📄 আলেমদের ওপর দারিদ্র্যের প্রভাব
আলেমদের জন্য দুনিয়ায় ইলমের পর সবচেয়ে উপকারী হলো তার সম্পদ অর্জন। কারণ, যখন তার ইলমের সাথে এই সম্পদ একত্রিত হবে, তখন তার ব্যক্তিত্বের পূর্ণতা পাবে। মানুষের নিকট হাতপাতা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব হবে। নিজেকে লাঞ্ছনার মুখোমুখি হতে হবে না।
কিন্তু অধিকাংশ আলেমই তাদের ইলমের ব্যস্ততার কারণে সম্পদ অর্জনের সুযোগ পান না, কিন্তু এগুলো ছাড়া দুনিয়ার জীবনযাপনও সম্ভব নয়। একালে আমাদের এবং আলেমদের ধৈর্যও গেছে কমে।
এ কারণে তারা এমন কিছু জায়গায় যাওয়া-আসা করছে, যা তাদের সম্মান নষ্ট করে। যদিও তারা এক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও তাবিলের আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু আসলেই এর বিপরীত পথ অবলম্বন করাটাই ছিল তাদের জন্য উত্তম সুন্দর ও সম্মানজনক।
অতীতেও আলেমদের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে। যেমন, ইমাম জুহরি খলিফা আবদুল মালেকের নিকট যাওয়া, হজরত আবু উবাইদা, তাহের বিন হুসাইনের দরবারে যাওয়া। ইবনে আবিদ দুনয়া তো ছিলেন খলিফা মু'তাদের দরবারি শিক্ষক। আর ইবনে কুতাইবা মন্ত্রীর প্রশংসায় একটি কিতাবই লিখে ফেলেছেন। এভাবে অনেক আলেম ও জাহেদ ব্যক্তি এমন শাসকদের ছত্র-ছায়ায় বাস করেছেন- যারা ছিল জালেম।
এসকল ক্ষেত্রে যদিও আলেমগণ নিজেদের পক্ষে কিছু ব্যাখ্যা ও ওজর পেশ করেছেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা শাসকদের থেকে যতটা দুনিয়া অর্জন করেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি তারা তাদের অন্তর থেকে দ্বীন ও তাকওয়া খুইয়েছেন।
আমরা অনেক আলেম ও সুফিকে দেখি, তারা শাসক-মন্ত্রীদের চারপাশ আবৃত করে আছে- যাতে করে তাদের থেকে পার্থিব কিছু প্রাপ্ত হতে পারে। তাদের তোষামদ করছে, লৌকিকতা করছে। আর কেউ নাজায়েয প্রশংসাও করছে। কেউ তাদের দোষ ও জুলুম সম্পর্কে চুপ থাকছে। আরও বিভিন্ন ধরনের তোষামদ ও মোসাহেবি করছে। এবং এর অধিকাংশই করা হচ্ছে নিজেদের দরিদ্রতার কারণে এবং দুনিয়াপ্রাপ্তির আশায়।
এ কারণেই আমরা বারবার বলি- পরিপূর্ণ মর্যাদাবান হতে হলে এবং লোক দেখানো লৌকিকতা থেকে বেঁচে থাকতে হলে, এসকল জালেম শাসক, মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের থেকে দূরে থাকতে হবে। আর এটি করতে হলে আলেমদের দুই ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে:
১. আলেম ও মুহাদ্দিসদের সম্পদের অধিকারী হতে হবে।
যেমন ছিলেন হজরত সাইয়েদ ইবনে মুসাইয়িব রহ.। তাঁর যাইতুন ও অন্যান্য জিনিসের ব্যবসা ছিল। আরও ছিলেন সুফিয়ান সাওরি রহ.। তাঁর অনেকগুলো পানি সিঞ্চনের কূপ ছিল। জমি-জায়গা ছিল। সেগুলো থেকে উপার্জন হতো। আরও ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহ.। তিনিও অনেক সম্পদের অধিকারী ছিলেন। এমন ছিলেন আরও অনেকেই।
