📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 হেঁচটর স্থানে সতর্ক হও

📄 হেঁচটর স্থানে সতর্ক হও


আমি দেখেছি, যখনই কেউ কোথাও হোঁচট খায় কিংবা বৃষ্টি-কাদায় পিছলে পড়ে, তখন সে তার হোঁচট খাওয়া জায়গার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকায়। এটিই মানুষের স্বাভাবিক অভ্যাস। এই তাকানোর পেছনে দুটি কারণ থাকে।
১. ভবিষ্যতে এই স্থান বা পরিস্থিতি থেকে সতর্ক থাকা।
২. নিজের ভেতরে একটি কৌতূহল ও বিস্ময় কাজ করে- তার এত সতর্কতা ও সচেতনতা সত্ত্বেও এখানে সে হোঁচটটা খেল কীভাবে- জায়গাটি আসলে কেমন!
আমি মানুষের এই আচরণ থেকে একটি মূল্যবান ইশারা পেয়েছি। একটি শিক্ষা পেয়েছি। নিজেও মেনে চলি এবং অন্যদেরও সেই শিক্ষার কথা বলি, হে সেই ব্যক্তি, যে বারবার দ্বীনের পথে আছাড় খাও, হোঁচট খাও- তুমি কি একবারও তোমার হোঁচট খাওয়া স্থানের দিকে তাকিয়ে দেখো না, তাহলে বারবার তো এ ধরনের হোঁচট খাওয়া থেকে বেঁচে থাকতে পারতে?
হে নিজেকে পঙ্কিলকারী, তুমি তোমার পঙ্কিলতার স্থান সম্পর্কে সতর্ক হও না কেন? তাহলে তুমি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ও পরিস্থিতি থেকে বেঁচে থাকতে পারতে!
তোমার কী আশ্চর্য রকম দুর্ভাগ্য- তুমি কীভাবে একইভাবে বারবার অমুক-অমুক গোনাহে হোঁচট খেলে?! কেমন প্রতারণায় বেহুঁশ হয়ে রইলে যে নিজের বুদ্ধি দিয়ে তার মর্ম বুঝলে না? চিন্তার চোখ দিয়ে তার লক্ষ্য দেখলে না? কীভাবে তুমি অস্থায়ীকে স্থায়িত্বের ওপর প্রাধান্য দিলে? কীভাবে প্রবল শাস্তির ওপর সাময়িক উৎফুল্লতাকে গ্রহণ করে নিলে?
আহা! সাময়িক উত্তেজনার বিনিময়ে তুমি এমন লাঞ্ছনা কিনে নিলে, যা কোনো পিঠ বহন করতে সক্ষম নয়। উচ্চ মাথাকে অবনত করে দিলে। চোখ থেকে বিরামহীন অশ্রু প্রবাহের ব্যবস্থা করে নিলে। এসকল অবস্থা যেন তোমাকে বারবার ডেকে ডেকে বলছে-
তুমি এটা কেন করলে?
কী জন্য করলে?
কিসের বিনিময়ে করলে?
কিয়ামতের মাঠে হিসাবের পাল্লার কথা তোমার কি একটিবারের জন্যও স্মরণ হলো না?

