📄 ইলম অর্জনের পদ্ধতি
জাগতিক সম্পদ অর্জনের প্রচণ্ড লোভ অনেক ক্ষেত্রেই লোভীকে তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চিত রাখে। আমি এমন অনেককে দেখেছি- সম্পদ সঞ্চয়ের ব্যাপারে যার প্রচণ্ড লোভ রয়েছে এবং তার অনেক সম্পদ অর্জনও হয়েছে, কিন্তু এরপরও সে আরও আরও সম্পদ অর্জনের প্রতি আগ্রহী। অশেষ সম্পদ অর্জনের জন্য দিনরাত একাকার করে ফেলছে।
কিন্তু সে যদি বুঝমান হতো, তাহলে জানত, সম্পদ দ্বারা লক্ষ্য হচ্ছে তা জীবনে খরচ করা। কিন্তু সে যখন পুরো জীবনটাই খরচ করে দিচ্ছে সম্পদ অর্জনের পেছনে, তখন তো তার দুটি উদ্দেশ্যই হাতছাড়া হয়ে পড়ছে। জীবন চলে যাচ্ছে- অথচ আরামের সাথে সেটা খরচও করতে পারছে না।
এমন কত মানুষকে দেখেছি- বহু সম্পদ অর্জন করেছে, কিন্তু তা দিয়ে নিজে উপকৃত হতে পারেনি। এগুলো অন্যদের জন্য রেখে দুনিয়া থেকে শূন্য হাতেই তাকে প্রস্থান করতে হয়েছে।
যেমন কবি বলেন, كدودة القز، ما تبنيه يهدمها ... وغيرها بالذي تبنيه ينتفع.
রেশমের পোকা-তার অর্জনই তাকে করে ধ্বংস। আর সেই অর্জিত জিনিসে উপকৃত হয় অন্যরা।
এভাবে কিছু মানুষকে দেখি, যাদের কিতাব জমা করার ওপর খুব আগ্রহ। তারা সেগুলোর অনুলিপি তৈরি করে করে নিজেদের জীবন অতিবাহিত করে দিয়েছেন। অনেক হাদিসবিশারদদের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, গোটা জীবন তারা খরচ করছেন হাদিস জমা করা, প্রতিলিপি করা, শ্রবণ করা এবং লেখার কাজ ইত্যাদিতে। তারা নিজেরা কোনো উপকার লাভ করতে পারেনি।
কিন্তু সবার অবস্থা, উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি একরকম নয়। এখানে দুটি শ্রেণি হয়-
১. প্রথম শ্রেণি- যিনি ব্যস্ত হন হাদিসের অধ্যয়নে, হাদিসের ইলম অর্জনে এবং সেগুলোর শুদ্ধাশুদ্ধির বিন্যাস ও নির্বাচনে। এগুলো নিয়েই তিনি মগ্ন থাকেন। যেন তিনি চারপাশের নতুন উদ্ভাবিত বিষয়ে কিছু জানেনই না। খবরই রাখেন না। হাদিসের শত বর্ণনাকারীর উৎস তার কাছে জমা হয়। আমার কাছে একজন হাদিসবিশারদের কথা বলা হয়েছে- তিনি হাদিসের একটি অংশ নিশ্চিত হওয়ার জন্য একশত শাইখ থেকে শ্রবণ করেছেন। এবং তার কাছে এর সত্তরটি লিপি বিদ্যমান রয়েছে।
২. দ্বিতীয় শ্রেণি- যিনি অনেক কিতাব জমা করেছেন। অনেক হাদিস শ্রবণ করেছেন। কিন্তু এগুলোর শুদ্ধাশুদ্ধি সম্পর্কে নিজে কিছুই জানেন না। তার অর্থও তিনি বোঝেন না। অথচ তিনি গর্বের সাথে বলে বেড়ান, আমার কাছে অমুক অমুক ব্যক্তির লেখা রয়েছে। অমুক অমুক থেকে শ্রবণ করেছি। আমার কাছে তার লিপি রয়েছে। কিন্তু এগুলোর কোনটি সহিহ, আর কোনটি দুর্বল ও জয়িফ বা মাওজু- তার কোনো জ্ঞান নেই। এগুলো অর্জনের ব্যস্ততাই যেন তাকে ইলমের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে বিরত রেখেছে।
যেমন কবি হাতিয়া- জারওয়াল ইবনে আউস বলেন, زوامل للأخبار لا علم عندها ... بمثقلها إلا كعلم الأباعر لعمرك ما يدري البعير إذا غدا ... بأوساقه أوراح في الغرائر
