📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 অন্তরের হিসাব-নিকাশ

📄 অন্তরের হিসাব-নিকাশ


বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত, তার সক্ষমতার অতিরিক্ত কোনো বিষয়ের প্রত্যয় না করা এবং তা বাস্তবায়িত করতে অগ্রসর না হওয়া। কারণ, বহু মানুষ আবেগের বশবর্তী হয়ে আকাশ সমান বিষয় জমিয়ে নেয়। কিন্তু ভেবে দেখে না- এগুলোর সাধনা ও অর্জনের কষ্টের ওপর সে ধৈর্যধারণ করতে পারবে কি না? এ ধরনের ব্যক্তি অবশেষে নিরাশ হয়, হতাশ হয়ে ফিরে আসে এবং লজ্জিত হয়।
এভাবে অন্যদের দেখাদেখিও কোনো জিনিস করতে না যাওয়া উচিত। ময়দানে নামার আগে নিজের ক্ষমতার ওজন মেপে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, সবার সক্ষমতা একরকম নয়।
যিনি বুদ্ধিমান- তিনি সব সময় নিজেকে মানুষদের মাঝে ‘মধ্যপন্থার’ পোশাকে আচ্ছাদন করে রাখেন। এর দ্বারা তিনি সম্পদশালীদের কাতার থেকে বের হয়ে যান না, আবার তাকে অভাবগ্রস্তও মনে হয় না। তার যদি আমল ও ইবাদতের আগ্রহ বেড়ে যায়, তিনি সেগুলো বাড়ির ভেতরে পালন করেন। আর সৌন্দর্যপূর্ণ কাপড় বর্জন করেন- নিজের অবস্থা অপ্রকাশিত রাখার জন্য। মানুষের সামনে সবকিছু প্রকাশ করে বেড়ান না। আর এভাবেই অহংকার থেকে দূরে থাকা যায়। আবার মানুষদের থেকে ‘কিপটে’র অপবাদও শুনতে হয় না।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সুখের পরে দুঃখ

📄 সুখের পরে দুঃখ


বোকার চেয়েও বোকা হলো সেই ব্যক্তি- বর্তমানের সুখকে যে এমন ভবিষ্যতের ওপর প্রাধান্য দেয়, যার অন্তহীন কষ্ট থেকে সে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ নয়।
আমরা পৃথিবীতেই এমন কত আমির, সুলতান ও ধনবান ব্যক্তির কথা শুনেছি- যারা, নিজেদেরকে অবাধ কামনা-বাসনা ও বিলাস-ব্যসনের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। হালাল-হারামের দিকে কোনো লক্ষ রাখেনি। কিন্তু মৃত্যুর সময় এসে শুধু আফসোসই করেছে। সারাজীবন যা ভোগ করেছে, মৃত্যুর সময় তার বহুগুণ অনুশোচনায় বিদগ্ধ হয়েছে। প্রতিটি অবৈধ আনন্দের পরিবর্তে বিশাল পরিমাণ আফসোস এসে ভর করেছে তাদের মাথায়।
তাছাড়া পৃথিবীর এই শোক-তাপ-অনুশোচনা দ্বারাই তো তার মুক্তি মিলবে না। এ শাস্তিই সবটুকু নয়। বরং আখেরাতের স্থায়ী শাস্তি-শাপ ওত পেতে আছে তার জন্য- যার থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো উপায় তার নেই।
সত্যকথা হলো, দুনিয়ার আনন্দ-স্ফূর্তি মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। একে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। তার অন্বেষণ, উপার্জন এবং ভোগের বিষয়ও আমি অস্বীকার করি না কিংবা অপছন্দ করি না। কিন্তু আমার কথা হলো, সে যেন তার উপার্জনে হালাল-হারামের বিষয়ে লক্ষ রাখে। যাতে তার আনন্দের পরিণামও আনন্দকর হয়। নতুবা সেই সাময়িক আনন্দের মাঝে কি কোনো কল্যাণ আছে- যার পরিণাম হলো দীর্ঘ ও স্থায়ী কষ্ট ও আগুন?
