📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আল্লাহ তাআলার নির্বাচন

📄 আল্লাহ তাআলার নির্বাচন


কখনো কোনো বিপদে আপতিত হলে আমাদের কর্তব্য হবে, আল্লাহর নিকট দুআ করা। কিন্তু দুআ কবুলে বিলম্ব হলে কিংবা একান্ত প্রার্থনায় সাড়া না পেলেও অন্তরে যেন কোনোপ্রকার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি না হয় সে দিকে খেয়াল রাখা উচিত।
কেননা, আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতিপালক। তিনি সর্বময় জ্ঞানের অধিকারী। তাঁর কাছে শুধু প্রার্থনা করা যায়। যদি সাড়া না দেন- তবে তিনি তাঁর রাজত্বে যা ইচ্ছা সেটাই করতে পারেন। আর যদি বিলম্ব হয়, তাহলেও তো তিনি তাঁর হিকমত অনুযায়ী কাজ করেছেন।
সুতরাং তাঁর এই একান্ত হিকমত ও অদৃশ্য কল্যাণকামনার ওপর বিরূপতা প্রদর্শন করা আনুগত্যশীল বান্দার কাজ নয়। এরপর জেনে রাখা উচিত, নিজের নির্বাচনের চেয়ে সব সময় আল্লাহ তাআলার নির্বাচনই উত্তম। কারণ, কখনো বান্দা এমন বিষয় প্রার্থনা করতে পারে, পরিণামে যা তাঁর জন্য ক্ষতিকর।
হাদিসে এসেছে-
إن رجلا كان يسأل الله عز وجل أن يرزقه الجهاد فهتف به هاتف : أن غزوت أسرت وأن أسرت تنصرت.
কোনো কোনো মানুষ আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে যে, আল্লাহ যেন তাঁকে জিহাদের ময়দানে নিয়ে যান। তখন তাঁর অদৃশ্যে কেউ বলতে থাকে, তুমি যদি লড়াইয়ে যাও, তবে বন্দি হবে। আর যদি বন্দি হও, তবে তুমি আর কষ্টের কারণে নিজের ঈমানের ওপর অটল থাকতে পারবে না। ৭৬
আর বান্দা যদি পূর্ণভাবে তার সকল হিকমত ও হুকুমকে মেনে নেয় এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখে যে, সকল কর্তৃত্ব আল্লাহ তাআলারই, তবে তার অন্তর প্রশান্ত হয়ে যাবে- তার প্রয়োজন পূরণ হোক অথবা না হোক।
হাদিসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَنْصِبُ وَجْهَهُ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فِي مَسْأَلَةٍ إِلَّا أَعْطَاهَا إِيَّاهُ إِمَّا أَنْ يُعَجِّلَهَا لَهُ وَإِمَّا أَنْ يَدَّخِرَهَا لَهُ.
হজরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে মুসলিম ব্যক্তিই আল্লাহ তাআলার দিকে তার মুখ উঠিয়ে দুআ করে কিছু প্রার্থনা করে, আল্লাহ নিশ্চয় তাকে তা প্রদান করেন। তবে হয়তো সেটা তাৎক্ষণিক প্রদান করেন কিংবা সেটাকে তিনি বান্দার আখেরাতের জন্য জমা করে রাখেন। ৭৭
এরপর বান্দা যখন কিয়ামতের দিন দেখবে, দুনিয়াতে তাকে যা প্রদান করা হয়েছিল, সবই আজ উধাও হয়ে গেছে। আর যেটা প্রদান করা হয়নি, তার প্রতিদান আখেরাতের জন্য অবশিষ্ট রয়ে গেছে। তখন সে বলতে থাকবে, হায়! আমার কোনো দুআই যদি দুনিয়ার জন্য কবুল না করে আখেরাতের জন্য রেখে দেওয়া হতো, কতই না ভালো হতো!
এই বিষয়গুলো অনুধাবন করো। এবং অন্তরকে আশ্বস্ত করো- সেখানে যেন কোনো প্রকার সন্দেহ কিংবা তাড়াহুড়া না আসে।

টিকাঃ
৭৬. মুসনাদে আহমদ: ৩/১৮ এবং হাকেম ইবনে মুসতাদরাক: ১/৪৯৩। এবং ইমাম বোখারি রহ.ও এটি 'আলআদাবুল মুফরাদ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন-২/৭১০। ইমাম যাহাবি রহ. এবং তবারনি রহ. এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন। ११ মুসনাদে আহমদ: ১৯/৯৪০৯, পৃষ্ঠা: ৪৫২- মা. শামেলা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ইলমের শ্রেষ্ঠত্ব

