📄 মধ্যাস্থাই শ্রেষ্ঠ
জেনে রেখো, সকল বিষয়ে মধ্যপন্থাই হলো শ্রেষ্ঠ পন্থা। যখন দেখি দুনিয়াদাররা তাদের সম্পদের উচ্চাশায় হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং আখেরাতের ভালো কাজগুলো থেকে দূরে সরে যায়, তখন আমি তাদেরকে বেশি বেশি মৃত্যু, কবর ও আখেরাতের কথা স্মরণ করতে আদেশ করি।
কিন্তু যখন কোনো আলেমের ক্ষেত্রে এমন হয় যে, তার স্মরণ থেকে মৃত্যু কখনো অনুপস্থিত থাকে না। প্রায় সর্বক্ষণ আখেরাতের কথা-সংবলিত বহু হাদিস তার কাছে পড়া হয় এবং নিজেও বহু হাদিস পাঠ করে, তখন এগুলো তার মৃত্যুর স্মরণকে এমনভাবে বাড়িয়ে দেয় যে, স্বস্তির সাথে সে অন্য কাজও করতে পারে না।
তাহলে সর্বক্ষণ আল্লাহর প্রতি প্রচণ্ড ভয় ও আখেরাতের অধিক স্মরণকারী এই আলেমের জন্য উচিত হবে, মৃত্যুর স্মরণ থেকে তার অন্তরকে কিছুটা বিরত রাখা। যাতে তার নফস দুনিয়ার অন্য কাজের দিকেও কিছুটা অগ্রসর হতে পারে। যেমন, কিতাব রচনা, আত্মীয়স্বজনদের সাথে সম্পর্ক রাখা। কল্যাণকর কাজ এবং বিবাহ ও সন্তান অন্বেষণ ও প্রতিপালন ইত্যাদি।
সুতরাং তার এই অবস্থায় সে যদি আরও মৃত্যুর স্মরণে লেগে থাকে, তবে সেটা তার উপকারের চেয়ে ক্ষতিই করবে বেশি। তুমি কি শোনোনি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রী হজরত আয়েশা রা.-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন? কখনো আয়েশা রা. অগ্রগামী হয়েছেন, আবার কখনো তিনি অগ্রগামী হয়েছেন। এভাবে তিনি হাসি-মজাকও করেছেন। কিছু সময় অন্তরকে স্বস্তি দিয়েছেন।
সুতরাং কঠোরতার ওপর যদি আবার কড়াকড়ি শুরু হয়, তবে তা শরীরকে নষ্ট করে এবং অন্তর তাতে ত্যক্ত বিরক্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ে।
হজরত আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি একবার আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করলেন যে, তিনি যেন তার ওপর তার ভয়ের দরজা খুলে দেন।
প্রার্থনা অনুযায়ী তার ওপর ভয়ের দরজা খুলে দেওয়া হলো। সর্বক্ষণ প্রচণ্ড ভয়। পরিণামে তার মস্তিষ্ক বিগড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। হজরত আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. আবার দুআ করলেন- ভয়ের তীব্রতা উঠিয়ে নেওয়ার জন্য।
সুতরাং জীবনের সর্বক্ষেত্রে এই মূলনীতিটি অনুসরণ করবে। কখনো কখনো নফসকে একটু স্বস্তি দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এর মাঝেই রয়েছে তার কল্যাণ।
📄 পূর্ণতার অন্বেষণ
কারও যদি একটি পরিশুদ্ধ চিন্তা থাকে, তাহলে চিন্তাটি তাকে কোনো বিষয়ের সর্বোচ্চ মর্যাদায় উপনীত হওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে এবং তাকে নীচতার প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে নিষেধ করবে। কবি আবুত তিব আল মুতানাব্বি বলেন, ولم أر في عيوب الناس عيباً ... كنقص القادرين على التمام মানুষের ত্রুটিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দোষ বলি আমি পূর্ণতার ওপর সক্ষম ব্যক্তি যদি নিচে আসে নামি।
