📄 মহাগ্রন্থ নিয়ে ভাবনা
একবার হজের সফরে আমরা আরবের রাস্তায় চলছিলাম। চলতে চলতে আমরা এক সময় খায়বারের রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। সেখানে আমি অনেক বড় বড় পাহাড় ও আশ্চর্য বিস্ময়কর সব রাস্তা-পথ দেখতে পেলাম। এগুলো আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। আমি যেন মুগ্ধ হতবুদ্ধ হয়ে সেগুলো দেখছিলাম। আমার অন্তরে স্রষ্টার বড়ত্ব ও মহত্ব উত্তরোত্তর বেড়েই চলছিল। এখনো এসকল রাস্তার আলোচনায় আমার অন্তরে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়, যা অন্য কিছুর স্মরণে হয় না।
একবার আমি আমার নফসকে ডেকে বললাম, তোমার এ কী অবস্থা! তুমি সমুদ্রে যাও, তার আশ্চর্য বিষয়াবলির দিকে চিন্তার দৃষ্টি নিয়ে তাকাও। সেগুলো তো এগুলোর চেয়েও আরও বিশাল ও বিস্ময়কর। এরপর আশপাশের সকল সৃষ্টির দিকে তাকাও এবং সেগুলো লক্ষ করো। সপ্ত আসমান ও শূন্য দিগন্তের তুলনায় এগুলো তো একটি বিশাল ময়দানের মাঝে একটি বিন্দুর মতো।
এরপর কল্পনায় ঘুরে বেড়াও আকাশের দিগন্তে। চক্কর দাও আরশের চারপাশে। এবং লক্ষ করার চেষ্টা করো সেখানকার আলো উজ্জ্বলতা ও বিশালতা। এরপর সকল কিছু থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অবশেষে এগুলোর স্রষ্টার দিকে তোমার দৃষ্টি ফেরাও- এবার দেখতে পাবে এই বিশাল জগৎ ক্ষমতাশীল স্রষ্টার এমন ক্ষমতার অধীন হয়ে যাচ্ছে, যে ক্ষমতার কোনো শেষ নেই, সীমা নেই।
এরপর তোমার নিজের দিকে তাকাও। লক্ষ করো তোমার ক্ষুদ্রতা ও নশ্বরতা। তোমার অক্ষমতা ও অসহায়ত্ব। তোমার সূচনা ও সমাপ্তি। এরপর চিন্তা করো, সূচনার আগে তুমি কিছুই ছিলে না। এরপর একদিন ধ্বংসের মাটি ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।
তাহলে তুমি কীভাবে তোমার এই অস্তিত্ব নিয়ে তার পূর্ণ পরিচয় ও পরিচিতি পেতে চাও- যিনি এর সকল কিছুর শুরু-সমাপ্তি দেখতে পান? যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন- তার বিশালত্ব কীভাবে তোমার ক্ষুদ্রতা দিয়ে পরিমাণ করতে পারো?
চাও? তিনিই তোমার স্রষ্টা। তাহলে তোমার অন্তর কীভাবে এই মহান ইলাহ ও স্রষ্টার স্মরণ থেকে উদাসীন থাকে?
আল্লাহর কসম, মানুষের গাফেল অন্তর থেকে যদি তার প্রবৃত্তির বেহুঁশি ছুটে যায়, তবে অবশ্যই স্রষ্টার বড়ত্বে ও মহত্বে তার অন্তর ভীত ও নত হয়ে পড়বে। কিংবা তার ভালোবাসায় নিমগ্ন হয়ে পড়বে। কিন্তু মানুষের ইন্দ্রিয় শক্তিটাই বেশি প্রাধান্য লাভ করে, প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এ কারণে সে পাহাড় ও সমুদ্র দেখে সেগুলোর বড়ত্ব ও বিশালত্ব বোঝে। কিন্তু কোনো বুদ্ধিমান যদি এগুলোর দিকে তাকায়, তখন বাহ্যিক এই পাহাড়-পর্বত ও সমুদ্রের বড়ত্ব ও বিশালত্বের চেয়ে এগুলোর স্রষ্টার সীমাহীন ক্ষমতা ও মহত্বই তাকে বেশি উজ্জীবিত করে।
📄 বিপদ ও ধৈর্য
