📄 ইন্দ্রিয় ও আকলের আনন্দ অনুভব
মানুষের সকল সুখানুভব দুই ভাগে বিভক্ত।
১. ইন্দ্রিয়জাত- অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখটা অনুভব করা হয়।
২. মস্তিষ্ক বা হৃদয়জাত- অর্থাৎ মস্তিষ্ক বা হৃদয় দ্বারা অনুভব করা হয়। তবে সবচেয়ে তীব্র সুখানুভব হয় ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই এবং তার সর্বোচ্চ স্তর হলো সহবাস।
আর আকল বা মস্তিষ্কের সর্বোচ্চ সুখানুভব ঘটে ইলম বা জ্ঞানার্জনে।
যে ব্যক্তি এই দুটি জিনিসই দুনিয়াতে যথার্থ পরিমাণে অর্জন করতে সক্ষম হয়, তার মতো সুখী আর কেউ হয় না।
কিন্তু আমি তো শিক্ষার্থীদের এর চেয়ে আরও উচ্চের ও ঊর্ধ্বর স্তরের দিকে পথ দেখাতে চাই। তাদের সুখ যেন শুধু অর্জনেরই সুখ নয়; তা হবে 'পাগলপ্রায়' আনন্দ ঢেউয়ের মতো- তা হলো, ইলমের সাধনায় নিমগ্ন হওয়া।
কিন্তু ইলম অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীর মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। যেমন উঁচু হিম্মত থাকতে হবে। এই হিম্মত আবার কারও ক্ষেত্রে শৈশব থেকেই প্রকাশ পায়। এ ধরনের কোনো বাচ্চাকে শৈশব থেকেই ভালো ভালো ব্যতিক্রম বিষয় গ্রহণ করতে দেখা যায়।
যেমন বর্ণনা করা হয়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিবের একটি মূল্যবান গালিচা ছিল। সেটা 'দারুন নাদওয়া'র কামরায় বিছানো থাকত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শৈশবের সেই ছোট বয়সে এই একান্ত গালিচার ওপর এসে বসতেন। তখন দাদা আবদুল মুত্তালিব বলতেন, 'নিশ্চয় আমার এ নাতির আলাদা একটি আভিজাত্য রয়েছে।'
এক্ষেত্রে কেউ যদি বলেন, আমার তো হিম্মত, শক্তি ও সাহস রয়েছে; কিন্তু যা কামনা করি তার কোনোটিই প্রাপ্ত হই না- আসলে এর কী সমাধান?
উত্তরে আমি বলব, কিছু ক্ষেত্রে সফল না হতে পারা সকল ক্ষেত্রে সফল না- হওয়াকে আবশ্যক করে না। তোমার উপযুক্ত কোনো একটা পথ তো বের হবেই। তাছাড়া, তোমাকে হিম্মত ও সাহস প্রদান করা হয়েছে, আর সেটা কার্যকর করার জন্য তোমাকে সাহায্য করা হবে না- এমন তো কখনো হবে না।
বরং তুমি গভীরভাবে তোমার নিজের দিকে আবার একটু তাকাও, সম্ভবত, তিনি তোমাকে এমন কিছু দিয়েছেন, যার শুকরিয়া তুমি করোনি। কিংবা প্রবৃত্তির বাসনার কোনো বিষয়ে তোমাকে পরীক্ষা করা হয়েছে; কিন্তু তুমি তাতে ধৈর্যধারণ করোনি।
আবার এটাও জেনে রেখো, তোমার থেকে হয়তো এই কারণে দুনিয়ার বেশি উপযোগিতা সরিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে তুমি বেশি বেশি ইলম ও প্রজ্ঞার স্বাদ অনুভব করতে পারো। কারণ, তুমি একজন মানুষ। খুবই দুর্বল। দুনিয়ার ভোগ ও ইলমের স্বাদ- উভয়টি সমানভাবে একত্রে সন্নিবেশ করতে তুমি শক্তি রাখো না। তাই তোমাকে ইলমের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তোমার প্রতিপালক- তিনিই তোমার তুলনামূলক কল্যাণের ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো জানেন।