সুতরাং কোনো বুদ্ধিমানের জন্য উচিত হবে, তার জন্য সম্ভব সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছার চেষ্টা করা।
মানুষের জন্য যদি আকাশে আরোহণের বিষয়টি সম্ভব হতো, তবে আমি তার জন্য জমিনে বসে থাকাটা পছন্দ করতাম না।
নবুয়ত যদি চেষ্টা ও সাধনার মাধ্যমে অর্জনের বিষয় হতো, তবে আমি তা অর্জনে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তিকে ভাবতাম নিম্নশ্রেণির লোক। কিন্তু তা যেহেতু অর্জন করা সম্ভব নয়, তাহলে যা সম্ভব তা অর্জনের চেষ্টা করা আবশ্যক।
পণ্ডিতরা বলেন, ইলম ও আমলে, জ্ঞান ও কর্মে যথাসম্ভব পূর্ণতায় পৌঁছানো ব্যক্তির জীবনই একটি শ্রেষ্ঠ জীবন।
অর্থাৎ তারা বলতে চান—মানুষের শারীরিক আকৃতি ও চেহারা তার স্বেচ্ছায় অর্জনের বিষয় নয়। কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা এবং নিজেকে পরিপাটি করে রাখা নিজ ইচ্ছায় সম্ভব। কিন্তু এক্ষেত্রেও অনেক মানুষ ভীষণ অবহেলা ও অলসতা প্রদর্শন করে। শরিয়ত এসব বিষয়ে সতর্ক করেছে। এখানে তার কিছু উল্লেখ করছি। যেমন, হাতের নখ কাটা, বগলের পশম ওঠানো, নাভির নিচের পশম কাটা। জনাকীর্ণ জায়গার ক্ষেত্রে রসুন-পেঁয়াজ না খাওয়া—যাতে দুর্গন্ধ না ছড়ায়। সুগন্ধি ব্যবহার করা।
একজন মুসলমানের জন্য এগুলোর ওপর কিয়াস করে জীবনের অন্য বিষয়গুলির ক্ষেত্রেও শুভ্রতার পরিচয় দেওয়া উচিত। জীবনের সর্বক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পরিমাণে পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাট্যতার পরিচয় দেওয়া উচিত। আমরা জানি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীরের ঘ্রাণের সৌরভে তার আগমন উপলব্ধি করা যেত। এটি ছিল তার সর্বোচ্চ পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকার উত্তম উদাহরণ।
এসকল আলোচনা দ্বারা আমি এটা বলতে চাচ্ছি না যে, এ বিষয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করা হবে। যেমন লৌকিকতা প্রদর্শনকারীরা করে। কিন্তু মধ্যপন্থা সব সময়ই প্রশংসনীয়।
এরপর একজন মুসলমানের জন্য তার শারীরিক শক্তিমত্তার ব্যাপারেও দৃষ্টি দেওয়া উচিত। কারণ, এই শরীরটাই তার বাহন। এর শক্তি যদি কমে যায়, তার নিজের শক্তিও কমে যাবে। এ বলে আমি অবশ্যই বাছ-বিচারহীন ‘ভক্ষণ’-এর কথা বলতে চাচ্ছি না। আমি বলতে চাচ্ছি একটি উপযুক্ত পরিমাণের কথা- যার মাধ্যমে শারীরিক শক্তিমত্তা অটুট থাকে। শরীর হলো একটি প্রবাহিত ঝরনার মতো। এটা ঠিক থাকলে নিজে উপকৃত হওয়া যায় এবং অন্যরাও উপকৃত হতে পারে।
তুমি কিছুতেই সেই কঠোর কঠিন জাহেদদের কথায় কান দিয়ো না, যারা নিজেরা খুবই স্বল্প খায়। এবং দুর্বল হতে হতে ফরজ ও আবশ্যক কাজগুলো থেকেও অক্ষম হয়ে পড়ে। অথচ দুনিয়াতে কত কাজ! শান্তি লুকিয়ে থাকে সত্য শক্তিমত্তার আড়ালে!