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 তাকওয়ার প্রতিদান

📄 তাকওয়ার প্রতিদান


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ﴿فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَى আর যে আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে, সে বিপথগামী হবে না এবং দুঃখগ্রস্ত হবে না। [সুরা তোয়াহা : ১২৩]
আমি আল্লাহর তাআলার এই বাণী নিয়ে চিন্তা করলাম। তাফসিরকারকগণ বলেন, এখানে ‘হিদায়াত’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রাসুল ও কিতাবের অনুসরণ। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর কোরআন ও রাসুলের সুন্নতের অনুসরণ করে চলবে, নিঃসন্দেহে সে পথভ্রষ্টতা থেকে নিরাপদ থাকবে এবং আখেরাতের কষ্ট তার থেকে দূরে থাকবে।
ঠিক একইভাবে তার দুনিয়ার কষ্টও আর থাকবে না। এটা বুঝে আসে আল্লাহ তাআলার এই বাণীর মাধ্যমে- তিনি ইরশাদ করেন, وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا) যে-কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে উত্তরণের কোনো পথ তৈরি করে দেবেন। [সুরা তালাক : ২]
অতএব, তুমি যদি এমন ব্যক্তিকে কখনো কোনো কষ্টের মাঝেও দেখতে পাও, তবু এতে ধৈর্যধারণে যে পুরস্কার নিহিত রয়েছে, সে বিষয়ে তার নিশ্চিত বিশ্বাস থাকার কারণে তিক্ত-কষ্টকেও তার কাছে মধুর মতো মিষ্ট অনুভব হয়।
তাছাড়া এ ধরনের লোক একটি অন্যরকম সুখময় জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়। তার ওপর বিপদ-আপদ কম আসে। তবে কখনো যদি কোনো কাজের ক্ষেত্রে তাকওয়া থেকে দূরে সরে যায়- তাহলে দ্রুতই বিপদে আপতিত হয়ে পড়ে। কিন্তু সর্বক্ষণ যে তাকওয়ার পথ অবলম্বন করে থাকে, তার নিকট বিপদ আসে না। তার কোনো বিপর্যয় ঘটে না। এটিই সাধারণ নিয়ম। নতুবা কখনো যদি তাকওয়ার অবস্থায় কোনো বিপদ আসে, তাহলে সেটা তার পূর্বের কোনো গোনাহের কারণে আসে।
এরপরও যদি তার ওপর কোনো বিপদ আপতিত হয়, সেটাকে সে প্রতিপালকের পক্ষ থেকে নিয়ামত মনে করে। বিপদে সে কোনো কষ্টই অনুভব করে না।
হজরত শিবলী রহ. বলেন, أحبك الناس لنعمائك، وأنا أحبك لبلائك. খোদা হে, মানুষ তোমাকে তোমার নিয়ামতের কারণে ভালোবাসে। আর আমি তোমাকে ভালোবাসি তোমার প্রদত্ত বিপদের কারণে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 গোনাহের প্রভাব

📄 গোনাহের প্রভাব


উদাসী মত্ততায় মাতাল হওয়া ছাড়া কোনো গোনাহে পূর্ণ লাজ্জত বা পরিপূর্ণ স্বাদ উপভোগ করা সম্ভব নয়। আর মুমিন ব্যক্তি তো গোনাহের স্বাদ পেতেই পারে না। কারণ, গোনাহের স্বাদ আস্বাদনের সময় তার নিকট উপস্থিত হয় এর হারামের জ্ঞান এবং শাস্তির সতর্কতা। আর তার জ্ঞানটা যদি আরও প্রবল ও ব্যাপক হয়, তবে তো সে তার ইলমের চোখ দিয়ে নিষেধের তীব্রতা অনুভব করতে থাকে, তখন তার থেকে সকল আস্বাদনের মজা ও স্ফূর্তি দূর হয়ে যায়।
কিন্তু কখনো যদি প্রবৃত্তির মত্ততা প্রবল হয়ে ওঠে এবং গোনাহে লিপ্ত হয়, তবুও তার অন্তর এসকল চিন্তার কারণে ম্রিয়মাণ হয়ে থাকে। গোনাহের কামনা প্রবল হয়ে ওঠে-কিন্তু তা খুবই অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু যখন সকল উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে যায়, পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে-তখন এর পরিণামের চিন্তা লাফ দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন শুরু হয় অব্যাহত আফসোস ক্রন্দন ও অনুশোচনা। এমনকি কান্না ও তাওবার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মাগফিরাতের বিষয়টি নিশ্চিত হলেও চারপাশের মানুষের তিরস্কার ও ধিক্কার অব্যাহত থেকেই যায়। নিকৃষ্ট সংবাদটি চারপাশে জানাজানি হয়ে যায়। এর একটি পঙ্কিল প্রভাব রয়ে যায় সারাজীবন।
তাই মানুষের গাফলাত ও বেহুঁশ মত্ততা থাকে যতটুকু- ততটুকুই শুধু কেউ গোনাহের লাজ্জত বা স্বাদ অনুভব করে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 নির্জন বিচ্ছিন্নতার প্রভাব