এবার তোমাকে জীবনসূচনার বিবরণগুলো বলি- একটি কিশোরের জন্য উচিত হবে, কোরআন দিয়ে শিক্ষা শুরু করা। এরপর সকল প্রকার ইলম থেকে প্রাথমিক জ্ঞানগুলো অর্জন করা। এবং এগুলোর মাঝে ইলমে ফিকহকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া। শুধু বর্ণনার ওপর নির্ভর করবে না। নিজেও চিন্তা-ভাবনা করবে। এরপর যখন এগুলো স্পষ্টভাবে জানা হয়ে যাবে- সেই সাথে অর্জিত হবে ভাষা-সাহিত্যের জ্ঞান, তখন তার ভাষা ও বক্তব্য হয়ে উঠবে অধিকতর ধারালো শক্তিশালী ও হৃদয়গ্রাহী। এভাবে সে যদি সত্যকে চেনার হক আদায় করে এবং রবের প্রতি অনুগত থাকে, তবে তার জন্য এমন এমন সৌভাগ্যের দরজা খুলে যাবে- যা সে কল্পনাও করতে পারে না।
এরপর তার জন্য উচিত হবে, খুবই সতর্কতার সাথে কিছু সময় কোনো উপার্জন বা ব্যবসায় ব্যয় করা। কিন্তু সরাসরি সার্বক্ষণিকভাবে তাতে যুক্ত থাকবে না। আর খরচ ও জীবনযাপনের ক্ষেত্রে খুবই মিতব্যয়ী হবে। অপচয় ও অপব্যয় থেকে বিরত থাকবে।
কিন্তু কখনো কখনো ইলমের বর্ণনা, প্রচার ও আমল- ধীরে ধীরে কাউকে আল্লাহ তাআলার মারেফাতের দিকে এমনভাবে ধাবিত করতে থাকে যে, সে এতেই মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সাংসারিক বিষয়াবলির কথা ভাবার যেন সময় থাকে না। ইলমের এই স্বাদ ও আস্বাদন তাকে সকল কিছু থেকে মুখাপেক্ষীহীন করে রাখে। তার আর বাহ্য উপভোগের কোনো প্রয়োজন পড়ে না।
কিন্তু কেউ যদি নিজের মধ্যে বাহ্যিক উপভোগ্যতার তীব্র আকর্ষণ বোধ করে, তবে তার জন্য উচিত হবে দ্রুত বিয়ে করে নেওয়া। কিন্তু এতেও আবার এমনভাবে মগ্ন হয়ে পড়বে না যে- শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। দ্রুত শক্তি ক্ষয় হয়ে যায়। তাহলে তো তার আসল উদ্দেশ্য- ইলমই হাতছাড়া হয়ে যাবে। ইন্দ্রিয় ও মস্তিষ্কের আনন্দ উপভোগ্যতার কিছু বিষয় এখানে ইশারার মাধ্যমে উল্লেখ করলাম। আর যা বিস্তারিত উল্লেখ করা হলো না, সেগুলো ইশারার মাধ্যমেই বুঝে নাও।
📄 ইলম সংরক্ষণের পদ্ধতি
জেনে রেখো, সকল তালিবুল ইলম বা শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজন হলো তার অধ্যয়নকে অব্যাহত ও সচল রাখা- পরিমাণে কম হলেও এবং বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে হলেও।
কিন্তু একটা ভুল পদ্ধতি হলো, রাতদিন একাকার করে কিছু পড়া বা অধ্যয়ন করা এবং করতেই থাকা। কারণ, এ ধরনের অধ্যয়নকারী কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে নিজেই পড়া ছেড়ে দেবে কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।
হজরত আবু বকর ইবনুল আনবারীর অবস্থা আমরা নিজেরাই দেখেছি। তিনি যখন মৃত্যুশয্যায় বিছানাগত। ডাক্তার এলেন দেখতে। ডাক্তার কামরায় প্রবেশ করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে তার শত শত কিতাবের দিকে দৃষ্টি বোলালেন। এরপর রোগীকে বললেন, আপনি আসলে এমন কাজ করতেন, যা কোনো মানুষ করতে পারে না। এই জন্যই আজ এই অবস্থা।'
ডাক্তার তার সাধ্যমতো ব্যবস্থাপত্র দিয়ে বের হয়ে গেলেন। ইবনুল আনবারী তার গমনপথের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তিনি আমার কোনো উপকার করতে পারবেন না।'
এ সময় তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি আসলে কী করতেন? ডাক্তার কিসের কথা বলে গেল?