দুনিয়ার সকল বিপদেরই একটি নির্ধারিত সময় ও শেষ আছে। আল্লাহ তাআলা সেটা জানেন। এ কারণে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য উচিত হবে, সেই বিপদের সমাপ্তির সময় পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করা। নতুবা সে যদি নির্ধারিত সময়ের আগেই অস্থির বেচাইন হয়ে হায়-হুতাশ করতে থাকে, তবে এটা তাকে কোনো উপকার করবে না। যেমন, কোনো ভারি ধাতব গোলাকার বস্তু যদি ওপর থেকে নিচে পতিত হয় কিংবা ঘূর্ণন শুরু করে, তবে আর তাকে ঠেকানো যায় না। বরং তখন তার স্থির হওয়া বা গতিহীন হওয়া পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করতে হয়। এভাবে একটি নির্ধারিত সময় থাকা সত্ত্বেও যদি বিপদ দ্রুত দূর হওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করা হয়, তবে এতেও কোনো উপকার হয় না।
সুতরাং উচিত হলো ধৈর্যধারণ করা। যদিও বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য দুআ করা বৈধ এবং এর মাধ্যমেই উপকার হয়। কিন্তু দুআকারীর জন্য সাড়াদানের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। বরং সে তার 'দাসত্ব' বা আনুগত্যকে প্রকাশ করবে ধৈর্যধারণের মাধ্যমে, প্রার্থনার মাধ্যমে এবং প্রজ্ঞাবান সত্তার ফয়সালা মেনে নেওয়ার মাধ্যমে।
আর এদিকে সম্ভাব্য যে অপরাধগুলোর কারণে এই বিপদ এসেছে, সেগুলো বর্জন করবে। কারণ, অধিকাংশ বিপদই হয়ে থাকে শাস্তিস্বরূপ। কিন্তু দ্রুত সাড়াপ্রত্যাশী ব্যক্তি তো প্রতিপালকের অমান্যতা প্রদর্শন করে। এটা বান্দার কাজ নয়। এটা বান্দার জন্য শোভনও নয়। বরং বান্দার কাজ হলো, প্রতিপালকের ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং ধৈর্যধারণ করা।
হ্যাঁ, অধিক দুআ ও প্রার্থনার মাধ্যমে মিনতি করা তো ভালো কাজ। বরং বিমুখ থাকা- প্রার্থনা না করাই হারাম ও অবাধ্যতা। কিন্তু এক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করাও তো তার পরিচালনা-পদ্ধতির মাঝে বিঘ্নতা সৃষ্টি করতে চাওয়ার নামান্তর।
আলোচিত বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করো। নিশ্চয় এগুলো আপতিত বিপদকে তোমার নিকট সহনীয় করে তুলবে।
📄 ধৈর্যের পুরস্কার
জগতে ধৈর্যের চেয়ে কঠিন কিছু নেই।
কারণ, কখনো ধৈর্যধারণ করতে হয় প্রিয় ব্যক্তির বিচ্ছেদের ওপর কিংবা অপছন্দনীয় জিনিস সয়ে নেওয়ার ওপর। বিশেষকরে ধৈর্যধারণটা কঠিন হয়ে পড়ে তখন, যখন বিপদের সময়টি অতি দীর্ঘ হয় কিংবা উদ্ধারের ক্ষেত্রে নিরাশা এসে যায়।
ঠিক এই সময়গুলোতে এমন কিছু অবলম্বন ও পাথেয় দরকার- যার মাধ্যমে এই কঠিন যাত্রাটা পার করা সম্ভব হয়। পাথেয় অনেক প্রকার হতে পারে। যেমন,
বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি বিপদের পরিমাণের দিকে লক্ষ করবে। কারণ, বিপদটি এর চেয়ে আরও বেশি হতে পারত। কিংবা ভেবে নেবে, এরপর আল্লাহ আরও বেশি ভালো প্রতিদান দেবেন। যেমন, কারও সন্তান মারা গেল। কিন্তু আল্লাহর কাছে তো এর চেয়ে আরও উত্তম প্রতিদান রয়েছে। হয়তো সেটা দুনিয়াতেই হতে পারে- তাকে আরও নেককার সন্তান প্রদানের মাধ্যমে। কিংবা এর প্রতিদান হতে পারে আখেরাতে।
তাছাড়া শুধু শুধু চিন্তা-ভাবনা করা এবং এ নিয়ে অস্থিরতা প্রকাশ করে তো কোনো উপকার হয় না। এমন আরও কিছু বিষয় নিয়ে চিন্তা করলে, ধৈর্যধারণ সহজ হয়ে যায়।
ধৈর্যের পথে উপকার ছাড়া কিছু নেই। সুতরাং ধৈর্যশীল ব্যক্তির জন্য এই সকল ভাবনায় নফসকে ব্যস্ত রাখা উচিত। এর মাধ্যমে তার বিপদের সময়গুলো সহজে সহনশীলতার সাথে অতিবাহিত হবে এবং কষ্টের আঁধার কেটে সুখময় সকালের উদয় ঘটবে।