📄 ইলমের শ্রেষ্ঠত্ব


যে ব্যক্তি জাহেদদের ওপর আলেমদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেখতে চায়, সে যেন জিবরাইল আ.., মিকাইল আ. এবং যে সকল ফেরেশতাকে সৃষ্টিজীবের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, তাদের মর্যাদার দিকে তাকায়। অথচ অন্য ফেরেশতাগণ বিভিন্ন ইবাদতের জায়গায় রাহেবদের মতো ইবাদতে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
প্রথম শ্রেণির ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে তাদের ইলমের পরিমাণ অনুপাতে সম্মান ও নৈকট্য অর্জন করেছেন। কিন্তু অন্যদের অবস্থা তাদের চেয়ে নিচে। যেমন বলা হয়েছে, যখন তাদের মধ্যে কেউ কোনো হুকুম নিয়ে আসে, আসমানবাসীরা বিরক্ত হয়- যতক্ষণ না তাদেরকে সংবাদ প্রদান করা হয় যে, এটা প্রভুর পক্ষ থেকে। এ ক্ষেত্রে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
حَتَّى إِذَا فُزِّعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الْحَقَّ )
পরিশেষে যখন তাদের অন্তর থেকে ভয় দূর করে দেওয়া হয়, তখন তারা বলে, তোমাদের প্রতিপালক কী বলেছেন? তারা উত্তর দেয়, সত্য কথা বলেছেন। [সুরা সাবা : ২৩]
একইভাবে কোনো জাহেদ যখন কোনো হাদিস শোনে আর কোনো আলেম যখন তাকে এর বিশুদ্ধতা ও অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তখন সে জাহেদ ব্যক্তি বিরক্ত হয়।
আল্লাহর প্রশংসা- যিনি কিছু ব্যক্তিকে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন, যেগুলো দিয়ে তিনি তাদের সমশ্রেণির ওপর তাদের মর্যাদাবান করেছেন। আর ইলমের বৈশিষ্ট্যের চেয়ে মর্যাদার বড় কোনো জিনিস নেই। ইলমের আধিক্যের কারণেই হজরত আদম আলাইহিস সালামকে সেজদা করতে বলা হয়েছে। আর ইলমের কমতির কারণে ফেরেশতারা হয়েছেন সেজদাকারী।
আল্লাহর সবচেয়ে নৈকট্যশীল ব্যক্তিরা হলেন আলেমগণ। তবে ইলম বলতে শুধু তার বাহ্যিক আকৃতি-শব্দ-লফজ উদ্দেশ্য নয়। এখানে অর্থ-মর্ম উদ্দেশ্য। আর সে ব্যক্তিই এর অর্থ-মর্ম অনুধাবনে সক্ষম, যিনি ইলম অনুযায়ী আমল করেন। তার প্রমাণ হলো, যখন ইলম কোনো বিষয়ের শ্রেষ্ঠত্ব ও ফজিলতের বিষয়ে জানায়, তখনই সে তা অর্জনের জন্য চেষ্টা করে। যখন কোনো বিষয়ের নিষেধ আসে, তখন সে সেই নিষেধিত বিষয় থেকে বিরত থাকে।
নিজের অর্জিত ইলমের সাথে যখন কেউ এভাবে চলতে সক্ষম হয়, তখনই শুধু ইলম তার নিকট নিজের রহস্য প্রকাশ করে। এটা তখন তার জন্য অর্জন হয়ে যায়। সে ইলমের জন্য এমনই আকর্ষণ ও আগ্রহ অনুভব করে যে, কোনো নতুন বিষয় তাকে আকর্ষণ করার সাথে সাথে সে তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সেদিকে ধাবিত হয়।
আর যে ব্যক্তি ইলম অনুযায়ী আমল করে না, ইলম তার রহস্য সম্পর্কে তাকে অবহিত করে না। তার মূল মর্ম তার কাছে প্রকাশ করে না। তার অবস্থা হয় সেই পাগলের মতো- বিভিন্ন পাগলামির আকর্ষণ যাকে উদ্বুদ্ধ করে। নিছক সে শুধু জ্ঞান অর্জন করে- এটা তার সচেতন ইলমের আকর্ষণ নয়।
এই উদাহরণগুলো বোঝার চেষ্টা করো। তোমার উদ্দেশ্য শোধিত করো- নতুবা আমলহীন ইলমের পেছনে আর গলদঘর্ম হয়ো না।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মধ্যাস্থাই শ্রেষ্ঠ