তাদের এই বিষয়গুলো কিছুতেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা তাঁর সাহাবিদের থেকে বর্ণিত নয়। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে সাহাবিরা যখন খাওয়ার কিছু পেতেন না, তখন ক্ষুধার্ত থাকতেন এবং ধৈর্যধারণ করতেন। আবার আল্লাহ রিজিক দিলে খেতেন এবং শুকরিয়া আদায় করতেন।
যেহেতু তোমার শরীর হলো তোমার বাহন—তাই এর দানা-পানির ব্যাপারেও তোমাকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সুতরাং তার কষ্ট হয়- এমন কিছু করবে না। বরং তার সুস্থতার ব্যাপারে নজর রাখবে। আর সেই জাহেদের কথার দিকে দৃষ্টি দেবে না, যে বলে, 'আমি কিছুতেই নফসকে শাহওয়াতের ওপর নিয়ে যেতে চাই না। তাই খাই না।'
হ্যাঁ, খাবারের ক্ষেত্রে বেঁচে থাকতে হবে হারাম থেকে। অধিক ভক্ষণ থেকে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাথিরা খাদ্য বর্জন করেছেন কোনো হারামের কারণে অথবা সর্বক্ষণ নফসের চাহিদা বৃদ্ধির ভয়ে। এটা বৈধ।
এরপর সকল সক্ষম ব্যক্তির জন্যই উচিত— ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা উপার্জনের উপযুক্ত কোনো মাধ্যম গ্রহণ করা। যাতে সে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে। অন্যরা যেন তার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে না পারে। তবে অবশ্যই এর মধ্যে একটি সীমা বেঁধে নেবে— যাতে উপার্জনে অধিক মগ্নতার কারণে ইলমচর্চা থেকে গাফেল হয়ে না পড়ে। এরপর যার সুযোগ ও সক্ষমতা রয়েছে তার জন্য উচিত হবে, ইলমের সর্বোচ্চ সীমায় উপনীত হওয়ার চেষ্টা করা।
এরপর সে আল্লাহ তাআলার সর্বোচ্চ মারেফাত অর্জনের জন্যও চেষ্টা করবে। তার জন্য একনিষ্ঠতার সাথে আমল করবে। এটাই হবে তার জীবন-পথের ধারাবাহিক কাজ ও কর্তব্য।
মোটকথা- তার জন্য যে শ্রেষ্ঠত্বগুলো অর্জন করা সম্ভব, সে তার সবগুলোই অর্জন করার চেষ্টা করবে। কারণ, সর্বোচ্চে উঠে নমনীয়তা দেখানোই হলো সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক।
কবি বলেন,
فكن رجلاً رجله في الثرى ... وهامة همته في الثريا
তাহলে তুমি এমন এক ব্যক্তি হও, যার পা রয়েছে মাটিতে। এমন সাহসী ও প্রত্যয়ী হও, যার হিম্মত ও উচ্চাশা ছুঁয়েছে আকাশের 'সুরাইয়া' তারকাকে।
ইলম ও আমলে তুমি যদি বর্তমানের সকল আলেম ও জাহেদকে ছাড়িয়ে যেতে পারো, তবে তুমি তা-ই করো। তারাও যেমন রক্ত-মাংসের সাধারণ মানুষ, তুমিও তেমন এক মানুষ। কোনো ব্যক্তি যদি হীন, অক্ষম ও গৌণ হয়, সে তার হিম্মতের হীনতা ও নীচতার কারণেই হয়।
জেনে রেখো, তুমি এক প্রতিযোগিতার ময়দানে রয়েছ। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। মুহূর্তের জন্যও অবহেলা ও অলসতাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। কারণ,
فما فات ما فات إلا بالكسل ولا نال من نال إلا بالجد والعزم
মানুষের জীবনে যত বঞ্চনা এসেছে, সেটা তার অলসতার কারণেই এসেছে।
এবং যতটুকু অর্জন করেছে, সে তার হিম্মত ও প্রচেষ্টার মাধ্যমেই অর্জন করেছে।
হিম্মত ও প্রত্যয় এমন এক জিনিস—যা অন্তরকে উজ্জীবিত করে রাখে। যেমন আগুন উত্তপ্ত রাখে পাতিলের মাঝের তরলতাকে। আমাদের একজন সালাফ বলেন,
