📄 বিদআত ও সাদৃশ্যপন্থিদের কাণ্ড
জেনে রাখো, আমাদের শরিয়তের মূল ভিত্তিগুলো খুবই মজবুত এবং এর নিয়ম-নীতিগুলো খুবই সুগঠিত ও সুশৃঙ্খলিত। এর মধ্যে কোনো দুর্বলতা ও অস্পষ্টতা নেই। এবং আগের আসমানি প্রতিটি শরিয়ত বা ধর্মও এমনটিই ছিল। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে বিপর্যয় ঘটিয়েছে মূর্খ এবং দ্বীনের ক্ষেত্রে নব উদ্ভাবনকারীরা অর্থাৎ বিদআতিরা।
যেমন খ্রিষ্টধর্মে... তারা দেখল যে, হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের হাতে মৃত ব্যক্তি জীবিত হচ্ছে, তখন তারা এই অলৌকিক ঘটনাকে ধারণা করল, এটি মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়। এ কারণে তারা তাকে ইলাহ বা উপাস্যের পর্যায়ে নিয়ে বসাল।
কিন্তু তারা যদি হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের সত্তা ও ব্যক্তি-প্রকৃতি সম্পর্কে একটু চিন্তা-ভাবনা করে দেখত, তাহলে তারা জানতে পারত- তিনি নিজেই অনেক অসম্পূর্ণতা, প্রয়োজন ও পরনির্ভরতার সমন্বয়ে গঠিত। অন্তত এতটুকু তো কারও ইলাহ বা উপাস্য না হওয়ার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ দলিল। তাহলে তার হাতে যা সংঘটিত হয়েছে, নিশ্চয় তা অন্যের কাজ। অন্য কোনো ক্ষমতাশালী সত্তা এগুলো তার মাধ্যমে সংঘটিত করেছেন। কিন্তু তারা এই সঠিক পথে চিন্তা না করায় বিভ্রান্ত হয়েছে।
এমনিভাবে তারা ধর্মের আরও বহু শাখা-প্রশাখাগত বিষয়েও বিকৃতি সাধন করেছে। যেমন বর্ণিত আছে, তাদের রোজা ছিল একমাস। কিন্তু তারা এর সাথে ২০ দিন বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। এরপর আরও বিকৃতি ঘটিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো এটিকে বছরে চার মাসে উত্তীর্ণ করেছে।
ঠিক একইভাবে ইহুদিরাও তাদের দ্বীনের মূল ও শাখাগত বিষয়ে বিকৃতি সাধন করেছে। এবং এই উম্মতের মধ্যে পদ্ধতিগত বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ভ্রষ্টতার মধ্যে নিপতিত হয়েছে এই জাতিটি। যদিও একসময় তাদের অধিকাংশ ব্যক্তিই শিরক, সন্দেহ ও বড় ধরনের প্রকাশ্য বিরোধিতা থেকে মুক্ত ছিল। কেননা, তারা ছিল জাতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ও বুদ্ধিমান। কিন্তু শয়তান যখন তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হয়েছে, তারাও শয়তানি চক্রান্তে নিমজ্জিত হয়েছে। এরপর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে শয়তানেরও এখন আর তাদেরকে বিভ্রান্ত করতে হয় না। তারা নিজেরাই এক-একটি আস্ত শয়তান হয়ে অন্যদের ভ্রষ্টতার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করে চলেছে।
বিকৃতির ঠিক এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁর শেষ নবীর ওপর সর্বশেষ কিতাব অবতীর্ণ করলেন। সেখানে এই কিতাবের পরিচয় সম্পর্কে বলা হলো,
﴿مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ আমি এই কিতাবে কিছুমাত্র ত্রুটি রাখিনি। [সুরা আনআম: ৩৮]
এছাড়া যে বিষয়গুলো বুঝতে কষ্টকর, ব্যাখ্যার প্রয়োজন, সেগুলো বর্ণনা করা হয়েছে রাসুলের সুন্নাতের মাধ্যমে। যেমন আল্লাহ তাআলা নিজেই এ বিষয়টি বর্ণনা করে বলেন,
﴿وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ (হে নবী,) আমি তোমার প্রতিও এই কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষের সামনে সেইসব বিষয়ের ব্যাখ্যা করে দাও, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে। [সুরা নাহল : ৪৪]
এভাবে কোরআন ও সুন্নাহের ব্যাখ্যার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দ্বীন সম্পর্কে বলেছেন,
تركتكم على بيضاء نقية. আমি তোমাদের একটি স্বচ্ছ শুভ্র ও স্পষ্ট দ্বীনের ওপর রেখে গেলাম। ৬১
কিন্তু এরপর এমন একটি দলের আগমন ঘটল, তারা যেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বর্ণনা ও ব্যাখ্যার প্রতি পরিতৃপ্ত নয়। তারা তাঁর সাহাবিদের পথ-পদ্ধতির অনুসরণে সন্তুষ্ট নয়। তারা নিজেরা বিভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুরু করল। এবং নিজেরাও বিভিন্ন দলে ও মতে বিভক্ত হয়ে পড়ল।
তাদের মধ্যে একটি দল, দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে শরিয়ত যা মানুষের অন্তরে প্রতিষ্ঠা করেছে, সেগুলো মানুষের অন্তর থেকে মুছে দিতে লাগল।
