্ধের ময়দানে, কোন দিক থেকে যে শয়তানের তির এসে বিদ্ধ করে-তা বলা মুশকিল। সুতরাং সর্বক্ষণ নিজেদের সাহায্যের কাজে নিয়োজিত থাকো। নিজেদের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যেয়ো না।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আনুগত্যের পরিস্থিতি

📄 আনুগত্যের পরিস্থিতি


আল্লাহ তাআলা তার বান্দার ঘাড়ের শাহরগের চেয়েও নিকটবর্তী। কিন্তু বান্দার সাথে তিনি এমন অবস্থান নিয়ে থাকেন, তিনি যেন বান্দার থেকে অনেক দূরে। এ কারণে তিনি তার নিয়তের ইচ্ছা করতে আদেশ দেন। তার দিকে হাত তুলতে বলেন এবং প্রার্থনার কথা বলেন।
কিন্তু মূর্খদের অন্তর তাকে বহু দূরবর্তী ভাবে। এ কারণেই তাদের থেকে গোনাহ সংঘটিত হয় বেশি। কিন্তু তাদের চেতনায় যদি তার ‘হাজির-নাজির’ হওয়ার বিষয়টি সঠিকভাবে উদ্ভাসিত হতো, তাহলে তারা অবশ্যই এই ভুল করা থেকে বিরত থাকত। কিন্তু যারা সচেতন, জাগ্রত হৃদয়, তাদের নিকট তার নৈকট্য-চেতনা উদ্ভাসিত, সে কারণে এটা তাদেরকে অবাধ্যতা থেকে বিরত রাখে।
কিন্তু কিছুটা পর্দা বা আবরণ তো থেকেই যায়। প্রকৃত মুরাকাবার ক্ষেত্রে চোখে যদি এই আবরণটুকু না থাকত, তবে তো কেউ খাবার খেতে পারত না। চোখ দিয়ে অন্য কিছু দেখতে পেত না।
ঠিক এই বিষয়টার দিকে ইঙ্গিত করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إنه ليغان على قلبي -আমার অন্তরেও কখনো কিছুটা আবরণ আসে। ৮০
এভাবে যখন পরিপূর্ণ নৈকট্যের চেতনা আসে, তখন মারেফাতও অর্জিত হয়। আর এই মারেফাত বা ঘনিষ্ঠতা অর্জিত হয় প্রকৃত আনুগত্যের মাধ্যমে। অন্যদিকে অবাধ্যতা ও অমান্যতা অপরিচয় ও দূরত্ব সৃষ্টি করে। আর আনুগত্যের মাধ্যমে আসে স্বতঃস্ফূর্ততা।
হায়, কে বুঝবে ঘনিষ্ঠদের আনন্দ! আর কেই-বা অনুধাবন করবে অপরিচিতদের দুর্ভাগ্য!
তবে আনুগত্য বলতে শুধু সেগুলোই নয়; যা অনেক মূর্খ ধারণা করে। তারা ধারণা করে, ইবাদত যেন শুধু নামাজ, রোজা, হজ। মূলত আনুগত্য হলো আল্লাহ তাআলার সকল আদেশ পালন করা এবং নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকা।
এটাই হলো মূলনীতি এবং প্রকৃত পদ্ধতি। তাছাড়া কত ইবাদতকারীই তো তার নৈকট্য থেকে বঞ্চিত। কারণ, তারা শরিয়তের মূল বিষয়কে বিনষ্ট করে। প্রকৃত পদ্ধতিকে ধ্বংস করে। কারণ, তারা আদেশগুলো মান্য করে না এবং নিষেধগুলো থেকে বিরত থাকে না। প্রকৃত বীর তো সেই, যে নিজের হিসাব-নিকাশের দাঁড়িপাল্লা নিজের মুঠোয় ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। গোনাহের কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রেখেছে। যা কর্তব্য তা করেছে। আর যা বর্জনীয়- তা থেকে বিরত থেকেছে। এরপর যদি অতিরিক্ত আরও ভালো কাজের তাওফিক পায়, ভালো। আর যদি না পায়- তবুও তার কোনো ক্ষতি নেই। সেই নিরাপদ।

