📄 সময়ের অপচয়
আমি অধিকাংশ মানুষকে দেখি—তারা খুবই আশ্চর্যরকম অবহেলায় সময় কাটিয়ে দেয়। রাত যদি দীর্ঘ হয়, তবে গল্প-গুজবের মাধ্যমে নষ্ট করে। কিংবা অনর্থক যুদ্ধ-কাহিনি ও চিত্তাকর্ষক প্রেম-ভালোবাসার কাহিনির বই পড়ে সময় পার করে। আর যখন দিবস হয়ে পড়ে দীর্ঘ—তখন দুপুরের ঘুমে সময় কাটিয়ে দেয়। এছাড়া দিবসের আরও বিভিন্ন সময় বাজারে কিংবা দজলা নদীর পাড়ে ঘুরে ঘুরে সময় নষ্ট করে।
এদের উদাহরণ হলো এমন এক জাহাজের অধিবাসীদের মতো, যারা নিজেদেরকে বিভিন্ন খোশ-গল্পে মত্ত রেখেছে—অথচ স্রোতের টানে জাহাজ ভেসে চলেছে কোথায়, সেদিকে তাদের কোনো খেয়ালই নেই।
তবে খুবই অল্প মানুষকে দেখেছি, যারা পৃথিবীতে নিজেদের অস্তিত্বের অর্থ অনুধাবন করতে পারে। তারা জীবনের পাথেয় সঞ্চয় করে। যাত্রার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
তবে তাদের মাঝেও ভিন্নতা রয়েছে। তাদের ভিন্নতার কারণ হলো, আখেরাতের সম্বল সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে নিজেদের ইলমের স্বল্পতা কিংবা আধিক্য। সতর্ক যারা, তারা সব সময় নিজেদের প্রধান লক্ষ্যের দিকে সচেতন দৃষ্টি রাখে। এ কারণে তারা ব্যবসায় বেশি লাভবান হয়। আর যারা এ সম্পর্কে উদাসীন ও অজ্ঞ—তারা স্রোতের টানে চলতে থাকে, কখনো মানজিল পায়। কখনো ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে।
কত মানুষকে দেখেছি, জীবনের দীর্ঘ সফর পাড়ি দিয়ে সূর্য ডুবুডুবু—কিন্তু অর্জনের খাতা একেবারে শূন্য। নেকির পাতায় শূন্যতায় ভরা। আল্লাহর দোহাই, আল্লাহর দোহাই! জীবনের মৌসুমকে বুঝতে শেখো। সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আগেই দ্রুত অর্জনের থলে পূর্ণ করে নাও। ইলম শেখো। হিকমত অর্জন করো। সময়ের সাথে পাল্লা দাও। নফসের ওপর সওয়ার হও। পাথেয়ের মাধ্যমে সজ্জিত হও।
📄 আমলদার আলেম
আমি আমার এ ক্ষুদ্র জীবনে অনেক ‘মাশায়েখ’-এর সাক্ষাৎ পেয়েছি। তাদের একেকজনের অবস্থা ছিল একেক রকম। ইলমের ক্ষেত্রেও তাদের অবস্থা ও মর্যাদা ছিল ভিন্ন ভিন্ন। তবে তাদের মধ্যে আমাকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত করেছেন তারাই, যাদের ইলমের সাথে আমলও ছিল। অথচ তাদের চেয়ে অন্যদের ইলম হয়তো বেশিই ছিল- কিন্তু তাদের দ্বারা তেমন বেশি উপকার হয়নি।
আমি আলেম-মুহাদ্দিসদের এমন ব্যক্তিদের সাথেও সাক্ষাৎ করেছি, যারা ছিলেন অনেক জ্ঞানের অধিকারী। বুঝমান। প্রাজ্ঞ। তাদের কলবে ও কিতাবে সংরক্ষিত ছিল অনেক ইলম ও জ্ঞান। কিন্তু তাদের মজলিস ছিল গিবতে ভরপুর। অন্যদের অবস্থান নির্ণয়ের (জারহ ও তাদিল শাস্ত্র) সুযোগে তারা গিবত করে বেড়াত। এবং হাদিসের এই পঠনের ওপর তারা প্রতিদান গ্রহণ করত। সম্মান বজায় রাখতে গিয়ে যেকোনো প্রশ্নের দ্রুত উত্তর প্রদান করত- অথচ ভুলের দিকে ভ্রক্ষেপ করত না। তাদের সত্যানুসন্ধান নেই। যাচাই- বাছাই নেই।