📄 মধ্যাস্থাই শ্রেষ্ঠ


জেনে রেখো, সকল বিষয়ে মধ্যপন্থাই হলো শ্রেষ্ঠ পন্থা। যখন দেখি দুনিয়াদাররা তাদের সম্পদের উচ্চাশায় হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং আখেরাতের ভালো কাজগুলো থেকে দূরে সরে যায়, তখন আমি তাদেরকে বেশি বেশি মৃত্যু, কবর ও আখেরাতের কথা স্মরণ করতে আদেশ করি।
কিন্তু যখন কোনো আলেমের ক্ষেত্রে এমন হয় যে, তার স্মরণ থেকে মৃত্যু কখনো অনুপস্থিত থাকে না। প্রায় সর্বক্ষণ আখেরাতের কথা-সংবলিত বহু হাদিস তার কাছে পড়া হয় এবং নিজেও বহু হাদিস পাঠ করে, তখন এগুলো তার মৃত্যুর স্মরণকে এমনভাবে বাড়িয়ে দেয় যে, স্বস্তির সাথে সে অন্য কাজও করতে পারে না।
তাহলে সর্বক্ষণ আল্লাহর প্রতি প্রচণ্ড ভয় ও আখেরাতের অধিক স্মরণকারী এই আলেমের জন্য উচিত হবে, মৃত্যুর স্মরণ থেকে তার অন্তরকে কিছুটা বিরত রাখা। যাতে তার নফস দুনিয়ার অন্য কাজের দিকেও কিছুটা অগ্রসর হতে পারে। যেমন, কিতাব রচনা, আত্মীয়স্বজনদের সাথে সম্পর্ক রাখা। কল্যাণকর কাজ এবং বিবাহ ও সন্তান অন্বেষণ ও প্রতিপালন ইত্যাদি।
সুতরাং তার এই অবস্থায় সে যদি আরও মৃত্যুর স্মরণে লেগে থাকে, তবে সেটা তার উপকারের চেয়ে ক্ষতিই করবে বেশি। তুমি কি শোনোনি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রী হজরত আয়েশা রা.-এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন? কখনো আয়েশা রা. অগ্রগামী হয়েছেন, আবার কখনো তিনি অগ্রগামী হয়েছেন। এভাবে তিনি হাসি-মজাকও করেছেন। কিছু সময় অন্তরকে স্বস্তি দিয়েছেন।
সুতরাং কঠোরতার ওপর যদি আবার কড়াকড়ি শুরু হয়, তবে তা শরীরকে নষ্ট করে এবং অন্তর তাতে ত্যক্ত বিরক্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ে।
হজরত আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি একবার আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করলেন যে, তিনি যেন তার ওপর তার ভয়ের দরজা খুলে দেন।
প্রার্থনা অনুযায়ী তার ওপর ভয়ের দরজা খুলে দেওয়া হলো। সর্বক্ষণ প্রচণ্ড ভয়। পরিণামে তার মস্তিষ্ক বিগড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। হজরত আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. আবার দুআ করলেন- ভয়ের তীব্রতা উঠিয়ে নেওয়ার জন্য।
সুতরাং জীবনের সর্বক্ষেত্রে এই মূলনীতিটি অনুসরণ করবে। কখনো কখনো নফসকে একটু স্বস্তি দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এর মাঝেই রয়েছে তার কল্যাণ।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 পূর্ণতার অন্বেষণ