📄 নির্জন বিচ্ছিন্নতার প্রভাব


একবার আমি পূর্ণ নির্জনতার প্রত্যাশা নিয়ে খুব সকালে জাগ্রত হলাম এবং একাকী হাঁটতে শুরু করলাম। বহুদূর হাঁটার পর জনশূন্য একটি জায়গায় গেলাম। সেখানে কিছু আলেম ও সৎ ব্যক্তির দেখা পেলাম। এদের অনেকেই এই নির্জন এলাকায় দীর্ঘদিন বসবাস করছে। আমি তাদের একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কতদিন এখানে অবস্থান করছেন?
তিনি ইশারায় জানালেন, প্রায় চল্লিশ বছর।
তাকে আমি সেখানে একটি জীর্ণশীর্ণ অপরিচ্ছন্ন ঘরে বসবাস করতে দেখতে পেলাম। আমি তার এই দীর্ঘ সময় বিবাহহীন অতিবাহনের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করলাম। তখন, আমার নফস এটিকে খুবই অসাধারণ ও দৃঢ়তাপূর্ণ সৎ কাজ বলে ভাবতে শুরু করল। নফস ভীষণ প্রভাবিত হলো। সে তখন মনে মনে দুনিয়ার নিন্দা-মন্দ শুরু করে দিল। এবং দুনিয়ার বিষয়ে নিমগ্ন হওয়াকে তিরস্কার করল।
এসময় আমার ইলম আমার নফসের বিরোধিতায় জেগে ওঠল। শরিয়তের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যও আমার ইলমের সমর্থন জোগাল। এ কারণে আমি নফসকে ডেকে বলি, এখানে যে-সকল লোককে তুমি দেখছ, তারা দু-ভাগে বিভক্ত :
১. এদের একটি অংশ নিজের নফসের সাথে লড়াই করে এসকল কষ্টকর পরিস্থিতির ওপর ধৈর্যধারণ করে চলছে। কিন্তু এর কারণে তারা আহলে ইলমদের সান্নিধ্য ও সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সম্মিলিত আমল থেকে দূরে থাকছে। সন্তান প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্য মানুষদের উপকার করা থেকে বিরত থাকছে। এবং দ্বীনের প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের মজলিসে বসে নিজেদের উপকার করা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
এমনকি এভাবে একাকী অবস্থানের কারণে তাদের মধ্যে একধরনের অপরিচিত রুক্ষতা, হৃদয়হীনতা ও বন্যতা এসে যাচ্ছে। একাকী থেকে আরও বেশি একাকী ও নির্জন হয়ে উঠছে। কখনো শরীর ও মেজাজ নষ্ট হয়ে পড়ছে। এমনকি বিবাহহীন থাকার কারণে বীর্যের বহির্গমন না হওয়ায় সেটা আবদ্ধ থেকে শরীর ও মস্তিষ্কের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলছে।
কখনো কখনো এই সীমাহীন নির্জনতা তার মাঝে বিভিন্ন ধরনের ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করছে। নিজেকে কখনো সে ভাবছে 'ওলি' বলে। আলেমদের জ্ঞাত ইলমকে অনর্থক ভাবছে। কিংবা শয়তান কখনো তার কল্পনায় বিভিন্ন বিষয়ের অলৌকিক রূপায়ণ ঘটাচ্ছে আর সেগুলোকে সে নিজের কারামত ভাবছে।
কখনো সে ভাবছে, সে যা করছে, এটাই হলো দ্বীনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। কিন্তু সে আসলে বুঝছে না- সে অপছন্দের কতটা কাছাকাছি চলে গেছে।
কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষের একাকী থাকা নিষিদ্ধ করেছেন। অথচ এদের সকলে একাকী নির্জন বাস গ্রহণ করছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ থেকে বিরত থাকতে নিষেধ করেছেন। অথচ তারা বিবাহ থেকে বিরত রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'রাহবানিয়াত' বা এই সকল কৃচ্ছতা সাধন থেকে নিষেধ করেছেন। এগুলো হলো, শয়তানের এক গোপন ষড়যন্ত্রের অংশ- যার মাধ্যমে সে মানুষদের সূক্ষ্মভাবে ভ্রষ্টতার মধ্যে নিক্ষেপ করছে।
২. আর কিছু লোক এখানে রয়েছে, যারা খুবই বৃদ্ধ। জীবনের অন্যান্য প্রয়োজন ও চাহিদা যাদের রহিত হয়ে গেছে। তাদের বুঝ-বুদ্ধির সঠিক সক্ষমতা আর নেই। অথর্ব বয়সে উপনীত হয়েছে। এদের কথা ভিন্ন। এদেরকে তাদের অবস্থায় ছেড়ে দেওয়াই ভালো।
কিন্তু প্রথম শ্রেণি- যারা নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইলম, সম্মিলিত আমল ও উপার্জন থেকে নিজেদের একেবারে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। এরা দর্শনের পর অন্ধ হয়েছে। শারীরিক সক্ষমতা নিয়েও অথর্ব হয়ে বসে আছে।
আমার এসব কথা শুনে নফস আমাকে বলল, আমি তোমার এ কথার ওপর সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। তুমি তো ঝুঁকে আছ সুন্দর খাবার ও সুন্দর নারী বিবাহের দিকে। এই সকল ত্যাগের দিকে তো যাওনি। তাই নিজে তো আবেদ হলেই না। এখন আবার তাদের নিয়ে নিন্দায় মত্ত হয়ো না।
আমি নফসকে বললাম, তোমার যদি বুঝ থাকে, তবে তোমার সাথে কথা বলা যায়। আর যদি তুমি শুধু এদের বাহ্যিক কষ্ট ও অবস্থা দেখে প্রভাবিত হও, তবে আর তোমার সাথে কিসের আলোচনা!
জেনে রেখো, বিবাহের উদ্দেশ্য হলো মানুষের বংশধারা অব্যাহত রাখা। এবং শরীরের মধ্যে যে কষ্টদায়ক পদার্থের উদ্ভব হয়—তা থেকে নিষ্কৃতি লাভ করা। এর মাধ্যমে শরীর সুস্থ থাকে। ইবাদতে নির্মল মগ্নতা আসে। মন ভালো থাকে।
এরপর হলো দ্বীনের কাজের কথা। ইলমের ফজিলত ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। অথচ এই নির্জন নিরালার ‘জুহুদ’—এটা তো তার চৌকাটও পেরুতে সক্ষম নয়। তাহলে মানুষের মাঝে ইলম ও প্রজ্ঞার সাথে দ্বীনের কাজ করবে কে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, لأن يهدي الله بك رجلا خير لك مما طلعت عليه الشمس. জগতের যতকিছুর ওপর সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়, তোমার মাধ্যমে আল্লাহর একজন ব্যক্তির হেদায়াতপ্রাপ্ত হওয়া, তার সকল কিছু থেকে উত্তম। ৭০
জেনে রেখো নবীদের চেয়ে রাসুলদের শ্রেষ্ঠ হওয়ার কথা। স্মরণ রেখো, যে প্রাণী শিকার করতে পারে না, তার ওপর শিকারী প্রাণীর শ্রেষ্ঠত্বের কথা।
একটু ভেবে দেখো—মানুষদের মধ্যে অবস্থানকারী আলেমদের দ্বারা বহু মানুষ উপকৃত হয়েছে ও হচ্ছে। মানুষের দ্বীনের পরিশুদ্ধতা এসেছে। অন্যদিকে নির্জনতা অবলম্বনকারী মূর্খ জাহেদদের থেকে অন্যদের উপকৃত হওয়া তো দূরের কথা, তারা নিজেরাই ভ্রষ্ট হয়েছে।
আলেম যদি লোকদের মাঝে থেকেও শুধু নিজের খারাবি থেকে বিরত থাকে—এটাই তার জন্য যথেষ্ট। এতেই অনেকের উপকার হবে। তার কোনো নির্জনবাসের প্রয়োজন নেই।

টিকাঃ
৭০ সূত্র: পূর্বে চলে গেছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00