📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সময়ের পরিক্রমা

📄 সময়ের পরিক্রমা


জেনে রেখো, সময় কখনো একভাবে চলে না। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
﴿وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ﴾
এ তো দিন-পরিক্রমা, যা আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে বদলাতে থাকি। [সুরা আলে ইমরান : ১৪০]
সুতরাং কখনো দরিদ্রতা, কখনো সচ্ছলতা, কখনো সম্মান, কখনো অসম্মান। কখনো তুমি খুশি। কখনো খুশি শত্রুরা। কখনো কষ্ট, কখনো আনন্দ-সুখ। এর মধ্য থেকে সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে সকল সময় মৌলিক অবস্থায় অটল থাকে- আর তা হলো সর্বাবস্থায় তাকওয়া বা আল্লাহকে ভয় করে চলে। এভাবে চললে কী হবে?
সে যদি ধনী হয়, তার দ্বীনের শোভা-সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে। আর যদি গরিব হয়, ধৈর্যধারণ করবে। যদি সুস্থতা ও শান্তিতে থাকে, সকল নিয়ামতের শোকর আদায় করবে। আর যদি অসুস্থ বা কোনো বিপদে আপতিত হয়, তবে তা সহ্য করবে।
অর্থাৎ কোনো অবস্থায় তার কোনো ক্ষতি হবে না। যুগের ঢেউ যদি তাকে উঠায়-নামায়, তার অনুকূল বা প্রতিকূল হয়—কখনো ক্ষুধা কিংবা পেটপূর্ণ তৃপ্তি, কিছুই তাকে ক্ষতি করতে পারবে না।
কারণ, এসকল জিনিস সদা পরিবর্তনশীল। কখনো থাকে, কখনো থাকে না। কিন্তু 'তাকওয়া' হলো কোনো মানুষের মৌলিক সম্পদ—এটি তাকে সব সময় প্রহরীর মতো রক্ষা করে রাখে—সকল হোঁচট থেকে, পদস্খলন থেকে। এবং তাকে সকল সময় দ্বীনের সীমার মধ্যে সংরক্ষিত রাখে।
আর সাময়িক স্বাদ ও আনন্দ-উল্লাস যাকে বিভ্রান্ত করে, তাকওয়ার পথ ছেড়ে সাময়িক স্ফূর্তিতে যে গা ভাসায়, অচিরেই দেখা যায় তার অবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেছে। এই বিচ্যুতিই তাকে আরও বড় ক্ষতির মুখোমুখি করে ছাড়ে। আর তুমি যদি সর্বক্ষণ তাকওয়ার পথ অবলম্বন করে চলো, তবে সংকীর্ণতার মাঝেও প্রশস্ততা দেখতে পাবে, অসুস্থতার মধ্যেও সুস্থতার স্বাদ পাবে। এটি এমন এক ব্যাপার—তাড়াহুড়োকারীরা যার থেকে বঞ্চিত হয়। এবং ধৈর্যশীলদের জন্য এই পুরস্কার একেবারে নিশ্চিত ও নিরারুদ্ধ।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ

📄 প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ


আমি একবার এক আশ্চর্য বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করলাম। ভাবলাম একটি মৌলিক বিষয়ে। বিষয়টা হলো, মুমিনের ওপর পরীক্ষার আবির্ভাব ঘটা। তাকে এমন বিষয়ে পরীক্ষা করা হয়, যে বিষয়ে তার সক্ষমতা রয়েছে এবং আস্বাদন ও আকর্ষণ রয়েছে। এবং যা অর্জনে বা সংঘটনে তার কোনো কষ্ট পোহাতে হয় না। যেমন, নিরাপদ নির্জনে এমন প্রিয় কোনো জিনিস সহজলভ্য হওয়া— যাতে লিপ্ত হওয়া শরিয়তে নিষেধ।
আমি মনে করি, এসব স্থানে ঈমান এমনভাবে প্রকাশ পায়, যা দু-রাকাত নামাজের ক্ষেত্রেও হয় না। আল্লাহর কসম, হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম ঠিক এই ধরনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই তো এমন শ্রেষ্ঠত্বের কাতারে শামিল হয়েছেন। হে আমার সাথিভাই, একবার সেই নির্জন নিরাপদ চিত্তাকর্ষক পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে দেখুন তো, এমন পরিস্থিতিতে তিনি যদি তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করতেন, তিনি কি আজ এই সীমাহীন মর্যাদা ও পবিত্রতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারতেন? এমনই হয়।
এ ধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ কাউকে এভাবেই এত উপরে তুলে ধরেন! তাই প্রতিটি সাময়িক স্ফূর্তি ও ভোগের সময় পরিস্থিতির অনুধাবন নিজের জন্য ঢাল বানিয়ে নাও। সাময়িক উত্তেজনায় লিপ্ত হয়ে যেয়ো না।
কারণ, এভাবেই মুমিনের সামনে অবৈধ আস্বাদনের বিষয়গুলো উপস্থাপিত হয়। এগুলোকে যেন সে নফসের যুদ্ধের ময়দান হিসেবে দেখতে পায়; কিন্তু যখনই সে পরিণামের চিন্তা-ভাবনার সৈন্য পাঠাতে বিলম্বিত করবে, তখনই সে পরাজিত হবে।
এগুলোর মুখোমুখি ব্যক্তিদের যেন আমি নিজ চোখে দেখতে পাই, পরিস্থিতির ভাষা তাকে যেন ডেকে বলে, বাছা, তুমি তোমার স্থানে দৃঢ় ও অটল থাকো, নতুবা সাময়িক উত্তেজনায় তুমি তোমার নফসের জন্য যা নির্বাচন করবে, তা পরিণামে তোমার আফসোস, ক্রন্দন ও অনুতাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
তাছাড়া এই গোনাহের গর্তে আপতিত হওয়ার পর বাহ্যিকভাবে কেউ আর নিরাপদে ফিরে আসতে পারে না। কেউ যদি ফিরে আসেও, তবুও তার গায়ে পঙ্কিলতার আবর্জনা লেগে যায়। কত ব্যক্তিই তো এরপর আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। কিংবা তার পদস্খলনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। ভেবে দেখো, ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল, অবস্থা এতটা স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছিল যে, হাত বাড়িয়ে প্রার্থনা করতে হয়েছিল- تصدق علينا - আমাদের কিছু দান করুন।
কিন্তু কেউ যদি তাদের অবস্থা আর নিজেদের অবস্থা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, তবে একটি পার্থক্য দেখতে পাবে। ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের তাওবা কবুল করা হয়েছিল। নবীর মাধ্যমে তারা তাদের দুআ কবুল করিয়েছে।
কিন্তু আমাদের অবস্থা!
সুতরাং হে সাথিবৃন্দ, সাময়িক অবৈধ উৎফুল্লতার সময় নফসের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। নফসের লাগামকে দৃঢ়ভাবে আটকে ধরো।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 অক্ষম মানুষের প্রার্থনা