টিকাঃ
৮০ সহিহ মুসলিম : ১৩/৪৮৭০, পৃষ্ঠা: ২১৬। মুসনাদে আহমদ: ৩৭/১৭৫৭৫, পৃষ্ঠা: ২৪৩- মা. শামেলা। পুরো হাদিসটি এমন-
عَنْ أَبِي بُرْدَةَ عَنْ الْأَغَرِّ الْمُزَنِي وَكَانَتْ لَهُ صُحْبَةٌ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وََسَلَّمَ قَالَ إِنَّهُ لَيُغَانُ عَلَى قَلْبِي وَإِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ভালোবাসার জিনিসের সৌন্দর্য রক্ষা

📄 ভালোবাসার জিনিসের সৌন্দর্য রক্ষা


দুনিয়া আসলে একটি মুসাফিরখানা। সুতরাং মানুষদের এখানে এর স্বাদ-আনন্দ উপভোগের জন্য প্রতিযোগিতায় নামা উচিত নয়। সময়গুলো এর পেছনে ব্যয় করাও বুদ্ধিমানের কাজও নয়। এখানে মোটামুটি কাজ চলে যাওয়ার মতো হলেই যথেষ্ট- গভীর অনুসন্ধানের কোনো প্রয়োজন নেই।
যেমন, গোশতজাতীয় কোনো খাবারের ক্ষেত্রে- কেউ যদি প্রাণীটির জবাই দেখে। শ্রমিকদের অপরিচ্ছন্নতার দিকে লক্ষ করে। যদি দেখে স্থান ও পাত্র। এবং স্মরণে রাখে পরিবেশনার আগের ও পরের অবস্থা ও চিত্র। আর এগুলো নিয়ে বেশি চিন্তা-কল্পনা করে- তাহলে তার অনেক খাবারের ক্ষেত্রেই আর রুচি থাকবে না।
এমনকি কেউ যদি তার মুখের মধ্যে খাদ্যের লালার সাথে মিশ্রিত হওয়া, তার ঘুরতে থাকা, চক্কর কাটা, দাঁতের নিচে পিষ্ট হওয়া, থুথু ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা করে- তারও খেতে ভালো রুচি হবে না। এ কারণে সাময়িক উপভোগ্যতার ক্ষেত্রে গভীর অনুসন্ধানে না যাওয়াই ভালো।
উপভোগ্যতার মানসিকতার বিচারে মানুষ দু-প্রকার-
১. বৈধ আনন্দ-উপভোগ্যতার মাধ্যমে বিলাস-ব্যসনের কামনা করা।
২. প্রয়োজনগুলো পূরণের মাধ্যমে যেকোনোভাবে দিন অতিবাহিত করতে চাওয়া।
এখন কথা হলো, যার যেই উদ্দেশ্যই থাক, তার উচিত হবে, তার ভোগ্যতার বিষয়ে গভীর অনুসন্ধানে না যাওয়া। কারণ, কেউ যদি তার স্ত্রীর গোপন বিষয়গুলো অকপটে দেখে ও চিন্তা করে, তবে অচিরেই তার স্ত্রী থেকে তার মন আকর্ষণহীন হয়ে পড়বে।
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা. বলেন,
مَا رَأَيْتُ مِنْ رَسُولِ اللهِ وَلَا رَآهُ مِنِّي.
