📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 নির্জন বিচ্ছিন্নতার প্রভাব

📄 নির্জন বিচ্ছিন্নতার প্রভাব


একবার আমি পূর্ণ নির্জনতার প্রত্যাশা নিয়ে খুব সকালে জাগ্রত হলাম এবং একাকী হাঁটতে শুরু করলাম। বহুদূর হাঁটার পর জনশূন্য একটি জায়গায় গেলাম। সেখানে কিছু আলেম ও সৎ ব্যক্তির দেখা পেলাম। এদের অনেকেই এই নির্জন এলাকায় দীর্ঘদিন বসবাস করছে। আমি তাদের একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কতদিন এখানে অবস্থান করছেন?
তিনি ইশারায় জানালেন, প্রায় চল্লিশ বছর।
তাকে আমি সেখানে একটি জীর্ণশীর্ণ অপরিচ্ছন্ন ঘরে বসবাস করতে দেখতে পেলাম। আমি তার এই দীর্ঘ সময় বিবাহহীন অতিবাহনের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করলাম। তখন, আমার নফস এটিকে খুবই অসাধারণ ও দৃঢ়তাপূর্ণ সৎ কাজ বলে ভাবতে শুরু করল। নফস ভীষণ প্রভাবিত হলো। সে তখন মনে মনে দুনিয়ার নিন্দা-মন্দ শুরু করে দিল। এবং দুনিয়ার বিষয়ে নিমগ্ন হওয়াকে তিরস্কার করল।
এসময় আমার ইলম আমার নফসের বিরোধিতায় জেগে ওঠল। শরিয়তের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যও আমার ইলমের সমর্থন জোগাল। এ কারণে আমি নফসকে ডেকে বলি, এখানে যে-সকল লোককে তুমি দেখছ, তারা দু-ভাগে বিভক্ত :
১. এদের একটি অংশ নিজের নফসের সাথে লড়াই করে এসকল কষ্টকর পরিস্থিতির ওপর ধৈর্যধারণ করে চলছে। কিন্তু এর কারণে তারা আহলে ইলমদের সান্নিধ্য ও সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সম্মিলিত আমল থেকে দূরে থাকছে। সন্তান প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্য মানুষদের উপকার করা থেকে বিরত থাকছে। এবং দ্বীনের প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের মজলিসে বসে নিজেদের উপকার করা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
এমনকি এভাবে একাকী অবস্থানের কারণে তাদের মধ্যে একধরনের অপরিচিত রুক্ষতা, হৃদয়হীনতা ও বন্যতা এসে যাচ্ছে। একাকী থেকে আরও বেশি একাকী ও নির্জন হয়ে উঠছে। কখনো শরীর ও মেজাজ নষ্ট হয়ে পড়ছে। এমনকি বিবাহহীন থাকার কারণে বীর্যের বহির্গমন না হওয়ায় সেটা আবদ্ধ থেকে শরীর ও মস্তিষ্কের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলছে।
কখনো কখনো এই সীমাহীন নির্জনতা তার মাঝে বিভিন্ন ধরনের ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করছে। নিজেকে কখনো সে ভাবছে 'ওলি' বলে। আলেমদের জ্ঞাত ইলমকে অনর্থক ভাবছে। কিংবা শয়তান কখনো তার কল্পনায় বিভিন্ন বিষয়ের অলৌকিক রূপায়ণ ঘটাচ্ছে আর সেগুলোকে সে নিজের কারামত ভাবছে।
কখনো সে ভাবছে, সে যা করছে, এটাই হলো দ্বীনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। কিন্তু সে আসলে বুঝছে না- সে অপছন্দের কতটা কাছাকাছি চলে গেছে।
কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষের একাকী থাকা নিষিদ্ধ করেছেন। অথচ এদের সকলে একাকী নির্জন বাস গ্রহণ করছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ থেকে বিরত থাকতে নিষেধ করেছেন। অথচ তারা বিবাহ থেকে বিরত রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'রাহবানিয়াত' বা এই সকল কৃচ্ছতা সাধন থেকে নিষেধ করেছেন। এগুলো হলো, শয়তানের এক গোপন ষড়যন্ত্রের অংশ- যার মাধ্যমে সে মানুষদের সূক্ষ্মভাবে ভ্রষ্টতার মধ্যে নিক্ষেপ করছে।
২. আর কিছু লোক এখানে রয়েছে, যারা খুবই বৃদ্ধ। জীবনের অন্যান্য প্রয়োজন ও চাহিদা যাদের রহিত হয়ে গেছে। তাদের বুঝ-বুদ্ধির সঠিক সক্ষমতা আর নেই। অথর্ব বয়সে উপনীত হয়েছে। এদের কথা ভিন্ন। এদেরকে তাদের অবস্থায় ছেড়ে দেওয়াই ভালো।
কিন্তু প্রথম শ্রেণি- যারা নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইলম, সম্মিলিত আমল ও উপার্জন থেকে নিজেদের একেবারে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। এরা দর্শনের পর অন্ধ হয়েছে। শারীরিক সক্ষমতা নিয়েও অথর্ব হয়ে বসে আছে।
আমার এসব কথা শুনে নফস আমাকে বলল, আমি তোমার এ কথার ওপর সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। তুমি তো ঝুঁকে আছ সুন্দর খাবার ও সুন্দর নারী বিবাহের দিকে। এই সকল ত্যাগের দিকে তো যাওনি। তাই নিজে তো আবেদ হলেই না। এখন আবার তাদের নিয়ে নিন্দায় মত্ত হয়ো না।
আমি নফসকে বললাম, তোমার যদি বুঝ থাকে, তবে তোমার সাথে কথা বলা যায়। আর যদি তুমি শুধু এদের বাহ্যিক কষ্ট ও অবস্থা দেখে প্রভাবিত হও, তবে আর তোমার সাথে কিসের আলোচনা!
জেনে রেখো, বিবাহের উদ্দেশ্য হলো মানুষের বংশধারা অব্যাহত রাখা। এবং শরীরের মধ্যে যে কষ্টদায়ক পদার্থের উদ্ভব হয়—তা থেকে নিষ্কৃতি লাভ করা। এর মাধ্যমে শরীর সুস্থ থাকে। ইবাদতে নির্মল মগ্নতা আসে। মন ভালো থাকে।
এরপর হলো দ্বীনের কাজের কথা। ইলমের ফজিলত ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। অথচ এই নির্জন নিরালার ‘জুহুদ’—এটা তো তার চৌকাটও পেরুতে সক্ষম নয়। তাহলে মানুষের মাঝে ইলম ও প্রজ্ঞার সাথে দ্বীনের কাজ করবে কে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, لأن يهدي الله بك رجلا خير لك مما طلعت عليه الشمس. জগতের যতকিছুর ওপর সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়, তোমার মাধ্যমে আল্লাহর একজন ব্যক্তির হেদায়াতপ্রাপ্ত হওয়া, তার সকল কিছু থেকে উত্তম। ৭০
জেনে রেখো নবীদের চেয়ে রাসুলদের শ্রেষ্ঠ হওয়ার কথা। স্মরণ রেখো, যে প্রাণী শিকার করতে পারে না, তার ওপর শিকারী প্রাণীর শ্রেষ্ঠত্বের কথা।
একটু ভেবে দেখো—মানুষদের মধ্যে অবস্থানকারী আলেমদের দ্বারা বহু মানুষ উপকৃত হয়েছে ও হচ্ছে। মানুষের দ্বীনের পরিশুদ্ধতা এসেছে। অন্যদিকে নির্জনতা অবলম্বনকারী মূর্খ জাহেদদের থেকে অন্যদের উপকৃত হওয়া তো দূরের কথা, তারা নিজেরাই ভ্রষ্ট হয়েছে।
আলেম যদি লোকদের মাঝে থেকেও শুধু নিজের খারাবি থেকে বিরত থাকে—এটাই তার জন্য যথেষ্ট। এতেই অনেকের উপকার হবে। তার কোনো নির্জনবাসের প্রয়োজন নেই।

