📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 বন্ধুর ক্ষেত্রে সতর্কতা

📄 বন্ধুর ক্ষেত্রে সতর্কতা


মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হলো না জেনে অন্যের ওপর আস্থা রাখা এবং বন্ধুদের ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শন করা। কারণ, মানুষকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় বন্ধু থেকে পরিবর্তিত হওয়া শত্রু। কারণ, সে সকল গোপনীয়তা ও দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত থাকে।
যেমন কবি বলেন, احذر عدوك مرة ... واحد صديقك ألف مرة فلربما انقلب الصديق فكان أعم بالمضرة
শত্রুর ক্ষেত্রে সতর্ক হও একবার। বন্ধুর ক্ষেত্রে সতর্ক হও হাজারবার। বন্ধু যদি শত্রুতে পরিণত হয়, সে তোমার ক্ষতির ক্ষেত্রে বেশি খবরদার।
মানুষের অন্তরে যে সকল গোপন বিষয় লুকিয়ে থাকে, তার মধ্যে প্রধান হলো অন্যের কল্যাণের ব্যাপারে হিংসা, ঈর্ষা এবং নিজের উন্নতির আকাঙ্ক্ষা।
সুতরাং যখন তোমার সমশ্রেণির কেউ তোমাকে দেখবে যে, তুমি তার চেয়ে বেশি উন্নতি করছ, অবশ্যই এটা তার ওপর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। এমনকি এটা তাকে হিংসায় নিপতিত করবে। হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সাথে তার ভাইদের বিষয়টি এই হিংসার কারণেই ঘটেছিল।
এখন তুমি যদি বলো, মানুষের বন্ধু দরকার হয়। বন্ধু ছাড়া সে কীভাবে জীবনযাপন করবে?
আমি তোমাকে বলি, তুমি কি নিজেই দেখোনি, সমশ্রেণিরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি কীভাবে হিংসা করে? আর যদি সাধারণ ব্যক্তিদের কথা ধরো, তবে তো তাদের অধিকাংশের বিশ্বাস—একজন আলেম ‘মুচকিও হাসবে না। দুনিয়ার কোনো বিষয়েই তার আকর্ষণ থাকবে না। তাই যখন তারা কোনো আলেমকে কোনো বৈধ আনন্দ বা উপভোগ্যতার দিকে হাত বাড়াতে দেখে, তাদের চোখে সে আলেমের পতন ঘটে যায়। এই হলো সাধারণ ব্যক্তিদের অবস্থা। আর আমরা তো বলছি বিশেষ ও একান্ত ব্যক্তিদের কথা—একটু এদিক-সেদিক হলেই অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তাহলে তুমি ঘনিষ্ঠ হবে কার সাথে?
কিছুতেই না। আল্লাহর কসম, দুনিয়াতে কিছুতেই কোনো হৃদয়ের সাথে নিঃস্বার্থ ঘনিষ্ঠ হওয়া কিংবা একনিষ্ঠ বন্ধুত্ব প্রাপ্তি সম্ভব নয়। কারণ, মানুষের অন্তর হলো 'বহুরূপী'। ক্ষণে ক্ষণে তার রূপ পাল্টাতে পারে এবং পাল্টায়। হ্যাঁ, মানুষের সাথে ওঠাবসা করা, চলাফেরা করা এবং সামাজিক আচার-আচরণ চলতে পারে।
হ্যাঁ- এটাও ঠিক, কোনো ধরনের প্রত্যাশা ও বাসনা ছাড়া কাউকে বন্ধু হিসেবে পাওয়া বা গ্রহণ করার বাস্তবতাও স্বীকৃত। তবে এমন বন্ধু পাওয়া প্রায় অসম্ভব। যদি হয়ও- তবে সে হয়তো তোমার সমশ্রেণি থেকে হবে না। কারণ, সমশ্রেণির মধ্যে হিংসাটাই প্রধান থাকে। এবং সে হবে সাধারণ থেকে একটু উচ্চের। এবং এমন ব্যক্তি হবে- যে তোমার পর্যায়ের সম্মান ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষী নয়।
