📄 সুফিদের বিভিন্ন বিভ্রান্তি
বুদ্ধি ও শরিয়তের চাহিদা হলো, কল্যাণকর জিনিসের প্রতি চেষ্টা-প্রচেষ্টা অব্যাহত করা।
যেমন সম্পদ অর্জন করা, সম্পদ সংরক্ষণ করা এবং সেগুলো প্রবৃদ্ধির জন্য আগ্রহ রাখা এবং চেষ্টা করা। কারণ, মানুষের অস্তিত্বের অবশিষ্ট থাকা খাদ্য ও সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে মানুষের সম্পদের অপচয় ও বিনষ্ট করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
( وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا )
তোমরা তোমাদের সম্পদ নির্বোধ বোকাদের নিকট অর্পণ করো না- যে সম্পদকে আল্লাহ তাআলা তোমাদের জীবনধারণের মাধ্যম বানিয়েছেন।' [সুরা নিসা : ৫]
অর্থাৎ এই সম্পদ হলো তোমাদের জীবনযাপনের মাধ্যম। এর মাধ্যমে তোমরা তোমাদের জীবন পরিচালনা করে থাকো। এ কারণে এগুলো নষ্ট করো না।
অন্য আয়াতে বলেছেন,
( وَلَا تَبْسُطُهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَحْسُورًا )
অপব্যয়ী হয়ে হাত সম্পূর্ণরূপে খুলে রেখো না, তাহলে তোমাকে নিন্দিত ও নিঃস্ব বসে থাকতে হবে। [সুরা ইসরা: ২৯]
আরেক আয়াতে বলেন,
( وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ )
আর নিজের অর্থ-সম্পদ অপ্রয়োজনীয় কাজে ওড়াবে না। জেনে রেখো, যারা অপ্রয়োজনীয় কাজে অর্থ ওড়ায়, তারা শয়তানের ভাই। [সুরা ইসরা: ২৬-২৭]
অন্য আয়াতে বলেছেন,
( وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا )
এবং যারা ব্যয় করার সময় না করে অপব্যয় এবং না করে কার্পণ্য; বরং তা হয় উভয়ের মাঝখানে ভারসাম্যমান। [সুরা ফুরকান: ৬৭] এছাড়া আল্লাহ তাআলা সম্পদের শ্রেষ্ঠত্বের কথাও বলেছেন। যেমন তিনি বলেন,
الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ) যারা আল্লাহর রাস্তায় তাদের সম্পদ খরচ করে। [সুরা বাকারা: ২৬১] অন্য আয়াতে বলেন,
وَمَا لَكُمْ أَلَّا تُنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ ) তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করছ না! [সুরা হাদিদ: ১০]
হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
نعم المال الصالح للرجل الصالح. একজন সৎ ব্যক্তির জন্য হালাল সম্পদ কতই না উত্তম! ৭৪
এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
ما نفعني مال كمال أبي بكر. আবু বকরের সম্পদের মতো অন্য কোনো সম্পদ আমাকে এত বেশি উপকার করেনি। ৭৫
হজরত আবু বকর রা. ব্যবসার জন্য বের হয়ে যেতেন। রাসুলের সাহচর্য ছেড়ে যেতেন; কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এ জন্য নিষেধ করতেন না।
হজরত উমর ইবনে খাত্তাব রা. বলতেন, لأن أموت بين شعبتي جبل أطلب كفاف وجهي أحب إلي من أن أموت غازياً في سبيل الله.
আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে শহিদ হওয়ার চেয়েও আমার নিকট প্রিয় হলো, আমি পাহাড়ের দুই প্রান্তের মাঝে মারা যাব, আমার জন্য প্রয়োজনীয় হালাল জীবিকা অন্বেষণ করতে করতে।
এভাবে সাহাবিদের একটি বড় অংশ ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তাবেয়িদের অনেকেই ব্যবসা করেছেন। তাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হজরত সাইদ ইবনে মুসাইয়েব রা. অনেক সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন। তিনি যাইতুন মজুত করতেন।
সালাফে সালেহিনদের সময়ও এমনই চলেছে। কিন্তু এরপর এক দুরারোগ্য অসুখের মতো বিপর্যয় নেমে এসেছে। এখন- যখন মানুষের সম্পদের প্রয়োজন হচ্ছে, তখন আর মানুষ কারও থেকে কোনো কৌশলেই সম্পদ পাচ্ছে না- যতক্ষণ না সে তার বিনিময় দিচ্ছে কিংবা নিজের দ্বীন বিক্রয় করছে। সম্পদ অর্জনের জন্য শারীরিক শক্তিও প্রয়োজন। এ সময় একটি দল অলসতার পথ অবলম্বন করল এবং দাবি করতে লাগল যে, তারাই হলো একমাত্র তাওয়াক্কুলকারী। আর তারা বলে বেড়াতে লাগল- আমরা কোনোকিছু জমিয়ে রাখি না। কোনো সফরের জন্য পাথেয় রাখি না। শরীরের রিজিক আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসবে।
এই কাজ ও মানসিকতা স্পষ্ট শরিয়তের বিরোধী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পদ নষ্ট করতে নিষেধ করেছেন। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম যখন হজরত খাজির আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাতের জন্য সফরে বের হন, তখন তিনিও পাথেয় সঙ্গে নিয়ে বের হয়েছিলেন।
আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও যখন হিজরতের জন্য বের হন, পাথেয় নিয়েই বের হন। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম প্রমাণ হলো আল্লাহ তাআলার আদেশ। তিনি বলেন, وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى)
তোমরা পাথেয় গ্রহণ করো। নিশ্চয়ই সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া। [সুরা বাকারা : ১৯৭]
এরপর এসকল সুফিগণ দুনিয়ার প্রতি ঘৃণার দাবি করে। কিন্তু আসলে নিজেরা বোঝেই না, কোন জিনিসের জন্য ঘৃণা হওয়া উচিত। তারা কোনো মানুষের সম্পদের প্রাচুর্য প্রার্থনাকে লোভ ও লালসা বলে ধারণা করে।
মোটকথা, তারা নিজেরা নিজেদের ধারণা অনুযায়ী এমন একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে, যা মূলত খ্রিষ্টানদের 'রাহবানিয়াত' বা কৃচ্ছতাসাধন থেকে উৎসারিত। এটি তাদের একটি বাহ্যিক ভোজবাজি। যেন তারা 'জুহুদ' বা দুনিয়াবিমুখতার আবরণে শিকারের জাল পেতেছে। আর এর মাধ্যমে লোকদের হাত থেকে তাদের নিকট রিজিক পৌঁছায়, এগুলোকে তারা নাম দিয়েছে বিজয়।
হজরত ইবনে কুতাইবা রহ. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের মধ্যে আল-ইয়াদুল উলইয়া - উচ্চ হাতের ব্যাখ্যায় বলেন, এটি হলো প্রদানকারী হাত। আমি সেসকল সুফির কথায় আশ্চর্য বোধ করি, যারা বলতে চায়, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো 'গ্রহণকারী হাত'।
আসলে আমি মনে করি, এরা এমন এক সম্প্রদায়, যারা অন্যের থেকে চেয়ে-খেয়ে জীবনযাপন করতে ভালোবাসে। হীনতার পথ অবলম্বন করে। শরিয়ত তাদের এই অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এর সাথে শরিয়তের কোনো সম্পর্ক নেই।
হাদিসে এসেছে, যখন ইবরাহিম এবং লুত আলাইহিমাস সালামের নিকট নিজ এলাকায় জীবিকার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা দেখা গেল, তখন তারা জীবিকার অন্বেষণে অন্য এলাকায় হিজরত করেন।
হজরত শুয়াইব আলাইহিস সালাম সম্পদশালী ছিলেন। এরপরও অধিক উপার্জনের আশায় হজরত মুসা আলাইহিস সালামকে বললেন,
(أَنْ تَأْجُرَنِي ثَمَانِيَ حِجَجٍ فَإِنْ أَتْمَمْتَ عَشْرًا فَمِنْ عِنْدِكَ)
'তুমি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে আট বছর আমার এখানে কাজ করবে। আর যদি তুমি দশ বছর পূর্ণ করো, সেটা তোমার নিজ স্বাধীনতা। [সুরা কাসাস : ২৭]
আমাদের এক সালাফ বলেছেন,
من ادعى بغض الدنيا فهو عندي كذاب إلى أن يثبت صدقه، فإذا ثبت صدقه فهو مجنون.