আমি আবদুল ওয়াহহাব আনমাতি রহ.-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি ছিলেন ‘সালাফে সালেহিন’-এর পথ ও পদ্ধতির ওপর অটল একজন ব্যক্তিত্ব। তার মজলিসে কখনো গিবত শোনা যায়নি। হাদিস শ্রবণের ক্ষেত্রে তিনি কখনো প্রতিদান গ্রহণ করতেন না। আমি যখন তার নিকট ‘কিতাবুর রাকাইক’-এর হাদিসগুলো পাঠ করি, তার চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে দেখেছি। তিনি হাদিস শুনছেন—আর তার দুটি চোখ দিয়ে বিরামহীন অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে! আমার সেই ছোট বয়সে তার এই আশ্চর্য হৃদয়বিগলিত ক্রন্দন তখনই আমার অন্তরের মাঝে এক অন্য ধরনের অবস্থা সৃষ্টি করেছিল। আসলে তিনি ছিলেন সেই সকল মহান মনীষীদের অন্তর্ভুক্ত—আগের যুগে আমাদের আকাবিরদের গুণাবলি যেমন শোনা যায়।
এছাড়াও আমি শাইখ আবু মানসুর আল-জাওয়ালিকি রহ. এর সাক্ষাৎ পেয়েছি। তিনি ছিলেন খুবই চুপচাপ ধরনের মানুষ। যা বলতেন, কঠিনভাবে যাচাই-বাছাই ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে দৃঢ়তার সাথেই বলতেন।
তার মজলিসে কোনো প্রশ্ন করা হলে, কখনো কখনো তার ছাত্ররা তার উত্তরে হয়তো তাড়াহুড়া করে ফেলত। কিন্তু তিনি তাদের থামিয়ে দিতেন। বিষয়টির ওপর দীর্ঘ পর্যালোচনার পর নিশ্চিত হয়ে তারপর উত্তর দিতে বলতেন।
তিনি বেশি বেশি রোজা রাখতেন। চুপচাপ থাকতেন। কথা কম বলতেন।
আমি এই দুই ব্যক্তির মাধ্যমে যেভাবে অধিক পরিমাণে উপকৃত হয়েছি, আর কারও দ্বারা তেমন উপকৃত হতে পারিনি। এর দ্বারা আমি একটি জিনিস খুব ভালোভাবে বুঝেছি, আর তা হলো এই-
الدليل بالفعل أرشد من الدليل بالقول.
কথার প্রমাণের চেয়ে কাজের প্রমাণ অনেক বেশি কার্যকর ও হৃদয়গ্রাহী।
এছাড়াও আমি এমন অনেক শাইখকে দেখেছি, যাদের একান্ত সময়গুলো ছিল হাসি-মজাক ও বিলাসিতায় পূর্ণ। এ কারণে তাদের লিখিত ও সংরক্ষিত অসংখ্য কিতাব থাকা সত্ত্বেও তারা মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিতে পারেনি। তাদের জীবদ্দশায়ও মানুষরা তাদের দ্বারা বেশি উপকৃত হতে পারেনি। আর তাদের মৃত্যুর পর তো তারা মানুষের অন্তর থেকে একেবারেই মুছে গেছে। এ কারণে পরে আর কেউ তাদের সেসকল কিতাব ও রচনার দিকে দৃষ্টিপাতও করেনি।
আল্লাহর দোহাই! ইলমের সাথে আমল করো। কেননা, এটাই হলো মূল কাজ।
তার চেয়ে দুর্ভাগা আর কে আছে, যে তার গোটা জীবন ইলমের সাধনায় অতিবাহিত করল, কিন্তু আমল করল না? সে তো দুনিয়ার ভোগ-বিলাস থেকেও বঞ্চিত হলো, আবার আখেরাতের সমূহ কল্যাণের জন্যও কিছু করল না। আখেরাতে সে তো আমলে নিঃস্ব হয়ে উঠবেই- সেই সাথে নিজের বিপক্ষে নিজেই নিয়ে উঠবে এক শক্তিশালী দলিল।
📄 শান্তির ক্ষেত্রে নিজেকে নিরাপদ মনে না করা
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কত মহান ও ক্ষমতাধর!