ليس لي مال سوى كري ... فبه أحيا من العدم
قنعت نفسي بما رزقت ... وتمطت في العلا هممي
আমার সম্পদ নেই, কিন্তু রয়েছে তার ঝোঁক। আর তাতেই আমি রয়েছি জীবিত ও উজ্জীবিত।
নফস যদিও প্রদত্ত রিজিকের প্রতিই সন্তুষ্ট। কিন্তু হিম্মত আমার ছুটে চলেছে আরও উচ্চে অবিরত।
📄 আলেমদের ওপর দারিদ্র্যের প্রভাব
আলেমদের জন্য দুনিয়ায় ইলমের পর সবচেয়ে উপকারী হলো তার সম্পদ অর্জন। কারণ, যখন তার ইলমের সাথে এই সম্পদ একত্রিত হবে, তখন তার ব্যক্তিত্বের পূর্ণতা পাবে। মানুষের নিকট হাতপাতা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব হবে। নিজেকে লাঞ্ছনার মুখোমুখি হতে হবে না।
কিন্তু অধিকাংশ আলেমই তাদের ইলমের ব্যস্ততার কারণে সম্পদ অর্জনের সুযোগ পান না, কিন্তু এগুলো ছাড়া দুনিয়ার জীবনযাপনও সম্ভব নয়। একালে আমাদের এবং আলেমদের ধৈর্যও গেছে কমে।
এ কারণে তারা এমন কিছু জায়গায় যাওয়া-আসা করছে, যা তাদের সম্মান নষ্ট করে। যদিও তারা এক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও তাবিলের আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু আসলেই এর বিপরীত পথ অবলম্বন করাটাই ছিল তাদের জন্য উত্তম সুন্দর ও সম্মানজনক।
অতীতেও আলেমদের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে। যেমন, ইমাম জুহরি খলিফা আবদুল মালেকের নিকট যাওয়া, হজরত আবু উবাইদা, তাহের বিন হুসাইনের দরবারে যাওয়া। ইবনে আবিদ দুনয়া তো ছিলেন খলিফা মু'তাদের দরবারি শিক্ষক। আর ইবনে কুতাইবা মন্ত্রীর প্রশংসায় একটি কিতাবই লিখে ফেলেছেন। এভাবে অনেক আলেম ও জাহেদ ব্যক্তি এমন শাসকদের ছত্র-ছায়ায় বাস করেছেন- যারা ছিল জালেম।
এসকল ক্ষেত্রে যদিও আলেমগণ নিজেদের পক্ষে কিছু ব্যাখ্যা ও ওজর পেশ করেছেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা শাসকদের থেকে যতটা দুনিয়া অর্জন করেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি তারা তাদের অন্তর থেকে দ্বীন ও তাকওয়া খুইয়েছেন।
আমরা অনেক আলেম ও সুফিকে দেখি, তারা শাসক-মন্ত্রীদের চারপাশ আবৃত করে আছে- যাতে করে তাদের থেকে পার্থিব কিছু প্রাপ্ত হতে পারে। তাদের তোষামদ করছে, লৌকিকতা করছে। আর কেউ নাজায়েয প্রশংসাও করছে। কেউ তাদের দোষ ও জুলুম সম্পর্কে চুপ থাকছে। আরও বিভিন্ন ধরনের তোষামদ ও মোসাহেবি করছে। এবং এর অধিকাংশই করা হচ্ছে নিজেদের দরিদ্রতার কারণে এবং দুনিয়াপ্রাপ্তির আশায়।
এ কারণেই আমরা বারবার বলি- পরিপূর্ণ মর্যাদাবান হতে হলে এবং লোক দেখানো লৌকিকতা থেকে বেঁচে থাকতে হলে, এসকল জালেম শাসক, মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের থেকে দূরে থাকতে হবে। আর এটি করতে হলে আলেমদের দুই ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে:
১. আলেম ও মুহাদ্দিসদের সম্পদের অধিকারী হতে হবে।
যেমন ছিলেন হজরত সাইয়েদ ইবনে মুসাইয়িব রহ.। তাঁর যাইতুন ও অন্যান্য জিনিসের ব্যবসা ছিল। আরও ছিলেন সুফিয়ান সাওরি রহ.। তাঁর অনেকগুলো পানি সিঞ্চনের কূপ ছিল। জমি-জায়গা ছিল। সেগুলো থেকে উপার্জন হতো। আরও ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহ.। তিনিও অনেক সম্পদের অধিকারী ছিলেন। এমন ছিলেন আরও অনেকেই।