খবরের স্তুপ জমা হয়ে আছে তার কাছে। কিন্তু এ ব্যাপারে এক ছটাক জ্ঞানও তার নেই। এ যেন গাধার মতো।
তোমার জীবনের কসম, গাধার ভীষণ বোঝা নিয়ে চলা কিংবা আরামের বিছানায় নতুন স্ত্রী নিয়ে শয্যা গ্রহণ করা- তার কিছুই সে বোঝে না।
ইলমের এই অবস্থা সত্ত্বেও কেউ কেউ নিজেই নিজের বর্ণনা নিয়ে ইলমের নেতৃত্ব দিতে চায়। যা তার যোগ্যতা ও সক্ষমতার বাইরে- তা-ই করতে চায়। তাই যখন সে কোনো ফতোয়া দেয়, ভুল করে। যখন কোনো উসুল নিয়ে কথা বলে, ভ্রান্তি ছড়ায়। আমি যদি নাম উল্লেখ করে বর্ণনা করা অপছন্দ না করতাম, তবে আজ এখানে এ ধরনের ব্যক্তিদের কথা উল্লেখ করে দিতাম। আমাদের অনেক বড় আলেমের ক্ষেত্রেও এ বিষয়গুলো ঘটেছে। তবে যারা মুহাক্কিক আলেম ও মুহাদ্দিস- তাদের নিকট এ নামগুলো গোপন নেই।
হাদিসে তো এসেছে-
منهومان لا يشبعان، طالب علم وطالب دنيا.
দু-ধরনের ক্ষুধার্ত ব্যক্তি কখনো পরিতৃপ্ত হয় না। এক হলো ইলমের আকাঙ্ক্ষী। দুই দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষী। ৭৮
হাদিসের এই কথা তুলে কেউ যদি বলে বসেন, তাহলে আর এ ধরনের ব্যক্তির ইলম সংগ্রহের ব্যাপারে দোষারোপের কী আছে?
আমি তো কোনো আলেমকে বলি না যে, ইলমের ওপর পরিতৃপ্ত হও এবং ইলমের কিছু অংশের ওপর সীমিত থাকো।
আমি বরং তাকে বলি, এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আগে অর্জন করো। একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি তার জীবনকে বিন্যাস করে নেন, পরিকল্পনা এঁটে নেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে থাকেন। যেহেতু এই পরিমিত স্বল্প জীবন দিয়ে দুনিয়ার সকল ইলম ও জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়, তাই সেগুলোকে গুরুত্বের ভিত্তিতে বিন্যাস করে নিতে হয়- কোনগুলো এবং কী পরিমাণ আগে হবে আর কোনগুলো পেছনে? এভাবে একেকটি ঘাঁটিতে উপনীত হতে হতে, নতুন পাথেয় ও রসদ পেতে পেতে যতদূর যাওয়া যায়। সমাপ্তির আগেই যদি মৃত্যু এসে যায়- তবে হয়তো নিয়ত সেখানে পৌঁছে যাবে! মুমিনের নিয়তই উত্তম।
সুতরাং একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি যখন জানবে যে, জীবন হলো সংক্ষিপ্ত আর ইলম বা জ্ঞান হলো অনেক। কেউ যদি সকল ইলম সম্পূর্ণভাবে অর্জন করতে চায়- তবে এটা নির্বোধের মতো কাজ হবে। যেমন হাদিস শোনা, লিপি সংগ্রহ করা এবং প্রতিটি সূত্রে হাদিসটি অর্জন করতে চাওয়া। প্রতিটি বর্ণনাকারী বের করা। অপ্রচলিত বর্ণনাগুলোও অন্বেষণ করা ইত্যাদি। এভাবে করতে গেলে পঞ্চাশ বছরেও শেষ হবে না। বিশেষ করে যদি নসখের বিষয়ে কাজ করতে যায়। তখন এর সাথে যুক্ত হবে কোরআন, ইলমুল কোরআন। ফিকহ, ইখতিলাফ। উসুল ইত্যাদি।
তাই অর্জনের এই পদ্ধতিটি সঠিক নয়। যেহেতু জানা হয়েছে, জীবন ছোট; কিন্তু ইলমের পরিধি অনেক বিস্তৃত। এ কারণে জ্ঞান-অন্বেষী ব্যক্তির জন্য উচিত হবে, কোরআনের মাধ্যমে শুরু করা। প্রথমে হিফজ করবে। এরপর মধ্যম ধরনের তাফসির দেখবে- যাতে সকল বিষয়ে কিছু কিছু আলোচনা রয়েছে।