টিকাঃ
৭০ সূত্র: পূর্বে চলে গেছে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 গোনাহের সমাপ্তি টানা

📄 গোনাহের সমাপ্তি টানা


প্রত্যেক বুদ্ধিমান ও সচেতন ব্যক্তির জন্য উচিত- গোনাহের পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক থাকা। কারণ, মানুষ ও আল্লাহর মাঝে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। কোনো বংশগত নৈকট্যও নেই। তিনি হলেন অবিচল একজন ইনসাফকারী। অটলভাবে সাম্যতা বিধানকারী। ন্যায়ের ওপর দণ্ডায়মান।
তাঁর দয়া ও রহম যদিও সকল গোনাহকে পরিব্যাপ্ত করে নিতে পারে- কিন্তু কথা হলো, তিনি যদি ক্ষমা করার ইচ্ছা করেন, তবে আকাশভরা সকল গোনাহই মাফ করে দেবেন। কিন্তু তিনি যদি ধরে বসেন, তবে সামান্য কোনো অপরাধও ধরে বসবেন। কেউ রক্ষা করতে পারবে না।
সুতরাং আবারও বলি, গোনাহের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করুন। গোনাহের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করুন।
আমি এমন অনেক মানুষকে দেখি, যারা সীমাহীন গোপন ও প্রকাশ্য গোনাহের মধ্যে লিপ্ত। তারা গোনাহ করতে করতে যেন ক্লান্ত হয়ে গেছে। তাদের এগুলো করার কারণ হলো, তারা আল্লাহ তাআলার পাকড়াওয়ের বিষয়টি হালকাভাবে নিয়েছে। তারা ধারণা করছে, তারা যে ভালো কাজগুলো করে যাচ্ছে, এগুলোই সেই গোনাহের সমপরিমাণ ও সমতুল্য হয়ে যাবে। এভাবেই তাদের ধারণার জাহাজ চলতে থেকেছে। কিন্তু কখন যে এখানে আল্লাহর কৌশলের পানি ঢুকে পড়েছে এবং জাহাজকে ডুবিয়েছে- তাদের কোনো খবরই নেই।
আমি আরও কিছু ব্যক্তিকে দেখেছি, যাদেরকে লোকেরা আলেম বলে, অথচ নির্জন নিরালায় তারাও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে না। নির্জনে তাদের সকল সুন্দর জিকির, বিনম্র নামাজ, সন্তুষ্টচিত্ত তেলাওয়াত- কিছুই থাকে না। এ কারণে তাদের অস্তিত্ব যেন না থাকারই মতো। এ কারণে তাদেরকে দর্শনের মাঝে মানুষের কোনো তৃপ্তি নেই। তাদের সাক্ষাতে অন্তরের কোনো আগ্রহ ও আকর্ষণ নেই।
আবারও বলি, সর্বক্ষণ আল্লাহর পর্যবেক্ষণের দিকে সতর্ক থাকা চাই। কারণ, হাশরের দিনের দাঁড়িপাল্লা এমনই সাম্যপূর্ণ হবে যে, সেখানে অণু পরিমাণ আমলও প্রকাশ পেয়ে যাবে। এবং অণু পরিমাণ ভুলের প্রতিদানও পাওয়া যাবে- বিলম্বে হলেও।
কেউ কেউ তার ভালো অবস্থা দেখে ধারণা করে- তার গোনাহ মাফ হয়ে গেছে। কিন্তু এটা হয়তো আল্লাহর পক্ষ থেকে অবকাশ- অব্যাহত গোনাহের কঠিন শাস্তির জন্য এই অবকাশ প্রদান। এটা ক্ষমা নয়।
আমরা আমাদের নির্জনতার বিষয়ে সতর্ক হই। আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সচেতন হই। আমাদের নিয়তের ব্যাপারে বিশুদ্ধ হই।
কেননা, আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বক্ষণ তোমাদের দেখা হচ্ছে। আর তোমরা তার দয়া ও অনুগ্রহের কারণে ধোঁকায় পড়ে থেকো না। কতজনকেই তো দুনিয়ার সাময়িক অবকাশ প্রদান করা হয়। এরপর শাস্তির মুখোমুখি করা হয়। তাই তোমরা তোমাদের গোনাহ ও অপরাধের দিকে লক্ষ রাখো। সেগুলোকে তাওবার মাধ্যমে মুছে ফেলার চেষ্টা করো।
গোনাহের ব্যাপারে লক্ষ রেখে আল্লাহর নিকট বিনয়াবনত হয়ে কাকুতি-মিনতি করার চেয়ে উপকারী কিছু নেই।
এগুলো এমন কিছু কথা, আল্লাহর দিকে তাকিয়ে যে ব্যক্তি এগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে, নিশ্চয় সে উপকৃত হবে। আল্লাহর এক বান্দা তার নিজের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন,
একবার আমার সামনে একটি গোনাহের ব্যাপার এলো- যা সংঘটন করতে আমি সক্ষম ছিলাম এবং যার আস্বাদন আমাকে প্ররোচিত করছিল এবং গোনাহটিও খুব বড় ছিল না। আমার নফস আমাকে সেদিকে প্ররোচিত করছিল- সেটির ক্ষুদ্রতা ও আল্লাহ তাআলার দয়া ও অনুগ্রহের বিশালতার কথা বলে।
তখন আমি আমার নফসকে বললাম, এটি যদি না করো, তবে তো তুমি তুমিই রয়ে গেলে। কিন্তু তুমি যদি এটি করে বসো, তখন তুমি কি আর শুভ্র রইলে?
এরপর নফসকে আমি এমন লোকদের অবস্থা স্মরণ করালাম, যারা নিজেদের ভুলের ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শন করেছিল। পরিণামে তাদের জিকির-আজকার সব দূর হয়ে গেল এবং এগুলো থেকে একসময় তারা মুখ ফিরিয়ে নিল।
এসকল কথায় আমার নফসও অবনত হলো এবং যে গোনাহের ইচ্ছা করেছিল, তা থেকে বিরত রইল।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 গোনাহকে ছোট মনে করা