২. আর সম্পদ যদি না থাকে, তাহলে আলেম ও মুহাদ্দিসদের সীমাহীন ধৈর্যের অধিকারী হতে হবে। অর্জিত সম্পদে যথেষ্ট হোক বা না হোক- তাতেই সন্তুষ্ট থাকার মতো হিম্মত থাকতে হবে।
যেমন ছিলেন বিশর হাফি রহ., আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এবং অনেকে।
কিন্তু এমন ধৈর্যশীল যদি না পাওয়া যায় এবং উল্লিখিতদের মতো ধনবান যদি না হয়, তাহলে অনিবার্যভাবেই একজন আলেম বা মুহাদ্দিস ফিতনা ও পরীক্ষার মধ্যে পড়ে যাবে। ভীষণ কষ্টের শিকার হবে। কিংবা নিজের দ্বীনকেই বিনষ্ট করে ফেলবে।
হে তালিবুল ইলম, তোমাকে এবার বলি, ইলমের সাথে সাথে সম্পদ অর্জনেরও চেষ্টা করবে- যাতে মানুষের নিকট হাত পাতা থেকে বিরত থাকা যায়। এটা তোমার দ্বীনের হেফাজতের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে।
ধর্মের নামে, দুনিয়াবিমুখতার নামে এবং খোদাভীরুতার নামে যারাই মুনাফেকি করছে এবং আলেমদের মধ্যে যারাই কষ্টে পতিত হতে হচ্ছে- এর অধিকাংশই হচ্ছে দুনিয়ার সম্পদের প্রতি তাদের দৃষ্টি থাকার কারণে এবং তাদের ভীষণ দরিদ্রতার কারণে। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তারা বিভিন্ন অবৈধ পথেও প্রবেশ করে ফেলছে এবং অন্যরাও তাদের নিয়ে খেলছে- তাদের এই দারিদ্র্যের সুযোগে।
কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকার পরও যারা দুনিয়াদারদের সাথে দ্বীন বিক্রয়ে মেলামেশা করছে, তাদের সংখ্যা খুবই কম। তারা তো আলেমদের কাতার থেকেই বিচ্ছিন্ন। তাদেরকে আলেম বলার কোনো কারণই নেই। আল্লাহ তাআলা আমাদের এমন অবস্থা থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
📄 একজন ফিকাহবিদের শ্রেষ্ঠত্ব
কোনো জিনিসের শ্রেষ্ঠত্বের বড় প্রমাণ হলো তার পরিণাম বা ফলাফলের উৎকৃষ্টতা। যে ব্যক্তি ফিকহর প্রতিফল নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে, সেই বুঝবে যে ইলমগুলোর মধ্যে ফিকহ হলো শ্রেষ্ঠ ইলম। কেননা, মাজহাবগুলোর বিন্যাসদানকারী ইমামগণ এই ফিকহের মাধ্যমেই সকলের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন। অথচ তাদের সময়েই কোরআন, হাদিস ও ভাষা-সাহিত্যে তাদের চেয়েও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিগণ ছিলেন। আজকের দিনেও একইভাবে বিষয়গুলো মিলিয়ে দেখতে পারো।
এমন কত আলেম রয়েছেন, যারা কোরআন, হাদিস, তাফসির কিংবা ভাষা-সাহিত্যে অনবদ্য ও অনন্যসাধারণ জ্ঞান রাখেন, কিন্তু বয়সের আধিক্য সত্ত্বেও শরিয়তের প্রধান ও মৌলিক হুকুমগুলোর জ্ঞান রাখেন না। কারও অবস্থা এতটাই খারাপ যে, নামাজের মাসআলাগুলোও ঠিকমতো জানা নেই।
কিন্তু একজন ফকিহ- তাকে ব্যাপক অধ্যয়ন করতে হবে; ফিকহের পাশাপাশি অন্য ইলমগুলোর ক্ষেত্রেও যেন সে একেবারে অজ্ঞ থেকে না যায়। নতুবা সে তো একজন প্রাজ্ঞ ফকিহই হতে পারবে না। বরং সে প্রতিটা ইলমে যথেষ্ট পরিমাণ জ্ঞান আহরণ করবে, এরপর ফিকহের সাধনায় মনোনিবেশ করবে। এটাই হবে তার দুনিয়া ও আখেরাতের মর্যাদার মাধ্যম।
