📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মানুষের প্রকৃতি

📄 মানুষের প্রকৃতি


মানুষের শরীর সুস্থ থাকার জন্য প্রাকৃতিকভাবে উপকারী কিছু অর্জন এবং ক্ষতিকারক কিছু বর্জনের দরকার রয়েছে। এ কারণে তার মাঝে ইচ্ছা ও আকর্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে সে ভালোগুলো অর্জন করতে পারে। খারাপগুলোকে বর্জন করতে পারে।
মানুষের শরীরে খাবার দরকার-
খাবারের প্রতি যদি মানুষের কোনো ক্ষুধা, আকর্ষণ ও তৃপ্তি অনুভব না হতো, তাহলে মানুষ কখনো খাবার গ্রহণ করত না। তাহলে তার শরীরও ঠিক থাকত না। এ কারণে তার মাঝে খাবারের ক্ষুধা, স্বাদ ও তৃপ্তি উদ্রেক করা হয়েছে। এরপর যখন তার শরীর সুস্থ থাকা পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ হয়ে যায়, তখন আকর্ষণকারী এই বিষয়গুলোও আর থাকে না। তখন আর খেতে ভালো লাগে না। এই একই বিষয় ঘটে পানি পানের ক্ষেত্রে, পোশাক-পরিচ্ছেদ পরিধানের ক্ষেত্রে এবং বিয়ে ও সহবাসের ক্ষেত্রে।
বিয়ের উপকারিতা দুটো : ১. মানুষের বংশ পরম্পরা অব্যাহত রাখা। এটিই প্রধান উদ্দেশ্য। ২. শরীরের মাঝে সৃষ্ট হওয়া সেই পদার্থকে বিদূরিত করা, যা আটকে রাখলে শরীরের কষ্ট বাড়ে।
এই যে একটি পদ্ধতি- যারা বুঝবান, তারা মূল উদ্দেশ্যটি বুঝতে পারেন। কিন্তু যারা মূর্খ, তারা শুধু এর স্বাদ ও লাজ্জত উপভোগ করে। প্রবৃত্তি তাড়িত হয়ে চলতে থাকে। এগুলোর আসল উদ্দেশ্য বোঝে না। তারা তাদের দীর্ঘ সময় এমন কাজে ব্যয় করে, যার মধ্যে কোনো উপকারিতা নেই। তাদেরকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, সেগুলোই যেন তারা বোঝে না। জানে না। জানতে চায়ও না। তাদের প্রবৃত্তি এভাবে তাদের সম্পদ, লক্ষ্য ও দ্বীনকে নষ্টের দিকে নিয়ে যায়। অতঃপর এক সময় ধ্বংসের গহ্বরে গিয়ে নিক্ষিপ্ত হয়।
এমন আরও বহু মানুষকে দেখেছি, যারা নতুন নতুন নারীর দিকে ধাবিত হয়, নিজের প্রবৃত্তির নতুন চাহিদা মেটাতে। কিংবা কেউ তার প্রতাপিত যৌন চাহিদা মেটাতে গিয়ে অতি সহবাসের কারণে নিজেও ধ্বংস হয় এবং স্ত্রীকেও ধ্বংস করে ছাড়ে।
এগুলো ঘটে একেবারে বুঝ-বুদ্ধি না থাকার কারণে।
কিন্তু মানুষের এই যে খাদ্য গ্রহণ এবং তার মাঝের এই যে শাহওয়াত বা যৌন চাহিদা- এগুলো কিসের জন্য? এগুলো প্রদত্ত হয়েছে দুনিয়ার এই সফর পাড়ি দেওয়ার সময় শরীরের সুস্থতার জন্য। এগুলো আসলে মজা বা স্ফূর্তির জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। যতটুকু মজা বা শান্তি অর্জিত হয়, অনুভূত হয়— এগুলো মূলত একটি কৌশলের মতো। এর আকর্ষণেই মানুষ খাদ্য গ্রহণ করে—যাতে শরীর ঠিক থাকে। মানুষ সহবাস করে—যাতে বংশ পদ্ধতি ঠিক থাকে। খাদ্যের স্বাদ বা সহবাসের মজা এখানে কিছুতেই মূল উদ্দেশ্য নয়। নতুবা শুধু যদি এই স্বাদ ও মজাই উদ্দেশ্য হতো, তবে তো মানুষের চেয়ে পশু-প্রাণীই এগুলোর ক্ষেত্রে অধিক উপযুক্ত। চিন্তাহীনভাবে এগুলোই তারা বেশি আস্বাদন করতে সক্ষম।
কিন্তু মানুষ...?
সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যিনি নিজেকে সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যগুলো, আসল বাস্তবতাগুলো বুঝতে পারেন। প্রবৃত্তির ডাকে অন্ধ উন্মাতাল হয়ে পড়েন না।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 গোনাহ ও সওয়াবের প্রতিফল

