📄 অক্ষম মানুষের প্রার্থনা
একটি আশ্চর্য বিষয় নিয়ে চিন্তা করলাম। আর তা হলো- মুমিনের ওপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের বিপদ আসে। এ জন্য সে দুআ করতে থাকে। বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য অনেক আকুতি-মিনতি করতে থাকে। কিন্তু হয়তো অনেক দিন এর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না, দুআ কবুলের কোনো আলামত পাওয়া যায় না। অবশেষে যখন সে একেবারে হতাশার কাছাকাছি উপনীত হয়ে যায়, তখন তার অন্তরের দিকে লক্ষ করা হয়, তখনো সে যদি 'তাকদির'-এর ওপর সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ না হয়, তখন দ্রুত তার ডাকে সাড়া প্রদান করা হয়। কেননা, বিপদের এই মুহূর্তে এসেই ঈমানের চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়া হয়। উত্তীর্ণ হতে পারলে শয়তান পরাজিত হয়। পরীক্ষার এই অবস্থাতে এসেই মানুষের মর্যাদার উন্নতি কিংবা অবনতি প্রকাশিত হয়।
আল্লাহ তাআলা এদিকে ইশারা করে বলেন,
حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرُ اللَّهِ قَرِيبٌ )
এমনকি রাসুল এবং তাঁর ঈমানদার সঙ্গীগণ বলে উঠেছিল, আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? জেনে রেখো, আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটেই। [সুরা বাকারা : ২১৪]
এমনটাই ঘটেছিল হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে। প্রথমে তার একটি সন্তান হারায়। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়। এরপর তার ছোট আরেকটি সন্তান বিনইয়ামিনও তার সান্নিধ্যহারা হয়। এ সময়ও তিনি তার প্রতিপালকের অনুগ্রহের আশা থেকে নিরাশ না হয়ে বলেছিলেন,
عَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَنِي بِهِمْ جَمِيعًا )
আল্লাহর প্রতি আশা, তিনি সকলকেই আমার কাছে আবার এনে দেবেন। [সুরা ইউসুফ : ৮৩]
এমনিভাবে হজরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম বলেছেন,
وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا )
হে আমার প্রতিপালক, আমি আপানাকে ডেকে কখনো ব্যর্থ হইনি। [সুরা মারইয়াম : ৪]
সুতরাং, তুমি কিছুতেই দুআ কবুলের সময়টাকে কখনোই বিলম্বিত ভেবো না। এটা স্মরণে রাখো, তিনি তোমার প্রতিপালক। সকল বিষয়ে সবচেয়ে বেশি প্রজ্ঞাবান। সর্বাধিক কল্যাণ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি তিনিই অবহিত।
আবার এদিকেও খেয়াল রাখতে হবে, হয়তো তিনি এর মাধ্যমে তোমার আন্তরিক ঈমানের পরীক্ষা নিতে চান। তিনি চান, তুমি যেন এই কারণে তার কাছে মিনতি করো, বিনয়ী হও। তিনি হয়তো এই বিপদে তোমার ধৈর্যধারণের প্রতিদান দিতে চান। কিংবা তিনি পরীক্ষা করতে চান, ঈমানের এই পরীক্ষায় ইবলিসের ওয়াসওয়াসার সাথে তুমি যুদ্ধ করে বিজয়ী হতে পারো কি না? আর যদি এগুলোই তিনি ইচ্ছা করে থাকেন, তবে এগুলো তার অনুগ্রহের ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করে। এ জন্য তোমার বরং শোকর আদায় করা উচিত।
কারণ, এই বিপদের মাধ্যমে তিনি তোমাকে তার কাছে প্রার্থনাকারীর উপযুক্ত করে তুলেছেন। তোমাকে তার দিকে ঝুঁকিয়ে নিয়েছেন। আর কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয়গ্রহণ করা—এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে!