যখন কোরআনের পাঠ ও অধ্যয়ন শেষ হবে, এরপর আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের প্রাথমিক ও মৌলিক নীতিগুলো অধ্যয়ন হবে। এরপর হাদিস বিষয়ে অধ্যয়ন শুরু করবে। সহিহ, মুসনাদ ও সুনানগুলো অধ্যয়ন করবে। এরপর ইলমুল হাদিস বিষয়ে মনোবিবেশ করবে। যেমন, দুর্বল ও সবল বর্ণনাকারী ও তাদের বিস্তারিত পরিচয়। পাশাপাশি এগুলো অধ্যয়নের মূলনীতিসমূহ জেনে নেবে।
তবে আমাদের অনেক পূর্বসূরি এগুলোর অনেক কিছুই জমা করে দিয়েছেন। তাই এ ব্যাপারে এখন কষ্ট কম হয়।
এরপর মনোযোগ দেবে ইতিহাসের দিকে। যেমন, রাসুলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশ, তার আত্মীয়স্বজন, স্ত্রী, তার পূর্ণ সিরাত এবং পরবর্তীদের আমল ও ঘটনাবলি।
এরপর আবার মনোনিবেশ করবে ফিকহের দিকে, মাজহাব ও এগুলোর মতবিরোধের দিকে এবং মাসআলা গ্রহণের মূল উৎস-তথা আয়াতের তাফসির, হাদিসের ব্যাখ্যা, এমনকি শব্দ-বাক্যের বিশ্লেষণ ইত্যাদি-এর দিকে।
এরপর সেই মূলনীতিগুলো জেনে নেবে, যা স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করে। তার গুণাবলি সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেবে। তার সাথে কী সম্পৃক্ত হতে পারে এবং কী না পারে, সে সম্পর্কেও জানবে। এরপর রাসুল প্রেরণের সত্যতা, তার প্রমাণ, তাকে মান্য করার আবশ্যকতা ইত্যাদি সম্পর্কেও অধ্যয়ন করবে।
এরপর সময় যদি তাকে সঙ্গ দেয়, তবে সে পুরোপুরিভাবে ফিকহের ব্যাপারে মনোনিবেশ করবে। কারণ, এটিই সবচেয়ে উপকারী ইলম।
আর তার যদি সুযোগ ও সক্ষমতা থাকে, তবে ইলমগুলো লিপিবদ্ধ করার মধ্যেও সময় দেবে। এতে করে সে তার পরে একটি সৎ ও শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি করতে সক্ষম হবে।
এভাবে জীবনের সকল ক্ষেত্রে উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা করবে। কখনোই নিজেকে তার সক্ষমতার নিম্নে অবস্থান করাবে না। যেমন, তার যদি চেষ্টার মাধ্যমে নবুয়ত প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকত, তবে তার ওলি হওয়ার ওপর সন্তুষ্ট থাকা উচিত হতো না। কিন্তু নবী হওয়া আর সম্ভব নয়, তাই ওলি হওয়ার চেষ্টা করবে। এমনিভাবে কেউ যদি প্রত্যয় রাখে, সে খলিফা হতে পারবে, তবে তার উজির হওয়ার ওপর সন্তুষ্ট থাকা উচিত নয়। অর্থাৎ ইলম ও আমলে সর্বোচ্চ সম্ভাবনার ব্যক্তি নিম্নবর্তী অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে না। সে তার সকল সক্ষমতা ও যোগ্যতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে।
তবে আল্লাহ তার কিছু বান্দাকে যেন নিজেই তারবিয়ত করেন। শৈশব থেকে তার মধ্যে সঠিক আদর্শ গ্রহণের বুদ্ধি-বিবেক দান করেন। এরপর দান করেন জীবন গঠনের যথাযথ অনুধাবন ও বুঝশক্তি। তার জীবন হয়ে ওঠে সভ্য ও সজ্জিত, পবিত্র ও কর্মময়। জীবনের সকল স্তরেই সে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের পথ অনুসরণ করে। এভাবেই একটি আদর্শ জীবন তার গড়ে ওঠে।
