📄 ধৈর্যের ওপর দৃঢ়তা
হে অপরাধী,
তুমি যখন কোনো প্রতিফল বা শাস্তির মুখোমুখি হও, তখন বেশি অস্থির হয়ো না ও চেঁচামেচি করো না। আর বলতে থেকো না- আমি কত তাওবা করলাম, অনুতপ্ত হলাম! এরপরও আমার থেকে কেন এই শাস্তি বিদূরীত হলো না?
এমন তো হতে পারে- সঠিকভাবে তোমার তাওবা করা হয়নি। এছাড়া দীর্ঘ অসুস্থতার মতো কখনো কখনো শাস্তির সময়ও দীর্ঘ হয়। সুতরাং তার নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার আগে তুমি আর অন্য কোনো বিরূপতা দেখিয়ো না।
সুতরাং হে অপরাধী, ধৈর্যধারণ করো। তোমার চোখের পানি নাপাক অন্তরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশের সুযোগ করে দাও। এরপর অনুশোচনার হাত দিয়ে পানি নিংড়ে নাও। এভাবে আবারও করো। তবেই এক সময় তোমার অন্তরে পবিত্রতার হুকুম লাগানো হবে।
স্মরণ রেখো, হজরত আদম আলাইহিস সালাম দীর্ঘ ৩০০ বছর ক্রন্দন করেছেন। হজরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম দীর্ঘ ১৮ বছর তাঁর বিপদের মধ্যে ধৈর্যধারণ করেছেন। হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তাঁর সন্তান ইউসুফের জন্য দীর্ঘ ২৮ বছর অশ্রু ঝরিয়েছেন।
এভাবে প্রতিটি বিপদ-আপদের একটি নির্ধারিত নির্দিষ্ট সময় রয়েছে- সেই সময় পর্যন্ত তা বিলম্বিত হয়। এমনকি কারও কারও ক্ষেত্রে এই বিপদ তার মৃত্যু পর্যন্তও বিলম্বিত হয়!
সুতরাং তোমার জন্য কর্তব্য হলো, অপরাধের কথা স্মরণ করে বিনয়-অবনত হওয়া। নতুনভাবে তাওবা করা। উঠতে-বসতে চিন্তা ও ক্রন্দনের মধ্যে থাকা। কারণ, মাঝে মাঝে বিপদ এতটা বিলম্বিত হয় যে, সুসংবাদদাতা যখন আসে, ততদিনে দুঃখে-কষ্টে ক্রন্দন করতে করতে 'ইয়াকুব'-এর চোখ অন্ধ হয়ে যায়।
আর যদি তুমি এই বিপদের মধ্যে দুনিয়া থেকে বিদায় নাও, তবুও তো কারও জন্য এমন হয় যে, আখেরাতের সীমাহীন কষ্টের পরিবর্তে শুধু এই দুনিয়াতেই কষ্ট পেয়ে যায়। কিন্তু আখেরাতে শান্তি পায়। এটা তো অনেক বড় লাভ ও সৌভাগ্যের কথা।
📄 নফসের সাথে বোঝাপড়া
যে ব্যক্তি 'আরেফ বিল্লাহ' বা আল্লাহ্ সম্পর্কে অবগত, সে কি কখনো আল্লাহর বিরোধিতা করতে পারে- পরিণামে জীবন চলে গেলেও? দুনিয়া ও আখেরাত শুধু আল্লাহর জন্যই! তার সন্তুষ্টি ছাড়া কীভাবে তার জীবন চলে?
সে ব্যক্তির জন্য বড় আফসোস, যে ব্যক্তি নিজের পছন্দনীয় বিষয় অর্জনের জন্য আল্লাহর অপছন্দনীয় বিষয়ে লিপ্ত হয়! আল্লাহর কসম, এর মাধ্যমে সে যা অর্জন করে, তার চেয়ে বহুগুণ কল্যাণ থেকে নিজেকে সে বঞ্চিত করে।
হে আস্বাদনকারী, আমি যা বলি তার উত্তর দাও—তোমার জীবনে তুমি কি খুবই বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছ? তোমার অবস্থা কি খুবই সঙ্গীন? জেনে রেখো, আল্লাহর বিরোধিতার চেয়ে বড় কোনো বিপর্যয় বা সঙ্গীন অবস্থা হতে পারে না!