📄 প্রবৃত্তির প্রাধান্য
আমি অনেক মানুষকে দেখি—নাপাকির ছিটেফোঁটা থেকেও তারা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু গিবত থেকে বিরত থাকে না। অনেক দান-সদকা করে, কিন্তু সুদের কারবার বর্জন করে না। রাতের গভীরে তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে যায়, কিন্তু অনেক ফরজ কর্তব্যও বিলম্বিত করে রাখে কিংবা আদায় করে না। এভাবে অনেক শাখাগত বিষয় তো পালন করে, কিন্তু মৌলিক বিধানগুলোই বিনষ্ট করে ছাড়ে ইত্যাদি।
এগুলো নিয়ে আমি চিন্তা-ভাবনা করলাম- এর কারণ কী? এর দুটি কারণ হতে পারে।
১. অভ্যাস। অভ্যাসের কারণেই মানুষ এমনটি করে। অভ্যাসের কারণেই সে হয়তো কঠিনটাও করে ফেলছে। আবার অভ্যাসের বাইরে হওয়ার কারণে সহজ কাজটাও অনেক সময় সে করছে না। তার নিকট কঠিন মনে হচ্ছে।
২. প্রবৃত্তির প্রাধান্য। হয়তো কোনো বিষয় অর্জনের ক্ষেত্রে তার প্রবৃত্তি বা কামনা প্রবল হয়েছে। সে এর জন্য সে প্রাণপণ পরিশ্রম করছে। অন্যদিকে দৃষ্টিপাতের যেন কোনো সুযোগই নেই। যেকোনো মূল্যে সে এটাকে অর্জন করেই ছাড়বে। এমনকি এ ব্যাপারে সে তার হালাল-হারামেরও বাছ-বিচারও করতে রাজি নয়।
এ ধরনের কাজের উদাহরণ হিসেবে হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের কথা উল্লেখ করা যায়। যখন তারা মিসরে এসে খাদ্য-সামগ্রী নিয়ে ফিরে চলছিল- এ সময় তাদের পেছন থেকে একজনের আহ্বান শুনতে পেল- ﴿أَيَّتُهَا الْعِيرُ إِنَّكُمْ لَسَارِقُونَ﴾ -হে মুসাফির দল, নিশ্চয় তোমরা চোর।
তখন তারা লোকটির দিকে ফিরে বলল, ﴿تَاللَّهِ لَقَدْ عَلِمْتُمْ مَا جِئْنَا لِنُفْسِدَ فِي الْأَرْضِ وَمَا كُنَّا سَارِقِينَ﴾ আল্লাহর কসম, তোমরা তো জানোই, আমরা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার জন্য আসিনি। আর আমরা চোরও নই। [সুরা ইউসুফ: ৭০]
তাফসিরে বর্ণিত হয়েছে, ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইয়েরা যখন মিসর এসে নামলেন, তখন তারা তাদের উটের মুখে 'মুখবন্ধনী' পরিয়ে দিলেন- যাতে উটগুলো অন্য কারও জিনিসে মুখ দিতে না পারে। কারও জিনিস খেতে না পারে। এখন ভাইয়েরা 'আমরা চোর নই' কথার মধ্যে এই দিকে ইশারা ছিল যে, অন্যের সামান্য কোনো জিনিসও যেন আমাদের উট খেয়ে ফেলতে না পারে, সে জন্য আমরা আমাদের উটের ক্ষেত্রে যা করেছি, যা তোমরা দেখছ। তাহলে আমরা কীভাবে চোর হতে পারি?
এখানে ভাইদের অবস্থা কেমন? অবস্থাটা এই যে- অন্যের মালিকানার সামান্য কিছুও যেন উট খেয়ে না ফেলে- এ বিষয়ে তাদের 'তাকওয়া' এতটাই উচ্চ পর্যায়ের... অন্যদিকে তারাই আবার ইউসুফকে কুয়ার মধ্যে ফেলে দিয়েছে এবং সামান্য কিছুর বিনিময়ে নিজের ভাইকে গোলাম হিসেবে বেচে দেওয়ার মতো গর্হিত কাজ করেছে!