📄 গোনাহকে ছোট মনে করা


মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে ভুল করে এবং এগুলোকে তারা সামান্য ধারণা করে। অথচ এটি খুবই খারাপ এক মানসিকতা। যেমন, ছাত্রদের কারও থেকে কিছু ধার নেওয়া, এরপর সেটা ফেরত না দেওয়া। কারও খাবারের সময়ে এই উদ্দেশ্যেই যাওয়া যে, তার সাথে বসে খাবে। স্বল্প ভুলেই কারও দিকে অবজ্ঞার চোখে তাকানো। না জেনেও ফতোয়া প্রদান করা—যাতে কেউ মূর্খ ধারণা না করে বসে।
এ ধরনের ভুল বা গোনাহকে ছোট মনে করা হয়। কিন্তু এগুলো আসলে অনেক বড় গোনাহ এবং খুবই ক্ষতিকর।
এমনকি এরচেয়েও ছোট ছোট ভুলও একজন ব্যক্তিকে মানুষদের মাঝে ব্যতিক্রমী মানুষের মর্যাদা থেকে নিচে নামিয়ে দেয়। আল্লাহর নিকট তার সম্মানের স্তর থেকে নিচে নেমে যায়। যুগের ভাষা যেন তাকে ডেকে ডেকে বলে, হে সেই ব্যক্তি, যে এত সামান্য বিষয়েও খিয়ানত করে বসো, তুমি কীভাবে বড় কোনো বিষয়ে দ্বীনদার ব্যক্তিদের পরিচালনায় তাদের সন্তুষ্টির আশা করো?
আমাদের একজন সালাফ বলেন, একবার আমি এক লোকমা খাবার ভুল করে খেয়ে ফেলেছিলাম, সেই থেকে আজ চল্লিশ বছর অধঃপাতের দিকেই চলেছি।
আল্লাহর ওয়াস্তে যারা এ রাস্তায় অভিজ্ঞ, তাদের কথা শোনো। সর্বদা সতর্ক থাকো। পরিণামের দিকে লক্ষ রাখো। আর নিষেধকারীর বড়ত্ব ও ক্ষমতার কথা স্মরণ রাখো—তিনি আমাদের স্রষ্টা ও রব। তাঁর ক্ষমতা অসীম। তাঁর শাস্তিও সহ্যের বাইরে। তাই সামান্য অহংকার থেকেও সতর্ক থাকো। সামান্য স্ফুলিঙ্গ থেকেও বেঁচে থাকো—কারণ, এই সামান্যটুকুও একটি পুরো দেশ পুড়িয়ে দিতে সক্ষম।
আমি এ বিষয়ে এখানে অতি অল্পকিছু উল্লেখ করলাম—যা অনেক কিছুর প্রতি ইশারা করছে। কিংবা সামান্য কিছু উদাহরণ পেশ করলাম, এর মাধ্যমে অন্য গোনাহের ক্ষেত্রগুলোকেও চিনে নাও।
ইলম এবং সতর্কতা- আমি যা হয়তো উল্লেখ করিনি, এ দুটো জিনিস তোমাকে সেগুলোর পরিচয় করিয়ে দেবে। তুমি যদি দূরদর্শিতার চোখে লক্ষ করো, তবে এ দুটি জিনিসই তোমাকে গোনাহের নিকৃষ্ট প্রভাব সম্পর্কে জানিয়ে দেবে।
সকল শক্তি ও সক্ষমতা এক আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আগে তাওবা তারপর প্রার্থনা