📄 গোনাহ ও সওয়াবের প্রতিফল


যে ব্যক্তি গোনাহের পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করবে, সেই বুঝবে—গোনাহ কতটা নিকৃষ্ট ও ক্ষতিকারক।
আমি আমার পরিচিত কিছুলোক সম্পর্কে চিন্তা করে দেখেছি, তারা অব্যাহত জিনার মধ্যে লিপ্ত রয়েছে, হারাম কাজে সম্পৃক্ত রয়েছে—দুনিয়ায় তাদের সীমাহীন সম্পত্তি ও উত্তম খাদ্য-খাবার থাকা সত্ত্বেও তাদের দেখে মনে হয়—তাদের চেহারায় যেন মেঘের কালিমা ছেয়ে রয়েছে। কেমন শ্রীহীন অসুন্দর। কৃত্রিম। অন্তর কিছুতেই তাদের দিকে আকৃষ্ট হয় না।
আবার এর বিপরীত কিছু ব্যক্তিকেও আমি দেখেছি—তারা প্রবৃত্তির ওপর ধৈর্যধারণ করে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখে। হারাম ও অবৈধ বিষয় থেকে নিজেকে সব সময় বিরত রাখে। তাদের মধ্যে অনেকের দুনিয়ার সমৃদ্ধিও রয়েছে। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব রয়েছে। সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। এবং এগুলো দ্বারা তারা ইসলাম ও ঈমানের সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করেছে। অন্য মুমিনদের অভাব-অনটনে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে ধরেছে। আবার নিজের ক্ষেত্রেও যদি কখনো কোনো অভাব-অনটন কিংবা বিপর্যয় এসেছে, তখনও তারা অভিযোগহীন ধৈর্যধারণ করেছে। তাকদিরের ওপর সন্তুষ্ট থেকেছে। এবং তাদের মাঝে কোনো ধরনের নিরাশা ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ পায়নি।
এগুলো দেখেই আল্লাহ তাআলার এই কথার মর্ম ভালোভাবে বুঝে আসে—আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
إِنَّهُ مَنْ يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ)
নিশ্চয় যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্যধারণ করে, সে জেনে রাখুক, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীলদের কর্মের প্রতিদান নষ্ট করেন না। [সুরা ইউসুফ: ৯০]