তাকে যে চিনতে পেরেছে, সে তাকে ভয় করবেই। আর যে তার শাস্তি ও আজাব থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করছে, সে আসলে তাকে চিনতেই পারেনি। এ ব্যাপারে আমি একটি আশ্চর্য বিষয় চিন্তা করে বের করলাম। বিষয়টি হলো এই-
আল্লাহ তাআলা কখনো কাউকে এমনভাবে ঢিল দেন, যেন তাকে তিনি ছেড়েই দিয়েছেন। এভাবে জালেমের হাত বাড়তেই থাকে। তাকে যেন আটকে রাখার কেউ নেই। ক্রমে তার ঔদ্ধত্য বাড়তেই থাকে। এরপরও অন্তর ফিরে আসে না বা ভীত হয় না- তখন তিনি হঠাৎ তাকে তার ক্ষমতা দিয়ে কঠোরভাবে ধরে বসেন।
কিন্তু মাঝখানে এই যে তাকে অবকাশ দেওয়া, ঢিল দেওয়া- এর মাঝে দুটো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লুকিয়ে আছে-
১. জুলুমের মাধ্যমে ধৈর্যশীলদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া।
২. জালেমকে ফিরে আসার সুযোগ প্রদান করা।
এদিকে ধৈর্যশীলের ধৈর্যের কারণে তার ওপর আল্লাহর প্রতিদান নেমে আসে। আর জালেমের নিকৃষ্টতম কাজের আধিক্যের কারণে তার শাস্তিরও প্রবৃদ্ধি হতে থাকে।
আবার কখনো কখনো মানুষের নিকট জালেমের শাস্তির কারণটি মানুষের অগোচর থাকে। হঠাৎ তার ওপর শাস্তি দেখে মানুষরা বলাবলি করতে থাকে- অমুককে তো আমরা ভালো বলেই জানি। তার ওপর এ বিপদ আসার কী কারণ?
তখন অদৃশ্যের ভাগ্য এসে বলতে থাকে, এটি তার গোপন পাপের শাস্তি। তার সেই গোপন পাপ শাস্তির মাধ্যমে প্রকাশ্যে এসে গেল। আল্লাহ হলেন মহান সত্তা- যার কাছে কিছুই গোপন নেই। তাই শাস্তিও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বান্দা যদি তাওবা করে, তখন মানুষের গোনাহকে এমনভাবে গোপন করেন, যেন তিনি তা জানেনই না! আর অন্য মানুষের জানার প্রশ্নই ওঠে না।
কিন্তু তিনি কখনো কাউকে ঢিল দেন আর তাই দেখে জালেম আরও ভুল ও অবাধ্যতার মধ্যে অগ্রসর হয়। আবার তিনিই যখন ধরে বসেন, তার ভয়াবহতায় মানুষের অন্তর কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকে। ভয়ে বিহ্বল হয়ে পড়ে।
আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। আমিন।
📄 নফসকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া
আমি একবার ইলম, ইলমের ঝোঁক এবং তার চর্চায় মশগুল থাকা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলাম। লক্ষ করলাম—এগুলো অন্তরকে যেমন শক্তি প্রদান করে আবার মনের মধ্যে এক ধরনের কঠোরতাও সৃষ্টি করে।
অন্তরের শক্তির প্রয়োজন আছে। কারণ, অন্তরের এই শক্তি যদি না থাকত এবং তার একটি দীর্ঘ আশা না থাকত, তবে আর সে ইলমে মগ্ন থাকতে পারত না। যেমন, আমি হাদিস লিখি এবং এগুলো বর্ণনা করার আশা রাখি। এগুলো রচনা শুরু করেছি এবং সেগুলো শেষ করার প্রত্যাশা করি। আমি একটি দীর্ঘজীবন কামনা করি। আরও কত কত কাজ করার স্বপ্ন দেখি।
কিন্তু আমি যখন শুধু ‘মোআমালা’র বিষয়ে চিন্তা করি, তখন এসকল বাহ্যিক প্রত্যাশা কমে আসে। তখন শুধু আখেরাতের ভাবনা আসে। দুনিয়ার কাজের ব্যাপারে অন্তর দমে যায়। চোখ দিয়ে অশ্রু নামে। প্রার্থনায় নত হয়ে পড়ি। তখন মনের মধ্যে অন্য ধরনের এক প্রশান্তি অনুভব করি। আর অবস্থা এমন হয়—যেন আমি মোরাকাবার মধ্যে রয়েছি।