জবাবে তিনি বললেন, আমি প্রতি সপ্তাহে দশ হাজার পৃষ্ঠা অধ্যয়ন করতাম।
জীবনের এই হলো সেই ভুল পদ্ধতি- অনেক আবেগি আগ্রহী ও জেদি মানুষ যা করে থাকে।
তাছাড়া আরেকটি ভুল পদ্ধতি হলো, বেশি বেশি মুখস্থ করার চেষ্টা করা এবং অনেক প্রকার শাস্ত্র বা বিষয় মুখস্থ করার ক্ষেত্রে নিজের ওপর চাপ বাড়ানো। সকল অঙ্গের মতো অন্তর বা মস্তিষ্কও একটি অঙ্গ। যেমন একটি মানুষ হয়তো সহজেই ১০০ রিতল বহন করতে পারে। সেখানে আরেকজনের জন্য হয়তো ২০ রিতল বহন করাই কষ্টকর। অন্তর বা মস্তিষ্কও ঠিক এই রকম- মানুষভেদে তার সক্ষমতার তারতম্য রয়েছে। সুতরাং মানুষের জন্য কর্তব্য হলো- তার সাধ্যানুযায়ী কিংবা তার চেয়েও কিছুটা কম বহন করা। কারণ, সাধ্যাতীত কিছু বহনের ক্ষেত্রে একবার যদি পদস্খলন ঘটে, একবার যদি বিচ্যুতি ঘটে, তবে হয়তো চিরদিনের জন্যই তার আগ্রহের সকল কিছু হারাতে হবে!
যেমন, কোনো পেটুক ও লোভী ব্যক্তি সাধ্যের বাইরে গিয়ে আরও দু-এক লোকমা ভক্ষণ করল, তাহলে এমনও হতে পারে, এই অতিরিক্ত দুটি লোকমাই তাকে জীবনের অনেক খাবার থেকে বঞ্চিত করবে।
এ কারণে সাধ্য ও সামর্থ্যের মধ্যে চলাই সঠিক পথ। শ্রম বা অধ্যয়নকে সে দিনরাতের মধ্যে বণ্টন করে নেবে। বাকি সময়গুলোতে নিজেকে একটু শান্তি ও স্বস্তি প্রদান করবে।
সব কথার মূলকথা হলো, সাধ্যের মধ্যে নিরবচ্ছিন্নতা বজায় রাখা। এমন অনেক মুখস্থকারীকে দেখা যায়, একবারে অনেক মুখস্থ করেছে; কিন্তু দীর্ঘদিন আর সেগুলো স্মরণ করেনি। ফলে ভুলে গেছে। সেগুলোই পুনরায় মুখস্থ করতে আবার সময় দিতে হয়েছে।
হিফজ বা মুখস্থের জন্য জীবনের বিশেষ কিছু সময় রয়েছে। এগুলোর মধ্যে শৈশব ও কৈশোরই হলো উত্তম সময়। আর মুখস্থের জন্য প্রভাত ও দিবসের অর্ধভাগই সবচেয়ে উত্তম। তাছাড়া সন্ধ্যার চেয়ে অন্য সকল সময়ই উত্তম। ৭৯ এভাবে পেটপূর্ণ অবস্থার চেয়ে কিছুটা ক্ষুধার অবস্থাই উত্তম।
তবে চারপাশের বিশাল সবুজ এবং নদীর তীরবর্তী স্থান মুখস্থের জন্য আদর্শ স্থান নয়। কারণ, বাইরের আকর্ষিত পরিবেশ মনকে ভিন্ন দিকে টেনে নিয়ে যায়। নিচু স্থানের চেয়ে উঁচু স্থান হিফজের জন্য ভালো। তবে নির্জনতা ও নীরবতা সব সময়ই কাম্য।
কিন্তু সকল কথার মূলকথা, হিফজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো, মনোযোগিতা এবং একাগ্রতা।
সপ্তাহে একদিন নিজেকে মুখস্থ থেকে অব্যাহতি প্রদান করা প্রয়োজন। তাহলে এটি অন্তরকে শক্তিশালী করবে। নিজেকে স্বতঃস্ফূর্ত ও সতেজ রাখবে। যেমন কোনো ঘর বা বিল্ডিং বানানোর সময় কাঁচা নতুন গাঁথুনিকে কয়েকদিন ফেলে রাখা হয়- যাতে সেটা শক্ত ও মজবুত হয় এবং তার উপর নতুন করে গাঁথুনি দেওয়া যায়।
