📄 সুগন্ধীদের অনুধাবন ও শিক্ষা
কখনো কখনো এমনও হয়—সচেতন অনুভূতিশীল কোনো ব্যক্তি হয়তো একটি কবিতা পড়লেন কিংবা শুনলেন-এর থেকে তিনি এমন একটি ইশারা বা শিক্ষা প্রাপ্ত হন, যা তার জীবন পাল্টে দেয়। যা তাকে অনেক উপকার করে।
হজরত জুনায়েদ রহ. ৭৩ বলেন, একবার আমার এক সুহৃদ ব্যক্তি আমাকে একটি কাগজের টুকরা এনে দেন। তাতে লেখা ছিল, আমি মক্কার পথে এক উটচালককে বলতে শুনেছি এই কবিতা-
أبكي وما يدريك ما يبكيني أبكي حذارا أن تفارقيني وتقطعي حبلي وتهجريني
আজ আমি কাঁদি। তুমি কি জানো, কেন আমি অশ্রু ঝরাই? তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে, কাঁদি আমি সেই বেদনায় ছিন্ন হবে সকল বাঁধন; তুমি আমায় ছেড়ে যাবে হায়!
একজন গোপন প্রেমিকের নিকট কবিতার এই চরণগুলোর প্রভাবের বিষয়টি লক্ষ করে দেখো তো। সে এর দ্বারা যা বুঝেছে, সেটাকে হজরত জুনায়েদ রহ.-কেও অবহিত করাকে ভালো মনে করেছে। আর এটা বোঝার জন্য তো হজরত জুনায়েদকেই প্রয়োজন—আর কে হবে এর সমবাদার!
মানুষের মধ্যে অনেক শ্রেণি রয়েছে। এদের কিছু ব্যক্তির মেজাজ-স্বভাব খুবই মোটা ধরনের। তাদের অনুভব-অনুভূতি অতটা সূক্ষ্ম নয়। তাদের কেউ যখন এ ধরনের কোনো কবিতা শোনে, তখন সে বলে ওঠে, এর দ্বারা কী বোঝায়?
এর দ্বারা যদি খোদাকে উদ্দেশ্য নেওয়া হয়, তবে তো কিছুতেই স্ত্রী-বাচক শব্দ দিয়ে তার দিকে ইশারা করা হতো না। আর যদি কোনো নারীই উদ্দেশ্য হয়, তবে আর এখানে তাসাওউফ বা দুনিয়াবিমুখতা কিংবা শিক্ষার কী আছে?
আমার জীবনের কসম! এগুলো আসলে উদাসীন উটচালকদেরই গান— এগুলো তারাই শোনে। এ কারণেই এ ধরনের কবিদের কবিতা ও গায়কদের গান শুনতে নিষেধ করা হয়। কারণ, অধিকাংশ ব্যক্তিই এই কবিতার চরণগুলোকে প্রবৃত্তির কামনা এবং জৈবিক বাসনা হিসেবে অনুধাবন করে। নতুবা আমাদের আর কি সেই জুনায়েদ ও সেই গোপন প্রেমিক আছে! যদি আজ তাদের মতো কেউ থাকত, তাহলে তারাই বুঝত এর মর্ম! অন্যদের জন্য এগুলো শোনা নিষেধ হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
তবে একেবারে মোটা দাগে বাহ্যিক অর্থে প্রয়োগ করে যারা এটির ক্ষেত্রে আপত্তি পেশ করেন, তাদের কথাও গ্রহণীয় নয়। এটাকে অন্তরের গভীরতম বোধ দিয়ে বুঝতে হবে। আর তা হলো,
গোপন সেই প্রেমিক শাব্দিক কোনো ইশারা-ইঙ্গিত গ্রহণ করেনি এবং এটাকে তার নিজের চাহিদার ওপরও উপলব্ধি করে নেয়নি যে—এখানে নারী বা পুরুষের কোনো বিষয় আসবে। এখানে সে শুধু অর্থের দিক থেকে একটি ইশারা বা বোধকে গ্রহণ করেছে। যেন সে এই চরণগুলোর অর্থ দিয়ে তার হাবিব বা প্রিয়কে আহ্বান করছে। সে বলছে, 'আমি তোমার বিরহ ও বিচ্ছিন্নতার ভয়ে ক্রন্দন করি।' এটিই তার মূল উদ্দেশ্য। এখানে সে নারী বা পুরুষবাচক শব্দের দিকে কখনোই খেয়াল রাখছে না।