📄 পূর্ণতার অন্বেষণ


কারও যদি একটি পরিশুদ্ধ চিন্তা থাকে, তাহলে চিন্তাটি তাকে কোনো বিষয়ের সর্বোচ্চ মর্যাদায় উপনীত হওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে এবং তাকে নীচতার প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে নিষেধ করবে। কবি আবুত তিব আল মুতানাব্বি বলেন, ولم أر في عيوب الناس عيباً ... كنقص القادرين على التمام মানুষের ত্রুটিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দোষ বলি আমি পূর্ণতার ওপর সক্ষম ব্যক্তি যদি নিচে আসে নামি।
সুতরাং কোনো বুদ্ধিমানের জন্য উচিত হবে, তার জন্য সম্ভব সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছার চেষ্টা করা।
মানুষের জন্য যদি আকাশে আরোহণের বিষয়টি সম্ভব হতো, তবে আমি তার জন্য জমিনে বসে থাকাটা পছন্দ করতাম না।
নবুয়ত যদি চেষ্টা ও সাধনার মাধ্যমে অর্জনের বিষয় হতো, তবে আমি তা অর্জনে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তিকে ভাবতাম নিম্নশ্রেণির লোক। কিন্তু তা যেহেতু অর্জন করা সম্ভব নয়, তাহলে যা সম্ভব তা অর্জনের চেষ্টা করা আবশ্যক।
পণ্ডিতরা বলেন, ইলম ও আমলে, জ্ঞান ও কর্মে যথাসম্ভব পূর্ণতায় পৌঁছানো ব্যক্তির জীবনই একটি শ্রেষ্ঠ জীবন।
অর্থাৎ তারা বলতে চান—মানুষের শারীরিক আকৃতি ও চেহারা তার স্বেচ্ছায় অর্জনের বিষয় নয়। কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা এবং নিজেকে পরিপাটি করে রাখা নিজ ইচ্ছায় সম্ভব। কিন্তু এক্ষেত্রেও অনেক মানুষ ভীষণ অবহেলা ও অলসতা প্রদর্শন করে। শরিয়ত এসব বিষয়ে সতর্ক করেছে। এখানে তার কিছু উল্লেখ করছি। যেমন, হাতের নখ কাটা, বগলের পশম ওঠানো, নাভির নিচের পশম কাটা। জনাকীর্ণ জায়গার ক্ষেত্রে রসুন-পেঁয়াজ না খাওয়া—যাতে দুর্গন্ধ না ছড়ায়। সুগন্ধি ব্যবহার করা।
একজন মুসলমানের জন্য এগুলোর ওপর কিয়াস করে জীবনের অন্য বিষয়গুলির ক্ষেত্রেও শুভ্রতার পরিচয় দেওয়া উচিত। জীবনের সর্বক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পরিমাণে পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাট্যতার পরিচয় দেওয়া উচিত। আমরা জানি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীরের ঘ্রাণের সৌরভে তার আগমন উপলব্ধি করা যেত। এটি ছিল তার সর্বোচ্চ পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকার উত্তম উদাহরণ।
এসকল আলোচনা দ্বারা আমি এটা বলতে চাচ্ছি না যে, এ বিষয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করা হবে। যেমন লৌকিকতা প্রদর্শনকারীরা করে। কিন্তু মধ্যপন্থা সব সময়ই প্রশংসনীয়।
এরপর একজন মুসলমানের জন্য তার শারীরিক শক্তিমত্তার ব্যাপারেও দৃষ্টি দেওয়া উচিত। কারণ, এই শরীরটাই তার বাহন। এর শক্তি যদি কমে যায়, তার নিজের শক্তিও কমে যাবে। এ বলে আমি অবশ্যই বাছ-বিচারহীন ‘ভক্ষণ’-এর কথা বলতে চাচ্ছি না। আমি বলতে চাচ্ছি একটি উপযুক্ত পরিমাণের কথা- যার মাধ্যমে শারীরিক শক্তিমত্তা অটুট থাকে। শরীর হলো একটি প্রবাহিত ঝরনার মতো। এটা ঠিক থাকলে নিজে উপকৃত হওয়া যায় এবং অন্যরাও উপকৃত হতে পারে।
তুমি কিছুতেই সেই কঠোর কঠিন জাহেদদের কথায় কান দিয়ো না, যারা নিজেরা খুবই স্বল্প খায়। এবং দুর্বল হতে হতে ফরজ ও আবশ্যক কাজগুলো থেকেও অক্ষম হয়ে পড়ে। অথচ দুনিয়াতে কত কাজ! শান্তি লুকিয়ে থাকে সত্য শক্তিমত্তার আড়ালে!