কিছু মানুষ এমন আছে, যারা দ্বীনের ছোট ছোট বিষয়ও মেনে চলে; কিন্তু বড় বিষয়গুলোই মান্য করে না এবং তার অভ্যাসের কারণে যেটা করতে তার কষ্ট হয়, সেটাও করে না- বিষয়টি ছোট হোক কিংবা বড়। এবং খাদ্য-খাবার ও পোশাক-পরিচ্ছেদের ক্ষেত্রে যেগুলো তার অভ্যাসের মধ্যে কোনো ব্যাঘাত ঘটায় না- সেগুলোই শুধু মানে। আর বিপরীতগুলো মানে না।
এমন কিছু লোককেও দেখি, যারা সুদ গ্রহণ করে। অথচ তারাই আবার আলোচনায় গল্প করে- মানুষ কীভাবে আজান শুনে মসজিদে না গিয়ে পারে!
কারও তো অজুর মধ্যে ওয়াসওয়াসা হতেই থাকে। একের পর এক পানি ব্যবহার করতে থাকে। অথচ এর কারণে যে প্রচুর পানির অপচয় হচ্ছে, সেটাকে সে কিছুই মনে করছে না। তার থেকে বিরতও থাকছে না।
কিছু মানুষ অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্য মিথ্যা ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে- অথচ সে জানে, এটা জায়েয নয়।
এমনকি আমার নিজের দেখা একজন লোকের কথা বলি- তাকে আমি ভালোই মনে করতাম। তাকে একবার এক ব্যক্তি মসজিদ নির্মাণের জন্য কিছু সম্পদ প্রদান করল। কিন্তু লোকটি তা দিয়ে মসজিদ না বানিয়ে নিজেই আত্মসাৎ করে নিল-নিজের প্রয়োজনে খরচ করে ফেলল।
আবার কিছু লোক এমন আছে, যারা গোনাহের উপকরণ ও পরিবেশ থেকে দূরে থাকার কারণে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে। এবং গোনাহ বর্জনের ব্যাপারে তৃপ্তও থাকে। কিন্তু যখন তারাও গোনাহের নিকটবর্তী হয় কিংবা সেই পরিবেশে আসে, তখন আর নিজেকে گناه থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না কিংবা তা থেকে বিরত থাকে না। বরং তারা নিজেরাই গোনাহের মধ্যে লিপ্ত হয়ে যায়।
মানুষের মাঝে এমন আশ্চর্য আচরণের অধিকারী অনেক শ্রেণি আছে- যার আলোচনা অনেক দীর্ঘ।
আমরা নিজেরাও জানি, ইহুদি আলেমদের অনেকেই তাদের ধর্ম ও ইবাদতের ক্ষেত্রে অনেক কষ্ট স্বীকার করত। অনেক আমল করত। কিন্তু যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন এবং তারা তার সত্যতা সম্পর্কেও অবগত হলো, তখন তারা তাদের নেতৃত্বের মোহের ওপর সত্যকে প্রাধান্য দিতে সক্ষম হয়নি।
সম্রাট হিরাক্লিয়াসের ক্ষেত্রেও এমনটিই হয়েছিল। সে-ও বিভিন্ন দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যতা জেনেছিল- কিন্তু সে সত্যকে তার প্রবৃত্তির চাহিদা ও রাজত্বের মোহের ওপর প্রাধান্য দিতে সক্ষম হয়নি।
আল্লাহর দোহাই, মৌলিক জিনিস নষ্ট না করা চাই। আর প্রবৃত্তিকে তার ইচ্ছামতো চরতে দেওয়ার অবহেলা থেকেও বেঁচে থাকা চাই। কারণ, তুমি যদি একবার তাকে তার ইচ্ছায় ছেড়ে দাও, তাহলে সে মুহূর্তের মধ্যে তোমার এতদিনের সাজানো তাকওয়ার বাগান সমূলে বিনষ্ট করে দেবে। প্রবৃত্তির উদাহরণ হলো একটি হিংস্র প্রাণীর মতো-যার গলায় শিকল দিয়ে বাঁধা রয়েছে। সে যদি দেখে শিকল শক্তিশালী, তখন সে তার থাবাকে গুটিয়ে রাখে। কিন্তু কখনো কখনো তার প্রবল প্রতাপ বাসনা এই শিকলের শক্তিকেও ডিঙিয়ে যায়। তখন আর শিকল তাকে বেঁধে রাখতে সক্ষম হয় না। শিকল যায় ছিঁড়ে। প্রবৃত্তি তখন তার কামনার থাবা নিয়ে গোনাহের রাজ্যে দাপিয়ে বেড়ায়-যতক্ষণ না তাকে আবার শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।