বিষয়টির মর্মকথা মর্ম দিয়েই বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
অনুভূতিশীল সচেতন ব্যক্তিরা এই ধরনের কথা থেকে নিজের শিক্ষণীয় বিষয়ের ইশারা-ইঙ্গিত গ্রহণ করে নিতে পারে। এমনকি অতি সাধারণ ব্যক্তিরাও যে সকল কথা বলে—সেগুলোকেও তারা একটু এদিক-সেদিক ঘুরিয়ে মহান কোনো শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়।
আমি নিজে ইবনে আকিলের লেখায় দেখেছি—তিনি তার এক শাইখের থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি এক মেয়েকে বলতে শোনেন—
غسلت له طول الليل فركت له طول النهار خرج يعاين غيري زلق وقع الطين
তার জন্য রাতভর গোসল করলাম। তার জন্য দিনভর শরীর করলাম পরিচ্ছন্ন।
আর সে বের হলো অন্যকে দেখতে। তাই পড়ল নরম কাদামাটিতে পা পিছলে।
এর দ্বারা শাইখ এই অর্থ নিয়েছেন—যেন আল্লাহ তাআলা বলছেন, হে আমার বান্দা, আমি তোমার শারীরিক গঠনকে কত সুন্দর করেছি। তোমার অবস্থা কত ভালো করেছি। তোমার গঠন শক্তিশালী করেছি। তোমাকে কত নিয়ামত প্রদান করেছি। তোমার জন্য জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছি। আর তুমি ধাবিত হয়েছ অন্যের দিকে। শিরকের দিকে। তাহলে অচিরেই আমার বিরোধিতার শাস্তি তুমি লক্ষ করবে। পা পিছলে পড়বে জাহান্নামে!
ইবনে আকিল আরও বলেন, আমি একটি মেয়েকে বলতে শুনেছি। কথাটি দীর্ঘ দিন আমার অন্তরের মধ্যে প্রভাব সৃষ্টি করে রেখেছিল। কথাটি এই—
كم كنت بالله أقول لك ... لذا التواني غائله وللقبيح خميرة ..... تبين بعد قليل
আমি কতবার তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলেছি, এই অবহেলার কারণেই তার ধ্বংস।
সকল নিকৃষ্টতার এমন একটি উপরি গাজনা রয়েছে, যা অচিরেই প্রকাশিত হয়ে পড়বে।
কবিতাটির শেষে ইবনে আকিল রহ. বলেন, আমাদের পালনীয় বিষয়ের অনেক ক্ষেত্রে শিথিলতার বিষয়টিও এই রকম লজ্জাজনক- যা অচিরেই আল্লাহ তাআলার সামনে প্রকাশ হয়ে পড়বে।
টিকাঃ
৭৩. পুরো নাম: জুনায়েদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে জুনায়েদ আননাহাওন্দি। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সুফি সাধক ও আবেদ। হজরত আবু ছাউর-এর নিকট দ্বীনের শিক্ষা অর্জন করেছেন। তার মারেফাতের গভীরতা নিয়ে তুমি চিন্তা করতেও পারবে না। তার বাবা ছিলেন একজন তাঁতী। আর তিনি নিজে ছিলেন একজন মুচি। তাদের পৈতৃক আবাস ছিল নাহাওন্দ। কিন্তু তার জন্ম ও বেড়ে উঠা বাগদাদে। তিনি অনেক আলেম থেকে ইলম অর্জন করেছেন। তিনি ২৯৮ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। طبقات الحنابلة : ১/১২৭-১২৯ سير أعلام النبلاء : ২৪/৩৬/১
