📄 রবের সাথে সম্পর্ক স্থাপন
বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত, সর্বক্ষণ তার প্রতিপালকের দরজা ধরে রাখা। এবং তার ডাকে সাড়া দেওয়া হোক বা না হোক- কিছুতেই রবের অনুগ্রহ ও দয়া থেকে নিরাশ না হওয়া। বরং সে নির্জনে-নিরালায় ইবাদত ও প্রার্থনার মাধ্যমে তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে। তার সাথে যদি অপরিচিতি বা সম্পর্কহীনতার সৃষ্টি হয়, তবে দ্রুতই সেটি দূর করে নেওয়ার চেষ্টা করবে। যেমন এক কবি বলেন,
أمستوحش أنت مما جنيت فأحسن إذا شئت واستأنس
তুমি কি তোমার অপরাধের কারণে বড়ই সম্পর্কহীন পেরেশান? তাহলে যদি চাও, সৎ কর্ম করো এবং সম্পর্কের দিকে হও আগুয়ান।
কোনো ব্যক্তি যদি দেখে তার অন্তর দুনিয়ার দিকে ধাবিত, তাহলে দুনিয়ার বিষয়াদিও প্রভুর কাছেই প্রার্থনা করবে। আর যদি দেখে আখেরাতের দিকে ধাবিত, তাহলে সে যেন আখেরাতের আমলের তাওফিক তার কাছেই প্রার্থনা করে। এরপর সে দুনিয়ার জন্য যা কামনা করছে, তাতে যদি ক্ষতির আশঙ্কা করে, তবে সে তার অন্তর বিশুদ্ধ করার জন্যও তার কাছেই প্রার্থনা করবে। তার অন্তরের রোগ নিরাময়ের জন্য তার কাছেই চাইবে। কারণ, অন্তর যদি ঠিক হয়ে যায়, তাহলে সে এমন কিছু আর কামনা করবে না, যা তার দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর কিংবা যা তার শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
যে ব্যক্তি এভাবে চলতে পারবে, সে একটি প্রাচুর্যপূর্ণ সুখী জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে।
হ্যাঁ, তবে তাকে এই অবস্থানের জন্য সার্বক্ষণিক তাকওয়া অর্জন করতে হবে। কারণ, তাকওয়া ছাড়া কিছুতেই প্রতিপালকের সাথে সম্পর্ক স্থাপন হবে না। হওয়া সম্ভব নয়। আর তাকওয়া অবলম্বনকারীরা সবকিছু থেকে বিরত থাকতে পারে; কিন্তু আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা ও আশ্রয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকে না।
বর্ণনা পাওয়া যায়-
বীরযোদ্ধা কুতাইবা ইবনে মুসলিহ রহ. যখন তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কাতারবদ্ধ হলেন, শত্রুপক্ষের এই বিশাল বাহিনীর সাথে লড়াই তাকে ভাবিয়ে তুলছিল। তিনি তখন অন্যদের জিজ্ঞাসা করলেন, মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসে কোথায়?
পাশের লোকেরা জানাল- তিনি ডান দিকের শেষপ্রান্তে নিজের ধনুকের তিরের ওপর ঝুঁকে আঙুল দিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করছেন।
হজরত কুতাইবা রহ. বললেন, আমার কাছে এই শূন্য আঙুল হাজার প্রশিক্ষিত তরবারি থেকে বেশি প্রিয়। হাজারো তীক্ষ্ণ বর্শার ফলা থেকে বেশি উপকারী।
এরপর যুদ্ধ শুরু হলো। তিনি তুর্কিদের ওপর বিজয়ী হলেন। যুদ্ধ শেষে হজরত কুতাইবা রহ. মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসেকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এভাবে আকাশের দিকে হাতের ইশারা করে কী করছিলেন?
মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসে বললেন, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার জন্য বিজয়ের সকল পথ ও পদ্ধতি জমা করে দিচ্ছিলাম।
📄 নিয়ামত ক্ষেত্রে প্রান্ততা প্রদর্শন
যে ব্যক্তিকে আল্লাহ দুনিয়াবি নিয়ামত দিয়েছেন, সে যেন এটাকে খুব বিচক্ষণতার সাথে ব্যবহার করে। বেশি কৃপণতা করবে না; বরং নিয়ামতের কিছুটা প্রকাশ যেন তার জীবনযাপনে থাকে। আবার খুব বেশি খরচ করবে না এবং প্রকাশ করে বেড়াবে না। সকলের কাছে সকল সম্পদের কথা প্রকাশও করবে না।
কিন্তু মানুষের প্রকৃতিই এমন যে, সম্পদ অর্জিত হলে তা অন্য মানুষের কাছে প্রকাশ করে বেড়ায়। এটি নফসের একটি গোপন আনন্দ ও স্বাদ গ্রহণের বিষয়। কিন্তু এটাকে নিয়ন্ত্রণ রাখা একটি প্রশংসনীয় ও কল্যাণকর স্বভাব- অসাধারণ চারিত্রিক দৃঢ়তা না থাকলে যা করা সম্ভব হয় না। সকলে এটা পারেও না। অথচ এতেই রয়েছে সমূহ কল্যাণ। তাছাড়া অধিক প্রকাশে চোখ লাগে, অনিষ্ট হয়- এটা সত্য। এটাকে আমরা এভাবে বুঝতে পারি-
আমার হয়তো অনেক সম্পদ হয়েছে- এটা মানুষের কাছে প্রকাশ করে বেড়াতে আমার ভালো লাগে। নফস চায়- মানুষ দেখুক, আমার কত সম্পদ। দেখাতে ভালো লাগে।
কিন্তু আমাকে এর পরিণতি নিয়েও ভাবা উচিত। অধিক সম্পদের কথা যদি আমি আমার কোনো বন্ধুর কাছে প্রকাশ করি- গোপনে সে আমার প্রতি ঈর্ষান্বিত- এমনকি রাগান্বিত হয়ে উঠতে পারে। কিংবা বিষয়টা নিজেদের মাঝে একটা দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে- এমনকি তাকে বন্ধু থেকে শত্রুও বানিয়ে দিতে পারে।
আর যদি আমি তা আমার কোনো শত্রুর নিকট প্রকাশ করি, তবে নিশ্চয় তাতে চোখ লাগবে, হিংসার কারণ হয়ে উঠবে। সে তা ধ্বংসের চেষ্টা করবে। এটা আমার ক্ষতির কারণ হবে।
সম্পদ বা কল্যাণের কথায় হিংসা থেকে মুক্ত পরিবেশ আমি তেমন কখনো দেখিনি। এটাই হলো মূলনীতি, শত্রুর নিকট সমস্যা ও অনটনের কথা বলা হলে, শত্রু মনে মনে তৃপ্তি পাবে। আর যদি সুখ ও স্বচ্ছলতার কথা বলা হয়, তবে সীমাহীন হিংসা করবে।
তাহলে কেন প্রয়োজন এই অনর্থক আত্মপ্রকাশ!