আল্লাহ তার সকল অসুবিধাগুলো দূর করে দেন। তার সকল সমস্যার সমাধান করে দেন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট আকুল প্রার্থনা- তিনি যেন আমাদেরকেও সে সকল বান্দার অন্তর্ভুক্ত করে নেন এবং জীবনের প্রতিকারহীন লাঞ্ছনা থেকে মুক্ত রাখেন। আমিন।
টিকাঃ
৮. মুসনাদে আহমদ: ১/২৮৬ পৃষ্ঠা: ৩০২, তবারনি: ৯/১০২৩৫ পৃষ্ঠা: ২৬- মা. শামেলা।
📄 নির্জন আল্লাহর ধ্যান
নির্জন ধ্যানমগ্নতার প্রচুর প্রভাব রয়েছে। অনেক মুমিন ব্যক্তি ধ্যানের এই প্রভাব অনুধাবন করতে পারে। মুমিন তখন তার অনেক অবৈধ কামনা ও বাসনা বর্জন করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞ হয়- আল্লাহর শাস্তির ভয়ে কিংবা তাঁর পক্ষ থেকে পুরস্কারের আশায় অথবা তার বড়ত্বের প্রতি অনুগত হয়ে। এভাবেই সে পূত-পবিত্র হয়ে ধূপদানিতে যেন এক 'হিন্দুস্তানি সুগন্ধি উদ'-এ পরিণত হয়। চারদিকে তার সুবাস ও সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন তার ঘ্রাণ অনুভব করে- কিন্তু কেউ জানতে পারে না বস্তুটি কোথায়!
এভাবে গোনাহ বর্জনের প্রচেষ্টার পরিমাণ অনুপাতে প্রভুর প্রতি তার ভালোবাসাও বাড়তে থাকে। একই সাথে দুনিয়ার কোনো 'প্রিয়তম' কিংবা 'প্রিয়তমা'র আহ্বান উপেক্ষার কষ্টের পরিমাণ অনুযায়ী তার সম্পর্কের সুঘ্রাণ ছড়াতে থাকে।
তখন মানুষের চোখ তাকে সম্মান করতে শুরু করে। মানুষের জিহ্বা তার প্রশংসা করতে থাকে- কিন্তু তারা ভালোভাবে বুঝতে পারে না, কেন এটা তারা করছে! এর রহস্য তাদের বোধগম্য না হওয়ার কারণে এর গুণাগুণও তারা বর্ণনা করতে সক্ষম হয় না।
আর এই প্রশংসা ও সৌরভ মূলত তার মৃত্যুর পর তার মর্যাদা অনুযায়ী আরও বিস্তৃত হতে থাকে। সাধারণ কোনো ব্যক্তির কল্যাণ নিয়ে আলোচনা করা হয় কিছুকাল- এরপর তাকে সকলে ভুলে যায়। আর কাউকে স্মরণ করা হয় শত বছর। এরপর আস্তে আস্তে তার আলোচনাও কমতে থাকে এবং একসময় বন্ধ হয়ে যায়। আর কেউ কেউ এমনই অমর আদর্শ হয়ে ওঠেন যে, তাদের স্মরণ-আলোচনা চিরদিন চলতেই তাকে। কখনো শেষ হয় না। বন্ধ হয়ে যায় না।
ঠিক এর বিপরীত অবস্থা হলো তার, মানুষজন যাকে ভয় করে। যার অনিষ্টকে ভয় করে। প্রকৃতপক্ষে তার অনুপস্থিতিতে কেউ তাকে সম্মান দেখায় না। আর এটা হয়ে থাকে তার গোনাহ ও অপরাধের অনুপাতে। তার থেকে কেমন যেন অপছন্দের বাতাস আসতে থাকে। অন্তরসমূহ তার প্রতি বিরক্ত বিতৃষ্ণ ও বিরূপ হয়ে ওঠে। তার ক্ষতির আশঙ্কা যখন কমে যায়, তখন লোকজনের জিহ্বাও তার কল্যাণের আলোচনা কমিয়ে দেয়। তখন শুধু বাহ্যিক সম্মানটাই বাকি থাকে। আর যদি ক্ষতির আশঙ্কা বেড়ে যায়- তখন অধিকাংশ মানুষ চুপ থাকে। তার প্রশংসাও করে না। নিন্দাও করে না।
হজরত আবু দারদা রা. বলেন,
إن العبد ليخلو بمعصية الله تعالى فيلقي الله بغضه في قلوب المؤمنين من حيث لا يشعر.