কবি বলেন, وَلا انْثَنَى عَزْمِي عَنْ بَابِكَ ... إِلَّا تَعَثَّرْتُ بِأَذْيَالِي
তোমার দরজা থেকে আমার আরজি এমনিতেই ফিরে আসেনি। আমারই দোষে- গোনাহের লেজ-লেজুড়ে বেঁধে আছড়ে পড়েছি আমি।
তুমি কি সেই সালাফের ঘটনা শোনোনি? আমাদের একজন মুরুব্বি ঘটনাটি বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি একদিন বৈরুতের ব্রিজের কাছে এক যুবককে বসে আল্লাহর জিকির করতে দেখলাম। আমি মনে করলাম- ভিক্ষুক বোধ হয়। আমি তাকে বললাম, তোমার কি কোনো প্রয়োজন রয়েছে? আমাকে বলো।
যুবক বলল, আমার যখন কোনো প্রয়োজন দেখা দেয়, আমি তা আমার অন্তর দিয়ে আল্লাহর কাছে চাই, তিনিই পূরণ করে দেন। মানুষের দরকার হয় না।
তুমি তোমার নফস নিয়ে মোরাকাবায় বসো। এরপর বলো, একজন বান্দার বৈশিষ্ট্য কী? আমি যদি কারও বান্দা হই, তবে আমার জন্য উচিত হলো আমার মালিকের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কাজ করা। এর জন্য আমাকে কোনো প্রতিদান দিতে হবে- এমন তো কোনো শর্ত নেই। আমি যদি তার প্রতি ভালোবাসাই রাখি, তবে তো তার সন্তুষ্টির জন্য আমার সকল ইচ্ছাকেও বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকব।
হে দুনিয়ার উদ্দেশ্য সাধনে অন্ধ ও প্রতারিত মানুষ! তুমি যদি তার পক্ষ থেকে প্রদত্ত বিপদ সহ্য করতে না পারো, তবে তার কাছেই আশ্রয় চাও। তার কোনো নির্বাচন তোমাকে যদি কষ্টে ফেলে, তবে তো তুমি তার সামনেই আছ। তার কাছে চাও। প্রার্থনা করো। রহম ও দয়া থেকে কিছুতেই নিরাশ হয়ো না—বিপদ যদি অনেক কঠিন ও দীর্ঘও হয়।
আল্লাহর কসম, বুদ্ধিমানদের এটাই কামনা। কাঙ্ক্ষিত সত্তার ইবাদত ও হুকুম মানার মধ্যেই যদি জীবনাবসান হয় তাহলে সে জীবন তো বড় সৌভাগ্যময়।
তুমি তোমার নফসকে ডেকে বলো,
হে আমার নফস, তোমাকে যা প্রদান করা হয়েছে, তুমি তার আশাও করতে পারতে না। তোমাকে এমন জায়গায় উপনীত করা হয়েছে, যা তুমি প্রার্থনাও করোনি। তোমার দোষ-ত্রুটিগুলো তিনি গোপন রেখেছেন। সেগুলো প্রকাশিত হলে মানুষের মাঝে তুমি লাঞ্ছিত হতে। তোমার সৎ কর্মগুলোর জন্য রয়েছে আখেরাতের মহান পুরস্কার। তবে আর দুনিয়ার সামান্য কামনাগুলোর অপূর্ণতা নিয়ে এত চেঁচামেচি করছ কেন? এত হায়-হাপিত্যেশই বা করছ কেন?
তুমি তার বান্দা-অধীন, নাকি মুক্ত-স্বাধীন? তুমি কি জানো না, তুমি রয়েছ কর্মের সময়ের মধ্যে? এটা কি বিশ্রাম ও আরামের সময়? মূর্খরা না হয় এ ধরনের কাজ করতে পারে— কিন্তু তুমি তো আরেফ— আল্লাহ সম্পর্কে অবগত হওয়ার দাবিদার! তোমার আচরণ তবে কেন এমন!
তুমি কি ভেবে দেখেছ, এক ঝড়ের ঝটকায় তোমার দু-চোখ অন্ধ হয়ে যেতে পারে? তখন তোমার দুনিয়ার সাধ-আহ্লাদ কোথায় যাবে? কিন্তু তোমার জন্য আফসোস— তুমি তোমার শ্রেষ্ঠ চোখ— অন্তরের চোখই যেন হারিয়েছ। তুমি ভুলের দিকেই অগ্রসর হয়ে চলেছ। জীবনের জাহাজ কবরের তীরে এসে প্রায় উপনীত। অথচ তোমার বাহনে জীবনের ব্যবসার লাভের কোনো সঞ্চয় নেই। শূন্য তরী।
কী আশ্চর্যতম কথা, তোমার জীবন উচ্চে উঠতে শুরু হয়েছে, আর তুমি নিজে নিচে নামতে শুরু করেছ। এমন কত মানুষকেই তো দেখো, বিপদ ও ফিতনার মধ্যেই যার জীবন অবসান হয়েছে? তবুও কি শিক্ষা নেবে না?
