📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আরেফের গুণাবলি

📄 আরেফের গুণাবলি


দুনিয়া কিংবা আখেরাত-আরেফদের চেয়ে সুখী ও শান্তিপূর্ণ জীবন কারও নেই এবং হবেও না। কারণ, যারা আল্লাহ তাআলার মারেফাত অর্জন করেছে, তারা তার সাথে নির্জনে নিরালায় আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
যখন তাকে কোনো নিয়ামত প্রদান করা হয়, তখন সে বুঝতে পারে, কে তাকে এটা দিয়েছে। এবং যখন কোনো কষ্ট ও তিক্ততা আসে, তখন এই তিক্ততাও তার মুখে স্বাদ লাগে। কারণ, সে খুব ভালোভাবেই জানে, তাকে পরীক্ষাকারী মহান সত্তাটি কে!
সে যদি তার কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে প্রার্থনা করে আর তাতে সাড়াদানে বিলম্ব হয়, তখন সে তার আকাঙ্ক্ষাকে তার তাকদিরের ওপরই ছেড়ে দেয়। কারণ, সে তার রবের কল্যাণকামিতার কথা জানে এবং জানে তার হিকমতের কথাও। তার সবচেয়ে সুন্দর পরিচালনার প্রতি রয়েছে তার অটল বিশ্বাস।
একজন আরেফের গুণ হলো, সে তার রবের বিষয়ে সব সময় খেয়াল রাখে। যেন তার সমুখেই সে অবস্থান করে। তার প্রতি দৃঢ় ইয়াকিন রাখে। এবং তার এই মারেফাতের বরকত ও প্রভাব তার সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়।
আরেফ যদি কখনো কোনো কষ্টে আপতিত হয়, তবে সে কিছুতেই এই কষ্টের বস্তুগত কারণের দিকে তাকায় না। সে তো তাকিয়ে থাকে এটি প্রদানকারী মূল কর্তার দিকে। সে তার রবের ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে।
যখন সে চুপ থাকে, তখন সে তার সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার চিন্তা করে। যখন সে কথা বলে, তখন এমন কথাই বলে, যাতে সে তাকে সন্তুষ্ট করতে পারে। তার অন্তর কখনো স্ত্রী-সন্তান-স্বজনের দিকে মগ্ন থাকে না। এবং তার প্রভু ব্যতীত অন্য কারও ভালোবাসাতে হৃদয় ঝুলে থাকে না।
সে মানুষদের সাথে চলাফেরা ও আচরণ করে যেন শুধু শরীর দিয়ে- বাহ্যিক আকৃতি দিয়ে। কিন্তু তার অন্তর পড়ে থাকে সব সময় তার প্রতিপালকের দিকে। দুনিয়ার এসকল ভোগ-বিলাসের দিকে তার কোনো ঝোঁক নেই।
দুনিয়ার এই জীবন ছেড়ে যেতে তার কোনো দুঃখ নেই। কবরের ব্যাপারে তার কোনো অপরিচিতি নেই। বিচার দিবসের ব্যাপারেও তার আলাদা কোনো ভয় নেই।
কিন্তু যার মধ্যে তার প্রতিপালকের কোনো মারেফাত নেই, সম্পর্ক নেই, সে শুধু হোঁচট খায় আর যেকোনো বিপদ-মসিবতে বিচলিত হয়ে পড়ে। কেননা, বিপদ কে দিচ্ছেন, তার দিকে তার কোনো লক্ষ নেই। নিজের উদ্দেশ্য সাধিত না হলে সে বিগড়ে যায়। কারণ, সে আসল কল্যাণ সম্পর্কে অবগত নয়। সে তার সমজাতীয় মানুষদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। কেননা, তার এবং তার প্রতিপালকের মাঝে কোনো পরিচিতি-পরিচয় নেই। সে এই জগৎ থেকে আখেরাতের যাত্রাকে ভয় করে। কারণ, তার রাস্তার কোনো পাথেয় নেই। রাস্তা সম্পর্কে জ্ঞানও নেই।
এমন কত আলেম ও জাহেদ রয়েছে- যাদের হয়তো একজন সাধারণ মানুষের মতোও মারেফাত অর্জিত হয়নি। বরং একজন সাধারণ মানুষও তাদের চেয়ে বেশি মারেফাতের অধিকারী হয়ে পড়ে। তাছাড়া এমন কিছু সাধারণ ব্যক্তি আছে, যাদেরকে এমন মারেফাত দেওয়া হয়েছে, অনেক আলেম ও জাহেদ তাদের বহু চেষ্টা সত্ত্বেও সেখানে পৌঁছুতে পারেনি।
এটা আসলে তাকদির ও ভাগ্যের বিষয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে এই নিয়ামত দান করেন।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সত্যের পথে দূতের আনন্দ

