📄 প্রবৃত্তির আগুন
অধিকাংশ ব্যক্তির নফস তাকে অবৈধ আনন্দের দিকে প্ররোচিত করে এবং তার দৃষ্টিকে এর পরিণাম ও শাস্তি থেকে সরিয়ে রাখে। কিন্তু আকল বা বিবেকের কণ্ঠ তাকে বলতে থাকে, তোমার কী হলো? তুমি এটা করো না। এতে তোমার উচ্চে আরোহণ ব্যাহত হবে। তুমি নিচের দিকে নামতে থাকবে। দোহায় তোমার, যা করতে চাচ্ছ- তা থেকে বিরত থাক।
কিন্তু তার প্রবৃত্তির ভীষণ কাম্যতা তাকে এ কথাগুলোর দিকে মনোনিবেশ করতে দেয় না। পরিণামে সে গোনাহে লিপ্ত হয় এবং ক্রমে অধঃপতনের দিকে ধাবিত হতে থাকে।
তার এই খারাবিকে গ্রহণের দৃষ্টান্ত হলো গল্পের সেই কুকুরের মতো। গল্পটি এমন-
একদিন এক কুকুর এসে সিংহকে বলল, হে প্রাণীদের রাজা, আপনি আমার নামটি পরিবর্তন করে দিন। আমার এ নামটি খুবই নিকৃষ্ট ও অপমানকর। এটা আমার পছন্দ হয় না।
সিংহ বলল, তুমি হলে একটি বিশ্বাসঘাতক প্রাণী। এ নামটিই তোমার জন্য মানানসই। ভালো কোনো নাম তোমার উপযুক্ত নয়।
কুকুর বলল, কিছুতেই আমি বিশ্বাসঘাতক প্রাণী নই। আমাকে একবার পরীক্ষা করেই দেখুন।
সিংহ কুকুরের দিকে এক টুকরো গোশত ছুড়ে দিয়ে বলল, 'তুমি এটি আগামীকাল পর্যন্ত আমার জন্য সংরক্ষণ করে রাখবে। কাল যখন গোশতের টুকরোটি নিয়ে আমার নিকট আসবে, তখন আমি তোমার নাম পরিবর্তন করে দেবো।'
কুকুর গোশতের টুকরোটি নিয়ে বিদায় নিল। কিছুক্ষণ পর সে যখন ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ল, গোশতের দিকে লোভাতুরভাবে তাকাল। কিন্তু নিজেকে সংবরণ করে রাখল। ধৈর্যধারণ করল। মনকে বোঝাল- নাম পরিবর্তন করতে চাইলে এটা খাওয়া যাবে না। কিন্তু একসময় যখন তার খাওয়ার কামনা আরও তীব্র হয়ে উঠল, তখন সে মনে মনে বলল, আমার এ নামেই বা ক্ষতি কী! 'কুকুর' নামটি তো একেবারে খারাপ না! ভালোই তো। এই বলে কুকুরটি তার কাছে রক্ষিত গোশতের টুকরোটি খেয়ে নিল।
মানুষের নিম্নতম মানসিকতাও ঠিক এমনই। নিজের অমর্যাদাকর অবস্থা নিয়েই সে সন্তুষ্ট থাকে। পরিশ্রমলব্ধ শ্রেষ্ঠ জিনিসের চেয়ে তাৎক্ষণিক ও সাময়িক আনন্দকেই সে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
আল্লাহর দোহাই! নফস যখন উত্তেজিত হয়ে ওঠে, তখনকার সেই আগুন থেকে সতর্ক থাকো। কীভাবে তাকে নেভানো যায়- তা নিয়ে চিন্তা করো। কারণ, কিছু কিছু পদস্খলন মানুষকে তলাহীন কুয়ার মধ্যে ফেলে দেয়। কিছু কিছু কলঙ্ক-দাগ- কিছুতেই আর মুছে না। যা হারিয়ে যায়, তা আর কিছুতেই পাওয়া যায় না। সুতরাং ফিতনার উপকরণগুলো থেকে দূরে থাকো। কারণ, নিকটবর্তী হওয়াই এমন একটি পরীক্ষা- যাতে অধিকাংশ মানুষই ফেল করে। নিরাপদ থাকতে পারে না।
📄 শয়তানের সাথে লড়াই
আমি যখন ভিন্ন একদৃষ্টি নিয়ে মানুষের অবস্থার দিকে তাকাই, তখন তাদের সকলকে যুদ্ধের ময়দানে কাতারবদ্ধ দেখতে পাই।
কার সাথে যুদ্ধ? শয়তানের সাথে।
শয়তান ক্রমাগত মানুষের দিকে বিভিন্ন প্রবৃত্তির তির নিক্ষেপ করছে। ভোগ-উপভোগ, আনন্দ-স্ফূর্তির তরবারি চালনা করে। যার একটু দুর্বল ঈমান, এলোমেলো চলাচল, অস্বচ্ছ লেনদেন- এগুলোর আঘাতে প্রথমেই সে ধরাশায়ী হয়ে যায়। পরাজিত হয়।