তবে এমন সঙ্গ বা বন্ধুত্বের দ্বারা মনে পূর্ণ পরিতৃপ্তি আসে না। কারণ, বন্ধুত্ব হওয়া দরকার ছিল তোমার সমশ্রেণির আলেম এবং একই মানসিকতাপূর্ণ ব্যক্তিদের মাঝে- একই বিষয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের মাঝে। তাহলে সেখানে এমন ইশারা-ইঙ্গিতে কথা চলতে পারত- যার কারণে মজলিস হয়ে উঠতে পারত প্রাণবন্ত ও প্রাঞ্জল। কিন্তু এটা যেন হওয়ারই নয়- সমশ্রেণির মাঝে পারস্পরিক হিংসার কারণে।
এ কারণে যাদের সাথে একনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হয়, তাদের দিয়ে মন ভরে না। আর যাদের সাথে মন ভরতে পারত, তাদের সাথে বন্ধুত্ব হয় না। মানুষের মনের রাজ্যে এ এক আশ্চর্য বিচরণ।
ঠিক এই ধরনের জটিল বিষয়ের মুখোমুখি হতে হয় বাড়িতে কোনো কাজের লোক রাখার ক্ষেত্রে। তুমি যদি বুদ্ধিমান কাউকে রাখো, তবে সে তোমার গোপন ও একান্ত বিষয়গুলোও জেনে যাবে। আর যদি নির্বোধ কাউকে রাখো, তবে তোমার কোনো কাজই তাদের দ্বারা আদায় হবে না। এ কারণে তোমার কর্তব্য হবে, তুমি বাইরের কাজের ক্ষেত্রে বুদ্ধিমান দেখে রাখবে আর বাড়ির ভেতরের কাজের জন্য রাখবে সরল ও নির্বোধ ধরনের কাউকে।
আর বন্ধুর ক্ষেত্রে তেমন বন্ধুর ওপরই আস্থা রাখতে পারো- যার বৈশিষ্ট্য আমি তোমাকে কিছুক্ষণ আগে বর্ণনা করেছি। তবে তার সঙ্গেও সতর্কতার সাথে চলবে। যে গোপন বিষয়গুলো তাকে না জানালেও চলে, সেগুলো তার থেকে গোপন রাখাই শ্রেয়। বন্ধুত্বের আচরণের ক্ষেত্রে তুমি হবে একই সাথে স্ফূর্ত ও সতর্ক। খোলামেলা, কিন্তু সজাগ। যেমন নেকড়ের কথা বলা হয়—
ينام بإحدى مقلتيه ويتقي ... بأخى الأعادي فهو يقظان هاجع
সে তার দুটি চোখের একটি দিয়ে ঘুমায়। আর অন্যটি দিয়ে শত্রুদের ব্যাপারে সতর্ক থাকে; যেন সে একই সাথে জাগ্রত ও ঘুমন্ত।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আলেমের বিপর্যয়

📄 আলেমের বিপর্যয়


আমি এমন অনেক ব্যক্তিকে দেখেছি, যে তার জীবনের শুরুর সময়গুলো, জীবনের শ্রেষ্ঠ অংশগুলো ব্যয় করেছে ইলমের অন্বেষণে। এতে সে বিভিন্ন কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করেছে। কত রকম আনন্দ-বিশ্রাম বর্জন করেছে— মূর্খতার গ্লানি ও তার অপদস্থতা থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য। কষ্ট সয়েছে ইলম ও তার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য।
কিন্তু সে হয়তো এতে এমন শীর্ষচূড়া অর্জন করতে পারেনি যে, এটি তাকে দুনিয়াদারদের স্থান থেকে আরও ঊর্ধ্বে স্থান করে দেবে। আর যা কিছু অর্জন করেছে, খুবই তাড়াহুড়োর সাথে করেছে। এ কারণে তার জীবন ও জীবিকা হয়ে পড়েছে সংকীর্ণ। কিংবা সে তার নিজের জন্য যে প্রত্যয় ও কামনা রেখেছিল, তার অংশ প্রাপ্তিতেও তার কমতি হয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন কারণে, ইলমের ক্ষেত্রে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে সে পৌঁছুতে ব্যর্থ হয়েছে।