যে ব্যক্তি দুনিয়ার প্রতি ঘৃণার দাবি করে, আমার মতে সে মিথ্যা বলছে। আর যদি সে তার সত্যতা প্রমাণ করতে পারে, তবে সে অবশ্যই পাগল।
সুফিদের একটি দল নবী, সাহাবি ও সালাফদের পথ ও পদ্ধতি বর্জন করে অলসতার জীবনযাপন শুরু করেছে। বিভিন্ন খানকা জমিয়ে বসেছে। সেখানে খায় আর নর্দন-নৃত্য করে। হজম হয়ে গেলে আবারও খেতে বসে। কোনো ধনবান ব্যক্তির নিকট খাবারের দাওয়াতের সুযোগ পেলে সেটাকে আবশ্যক করে নেয়। তারা এটা করে শুকরিয়া আদায় কিংবা মাগফিরাত কামনার বাহানায়। আর সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, তারা দাবি করে- এটা নাকি সওয়াবের কাজ!
এগুলো সবই শয়তানের প্রতারণা। শয়তান তার ধোঁকার জালের মধ্যে তাদেরকে আটকে রেখেছে।
এছাড়া আরও আশ্চর্য ব্যাপার হলো, কেউ একজন খুব দুনিয়ার ঘৃণার কথা বলে বেড়ায়, কিন্তু তৃপ্তিভরে খায় এবং খাবারটি কোথা থেকে কীভাবে এলো- সেদিকে কোনো লক্ষ রাখে না। গোনাহগার পাপী ভ্রষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদ ভক্ষণ করেও বলে বেড়ায়—এটা আল্লাহ আমাদের রিজিক হিসেবে দিয়েছেন।
তারা শরিয়ত থেকে মুক্ত। শরিয়তও তাদের থেকে মুক্ত।
টিকাঃ
৭৪. হাদিসটি ইমাম বোখারি রহ. তার 'আল-আদাবুল মুফরাদ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে- ৪/১৯৭,২০২। ৭৫. ইমাম ইবনে মাজা রহ. তার 'মুকাদ্দামা'য় এটি উল্লেখ করেছেন- ১/৯৪। এবং মুসনাদে আহমদ: ২/২৫৩, ২৬৬। শাইখ আহমদ শাকের বলেন, এর সনদ বিশুদ্ধ।
📄 মহাগ্রন্থ নিয়ে ভাবনা
একবার হজের সফরে আমরা আরবের রাস্তায় চলছিলাম। চলতে চলতে আমরা এক সময় খায়বারের রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। সেখানে আমি অনেক বড় বড় পাহাড় ও আশ্চর্য বিস্ময়কর সব রাস্তা-পথ দেখতে পেলাম। এগুলো আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। আমি যেন মুগ্ধ হতবুদ্ধ হয়ে সেগুলো দেখছিলাম। আমার অন্তরে স্রষ্টার বড়ত্ব ও মহত্ব উত্তরোত্তর বেড়েই চলছিল। এখনো এসকল রাস্তার আলোচনায় আমার অন্তরে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়, যা অন্য কিছুর স্মরণে হয় না।
একবার আমি আমার নফসকে ডেকে বললাম, তোমার এ কী অবস্থা! তুমি সমুদ্রে যাও, তার আশ্চর্য বিষয়াবলির দিকে চিন্তার দৃষ্টি নিয়ে তাকাও। সেগুলো তো এগুলোর চেয়েও আরও বিশাল ও বিস্ময়কর। এরপর আশপাশের সকল সৃষ্টির দিকে তাকাও এবং সেগুলো লক্ষ করো। সপ্ত আসমান ও শূন্য দিগন্তের তুলনায় এগুলো তো একটি বিশাল ময়দানের মাঝে একটি বিন্দুর মতো।