📄 সত্যের পথে দূতের আনন্দ


হে তাকওয়ার মাধ্যমে উচ্চে আরোহণকারী ব্যক্তি, তুমি কিছুতেই গোনাহের মাধ্যমে এর মর্যাদা ভুলণ্ঠিত করো না। প্রবৃত্তির প্রচণ্ড কামনা, দ্বিপ্রহরের তীব্র তৃষ্ণায় তোমার অন্তর যদি যন্ত্রণায় ফেটে যেতে চায়, তাপে ঝলসে যেতে চায়—তবুও তুমি গোনাহের প্রলুব্ধকর তীব্রতার ওপর ধৈর্যধারণ করো। কারণ, এটাই হলো সবচেয়ে মর্যাদা কিংবা সবচেয়ে অধঃপতনের সীমারেখা। ঠিক এখানেই নির্ধারিত হয়ে আছে তোমার পতন কিংবা উত্থান।
আল্লাহর দোহাই! নিষিদ্ধ জিনিস থেকে বিরত থাকার আন্তরিক মিষ্টতা তুমি একবার চেখেই দেখো না! কারণ, এটি এমন একটি গাছ— যার ফল হলো দুনিয়া ও আখেরাতের সম্মান ও মর্যাদা। তোমার যখন প্রবৃত্তির পিপাসা খুব বেড়ে যায়, তখন তুমি তার কাছেই প্রার্থনা করো— যার কাছে রয়েছে পরিপূর্ণ তৃপ্তির উপকরণ। এবং প্রার্থনায় হাত উঠিয়ে বলো, কষ্টকর এই দিনগুলো কষ্টের মধ্যেই কেটে চলেছে, সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের দেখা তুমি আমাকে দাও হে প্রভু।
আল্লাহর ওয়াস্তে তুমি সেই ব্যক্তির কথা চিন্তা করো, যে তার প্রায় গোটা জীবন তাকওয়া ও আনুগত্যের মধ্যে অতিবাহিত করেছে; কিন্তু শেষ বয়সে কোনো পরীক্ষায় আপতিত হয়ে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে বসল—তবে তো তার সৌভাগ্যের তরী তীরে এসে ডুবে গেল!
এমন ব্যক্তির জন্য দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার কোনো আফসোস নেই। তার জন্য আফসোস হলো জান্নাতের। এই সর্বশেষ পরীক্ষাটায় উত্তীর্ণ হতে পারলেই তার জন্য জান্নাত ছিল অনিবার্য।
হায়, সে এই মুহূর্তটুকু তার অবৈধ প্রিয় বস্তু বা প্রিয় ব্যক্তিকে যদি একটু উপেক্ষা করতে পারত!
নতুবা হে ওই ব্যক্তি, যে নিজের প্রবৃত্তির চাহিদার ওপর মুহূর্তকাল ধৈর্যধারণ করতে পারো না, তুমি আমাকে বলো, তুমি আসলে কে? তোমার আমল কী? কতটুকু তোমার সম্মান ও মর্যাদা?
তুমি কি জানো, প্রকৃত বীর ও সাহসী পুরুষ কে?
প্রকৃত বীর ও সাহসী ব্যক্তি সে, যে কোনো নিরাপদ নির্জন নিরালায় কোনো হারামের মুখোমুখি হয়, জ্বলে ওঠে কামনার অগ্নি এবং তা নিরাপদে সম্পাদন করতেও সক্ষম হয়-কিন্তু ঠিক সেই সময় সে তার প্রতিপালকের দৃষ্টির প্রতি তার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং তার ভেতরে প্রতিপালকের অপছন্দনীয় কাজ করতে লজ্জার সৃষ্টি হয় এবং মুহূর্তের মধ্যে তৃষ্ণা তার বুকের মধ্য থেকে বিদূরীত করে দেয় এবং কাজটি থেকে সে বিরত হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে তার অবস্থা দেখলে মনে হবে, এ ব্যাপারে তার যেন আগ্রহই জন্মেনি, তার প্রবৃত্তি যেন তাকে এ ব্যাপারে প্ররোচিতই করেনি। আর সে যেন এটি সংঘটিত করতেও সক্ষমও ছিল না! অথচ শুধু আল্লাহ তাআলার ভয়ে সে এর থেকে বিরত থেকেছে সুবহানাল্লাহ!
আল্লাহর কসম, এভাবে গোনাহের ঝাপটা তোমার কাছেও আসবে, তুমি যদি ভেঙে পড়ো, তবে অধঃপতিত হবে। আর যদি আগের মতোই গোনাহের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারো, তবে প্রশংসনীয় ব্যক্তিদের কাতারে উঠে আসতে পারবে।
সুতরাং আল্লাহর জন্য তুমি তোমার ভালোগুলো ব্যয় করো। অবৈধ প্রবৃত্তি-চাহিদাগুলো ত্যাগ করো। কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করো। আর জেনে রাখো, তুমি এমন একজন আল্লাহর কর্মচারী-জীবনের সূর্য ডুবলেই যার হাত ভরে উঠবে পারিশ্রমিকের পুরস্কারে। সীমাহীন জীবনজুড়ে নেমে আসবে শ্রান্তি শেষের সুখ, শান্তি ও মর্যাদা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 হিকমতের রহস্য