📄 আগে তাওবা তারপর প্রার্থনা


আমি আমার নফসের একটি আশ্চর্য বিষয় খেয়াল করেছি। সেটা হলো, সে আল্লাহ তাআলার নিকট তার প্রয়োজনগুলো প্রার্থনা করে-কিন্তু তার নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর কথা সে যেন ভুলেই থাকে!
আমি একদিন তাকে ডেকে বললাম, হে নিকৃষ্টতম নফস, তোমার মতো কেউ কি এ ধরনের প্রার্থনা-আবেদন করতে পারে? যদি কিছু প্রার্থনা করতে চাও, তবে তার কাছে আগে ক্ষমা প্রার্থনা করো। এত কিছু দাবি করার অধিকার কি তুমি রাখো?
নফস বলল, তাহলে আমি আমার প্রয়োজনের বিষয়গুলো কার কাছে প্রার্থনা করব?
আমি বললাম, আমি তোমাকে তোমার কাঙ্ক্ষিত বিষয়গুলো প্রার্থনা করতে নিষেধ করছি না। আমি শুধু বলতে চাচ্ছি, আগে তো প্রকৃতভাবে তাওবা করো- এরপর যা ইচ্ছা প্রার্থনা করো।
যেমন, পাপের উদ্দেশ্যে সফরকারীর ক্ষেত্রে আমরা বলি, সে যদি ক্ষুধার কারণে কোনো হারাম জিনিস খেতে বাধ্য হয়, তবুও তার জন্য তা খাওয়া জায়েজ নয়।
হ্যাঁ, এখন কেউ যদি আমাদের প্রশ্ন করে-তবে কি লোকটি না খেয়ে মারা যাবে?
আমরা তখন বলি, না-না খেয়ে মারা যাবে কেন? বরং প্রথমে নিজের কাজের ব্যাপারে তাওবা করবে-এরপর খেতে পারবে।
নতুবা এটা কত বড় দুঃসাহসের কথা বলুন, নিজের অঢেল গোনাহের কথা ভুলে থেকে, সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে আল্লাহর কাছে শুধু নিজের আবেদন-আবদার পেশ করা হবে! অথচ গোনাহের বিশালতা নিয়ে আগে তার মাথা নুইয়ে আসা দরকার ছিল।
আসল কাজ হলো, আগে তাওবা করা। গোনাহের কাজ থেকে ফিরে থাকার চেষ্টা করা। তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি যদি অতীতের গোনাহের বিষয়ে অনুতপ্ত হও, নিজেকে সংশোধন করে নাও, তবে দেখবে আপনাআপনিই তোমার আকাঙ্ক্ষা ও কামনাগুলো বাস্তবায়িত হয়ে যাবে। যেভাবে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ مَنْ شَغَلَهُ الْقُرْآنُ وَذِكْرِي عَنْ مَسْأَلَتِي أَعْطَيْتُهُ أَفْضَلَ مَا أُعْطِي السَّائِلِينَ.
হজরত সাইদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, যে ব্যক্তি কোরআন ও আমার জিকিরের মগ্নতায় আমার কাছে প্রার্থনার সুযোগ কম পায়, আমি তাকে যারা প্রার্থনা করে তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম জিনিস প্রদান করি। ৭১