এবার সে ভিড়ে গেল বিভিন্ন দেশের নিম্নশ্রেণির লোকদের সাথে। নিজেকে অবনত করল নিম্নস্তরের লোকদের নিকট, নিচু মানসিকতার লোকদের নিকট, বিভিন্ন কারবারি লোকদের নিকট... আরও আরও লোকদের নিকট।
আমি তাদের প্রত্যেককে সম্বোধন করে বলি, এ তুমি কী করছ? মূর্খতার থেকে মুক্তির সেই সম্মানবোধ কি তুমি একেবারে ভুলেই গেছ— যার জন্য কত কত রাত তুমি জেগে কাটিয়েছ? সেই ইলম কোথায় গেল— যার অর্জনে কত দিবস তুমি পিপাসার্ত থেকেছ? যখন তুমি সুউচ্চ হয়েছ, উপকৃত হতে শুরু করেছ, ঠিক তখনই তুমি ঝুঁকে পড়েছ নিচুদেরও নিচুতর স্থানের দিকে!
তোমার নিকট কি সেই আত্মসম্মানবোধের অণু পরিমাণও বিদ্যমান নেই, যার মাধ্যমে এই নিম্নতম স্থান থেকে তুমি উঠে আসতে পারো? তোমার নিকট এতদিনের শেখা সেই ইলমের সামান্যতমও কি অবশিষ্ট নেই, যার মাধ্যমে তুমি এই প্রবৃত্তির বিভ্রান্তিকর জাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারো? তোমার ইলমের মাধ্যমে এমন একটু শক্তিও কি অর্জিত হয়নি, যার মাধ্যমে নফসের লাগামকে আঁকড়ে ধরতে পারো তার নিকৃষ্টতর চারণভূমি থেকে?
না, এতদিন যা তুমি অর্জন করেছিলে- তোমার রাত জাগরণ, তোমার শ্রম ও সাধনা, আসলে সবই কি ছিল দুনিয়া অর্জনের জন্যই?
কিন্তু তুমি যদি দাবি করো যে, তুমি প্রত্যয় করেছ, কিছুটা সম্পদ অর্জন করে নেবে, যাতে সেটা তোমার ইলম অর্জনের পথে সহায়ক হয়। তাহলে জেনে রাখো, নিম্নশ্রেণির মানুষদের নিকট হাত পাতা থেকে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে তোমার যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ অর্জনের দিকে ধাবিত হওয়া তোমার তত পরিমাণ ইলম বৃদ্ধি হওয়ার চেয়ে উত্তম।
কিন্তু তুমি যে সম্পদ অর্জনের জন্য সেই 'নিম্নশ্রেণির' মানুষদের দরজায় ধরনা দিয়ে চলেছ। তুমি যদি জানতে, এতে তোমার দ্বীনের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তবে তুমি কিছুতেই এ পথে পা বাড়াতে না। এটা তো নফসের একটি ধোঁকা। তোমার মতো ব্যক্তির এ ধরনের দিকে ঝুঁকে পড়া কিছুতেই উচিত নয়। আর এ ধরনের কারবারে একবার নেমে পড়ার পর ন্যূনতম প্রয়োজনটুকুর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে আসা খুবই কঠিন ব্যাপার। আর তুমি তো জানোই- ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণের পরও 'চাওয়া' বা মানুষের কাছে 'হাতপাতা'র গোনাহের কথা।
আর অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে তাকওয়া অবলম্বন তো আরও অনেক দূরের কথা।
তুমি কি এখনই নিরাপদে ফিরে আসতে পারো না? পারো না এখনই নিজ পরিবেশে ফিরে আসতে? দারিদ্র্যের তির তোমাকে আর কতই বা বিক্ষত করবে? সম্পদ যা অর্জন করেছ, সবই ধ্বংস হয়ে যাবে। তবে যে ইলম তোমাকে প্রদান করা হয়েছে, তা তো কখনো নিঃশেষ হবে না।
এখন তোমার ফিরে আসাটাই যথেষ্ট! কারণ, তুমি তো দুনিয়ার এসব ঘৃণ্যতা ধোঁকা ও প্রতারণার কথা জানোই। মাঝে যা কিছু করেছ- ইলমের বিপরীতেই করেছ। আর যেহেতু একটি দীর্ঘ সময় তুমি ইলমের পেছনেই অতিবাহিত করেছ- সেগুলো তো ফেলনা নয়।
কেউ একজন বলেন, ومن أحسن فيما مضى يحسن فيما بقي.