মুখস্থ অল্প হোক- কিন্তু সেটা অব্যাহত রাখাটাই আসল। আগের পড়াটি মজবুত ও টেকসই না করে নতুন পড়া শুরু করবে না। আর যে মুখস্থ করতে উৎসাহ পায় না, তার মুখস্থ না করাই ভালো। কারণ, এভাবে নফসের ওপর বল প্রয়োগ করা ভালো নয়। যেকোনো বিষয়ে মানুষের স্বভাব, রুচি ও মেজাজ সংগতিপূর্ণ হওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা লক্ষ রাখা চাই।
এছাড়াও খাবার-খাদ্যের ভিন্নতার মাঝেও হিফজের কিছু প্রভাব রয়েছে। কিছু কিছু খাবার হিফজশক্তিকে বাড়িয়ে তোলে। কোনোটা কমিয়ে দেয়। এক্ষেত্রেও সাধ্যমতো সঠিক খাবার খাওয়া উচিত।
ইমাম জুহরি রহ. বলেন, আমি যখন থেকে হিফজ শুরু করেছি, (কোরআন, হাদিস) তারপর আর কখনো সিরকা (একপ্রকার টকজাতীয় পানীয়) পান করিনি।
একবার ইমাম আবু হানিফা রহ.-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি এত ফিক্হ মুখস্থ রাখেন কীভাবে?
জবাবে তিনি বলেন, নির্বিঘ্ন মনোযোগের মাধ্যমে।
একই প্রশ্নের উত্তরে হাম্মাদ ইবনে সালামা রহ. বলেন, দুঃখ-দুশ্চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রেখে।
হজরত মাকহুল রহ. বলেন, যার কাপড় বেশি পরিষ্কার, তার মনোযোগিতায় বিঘ্ন ঘটে। তবে যে ব্যক্তি সুঘ্রাণ ব্যবহার করে, তার মেধা-বুদ্ধি বেড়ে যায়। কিন্তু যে ব্যক্তি এ দুটির (পরিষ্কার পোশাক ও সুঘ্রাণ) মাঝে সমন্বয় করতে পারে, তার পৌরুষ ও আভিজাত্য বেড়ে যায়।
আমি মনে করি, ইলমের অন্বেষণে যারা নবীন, যথাসম্ভব তাদের দেরিতে বিয়ে করাই উত্তম। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. জীবনের চল্লিশ বছরে এসে বিয়ে করেছিলেন। এটার কারণ, যাতে ইলমের অন্বেষণে নির্বিঘ্ন মনোযোগ দেওয়া যায়। কিন্তু কারও জন্য যদি কষ্টকর হয় এবং জিনায় লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা হয়, তাহলে সে বিয়ে করে নিতে পারে। তবে যথাসম্ভব বেশি সঙ্গ ও আসঙ্গ এড়িয়ে চলবে। যাতে শক্তি অটুট থাকে এবং ইলম অন্বেষণে অধিক সময় ব্যয় করা যায়। এবং ইলম সংরক্ষণ করা যায়। কারণ, জীবন অতি মূল্যবান ও অল্প। কিন্তু ইলম অনেক বেশি ও ব্যাপ্ত।
কিছু মানুষকে দেখি, তারা এমন বিষয় মুখস্থের মধ্যে সময় ব্যয় করে, অথচ অন্যটি ছিল তার চেয়ে উত্তম। যদিও সকল ইলমই উত্তম ও মূল্যবান- কিন্তু এর মধ্যেও সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেই প্রথমে প্রাধান্য দিতে হবে।