📄 তুমি তোমার অন্তরকে জিজ্ঞেস করো
একবার দুনিয়ার কিছু আসবাব খুবই সস্তায় আমার অর্জিত হয়। এরপর যখন এভাবে আরও কিছু অর্জিত হতে লাগল, আমার অন্তর থেকেও যেন কিছু হারাতে থাকল। যখনই আমার সামনে তা অর্জনের আনন্দ আসতে লাগল, অন্যদিকে আমার অন্তরের আকাশ অন্ধকারে ছেয়ে যেতে লাগল।
এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে আমি একদিন নফসকে ডেকে বললাম, 'হে নিকৃষ্টতম নফস, গোনাহ হলো অন্তরের চর্মরোগ। গোনাহ ঘটলেই তার শরীর ও চেহারার আকৃতি পাল্টে যায়। এ কারণে বলা হয়েছে- إستفت قلبك - তুমি আগে তোমার অন্তরকে জিজ্ঞেস করো।'
দুনিয়াভরতি সকল বস্তু অর্জনের ক্ষেত্রেও যদি অন্তরে কোনো ধরনের কদর্যতা অর্জিত হয়, তবে তাতেও কোনো কল্যাণ নেই।
দ্বীনের মধ্যে কিংবা লেনদেনের মধ্যে কোনো কদর্যতা-পঙ্কিলতা আপতিত হওয়ার মাধ্যমে যদি দুনিয়ার 'জান্নাত'ও মিলে যায়, তবু তাতে শান্তি নেই। অন্তরের পঙ্কিলতা নিয়ে বাদশাহর বহুদামি পালঙ্কে শুয়ে থাকার চেয়ে, অন্তরের পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধি নিয়ে জীর্ণ ময়লার ভাণ্ডে শুয়ে থাকাও বেশি আরামদায়ক।
এভাবে আমি নিজের নফসের সাথে নিজেই তর্ক-বিতর্ক করতে থাকি। কখনো আমিই নফসের উপর বিজয়ী হই, কখনো নফস আমার ওপর জয়ী হয়ে পড়ে। কিন্তু এর মাঝেই হঠাৎ 'জীবনের প্রয়োজন' এসে দাবি করে বসে, উপায়-উপকরণ তার জীবনধারণে অবশ্যই দরকার। এছাড়া তার উপায় কী! আমি বাহ্যিকভাবে বৈধ ছাড়া অবৈধ কোনো জিনিসের দিকে তো হাত বাড়াইনি! তাহলে অসুবিধা কী?
আমি প্রয়োজনকে বললাম, তুমি যা করেছ, এটি কি তাকওয়ার খেলাফ নয়? সে বলল, হ্যাঁ।
আমি আবার বললাম, তুমি যা অর্জন করেছ, তা কি ধীরে ধীরে অন্তরের নম্রভাব দূর করে সেখানে রূঢ়তা ও কঠোরতা আনয়ন করবে না? সে বলল, হ্যাঁ, করবে বৈ কী!
আমি বললাম, এটার পরিণাম যদি এগুলোই হয়, তবে কিছুতেই তোমার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।
এর কিছুদিন পর এ বিষয়ে আমি একদিন আমার নফসের সাথে নির্জনে বসলাম। তাকে বললাম, বাড়াবাড়ি বন্ধ করে এবার একটু চুপ করে আমার কথাগুলো শোনো-
দুনিয়াতে তুমি যে উপায়ে সম্পদ অর্জন করো—যার মধ্যে সন্দেহ আছে, তার সকল কিছুই কি তুমি খরচ করে যাওয়ার ওপর নিশ্চিত? নফস বলল, না।
আমি বললাম, তাহলে এটাও কষ্টের কথা। তোমার অনুপস্থিতিতে অন্যরা এগুলো গ্রহণ করে নেবে আর তুমি এগুলো অর্জনের কারণে দুনিয়াতেও কদর্য হলে আর আখেরাতের শান্তি তো রয়েছেই।
তোমার দুর্ভোগ হোক- তুমি এগুলো বর্জন করো- যেগুলো তাকওয়ার বিপরীত- আল্লাহর দিকে তাকিয়ে সেগুলো বর্জন করো। হারাম ও সন্দেহযুক্ত জিনিস ছাড়া তোমার কি আর কিছুই অর্জন করার নেই? সেদিকে ধাবিত হও না কেন?
