📄 সাজদানে বিলম্ভতা তোমারই কল্যাণ
মানুষ খুবই অধৈর্য! যখন যা কামনা করে, তখনই সে তা পেতে চায়। তোমার অবস্থাও তা-ই। তোমার কাম্য বস্তু প্রার্থনার ক্ষেত্রে তোমার বেশি পীড়াপীড়ি করা উচিত নয়। হয়তো প্রার্থনার কাঙ্ক্ষিত বস্তু পেতে দেরি হয়, এদিকে তোমারও পীড়াপীড়ি বাড়তে থাকে। এটা কী ধরনের স্বভাব! অথচ প্রার্থনা গ্রহণীয় না হওয়ার বহু কারণ থাকতে পারে- তুমি সেগুলো ভুলে থাকো কেন? যেমন, তোমার আবেদন কবুল না হওয়ার দুটি কারণ হতে পারে-
১. আবেদন কবুল না হওয়া কিংবা বিলম্ব হওয়া- এটা তোমার জন্যই কল্যাণকর। কারণ, এমন তাড়াহুড়ার বস্তু অনেক সময়ই ক্ষতিকর হয়।
২. আবেদন কবুল না হওয়ার কারণ হলো, তোমার নিজেরই গোনাহ। গোনাহের মধ্যে লিপ্ত থাকা ব্যক্তির আবেদন কবুল হবে কীভাবে? গোনাহের ময়লা থেকে সাড়া প্রদানের পথ আগে পরিষ্কার করো।
এরপর গভীরভাবে লক্ষ করো, তোমার এই প্রার্থনা তোমার দ্বীনের কোনো কল্যাণের জন্য নাকি নিছক নিজের নফসের চাহিদা পূরণের জন্য?
যদি এটা তোমার প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের জন্য হয়, তাহলে জেনে রেখো, তোমার প্রার্থনার বিষয়ে সাড়া প্রদান না করাই হবে তোমার প্রতি দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন। কারণ, তুমি এক অবুঝ বাচ্চার মতো এমন বিষয়ের প্রার্থনা করছ, পরিণামে যা তোমাকে শুধু কষ্টই দেবে। যা তোমার শুধু ক্ষতিই করবে। সুতরাং তোমার প্রতি অনুগ্রহশীল হয়েই এটা থেকে বিরত রাখা হচ্ছে।
আর এই আবেদন যদি হয় তোমার দ্বীন ও ধর্মের কোনো কল্যাণের জন্য, তাহলে তো এমনও হতে পারে- এটার বিলম্বের মধ্যে কিংবা এটাকে একেবারে প্রদান না করার মধ্যেই রয়েছে আসল কল্যাণ।
মোটকথা, তোমার জন্য তোমার নিজের ইচ্ছা-বাসনার চেয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্বাচনই বেশি কল্যাণকর। তিনি যেটা চান, সেটাই সবদিক থেকে শ্রেষ্ঠ ও নিরাপদ।
এছাড়াও কখনো কখনো তোমার কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে সাড়াদান না করে তিনি তোমার ধৈর্যের পরীক্ষা করেন। অতএব, তুমি তাকে তোমার পক্ষ থেকে ‘সবরে জামিল’ বা ‘সুন্দর ধৈর্য’ প্রদর্শন করো। দেখবে, অচিরেই তুমি এমন প্রতিদান পাবে- যা পেয়ে খুশি হয়ে যাবে।
এভাবে তুমি যদি গোনাহের ময়লা থেকে আবেদন কবুলের রাস্তা পরিষ্কার রাখো এবং তার ফয়সালার ওপর ধৈর্যধারণ করতে পারো, তাহলে সাড়া দেওয়া হোক বা না হোক- উভয়টিই তোমার জন্য কল্যাণকর।
📄 যাত্রাদিনের প্রস্তুতি
যে ব্যক্তি জানে না, কখন আকস্মিকভাবে তার মৃত্যু এসে যেতে পারে, তার জন্য উচিত হলো সর্বক্ষণ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা। নিজের যৌবন বা সুস্থতা নিয়ে ধোঁকায় পড়া উচিত নয়। চারপাশে একটু তাকিয়ে দেখুক সে-বয়স্কদের চেয়ে কম বয়সীরাই বরং অধিকহারে মৃত্যুবরণ করছে। এ কারণেই তো বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সংখ্যা কম।
কবি বলেন,
يعمر واحد فيغر قوماً ... وينسى من يموت من الشباب
একজনের দীর্ঘ জীবন প্রাপ্তিতে ধোঁকায় পড়ছে পুরো জাতি। ভুলে যাচ্ছে মরছে কত যুবক-তরুণ- অল্প দিনের প্রদীপ-বাতি।
আর ধোঁকার আরেকটি বড় কারণ হলো, দীর্ঘ আশা। এর চেয়ে বড় কোনো বিপদ নেই। যদি এই দীর্ঘ আশা না থাকত, তবে সে কিছুতেই এই অবহেলার মধ্যে আপতিত হতো না। জীবনের এই দীর্ঘ আশার কারণেই একজন অপরাধী গোনাহ করছে, কিন্তু তাওবা করতে বিলম্ব করছে। এই দীর্ঘ আশার কারণেই প্রবৃত্তির কামনার দিকে ধাবিত হচ্ছে, কিন্তু তার থেকে ফিরে আসার কথা ভুলে থাকছে।
এই দীর্ঘ আশাই হলো একটি মারাত্মক প্রতারক সূত্র।
