📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 বিপদ ও ধৈর্য

📄 বিপদ ও ধৈর্য


দুনিয়ার সকল বিপদেরই একটি নির্ধারিত সময় ও শেষ আছে। আল্লাহ তাআলা সেটা জানেন। এ কারণে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য উচিত হবে, সেই বিপদের সমাপ্তির সময় পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করা। নতুবা সে যদি নির্ধারিত সময়ের আগেই অস্থির বেচাইন হয়ে হায়-হুতাশ করতে থাকে, তবে এটা তাকে কোনো উপকার করবে না। যেমন, কোনো ভারি ধাতব গোলাকার বস্তু যদি ওপর থেকে নিচে পতিত হয় কিংবা ঘূর্ণন শুরু করে, তবে আর তাকে ঠেকানো যায় না। বরং তখন তার স্থির হওয়া বা গতিহীন হওয়া পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করতে হয়। এভাবে একটি নির্ধারিত সময় থাকা সত্ত্বেও যদি বিপদ দ্রুত দূর হওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করা হয়, তবে এতেও কোনো উপকার হয় না।
সুতরাং উচিত হলো ধৈর্যধারণ করা। যদিও বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য দুআ করা বৈধ এবং এর মাধ্যমেই উপকার হয়। কিন্তু দুআকারীর জন্য সাড়াদানের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। বরং সে তার 'দাসত্ব' বা আনুগত্যকে প্রকাশ করবে ধৈর্যধারণের মাধ্যমে, প্রার্থনার মাধ্যমে এবং প্রজ্ঞাবান সত্তার ফয়সালা মেনে নেওয়ার মাধ্যমে।
আর এদিকে সম্ভাব্য যে অপরাধগুলোর কারণে এই বিপদ এসেছে, সেগুলো বর্জন করবে। কারণ, অধিকাংশ বিপদই হয়ে থাকে শাস্তিস্বরূপ। কিন্তু দ্রুত সাড়াপ্রত্যাশী ব্যক্তি তো প্রতিপালকের অমান্যতা প্রদর্শন করে। এটা বান্দার কাজ নয়। এটা বান্দার জন্য শোভনও নয়। বরং বান্দার কাজ হলো, প্রতিপালকের ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং ধৈর্যধারণ করা।
হ্যাঁ, অধিক দুআ ও প্রার্থনার মাধ্যমে মিনতি করা তো ভালো কাজ। বরং বিমুখ থাকা- প্রার্থনা না করাই হারাম ও অবাধ্যতা। কিন্তু এক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করাও তো তার পরিচালনা-পদ্ধতির মাঝে বিঘ্নতা সৃষ্টি করতে চাওয়ার নামান্তর।
আলোচিত বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করো। নিশ্চয় এগুলো আপতিত বিপদকে তোমার নিকট সহনীয় করে তুলবে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ধৈর্যের পুরস্কার

📄 ধৈর্যের পুরস্কার


জগতে ধৈর্যের চেয়ে কঠিন কিছু নেই।
কারণ, কখনো ধৈর্যধারণ করতে হয় প্রিয় ব্যক্তির বিচ্ছেদের ওপর কিংবা অপছন্দনীয় জিনিস সয়ে নেওয়ার ওপর। বিশেষকরে ধৈর্যধারণটা কঠিন হয়ে পড়ে তখন, যখন বিপদের সময়টি অতি দীর্ঘ হয় কিংবা উদ্ধারের ক্ষেত্রে নিরাশা এসে যায়।
ঠিক এই সময়গুলোতে এমন কিছু অবলম্বন ও পাথেয় দরকার- যার মাধ্যমে এই কঠিন যাত্রাটা পার করা সম্ভব হয়। পাথেয় অনেক প্রকার হতে পারে। যেমন,
বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি বিপদের পরিমাণের দিকে লক্ষ করবে। কারণ, বিপদটি এর চেয়ে আরও বেশি হতে পারত। কিংবা ভেবে নেবে, এরপর আল্লাহ আরও বেশি ভালো প্রতিদান দেবেন। যেমন, কারও সন্তান মারা গেল। কিন্তু আল্লাহর কাছে তো এর চেয়ে আরও উত্তম প্রতিদান রয়েছে। হয়তো সেটা দুনিয়াতেই হতে পারে- তাকে আরও নেককার সন্তান প্রদানের মাধ্যমে। কিংবা এর প্রতিদান হতে পারে আখেরাতে।
তাছাড়া শুধু শুধু চিন্তা-ভাবনা করা এবং এ নিয়ে অস্থিরতা প্রকাশ করে তো কোনো উপকার হয় না। এমন আরও কিছু বিষয় নিয়ে চিন্তা করলে, ধৈর্যধারণ সহজ হয়ে যায়।
ধৈর্যের পথে উপকার ছাড়া কিছু নেই। সুতরাং ধৈর্যশীল ব্যক্তির জন্য এই সকল ভাবনায় নফসকে ব্যস্ত রাখা উচিত। এর মাধ্যমে তার বিপদের সময়গুলো সহজে সহনশীলতার সাথে অতিবাহিত হবে এবং কষ্টের আঁধার কেটে সুখময় সকালের উদয় ঘটবে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আল্লাহ তাআলার নির্বাচন