তুমি কি শোনোনি-যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য কিছু বর্জন করে, আল্লাহ তাকে তার চেয়ে আরও উত্তম জিনিস প্রদান করেন?
তুমি শিক্ষা নেবে সেই সকল ব্যক্তি থেকে—যারা অনেক সম্পদ জমা করেছে, কিন্তু সেগুলো অন্যরা উপভোগ করেছে। তারা কামনা করেছে, কিন্তু তাদের লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেনি। কত আলেম রয়েছেন, কত কিতাব জমা করেছেন, কিন্তু তা দ্বারা উপকৃত হতে পারেননি। আবার এমন কতজন এগুলো দ্বারা উপকৃত হয়েছে—অথচ তার কাছে হয়তো কিতাবের দশটি খণ্ডও নেই। এমন কত সুখ-শান্তিতে বসবাসকারী রয়েছে, যারা সামান্য কিছু দিনারেরও মালিক নয়। আবার সুখ-শান্তিহীন কত ধনাঢ্য ব্যক্তিও রয়েছে।
তোমার কি এই বুদ্ধি হবে না, যে ব্যক্তি হয়তো অন্যের থেকে সস্তায় বা অন্য যেকোনো উপায়ে কিছু অর্জন করল, তার থেকে এগুলো বিভিন্ন বিপর্যয়ের মাধ্যমে আবার বিনষ্ট হয়ে পড়বে না- সে কথা তোমাকে কে বলল? হয়তো দেখা যাবে বাড়ির মালিক বা পরিবারের কারও এমন অসুখ হলো যে, বছর জুড়ে বিভিন্ন উপায়ে যা কিছু অর্জন করেছিল, তার দ্বিগুণ বের হয়ে গেল! সুতরাং দুনিয়া বা আখেরাত- তাকওয়ার চেয়ে উপকারী কোনো জিনিস তাদের জন্য নেই।
আমার এই তিরস্কার-ভৎসনায় নফস চিৎকার করে উঠে বলল, আমি যদি শরিয়তের আবশ্যক সীমাকে অতিক্রম না করি- তখন আমার ক্ষেত্রে মন্তব্য কী?