📄 মানুষের প্রকৃতি
মানুষের শরীর সুস্থ থাকার জন্য প্রাকৃতিকভাবে উপকারী কিছু অর্জন এবং ক্ষতিকারক কিছু বর্জনের দরকার রয়েছে। এ কারণে তার মাঝে ইচ্ছা ও আকর্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে সে ভালোগুলো অর্জন করতে পারে। খারাপগুলোকে বর্জন করতে পারে।
মানুষের শরীরে খাবার দরকার-
খাবারের প্রতি যদি মানুষের কোনো ক্ষুধা, আকর্ষণ ও তৃপ্তি অনুভব না হতো, তাহলে মানুষ কখনো খাবার গ্রহণ করত না। তাহলে তার শরীরও ঠিক থাকত না। এ কারণে তার মাঝে খাবারের ক্ষুধা, স্বাদ ও তৃপ্তি উদ্রেক করা হয়েছে। এরপর যখন তার শরীর সুস্থ থাকা পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ হয়ে যায়, তখন আকর্ষণকারী এই বিষয়গুলোও আর থাকে না। তখন আর খেতে ভালো লাগে না। এই একই বিষয় ঘটে পানি পানের ক্ষেত্রে, পোশাক-পরিচ্ছেদ পরিধানের ক্ষেত্রে এবং বিয়ে ও সহবাসের ক্ষেত্রে।
বিয়ের উপকারিতা দুটো : ১. মানুষের বংশ পরম্পরা অব্যাহত রাখা। এটিই প্রধান উদ্দেশ্য। ২. শরীরের মাঝে সৃষ্ট হওয়া সেই পদার্থকে বিদূরিত করা, যা আটকে রাখলে শরীরের কষ্ট বাড়ে।
এই যে একটি পদ্ধতি- যারা বুঝবান, তারা মূল উদ্দেশ্যটি বুঝতে পারেন। কিন্তু যারা মূর্খ, তারা শুধু এর স্বাদ ও লাজ্জত উপভোগ করে। প্রবৃত্তি তাড়িত হয়ে চলতে থাকে। এগুলোর আসল উদ্দেশ্য বোঝে না। তারা তাদের দীর্ঘ সময় এমন কাজে ব্যয় করে, যার মধ্যে কোনো উপকারিতা নেই। তাদেরকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, সেগুলোই যেন তারা বোঝে না। জানে না। জানতে চায়ও না। তাদের প্রবৃত্তি এভাবে তাদের সম্পদ, লক্ষ্য ও দ্বীনকে নষ্টের দিকে নিয়ে যায়। অতঃপর এক সময় ধ্বংসের গহ্বরে গিয়ে নিক্ষিপ্ত হয়।
এমন আরও বহু মানুষকে দেখেছি, যারা নতুন নতুন নারীর দিকে ধাবিত হয়, নিজের প্রবৃত্তির নতুন চাহিদা মেটাতে। কিংবা কেউ তার প্রতাপিত যৌন চাহিদা মেটাতে গিয়ে অতি সহবাসের কারণে নিজেও ধ্বংস হয় এবং স্ত্রীকেও ধ্বংস করে ছাড়ে।
এগুলো ঘটে একেবারে বুঝ-বুদ্ধি না থাকার কারণে।
কিন্তু মানুষের এই যে খাদ্য গ্রহণ এবং তার মাঝের এই যে শাহওয়াত বা যৌন চাহিদা- এগুলো কিসের জন্য? এগুলো প্রদত্ত হয়েছে দুনিয়ার এই সফর পাড়ি দেওয়ার সময় শরীরের সুস্থতার জন্য। এগুলো আসলে মজা বা স্ফূর্তির জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। যতটুকু মজা বা শান্তি অর্জিত হয়, অনুভূত হয়— এগুলো মূলত একটি কৌশলের মতো। এর আকর্ষণেই মানুষ খাদ্য গ্রহণ করে—যাতে শরীর ঠিক থাকে। মানুষ সহবাস করে—যাতে বংশ পদ্ধতি ঠিক থাকে। খাদ্যের স্বাদ বা সহবাসের মজা এখানে কিছুতেই মূল উদ্দেশ্য নয়। নতুবা শুধু যদি এই স্বাদ ও মজাই উদ্দেশ্য হতো, তবে তো মানুষের চেয়ে পশু-প্রাণীই এগুলোর ক্ষেত্রে অধিক উপযুক্ত। চিন্তাহীনভাবে এগুলোই তারা বেশি আস্বাদন করতে সক্ষম।
কিন্তু মানুষ...?
সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যিনি নিজেকে সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যগুলো, আসল বাস্তবতাগুলো বুঝতে পারেন। প্রবৃত্তির ডাকে অন্ধ উন্মাতাল হয়ে পড়েন না।
📄 গোনাহ ও সওয়াবের প্রতিফল
যে ব্যক্তি গোনাহের পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করবে, সেই বুঝবে—গোনাহ কতটা নিকৃষ্ট ও ক্ষতিকারক।
আমি আমার পরিচিত কিছুলোক সম্পর্কে চিন্তা করে দেখেছি, তারা অব্যাহত জিনার মধ্যে লিপ্ত রয়েছে, হারাম কাজে সম্পৃক্ত রয়েছে—দুনিয়ায় তাদের সীমাহীন সম্পত্তি ও উত্তম খাদ্য-খাবার থাকা সত্ত্বেও তাদের দেখে মনে হয়—তাদের চেহারায় যেন মেঘের কালিমা ছেয়ে রয়েছে। কেমন শ্রীহীন অসুন্দর। কৃত্রিম। অন্তর কিছুতেই তাদের দিকে আকৃষ্ট হয় না।
আবার এর বিপরীত কিছু ব্যক্তিকেও আমি দেখেছি—তারা প্রবৃত্তির ওপর ধৈর্যধারণ করে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখে। হারাম ও অবৈধ বিষয় থেকে নিজেকে সব সময় বিরত রাখে। তাদের মধ্যে অনেকের দুনিয়ার সমৃদ্ধিও রয়েছে। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব রয়েছে। সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। এবং এগুলো দ্বারা তারা ইসলাম ও ঈমানের সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করেছে। অন্য মুমিনদের অভাব-অনটনে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে ধরেছে। আবার নিজের ক্ষেত্রেও যদি কখনো কোনো অভাব-অনটন কিংবা বিপর্যয় এসেছে, তখনও তারা অভিযোগহীন ধৈর্যধারণ করেছে। তাকদিরের ওপর সন্তুষ্ট থেকেছে। এবং তাদের মাঝে কোনো ধরনের নিরাশা ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ পায়নি।
এগুলো দেখেই আল্লাহ তাআলার এই কথার মর্ম ভালোভাবে বুঝে আসে—আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
إِنَّهُ مَنْ يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ)
নিশ্চয় যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্যধারণ করে, সে জেনে রাখুক, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীলদের কর্মের প্রতিদান নষ্ট করেন না। [সুরা ইউসুফ: ৯০]
📄 রবের সাথে সম্পর্ক স্থাপন
বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত, সর্বক্ষণ তার প্রতিপালকের দরজা ধরে রাখা। এবং তার ডাকে সাড়া দেওয়া হোক বা না হোক- কিছুতেই রবের অনুগ্রহ ও দয়া থেকে নিরাশ না হওয়া। বরং সে নির্জনে-নিরালায় ইবাদত ও প্রার্থনার মাধ্যমে তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে। তার সাথে যদি অপরিচিতি বা সম্পর্কহীনতার সৃষ্টি হয়, তবে দ্রুতই সেটি দূর করে নেওয়ার চেষ্টা করবে। যেমন এক কবি বলেন,
أمستوحش أنت مما جنيت فأحسن إذا شئت واستأنس
তুমি কি তোমার অপরাধের কারণে বড়ই সম্পর্কহীন পেরেশান? তাহলে যদি চাও, সৎ কর্ম করো এবং সম্পর্কের দিকে হও আগুয়ান।
কোনো ব্যক্তি যদি দেখে তার অন্তর দুনিয়ার দিকে ধাবিত, তাহলে দুনিয়ার বিষয়াদিও প্রভুর কাছেই প্রার্থনা করবে। আর যদি দেখে আখেরাতের দিকে ধাবিত, তাহলে সে যেন আখেরাতের আমলের তাওফিক তার কাছেই প্রার্থনা করে। এরপর সে দুনিয়ার জন্য যা কামনা করছে, তাতে যদি ক্ষতির আশঙ্কা করে, তবে সে তার অন্তর বিশুদ্ধ করার জন্যও তার কাছেই প্রার্থনা করবে। তার অন্তরের রোগ নিরাময়ের জন্য তার কাছেই চাইবে। কারণ, অন্তর যদি ঠিক হয়ে যায়, তাহলে সে এমন কিছু আর কামনা করবে না, যা তার দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর কিংবা যা তার শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
যে ব্যক্তি এভাবে চলতে পারবে, সে একটি প্রাচুর্যপূর্ণ সুখী জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে।
হ্যাঁ, তবে তাকে এই অবস্থানের জন্য সার্বক্ষণিক তাকওয়া অর্জন করতে হবে। কারণ, তাকওয়া ছাড়া কিছুতেই প্রতিপালকের সাথে সম্পর্ক স্থাপন হবে না। হওয়া সম্ভব নয়। আর তাকওয়া অবলম্বনকারীরা সবকিছু থেকে বিরত থাকতে পারে; কিন্তু আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা ও আশ্রয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকে না।
বর্ণনা পাওয়া যায়-
বীরযোদ্ধা কুতাইবা ইবনে মুসলিহ রহ. যখন তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কাতারবদ্ধ হলেন, শত্রুপক্ষের এই বিশাল বাহিনীর সাথে লড়াই তাকে ভাবিয়ে তুলছিল। তিনি তখন অন্যদের জিজ্ঞাসা করলেন, মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসে কোথায়?
পাশের লোকেরা জানাল- তিনি ডান দিকের শেষপ্রান্তে নিজের ধনুকের তিরের ওপর ঝুঁকে আঙুল দিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করছেন।
হজরত কুতাইবা রহ. বললেন, আমার কাছে এই শূন্য আঙুল হাজার প্রশিক্ষিত তরবারি থেকে বেশি প্রিয়। হাজারো তীক্ষ্ণ বর্শার ফলা থেকে বেশি উপকারী।
এরপর যুদ্ধ শুরু হলো। তিনি তুর্কিদের ওপর বিজয়ী হলেন। যুদ্ধ শেষে হজরত কুতাইবা রহ. মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসেকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এভাবে আকাশের দিকে হাতের ইশারা করে কী করছিলেন?
মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসে বললেন, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার জন্য বিজয়ের সকল পথ ও পদ্ধতি জমা করে দিচ্ছিলাম।