কিন্তু যারা মুত্তাকি, খোদাভীরু, মজবুত ঈমানের অধিকারী- তাদেরকে জানপ্রাণ কষ্ট করে লড়াইয়ে টিকে থাকতে হয়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়। তারা তবুও অনড় ও অটল থাকে। আঘাতে আঘাতে তাদের অন্তরের দেহ ক্ষত-বিক্ষত হয়। কিন্তু তারা হেরে যায় না। নতও হয় না। তারা আহত হয়, আবার ওষুধ লাগায়। এবং শেষমেশ মৃত্যুর মাধ্যমে সংরক্ষিত ও নিরাপদ হয়ে যায়।
বরং তাদের এই প্রতিটি আঘাত ও ক্ষতের বিনিময়ে পুরস্কৃত করা হয়। চেহারায় উজ্জ্বলতা চকমক করতে থাকে।
সুতরাং, হিম্মতের সাথে এই লড়াইটির জন্য সচেতন সতর্ক ও প্রস্তুত থাকো।
📄 দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্কতা
দুনিয়া হলো একটি ফাঁদ।
মূর্খ ব্যক্তি প্রথম পদক্ষেপেই এতে আপতিত হয়। কিন্তু বুদ্ধিমান মুত্তাকি ব্যক্তি ক্ষুধার ওপর ধৈর্যধারণ করে। ফাঁদের দানার চারপাশে ঘুরতে থাকে। দানা খায় না। তবে এখান থেকে দূরে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ।
কারণ, অনেক লড়াইকারী ধৈর্যশীল ব্যক্তিকে দেখেছি, বছরের পর বছর ধৈর্য ধরে থেকেছেন; কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন।
সুতরাং খুবই সতর্কতা প্রয়োজন! অনেক মানুষ তো প্রায় জীবনভর সঠিক পথে থেকে কবরের প্রান্তে এসে ভ্রান্ত হয়েছে। তীরে এসে তরী ডুবিয়েছে।
📄 একাগ্রচিত্ত হিকমত
একবার আমি একটি বিষয়ে ভীষণ সংকটের মধ্যে পড়ে যাই। বিষয়টি আমাকে সর্বক্ষণ চিন্তিত ও বিষণ্ণ করে রাখে। অসহ্য সংকটটি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমি সকল প্রকার পদ্ধতি ও কৌশল অবলম্বন নিয়ে ব্যাপক চিন্তা করছিলাম। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ এক সময় কোরআনের এই আয়াতের কথা মনে পড়ল- ( وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا )
যে-কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে উত্তরণের কোনো পথ তৈরি করে দেবেন। [সুরা তালাক : ২]
আমি এর দ্বারা যেন নতুন করে জানলাম, তাকওয়াই হলো সকল প্রকার দুঃখ-চিন্তা থেকে মুক্তির উপায়। সে মতে আমি সকল ক্ষেত্রে তাকওয়ার বিষয়টি আরও জোরদারভাবে লক্ষ করতে লাগলাম। আল্লাহর রহমে আমি আমার সংকট থেকে মুক্ত হয়ে গেলাম।
সুতরাং প্রতিটি মানুষের জন্য উচিত, শুধু আল্লাহ তাআলার ওপরই ভরসা করা, তার কাছে প্রার্থনা করা এবং তার আনুগত্যের চিন্তা করা। তার আদেশ-নিষেধগুলো মান্য করা। কারণ, প্রতিটি পেরেশানি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এটিই একমাত্র পথ।
এরপর মুত্তাকির জন্য এটাও জানা উচিত, আল্লাহ তাআলাই তার জন্য যথেষ্ট। সুতরাং সে তার অন্তর অন্যকিছুর দিকে ঝুঁকাবে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
﴿وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ﴾ যে-কেউ আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, আল্লাহই তার (কর্ম সম্পাদনের) জন্য যথেষ্ট। [সুরা তালাক: ৩] এরপর আল্লাহ তাআলা তার ভরসা অনুযায়ী তার জন্য এমন ব্যবস্থা করবেন, কোনো কল্পনাকারীও যা কল্পনা করতে পারে না। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
﴿وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾ এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দান করবেন, যা তার ধারণার বাইরে। [সুরা তালাক: ৩]