অবশ্যই আমি মানি, ইলম হলো সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল। সবচেয়ে মর্যাদার বিষয়। তার জন্য কিছু এদিক-সেদিক হলেও, ইলমের ব্যাপারে আমার কোনো অভিযোগ নেই।
আর ‘মোআমালা’— তাতেও অনেক উপকারিতা রয়েছে, যেগুলোর দিকে একটু আগে আমি নিজেই ইশারা করেছি, তবুও সেটা যেন এমন অলস ভীরু ব্যক্তির কাজ—যে শুধু নিজের অন্তরের পরিশুদ্ধি নিয়ে ব্যস্ত থাকে— অন্যের হেদায়াতের ব্যাপারে কিছুই করে না। নিজের নির্জনতা নিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। মানুষদের তাদের প্রতিপালকের সাথে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে না। আমার মনে হয়, এক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি হলো, আলেম ব্যক্তি সঠিকভাবে তার ইলমচর্চায় লেগে থাকবে—সাথে সাথে অন্তরকে মোরাকাবা ও মোশাহাদার চাবুকে মৃদু মৃদু আঘাত করবে। তবে এত প্রবল আঘাত করবে না— যাতে আবার পূর্ণভাবে ইলমচর্চায় মশগুল হতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু আমার অবস্থার কথা বলি—
আমি আমার অন্তরের দুর্বলতা ও অধিক কোমলতার কারণে অধিক কবর জিয়ারত এবং মুমূর্ষু ব্যক্তির নিকট উপস্থিত হওয়াকে পছন্দ করি না। কারণ, এটি আমার চিন্তার মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং ইলমচর্চা থেকে বের করে অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুর চিন্তার মধ্যে ফেলে দেয়। মনে হয়—আমি যেন আর বেঁচে থাকব না! বাহ্যিক কাজগুলো তখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে যায়।
তবে এক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, ওষুধ হতে হবে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী। এ কারণে যার অন্তর কিছুটা কঠোর ও কঠিন, যার কাছে এমন মোরাকাবা একেবারেই অনুপস্থিত—যা তাকে গোনাহ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে, তার জন্য উচিত হবে বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করা এবং মুমূর্ষু ব্যক্তিদের কাছে উপস্থিত হওয়া, কবর জিয়ারত করা এবং অন্তরকে নরম করার চেষ্টা করা।
কিন্তু যার অন্তর আগে থেকেই নরম ও কোমল, তার বিদ্যমান অবস্থাই তার যথেষ্ট। তাকে বরং এখন এমন কিছু ভালো কাজে ব্যস্ত হয়ে থাকা উচিত— যেগুলো তাকে আরও বেশি নরম হওয়া থেকে ভুলিয়ে রাখবে। যাতে সে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে এবং নিজের কাজ-কর্মের ক্ষেত্রে যত্নবান হতে পারে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও কখনো কখনো হাসি-মজাক করতেন। আয়েশা রা. এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন। গল্প করতেন। এভাবে নফসকে কিছুটা স্বস্তি ও বিশ্রাম দিতেন।
যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী অধ্যয়ন করেছে, সে বুঝবে, নফসকে স্বস্তি প্রদানের যে কথা আমি বলছি, তার প্রয়োজন আছে।