আমি কখনো রাসুলুল্লাহর [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] গোপনাঙ্গ দেখিনি, তিনিও কখনো আমার থেকে দেখেননি। ৮১
এ কারণে বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের জন্য উচিত, স্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় রাখা। স্ত্রীকে সে সময় সাজ-গোজ করে থাকতে নির্দেশ দেওয়া। এছাড়া জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও তার দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করা থেকে বিরত থাকা। নতুবা জীবন কখনো সুখের হবে না। কারণ, কেউ-ই দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত নয়। নিজেও না।
আর স্ত্রীরও উচিত হবে, সর্বক্ষণ স্বামীর সাথে না ঘেঁষে থাকা। কিছুটা মনোরম দূরত্ব রাখা উচিত। আর যখনই সে স্বামীর নিকট উপস্থিত হবে কিংবা মিলিত হবে, কিছুটা সাজ-সজ্জা ও সুঘ্রাণে সুমণ্ডিত হয়ে উপস্থাপিত হবে।
এগুলো অনুসরণের মধ্যেই নিহিত আছে সুখময় জীবন।
কিন্তু কেউ যদি বেশি অনুসন্ধান চালাতে যায়, এটা-ওটা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে যায়, তাহলে তার দৃষ্টিতে বিভিন্ন দোষ-ত্রুটি প্রকাশিত হতে থাকবে। অন্তর আকর্ষণহীন হয়ে পড়বে। সঙ্গী পাল্টাতে চাইবে। কিন্তু তার অভ্যাস যদি না পাল্টায়- তবে দ্বিতীয়জনের ক্ষেত্রেও এই একই বিষয় সংঘটিত হবে- যা প্রথমজনের ক্ষেত্রে হয়েছে।
পুরুষের জন্যেও এই একই কথা। পুরুষ নিজেও পরিচ্ছন্ন সুঘ্রাণ ও উপযুক্ত পরিপাটি হয়ে থাকবে- যেমনটা সে স্ত্রীর ক্ষেত্রে ভালোবাসে। এটা কোনো লৌকিকতা নয়; জীবনযাপনের সুন্নত পদ্ধতি। নবীর চেয়ে সুঘ্রাণ ও পরিপাটি আর কেউ ছিলেন না।
কিন্তু এভাবে যদি কারও দাম্পত্য জীবন না চলে, তবে অচিরেই সেখানে দুটি বিষয়ের একটি বিষয় সংঘটিত হবে। হয়তো স্বামী বা স্ত্রী সঙ্গী পরিবর্তন করে ফেলবে কিংবা নিজেদের মধ্যে বিতৃষ্ণা ভাব চলে আসবে।
বিতৃষ্ণা ভাব এলে, তখন তার কাঙ্ক্ষিত বাসনাগুলো চরিতার্থ না হওয়ায় তাকে নিয়েই ধৈর্যধারণ করতে হবে। আর যদি তালাকের সিদ্ধান্তে চলে আসে, তখনো তাকে একে-অপরের প্রতি অনুগ্রহ ও সহানুভূতির কথা মনে করে বিরত থাকতে হবে- কিন্তু দুটি বিষয়ই কষ্টকর। এটা দুজনকেই কষ্টে ফেলে দেবে।
তাই যেভাবে চলার বর্ণনা প্রদান করা হলো, সেভাবে না চললে জীবন সুখময় হবে না এবং জীবন ও সময় যেভাবে কাটানো উচিত, সেভাবে কাটাতে সক্ষম হবে না।

টিকাঃ
৮১. সুনানে ইবনে মাজা:১/২১৭/৬১৯। এবং মুসনাদে আহমদ: ৬/১৯০, ৬৩। শামায়েলে তিরমিজি: ৩৪৪। তবে ইবনে মাজা বর্ণনায় হাদিস এভাবে এসেছে-
مَوْلًى لِعَائِشَةَ عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ مَا نَظَرْتُ أَوْ مَا رَأَيْتُ فَرْجَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَط.
