📄 দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্কতা
দুনিয়া হলো একটি ফাঁদ।
মূর্খ ব্যক্তি প্রথম পদক্ষেপেই এতে আপতিত হয়। কিন্তু বুদ্ধিমান মুত্তাকি ব্যক্তি ক্ষুধার ওপর ধৈর্যধারণ করে। ফাঁদের দানার চারপাশে ঘুরতে থাকে। দানা খায় না। তবে এখান থেকে দূরে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ।
কারণ, অনেক লড়াইকারী ধৈর্যশীল ব্যক্তিকে দেখেছি, বছরের পর বছর ধৈর্য ধরে থেকেছেন; কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন।
সুতরাং খুবই সতর্কতা প্রয়োজন! অনেক মানুষ তো প্রায় জীবনভর সঠিক পথে থেকে কবরের প্রান্তে এসে ভ্রান্ত হয়েছে। তীরে এসে তরী ডুবিয়েছে।
📄 একাগ্রচিত্ত হিকমত
একবার আমি একটি বিষয়ে ভীষণ সংকটের মধ্যে পড়ে যাই। বিষয়টি আমাকে সর্বক্ষণ চিন্তিত ও বিষণ্ণ করে রাখে। অসহ্য সংকটটি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমি সকল প্রকার পদ্ধতি ও কৌশল অবলম্বন নিয়ে ব্যাপক চিন্তা করছিলাম। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ এক সময় কোরআনের এই আয়াতের কথা মনে পড়ল- ( وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا )
যে-কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে উত্তরণের কোনো পথ তৈরি করে দেবেন। [সুরা তালাক : ২]
আমি এর দ্বারা যেন নতুন করে জানলাম, তাকওয়াই হলো সকল প্রকার দুঃখ-চিন্তা থেকে মুক্তির উপায়। সে মতে আমি সকল ক্ষেত্রে তাকওয়ার বিষয়টি আরও জোরদারভাবে লক্ষ করতে লাগলাম। আল্লাহর রহমে আমি আমার সংকট থেকে মুক্ত হয়ে গেলাম।
সুতরাং প্রতিটি মানুষের জন্য উচিত, শুধু আল্লাহ তাআলার ওপরই ভরসা করা, তার কাছে প্রার্থনা করা এবং তার আনুগত্যের চিন্তা করা। তার আদেশ-নিষেধগুলো মান্য করা। কারণ, প্রতিটি পেরেশানি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এটিই একমাত্র পথ।
এরপর মুত্তাকির জন্য এটাও জানা উচিত, আল্লাহ তাআলাই তার জন্য যথেষ্ট। সুতরাং সে তার অন্তর অন্যকিছুর দিকে ঝুঁকাবে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
﴿وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ﴾ যে-কেউ আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, আল্লাহই তার (কর্ম সম্পাদনের) জন্য যথেষ্ট। [সুরা তালাক: ৩] এরপর আল্লাহ তাআলা তার ভরসা অনুযায়ী তার জন্য এমন ব্যবস্থা করবেন, কোনো কল্পনাকারীও যা কল্পনা করতে পারে না। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
﴿وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾ এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দান করবেন, যা তার ধারণার বাইরে। [সুরা তালাক: ৩]
📄 সাজদানে বিলম্ভতা তোমারই কল্যাণ
মানুষ খুবই অধৈর্য! যখন যা কামনা করে, তখনই সে তা পেতে চায়। তোমার অবস্থাও তা-ই। তোমার কাম্য বস্তু প্রার্থনার ক্ষেত্রে তোমার বেশি পীড়াপীড়ি করা উচিত নয়। হয়তো প্রার্থনার কাঙ্ক্ষিত বস্তু পেতে দেরি হয়, এদিকে তোমারও পীড়াপীড়ি বাড়তে থাকে। এটা কী ধরনের স্বভাব! অথচ প্রার্থনা গ্রহণীয় না হওয়ার বহু কারণ থাকতে পারে- তুমি সেগুলো ভুলে থাকো কেন? যেমন, তোমার আবেদন কবুল না হওয়ার দুটি কারণ হতে পারে-
১. আবেদন কবুল না হওয়া কিংবা বিলম্ব হওয়া- এটা তোমার জন্যই কল্যাণকর। কারণ, এমন তাড়াহুড়ার বস্তু অনেক সময়ই ক্ষতিকর হয়।
২. আবেদন কবুল না হওয়ার কারণ হলো, তোমার নিজেরই গোনাহ। গোনাহের মধ্যে লিপ্ত থাকা ব্যক্তির আবেদন কবুল হবে কীভাবে? গোনাহের ময়লা থেকে সাড়া প্রদানের পথ আগে পরিষ্কার করো।
এরপর গভীরভাবে লক্ষ করো, তোমার এই প্রার্থনা তোমার দ্বীনের কোনো কল্যাণের জন্য নাকি নিছক নিজের নফসের চাহিদা পূরণের জন্য?