যে তার অতীত ভালো কর্মে কাটিয়েছে, নিশ্চয় তার ভবিষ্যৎও ভালো হবে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ইলম অর্জনের পদ্ধতি

📄 ইলম অর্জনের পদ্ধতি


জাগতিক সম্পদ অর্জনের প্রচণ্ড লোভ অনেক ক্ষেত্রেই লোভীকে তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চিত রাখে। আমি এমন অনেককে দেখেছি- সম্পদ সঞ্চয়ের ব্যাপারে যার প্রচণ্ড লোভ রয়েছে এবং তার অনেক সম্পদ অর্জনও হয়েছে, কিন্তু এরপরও সে আরও আরও সম্পদ অর্জনের প্রতি আগ্রহী। অশেষ সম্পদ অর্জনের জন্য দিনরাত একাকার করে ফেলছে।
কিন্তু সে যদি বুঝমান হতো, তাহলে জানত, সম্পদ দ্বারা লক্ষ্য হচ্ছে তা জীবনে খরচ করা। কিন্তু সে যখন পুরো জীবনটাই খরচ করে দিচ্ছে সম্পদ অর্জনের পেছনে, তখন তো তার দুটি উদ্দেশ্যই হাতছাড়া হয়ে পড়ছে। জীবন চলে যাচ্ছে- অথচ আরামের সাথে সেটা খরচও করতে পারছে না।
এমন কত মানুষকে দেখেছি- বহু সম্পদ অর্জন করেছে, কিন্তু তা দিয়ে নিজে উপকৃত হতে পারেনি। এগুলো অন্যদের জন্য রেখে দুনিয়া থেকে শূন্য হাতেই তাকে প্রস্থান করতে হয়েছে।
যেমন কবি বলেন, كدودة القز، ما تبنيه يهدمها ... وغيرها بالذي تبنيه ينتفع.