📄 আল্লাহ তাআলার নির্বাচন


কখনো কোনো বিপদে আপতিত হলে আমাদের কর্তব্য হবে, আল্লাহর নিকট দুআ করা। কিন্তু দুআ কবুলে বিলম্ব হলে কিংবা একান্ত প্রার্থনায় সাড়া না পেলেও অন্তরে যেন কোনোপ্রকার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি না হয় সে দিকে খেয়াল রাখা উচিত।
কেননা, আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতিপালক। তিনি সর্বময় জ্ঞানের অধিকারী। তাঁর কাছে শুধু প্রার্থনা করা যায়। যদি সাড়া না দেন- তবে তিনি তাঁর রাজত্বে যা ইচ্ছা সেটাই করতে পারেন। আর যদি বিলম্ব হয়, তাহলেও তো তিনি তাঁর হিকমত অনুযায়ী কাজ করেছেন।
সুতরাং তাঁর এই একান্ত হিকমত ও অদৃশ্য কল্যাণকামনার ওপর বিরূপতা প্রদর্শন করা আনুগত্যশীল বান্দার কাজ নয়। এরপর জেনে রাখা উচিত, নিজের নির্বাচনের চেয়ে সব সময় আল্লাহ তাআলার নির্বাচনই উত্তম। কারণ, কখনো বান্দা এমন বিষয় প্রার্থনা করতে পারে, পরিণামে যা তাঁর জন্য ক্ষতিকর।
হাদিসে এসেছে-
إن رجلا كان يسأل الله عز وجل أن يرزقه الجهاد فهتف به هاتف : أن غزوت أسرت وأن أسرت تنصرت.
কোনো কোনো মানুষ আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে যে, আল্লাহ যেন তাঁকে জিহাদের ময়দানে নিয়ে যান। তখন তাঁর অদৃশ্যে কেউ বলতে থাকে, তুমি যদি লড়াইয়ে যাও, তবে বন্দি হবে। আর যদি বন্দি হও, তবে তুমি আর কষ্টের কারণে নিজের ঈমানের ওপর অটল থাকতে পারবে না। ৭৬
আর বান্দা যদি পূর্ণভাবে তার সকল হিকমত ও হুকুমকে মেনে নেয় এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখে যে, সকল কর্তৃত্ব আল্লাহ তাআলারই, তবে তার অন্তর প্রশান্ত হয়ে যাবে- তার প্রয়োজন পূরণ হোক অথবা না হোক।
হাদিসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَنْصِبُ وَجْهَهُ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فِي مَسْأَلَةٍ إِلَّا أَعْطَاهَا إِيَّاهُ إِمَّا أَنْ يُعَجِّلَهَا لَهُ وَإِمَّا أَنْ يَدَّخِرَهَا لَهُ.
হজরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে মুসলিম ব্যক্তিই আল্লাহ তাআলার দিকে তার মুখ উঠিয়ে দুআ করে কিছু প্রার্থনা করে, আল্লাহ নিশ্চয় তাকে তা প্রদান করেন। তবে হয়তো সেটা তাৎক্ষণিক প্রদান করেন কিংবা সেটাকে তিনি বান্দার আখেরাতের জন্য জমা করে রাখেন। ৭৭
এরপর বান্দা যখন কিয়ামতের দিন দেখবে, দুনিয়াতে তাকে যা প্রদান করা হয়েছিল, সবই আজ উধাও হয়ে গেছে। আর যেটা প্রদান করা হয়নি, তার প্রতিদান আখেরাতের জন্য অবশিষ্ট রয়ে গেছে। তখন সে বলতে থাকবে, হায়! আমার কোনো দুআই যদি দুনিয়ার জন্য কবুল না করে আখেরাতের জন্য রেখে দেওয়া হতো, কতই না ভালো হতো!
এই বিষয়গুলো অনুধাবন করো। এবং অন্তরকে আশ্বস্ত করো- সেখানে যেন কোনো প্রকার সন্দেহ কিংবা তাড়াহুড়া না আসে।