📄 অক্ষম মানুষের প্রার্থনা


একটি আশ্চর্য বিষয় নিয়ে চিন্তা করলাম। আর তা হলো- মুমিনের ওপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের বিপদ আসে। এ জন্য সে দুআ করতে থাকে। বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য অনেক আকুতি-মিনতি করতে থাকে। কিন্তু হয়তো অনেক দিন এর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না, দুআ কবুলের কোনো আলামত পাওয়া যায় না। অবশেষে যখন সে একেবারে হতাশার কাছাকাছি উপনীত হয়ে যায়, তখন তার অন্তরের দিকে লক্ষ করা হয়, তখনো সে যদি 'তাকদির'-এর ওপর সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ না হয়, তখন দ্রুত তার ডাকে সাড়া প্রদান করা হয়। কেননা, বিপদের এই মুহূর্তে এসেই ঈমানের চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়া হয়। উত্তীর্ণ হতে পারলে শয়তান পরাজিত হয়। পরীক্ষার এই অবস্থাতে এসেই মানুষের মর্যাদার উন্নতি কিংবা অবনতি প্রকাশিত হয়।
আল্লাহ তাআলা এদিকে ইশারা করে বলেন,
حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرُ اللَّهِ قَرِيبٌ )
এমনকি রাসুল এবং তাঁর ঈমানদার সঙ্গীগণ বলে উঠেছিল, আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? জেনে রেখো, আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটেই। [সুরা বাকারা : ২১৪]
এমনটাই ঘটেছিল হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে। প্রথমে তার একটি সন্তান হারায়। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়। এরপর তার ছোট আরেকটি সন্তান বিনইয়ামিনও তার সান্নিধ্যহারা হয়। এ সময়ও তিনি তার প্রতিপালকের অনুগ্রহের আশা থেকে নিরাশ না হয়ে বলেছিলেন,
عَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَنِي بِهِمْ جَمِيعًا )
আল্লাহর প্রতি আশা, তিনি সকলকেই আমার কাছে আবার এনে দেবেন। [সুরা ইউসুফ : ৮৩]
এমনিভাবে হজরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম বলেছেন,
وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا )
হে আমার প্রতিপালক, আমি আপানাকে ডেকে কখনো ব্যর্থ হইনি। [সুরা মারইয়াম : ৪]
সুতরাং, তুমি কিছুতেই দুআ কবুলের সময়টাকে কখনোই বিলম্বিত ভেবো না। এটা স্মরণে রাখো, তিনি তোমার প্রতিপালক। সকল বিষয়ে সবচেয়ে বেশি প্রজ্ঞাবান। সর্বাধিক কল্যাণ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি তিনিই অবহিত।
আবার এদিকেও খেয়াল রাখতে হবে, হয়তো তিনি এর মাধ্যমে তোমার আন্তরিক ঈমানের পরীক্ষা নিতে চান। তিনি চান, তুমি যেন এই কারণে তার কাছে মিনতি করো, বিনয়ী হও। তিনি হয়তো এই বিপদে তোমার ধৈর্যধারণের প্রতিদান দিতে চান। কিংবা তিনি পরীক্ষা করতে চান, ঈমানের এই পরীক্ষায় ইবলিসের ওয়াসওয়াসার সাথে তুমি যুদ্ধ করে বিজয়ী হতে পারো কি না? আর যদি এগুলোই তিনি ইচ্ছা করে থাকেন, তবে এগুলো তার অনুগ্রহের ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করে। এ জন্য তোমার বরং শোকর আদায় করা উচিত।
কারণ, এই বিপদের মাধ্যমে তিনি তোমাকে তার কাছে প্রার্থনাকারীর উপযুক্ত করে তুলেছেন। তোমাকে তার দিকে ঝুঁকিয়ে নিয়েছেন। আর কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয়গ্রহণ করা—এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে!