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 রবের সাথে সম্পর্ক স্থাপন

📄 রবের সাথে সম্পর্ক স্থাপন


বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত, সর্বক্ষণ তার প্রতিপালকের দরজা ধরে রাখা। এবং তার ডাকে সাড়া দেওয়া হোক বা না হোক- কিছুতেই রবের অনুগ্রহ ও দয়া থেকে নিরাশ না হওয়া। বরং সে নির্জনে-নিরালায় ইবাদত ও প্রার্থনার মাধ্যমে তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে। তার সাথে যদি অপরিচিতি বা সম্পর্কহীনতার সৃষ্টি হয়, তবে দ্রুতই সেটি দূর করে নেওয়ার চেষ্টা করবে। যেমন এক কবি বলেন,
أمستوحش أنت مما جنيت فأحسن إذا شئت واستأنس
তুমি কি তোমার অপরাধের কারণে বড়ই সম্পর্কহীন পেরেশান? তাহলে যদি চাও, সৎ কর্ম করো এবং সম্পর্কের দিকে হও আগুয়ান।
কোনো ব্যক্তি যদি দেখে তার অন্তর দুনিয়ার দিকে ধাবিত, তাহলে দুনিয়ার বিষয়াদিও প্রভুর কাছেই প্রার্থনা করবে। আর যদি দেখে আখেরাতের দিকে ধাবিত, তাহলে সে যেন আখেরাতের আমলের তাওফিক তার কাছেই প্রার্থনা করে। এরপর সে দুনিয়ার জন্য যা কামনা করছে, তাতে যদি ক্ষতির আশঙ্কা করে, তবে সে তার অন্তর বিশুদ্ধ করার জন্যও তার কাছেই প্রার্থনা করবে। তার অন্তরের রোগ নিরাময়ের জন্য তার কাছেই চাইবে। কারণ, অন্তর যদি ঠিক হয়ে যায়, তাহলে সে এমন কিছু আর কামনা করবে না, যা তার দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর কিংবা যা তার শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
যে ব্যক্তি এভাবে চলতে পারবে, সে একটি প্রাচুর্যপূর্ণ সুখী জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে।
হ্যাঁ, তবে তাকে এই অবস্থানের জন্য সার্বক্ষণিক তাকওয়া অর্জন করতে হবে। কারণ, তাকওয়া ছাড়া কিছুতেই প্রতিপালকের সাথে সম্পর্ক স্থাপন হবে না। হওয়া সম্ভব নয়। আর তাকওয়া অবলম্বনকারীরা সবকিছু থেকে বিরত থাকতে পারে; কিন্তু আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা ও আশ্রয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকে না।
বর্ণনা পাওয়া যায়-
বীরযোদ্ধা কুতাইবা ইবনে মুসলিহ রহ. যখন তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কাতারবদ্ধ হলেন, শত্রুপক্ষের এই বিশাল বাহিনীর সাথে লড়াই তাকে ভাবিয়ে তুলছিল। তিনি তখন অন্যদের জিজ্ঞাসা করলেন, মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসে কোথায়?
পাশের লোকেরা জানাল- তিনি ডান দিকের শেষপ্রান্তে নিজের ধনুকের তিরের ওপর ঝুঁকে আঙুল দিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করছেন।
হজরত কুতাইবা রহ. বললেন, আমার কাছে এই শূন্য আঙুল হাজার প্রশিক্ষিত তরবারি থেকে বেশি প্রিয়। হাজারো তীক্ষ্ণ বর্শার ফলা থেকে বেশি উপকারী।
এরপর যুদ্ধ শুরু হলো। তিনি তুর্কিদের ওপর বিজয়ী হলেন। যুদ্ধ শেষে হজরত কুতাইবা রহ. মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসেকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এভাবে আকাশের দিকে হাতের ইশারা করে কী করছিলেন?
মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসে বললেন, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার জন্য বিজয়ের সকল পথ ও পদ্ধতি জমা করে দিচ্ছিলাম।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 নিয়ামত ক্ষেত্রে প্রান্ততা প্রদর্শন