রেশমের পোকা-তার অর্জনই তাকে করে ধ্বংস। আর সেই অর্জিত জিনিসে উপকৃত হয় অন্যরা।
এভাবে কিছু মানুষকে দেখি, যাদের কিতাব জমা করার ওপর খুব আগ্রহ। তারা সেগুলোর অনুলিপি তৈরি করে করে নিজেদের জীবন অতিবাহিত করে দিয়েছেন। অনেক হাদিসবিশারদদের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, গোটা জীবন তারা খরচ করছেন হাদিস জমা করা, প্রতিলিপি করা, শ্রবণ করা এবং লেখার কাজ ইত্যাদিতে। তারা নিজেরা কোনো উপকার লাভ করতে পারেনি।
কিন্তু সবার অবস্থা, উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি একরকম নয়। এখানে দুটি শ্রেণি হয়-
১. প্রথম শ্রেণি- যিনি ব্যস্ত হন হাদিসের অধ্যয়নে, হাদিসের ইলম অর্জনে এবং সেগুলোর শুদ্ধাশুদ্ধির বিন্যাস ও নির্বাচনে। এগুলো নিয়েই তিনি মগ্ন থাকেন। যেন তিনি চারপাশের নতুন উদ্ভাবিত বিষয়ে কিছু জানেনই না। খবরই রাখেন না। হাদিসের শত বর্ণনাকারীর উৎস তার কাছে জমা হয়। আমার কাছে একজন হাদিসবিশারদের কথা বলা হয়েছে- তিনি হাদিসের একটি অংশ নিশ্চিত হওয়ার জন্য একশত শাইখ থেকে শ্রবণ করেছেন। এবং তার কাছে এর সত্তরটি লিপি বিদ্যমান রয়েছে।
২. দ্বিতীয় শ্রেণি- যিনি অনেক কিতাব জমা করেছেন। অনেক হাদিস শ্রবণ করেছেন। কিন্তু এগুলোর শুদ্ধাশুদ্ধি সম্পর্কে নিজে কিছুই জানেন না। তার অর্থও তিনি বোঝেন না। অথচ তিনি গর্বের সাথে বলে বেড়ান, আমার কাছে অমুক অমুক ব্যক্তির লেখা রয়েছে। অমুক অমুক থেকে শ্রবণ করেছি। আমার কাছে তার লিপি রয়েছে। কিন্তু এগুলোর কোনটি সহিহ, আর কোনটি দুর্বল ও জয়িফ বা মাওজু- তার কোনো জ্ঞান নেই। এগুলো অর্জনের ব্যস্ততাই যেন তাকে ইলমের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে বিরত রেখেছে।
যেমন কবি হাতিয়া- জারওয়াল ইবনে আউস বলেন, زوامل للأخبار لا علم عندها ... بمثقلها إلا كعلم الأباعر لعمرك ما يدري البعير إذا غدا ... بأوساقه أوراح في الغرائر
খবরের স্তুপ জমা হয়ে আছে তার কাছে। কিন্তু এ ব্যাপারে এক ছটাক জ্ঞানও তার নেই। এ যেন গাধার মতো।
তোমার জীবনের কসম, গাধার ভীষণ বোঝা নিয়ে চলা কিংবা আরামের বিছানায় নতুন স্ত্রী নিয়ে শয্যা গ্রহণ করা- তার কিছুই সে বোঝে না।
ইলমের এই অবস্থা সত্ত্বেও কেউ কেউ নিজেই নিজের বর্ণনা নিয়ে ইলমের নেতৃত্ব দিতে চায়। যা তার যোগ্যতা ও সক্ষমতার বাইরে- তা-ই করতে চায়। তাই যখন সে কোনো ফতোয়া দেয়, ভুল করে। যখন কোনো উসুল নিয়ে কথা বলে, ভ্রান্তি ছড়ায়। আমি যদি নাম উল্লেখ করে বর্ণনা করা অপছন্দ না করতাম, তবে আজ এখানে এ ধরনের ব্যক্তিদের কথা উল্লেখ করে দিতাম। আমাদের অনেক বড় আলেমের ক্ষেত্রেও এ বিষয়গুলো ঘটেছে। তবে যারা মুহাক্কিক আলেম ও মুহাদ্দিস- তাদের নিকট এ নামগুলো গোপন নেই।
হাদিসে তো এসেছে-
منهومان لا يشبعان، طالب علم وطالب دنيا.
দু-ধরনের ক্ষুধার্ত ব্যক্তি কখনো পরিতৃপ্ত হয় না। এক হলো ইলমের আকাঙ্ক্ষী। দুই দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষী। ৭৮
হাদিসের এই কথা তুলে কেউ যদি বলে বসেন, তাহলে আর এ ধরনের ব্যক্তির ইলম সংগ্রহের ব্যাপারে দোষারোপের কী আছে?