তুমি যদি তোমার জীবনের আশাকে ছোট ভাবতে সক্ষম না হও, তবে দীর্ঘ জীবন ও আশাকে না হয় ছোট ছোট ভাগ করে হিসাব নাও। সন্ধ্যায় তুমি তোমার পুরো দিবসের একটি হিসাব নাও। সেখানে যদি কোনো বিচ্যুতি বা অপরাধ দেখতে পাও, দ্রুত তাওবার মাধ্যমে তা মুছে ফেলো। আর যদি কোনো গোনাহ দেখতে পাও, তাওবার মাধ্যমে তা বিদূরীত করে নাও। আর যখন সকাল যাপন করো, তখন রাতের বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করো এবং কোনো সমস্যা দেখলে একইভাবে তাওবা ও ইস্তেগফার করে নাও।
অলসতা ও গড়িমসি থেকে খুবই সাবধান! কারণ, এটা হলো ইবলিসের সবচেয়ে বড় ফাঁদগুলোর একটি।
জীবনের স্বল্পতা ও ক্ষুদ্রতা নিয়ে কল্পনা করো। চিন্তা করো এর ব্যস্ততা নিয়ে। মৃত্যুর সময় এই অবহেলাগুলোর ওপর আফসোসের তীব্রতা নিয়ে চিন্তা করো। আর তখন দ্রুত সময় ও সুযোগ ফুরিয়ে যাওয়ার ওপর দীর্ঘ অনুশোচনার কথাও ভেবে দেখো।
পূর্ণ ও সম্পূর্ণ ব্যক্তিদের কথা চিন্তা করো- সেই তুলনায় তুমি কত ত্রুটিপূর্ণ। মুজতাহিদদের কথা ভাবো, সেই তুলনায় তুমি কত অলস ও বেখেয়াল। যে নসিহত বা উপদেশগুলো শোনো, তা থেকে নিজেকে কখনো মুক্ত মনে করো না। পরস্পর যে আলোচনাগুলো করো, সে চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে রেখো না। নফস হলো এক বিবাগী ঘোড়ার মতো, তুমি যদি তার লাগামে সামান্য ঢিল দাও, সে তোমাকে উল্টে ফেলে দেবে।
তোমার এই অবৈধ কামনা-বাসনাগুলো তোমাকে পঙ্কিল করে তুলছে। তোমার জীবনকে নষ্ট করে তুলছে। এখনো সময় আছে- বাকিটা ধ্বংস হওয়ার আগেই তুমি তাকে বাগে আনো ও সংশোধন করো। নিজের নিয়ন্ত্রণের ওপর অযথা ভরসা করে থেকো না। সাবধান! বহু প্রত্যয়ী মজবুত ব্যক্তিরও ডানা আটকে গেছে প্রবৃত্তির ফাঁদে। বহু সচেতন ব্যক্তিও নিপতিত হয়েছে অধঃপাতের গভীর কূপে। সাবধান!
📄 আল্লাহর নিকট কিছুই হারিয়ে যায় না
হে বন্ধুগণ, তোমরা তার নসিহত শোনো- যে ব্যক্তি প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ।
তোমরা আল্লাহ তাআলাকে যে পরিমাণ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করবে, আল্লাহ তাআলা সে পরিমাণ তোমাদের সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করবেন। তোমরা যেভাবে তার বিধি-বিধানকে সংরক্ষণ ও পালন করবে, আল্লাহ তাআলা সে পরিমাণ তোমাদের পুরস্কার ও সম্মান বাড়িয়ে দেবেন।
আমি এমন অনেক আলেমকে দেখেছি, ইলমের চর্চায় যিনি তার জীবন অতিবাহিত করেছেন। বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন। এরপর আল্লাহর বিধানের অবাধ্য হওয়া শুরু করেছেন। তখন তিনিও মানুষের নিকট ছোট ও নীচু হয়ে পড়েছেন। তার অঢেল ইলম, সীমাহীন কষ্ট ও পরিশ্রম সত্ত্বেও মানুষ এখন আর তার দিকে ফিরেও তাকায় না।
আবার এমন ব্যক্তিদেরও দেখেছি, যারা তাদের শৈশব থেকে আল্লাহ তাআলার দিকে দৃষ্টি রেখে চলেছে, পূর্বোক্ত আলেমের তুলনায় ইলমে কম হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাদেরকে সম্মানিত করেছেন। মানুষের অন্তরে তাদের তার মর্যাদা ঢেলে দিয়েছেন। মানুষ শুধু তাদের কল্যাণের আলোচনাই করে। তার প্রশংসা করে।
আবার এমন ব্যক্তিদেরও দেখেছি, তারা যখন ভালো কাজের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, তখন তো থাকেই- কিন্তু আবার কখনো বিচ্যুত হলে, পুরোভাবেই বিচ্যুত হয়ে পড়ে। তখন তাদের থেকে সকল কোমলতা লীন হয়ে যায়। যদি আল্লাহ তার রহম দিয়ে তাদের এই বিচ্যুতিগুলো সংশোধন না করেন, তবে অচিরেই তারা মানুষদের মাঝে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের সুযোগ দেন। কিংবা শাস্তির ক্ষেত্রে বিলম্ব করেন। আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি এতটাই রহমশীল!