📄 নিয়ামত ক্ষেত্রে প্রান্ততা প্রদর্শন


যে ব্যক্তিকে আল্লাহ দুনিয়াবি নিয়ামত দিয়েছেন, সে যেন এটাকে খুব বিচক্ষণতার সাথে ব্যবহার করে। বেশি কৃপণতা করবে না; বরং নিয়ামতের কিছুটা প্রকাশ যেন তার জীবনযাপনে থাকে। আবার খুব বেশি খরচ করবে না এবং প্রকাশ করে বেড়াবে না। সকলের কাছে সকল সম্পদের কথা প্রকাশও করবে না।
কিন্তু মানুষের প্রকৃতিই এমন যে, সম্পদ অর্জিত হলে তা অন্য মানুষের কাছে প্রকাশ করে বেড়ায়। এটি নফসের একটি গোপন আনন্দ ও স্বাদ গ্রহণের বিষয়। কিন্তু এটাকে নিয়ন্ত্রণ রাখা একটি প্রশংসনীয় ও কল্যাণকর স্বভাব- অসাধারণ চারিত্রিক দৃঢ়তা না থাকলে যা করা সম্ভব হয় না। সকলে এটা পারেও না। অথচ এতেই রয়েছে সমূহ কল্যাণ। তাছাড়া অধিক প্রকাশে চোখ লাগে, অনিষ্ট হয়- এটা সত্য। এটাকে আমরা এভাবে বুঝতে পারি-
আমার হয়তো অনেক সম্পদ হয়েছে- এটা মানুষের কাছে প্রকাশ করে বেড়াতে আমার ভালো লাগে। নফস চায়- মানুষ দেখুক, আমার কত সম্পদ। দেখাতে ভালো লাগে।
কিন্তু আমাকে এর পরিণতি নিয়েও ভাবা উচিত। অধিক সম্পদের কথা যদি আমি আমার কোনো বন্ধুর কাছে প্রকাশ করি- গোপনে সে আমার প্রতি ঈর্ষান্বিত- এমনকি রাগান্বিত হয়ে উঠতে পারে। কিংবা বিষয়টা নিজেদের মাঝে একটা দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে- এমনকি তাকে বন্ধু থেকে শত্রুও বানিয়ে দিতে পারে।
আর যদি আমি তা আমার কোনো শত্রুর নিকট প্রকাশ করি, তবে নিশ্চয় তাতে চোখ লাগবে, হিংসার কারণ হয়ে উঠবে। সে তা ধ্বংসের চেষ্টা করবে। এটা আমার ক্ষতির কারণ হবে।
সম্পদ বা কল্যাণের কথায় হিংসা থেকে মুক্ত পরিবেশ আমি তেমন কখনো দেখিনি। এটাই হলো মূলনীতি, শত্রুর নিকট সমস্যা ও অনটনের কথা বলা হলে, শত্রু মনে মনে তৃপ্তি পাবে। আর যদি সুখ ও স্বচ্ছলতার কথা বলা হয়, তবে সীমাহীন হিংসা করবে।
তাহলে কেন প্রয়োজন এই অনর্থক আত্মপ্রকাশ!
তাছাড়া সকল ক্ষেত্রেই নিজের বিষয়গুলো অপ্রকাশিত রাখা একটি চারিত্রিক দৃঢ়তার ব্যাপার- এটা সকলে পারে না। কিন্তু অনেক স্থানেই এটিই কল্যাণকর। যেমন ধরো, কেউ কোথাও অপ্রয়োজনে তার বয়সের কথা প্রকাশ করল, সেখানে অন্যদের চেয়ে তার বয়স বেশি হলে, সকলেই তখন তাকে বয়োবৃদ্ধ জীর্ণ অথর্ব ভাবতে শুরু করবে। আবার বয়স কম হলে, অন্যরা তাচ্ছিল্যের চোখে দেখতে পারে।
এমনকি কোথাও অনর্থক নিজের বিশ্বাস ও মতবাদের কথা প্রকাশ করাও উচিত নয়। তাহলে সেখানে তার মতের বিরোধীরা তার শত্রুতে পরিণত হবে।
কিংবা কোথাও নিজের সম্পদের কথা প্রকাশ করে দিলো- সম্পদ যদি উপস্থিত ব্যক্তিদের থেকে তুলনামূলক কম হয়, অন্যরা তুচ্ছ ভাববে। আর যদি বেশি হয়, হিংসা করবে।
আর ঠিক এই তিনটি বিষয় নিয়ে এক কবি বলেন,
احفظ لسانك لا تبح بثلاثة سن ومال من ما استطعت ومذهب
فعلى الثلاثة تبتلى بثلاثة بمموه وبمخرق و مکذب
নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করো। তিনটি জিনিস করো না ফাঁস- তোমার বয়স, তোমার সম্পদ এবং আদর্শ।
অন্যথায় এই তিনটির ক্ষেত্রে পড়বে তিনটি সমস্যায়- হবে প্রতারিত, করবে অনিষ্ট, অবিশ্বাস করবে তোমায়।
এখানে সংক্ষেপে ও ইশারায় যা কিছু উল্লেখ করলাম, এটা দিয়েই নিজের অন্য বিষয়গুলো অনুমান করে নাও। অর্থাৎ তুমি কিছুতেই সেই গল্পকার ও পেটপাতলা লোকদের মতো হয়ো না, যারা এমন লোকদের কাছে গল্প করে বেড়ায়, অচিরেই সেগুলো তারা জায়গায়-অজায়গায় যেখানে-সেখানে ছড়িয়ে বেড়াবে- পরিণতিতে যা শুধু ক্ষতিই ডেকে আনবে।
প্রবাদ আছে, رب كلمة جرى بها اللسان، هلك بها الانسان.
মনে রেখো, মানুষের মুখে কখনো এমন কথা এসে যায়, যা তার ধ্বংসের কারণ হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00