এ কারণে তোমার প্রথম ও প্রধান কাজ হবে কোরআন হিফজ করা। এরপর ফিকহ। এরপর অন্য বিষয়গুলো। যার সচেতনতা রয়েছে, সে নিজেই বুঝে নিতে পারে, কোনটি অগ্রগণ্য আর কোনটি পশ্চাদগণ্য- এর জন্য আলাদা কোনো দলিল-প্রমাণ লাগে না। আর যে ব্যক্তি তার ইলমের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায়, তার লক্ষ্যই তো তাকে শ্রেষ্ঠ ও অগ্রগণ্য ইলমের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- وَاتَّقُوا اللَّهَ وَيُعَلِّمُكُمُ اللَّهُ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ)
তোমরা অন্তরে আল্লাহর ভয় রেখো। আল্লাহই তোমাদের শিক্ষা দেবেন। এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞাত। [সুরা বাকারা: ২৮২]
টিকাঃ
৭৯. এটা হয়তো সেই সময়ের জীবনযাপনের পদ্ধতি অনুসারে। তখন মাগরিবের পরই খাওয়া-দাওয়া হয়ে যেত। নামাজ পড়ে ঘুম। এখন অবস্থা অনেকটাই পাল্টে গেছে। তাই কথাটি এখন আর এ সময়ের জন্য প্রযোজ্য না-ও হতে পারে।
📄 মানুষের গোনাহ ও তাওবা
যে ব্যক্তি স্থায়ী নিরাপত্তা ও শান্তি চায়, সে যেন আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে চলে। কারণ, যে ব্যক্তি তাকওয়াহীন কোনো বিষয়ে নিজেকে জড়িয়েছে, তা যত ছোটই হোক, সে তার শাস্তি অবশ্যই পেয়েছে- তাৎক্ষণিকভাবে কিংবা বিলম্বে।
অনেক সময় মানুষ ধোঁকা খায়। যেমন ধরো, তুমি কোনো গোনাহের কাজ করলে। এরপরও তুমি নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন জীবনযাপন করছ, আর ভাবছ সেটা তো তেমন অপরাধ ছিল না এবং ভুলে থাকো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- مَنْ يَعْمَلْ سُوءًا يُجْزَ بِهِ )
যে-কেউ কোনো অপরাধ করবে, তার প্রতিদান তাকে দেওয়া হবে। [সুরা নিসা: ১২৩]
কখনো নফস বলে, আল্লাহ হলেন গাফফার; তিনি তো এটা মাফ করে দেবেন।
নিঃসন্দেহে তিনি গাফফার, মাফ করে দেবেন; কিন্তু যাকে চান, তাকে মাফ করবেন।
আমি এই অবস্থাটা তোমার কাছে ব্যাখ্যা করে দিচ্ছি, তুমি একটু চিন্তা করে দেখো। এতেই তোমার কাছে 'মাগফিরাত'-এর প্রকৃত অর্থ স্পষ্ট হয়ে উঠবে। যেমন, কেউ হয়তো একটি ভুল করল কিংবা অপরাধ করল। কিন্তু এই অপরাধের ব্যাপারে তার কোনো ইচ্ছা ছিল না। এটা সংঘটিত হওয়ার আগে এ ব্যাপারে তার কোনো পরিকল্পনাও ছিল না। কিন্তু হয়ে গেছে। আবার এটি সংঘটিত হয়ে যাবার পর পুনরায় এটা করার কোনো ইচ্ছাও তার নেই। এ অবস্থায় এই হঠাৎ সংঘটিত অপরাধের ব্যাপারে সে সচেতন হয়ে ওঠে এবং আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে।
তখন তার এই কাজটি যদিও ইচ্ছার সাথেই সংঘটিত হয়েছে; কিন্তু এটি 'অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল' হিসেবেই গণ্য হবে।