কথার কথা, কাউকে বলা হলো, 'তুমি একবছরের জন্য রাজ্য শাসন করো- এরপর আমরা তোমাকে হত্যা করব।'
এটা যে গ্রহণ করবে, তাকে কিছুতেই বুদ্ধিমান ভাবা যায় না। বরং বুদ্ধিমান তো সে-ই, যে একবছর- প্রয়োজনে বছরের পর বছর অপেক্ষা করবে, ধৈর্যধারণ করবে, পরবর্তী পুরো ভবিষ্যৎ আরাম-আয়েশে থাকার জন্য।
মোটকথা- যে আনন্দের পরিণাম হলো স্থায়ী দুঃখ, আফসোস তার জন্য।
দালফ ইবনে আবি দালফ নিজের একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, আমি আমার বাবার মৃত্যুর কয়েক দিন পর স্বপ্নে দেখলাম, যেন একজন আগন্তুক আমার নিকট এসে বলল, তোমাকে আমির ডেকেছে। আমি তার সাথে রওনা দিলাম। সে আমাকে একটি অপরিচিত কামরায় প্রবেশ করাল। জীর্ণ শীর্ণ পুরোনো কালো জানালা। ছাদ এবং দরজাও বন্ধ। এরপর আমাকে সেখান থেকে আরেকটু ওপরে নিয়ে গেল। এরপর আমাকে সামনের আরেকটি কামরায় প্রবেশ করাল। এ কামরার জানালায় কিছুটা আলোর ছিটা বাইরে থেকে এসে পড়ছে বলে ঘর কিছুটা আলোকিত। নিচে অনেক পুড়া ছাইয়ের স্তুপ। এবং এর পাশেই আমার বাবাকে দেখলাম- তিনি তার মাথা দু-হাঁটুর মাঝে গুঁজে মাথা নিচু করে বসে আছেন।
আমাকে আগন্তুক ব্যক্তিটি বলল, হে দালফ, কিছু কি বুঝতে পারছ?
আমি বললাম, হ্যাঁ, আল্লাহ আমিরকে পরিশুদ্ধ করুন।
এরপর তিনি কবিতা আকারে বললেন,
أبلغن أهلنا ولا تخف عنهم .... ما لقينا في البرزخ الخفاق قد سئلنا عن كل ما قد فعلنا ... فارحموا وحشتي وما قد ألاقي
এই বারযাখের জগতে আমাদের যে কষ্ট ও হৃদয়ের ধুকপুকানি- তা আমাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়ো- কিছুই করবে না গোপন। আমরা যা করেছি, তার সবকিছু সম্পর্কে এখানে জিজ্ঞাসা করা হয়, আমাদের এই অসহায়-আপতিত বিপদের ক্ষেত্রে একটু করো তো রহম।
এতটুকু বলে তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, বুঝতে পারছ কী বলছি?
আমি বললাম, জি, বুঝতে পারছি।
এরপর তিনি আবার কবিতার আকারে বললেন,
فلو أنا إذا متنا تركنا ... لكان الموت راحة كل حي ولكنا إذا متنا بعثنا . .. ونسأل بعده عن كل شيء
মৃত্যুই যেহেতু সকল প্রাণের অবশ্যম্ভাবী বাহন, তাই যখন মারা গেলাম, তখন যদি সবই ছেড়ে আসতে পারতাম, সাথে না আসত কোনো কর্ম!