এরপর কল্পনায় ঘুরে বেড়াও আকাশের দিগন্তে। চক্কর দাও আরশের চারপাশে। এবং লক্ষ করার চেষ্টা করো সেখানকার আলো উজ্জ্বলতা ও বিশালতা। এরপর সকল কিছু থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অবশেষে এগুলোর স্রষ্টার দিকে তোমার দৃষ্টি ফেরাও- এবার দেখতে পাবে এই বিশাল জগৎ ক্ষমতাশীল স্রষ্টার এমন ক্ষমতার অধীন হয়ে যাচ্ছে, যে ক্ষমতার কোনো শেষ নেই, সীমা নেই।
এরপর তোমার নিজের দিকে তাকাও। লক্ষ করো তোমার ক্ষুদ্রতা ও নশ্বরতা। তোমার অক্ষমতা ও অসহায়ত্ব। তোমার সূচনা ও সমাপ্তি। এরপর চিন্তা করো, সূচনার আগে তুমি কিছুই ছিলে না। এরপর একদিন ধ্বংসের মাটি ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।
তাহলে তুমি কীভাবে তোমার এই অস্তিত্ব নিয়ে তার পূর্ণ পরিচয় ও পরিচিতি পেতে চাও- যিনি এর সকল কিছুর শুরু-সমাপ্তি দেখতে পান? যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন- তার বিশালত্ব কীভাবে তোমার ক্ষুদ্রতা দিয়ে পরিমাণ করতে পারো?
চাও? তিনিই তোমার স্রষ্টা। তাহলে তোমার অন্তর কীভাবে এই মহান ইলাহ ও স্রষ্টার স্মরণ থেকে উদাসীন থাকে?
আল্লাহর কসম, মানুষের গাফেল অন্তর থেকে যদি তার প্রবৃত্তির বেহুঁশি ছুটে যায়, তবে অবশ্যই স্রষ্টার বড়ত্বে ও মহত্বে তার অন্তর ভীত ও নত হয়ে পড়বে। কিংবা তার ভালোবাসায় নিমগ্ন হয়ে পড়বে। কিন্তু মানুষের ইন্দ্রিয় শক্তিটাই বেশি প্রাধান্য লাভ করে, প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এ কারণে সে পাহাড় ও সমুদ্র দেখে সেগুলোর বড়ত্ব ও বিশালত্ব বোঝে। কিন্তু কোনো বুদ্ধিমান যদি এগুলোর দিকে তাকায়, তখন বাহ্যিক এই পাহাড়-পর্বত ও সমুদ্রের বড়ত্ব ও বিশালত্বের চেয়ে এগুলোর স্রষ্টার সীমাহীন ক্ষমতা ও মহত্বই তাকে বেশি উজ্জীবিত করে।
📄 বিপদ ও ধৈর্য
দুনিয়ার সকল বিপদেরই একটি নির্ধারিত সময় ও শেষ আছে। আল্লাহ তাআলা সেটা জানেন। এ কারণে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য উচিত হবে, সেই বিপদের সমাপ্তির সময় পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করা। নতুবা সে যদি নির্ধারিত সময়ের আগেই অস্থির বেচাইন হয়ে হায়-হুতাশ করতে থাকে, তবে এটা তাকে কোনো উপকার করবে না। যেমন, কোনো ভারি ধাতব গোলাকার বস্তু যদি ওপর থেকে নিচে পতিত হয় কিংবা ঘূর্ণন শুরু করে, তবে আর তাকে ঠেকানো যায় না। বরং তখন তার স্থির হওয়া বা গতিহীন হওয়া পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করতে হয়। এভাবে একটি নির্ধারিত সময় থাকা সত্ত্বেও যদি বিপদ দ্রুত দূর হওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করা হয়, তবে এতেও কোনো উপকার হয় না।