আমি তো কোনো আলেমকে বলি না যে, ইলমের ওপর পরিতৃপ্ত হও এবং ইলমের কিছু অংশের ওপর সীমিত থাকো।
আমি বরং তাকে বলি, এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আগে অর্জন করো। একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি তার জীবনকে বিন্যাস করে নেন, পরিকল্পনা এঁটে নেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে থাকেন। যেহেতু এই পরিমিত স্বল্প জীবন দিয়ে দুনিয়ার সকল ইলম ও জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়, তাই সেগুলোকে গুরুত্বের ভিত্তিতে বিন্যাস করে নিতে হয়- কোনগুলো এবং কী পরিমাণ আগে হবে আর কোনগুলো পেছনে? এভাবে একেকটি ঘাঁটিতে উপনীত হতে হতে, নতুন পাথেয় ও রসদ পেতে পেতে যতদূর যাওয়া যায়। সমাপ্তির আগেই যদি মৃত্যু এসে যায়- তবে হয়তো নিয়ত সেখানে পৌঁছে যাবে! মুমিনের নিয়তই উত্তম।
সুতরাং একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি যখন জানবে যে, জীবন হলো সংক্ষিপ্ত আর ইলম বা জ্ঞান হলো অনেক। কেউ যদি সকল ইলম সম্পূর্ণভাবে অর্জন করতে চায়- তবে এটা নির্বোধের মতো কাজ হবে। যেমন হাদিস শোনা, লিপি সংগ্রহ করা এবং প্রতিটি সূত্রে হাদিসটি অর্জন করতে চাওয়া। প্রতিটি বর্ণনাকারী বের করা। অপ্রচলিত বর্ণনাগুলোও অন্বেষণ করা ইত্যাদি। এভাবে করতে গেলে পঞ্চাশ বছরেও শেষ হবে না। বিশেষ করে যদি নসখের বিষয়ে কাজ করতে যায়। তখন এর সাথে যুক্ত হবে কোরআন, ইলমুল কোরআন। ফিকহ, ইখতিলাফ। উসুল ইত্যাদি।
তাই অর্জনের এই পদ্ধতিটি সঠিক নয়। যেহেতু জানা হয়েছে, জীবন ছোট; কিন্তু ইলমের পরিধি অনেক বিস্তৃত। এ কারণে জ্ঞান-অন্বেষী ব্যক্তির জন্য উচিত হবে, কোরআনের মাধ্যমে শুরু করা। প্রথমে হিফজ করবে। এরপর মধ্যম ধরনের তাফসির দেখবে- যাতে সকল বিষয়ে কিছু কিছু আলোচনা রয়েছে।
যখন কোরআনের পাঠ ও অধ্যয়ন শেষ হবে, এরপর আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের প্রাথমিক ও মৌলিক নীতিগুলো অধ্যয়ন হবে। এরপর হাদিস বিষয়ে অধ্যয়ন শুরু করবে। সহিহ, মুসনাদ ও সুনানগুলো অধ্যয়ন করবে। এরপর ইলমুল হাদিস বিষয়ে মনোবিবেশ করবে। যেমন, দুর্বল ও সবল বর্ণনাকারী ও তাদের বিস্তারিত পরিচয়। পাশাপাশি এগুলো অধ্যয়নের মূলনীতিসমূহ জেনে নেবে।
তবে আমাদের অনেক পূর্বসূরি এগুলোর অনেক কিছুই জমা করে দিয়েছেন। তাই এ ব্যাপারে এখন কষ্ট কম হয়।
এরপর মনোযোগ দেবে ইতিহাসের দিকে। যেমন, রাসুলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশ, তার আত্মীয়স্বজন, স্ত্রী, তার পূর্ণ সিরাত এবং পরবর্তীদের আমল ও ঘটনাবলি।
এরপর আবার মনোনিবেশ করবে ফিকহের দিকে, মাজহাব ও এগুলোর মতবিরোধের দিকে এবং মাসআলা গ্রহণের মূল উৎস-তথা আয়াতের তাফসির, হাদিসের ব্যাখ্যা, এমনকি শব্দ-বাক্যের বিশ্লেষণ ইত্যাদি-এর দিকে।