মানুষের মধ্যে কেউ কেউ তার প্রবৃত্তিকে বেঁধে রাখে শিকল দিয়ে। কেউ রশি দিয়ে। আর কেউ কেউ সুতো দিয়ে। তাই গোনাহের দিকে তার ঝাঁপিয়ে পড়ার ক্ষেত্রেও মানুষের তারতম্য পরিলক্ষিত হয়।
বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত হবে, প্রবৃত্তির এসকল 'শয়তানি' সম্পর্কে সতর্ক থাকা। সে যে সকল উপায়ে এবং যাদের ওপর শক্তিশালী হয়ে ওঠে- সেসব বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখা।
📄 বন্ধুর ক্ষেত্রে সতর্কতা
মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হলো না জেনে অন্যের ওপর আস্থা রাখা এবং বন্ধুদের ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শন করা। কারণ, মানুষকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় বন্ধু থেকে পরিবর্তিত হওয়া শত্রু। কারণ, সে সকল গোপনীয়তা ও দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত থাকে।
যেমন কবি বলেন, احذر عدوك مرة ... واحد صديقك ألف مرة فلربما انقلب الصديق فكان أعم بالمضرة
শত্রুর ক্ষেত্রে সতর্ক হও একবার। বন্ধুর ক্ষেত্রে সতর্ক হও হাজারবার। বন্ধু যদি শত্রুতে পরিণত হয়, সে তোমার ক্ষতির ক্ষেত্রে বেশি খবরদার।
মানুষের অন্তরে যে সকল গোপন বিষয় লুকিয়ে থাকে, তার মধ্যে প্রধান হলো অন্যের কল্যাণের ব্যাপারে হিংসা, ঈর্ষা এবং নিজের উন্নতির আকাঙ্ক্ষা।
সুতরাং যখন তোমার সমশ্রেণির কেউ তোমাকে দেখবে যে, তুমি তার চেয়ে বেশি উন্নতি করছ, অবশ্যই এটা তার ওপর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। এমনকি এটা তাকে হিংসায় নিপতিত করবে। হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সাথে তার ভাইদের বিষয়টি এই হিংসার কারণেই ঘটেছিল।
এখন তুমি যদি বলো, মানুষের বন্ধু দরকার হয়। বন্ধু ছাড়া সে কীভাবে জীবনযাপন করবে?
আমি তোমাকে বলি, তুমি কি নিজেই দেখোনি, সমশ্রেণিরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি কীভাবে হিংসা করে? আর যদি সাধারণ ব্যক্তিদের কথা ধরো, তবে তো তাদের অধিকাংশের বিশ্বাস—একজন আলেম ‘মুচকিও হাসবে না। দুনিয়ার কোনো বিষয়েই তার আকর্ষণ থাকবে না। তাই যখন তারা কোনো আলেমকে কোনো বৈধ আনন্দ বা উপভোগ্যতার দিকে হাত বাড়াতে দেখে, তাদের চোখে সে আলেমের পতন ঘটে যায়। এই হলো সাধারণ ব্যক্তিদের অবস্থা। আর আমরা তো বলছি বিশেষ ও একান্ত ব্যক্তিদের কথা—একটু এদিক-সেদিক হলেই অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তাহলে তুমি ঘনিষ্ঠ হবে কার সাথে?