মানুষ যখন নির্জনে আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা অব্যাহত রাখে, তখন আল্লাহ তাআলা মুমিনদের অন্তরে তার প্রতি অপছন্দনীয়তা এমনভাবে স্থাপন করেন যে, তা সেই ব্যক্তি নিজেও টের পায় না।
যেগুলো লিখলাম, সেগুলো নিয়ে চিন্তা করো। যা উল্লেখ করলাম, সেগুলো স্মরণ করো। নিজেদের একান্ত ও নির্জন অবস্থা ও আমল সম্পর্কে অবহেলা করো না। আমল নির্ভর করে নিয়তের ওপর। আর প্রতিদান প্রদান করা হয় ইখলাস বা একনিষ্ঠতা অনুসারে।
📄 অন্তরের হিসাব-নিকাশ
বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত, তার সক্ষমতার অতিরিক্ত কোনো বিষয়ের প্রত্যয় না করা এবং তা বাস্তবায়িত করতে অগ্রসর না হওয়া। কারণ, বহু মানুষ আবেগের বশবর্তী হয়ে আকাশ সমান বিষয় জমিয়ে নেয়। কিন্তু ভেবে দেখে না- এগুলোর সাধনা ও অর্জনের কষ্টের ওপর সে ধৈর্যধারণ করতে পারবে কি না? এ ধরনের ব্যক্তি অবশেষে নিরাশ হয়, হতাশ হয়ে ফিরে আসে এবং লজ্জিত হয়।
এভাবে অন্যদের দেখাদেখিও কোনো জিনিস করতে না যাওয়া উচিত। ময়দানে নামার আগে নিজের ক্ষমতার ওজন মেপে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, সবার সক্ষমতা একরকম নয়।
যিনি বুদ্ধিমান- তিনি সব সময় নিজেকে মানুষদের মাঝে ‘মধ্যপন্থার’ পোশাকে আচ্ছাদন করে রাখেন। এর দ্বারা তিনি সম্পদশালীদের কাতার থেকে বের হয়ে যান না, আবার তাকে অভাবগ্রস্তও মনে হয় না। তার যদি আমল ও ইবাদতের আগ্রহ বেড়ে যায়, তিনি সেগুলো বাড়ির ভেতরে পালন করেন। আর সৌন্দর্যপূর্ণ কাপড় বর্জন করেন- নিজের অবস্থা অপ্রকাশিত রাখার জন্য। মানুষের সামনে সবকিছু প্রকাশ করে বেড়ান না। আর এভাবেই অহংকার থেকে দূরে থাকা যায়। আবার মানুষদের থেকে ‘কিপটে’র অপবাদও শুনতে হয় না।
📄 সুখের পরে দুঃখ
বোকার চেয়েও বোকা হলো সেই ব্যক্তি- বর্তমানের সুখকে যে এমন ভবিষ্যতের ওপর প্রাধান্য দেয়, যার অন্তহীন কষ্ট থেকে সে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ নয়।
আমরা পৃথিবীতেই এমন কত আমির, সুলতান ও ধনবান ব্যক্তির কথা শুনেছি- যারা, নিজেদেরকে অবাধ কামনা-বাসনা ও বিলাস-ব্যসনের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। হালাল-হারামের দিকে কোনো লক্ষ রাখেনি। কিন্তু মৃত্যুর সময় এসে শুধু আফসোসই করেছে। সারাজীবন যা ভোগ করেছে, মৃত্যুর সময় তার বহুগুণ অনুশোচনায় বিদগ্ধ হয়েছে। প্রতিটি অবৈধ আনন্দের পরিবর্তে বিশাল পরিমাণ আফসোস এসে ভর করেছে তাদের মাথায়।
তাছাড়া পৃথিবীর এই শোক-তাপ-অনুশোচনা দ্বারাই তো তার মুক্তি মিলবে না। এ শাস্তিই সবটুকু নয়। বরং আখেরাতের স্থায়ী শাস্তি-শাপ ওত পেতে আছে তার জন্য- যার থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো উপায় তার নেই।
সত্যকথা হলো, দুনিয়ার আনন্দ-স্ফূর্তি মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। একে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। তার অন্বেষণ, উপার্জন এবং ভোগের বিষয়ও আমি অস্বীকার করি না কিংবা অপছন্দ করি না। কিন্তু আমার কথা হলো, সে যেন তার উপার্জনে হালাল-হারামের বিষয়ে লক্ষ রাখে। যাতে তার আনন্দের পরিণামও আনন্দকর হয়। নতুবা সেই সাময়িক আনন্দের মাঝে কি কোনো কল্যাণ আছে- যার পরিণাম হলো দীর্ঘ ও স্থায়ী কষ্ট ও আগুন?