২. আর সম্পদ যদি না থাকে, তাহলে আলেম ও মুহাদ্দিসদের সীমাহীন ধৈর্যের অধিকারী হতে হবে। অর্জিত সম্পদে যথেষ্ট হোক বা না হোক- তাতেই সন্তুষ্ট থাকার মতো হিম্মত থাকতে হবে।
যেমন ছিলেন বিশর হাফি রহ., আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এবং অনেকে।
কিন্তু এমন ধৈর্যশীল যদি না পাওয়া যায় এবং উল্লিখিতদের মতো ধনবান যদি না হয়, তাহলে অনিবার্যভাবেই একজন আলেম বা মুহাদ্দিস ফিতনা ও পরীক্ষার মধ্যে পড়ে যাবে। ভীষণ কষ্টের শিকার হবে। কিংবা নিজের দ্বীনকেই বিনষ্ট করে ফেলবে।
হে তালিবুল ইলম, তোমাকে এবার বলি, ইলমের সাথে সাথে সম্পদ অর্জনেরও চেষ্টা করবে- যাতে মানুষের নিকট হাত পাতা থেকে বিরত থাকা যায়। এটা তোমার দ্বীনের হেফাজতের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে।
ধর্মের নামে, দুনিয়াবিমুখতার নামে এবং খোদাভীরুতার নামে যারাই মুনাফেকি করছে এবং আলেমদের মধ্যে যারাই কষ্টে পতিত হতে হচ্ছে- এর অধিকাংশই হচ্ছে দুনিয়ার সম্পদের প্রতি তাদের দৃষ্টি থাকার কারণে এবং তাদের ভীষণ দরিদ্রতার কারণে। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তারা বিভিন্ন অবৈধ পথেও প্রবেশ করে ফেলছে এবং অন্যরাও তাদের নিয়ে খেলছে- তাদের এই দারিদ্র্যের সুযোগে।
কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকার পরও যারা দুনিয়াদারদের সাথে দ্বীন বিক্রয়ে মেলামেশা করছে, তাদের সংখ্যা খুবই কম। তারা তো আলেমদের কাতার থেকেই বিচ্ছিন্ন। তাদেরকে আলেম বলার কোনো কারণই নেই। আল্লাহ তাআলা আমাদের এমন অবস্থা থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
📄 একজন ফিকাহবিদের শ্রেষ্ঠত্ব
কোনো জিনিসের শ্রেষ্ঠত্বের বড় প্রমাণ হলো তার পরিণাম বা ফলাফলের উৎকৃষ্টতা। যে ব্যক্তি ফিকহর প্রতিফল নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে, সেই বুঝবে যে ইলমগুলোর মধ্যে ফিকহ হলো শ্রেষ্ঠ ইলম। কেননা, মাজহাবগুলোর বিন্যাসদানকারী ইমামগণ এই ফিকহের মাধ্যমেই সকলের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন। অথচ তাদের সময়েই কোরআন, হাদিস ও ভাষা-সাহিত্যে তাদের চেয়েও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিগণ ছিলেন। আজকের দিনেও একইভাবে বিষয়গুলো মিলিয়ে দেখতে পারো।
এমন কত আলেম রয়েছেন, যারা কোরআন, হাদিস, তাফসির কিংবা ভাষা-সাহিত্যে অনবদ্য ও অনন্যসাধারণ জ্ঞান রাখেন, কিন্তু বয়সের আধিক্য সত্ত্বেও শরিয়তের প্রধান ও মৌলিক হুকুমগুলোর জ্ঞান রাখেন না। কারও অবস্থা এতটাই খারাপ যে, নামাজের মাসআলাগুলোও ঠিকমতো জানা নেই।
কিন্তু একজন ফকিহ- তাকে ব্যাপক অধ্যয়ন করতে হবে; ফিকহের পাশাপাশি অন্য ইলমগুলোর ক্ষেত্রেও যেন সে একেবারে অজ্ঞ থেকে না যায়। নতুবা সে তো একজন প্রাজ্ঞ ফকিহই হতে পারবে না। বরং সে প্রতিটা ইলমে যথেষ্ট পরিমাণ জ্ঞান আহরণ করবে, এরপর ফিকহের সাধনায় মনোনিবেশ করবে। এটাই হবে তার দুনিয়া ও আখেরাতের মর্যাদার মাধ্যম।