যদি এটা তোমার প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণের জন্য হয়, তাহলে জেনে রেখো, তোমার প্রার্থনার বিষয়ে সাড়া প্রদান না করাই হবে তোমার প্রতি দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন। কারণ, তুমি এক অবুঝ বাচ্চার মতো এমন বিষয়ের প্রার্থনা করছ, পরিণামে যা তোমাকে শুধু কষ্টই দেবে। যা তোমার শুধু ক্ষতিই করবে। সুতরাং তোমার প্রতি অনুগ্রহশীল হয়েই এটা থেকে বিরত রাখা হচ্ছে।
আর এই আবেদন যদি হয় তোমার দ্বীন ও ধর্মের কোনো কল্যাণের জন্য, তাহলে তো এমনও হতে পারে- এটার বিলম্বের মধ্যে কিংবা এটাকে একেবারে প্রদান না করার মধ্যেই রয়েছে আসল কল্যাণ।
মোটকথা, তোমার জন্য তোমার নিজের ইচ্ছা-বাসনার চেয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্বাচনই বেশি কল্যাণকর। তিনি যেটা চান, সেটাই সবদিক থেকে শ্রেষ্ঠ ও নিরাপদ।
এছাড়াও কখনো কখনো তোমার কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে সাড়াদান না করে তিনি তোমার ধৈর্যের পরীক্ষা করেন। অতএব, তুমি তাকে তোমার পক্ষ থেকে ‘সবরে জামিল’ বা ‘সুন্দর ধৈর্য’ প্রদর্শন করো। দেখবে, অচিরেই তুমি এমন প্রতিদান পাবে- যা পেয়ে খুশি হয়ে যাবে।
এভাবে তুমি যদি গোনাহের ময়লা থেকে আবেদন কবুলের রাস্তা পরিষ্কার রাখো এবং তার ফয়সালার ওপর ধৈর্যধারণ করতে পারো, তাহলে সাড়া দেওয়া হোক বা না হোক- উভয়টিই তোমার জন্য কল্যাণকর।
📄 যাত্রাদিনের প্রস্তুতি
যে ব্যক্তি জানে না, কখন আকস্মিকভাবে তার মৃত্যু এসে যেতে পারে, তার জন্য উচিত হলো সর্বক্ষণ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা। নিজের যৌবন বা সুস্থতা নিয়ে ধোঁকায় পড়া উচিত নয়। চারপাশে একটু তাকিয়ে দেখুক সে-বয়স্কদের চেয়ে কম বয়সীরাই বরং অধিকহারে মৃত্যুবরণ করছে। এ কারণেই তো বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সংখ্যা কম।
কবি বলেন,
يعمر واحد فيغر قوماً ... وينسى من يموت من الشباب
একজনের দীর্ঘ জীবন প্রাপ্তিতে ধোঁকায় পড়ছে পুরো জাতি। ভুলে যাচ্ছে মরছে কত যুবক-তরুণ- অল্প দিনের প্রদীপ-বাতি।