সুতরাং উচিত হলো ধৈর্যধারণ করা। যদিও বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য দুআ করা বৈধ এবং এর মাধ্যমেই উপকার হয়। কিন্তু দুআকারীর জন্য সাড়াদানের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। বরং সে তার 'দাসত্ব' বা আনুগত্যকে প্রকাশ করবে ধৈর্যধারণের মাধ্যমে, প্রার্থনার মাধ্যমে এবং প্রজ্ঞাবান সত্তার ফয়সালা মেনে নেওয়ার মাধ্যমে।
আর এদিকে সম্ভাব্য যে অপরাধগুলোর কারণে এই বিপদ এসেছে, সেগুলো বর্জন করবে। কারণ, অধিকাংশ বিপদই হয়ে থাকে শাস্তিস্বরূপ। কিন্তু দ্রুত সাড়াপ্রত্যাশী ব্যক্তি তো প্রতিপালকের অমান্যতা প্রদর্শন করে। এটা বান্দার কাজ নয়। এটা বান্দার জন্য শোভনও নয়। বরং বান্দার কাজ হলো, প্রতিপালকের ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং ধৈর্যধারণ করা।
হ্যাঁ, অধিক দুআ ও প্রার্থনার মাধ্যমে মিনতি করা তো ভালো কাজ। বরং বিমুখ থাকা- প্রার্থনা না করাই হারাম ও অবাধ্যতা। কিন্তু এক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করাও তো তার পরিচালনা-পদ্ধতির মাঝে বিঘ্নতা সৃষ্টি করতে চাওয়ার নামান্তর।
আলোচিত বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করো। নিশ্চয় এগুলো আপতিত বিপদকে তোমার নিকট সহনীয় করে তুলবে।
📄 ধৈর্যের পুরস্কার
জগতে ধৈর্যের চেয়ে কঠিন কিছু নেই।
কারণ, কখনো ধৈর্যধারণ করতে হয় প্রিয় ব্যক্তির বিচ্ছেদের ওপর কিংবা অপছন্দনীয় জিনিস সয়ে নেওয়ার ওপর। বিশেষকরে ধৈর্যধারণটা কঠিন হয়ে পড়ে তখন, যখন বিপদের সময়টি অতি দীর্ঘ হয় কিংবা উদ্ধারের ক্ষেত্রে নিরাশা এসে যায়।
ঠিক এই সময়গুলোতে এমন কিছু অবলম্বন ও পাথেয় দরকার- যার মাধ্যমে এই কঠিন যাত্রাটা পার করা সম্ভব হয়। পাথেয় অনেক প্রকার হতে পারে। যেমন,
বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি বিপদের পরিমাণের দিকে লক্ষ করবে। কারণ, বিপদটি এর চেয়ে আরও বেশি হতে পারত। কিংবা ভেবে নেবে, এরপর আল্লাহ আরও বেশি ভালো প্রতিদান দেবেন। যেমন, কারও সন্তান মারা গেল। কিন্তু আল্লাহর কাছে তো এর চেয়ে আরও উত্তম প্রতিদান রয়েছে। হয়তো সেটা দুনিয়াতেই হতে পারে- তাকে আরও নেককার সন্তান প্রদানের মাধ্যমে। কিংবা এর প্রতিদান হতে পারে আখেরাতে।
তাছাড়া শুধু শুধু চিন্তা-ভাবনা করা এবং এ নিয়ে অস্থিরতা প্রকাশ করে তো কোনো উপকার হয় না। এমন আরও কিছু বিষয় নিয়ে চিন্তা করলে, ধৈর্যধারণ সহজ হয়ে যায়।
ধৈর্যের পথে উপকার ছাড়া কিছু নেই। সুতরাং ধৈর্যশীল ব্যক্তির জন্য এই সকল ভাবনায় নফসকে ব্যস্ত রাখা উচিত। এর মাধ্যমে তার বিপদের সময়গুলো সহজে সহনশীলতার সাথে অতিবাহিত হবে এবং কষ্টের আঁধার কেটে সুখময় সকালের উদয় ঘটবে।