কিন্তু যখন আমাদের হলো মৃত্যু, আমাদের উত্থিত করা হলো সকল কর্মসহ। এরপর জিজ্ঞাসা করা হলো সকল কিছু সম্পর্কে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ইন্দ্রিয় ও আকলের আনন্দ অনুভব

📄 ইন্দ্রিয় ও আকলের আনন্দ অনুভব


মানুষের সকল সুখানুভব দুই ভাগে বিভক্ত।
১. ইন্দ্রিয়জাত- অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখটা অনুভব করা হয়।
২. মস্তিষ্ক বা হৃদয়জাত- অর্থাৎ মস্তিষ্ক বা হৃদয় দ্বারা অনুভব করা হয়। তবে সবচেয়ে তীব্র সুখানুভব হয় ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই এবং তার সর্বোচ্চ স্তর হলো সহবাস।
আর আকল বা মস্তিষ্কের সর্বোচ্চ সুখানুভব ঘটে ইলম বা জ্ঞানার্জনে।
যে ব্যক্তি এই দুটি জিনিসই দুনিয়াতে যথার্থ পরিমাণে অর্জন করতে সক্ষম হয়, তার মতো সুখী আর কেউ হয় না।
কিন্তু আমি তো শিক্ষার্থীদের এর চেয়ে আরও উচ্চের ও ঊর্ধ্বর স্তরের দিকে পথ দেখাতে চাই। তাদের সুখ যেন শুধু অর্জনেরই সুখ নয়; তা হবে 'পাগলপ্রায়' আনন্দ ঢেউয়ের মতো- তা হলো, ইলমের সাধনায় নিমগ্ন হওয়া।
কিন্তু ইলম অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীর মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। যেমন উঁচু হিম্মত থাকতে হবে। এই হিম্মত আবার কারও ক্ষেত্রে শৈশব থেকেই প্রকাশ পায়। এ ধরনের কোনো বাচ্চাকে শৈশব থেকেই ভালো ভালো ব্যতিক্রম বিষয় গ্রহণ করতে দেখা যায়।
যেমন বর্ণনা করা হয়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিবের একটি মূল্যবান গালিচা ছিল। সেটা 'দারুন নাদওয়া'র কামরায় বিছানো থাকত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শৈশবের সেই ছোট বয়সে এই একান্ত গালিচার ওপর এসে বসতেন। তখন দাদা আবদুল মুত্তালিব বলতেন, 'নিশ্চয় আমার এ নাতির আলাদা একটি আভিজাত্য রয়েছে।'
এক্ষেত্রে কেউ যদি বলেন, আমার তো হিম্মত, শক্তি ও সাহস রয়েছে; কিন্তু যা কামনা করি তার কোনোটিই প্রাপ্ত হই না- আসলে এর কী সমাধান?
উত্তরে আমি বলব, কিছু ক্ষেত্রে সফল না হতে পারা সকল ক্ষেত্রে সফল না- হওয়াকে আবশ্যক করে না। তোমার উপযুক্ত কোনো একটা পথ তো বের হবেই। তাছাড়া, তোমাকে হিম্মত ও সাহস প্রদান করা হয়েছে, আর সেটা কার্যকর করার জন্য তোমাকে সাহায্য করা হবে না- এমন তো কখনো হবে না।
বরং তুমি গভীরভাবে তোমার নিজের দিকে আবার একটু তাকাও, সম্ভবত, তিনি তোমাকে এমন কিছু দিয়েছেন, যার শুকরিয়া তুমি করোনি। কিংবা প্রবৃত্তির বাসনার কোনো বিষয়ে তোমাকে পরীক্ষা করা হয়েছে; কিন্তু তুমি তাতে ধৈর্যধারণ করোনি।
আবার এটাও জেনে রেখো, তোমার থেকে হয়তো এই কারণে দুনিয়ার বেশি উপযোগিতা সরিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে তুমি বেশি বেশি ইলম ও প্রজ্ঞার স্বাদ অনুভব করতে পারো। কারণ, তুমি একজন মানুষ। খুবই দুর্বল। দুনিয়ার ভোগ ও ইলমের স্বাদ- উভয়টি সমানভাবে একত্রে সন্নিবেশ করতে তুমি শক্তি রাখো না। তাই তোমাকে ইলমের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তোমার প্রতিপালক- তিনিই তোমার তুলনামূলক কল্যাণের ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো জানেন।