কিছুতেই না। আল্লাহর কসম, দুনিয়াতে কিছুতেই কোনো হৃদয়ের সাথে নিঃস্বার্থ ঘনিষ্ঠ হওয়া কিংবা একনিষ্ঠ বন্ধুত্ব প্রাপ্তি সম্ভব নয়। কারণ, মানুষের অন্তর হলো 'বহুরূপী'। ক্ষণে ক্ষণে তার রূপ পাল্টাতে পারে এবং পাল্টায়। হ্যাঁ, মানুষের সাথে ওঠাবসা করা, চলাফেরা করা এবং সামাজিক আচার-আচরণ চলতে পারে।
হ্যাঁ- এটাও ঠিক, কোনো ধরনের প্রত্যাশা ও বাসনা ছাড়া কাউকে বন্ধু হিসেবে পাওয়া বা গ্রহণ করার বাস্তবতাও স্বীকৃত। তবে এমন বন্ধু পাওয়া প্রায় অসম্ভব। যদি হয়ও- তবে সে হয়তো তোমার সমশ্রেণি থেকে হবে না। কারণ, সমশ্রেণির মধ্যে হিংসাটাই প্রধান থাকে। এবং সে হবে সাধারণ থেকে একটু উচ্চের। এবং এমন ব্যক্তি হবে- যে তোমার পর্যায়ের সম্মান ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষী নয়।
তবে এমন সঙ্গ বা বন্ধুত্বের দ্বারা মনে পূর্ণ পরিতৃপ্তি আসে না। কারণ, বন্ধুত্ব হওয়া দরকার ছিল তোমার সমশ্রেণির আলেম এবং একই মানসিকতাপূর্ণ ব্যক্তিদের মাঝে- একই বিষয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের মাঝে। তাহলে সেখানে এমন ইশারা-ইঙ্গিতে কথা চলতে পারত- যার কারণে মজলিস হয়ে উঠতে পারত প্রাণবন্ত ও প্রাঞ্জল। কিন্তু এটা যেন হওয়ারই নয়- সমশ্রেণির মাঝে পারস্পরিক হিংসার কারণে।
এ কারণে যাদের সাথে একনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হয়, তাদের দিয়ে মন ভরে না। আর যাদের সাথে মন ভরতে পারত, তাদের সাথে বন্ধুত্ব হয় না। মানুষের মনের রাজ্যে এ এক আশ্চর্য বিচরণ।
ঠিক এই ধরনের জটিল বিষয়ের মুখোমুখি হতে হয় বাড়িতে কোনো কাজের লোক রাখার ক্ষেত্রে। তুমি যদি বুদ্ধিমান কাউকে রাখো, তবে সে তোমার গোপন ও একান্ত বিষয়গুলোও জেনে যাবে। আর যদি নির্বোধ কাউকে রাখো, তবে তোমার কোনো কাজই তাদের দ্বারা আদায় হবে না। এ কারণে তোমার কর্তব্য হবে, তুমি বাইরের কাজের ক্ষেত্রে বুদ্ধিমান দেখে রাখবে আর বাড়ির ভেতরের কাজের জন্য রাখবে সরল ও নির্বোধ ধরনের কাউকে।
আর বন্ধুর ক্ষেত্রে তেমন বন্ধুর ওপরই আস্থা রাখতে পারো- যার বৈশিষ্ট্য আমি তোমাকে কিছুক্ষণ আগে বর্ণনা করেছি। তবে তার সঙ্গেও সতর্কতার সাথে চলবে। যে গোপন বিষয়গুলো তাকে না জানালেও চলে, সেগুলো তার থেকে গোপন রাখাই শ্রেয়। বন্ধুত্বের আচরণের ক্ষেত্রে তুমি হবে একই সাথে স্ফূর্ত ও সতর্ক। খোলামেলা, কিন্তু সজাগ। যেমন নেকড়ের কথা বলা হয়—
ينام بإحدى مقلتيه ويتقي ... بأخى الأعادي فهو يقظان هاجع
সে তার দুটি চোখের একটি দিয়ে ঘুমায়। আর অন্যটি দিয়ে শত্রুদের ব্যাপারে সতর্ক থাকে; যেন সে একই সাথে জাগ্রত ও ঘুমন্ত।