আমি তোমার ধোঁকা বা প্রতারণার ওপর নিশ্চিত নই। আর তোমার গোপন বিষয়ে তুমিই সবচেয়ে ভালো জানো।
তখন নফস আমাকে বলল, তাহলে বলে দিন- আমি কী করব? আমি বললাম, তোমাকে সর্বক্ষণ যিনি দেখছেন, তার ব্যাপারে লক্ষ রাখতে হবে। কোনো কর্তৃত্বশীল অভিজাত ব্যক্তি তোমাকে যদি সর্বক্ষণ দেখত, তখন তুমি তার সাথে কেমন আচরণ করতে- তার সাথে তুলনা করো। আর আল্লাহর নিকট কোনো বিষয়ই গোপন থাকে না- যা তোমার ওই ব্যক্তির নিকট গোপন থাকা বা রাখা সম্ভব।
সুতরাং সর্বক্ষণ সতর্ক থাকো। কিছুতেই সাময়িক প্রবৃত্তির প্ররোচনায় পড়ে তোমার ইয়াকিন ও তাকওয়াকে বিক্রয় করে ফেলো না। আর যদি এগুলো করতে জীবনযাপনে খুবই কষ্ট ও কঠোরতা অনুভব হয়-তবে মেজাজ ও স্বভাবকে বলো, আর কিছুদিন অপেক্ষা করো। প্রাণ বের হয়ে যাওয়ার সময় তো এখনো আসেনি।
আল্লাহই তোমাকে সঠিক পথ দেখাবেন। সাহায্যের মাধ্যমে সক্ষমতা প্রদান করবেন।
📄 সুফিদের বিভিন্ন বিভ্রান্তি
বুদ্ধি ও শরিয়তের চাহিদা হলো, কল্যাণকর জিনিসের প্রতি চেষ্টা-প্রচেষ্টা অব্যাহত করা।
যেমন সম্পদ অর্জন করা, সম্পদ সংরক্ষণ করা এবং সেগুলো প্রবৃদ্ধির জন্য আগ্রহ রাখা এবং চেষ্টা করা। কারণ, মানুষের অস্তিত্বের অবশিষ্ট থাকা খাদ্য ও সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে মানুষের সম্পদের অপচয় ও বিনষ্ট করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
( وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا )
তোমরা তোমাদের সম্পদ নির্বোধ বোকাদের নিকট অর্পণ করো না- যে সম্পদকে আল্লাহ তাআলা তোমাদের জীবনধারণের মাধ্যম বানিয়েছেন।' [সুরা নিসা : ৫]
অর্থাৎ এই সম্পদ হলো তোমাদের জীবনযাপনের মাধ্যম। এর মাধ্যমে তোমরা তোমাদের জীবন পরিচালনা করে থাকো। এ কারণে এগুলো নষ্ট করো না।
অন্য আয়াতে বলেছেন,
( وَلَا تَبْسُطُهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَحْسُورًا )
অপব্যয়ী হয়ে হাত সম্পূর্ণরূপে খুলে রেখো না, তাহলে তোমাকে নিন্দিত ও নিঃস্ব বসে থাকতে হবে। [সুরা ইসরা: ২৯]
আরেক আয়াতে বলেন,
( وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ )
আর নিজের অর্থ-সম্পদ অপ্রয়োজনীয় কাজে ওড়াবে না। জেনে রেখো, যারা অপ্রয়োজনীয় কাজে অর্থ ওড়ায়, তারা শয়তানের ভাই। [সুরা ইসরা: ২৬-২৭]
অন্য আয়াতে বলেছেন,
( وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا )
এবং যারা ব্যয় করার সময় না করে অপব্যয় এবং না করে কার্পণ্য; বরং তা হয় উভয়ের মাঝখানে ভারসাম্যমান। [সুরা ফুরকান: ৬৭] এছাড়া আল্লাহ তাআলা সম্পদের শ্রেষ্ঠত্বের কথাও বলেছেন। যেমন তিনি বলেন,
الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ) যারা আল্লাহর রাস্তায় তাদের সম্পদ খরচ করে। [সুরা বাকারা: ২৬১] অন্য আয়াতে বলেন,
وَمَا لَكُمْ أَلَّا تُنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ ) তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করছ না! [সুরা হাদিদ: ১০]
হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
نعم المال الصالح للرجل الصالح. একজন সৎ ব্যক্তির জন্য হালাল সম্পদ কতই না উত্তম! ৭৪
এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
ما نفعني مال كمال أبي بكر. আবু বকরের সম্পদের মতো অন্য কোনো সম্পদ আমাকে এত বেশি উপকার করেনি। ৭৫
হজরত আবু বকর রা. ব্যবসার জন্য বের হয়ে যেতেন। রাসুলের সাহচর্য ছেড়ে যেতেন; কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এ জন্য নিষেধ করতেন না।
হজরত উমর ইবনে খাত্তাব রা. বলতেন, لأن أموت بين شعبتي جبل أطلب كفاف وجهي أحب إلي من أن أموت غازياً في سبيل الله.
আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে শহিদ হওয়ার চেয়েও আমার নিকট প্রিয় হলো, আমি পাহাড়ের দুই প্রান্তের মাঝে মারা যাব, আমার জন্য প্রয়োজনীয় হালাল জীবিকা অন্বেষণ করতে করতে।
এভাবে সাহাবিদের একটি বড় অংশ ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তাবেয়িদের অনেকেই ব্যবসা করেছেন। তাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হজরত সাইদ ইবনে মুসাইয়েব রা. অনেক সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন। তিনি যাইতুন মজুত করতেন।
সালাফে সালেহিনদের সময়ও এমনই চলেছে। কিন্তু এরপর এক দুরারোগ্য অসুখের মতো বিপর্যয় নেমে এসেছে। এখন- যখন মানুষের সম্পদের প্রয়োজন হচ্ছে, তখন আর মানুষ কারও থেকে কোনো কৌশলেই সম্পদ পাচ্ছে না- যতক্ষণ না সে তার বিনিময় দিচ্ছে কিংবা নিজের দ্বীন বিক্রয় করছে। সম্পদ অর্জনের জন্য শারীরিক শক্তিও প্রয়োজন। এ সময় একটি দল অলসতার পথ অবলম্বন করল এবং দাবি করতে লাগল যে, তারাই হলো একমাত্র তাওয়াক্কুলকারী। আর তারা বলে বেড়াতে লাগল- আমরা কোনোকিছু জমিয়ে রাখি না। কোনো সফরের জন্য পাথেয় রাখি না। শরীরের রিজিক আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসবে।
এই কাজ ও মানসিকতা স্পষ্ট শরিয়তের বিরোধী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পদ নষ্ট করতে নিষেধ করেছেন। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম যখন হজরত খাজির আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাতের জন্য সফরে বের হন, তখন তিনিও পাথেয় সঙ্গে নিয়ে বের হয়েছিলেন।
আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও যখন হিজরতের জন্য বের হন, পাথেয় নিয়েই বের হন। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম প্রমাণ হলো আল্লাহ তাআলার আদেশ। তিনি বলেন, وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى)
তোমরা পাথেয় গ্রহণ করো। নিশ্চয়ই সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া। [সুরা বাকারা : ১৯৭]
এরপর এসকল সুফিগণ দুনিয়ার প্রতি ঘৃণার দাবি করে। কিন্তু আসলে নিজেরা বোঝেই না, কোন জিনিসের জন্য ঘৃণা হওয়া উচিত। তারা কোনো মানুষের সম্পদের প্রাচুর্য প্রার্থনাকে লোভ ও লালসা বলে ধারণা করে।
মোটকথা, তারা নিজেরা নিজেদের ধারণা অনুযায়ী এমন একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে, যা মূলত খ্রিষ্টানদের 'রাহবানিয়াত' বা কৃচ্ছতাসাধন থেকে উৎসারিত। এটি তাদের একটি বাহ্যিক ভোজবাজি। যেন তারা 'জুহুদ' বা দুনিয়াবিমুখতার আবরণে শিকারের জাল পেতেছে। আর এর মাধ্যমে লোকদের হাত থেকে তাদের নিকট রিজিক পৌঁছায়, এগুলোকে তারা নাম দিয়েছে বিজয়।