এরপর সেই মূলনীতিগুলো জেনে নেবে, যা স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করে। তার গুণাবলি সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেবে। তার সাথে কী সম্পৃক্ত হতে পারে এবং কী না পারে, সে সম্পর্কেও জানবে। এরপর রাসুল প্রেরণের সত্যতা, তার প্রমাণ, তাকে মান্য করার আবশ্যকতা ইত্যাদি সম্পর্কেও অধ্যয়ন করবে।
এরপর সময় যদি তাকে সঙ্গ দেয়, তবে সে পুরোপুরিভাবে ফিকহের ব্যাপারে মনোনিবেশ করবে। কারণ, এটিই সবচেয়ে উপকারী ইলম।
আর তার যদি সুযোগ ও সক্ষমতা থাকে, তবে ইলমগুলো লিপিবদ্ধ করার মধ্যেও সময় দেবে। এতে করে সে তার পরে একটি সৎ ও শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি করতে সক্ষম হবে।
এভাবে জীবনের সকল ক্ষেত্রে উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা করবে। কখনোই নিজেকে তার সক্ষমতার নিম্নে অবস্থান করাবে না। যেমন, তার যদি চেষ্টার মাধ্যমে নবুয়ত প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকত, তবে তার ওলি হওয়ার ওপর সন্তুষ্ট থাকা উচিত হতো না। কিন্তু নবী হওয়া আর সম্ভব নয়, তাই ওলি হওয়ার চেষ্টা করবে। এমনিভাবে কেউ যদি প্রত্যয় রাখে, সে খলিফা হতে পারবে, তবে তার উজির হওয়ার ওপর সন্তুষ্ট থাকা উচিত নয়। অর্থাৎ ইলম ও আমলে সর্বোচ্চ সম্ভাবনার ব্যক্তি নিম্নবর্তী অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে না। সে তার সকল সক্ষমতা ও যোগ্যতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে।
তবে আল্লাহ তার কিছু বান্দাকে যেন নিজেই তারবিয়ত করেন। শৈশব থেকে তার মধ্যে সঠিক আদর্শ গ্রহণের বুদ্ধি-বিবেক দান করেন। এরপর দান করেন জীবন গঠনের যথাযথ অনুধাবন ও বুঝশক্তি। তার জীবন হয়ে ওঠে সভ্য ও সজ্জিত, পবিত্র ও কর্মময়। জীবনের সকল স্তরেই সে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের পথ অনুসরণ করে। এভাবেই একটি আদর্শ জীবন তার গড়ে ওঠে।
আল্লাহ তার সকল অসুবিধাগুলো দূর করে দেন। তার সকল সমস্যার সমাধান করে দেন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট আকুল প্রার্থনা- তিনি যেন আমাদেরকেও সে সকল বান্দার অন্তর্ভুক্ত করে নেন এবং জীবনের প্রতিকারহীন লাঞ্ছনা থেকে মুক্ত রাখেন। আমিন।

টিকাঃ
৮. মুসনাদে আহমদ: ১/২৮৬ পৃষ্ঠা: ৩০২, তবারনি: ৯/১০২৩৫ পৃষ্ঠা: ২৬- মা. শামেলা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 নির্জন আল্লাহর ধ্যান

📄 নির্জন আল্লাহর ধ্যান


নির্জন ধ্যানমগ্নতার প্রচুর প্রভাব রয়েছে। অনেক মুমিন ব্যক্তি ধ্যানের এই প্রভাব অনুধাবন করতে পারে। মুমিন তখন তার অনেক অবৈধ কামনা ও বাসনা বর্জন করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞ হয়- আল্লাহর শাস্তির ভয়ে কিংবা তাঁর পক্ষ থেকে পুরস্কারের আশায় অথবা তার বড়ত্বের প্রতি অনুগত হয়ে। এভাবেই সে পূত-পবিত্র হয়ে ধূপদানিতে যেন এক 'হিন্দুস্তানি সুগন্ধি উদ'-এ পরিণত হয়। চারদিকে তার সুবাস ও সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন তার ঘ্রাণ অনুভব করে- কিন্তু কেউ জানতে পারে না বস্তুটি কোথায়!