তাছাড়া সকল ক্ষেত্রেই নিজের বিষয়গুলো অপ্রকাশিত রাখা একটি চারিত্রিক দৃঢ়তার ব্যাপার- এটা সকলে পারে না। কিন্তু অনেক স্থানেই এটিই কল্যাণকর। যেমন ধরো, কেউ কোথাও অপ্রয়োজনে তার বয়সের কথা প্রকাশ করল, সেখানে অন্যদের চেয়ে তার বয়স বেশি হলে, সকলেই তখন তাকে বয়োবৃদ্ধ জীর্ণ অথর্ব ভাবতে শুরু করবে। আবার বয়স কম হলে, অন্যরা তাচ্ছিল্যের চোখে দেখতে পারে।
এমনকি কোথাও অনর্থক নিজের বিশ্বাস ও মতবাদের কথা প্রকাশ করাও উচিত নয়। তাহলে সেখানে তার মতের বিরোধীরা তার শত্রুতে পরিণত হবে।
কিংবা কোথাও নিজের সম্পদের কথা প্রকাশ করে দিলো- সম্পদ যদি উপস্থিত ব্যক্তিদের থেকে তুলনামূলক কম হয়, অন্যরা তুচ্ছ ভাববে। আর যদি বেশি হয়, হিংসা করবে।
আর ঠিক এই তিনটি বিষয় নিয়ে এক কবি বলেন,
احفظ لسانك لا تبح بثلاثة سن ومال من ما استطعت ومذهب
فعلى الثلاثة تبتلى بثلاثة بمموه وبمخرق و مکذب
নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করো। তিনটি জিনিস করো না ফাঁস- তোমার বয়স, তোমার সম্পদ এবং আদর্শ।
অন্যথায় এই তিনটির ক্ষেত্রে পড়বে তিনটি সমস্যায়- হবে প্রতারিত, করবে অনিষ্ট, অবিশ্বাস করবে তোমায়।
এখানে সংক্ষেপে ও ইশারায় যা কিছু উল্লেখ করলাম, এটা দিয়েই নিজের অন্য বিষয়গুলো অনুমান করে নাও। অর্থাৎ তুমি কিছুতেই সেই গল্পকার ও পেটপাতলা লোকদের মতো হয়ো না, যারা এমন লোকদের কাছে গল্প করে বেড়ায়, অচিরেই সেগুলো তারা জায়গায়-অজায়গায় যেখানে-সেখানে ছড়িয়ে বেড়াবে- পরিণতিতে যা শুধু ক্ষতিই ডেকে আনবে।
প্রবাদ আছে, رب كلمة جرى بها اللسان، هلك بها الانسان.
মনে রেখো, মানুষের মুখে কখনো এমন কথা এসে যায়, যা তার ধ্বংসের কারণ হয়।
📄 হেঁচটর স্থানে সতর্ক হও
আমি দেখেছি, যখনই কেউ কোথাও হোঁচট খায় কিংবা বৃষ্টি-কাদায় পিছলে পড়ে, তখন সে তার হোঁচট খাওয়া জায়গার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকায়। এটিই মানুষের স্বাভাবিক অভ্যাস। এই তাকানোর পেছনে দুটি কারণ থাকে।
১. ভবিষ্যতে এই স্থান বা পরিস্থিতি থেকে সতর্ক থাকা।
২. নিজের ভেতরে একটি কৌতূহল ও বিস্ময় কাজ করে- তার এত সতর্কতা ও সচেতনতা সত্ত্বেও এখানে সে হোঁচটটা খেল কীভাবে- জায়গাটি আসলে কেমন!
আমি মানুষের এই আচরণ থেকে একটি মূল্যবান ইশারা পেয়েছি। একটি শিক্ষা পেয়েছি। নিজেও মেনে চলি এবং অন্যদেরও সেই শিক্ষার কথা বলি, হে সেই ব্যক্তি, যে বারবার দ্বীনের পথে আছাড় খাও, হোঁচট খাও- তুমি কি একবারও তোমার হোঁচট খাওয়া স্থানের দিকে তাকিয়ে দেখো না, তাহলে বারবার তো এ ধরনের হোঁচট খাওয়া থেকে বেঁচে থাকতে পারতে?
হে নিজেকে পঙ্কিলকারী, তুমি তোমার পঙ্কিলতার স্থান সম্পর্কে সতর্ক হও না কেন? তাহলে তুমি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ও পরিস্থিতি থেকে বেঁচে থাকতে পারতে!