কথার কথা, কাউকে বলা হলো, 'তুমি একবছরের জন্য রাজ্য শাসন করো- এরপর আমরা তোমাকে হত্যা করব।'
এটা যে গ্রহণ করবে, তাকে কিছুতেই বুদ্ধিমান ভাবা যায় না। বরং বুদ্ধিমান তো সে-ই, যে একবছর- প্রয়োজনে বছরের পর বছর অপেক্ষা করবে, ধৈর্যধারণ করবে, পরবর্তী পুরো ভবিষ্যৎ আরাম-আয়েশে থাকার জন্য।
মোটকথা- যে আনন্দের পরিণাম হলো স্থায়ী দুঃখ, আফসোস তার জন্য।
দালফ ইবনে আবি দালফ নিজের একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, আমি আমার বাবার মৃত্যুর কয়েক দিন পর স্বপ্নে দেখলাম, যেন একজন আগন্তুক আমার নিকট এসে বলল, তোমাকে আমির ডেকেছে। আমি তার সাথে রওনা দিলাম। সে আমাকে একটি অপরিচিত কামরায় প্রবেশ করাল। জীর্ণ শীর্ণ পুরোনো কালো জানালা। ছাদ এবং দরজাও বন্ধ। এরপর আমাকে সেখান থেকে আরেকটু ওপরে নিয়ে গেল। এরপর আমাকে সামনের আরেকটি কামরায় প্রবেশ করাল। এ কামরার জানালায় কিছুটা আলোর ছিটা বাইরে থেকে এসে পড়ছে বলে ঘর কিছুটা আলোকিত। নিচে অনেক পুড়া ছাইয়ের স্তুপ। এবং এর পাশেই আমার বাবাকে দেখলাম- তিনি তার মাথা দু-হাঁটুর মাঝে গুঁজে মাথা নিচু করে বসে আছেন।
আমাকে আগন্তুক ব্যক্তিটি বলল, হে দালফ, কিছু কি বুঝতে পারছ?
আমি বললাম, হ্যাঁ, আল্লাহ আমিরকে পরিশুদ্ধ করুন।
এরপর তিনি কবিতা আকারে বললেন,
أبلغن أهلنا ولا تخف عنهم .... ما لقينا في البرزخ الخفاق قد سئلنا عن كل ما قد فعلنا ... فارحموا وحشتي وما قد ألاقي
এই বারযাখের জগতে আমাদের যে কষ্ট ও হৃদয়ের ধুকপুকানি- তা আমাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়ো- কিছুই করবে না গোপন। আমরা যা করেছি, তার সবকিছু সম্পর্কে এখানে জিজ্ঞাসা করা হয়, আমাদের এই অসহায়-আপতিত বিপদের ক্ষেত্রে একটু করো তো রহম।
এতটুকু বলে তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, বুঝতে পারছ কী বলছি?
আমি বললাম, জি, বুঝতে পারছি।
এরপর তিনি আবার কবিতার আকারে বললেন,
فلو أنا إذا متنا تركنا ... لكان الموت راحة كل حي ولكنا إذا متنا بعثنا . .. ونسأل بعده عن كل شيء
মৃত্যুই যেহেতু সকল প্রাণের অবশ্যম্ভাবী বাহন, তাই যখন মারা গেলাম, তখন যদি সবই ছেড়ে আসতে পারতাম, সাথে না আসত কোনো কর্ম!
কিন্তু যখন আমাদের হলো মৃত্যু, আমাদের উত্থিত করা হলো সকল কর্মসহ। এরপর জিজ্ঞাসা করা হলো সকল কিছু সম্পর্কে।