এবার তোমাকে জীবনসূচনার বিবরণগুলো বলি- একটি কিশোরের জন্য উচিত হবে, কোরআন দিয়ে শিক্ষা শুরু করা। এরপর সকল প্রকার ইলম থেকে প্রাথমিক জ্ঞানগুলো অর্জন করা। এবং এগুলোর মাঝে ইলমে ফিকহকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া। শুধু বর্ণনার ওপর নির্ভর করবে না। নিজেও চিন্তা-ভাবনা করবে। এরপর যখন এগুলো স্পষ্টভাবে জানা হয়ে যাবে- সেই সাথে অর্জিত হবে ভাষা-সাহিত্যের জ্ঞান, তখন তার ভাষা ও বক্তব্য হয়ে উঠবে অধিকতর ধারালো শক্তিশালী ও হৃদয়গ্রাহী। এভাবে সে যদি সত্যকে চেনার হক আদায় করে এবং রবের প্রতি অনুগত থাকে, তবে তার জন্য এমন এমন সৌভাগ্যের দরজা খুলে যাবে- যা সে কল্পনাও করতে পারে না।
এরপর তার জন্য উচিত হবে, খুবই সতর্কতার সাথে কিছু সময় কোনো উপার্জন বা ব্যবসায় ব্যয় করা। কিন্তু সরাসরি সার্বক্ষণিকভাবে তাতে যুক্ত থাকবে না। আর খরচ ও জীবনযাপনের ক্ষেত্রে খুবই মিতব্যয়ী হবে। অপচয় ও অপব্যয় থেকে বিরত থাকবে।
কিন্তু কখনো কখনো ইলমের বর্ণনা, প্রচার ও আমল- ধীরে ধীরে কাউকে আল্লাহ তাআলার মারেফাতের দিকে এমনভাবে ধাবিত করতে থাকে যে, সে এতেই মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সাংসারিক বিষয়াবলির কথা ভাবার যেন সময় থাকে না। ইলমের এই স্বাদ ও আস্বাদন তাকে সকল কিছু থেকে মুখাপেক্ষীহীন করে রাখে। তার আর বাহ্য উপভোগের কোনো প্রয়োজন পড়ে না।
কিন্তু কেউ যদি নিজের মধ্যে বাহ্যিক উপভোগ্যতার তীব্র আকর্ষণ বোধ করে, তবে তার জন্য উচিত হবে দ্রুত বিয়ে করে নেওয়া। কিন্তু এতেও আবার এমনভাবে মগ্ন হয়ে পড়বে না যে- শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। দ্রুত শক্তি ক্ষয় হয়ে যায়। তাহলে তো তার আসল উদ্দেশ্য- ইলমই হাতছাড়া হয়ে যাবে। ইন্দ্রিয় ও মস্তিষ্কের আনন্দ উপভোগ্যতার কিছু বিষয় এখানে ইশারার মাধ্যমে উল্লেখ করলাম। আর যা বিস্তারিত উল্লেখ করা হলো না, সেগুলো ইশারার মাধ্যমেই বুঝে নাও।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ইলম সংরক্ষণের পদ্ধতি

📄 ইলম সংরক্ষণের পদ্ধতি


জেনে রেখো, সকল তালিবুল ইলম বা শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজন হলো তার অধ্যয়নকে অব্যাহত ও সচল রাখা- পরিমাণে কম হলেও এবং বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে হলেও।
কিন্তু একটা ভুল পদ্ধতি হলো, রাতদিন একাকার করে কিছু পড়া বা অধ্যয়ন করা এবং করতেই থাকা। কারণ, এ ধরনের অধ্যয়নকারী কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে নিজেই পড়া ছেড়ে দেবে কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।
হজরত আবু বকর ইবনুল আনবারীর অবস্থা আমরা নিজেরাই দেখেছি। তিনি যখন মৃত্যুশয্যায় বিছানাগত। ডাক্তার এলেন দেখতে। ডাক্তার কামরায় প্রবেশ করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে তার শত শত কিতাবের দিকে দৃষ্টি বোলালেন। এরপর রোগীকে বললেন, আপনি আসলে এমন কাজ করতেন, যা কোনো মানুষ করতে পারে না। এই জন্যই আজ এই অবস্থা।'
ডাক্তার তার সাধ্যমতো ব্যবস্থাপত্র দিয়ে বের হয়ে গেলেন। ইবনুল আনবারী তার গমনপথের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তিনি আমার কোনো উপকার করতে পারবেন না।'
এ সময় তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি আসলে কী করতেন? ডাক্তার কিসের কথা বলে গেল?