যেমন ধরো, কোনো পুরুষের সামনে একজন রূপসী যুবতী মেয়ে [মেয়েদের ক্ষেত্রে যুবক] এসে পড়ল, মানবিক স্বভাবের তাড়নায় তার ওপর চোখ আটকে গেল। দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে দৃষ্টির স্বাদ অনুভব করল। আর এই আস্বাদনের বেহুঁশি তাকে যেন 'নিষিদ্ধ'র চিন্তা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। তার অবস্থা তখন আত্মভোলা কিংবা মোহগ্রস্ত ব্যক্তির মতো। নিজের কাজের ব্যাপারে যেন কোনো খেয়ালই নেই। কিন্তু যখন হঠাৎ সে সচেতন হয়ে ওঠে, তার মোহ কেটে যায়, তখন সে নিজের কাজের ব্যাপারে আফসোস ও অনুশোচনা করতে থাকে। আকুল হৃদয়ে মাওলার দরবারে তাওবা করে। আর এটিই যেন প্রবল বন্যা হয়ে তার গোনাহের সকল ময়দা-আবর্জনা দূর করে নিয়ে যায়।
যেন এটা ছিল নিছক এক 'ভুল'-যাতে তার কোনো ইচ্ছা ছিল না। এটা ক্ষমার আশা করা যায়।
আল্লাহ তাআলার এই আয়াতটি এদিকেই হয়তো ইঙ্গিত করছে-
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفُ مِنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمْ مُبْصِرُونَ)
যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে, তাদেরকে যখন শয়তানের পক্ষ হতে কোনো কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে, তখন তারা (আল্লাহকে) স্মরণ করে। ফলে তৎক্ষণাৎ তাদের চোখ খুলে যায়। [সুরা আরাফ: ২০১]
কিন্তু যে ব্যক্তি এই অবৈধ দৃষ্টি প্রদানের বিষয়টি অব্যাহত রাখে, বারবার সেদিকে দৃষ্টিপাত করে, তাহলে সে এই নিষিদ্ধ বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবেই করছে। সে যেন আল্লাহর নিষেধের বিরোধিতা করছে। এভাবে অব্যাহত গোনাহের পরিমাণ অনুপাতে তার থেকে তার ক্ষমার বিষয়টিও দূরে সরে যেতে থাকে।
তাওবা না করা এবং সে জন্য ক্ষমা না পাওয়ার একটি প্রতারণামূলক চিন্তা হলো- কৃত গোনাহের বিপরীতে কোনো শাস্তির ভাবনা মনের মধ্যে না রাখা। কিন্তু বিষয়টি তো এমন নয়। যেমন ইবনুল জালা তার নিজের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, আমি একদিন বাইরে দাঁড়িয়ে এক খ্রিষ্টান বালকের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে ছিলাম। এ সময় আমার শাইখ আমাকে এ অবস্থায় দেখে বললেন, এ কী করছ? অবশ্যই তুমি এর প্রতিফল দেখতে পাবে- দেরিতে হলেও।
এবং ঠিক তা-ই হলো, এর চল্লিশ বছর পর আমি কোরআন ভুলে গেলাম- যা আমার সম্পূর্ণ মুখস্থ ছিল।
জেনে রেখো, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, গোনাহের পরও নিরাপদ ও নির্ভাবনায় অবস্থান করা। কারণ, এখানে শাস্তি আসে বিলম্বে এবং ভয়াবহভাবে।