📄 হিকমতের রহস্য


আকলের মাধ্যমে যখন চিন্তা করেছি, তখন তাতে আল্লাহ তাআলার সকল কার্যাবলি অনুধাবনে এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব অনুভব করেছি। কখনো কখনো তার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার কিছু হিকমতের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। যেমন, কিছু নির্মাণের পর আবার তার ধ্বংস। তখন আকলের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করে। আর ঠিক শয়তান এই সুযোগটিই গ্রহণ করে ওয়াসওয়াসা দিয়ে বলতে থাকে—এখানে কী হিকমত আছে দেখাও?
তখন আমি তাকে বলি, ধুর হ দুর্ভাগা, আমাকে আর তুই ধোঁকা দিতে আসিস না। এ যাবৎ আমি যা দেখেছি, তাতেই আমার রবের হিকমত ও কল্যাণকামনার সর্বোচ্চ দলিল আমার কাছে সাব্যস্ত হয়ে আছে। আর কিছু দরকার নেই।
হে নফস, এখন যদি তোমার নিকট কোনো কিছু বোঝার অস্পষ্টতা থাকে, তাহলে সেটা তোমার অনুধাবনের কমতির কারণেই হয়েছে। দুনিয়ার সামান্য-রাজা-বাদশাহর ক্ষেত্রেও এমন কত রহস্য ও গোপন বিষয় থাকে, যেগুলোর তুমি কিছুই জানো না। তাহলে তুমি এমন কী হয়ে পড়েছ যে, মহান রবের সকল রহস্য বা একান্ত বিষয়গুলো তুমি জেনে যাবে? সামগ্রিকভাবে তুমি যা কিছু জানো, এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট। সুতরাং যেগুলো তোমার অনুধাবনের বাইরে, তুমি সেগুলোর পেছনে পড়ো না।
মনে রেখো, তুমি হলে তার অসংখ্য অগণিত বিশাল সৃষ্টির মাঝে খুবই সামান্য ও ক্ষুদ্র একটি সৃষ্টি। সুতরাং তুমি কীভাবে তার ব্যাপারে বিরূপ হতে পারো, যার থেকে তোমার সৃষ্টি হয়েছে? যার থেকে তোমার প্রকাশ ঘটেছে? যিনি তোমার স্রষ্টা।
এছাড়া তোমার কাছে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে তার আরও কত হিকমত, তার বিধান এবং তার রাজ্য ও রাজত্ব, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার প্রকাশ। সুতরাং তোমার যতটুকু সম্ভব, সেগুলোর অনুধাবনের জন্য তুমি তোমার জ্ঞান-বুদ্ধি ও উপকরণ ব্যবহার করো। এগুলোই তোমাকে তার ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে পারবে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 নফসের সাথে জিহাদ