জবাবে তিনি বললেন, আমি প্রতি সপ্তাহে দশ হাজার পৃষ্ঠা অধ্যয়ন করতাম।
জীবনের এই হলো সেই ভুল পদ্ধতি- অনেক আবেগি আগ্রহী ও জেদি মানুষ যা করে থাকে।
তাছাড়া আরেকটি ভুল পদ্ধতি হলো, বেশি বেশি মুখস্থ করার চেষ্টা করা এবং অনেক প্রকার শাস্ত্র বা বিষয় মুখস্থ করার ক্ষেত্রে নিজের ওপর চাপ বাড়ানো। সকল অঙ্গের মতো অন্তর বা মস্তিষ্কও একটি অঙ্গ। যেমন একটি মানুষ হয়তো সহজেই ১০০ রিতল বহন করতে পারে। সেখানে আরেকজনের জন্য হয়তো ২০ রিতল বহন করাই কষ্টকর। অন্তর বা মস্তিষ্কও ঠিক এই রকম- মানুষভেদে তার সক্ষমতার তারতম্য রয়েছে। সুতরাং মানুষের জন্য কর্তব্য হলো- তার সাধ্যানুযায়ী কিংবা তার চেয়েও কিছুটা কম বহন করা। কারণ, সাধ্যাতীত কিছু বহনের ক্ষেত্রে একবার যদি পদস্খলন ঘটে, একবার যদি বিচ্যুতি ঘটে, তবে হয়তো চিরদিনের জন্যই তার আগ্রহের সকল কিছু হারাতে হবে!
যেমন, কোনো পেটুক ও লোভী ব্যক্তি সাধ্যের বাইরে গিয়ে আরও দু-এক লোকমা ভক্ষণ করল, তাহলে এমনও হতে পারে, এই অতিরিক্ত দুটি লোকমাই তাকে জীবনের অনেক খাবার থেকে বঞ্চিত করবে।
এ কারণে সাধ্য ও সামর্থ্যের মধ্যে চলাই সঠিক পথ। শ্রম বা অধ্যয়নকে সে দিনরাতের মধ্যে বণ্টন করে নেবে। বাকি সময়গুলোতে নিজেকে একটু শান্তি ও স্বস্তি প্রদান করবে।
সব কথার মূলকথা হলো, সাধ্যের মধ্যে নিরবচ্ছিন্নতা বজায় রাখা। এমন অনেক মুখস্থকারীকে দেখা যায়, একবারে অনেক মুখস্থ করেছে; কিন্তু দীর্ঘদিন আর সেগুলো স্মরণ করেনি। ফলে ভুলে গেছে। সেগুলোই পুনরায় মুখস্থ করতে আবার সময় দিতে হয়েছে।
হিফজ বা মুখস্থের জন্য জীবনের বিশেষ কিছু সময় রয়েছে। এগুলোর মধ্যে শৈশব ও কৈশোরই হলো উত্তম সময়। আর মুখস্থের জন্য প্রভাত ও দিবসের অর্ধভাগই সবচেয়ে উত্তম। তাছাড়া সন্ধ্যার চেয়ে অন্য সকল সময়ই উত্তম। ৭৯ এভাবে পেটপূর্ণ অবস্থার চেয়ে কিছুটা ক্ষুধার অবস্থাই উত্তম।
তবে চারপাশের বিশাল সবুজ এবং নদীর তীরবর্তী স্থান মুখস্থের জন্য আদর্শ স্থান নয়। কারণ, বাইরের আকর্ষিত পরিবেশ মনকে ভিন্ন দিকে টেনে নিয়ে যায়। নিচু স্থানের চেয়ে উঁচু স্থান হিফজের জন্য ভালো। তবে নির্জনতা ও নীরবতা সব সময়ই কাম্য।
কিন্তু সকল কথার মূলকথা, হিফজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো, মনোযোগিতা এবং একাগ্রতা।
সপ্তাহে একদিন নিজেকে মুখস্থ থেকে অব্যাহতি প্রদান করা প্রয়োজন। তাহলে এটি অন্তরকে শক্তিশালী করবে। নিজেকে স্বতঃস্ফূর্ত ও সতেজ রাখবে। যেমন কোনো ঘর বা বিল্ডিং বানানোর সময় কাঁচা নতুন গাঁথুনিকে কয়েকদিন ফেলে রাখা হয়- যাতে সেটা শক্ত ও মজবুত হয় এবং তার উপর নতুন করে গাঁথুনি দেওয়া যায়।
মুখস্থ অল্প হোক- কিন্তু সেটা অব্যাহত রাখাটাই আসল। আগের পড়াটি মজবুত ও টেকসই না করে নতুন পড়া শুরু করবে না। আর যে মুখস্থ করতে উৎসাহ পায় না, তার মুখস্থ না করাই ভালো। কারণ, এভাবে নফসের ওপর বল প্রয়োগ করা ভালো নয়। যেকোনো বিষয়ে মানুষের স্বভাব, রুচি ও মেজাজ সংগতিপূর্ণ হওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা লক্ষ রাখা চাই।
এছাড়াও খাবার-খাদ্যের ভিন্নতার মাঝেও হিফজের কিছু প্রভাব রয়েছে। কিছু কিছু খাবার হিফজশক্তিকে বাড়িয়ে তোলে। কোনোটা কমিয়ে দেয়। এক্ষেত্রেও সাধ্যমতো সঠিক খাবার খাওয়া উচিত।
ইমাম জুহরি রহ. বলেন, আমি যখন থেকে হিফজ শুরু করেছি, (কোরআন, হাদিস) তারপর আর কখনো সিরকা (একপ্রকার টকজাতীয় পানীয়) পান করিনি।
একবার ইমাম আবু হানিফা রহ.-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি এত ফিক্হ মুখস্থ রাখেন কীভাবে?