আর সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো, মানুষ এ ব্যাপারে সচেতন না থাকা। হয়তো তার দ্বীন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তার অন্তর কালো হয়ে যায়। নিজের জন্য সে খারাপ পথ অবলম্বন করে। অথচ বাহ্যিকভাবে তার শরীর সুস্থ থাকে। জাগতিক উদ্দেশ্যগুলো পূরণ হয়। সম্পদ-সচ্ছলতায় জীবন ভরে ওঠে। কিন্তু এটা তো তাকে ঢিল প্রদান করা হচ্ছে- এটা তো প্রবল ঝড় ও বর্ষণের আগে সাময়িক স্থিরতা।
এ বিষয়ে একজন সরাসরি ভুক্তভোগী বলেন, আমি একবার এমন দিকে দৃষ্টিপাত করেছিলাম, যা আমার জন্য জায়েয ছিল না। এরপর আমি এর শাস্তির জন্য ভয়ে ভয়ে দিন কাটাতে লাগলাম। এরপর হঠাৎ এক দীর্ঘ সফরের জন্য বের হলাম। সফরে ভীষণ কষ্টে আপতিত হলাম। সৃষ্টির মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় একজনের মৃত্যু হলো। আমার অনেক মূল্যবান জিনিস বিনষ্ট হয়ে গেল। আমি বুঝছিলাম- এর সবই আমার সেই কুদৃষ্টির ফল।
আমি প্রভুর দরবারে প্রবলভাবে তাওবা করতে লাগলাম। একসময় হয়তো মাফ করা হলো এবং অবস্থা ভালো হয়ে উঠল।
কিন্তু এরপর আবারও আমি একই ধরনের গোনাহে লিপ্ত হলাম- চোখের গোনাহ। এবার আমার অন্তর কালো হয়ে গেল। চোখের আদ্রতা ও কোমলতা চলে গেল। প্রথম যা হয়েছিল, তার চেয়ে অধিক পরিমাণে আমার থেকে দ্বীন উঠিয়ে নেওয়া হলো। মুহূর্তের অপরাধের কারণে যা প্রাপ্ত হলাম- তা প্রাপ্ত না হওয়া কতই না ভালো ছিল!
এরপর যখন সেই অপরাধের আনন্দ ও তার পরিমাণ এবং তার পরিবর্তে শান্তি ও তার পরিমাণ নিয়ে চিন্তা করলাম- আমার অন্তর আচমকা চাবুকের আঘাতে চিৎকার করে উঠল! এটা তুমি কেন করলে?
বন্ধুগণ,
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যদি চটের বিছানায় কুকুরের সাথেও ঘুমোতে হয়, তাহলেও তো সেটা তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য খুবই কম কষ্টের বিষয়। তাছাড়া তুমি পৃথিবীর সকল কাম্যবস্তুও যদি প্রাপ্ত হও, আর আল্লাহ তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন, তবে তোমার আজকের এই বাহ্যিক শান্তিই তোমার ধ্বংসের কারণ হয়ে ওঠবে। তোমার নিরাপত্তাই হবে তোমার ভয়ের কারণ। তোমার সুস্থতাই হবে তোমার রোগ।
জগতের সকল বিষয় বিবেচিত হয় তার সমাপ্তি দিয়ে। সুতরাং বুদ্ধিমান তো সেই ব্যক্তি, যে পরিণামের বিষয়ে লক্ষ রাখে।
বন্ধুগণ,
দ্বিপ্রহরের উত্তপ্ত কষ্টে পড়ে হলেও ধৈর্যধারণ করো, আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহম করবেন। তিনি কত দ্রুতই তো এটাকে দূর করে দিতে পারেন। আল্লাহই তাওফিকদাতা। তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ ছাড়া কোনো শক্তি ও আশ্রয় নেই।