📄 নফসের সাথে জিহাদ


নফসের সাথে জিহাদ একটি অন্যরকম বিষয়। এতে খুব প্রজ্ঞা দূরদর্শিতা ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়।
কারণ, কিছুলোক নফসের লাগাম ছেড়ে দিয়ে তার সকল চাহিদা পূরণে লেগে পড়ে। এ কারণে তারা নিজেরা বিভিন্ন সমস্যা ও বিপদের মধ্যে আপতিত হয়। আবার কিছুলোক নফসের বিরোধিতায় খুবই বাড়াবাড়ি করে। নফসের সকল বৈধ অধিকার থেকেও তাকে বঞ্চিত করে। এমনকি তার ওপর জুলুমও করে।
তাদের এই জুলুমের কারণে তাদের ইবাদতের মধ্যেও বিরূপ প্রভাব পড়ে। কেউ হয়তো ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করে না। এতে তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে দেখা যায় আবশ্যক আমলগুলোও সে করতে সক্ষম হয় না। কেউ কেউ নির্জননিরালা বেছে নেয়। এতে মানুষদের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক-সংস্রব থাকে না। এগুলো তাদের বিভিন্ন ফরজ কিংবা শ্রেষ্ঠ কাজ থেকে বঞ্চিত করে রাখে। যেমন, রোগী দেখতে যাওয়া, পিতা-মাতার খেদমত, মানুষের সংশোধন। এভাবে নিজেও উপকৃত হওয়া এবং অন্যদের উপকৃত করা থেকে বঞ্চিত থাকে।
সঠিক ও আদর্শবান ব্যক্তি তো তিনি, যার থেকে মানুষ একনিষ্ঠতা, ঐকান্তিকতা এবং মৌলিক বিষয়াবলির জ্ঞান শিখতে পারে। মানুষদের মাঝেই অবস্থান করে। এবং নফসকে বৈধ বিষয়ের ক্ষেত্রে ছাড় দেয়, কিন্তু অবৈধ বিষয়ে ছাড় দেয় না। নফসের সাথে তার আচরণ হয় অতি ভারসাম্যপূর্ণ। যেমন, কোনো বাদশাহ তার কোনো সৈনিকের সাথে হাসি-তামাশা করেন। কিন্তু বিষয়টা যখন বেশি খোলামেলা এবং সীমা ছাড়িয়ে যেতে চায়, তিনি তখন আবার রাজসিক ক্ষমতা ও আভিজাত্যের গাম্ভীর্য দিয়ে পরিবেশ শান্ত করে আনেন।
একজন দূরদর্শী ও আদর্শবান ব্যক্তিও নফসের সাথে এমন আচরণ করেন। তার বৈধ প্রাপ্যগুলো তাকে বুঝিয়ে দেন। কিন্তু নিষেধিত বিষয়গুলো থেকে তাকে অতি কঠোরতার সাথে হলেও ফিরিয়ে রাখেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00