জবাবে তিনি বলেন, নির্বিঘ্ন মনোযোগের মাধ্যমে।
একই প্রশ্নের উত্তরে হাম্মাদ ইবনে সালামা রহ. বলেন, দুঃখ-দুশ্চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রেখে।
হজরত মাকহুল রহ. বলেন, যার কাপড় বেশি পরিষ্কার, তার মনোযোগিতায় বিঘ্ন ঘটে। তবে যে ব্যক্তি সুঘ্রাণ ব্যবহার করে, তার মেধা-বুদ্ধি বেড়ে যায়। কিন্তু যে ব্যক্তি এ দুটির (পরিষ্কার পোশাক ও সুঘ্রাণ) মাঝে সমন্বয় করতে পারে, তার পৌরুষ ও আভিজাত্য বেড়ে যায়।
আমি মনে করি, ইলমের অন্বেষণে যারা নবীন, যথাসম্ভব তাদের দেরিতে বিয়ে করাই উত্তম। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. জীবনের চল্লিশ বছরে এসে বিয়ে করেছিলেন। এটার কারণ, যাতে ইলমের অন্বেষণে নির্বিঘ্ন মনোযোগ দেওয়া যায়। কিন্তু কারও জন্য যদি কষ্টকর হয় এবং জিনায় লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা হয়, তাহলে সে বিয়ে করে নিতে পারে। তবে যথাসম্ভব বেশি সঙ্গ ও আসঙ্গ এড়িয়ে চলবে। যাতে শক্তি অটুট থাকে এবং ইলম অন্বেষণে অধিক সময় ব্যয় করা যায়। এবং ইলম সংরক্ষণ করা যায়। কারণ, জীবন অতি মূল্যবান ও অল্প। কিন্তু ইলম অনেক বেশি ও ব্যাপ্ত।
কিছু মানুষকে দেখি, তারা এমন বিষয় মুখস্থের মধ্যে সময় ব্যয় করে, অথচ অন্যটি ছিল তার চেয়ে উত্তম। যদিও সকল ইলমই উত্তম ও মূল্যবান- কিন্তু এর মধ্যেও সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেই প্রথমে প্রাধান্য দিতে হবে।
এ কারণে তোমার প্রথম ও প্রধান কাজ হবে কোরআন হিফজ করা। এরপর ফিকহ। এরপর অন্য বিষয়গুলো। যার সচেতনতা রয়েছে, সে নিজেই বুঝে নিতে পারে, কোনটি অগ্রগণ্য আর কোনটি পশ্চাদগণ্য- এর জন্য আলাদা কোনো দলিল-প্রমাণ লাগে না। আর যে ব্যক্তি তার ইলমের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায়, তার লক্ষ্যই তো তাকে শ্রেষ্ঠ ও অগ্রগণ্য ইলমের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- وَاتَّقُوا اللَّهَ وَيُعَلِّمُكُمُ اللَّهُ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ)
তোমরা অন্তরে আল্লাহর ভয় রেখো। আল্লাহই তোমাদের শিক্ষা দেবেন। এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞাত। [সুরা বাকারা: ২৮২]

টিকাঃ
৭৯. এটা হয়তো সেই সময়ের জীবনযাপনের পদ্ধতি অনুসারে। তখন মাগরিবের পরই খাওয়া-দাওয়া হয়ে যেত। নামাজ পড়ে ঘুম। এখন অবস্থা অনেকটাই পাল্টে গেছে। তাই কথাটি এখন আর এ সময়ের জন্য প্রযোজ্য না-ও হতে পারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00