📄 উচ্চাভিলাষ
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, তোমাকে হয়তো হৃদয়ভরা উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেওয়া হলো; কিন্তু সে অনুযায়ী কাজ করার শক্তি ও সামর্থ্য তোমাকে দেওয়া হলো না। তোমার উচ্চ হিম্মতের কারণে অন্যদের অনুগ্রহ গ্রহণ তোমার নিকট খুবই বড় ও কষ্টকর মনে হয়। কিন্তু তুমি যদি দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েই যাও- তখন তোমাকে তাদের অনুগ্রহ গ্রহণ করতে হয়। এটাও তোমার জন্য বড় কষ্টকর।
মনে করি, তোমার রুচি-চরিত্র খুবই অভিজাত, সাধারণ সহজলভ্য খাবার তোমার রুচিসম্মত হয় না। এ কারণে তোমাকে খাবারের জন্য বেশি খরচ করতে হয়।
আবার এদিকে তোমার সম্পদ কম, কিন্তু আশা ও আকাঙ্ক্ষা হলো রূপসী সুন্দরী বিয়ে করার। কিন্তু দরিদ্রতা এক্ষেত্রেও তোমার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ইলমের প্রতি তোমার ঝোঁক হলো প্রেমাস্পদের মতো। কিন্তু তোমার দুর্বল শক্তিহীন শরীর সেগুলো অব্যাহত অধ্যয়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক কিতাব ক্রয়ের জন্য যে টাকা-পয়সা দরকার, তা থেকেও তোমার হাত খালি।
মনে করি, তোমার প্রবল আকাঙ্ক্ষা হলো, আরেফ ও জাহেদদের মর্যাদা প্রাপ্তির। কিন্তু দুনিয়ার উপার্জনের বাধ্যবাধকতার কারণে দুনিয়াদারদের সাথে তোমার দিবস-রজনী অতিবাহিত হয়।
এগুলো একটি স্পষ্ট ভয়াবহ পরীক্ষা ও কষ্টের বিষয়।
কিন্তু যার মানসিকতা অতি নিম্নমানের- মানুষদের নিকট প্রার্থনা করতে কিংবা হাত পাততে তার কোনো লজ্জাবোধ নেই। স্বল্প ইলম ও জ্ঞান নিয়েই সে সন্তুষ্ট থাকে। আরেফদের অবস্থা ও মর্যাদাপ্রাপ্তিরও কোনো আশা-আকাঙ্ক্ষা রাখে না। এমন ব্যক্তিকে কোনোকিছুর বঞ্চনাই কষ্ট দেয় না। সে যা পেয়েছে এবং যে অবস্থায় রয়েছে- সেটাকেই সে শেষসীমা হিসেবে ভেবে নিয়েছে। এতেই সে বাচ্চাদের মতো রঙিন তুচ্ছ জিনিসে আনন্দ প্রকাশ করে চলেছে। এর কোনোকিছুই তার সম্মানবোধে আঘাত করে না। তার কোনো সমস্যা বোধ হয় না।
কিন্তু সমস্যাটা দাঁড়ায় জ্ঞানে ও সম্পদে উচ্চাভিলাষী রুচিবান ব্যক্তির ক্ষেত্রে- তার উচ্চাশা তাকে সকল বিপরীত জিনিস একত্রকরণের দিকে ঠেলে নিতে চায়- যাতে সে সকল দিক দিয়ে পূর্ণতায় উপনীত হতে পারে। কিন্তু তার মানবিক ত্রুটিগুলো তার লক্ষ্যে পৌঁছুতে দেয় না। এটাই তার কষ্ট ও পরীক্ষার বিষয়। এই হলো সেই অবস্থা, যেখানে এসে অনেক সময় ধৈর্যশীলদেরও ধৈর্যের পাথেয় ফুরিয়ে যায়।
কিন্তু যার হিম্মত এর চেয়েও আরও উঁচু- সে কখনো হিম্মত হারিয়ে নিচে আপতিত হয় না। সে কখনো নিরাশ হয় না।