তোমার কী আশ্চর্য রকম দুর্ভাগ্য- তুমি কীভাবে একইভাবে বারবার অমুক-অমুক গোনাহে হোঁচট খেলে?! কেমন প্রতারণায় বেহুঁশ হয়ে রইলে যে নিজের বুদ্ধি দিয়ে তার মর্ম বুঝলে না? চিন্তার চোখ দিয়ে তার লক্ষ্য দেখলে না? কীভাবে তুমি অস্থায়ীকে স্থায়িত্বের ওপর প্রাধান্য দিলে? কীভাবে প্রবল শাস্তির ওপর সাময়িক উৎফুল্লতাকে গ্রহণ করে নিলে?
আহা! সাময়িক উত্তেজনার বিনিময়ে তুমি এমন লাঞ্ছনা কিনে নিলে, যা কোনো পিঠ বহন করতে সক্ষম নয়। উচ্চ মাথাকে অবনত করে দিলে। চোখ থেকে বিরামহীন অশ্রু প্রবাহের ব্যবস্থা করে নিলে। এসকল অবস্থা যেন তোমাকে বারবার ডেকে ডেকে বলছে-
তুমি এটা কেন করলে?
কী জন্য করলে?
কিসের বিনিময়ে করলে?
কিয়ামতের মাঠে হিসাবের পাল্লার কথা তোমার কি একটিবারের জন্যও স্মরণ হলো না?
📄 তাকওয়ার প্রতিদান
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ﴿فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَى আর যে আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে, সে বিপথগামী হবে না এবং দুঃখগ্রস্ত হবে না। [সুরা তোয়াহা : ১২৩]
আমি আল্লাহর তাআলার এই বাণী নিয়ে চিন্তা করলাম। তাফসিরকারকগণ বলেন, এখানে ‘হিদায়াত’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রাসুল ও কিতাবের অনুসরণ। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর কোরআন ও রাসুলের সুন্নতের অনুসরণ করে চলবে, নিঃসন্দেহে সে পথভ্রষ্টতা থেকে নিরাপদ থাকবে এবং আখেরাতের কষ্ট তার থেকে দূরে থাকবে।
ঠিক একইভাবে তার দুনিয়ার কষ্টও আর থাকবে না। এটা বুঝে আসে আল্লাহ তাআলার এই বাণীর মাধ্যমে- তিনি ইরশাদ করেন, وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا) যে-কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে উত্তরণের কোনো পথ তৈরি করে দেবেন। [সুরা তালাক : ২]
অতএব, তুমি যদি এমন ব্যক্তিকে কখনো কোনো কষ্টের মাঝেও দেখতে পাও, তবু এতে ধৈর্যধারণে যে পুরস্কার নিহিত রয়েছে, সে বিষয়ে তার নিশ্চিত বিশ্বাস থাকার কারণে তিক্ত-কষ্টকেও তার কাছে মধুর মতো মিষ্ট অনুভব হয়।
তাছাড়া এ ধরনের লোক একটি অন্যরকম সুখময় জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়। তার ওপর বিপদ-আপদ কম আসে। তবে কখনো যদি কোনো কাজের ক্ষেত্রে তাকওয়া থেকে দূরে সরে যায়- তাহলে দ্রুতই বিপদে আপতিত হয়ে পড়ে। কিন্তু সর্বক্ষণ যে তাকওয়ার পথ অবলম্বন করে থাকে, তার নিকট বিপদ আসে না। তার কোনো বিপর্যয় ঘটে না। এটিই সাধারণ নিয়ম। নতুবা কখনো যদি তাকওয়ার অবস্থায় কোনো বিপদ আসে, তাহলে সেটা তার পূর্বের কোনো গোনাহের কারণে আসে।
এরপরও যদি তার ওপর কোনো বিপদ আপতিত হয়, সেটাকে সে প্রতিপালকের পক্ষ থেকে নিয়ামত মনে করে। বিপদে সে কোনো কষ্টই অনুভব করে না।
হজরত শিবলী রহ. বলেন, أحبك الناس لنعمائك، وأنا أحبك لبلائك. খোদা হে, মানুষ তোমাকে তোমার নিয়ামতের কারণে ভালোবাসে। আর আমি তোমাকে ভালোবাসি তোমার প্রদত্ত বিপদের কারণে।