সুনানে ইবনে মাজা: ২/৬৫৪, পৃষ্ঠা: ৩৪০- মা. শামেলা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আল্লাহর সীমাহীন নিয়ামত

📄 আল্লাহর সীমাহীন নিয়ামত


একবার আমার নফস আমাকে শরিয়তে 'মাকরুহ' একটি বিষয়ের দিকে প্ররোচিত করছিল। আমার জন্য জায়েযের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছিল। মাকরুহটাকে দূরে সরিয়ে রাখছিল। কিন্তু আসলে তার ব্যাখ্যাগুলো ছিল ভুল। সেটা মাকরুহ হওয়ার ওপর স্পষ্ট প্রমাণ ছিল।
আমি আমার নফসের এই চক্রান্ত থেকে রক্ষা পাবার জন্য আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করলাম। কোরআন মাজিদ তেলাওয়াত শুরু করলাম। আমার পড়ার ধারাবাহিকতা 'সুরা ইউসুফ' পর্যন্ত এসেছিল। আমি সুরা ইউসুফ খুলে বসলাম। কিন্তু আমার অন্তরের বিক্ষিপ্ততার জন্য আমি বুঝতে পারছিলাম না, কোথা থেকে এখন পড়া শুরু করতে পারি। অবশেষে সুরা ইউসুফ থেকেই পড়া শুরু করলাম। পড়তে পড়তে যখন এই স্থানে এসে পৌঁছালাম-
﴿وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ)
নারীটি বলল, এসে পড়ো। ইউসুফ বলল, আল্লাহর পানাহ! তিনি আমার মনিব। তিনি আমাকে ভালোভাবে রেখেছেন। [সুরা ইউসুফ : ২৩]
এই আয়াতের দ্বারা আমি সচকিত হয়ে উঠলাম। এটা দ্বারা যেন আমাকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আমার সেই হতভম্বতা থেকে জেগে উঠতে সক্ষম হলাম। আমি আমার নফসকে ডেকে বললাম, হে নফস, কিছু কি বুঝতে পারছ?
ইউসুফ আলাইহিস সালাম ছিলেন একজন স্বাধীন বালক। তাকে অন্যায়ভাবে বিক্রয় করে গোলাম বানিয়ে ফেলা হয়। এরপর যিনি তাকে কিনে স্বাধীন করে তার ওপর অনুগ্রহ করেছেন, তার প্রতি তিনি কতটা সন্তুষ্টচিত্ত ছিলেন এবং তাকে ‘রব বা মালিক’ বলে উল্লেখ করছেন। যদিও তার ওপর তার প্রকৃত মালিকানা নেই। এরপরও তিনি বলছেন, তিনি আমার মনিব। এরপর তিনি নিজের ক্ষেত্রে এমন বিষয় না করার কথা উল্লেখ করছেন- যা তার মালিককে কষ্ট দেবে এবং বলছেন- তিনি আমার অবস্থানকে সুন্দর করেছেন।
এবার হে নফস, তোমার ব্যাপার দেখো। তুমি এক মাওলার প্রকৃত বান্দা বা গোলাম। তোমার অস্তিত্বের সূচনা থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত তোমার প্রতি তার কত অনুগ্রহ ও দয়া। অসংখ্য বালি-কণার চেয়েও তোমার কত দোষ-ত্রুটি তিনি আবৃত করে রেখেছেন। তুমি কি একটু স্মরণ করে দেখবে না- তিনি তোমাকে কীভাবে লালনপালন করেছেন? তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন, রিজিক দিয়েছেন। তোমার বালা-মুসিবত দূর করেছেন। কত কল্যাণ তোমাকে দান করেছেন! সঠিক পথে তোমাকে পথ দেখিয়েছেন। সকল ষড়যন্ত্র থেকে তোমাকে রক্ষা করেছেন। বাহ্যিক আকার-আকৃতির সাথে সাথে অভ্যন্তরীণ জ্ঞান-বুদ্ধির সৌন্দর্য দান করেছেন। তোমার জন্য ইলম অর্জনকে সহজ করেছেন। দীর্ঘ পরিশ্রম ও অধ্যয়নে অন্যরা যা শিখতে পারে না, তুমি তা অল্পদিনের মধ্যেই অর্জন করতে পেরেছ। তোমার বিশুদ্ধ সুধাময় ভাষার মাঝে ইলমের ফল্গুধারা জারি করেছেন। মানুষের থেকে তোমার কত গোনাহ ও অপরাধ গোপন রেখেছেন। তারা তোমার সাথে কত সুন্দর ও ভালো ধারণা নিয়ে সাক্ষাৎ করে। কোনো ধরনের অসম্মান ও বড় কষ্ট ছাড়া তোমার রিজিকের ব্যবস্থা করেছেন।
আল্লাহর কসম, হে নফস, আমি বুঝতে পারছি না, তোমার প্রতি প্রদত্ত আর কত নিয়ামতের কথা আমি উল্লেখ করব! আকার গঠনের সৌন্দর্যের কথা? সুস্থ ও নিরাপদ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কথা? নাকি সুন্দর স্বভাবের কথা? নাকি বলব ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের কথা? নাকি বলব পঙ্কিলতামুক্ত সূক্ষ্ম অভিরুচির কথা? নাকি শৈশব থেকেই একটি অনাবিল সঠিক সৌন্দর্যের পথে পরিচালিত হওয়ার কথা? নাকি বলব তোমার ফাহেশা ও বিচ্যুতি থেকে সংরক্ষিত থাকার কথা? নাকি তোমার কোরআন হাদিসের মৌলিক বর্ণনা ও হেদায়েতের পথে থাকার কথা? বিদআত ও কুসংস্কার থেকে নিরাপদ থাকার কথা?