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মানুষের প্রকৃতি

📄 মানুষের প্রকৃতি


মানুষের শরীর সুস্থ থাকার জন্য প্রাকৃতিকভাবে উপকারী কিছু অর্জন এবং ক্ষতিকারক কিছু বর্জনের দরকার রয়েছে। এ কারণে তার মাঝে ইচ্ছা ও আকর্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে সে ভালোগুলো অর্জন করতে পারে। খারাপগুলোকে বর্জন করতে পারে।
মানুষের শরীরে খাবার দরকার-
খাবারের প্রতি যদি মানুষের কোনো ক্ষুধা, আকর্ষণ ও তৃপ্তি অনুভব না হতো, তাহলে মানুষ কখনো খাবার গ্রহণ করত না। তাহলে তার শরীরও ঠিক থাকত না। এ কারণে তার মাঝে খাবারের ক্ষুধা, স্বাদ ও তৃপ্তি উদ্রেক করা হয়েছে। এরপর যখন তার শরীর সুস্থ থাকা পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ হয়ে যায়, তখন আকর্ষণকারী এই বিষয়গুলোও আর থাকে না। তখন আর খেতে ভালো লাগে না। এই একই বিষয় ঘটে পানি পানের ক্ষেত্রে, পোশাক-পরিচ্ছেদ পরিধানের ক্ষেত্রে এবং বিয়ে ও সহবাসের ক্ষেত্রে।
বিয়ের উপকারিতা দুটো : ১. মানুষের বংশ পরম্পরা অব্যাহত রাখা। এটিই প্রধান উদ্দেশ্য। ২. শরীরের মাঝে সৃষ্ট হওয়া সেই পদার্থকে বিদূরিত করা, যা আটকে রাখলে শরীরের কষ্ট বাড়ে।
এই যে একটি পদ্ধতি- যারা বুঝবান, তারা মূল উদ্দেশ্যটি বুঝতে পারেন। কিন্তু যারা মূর্খ, তারা শুধু এর স্বাদ ও লাজ্জত উপভোগ করে। প্রবৃত্তি তাড়িত হয়ে চলতে থাকে। এগুলোর আসল উদ্দেশ্য বোঝে না। তারা তাদের দীর্ঘ সময় এমন কাজে ব্যয় করে, যার মধ্যে কোনো উপকারিতা নেই। তাদেরকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, সেগুলোই যেন তারা বোঝে না। জানে না। জানতে চায়ও না। তাদের প্রবৃত্তি এভাবে তাদের সম্পদ, লক্ষ্য ও দ্বীনকে নষ্টের দিকে নিয়ে যায়। অতঃপর এক সময় ধ্বংসের গহ্বরে গিয়ে নিক্ষিপ্ত হয়।
এমন আরও বহু মানুষকে দেখেছি, যারা নতুন নতুন নারীর দিকে ধাবিত হয়, নিজের প্রবৃত্তির নতুন চাহিদা মেটাতে। কিংবা কেউ তার প্রতাপিত যৌন চাহিদা মেটাতে গিয়ে অতি সহবাসের কারণে নিজেও ধ্বংস হয় এবং স্ত্রীকেও ধ্বংস করে ছাড়ে।
এগুলো ঘটে একেবারে বুঝ-বুদ্ধি না থাকার কারণে।
কিন্তু মানুষের এই যে খাদ্য গ্রহণ এবং তার মাঝের এই যে শাহওয়াত বা যৌন চাহিদা- এগুলো কিসের জন্য? এগুলো প্রদত্ত হয়েছে দুনিয়ার এই সফর পাড়ি দেওয়ার সময় শরীরের সুস্থতার জন্য। এগুলো আসলে মজা বা স্ফূর্তির জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। যতটুকু মজা বা শান্তি অর্জিত হয়, অনুভূত হয়— এগুলো মূলত একটি কৌশলের মতো। এর আকর্ষণেই মানুষ খাদ্য গ্রহণ করে—যাতে শরীর ঠিক থাকে। মানুষ সহবাস করে—যাতে বংশ পদ্ধতি ঠিক থাকে। খাদ্যের স্বাদ বা সহবাসের মজা এখানে কিছুতেই মূল উদ্দেশ্য নয়। নতুবা শুধু যদি এই স্বাদ ও মজাই উদ্দেশ্য হতো, তবে তো মানুষের চেয়ে পশু-প্রাণীই এগুলোর ক্ষেত্রে অধিক উপযুক্ত। চিন্তাহীনভাবে এগুলোই তারা বেশি আস্বাদন করতে সক্ষম।
কিন্তু মানুষ...?
সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যিনি নিজেকে সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যগুলো, আসল বাস্তবতাগুলো বুঝতে পারেন। প্রবৃত্তির ডাকে অন্ধ উন্মাতাল হয়ে পড়েন না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00