তাদের এই বিষয়গুলো কিছুতেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা তাঁর সাহাবিদের থেকে বর্ণিত নয়। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে সাহাবিরা যখন খাওয়ার কিছু পেতেন না, তখন ক্ষুধার্ত থাকতেন এবং ধৈর্যধারণ করতেন। আবার আল্লাহ রিজিক দিলে খেতেন এবং শুকরিয়া আদায় করতেন।
যেহেতু তোমার শরীর হলো তোমার বাহন—তাই এর দানা-পানির ব্যাপারেও তোমাকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সুতরাং তার কষ্ট হয়- এমন কিছু করবে না। বরং তার সুস্থতার ব্যাপারে নজর রাখবে। আর সেই জাহেদের কথার দিকে দৃষ্টি দেবে না, যে বলে, 'আমি কিছুতেই নফসকে শাহওয়াতের ওপর নিয়ে যেতে চাই না। তাই খাই না।'
হ্যাঁ, খাবারের ক্ষেত্রে বেঁচে থাকতে হবে হারাম থেকে। অধিক ভক্ষণ থেকে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাথিরা খাদ্য বর্জন করেছেন কোনো হারামের কারণে অথবা সর্বক্ষণ নফসের চাহিদা বৃদ্ধির ভয়ে। এটা বৈধ।
এরপর সকল সক্ষম ব্যক্তির জন্যই উচিত— ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা উপার্জনের উপযুক্ত কোনো মাধ্যম গ্রহণ করা। যাতে সে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে। অন্যরা যেন তার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে না পারে। তবে অবশ্যই এর মধ্যে একটি সীমা বেঁধে নেবে— যাতে উপার্জনে অধিক মগ্নতার কারণে ইলমচর্চা থেকে গাফেল হয়ে না পড়ে। এরপর যার সুযোগ ও সক্ষমতা রয়েছে তার জন্য উচিত হবে, ইলমের সর্বোচ্চ সীমায় উপনীত হওয়ার চেষ্টা করা।
এরপর সে আল্লাহ তাআলার সর্বোচ্চ মারেফাত অর্জনের জন্যও চেষ্টা করবে। তার জন্য একনিষ্ঠতার সাথে আমল করবে। এটাই হবে তার জীবন-পথের ধারাবাহিক কাজ ও কর্তব্য।
মোটকথা- তার জন্য যে শ্রেষ্ঠত্বগুলো অর্জন করা সম্ভব, সে তার সবগুলোই অর্জন করার চেষ্টা করবে। কারণ, সর্বোচ্চে উঠে নমনীয়তা দেখানোই হলো সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক।
কবি বলেন,
فكن رجلاً رجله في الثرى ... وهامة همته في الثريا
তাহলে তুমি এমন এক ব্যক্তি হও, যার পা রয়েছে মাটিতে। এমন সাহসী ও প্রত্যয়ী হও, যার হিম্মত ও উচ্চাশা ছুঁয়েছে আকাশের 'সুরাইয়া' তারকাকে।
ইলম ও আমলে তুমি যদি বর্তমানের সকল আলেম ও জাহেদকে ছাড়িয়ে যেতে পারো, তবে তুমি তা-ই করো। তারাও যেমন রক্ত-মাংসের সাধারণ মানুষ, তুমিও তেমন এক মানুষ। কোনো ব্যক্তি যদি হীন, অক্ষম ও গৌণ হয়, সে তার হিম্মতের হীনতা ও নীচতার কারণেই হয়।
জেনে রেখো, তুমি এক প্রতিযোগিতার ময়দানে রয়েছ। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। মুহূর্তের জন্যও অবহেলা ও অলসতাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। কারণ,
فما فات ما فات إلا بالكسل ولا نال من نال إلا بالجد والعزم
মানুষের জীবনে যত বঞ্চনা এসেছে, সেটা তার অলসতার কারণেই এসেছে।
এবং যতটুকু অর্জন করেছে, সে তার হিম্মত ও প্রচেষ্টার মাধ্যমেই অর্জন করেছে।
হিম্মত ও প্রত্যয় এমন এক জিনিস—যা অন্তরকে উজ্জীবিত করে রাখে। যেমন আগুন উত্তপ্ত রাখে পাতিলের মাঝের তরলতাকে। আমাদের একজন সালাফ বলেন,
ليس لي مال سوى كري ... فبه أحيا من العدم
قنعت نفسي بما رزقت ... وتمطت في العلا هممي
আমার সম্পদ নেই, কিন্তু রয়েছে তার ঝোঁক। আর তাতেই আমি রয়েছি জীবিত ও উজ্জীবিত।
নফস যদিও প্রদত্ত রিজিকের প্রতিই সন্তুষ্ট। কিন্তু হিম্মত আমার ছুটে চলেছে আরও উচ্চে অবিরত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00