📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 উচ্চাভিলাষ

📄 উচ্চাভিলাষ


সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, তোমাকে হয়তো হৃদয়ভরা উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেওয়া হলো; কিন্তু সে অনুযায়ী কাজ করার শক্তি ও সামর্থ্য তোমাকে দেওয়া হলো না। তোমার উচ্চ হিম্মতের কারণে অন্যদের অনুগ্রহ গ্রহণ তোমার নিকট খুবই বড় ও কষ্টকর মনে হয়। কিন্তু তুমি যদি দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েই যাও- তখন তোমাকে তাদের অনুগ্রহ গ্রহণ করতে হয়। এটাও তোমার জন্য বড় কষ্টকর।
মনে করি, তোমার রুচি-চরিত্র খুবই অভিজাত, সাধারণ সহজলভ্য খাবার তোমার রুচিসম্মত হয় না। এ কারণে তোমাকে খাবারের জন্য বেশি খরচ করতে হয়।
আবার এদিকে তোমার সম্পদ কম, কিন্তু আশা ও আকাঙ্ক্ষা হলো রূপসী সুন্দরী বিয়ে করার। কিন্তু দরিদ্রতা এক্ষেত্রেও তোমার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ইলমের প্রতি তোমার ঝোঁক হলো প্রেমাস্পদের মতো। কিন্তু তোমার দুর্বল শক্তিহীন শরীর সেগুলো অব্যাহত অধ্যয়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক কিতাব ক্রয়ের জন্য যে টাকা-পয়সা দরকার, তা থেকেও তোমার হাত খালি।
মনে করি, তোমার প্রবল আকাঙ্ক্ষা হলো, আরেফ ও জাহেদদের মর্যাদা প্রাপ্তির। কিন্তু দুনিয়ার উপার্জনের বাধ্যবাধকতার কারণে দুনিয়াদারদের সাথে তোমার দিবস-রজনী অতিবাহিত হয়।
এগুলো একটি স্পষ্ট ভয়াবহ পরীক্ষা ও কষ্টের বিষয়।
কিন্তু যার মানসিকতা অতি নিম্নমানের- মানুষদের নিকট প্রার্থনা করতে কিংবা হাত পাততে তার কোনো লজ্জাবোধ নেই। স্বল্প ইলম ও জ্ঞান নিয়েই সে সন্তুষ্ট থাকে। আরেফদের অবস্থা ও মর্যাদাপ্রাপ্তিরও কোনো আশা-আকাঙ্ক্ষা রাখে না। এমন ব্যক্তিকে কোনোকিছুর বঞ্চনাই কষ্ট দেয় না। সে যা পেয়েছে এবং যে অবস্থায় রয়েছে- সেটাকেই সে শেষসীমা হিসেবে ভেবে নিয়েছে। এতেই সে বাচ্চাদের মতো রঙিন তুচ্ছ জিনিসে আনন্দ প্রকাশ করে চলেছে। এর কোনোকিছুই তার সম্মানবোধে আঘাত করে না। তার কোনো সমস্যা বোধ হয় না।
কিন্তু সমস্যাটা দাঁড়ায় জ্ঞানে ও সম্পদে উচ্চাভিলাষী রুচিবান ব্যক্তির ক্ষেত্রে- তার উচ্চাশা তাকে সকল বিপরীত জিনিস একত্রকরণের দিকে ঠেলে নিতে চায়- যাতে সে সকল দিক দিয়ে পূর্ণতায় উপনীত হতে পারে। কিন্তু তার মানবিক ত্রুটিগুলো তার লক্ষ্যে পৌঁছুতে দেয় না। এটাই তার কষ্ট ও পরীক্ষার বিষয়। এই হলো সেই অবস্থা, যেখানে এসে অনেক সময় ধৈর্যশীলদেরও ধৈর্যের পাথেয় ফুরিয়ে যায়।
কিন্তু যার হিম্মত এর চেয়েও আরও উঁচু- সে কখনো হিম্মত হারিয়ে নিচে আপতিত হয় না। সে কখনো নিরাশ হয় না।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 দৃঢ়তাই প্রধান