যেমন কবি বলেন,
ومن كان في سخطه محسناً ... فكيف يكون إذا ما رضي
ভাবো একবার, যিনি তার ক্রোধের অবস্থাতেই এমন দয়াবান, তাহলে যখন তিনি সন্তুষ্ট হবেন, তখন হবেন কত মেহেরবান!
কিন্তু কিয়ামতের দিনের ন্যায়বিচারের কথা সব সময় খেয়াল রেখো। স্মরণ রেখো বিচারকের কোনোপ্রকার অন্যায় না হওয়ার কথা। আর তার নিকট থেকে কিছুই যে হারিয়ে যায় না, সে কথাও বিস্মৃত হয়ো না।
📄 ধৈর্যের ওপর দৃঢ়তা
হে অপরাধী,
তুমি যখন কোনো প্রতিফল বা শাস্তির মুখোমুখি হও, তখন বেশি অস্থির হয়ো না ও চেঁচামেচি করো না। আর বলতে থেকো না- আমি কত তাওবা করলাম, অনুতপ্ত হলাম! এরপরও আমার থেকে কেন এই শাস্তি বিদূরীত হলো না?
এমন তো হতে পারে- সঠিকভাবে তোমার তাওবা করা হয়নি। এছাড়া দীর্ঘ অসুস্থতার মতো কখনো কখনো শাস্তির সময়ও দীর্ঘ হয়। সুতরাং তার নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার আগে তুমি আর অন্য কোনো বিরূপতা দেখিয়ো না।
সুতরাং হে অপরাধী, ধৈর্যধারণ করো। তোমার চোখের পানি নাপাক অন্তরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশের সুযোগ করে দাও। এরপর অনুশোচনার হাত দিয়ে পানি নিংড়ে নাও। এভাবে আবারও করো। তবেই এক সময় তোমার অন্তরে পবিত্রতার হুকুম লাগানো হবে।
স্মরণ রেখো, হজরত আদম আলাইহিস সালাম দীর্ঘ ৩০০ বছর ক্রন্দন করেছেন। হজরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম দীর্ঘ ১৮ বছর তাঁর বিপদের মধ্যে ধৈর্যধারণ করেছেন। হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তাঁর সন্তান ইউসুফের জন্য দীর্ঘ ২৮ বছর অশ্রু ঝরিয়েছেন।
এভাবে প্রতিটি বিপদ-আপদের একটি নির্ধারিত নির্দিষ্ট সময় রয়েছে- সেই সময় পর্যন্ত তা বিলম্বিত হয়। এমনকি কারও কারও ক্ষেত্রে এই বিপদ তার মৃত্যু পর্যন্তও বিলম্বিত হয়!
সুতরাং তোমার জন্য কর্তব্য হলো, অপরাধের কথা স্মরণ করে বিনয়-অবনত হওয়া। নতুনভাবে তাওবা করা। উঠতে-বসতে চিন্তা ও ক্রন্দনের মধ্যে থাকা। কারণ, মাঝে মাঝে বিপদ এতটা বিলম্বিত হয় যে, সুসংবাদদাতা যখন আসে, ততদিনে দুঃখে-কষ্টে ক্রন্দন করতে করতে 'ইয়াকুব'-এর চোখ অন্ধ হয়ে যায়।
আর যদি তুমি এই বিপদের মধ্যে দুনিয়া থেকে বিদায় নাও, তবুও তো কারও জন্য এমন হয় যে, আখেরাতের সীমাহীন কষ্টের পরিবর্তে শুধু এই দুনিয়াতেই কষ্ট পেয়ে যায়। কিন্তু আখেরাতে শান্তি পায়। এটা তো অনেক বড় লাভ ও সৌভাগ্যের কথা।