হজরত ইবনে কুতাইবা রহ. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের মধ্যে আল-ইয়াদুল উলইয়া - উচ্চ হাতের ব্যাখ্যায় বলেন, এটি হলো প্রদানকারী হাত। আমি সেসকল সুফির কথায় আশ্চর্য বোধ করি, যারা বলতে চায়, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো 'গ্রহণকারী হাত'।
আসলে আমি মনে করি, এরা এমন এক সম্প্রদায়, যারা অন্যের থেকে চেয়ে-খেয়ে জীবনযাপন করতে ভালোবাসে। হীনতার পথ অবলম্বন করে। শরিয়ত তাদের এই অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এর সাথে শরিয়তের কোনো সম্পর্ক নেই।
হাদিসে এসেছে, যখন ইবরাহিম এবং লুত আলাইহিমাস সালামের নিকট নিজ এলাকায় জীবিকার ক্ষেত্রে সংকীর্ণতা দেখা গেল, তখন তারা জীবিকার অন্বেষণে অন্য এলাকায় হিজরত করেন।
হজরত শুয়াইব আলাইহিস সালাম সম্পদশালী ছিলেন। এরপরও অধিক উপার্জনের আশায় হজরত মুসা আলাইহিস সালামকে বললেন,
(أَنْ تَأْجُرَنِي ثَمَانِيَ حِجَجٍ فَإِنْ أَتْمَمْتَ عَشْرًا فَمِنْ عِنْدِكَ)
'তুমি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে আট বছর আমার এখানে কাজ করবে। আর যদি তুমি দশ বছর পূর্ণ করো, সেটা তোমার নিজ স্বাধীনতা। [সুরা কাসাস : ২৭]
আমাদের এক সালাফ বলেছেন,
من ادعى بغض الدنيا فهو عندي كذاب إلى أن يثبت صدقه، فإذا ثبت صدقه فهو مجنون.
যে ব্যক্তি দুনিয়ার প্রতি ঘৃণার দাবি করে, আমার মতে সে মিথ্যা বলছে। আর যদি সে তার সত্যতা প্রমাণ করতে পারে, তবে সে অবশ্যই পাগল।
সুফিদের একটি দল নবী, সাহাবি ও সালাফদের পথ ও পদ্ধতি বর্জন করে অলসতার জীবনযাপন শুরু করেছে। বিভিন্ন খানকা জমিয়ে বসেছে। সেখানে খায় আর নর্দন-নৃত্য করে। হজম হয়ে গেলে আবারও খেতে বসে। কোনো ধনবান ব্যক্তির নিকট খাবারের দাওয়াতের সুযোগ পেলে সেটাকে আবশ্যক করে নেয়। তারা এটা করে শুকরিয়া আদায় কিংবা মাগফিরাত কামনার বাহানায়। আর সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, তারা দাবি করে- এটা নাকি সওয়াবের কাজ!
এগুলো সবই শয়তানের প্রতারণা। শয়তান তার ধোঁকার জালের মধ্যে তাদেরকে আটকে রেখেছে।
এছাড়া আরও আশ্চর্য ব্যাপার হলো, কেউ একজন খুব দুনিয়ার ঘৃণার কথা বলে বেড়ায়, কিন্তু তৃপ্তিভরে খায় এবং খাবারটি কোথা থেকে কীভাবে এলো- সেদিকে কোনো লক্ষ রাখে না। গোনাহগার পাপী ভ্রষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদ ভক্ষণ করেও বলে বেড়ায়—এটা আল্লাহ আমাদের রিজিক হিসেবে দিয়েছেন।
তারা শরিয়ত থেকে মুক্ত। শরিয়তও তাদের থেকে মুক্ত।
টিকাঃ
৭৪. হাদিসটি ইমাম বোখারি রহ. তার 'আল-আদাবুল মুফরাদ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া মুসনাদে আহমাদেও বর্ণিত হয়েছে- ৪/১৯৭,২০২। ৭৫. ইমাম ইবনে মাজা রহ. তার 'মুকাদ্দামা'য় এটি উল্লেখ করেছেন- ১/৯৪। এবং মুসনাদে আহমদ: ২/২৫৩, ২৬৬। শাইখ আহমদ শাকের বলেন, এর সনদ বিশুদ্ধ।