আহা! তোমার এই পরবর্তী জীবনের চেয়ে তো প্রথম জীবনই ভালো ছিল। তোমার এই বয়সকালের আমলের চেয়ে তোমার যৌবনের আমলই তো ছিল পরিশুদ্ধ। নিজের আমলের দিকে দয়া করে আরেকবার ফিরে তাকাও। তা সংশোধন করো। তুমি কি খেয়াল করেছ, তুমি কী হতে গিয়ে কী হয়ে গেছ? কী করতে গিয়ে কী করে চলেছ? আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-
﴿وَتِلْكَ الأَمْثَالُ تَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ وَمَا يَعْقِلُهَا إِلا الْعَالِمُونَ﴾
আমি মানুষের কল্যাণার্থে এসব দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকি, কিন্তু তা বোঝে কেবল তারাই, যারা জ্ঞানবান। [সুরা আনকাবুত : ৪৩]
সকল প্রার্থনা কেবল আল্লাহ তাআলার নিকট। তার ইশারা ছাড়া কিছুই অর্জিত হয় না।
📄 ধৈর্যের উপর উত্তম পুরস্কার
আমি একদিন আমার নফসের এমন একটি চাহিদা পূরণের সুযোগ পেলাম- যা ছিল তার কাছে তীব্র পিপাসিত মুসাফিরের মুখের কাছে স্বচ্ছ শীতল পানির চেয়েও মিষ্টিকর। নফস বিভিন্ন ব্যাখ্যা জানাচ্ছিল, এটাতে কোনো অসুবিধা নেই। শুধু একটু তাকওয়ার ব্যাপার। তবে প্রকাশ্যভাবে বিষয়টি জায়েযের পর্যায়ে মনে হচ্ছিল।
আমি বিষয়টিতে অগ্রগামী হওয়া বা না-হওয়া নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে গেলাম। কী করা যায়! কিন্তু অবশেষে আমি সেটা থেকে নফসকে বিরত রাখতে সক্ষম হলাম। আমি শরিয়তের নিষেধের বিষয়টিকেই প্রাধান্য প্রদান করলাম। কিন্তু মনের মাঝে অস্থিরতা বিরাজ করতে লাগল। নিজের সর্বোচ্চ চাহিদার বিষয়টি সুযোগ পেয়েও অর্জিত হলো না বলে শুরু হলো নফসের ছটফটানি।
আমি তাকে বললাম, হে নফস, তুমি এটা করতে গেলে তোমার ধ্বংস ছাড়া আর কীই-বা হতো?
নফস তবুও আকুলি-বিকুলি করতে লাগল।
আমি তাকে ধমকের সুরে বললাম, এরকম কামনার ক্ষেত্রে আমি তোমাকে আর কতবার জানাব, এ ধরনের আনন্দ মুহূর্তের মধ্যে চলে যায় আর বাকি থেকে যায় শুধু আফসোস আর অনুশোচনা। এই কামনা চরিতার্থ করার ক্ষেত্রেও তুমি হিসাব করে দেখো, এটা কি সাময়িক অর্জিত আনন্দ তার পরিবর্তে বহুগুণ আফসোস ও অনুশোচনার উপলক্ষ রেখে যাবে না?