টিকাঃ
৭৬. মুসনাদে আহমদ: ৩/১৮ এবং হাকেম ইবনে মুসতাদরাক: ১/৪৯৩। এবং ইমাম বোখারি রহ.ও এটি 'আলআদাবুল মুফরাদ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন-২/৭১০। ইমাম যাহাবি রহ. এবং তবারনি রহ. এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন। ११ মুসনাদে আহমদ: ১৯/৯৪০৯, পৃষ্ঠা: ৪৫২- মা. শামেলা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ইলমের শ্রেষ্ঠত্ব

📄 ইলমের শ্রেষ্ঠত্ব


যে ব্যক্তি জাহেদদের ওপর আলেমদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেখতে চায়, সে যেন জিবরাইল আ.., মিকাইল আ. এবং যে সকল ফেরেশতাকে সৃষ্টিজীবের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, তাদের মর্যাদার দিকে তাকায়। অথচ অন্য ফেরেশতাগণ বিভিন্ন ইবাদতের জায়গায় রাহেবদের মতো ইবাদতে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
প্রথম শ্রেণির ফেরেশতাগণ আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে তাদের ইলমের পরিমাণ অনুপাতে সম্মান ও নৈকট্য অর্জন করেছেন। কিন্তু অন্যদের অবস্থা তাদের চেয়ে নিচে। যেমন বলা হয়েছে, যখন তাদের মধ্যে কেউ কোনো হুকুম নিয়ে আসে, আসমানবাসীরা বিরক্ত হয়- যতক্ষণ না তাদেরকে সংবাদ প্রদান করা হয় যে, এটা প্রভুর পক্ষ থেকে। এ ক্ষেত্রে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
حَتَّى إِذَا فُزِّعَ عَنْ قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الْحَقَّ )
পরিশেষে যখন তাদের অন্তর থেকে ভয় দূর করে দেওয়া হয়, তখন তারা বলে, তোমাদের প্রতিপালক কী বলেছেন? তারা উত্তর দেয়, সত্য কথা বলেছেন। [সুরা সাবা : ২৩]
একইভাবে কোনো জাহেদ যখন কোনো হাদিস শোনে আর কোনো আলেম যখন তাকে এর বিশুদ্ধতা ও অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তখন সে জাহেদ ব্যক্তি বিরক্ত হয়।
আল্লাহর প্রশংসা- যিনি কিছু ব্যক্তিকে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন, যেগুলো দিয়ে তিনি তাদের সমশ্রেণির ওপর তাদের মর্যাদাবান করেছেন। আর ইলমের বৈশিষ্ট্যের চেয়ে মর্যাদার বড় কোনো জিনিস নেই। ইলমের আধিক্যের কারণেই হজরত আদম আলাইহিস সালামকে সেজদা করতে বলা হয়েছে। আর ইলমের কমতির কারণে ফেরেশতারা হয়েছেন সেজদাকারী।
আল্লাহর সবচেয়ে নৈকট্যশীল ব্যক্তিরা হলেন আলেমগণ। তবে ইলম বলতে শুধু তার বাহ্যিক আকৃতি-শব্দ-লফজ উদ্দেশ্য নয়। এখানে অর্থ-মর্ম উদ্দেশ্য। আর সে ব্যক্তিই এর অর্থ-মর্ম অনুধাবনে সক্ষম, যিনি ইলম অনুযায়ী আমল করেন। তার প্রমাণ হলো, যখন ইলম কোনো বিষয়ের শ্রেষ্ঠত্ব ও ফজিলতের বিষয়ে জানায়, তখনই সে তা অর্জনের জন্য চেষ্টা করে। যখন কোনো বিষয়ের নিষেধ আসে, তখন সে সেই নিষেধিত বিষয় থেকে বিরত থাকে।
নিজের অর্জিত ইলমের সাথে যখন কেউ এভাবে চলতে সক্ষম হয়, তখনই শুধু ইলম তার নিকট নিজের রহস্য প্রকাশ করে। এটা তখন তার জন্য অর্জন হয়ে যায়। সে ইলমের জন্য এমনই আকর্ষণ ও আগ্রহ অনুভব করে যে, কোনো নতুন বিষয় তাকে আকর্ষণ করার সাথে সাথে সে তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সেদিকে ধাবিত হয়।
আর যে ব্যক্তি ইলম অনুযায়ী আমল করে না, ইলম তার রহস্য সম্পর্কে তাকে অবহিত করে না। তার মূল মর্ম তার কাছে প্রকাশ করে না। তার অবস্থা হয় সেই পাগলের মতো- বিভিন্ন পাগলামির আকর্ষণ যাকে উদ্বুদ্ধ করে। নিছক সে শুধু জ্ঞান অর্জন করে- এটা তার সচেতন ইলমের আকর্ষণ নয়।
এই উদাহরণগুলো বোঝার চেষ্টা করো। তোমার উদ্দেশ্য শোধিত করো- নতুবা আমলহীন ইলমের পেছনে আর গলদঘর্ম হয়ো না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00