📄 মহাগ্রন্থ নিয়ে ভাবনা
একবার হজের সফরে আমরা আরবের রাস্তায় চলছিলাম। চলতে চলতে আমরা এক সময় খায়বারের রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। সেখানে আমি অনেক বড় বড় পাহাড় ও আশ্চর্য বিস্ময়কর সব রাস্তা-পথ দেখতে পেলাম। এগুলো আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। আমি যেন মুগ্ধ হতবুদ্ধ হয়ে সেগুলো দেখছিলাম। আমার অন্তরে স্রষ্টার বড়ত্ব ও মহত্ব উত্তরোত্তর বেড়েই চলছিল। এখনো এসকল রাস্তার আলোচনায় আমার অন্তরে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়, যা অন্য কিছুর স্মরণে হয় না।
একবার আমি আমার নফসকে ডেকে বললাম, তোমার এ কী অবস্থা! তুমি সমুদ্রে যাও, তার আশ্চর্য বিষয়াবলির দিকে চিন্তার দৃষ্টি নিয়ে তাকাও। সেগুলো তো এগুলোর চেয়েও আরও বিশাল ও বিস্ময়কর। এরপর আশপাশের সকল সৃষ্টির দিকে তাকাও এবং সেগুলো লক্ষ করো। সপ্ত আসমান ও শূন্য দিগন্তের তুলনায় এগুলো তো একটি বিশাল ময়দানের মাঝে একটি বিন্দুর মতো।
এরপর কল্পনায় ঘুরে বেড়াও আকাশের দিগন্তে। চক্কর দাও আরশের চারপাশে। এবং লক্ষ করার চেষ্টা করো সেখানকার আলো উজ্জ্বলতা ও বিশালতা। এরপর সকল কিছু থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অবশেষে এগুলোর স্রষ্টার দিকে তোমার দৃষ্টি ফেরাও- এবার দেখতে পাবে এই বিশাল জগৎ ক্ষমতাশীল স্রষ্টার এমন ক্ষমতার অধীন হয়ে যাচ্ছে, যে ক্ষমতার কোনো শেষ নেই, সীমা নেই।
এরপর তোমার নিজের দিকে তাকাও। লক্ষ করো তোমার ক্ষুদ্রতা ও নশ্বরতা। তোমার অক্ষমতা ও অসহায়ত্ব। তোমার সূচনা ও সমাপ্তি। এরপর চিন্তা করো, সূচনার আগে তুমি কিছুই ছিলে না। এরপর একদিন ধ্বংসের মাটি ছাড়া আর কিছুই থাকবে না।
তাহলে তুমি কীভাবে তোমার এই অস্তিত্ব নিয়ে তার পূর্ণ পরিচয় ও পরিচিতি পেতে চাও- যিনি এর সকল কিছুর শুরু-সমাপ্তি দেখতে পান? যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন- তার বিশালত্ব কীভাবে তোমার ক্ষুদ্রতা দিয়ে পরিমাণ করতে পারো?
চাও? তিনিই তোমার স্রষ্টা। তাহলে তোমার অন্তর কীভাবে এই মহান ইলাহ ও স্রষ্টার স্মরণ থেকে উদাসীন থাকে?
আল্লাহর কসম, মানুষের গাফেল অন্তর থেকে যদি তার প্রবৃত্তির বেহুঁশি ছুটে যায়, তবে অবশ্যই স্রষ্টার বড়ত্বে ও মহত্বে তার অন্তর ভীত ও নত হয়ে পড়বে। কিংবা তার ভালোবাসায় নিমগ্ন হয়ে পড়বে। কিন্তু মানুষের ইন্দ্রিয় শক্তিটাই বেশি প্রাধান্য লাভ করে, প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এ কারণে সে পাহাড় ও সমুদ্র দেখে সেগুলোর বড়ত্ব ও বিশালত্ব বোঝে। কিন্তু কোনো বুদ্ধিমান যদি এগুলোর দিকে তাকায়, তখন বাহ্যিক এই পাহাড়-পর্বত ও সমুদ্রের বড়ত্ব ও বিশালত্বের চেয়ে এগুলোর স্রষ্টার সীমাহীন ক্ষমতা ও মহত্বই তাকে বেশি উজ্জীবিত করে।