আর ধোঁকার আরেকটি বড় কারণ হলো, দীর্ঘ আশা। এর চেয়ে বড় কোনো বিপদ নেই। যদি এই দীর্ঘ আশা না থাকত, তবে সে কিছুতেই এই অবহেলার মধ্যে আপতিত হতো না। জীবনের এই দীর্ঘ আশার কারণেই একজন অপরাধী গোনাহ করছে, কিন্তু তাওবা করতে বিলম্ব করছে। এই দীর্ঘ আশার কারণেই প্রবৃত্তির কামনার দিকে ধাবিত হচ্ছে, কিন্তু তার থেকে ফিরে আসার কথা ভুলে থাকছে।
এই দীর্ঘ আশাই হলো একটি মারাত্মক প্রতারক সূত্র।
তুমি যদি তোমার জীবনের আশাকে ছোট ভাবতে সক্ষম না হও, তবে দীর্ঘ জীবন ও আশাকে না হয় ছোট ছোট ভাগ করে হিসাব নাও। সন্ধ্যায় তুমি তোমার পুরো দিবসের একটি হিসাব নাও। সেখানে যদি কোনো বিচ্যুতি বা অপরাধ দেখতে পাও, দ্রুত তাওবার মাধ্যমে তা মুছে ফেলো। আর যদি কোনো গোনাহ দেখতে পাও, তাওবার মাধ্যমে তা বিদূরীত করে নাও। আর যখন সকাল যাপন করো, তখন রাতের বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করো এবং কোনো সমস্যা দেখলে একইভাবে তাওবা ও ইস্তেগফার করে নাও।
অলসতা ও গড়িমসি থেকে খুবই সাবধান! কারণ, এটা হলো ইবলিসের সবচেয়ে বড় ফাঁদগুলোর একটি।
জীবনের স্বল্পতা ও ক্ষুদ্রতা নিয়ে কল্পনা করো। চিন্তা করো এর ব্যস্ততা নিয়ে। মৃত্যুর সময় এই অবহেলাগুলোর ওপর আফসোসের তীব্রতা নিয়ে চিন্তা করো। আর তখন দ্রুত সময় ও সুযোগ ফুরিয়ে যাওয়ার ওপর দীর্ঘ অনুশোচনার কথাও ভেবে দেখো।
পূর্ণ ও সম্পূর্ণ ব্যক্তিদের কথা চিন্তা করো- সেই তুলনায় তুমি কত ত্রুটিপূর্ণ। মুজতাহিদদের কথা ভাবো, সেই তুলনায় তুমি কত অলস ও বেখেয়াল। যে নসিহত বা উপদেশগুলো শোনো, তা থেকে নিজেকে কখনো মুক্ত মনে করো না। পরস্পর যে আলোচনাগুলো করো, সে চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে রেখো না। নফস হলো এক বিবাগী ঘোড়ার মতো, তুমি যদি তার লাগামে সামান্য ঢিল দাও, সে তোমাকে উল্টে ফেলে দেবে।
তোমার এই অবৈধ কামনা-বাসনাগুলো তোমাকে পঙ্কিল করে তুলছে। তোমার জীবনকে নষ্ট করে তুলছে। এখনো সময় আছে- বাকিটা ধ্বংস হওয়ার আগেই তুমি তাকে বাগে আনো ও সংশোধন করো। নিজের নিয়ন্ত্রণের ওপর অযথা ভরসা করে থেকো না। সাবধান! বহু প্রত্যয়ী মজবুত ব্যক্তিরও ডানা আটকে গেছে প্রবৃত্তির ফাঁদে। বহু সচেতন ব্যক্তিও নিপতিত হয়েছে অধঃপাতের গভীর কূপে। সাবধান!