নফস কিছুটা নত হয়ে বলল, তবে আমি এক্ষেত্রে কী করতে পারি? আমি তাকে কবিতার মাধ্যমে বললাম, صبرت ولا والله ما بي جلادة ... على الحب لكني صبرت على الرغم
ধৈর্যধারণ করেছি। কিন্তু আল্লাহর কসম, ভালোবাসার ওপর আমার তো কোনো ধৈর্য নেই। তবুও অনিচ্ছা সত্ত্বেও ধৈর্যই ধরেছি।
এভাবে আমি আমার নফসের অবৈধ চাহিদা থেকে বিরত থাকি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এর উত্তম প্রতিদানের অপেক্ষা করতে থাকি। সুন্দর প্রতিদানের আশা নিয়ে দিন গুণতে থাকি। কারণ, আমি জানি, নিশ্চয় তিনি ধৈর্যের প্রতিদান দিয়ে থাকেন- হয়তো দ্রুতই কিংবা বিলম্বে। তিনি যদি দ্রুত প্রদান করেন, তবে করলেনই। আর যদি বিলম্বে প্রদানের পথ অবলম্বন করেন, তবুও তো তার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহ তাআলার জন্য কষ্ট সত্ত্বেও কোনো নিষিদ্ধ জিনিস বর্জন করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাকে এর চেয়েও উত্তম বিনিময় প্রদান করেন।
আল্লাহর কসম, আমি এটা শুধু আল্লাহর জন্যই বর্জন করেছিলাম। আর ভেবেছিলাম, নিশ্চয় এটা আমার একটি গচ্ছিত সম্পদ হবে। এমনকি আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হতো, আপনার কি এমন কোনো দিনের কথা স্মরণ হয়, যখন আপনি নিজের প্রবৃত্তির ওপর আল্লাহকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন?
আমি নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারতাম, হ্যাঁ, অমুক অমুক দিন... অমুক অমুক বিষয়ে প্রবৃত্তির ওপর আমি আল্লাহকেই প্রাধান্য দিয়েছি- ভীষণ কষ্ট সত্ত্বেও।
সুতরাং সে নফস, যে তোমাকে এটি করতে সক্ষম করেছে, তাকে নিয়ে গর্ব করো। তোমাকে ছাড়া আর কতজনই তো এতে আপতিত হয়ে লাঞ্ছিত হয়েছে। তুমিও তেমন কাজে লাঞ্ছিত হওয়া থেকে সতর্ক থাকো। আল্লাহ তাআলাই সকল কিছুর ক্ষমতাদাতা।
আমার এই ধৈর্যের ঘটনাটি ঘটেছিল ৫৬১ হিজরিতে। এরপর আমি যখন ৫৬৫ হিজরিতে পদার্পণ করলাম, তখন সেই উল্লিখিত বিষয়ে ধৈর্যের বিনিময় আমি প্রাপ্ত হলাম- তাকওয়ার সাথে এবং আত্মসম্মানবোধের সাথে।
আমি মনে মনে বললাম, এটা হলো আল্লাহর জন্য কিছু বর্জনের দুনিয়ার প্রতিদান- আখেরাতের পুরস্কার তো আরও উত্তম। সকল প্রশংসা শুধু আল্লাহ তাআলার জন্যই।
📄 সচেতনতার চোখ খুলে রাখো
যে ব্যক্তি বৈধভাবে দুনিয়ার স্বাদ অন্বেষণ করে, তার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। কারণ, সকল মানুষই সমানভাবে স্বাচ্ছন্দ্যকে বর্জন করতে সক্ষম হয় না।
কিন্তু দুর্ভাগ্য তার জন্য- যে ব্যক্তি অবৈধভাবে দুনিয়ার অন্বেষণে লিপ্ত হয়। হয়তো সে দুনিয়া পায় কিংবা আরও চায়। দুনিয়ার অন্বেষণে এমনভাবে লিপ্ত হয় যে, সেটা কীভাবে অর্জিত হলো, সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। এই দুর্ভাগ্যটি সংঘটিত হয় নিজের বুদ্ধি বা আকল না খাটানোর কারণে। কিংবা সে তার বুদ্ধি দিয়ে সামান্যতমও উপকৃত হয়নি। কারণ, সে যদি তার বুদ্ধি দিয়ে তার কৃতকর্মের দ্বারা শাস্তির বিষয়টা পরিমাপ করে নিত, তাহলে সে দেখতে পেত, অচিরেই বিদূরীত আনন্দের পাল্লাটি বিশাল শাস্তির কণা পরিমাণও নয়।
কত ব্যক্তিকে দেখেছি, নিজের প্রবৃত্তির চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে নিজের দ্বীন-ধর্মই বিনষ্ট করে ফেলেছে এবং ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়েছে।
এ কারণে সর্বক্ষণ সচেতনতার চোখ খুলে রাখা উচিত। কারণ, তোমরা সর্বক্ষণ অবস্থান করছ জীবন-যুদ্ধের ময়দানে, কোন দিক থেকে যে শয়তানের তির এসে বিদ্ধ করে-তা বলা মুশকিল। সুতরাং সর্বক্ষণ নিজেদের সাহায্যের কাজে নিয়োজিত থাকো। নিজেদের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যেয়ো না।