এভাবে গোনাহ বর্জনের প্রচেষ্টার পরিমাণ অনুপাতে প্রভুর প্রতি তার ভালোবাসাও বাড়তে থাকে। একই সাথে দুনিয়ার কোনো 'প্রিয়তম' কিংবা 'প্রিয়তমা'র আহ্বান উপেক্ষার কষ্টের পরিমাণ অনুযায়ী তার সম্পর্কের সুঘ্রাণ ছড়াতে থাকে।
তখন মানুষের চোখ তাকে সম্মান করতে শুরু করে। মানুষের জিহ্বা তার প্রশংসা করতে থাকে- কিন্তু তারা ভালোভাবে বুঝতে পারে না, কেন এটা তারা করছে! এর রহস্য তাদের বোধগম্য না হওয়ার কারণে এর গুণাগুণও তারা বর্ণনা করতে সক্ষম হয় না।
আর এই প্রশংসা ও সৌরভ মূলত তার মৃত্যুর পর তার মর্যাদা অনুযায়ী আরও বিস্তৃত হতে থাকে। সাধারণ কোনো ব্যক্তির কল্যাণ নিয়ে আলোচনা করা হয় কিছুকাল- এরপর তাকে সকলে ভুলে যায়। আর কাউকে স্মরণ করা হয় শত বছর। এরপর আস্তে আস্তে তার আলোচনাও কমতে থাকে এবং একসময় বন্ধ হয়ে যায়। আর কেউ কেউ এমনই অমর আদর্শ হয়ে ওঠেন যে, তাদের স্মরণ-আলোচনা চিরদিন চলতেই তাকে। কখনো শেষ হয় না। বন্ধ হয়ে যায় না।
ঠিক এর বিপরীত অবস্থা হলো তার, মানুষজন যাকে ভয় করে। যার অনিষ্টকে ভয় করে। প্রকৃতপক্ষে তার অনুপস্থিতিতে কেউ তাকে সম্মান দেখায় না। আর এটা হয়ে থাকে তার গোনাহ ও অপরাধের অনুপাতে। তার থেকে কেমন যেন অপছন্দের বাতাস আসতে থাকে। অন্তরসমূহ তার প্রতি বিরক্ত বিতৃষ্ণ ও বিরূপ হয়ে ওঠে। তার ক্ষতির আশঙ্কা যখন কমে যায়, তখন লোকজনের জিহ্বাও তার কল্যাণের আলোচনা কমিয়ে দেয়। তখন শুধু বাহ্যিক সম্মানটাই বাকি থাকে। আর যদি ক্ষতির আশঙ্কা বেড়ে যায়- তখন অধিকাংশ মানুষ চুপ থাকে। তার প্রশংসাও করে না। নিন্দাও করে না।
হজরত আবু দারদা রা. বলেন,
إن العبد ليخلو بمعصية الله تعالى فيلقي الله بغضه في قلوب المؤمنين من حيث لا يشعر.
মানুষ যখন নির্জনে আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা অব্যাহত রাখে, তখন আল্লাহ তাআলা মুমিনদের অন্তরে তার প্রতি অপছন্দনীয়তা এমনভাবে স্থাপন করেন যে, তা সেই ব্যক্তি নিজেও টের পায় না।
যেগুলো লিখলাম, সেগুলো নিয়ে চিন্তা করো। যা উল্লেখ করলাম, সেগুলো স্মরণ করো। নিজেদের একান্ত ও নির্জন অবস্থা ও আমল সম্পর্কে অবহেলা করো না। আমল নির্ভর করে নিয়তের ওপর। আর প্রতিদান প্রদান করা হয় ইখলাস বা একনিষ্ঠতা অনুসারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00