📄 দৃঢ়তাই প্রধান


একবার আমার নফস তার কিছু চাহিদা পূরণের জন্য আমাকে একটি ভ্রান্ত ব্যাখ্যার প্রতি প্ররোচিত করছিল।
আমি তাকে বললাম, আল্লাহর দোহাই, ধৈর্যধারণ করো। কারণ, যে ব্যক্তি সমুদ্রের নানা রঙ ও চমৎকার দৃশ্যাবলিতে বিমুগ্ধ হয়ে তার ঢেউয়ের আধিক্য নিয়ে সতর্ক থাকে না, সে অচিরেই ডুবে মরে। সুতরাং যখন তুমি কোনো কাজের ইচ্ছা করো, তখন তা অর্জনের সীমানা নির্ধারণ করো এবং লক্ষ করো তার পরিণামের কথা। এবং জেনে নাও- এর দ্বারা তোমার কী অর্জন হবে। এটার অর্জন যদি তোমার সামান্যতম অনুশোচনারও কারণ হয় এবং এর দ্বারা আল্লাহ তাআলার ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির আশঙ্কা হয়, তবে এর বিনিময়ে যদি তোমার 'দুনিয়ার কথিত জান্নাত'ও মেলে, তবুও তোমার জন্য আফসোস ছাড়া কিছু নেই। এর থেকে বিরত থাকো।
হে নফস, জেনে রেখো, এতদিন এলোমেলোভাবে যা অতিবাহিত হয়েছে- তা তো হয়েছেই। আল্লাহ তাআলা কখনো ধরেছেন- কখনো ছেড়েছেন। কিন্তু কিয়ামতের দিনে ন্যায়পূর্ণ হিসাবের দাঁড়িপাল্লায় 'অণু-পরমাণু' পরিমাণও প্রকাশিত হয়ে পড়বে। সুতরাং জীবন-মৃত্যুর ব্যাপারে সতর্ক হও এবং তার দিকে লক্ষ রাখো, যিনি তোমার ভালো-মন্দের কথা, বেশি ও কমতির কথা ছড়িয়ে দেবেন।
সেই সত্তার প্রশংসা, যিনি অদৃশ্যের সকল বিষয় জানেন এবং মানুষের সামনে তার প্রতিফল প্রকাশ করে দেন। এর প্রেক্ষিতে ভালো সৎ ব্যক্তিদের প্রতি মানুষের অন্তরের ভালোবাসা ঝুঁকতে থাকে। এবং অসৎ লোকদের প্রতি অসন্তুষ্টি আসতে থাকে। কিন্তু এগুলো তারা অনেক সময় কোনো প্রকার কারণ না জেনেই করতে থাকে।
এ সময় ইবলিস এসে বলে, তবে কি তুমি শুধু মানুষের কিছু প্রশংসা পাওয়ার জন্য তোমার দুনিয়ার লক্ষ্য ও চাহিদা বিসর্জন দেবে?
আমি বললাম, না, কিছুতেই না। মানুষের প্রশংসার জন্য কেন! এটা তো আমার মূল লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রাসঙ্গিক অনিবার্য কিছু অর্জন। এটা তো মূল লক্ষ্য নয়। মূল লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হলে মানুষের প্রশংসা আপনিই এসে যায়।
আমরা দেখি, কেউ কেউ শত মাইলের দৌড় প্রতিযোগিতা করে, উদ্দেশ্য- তাকে যেন 'শ্রেষ্ঠ দৌড়বিদ' বলা হয়। কিন্তু মুত্তাকি ব্যক্তি যদিও প্রশংসা ও সম্মান প্রাপ্ত হয়, কিন্তু এটা তো তার কাম্য নয়। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাসঙ্গিকভাবে আপনিই এসে যায়।
যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمَنُ وُدًّا )
নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং অনেক সৎকর্ম করে, দয়াময় আল্লাহ তাদের জন্য (সকলের অন্তরে) ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন।
[সূরা মারয়াম : ৯৬]
তখন নফস চিৎকার করে বলে উঠল, তবে কি তুমি আমাকে আজাবের ওপর ধৈর্যধারণের আদেশ দিতে চাচ্ছ? কারণ, আমার চাহিদাগুলো বর্জন করা তো আমার জন্য আজাবস্বরূপ।
আমি তাকে বললাম, দেখো, তোমার প্রতিটি অবৈধ চাহিদা বর্জনের পরিবর্তে বিনিময় রয়েছে। প্রতিটি বর্জনের জন্য তুমি তার উত্তম বিনিময় পাবে। তাছাড়া তুমি তো রয়েছ একজন বান্দার স্তরে। আর একজন শ্রমিকের জন্য কর্মের সময়ে বিশ্রামের পোশাক সমীচীন নয়। তাকওয়ার প্রতিটি সময় দিবসের রোজার মতো। যে ব্যক্তি পরিণামের ভয় করে, সে তার চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। আর যে নৈকট্যের আশা করে, সে তাকওয়া অর্জন করে। আর ধৈর্যের মিষ্টতা প্রকাশ পায় ঘটনার অনেক পরে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 প্রবৃত্তির আগুন