📄 আল্লাহ তাআলার নির্বাচন
কখনো কোনো বিপদে আপতিত হলে আমাদের কর্তব্য হবে, আল্লাহর নিকট দুআ করা। কিন্তু দুআ কবুলে বিলম্ব হলে কিংবা একান্ত প্রার্থনায় সাড়া না পেলেও অন্তরে যেন কোনোপ্রকার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি না হয় সে দিকে খেয়াল রাখা উচিত।
কেননা, আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতিপালক। তিনি সর্বময় জ্ঞানের অধিকারী। তাঁর কাছে শুধু প্রার্থনা করা যায়। যদি সাড়া না দেন- তবে তিনি তাঁর রাজত্বে যা ইচ্ছা সেটাই করতে পারেন। আর যদি বিলম্ব হয়, তাহলেও তো তিনি তাঁর হিকমত অনুযায়ী কাজ করেছেন।
সুতরাং তাঁর এই একান্ত হিকমত ও অদৃশ্য কল্যাণকামনার ওপর বিরূপতা প্রদর্শন করা আনুগত্যশীল বান্দার কাজ নয়। এরপর জেনে রাখা উচিত, নিজের নির্বাচনের চেয়ে সব সময় আল্লাহ তাআলার নির্বাচনই উত্তম। কারণ, কখনো বান্দা এমন বিষয় প্রার্থনা করতে পারে, পরিণামে যা তাঁর জন্য ক্ষতিকর।
হাদিসে এসেছে-
إن رجلا كان يسأل الله عز وجل أن يرزقه الجهاد فهتف به هاتف : أن غزوت أسرت وأن أسرت تنصرت.
কোনো কোনো মানুষ আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে যে, আল্লাহ যেন তাঁকে জিহাদের ময়দানে নিয়ে যান। তখন তাঁর অদৃশ্যে কেউ বলতে থাকে, তুমি যদি লড়াইয়ে যাও, তবে বন্দি হবে। আর যদি বন্দি হও, তবে তুমি আর কষ্টের কারণে নিজের ঈমানের ওপর অটল থাকতে পারবে না। ৭৬
আর বান্দা যদি পূর্ণভাবে তার সকল হিকমত ও হুকুমকে মেনে নেয় এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখে যে, সকল কর্তৃত্ব আল্লাহ তাআলারই, তবে তার অন্তর প্রশান্ত হয়ে যাবে- তার প্রয়োজন পূরণ হোক অথবা না হোক।
হাদিসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَنْصِبُ وَجْهَهُ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فِي مَسْأَلَةٍ إِلَّا أَعْطَاهَا إِيَّاهُ إِمَّا أَنْ يُعَجِّلَهَا لَهُ وَإِمَّا أَنْ يَدَّخِرَهَا لَهُ.
হজরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে মুসলিম ব্যক্তিই আল্লাহ তাআলার দিকে তার মুখ উঠিয়ে দুআ করে কিছু প্রার্থনা করে, আল্লাহ নিশ্চয় তাকে তা প্রদান করেন। তবে হয়তো সেটা তাৎক্ষণিক প্রদান করেন কিংবা সেটাকে তিনি বান্দার আখেরাতের জন্য জমা করে রাখেন। ৭৭
এরপর বান্দা যখন কিয়ামতের দিন দেখবে, দুনিয়াতে তাকে যা প্রদান করা হয়েছিল, সবই আজ উধাও হয়ে গেছে। আর যেটা প্রদান করা হয়নি, তার প্রতিদান আখেরাতের জন্য অবশিষ্ট রয়ে গেছে। তখন সে বলতে থাকবে, হায়! আমার কোনো দুআই যদি দুনিয়ার জন্য কবুল না করে আখেরাতের জন্য রেখে দেওয়া হতো, কতই না ভালো হতো!
এই বিষয়গুলো অনুধাবন করো। এবং অন্তরকে আশ্বস্ত করো- সেখানে যেন কোনো প্রকার সন্দেহ কিংবা তাড়াহুড়া না আসে।
টিকাঃ
৭৬. মুসনাদে আহমদ: ৩/১৮ এবং হাকেম ইবনে মুসতাদরাক: ১/৪৯৩। এবং ইমাম বোখারি রহ.ও এটি 'আলআদাবুল মুফরাদ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন-২/৭১০। ইমাম যাহাবি রহ. এবং তবারনি রহ. এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন। ११ মুসনাদে আহমদ: ১৯/৯৪০৯, পৃষ্ঠা: ৪৫২- মা. শামেলা।