হজরত বিশর হাফি রহ. দুআর জন্য হাত বাড়িয়ে দিতেন। এরপর আবার হাত গুটিয়ে নিয়ে বলতেন, গোনাহের এত প্রাচুর্য বিদ্যমান থাকা অবস্থায় আমার মতো মানুষ কি কিছু প্রার্থনা করার অধিকার রাখে!
অবশ্য বিশর হাফির এই অবস্থার কথা ভিন্ন। তার মারেফাতের আধিক্যের কারণে কখনো কখনো এমনটি তিনি করেছেন। তার প্রার্থনা ছিল এমন- যেন তিনি মুখোমুখি আল্লাহর কাছে চাচ্ছেন। এতটাই নৈকট্য অনুভব করতেন তিনি!
কিন্তু অন্যদের বিষয়- তারা তো মানসিকভাবেই অনেক দূর থেকে প্রার্থনা করে। তাদের মাঝে তো এই নৈকট্যের সৃষ্টি হয়নি। তাদের উচিত আকুল মনে আল্লাহ তাআলার নিকট নিজ গোনাহের জন্য মাফ চেয়ে নেওয়া। ক্ষমা প্রার্থনা করা।
যা কিছু বলা হলো, এগুলো বোঝার চেষ্টা করো এবং তাওবার দিকে ধাবিত হও। এছাড়া তোমার প্রার্থনার আরেকটি ভুল পদ্ধতি হলো, তুমি তোমার প্রার্থনার মধ্যে দুনিয়া ও আখেরাতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সংশোধনের প্রার্থনা না করে, শুধু প্রার্থনা করো বিভিন্ন ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশের বিষয়ে। আর দুনিয়ার প্রাপ্তি নিয়ে যেমন বেশি বেশি প্রার্থনা করো, তেমন তো অন্তর ও দ্বীনের সংশোধন নিয়ে প্রার্থনা করো না!
প্রতিপালকের কাছে তোমার এ কেমন প্রার্থনা! তুমি তোমার বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখো। অব্যাহত গাফলত ও ভ্রুক্ষেপহীনতায় ধীরে ধীরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়ে পড়েছ- এ বিষয়ে সচেতন হও। এখনই হও।
তুমি তোমার কামনা ও বাসনার চিন্তা বাদ রেখে, আগে তোমার স্খলন ও অপরাধ সম্পর্কে চিন্তিত হও। হজরত হাসান বসরি রহ. তার গোনাহের ব্যাপারে সব সময় প্রচণ্ড ভয়ের মধ্যে থাকতেন। একবার তাকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি এত ভয় পান কেন?
উত্তরে তিনি বলেন, আমার কোন কোন গোনাহ মাফ করা হয়নি, সে বিষয়ে আমার নিশ্চিত জ্ঞান নেই। হায়, কিয়ামতের মাঠে যদি আমাকে বলা হয়, যাও জাহান্নামে, তোমার এই এই গোনাহ এখনো ক্ষমা করা হয়নি, তখন আমার কী অবস্থা হবে!

টিকাঃ
৭১. সুনানে তিরমিজি: ১০/২৮৫০, পৃষ্ঠা: ১৬৯- মা. শামেলা

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00