📄 প্রবৃত্তির আগুন


অধিকাংশ ব্যক্তির নফস তাকে অবৈধ আনন্দের দিকে প্ররোচিত করে এবং তার দৃষ্টিকে এর পরিণাম ও শাস্তি থেকে সরিয়ে রাখে। কিন্তু আকল বা বিবেকের কণ্ঠ তাকে বলতে থাকে, তোমার কী হলো? তুমি এটা করো না। এতে তোমার উচ্চে আরোহণ ব্যাহত হবে। তুমি নিচের দিকে নামতে থাকবে। দোহায় তোমার, যা করতে চাচ্ছ- তা থেকে বিরত থাক।
কিন্তু তার প্রবৃত্তির ভীষণ কাম্যতা তাকে এ কথাগুলোর দিকে মনোনিবেশ করতে দেয় না। পরিণামে সে গোনাহে লিপ্ত হয় এবং ক্রমে অধঃপতনের দিকে ধাবিত হতে থাকে।
তার এই খারাবিকে গ্রহণের দৃষ্টান্ত হলো গল্পের সেই কুকুরের মতো। গল্পটি এমন-
একদিন এক কুকুর এসে সিংহকে বলল, হে প্রাণীদের রাজা, আপনি আমার নামটি পরিবর্তন করে দিন। আমার এ নামটি খুবই নিকৃষ্ট ও অপমানকর। এটা আমার পছন্দ হয় না।
সিংহ বলল, তুমি হলে একটি বিশ্বাসঘাতক প্রাণী। এ নামটিই তোমার জন্য মানানসই। ভালো কোনো নাম তোমার উপযুক্ত নয়।
কুকুর বলল, কিছুতেই আমি বিশ্বাসঘাতক প্রাণী নই। আমাকে একবার পরীক্ষা করেই দেখুন।
সিংহ কুকুরের দিকে এক টুকরো গোশত ছুড়ে দিয়ে বলল, 'তুমি এটি আগামীকাল পর্যন্ত আমার জন্য সংরক্ষণ করে রাখবে। কাল যখন গোশতের টুকরোটি নিয়ে আমার নিকট আসবে, তখন আমি তোমার নাম পরিবর্তন করে দেবো।'
কুকুর গোশতের টুকরোটি নিয়ে বিদায় নিল। কিছুক্ষণ পর সে যখন ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ল, গোশতের দিকে লোভাতুরভাবে তাকাল। কিন্তু নিজেকে সংবরণ করে রাখল। ধৈর্যধারণ করল। মনকে বোঝাল- নাম পরিবর্তন করতে চাইলে এটা খাওয়া যাবে না। কিন্তু একসময় যখন তার খাওয়ার কামনা আরও তীব্র হয়ে উঠল, তখন সে মনে মনে বলল, আমার এ নামেই বা ক্ষতি কী! 'কুকুর' নামটি তো একেবারে খারাপ না! ভালোই তো। এই বলে কুকুরটি তার কাছে রক্ষিত গোশতের টুকরোটি খেয়ে নিল।
মানুষের নিম্নতম মানসিকতাও ঠিক এমনই। নিজের অমর্যাদাকর অবস্থা নিয়েই সে সন্তুষ্ট থাকে। পরিশ্রমলব্ধ শ্রেষ্ঠ জিনিসের চেয়ে তাৎক্ষণিক ও সাময়িক আনন্দকেই সে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
আল্লাহর দোহাই! নফস যখন উত্তেজিত হয়ে ওঠে, তখনকার সেই আগুন থেকে সতর্ক থাকো। কীভাবে তাকে নেভানো যায়- তা নিয়ে চিন্তা করো। কারণ, কিছু কিছু পদস্খলন মানুষকে তলাহীন কুয়ার মধ্যে ফেলে দেয়। কিছু কিছু কলঙ্ক-দাগ- কিছুতেই আর মুছে না। যা হারিয়ে যায়, তা আর কিছুতেই পাওয়া যায় না। সুতরাং ফিতনার উপকরণগুলো থেকে দূরে থাকো। কারণ, নিকটবর্তী হওয়াই এমন একটি পরীক্ষা- যাতে অধিকাংশ মানুষই ফেল করে। নিরাপদ থাকতে পারে না।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 শয়তানের সাথে লড়াই

📄 শয়তানের সাথে লড়াই


আমি যখন ভিন্ন একদৃষ্টি নিয়ে মানুষের অবস্থার দিকে তাকাই, তখন তাদের সকলকে যুদ্ধের ময়দানে কাতারবদ্ধ দেখতে পাই।
কার সাথে যুদ্ধ? শয়তানের সাথে।
শয়তান ক্রমাগত মানুষের দিকে বিভিন্ন প্রবৃত্তির তির নিক্ষেপ করছে। ভোগ-উপভোগ, আনন্দ-স্ফূর্তির তরবারি চালনা করে। যার একটু দুর্বল ঈমান, এলোমেলো চলাচল, অস্বচ্ছ লেনদেন- এগুলোর আঘাতে প্রথমেই সে ধরাশায়ী হয়ে যায়। পরাজিত হয়।
কিন্তু যারা মুত্তাকি, খোদাভীরু, মজবুত ঈমানের অধিকারী- তাদেরকে জানপ্রাণ কষ্ট করে লড়াইয়ে টিকে থাকতে হয়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়। তারা তবুও অনড় ও অটল থাকে। আঘাতে আঘাতে তাদের অন্তরের দেহ ক্ষত-বিক্ষত হয়। কিন্তু তারা হেরে যায় না। নতও হয় না। তারা আহত হয়, আবার ওষুধ লাগায়। এবং শেষমেশ মৃত্যুর মাধ্যমে সংরক্ষিত ও নিরাপদ হয়ে যায়।
বরং তাদের এই প্রতিটি আঘাত ও ক্ষতের বিনিময়ে পুরস্কৃত করা হয়। চেহারায় উজ্জ্বলতা চকমক করতে থাকে।
সুতরাং, হিম্মতের সাথে এই লড়াইটির জন্য সচেতন সতর্ক ও প্রস্তুত থাকো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00