আমাকে বলো- আর কোন কোন নিয়ামতের কথা তোমাকে আমি বলি? এ কারণে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
( وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا )
তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামতসমূহ গুণতে শুরু করো, তবে তা গুণে শেষ করতে পারবে না। [সুরা নাহল : ১৮]
হে নফস, কত ষড়যন্ত্রকারী তোমার জন্য কত রকম ষড়যন্ত্র করেছে, কিন্তু সেগুলো থেকে তিনি তোমাকে রক্ষা করেছেন?
কত শত্রু তোমাকে নিন্দার আবরণে একেবারে ঢেকে ফেলেছিল, কিন্তু তিনি তা থেকে তোমাকে মুক্ত ও উজ্জ্বল করেছেন?
তোমার সম-সাথিদের কতজনই তো কাঙ্ক্ষিত পিপাসা নিবারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, অথচ তিনি তোমাকে তা পান করিয়ে তৃপ্ত করেছেন?
তোমার সঙ্গীদের কতজনকেই তো তাদের চাহিদা পূর্ণ হওয়ার আগেই আল্লাহ মৃত্যু দিয়েছেন, কিন্তু তিনি তোমাকে এখনো জীবিত রেখেছেন?
তুমি এখনো নিরাপদ সুস্থ শরীরে সকাল-সন্ধ্যা পার করছ। ইলম ও আমলে সজ্জিত হয়ে দ্বীনকে সংরক্ষণ করছ। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছেছ। আবার যদি কোনো লক্ষ্যে পৌঁছুতে না পারো, বিপদ আসে- তখনো তুমি ধৈর্যের নিয়ামত প্রাপ্ত হয়ে সেগুলো সয়ে নিচ্ছ। কারণ, তুমি তো প্রতিপালকের কল্যাণ প্রদানের পদ্ধতি ও হিকমতের কথা জানো। সে কারণে তুমি মেনে নাও যে, দুনিয়াতে কখনো কখনো প্রদানের চেয়ে বঞ্চনাই অধিকতর কল্যাণকর।
হে নফস, এভাবে তুমি যদি এসকল নিয়ামতের কথা গণনা করতে থাকো, তবে তার গণনা শেষ হবে না। লিখতে চাইলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শেষ হয়ে যাবে- কিন্তু লেখা শেষ হবে না। আর তুমি নিজেও জানো, এখানে যত নিয়ামতের কথা উল্লেখ করলাম, অনুল্লেখ রয়েছে তারচেয়ে অনেক বেশি। আর যেগুলোর প্রতি ইশারা করেছি, তার ব্যাখ্যাও করা হয়নি।
তাহলে কীভাবে তোমার জন্য শোভা পায়, তিনি যা অপছন্দ করেন তা করতে থাকা?
এবার তোমারও কি বলা উচিত নয়-
﴿مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ﴾
আল্লাহর পানাহ! তিনি আমার মনিব। তিনি আমাকে ভালোভাবে রেখেছেন। বাস্তবতা হলো, জালেমরা কখনো সফলকাম হয় না। [সুরা ইউসুফ : ২৩]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00