কোরআন ও হাদিস বিভিন্নভাবে আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর গুণাবলি মানুষের অন্তরে প্রতিষ্ঠা করেছে। সেখানে কিছু সাদৃশ্যপূর্ণ শব্দও ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন,
ثم استوى على العرش، بل يداه مبسوطتان، ينزل إلى السماء الدنيا، ويضحك ويغضب ...ইত্যাদি।
যদিও এই অভিব্যক্তিগুলো বাহ্যিকভাবে কোনো সাদৃশ্যের কল্পনাকে আবশ্যক করে তোলে; কিন্তু এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রথমে অস্তিত্ব প্রমাণ করা। এরপর শরিয়ত যখন দেখল এগুলো শোনার সময় অন্তরের মধ্যে সাদৃশ্যের এক ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, তখন এটাকে একবারে রহিত করে দেওয়া হলো এই বাণীর মাধ্যমে-
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ তার মতো কিছুই নেই। [সুরা শুরা: ১১]
এরপর মানুষের অন্তরে তার সাদৃশ্যহীনতা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। যতই কল্পনা আসুক—বাস্তবে তিনি কারও মতো নন। কিছুর মতো নন। এবং কোনো কিছুই তার মতো নয়। এভাবে মানুষেরা এই বিস্ময়কর কিতাব কোরআনের দিকে মনোনিবেশ করেছে। সাদৃশ্য থেকে মুক্তি পেয়েছে।
কিন্তু একটি সম্প্রদায় এগুলো নিয়ে তৃপ্ত থাকেনি। তারা বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও সাদৃশ্যের পেছনে পড়েছে। তারা কেউ কোরআনের ব্যাপারে বলেছে, এটা ‘মাখলুক’ বা ‘সৃষ্ট’। এটা বলে মানুষের অন্তর থেকে তার সমীহ সম্মান নষ্ট করেছে। আবার বলেছে এটার অবতীর্ণ হওয়া কল্পনা করা যায় না। কারণ, কীভাবে গুণান্বিত সত্তা থেকে গুণ বিচ্ছিন্ন হবে। আমাদের সমুখে লিখিত কোরআন নিছক কিছু কালির আঁচড়। এভাবে তারা একে একে শরিয়ত যা প্রতিষ্ঠা করে গেছে, সেগুলো মুছে ফেলতে শুরু করেছে। তারা বলতে শুরু করেছে, আল্লাহ আসমানে নেই। আবার আরশে রয়েছে—সে কথাও বলা যাবে না। আবার কেউ বলেছে, না, আরশেই আছেন। যেহেতু কোরআনে আছে আরশে থাকার কথা।
এভাবে তারা বিভিন্ন ব্যাখ্যায় আপতিত হয়েছে। শরিয়তের সীমা অতিক্রম করেছে। তারা আল্লাহর কথা- ثم استوى على العرش -এই কথার ওপর সীমিত থাকেনি। বরং এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে গিয়েছে। আর তাতেই তারা বিভ্রান্তিতে আপতিত হয়েছে।
কেউ আবার শুধু বাহ্যিক অর্থ ধরেই বসে আছে। এটাও বিভ্রান্তিকর। আল্লাহর হাত, মুখ, রাগ, হাসি ইত্যাদি বাহ্যিক অর্থেই গ্রহণ করেছে। যেন এটা সেই বোকা আরব জোহার গল্পের মতো। গল্পটি এমন—ছেলেটির নাম জোহা। ভীষণ বোকা। একবার তার মা দূরে কোথাও যাবার সময় তাকে বলে গেল, 'احفظ الباب - দরজা সংরক্ষণ করে রেখো'। এ কথা বলে মা বাইরে বেরিয়ে গেল। মা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তারও কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলো। মায়ের কথামতো সে ঘর থেকে দরজা উঠিয়ে সাথে নিয়ে হাঁটা দিলো। এদিকে চোর-চামারেরা ঘরের সকল মূল্যবান জিনিস হাতিয়ে নিল।
মা কিছুদিন পর বাড়ি ফিরে অবস্থা দেখে ছেলেকে তিরস্কার করে বললেন, বাবা, তুমি এটা কী করেছ? ঘরে চোর ঢুকল কীভাবে?
জোহা সরলভাবে বলল, কেন, তুমিই তো আমাকে দরজা সংরক্ষণ করার কথা বলেছ। তুমি তো ঘর সংরক্ষণের কথা বলোনি!
ঠিক এমনই তাদের বুদ্ধির জোর।
এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের কথা এই বোকা জোহার চেয়েও নিম্নতম। আল্লাহ দাঁড়িয়ে আছেন না বসে আছেন— তারা সেই ঝগড়া বাঁধায় এবং মত প্রকাশ করে যে, আল্লাহ দাঁড়িয়েই আছেন। প্রমাণ কী? প্রমাণ হলো, কোরআনে ইরশাদ হয়েছে—
(قَائِمًا بِالْقِسْطِ)
তিনি ন্যায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। [সুরা আলে ইমরান: ১৮]
কিন্তু তাদেরকে কে বোঝাবে এই 'দাঁড়ানো' তো নিছক 'দাঁড়িয়ে থাকা' নয়।
এসকল ব্যাপারে আমাদের গ্রহণ করতে হবে 'সালাফে সালেহিনের' পথ ও পদ্ধতি। হজরত আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন,
من ضيق علم الرجل أن يقلد في دينه الرجال.
কোনো ব্যক্তির ইলমের অনুপস্থিতির প্রমাণ হলো সে দ্বীনের ক্ষেত্রে লোকদের অনুসরণ করে।
সুতরাং আমি তোমার ব্যাপারে বলি, তুমি যাদের ব্যাপারে অন্তরে বড় ধারণা রাখো, যাদেরকে সম্মান করো, ধরো, তুমি তাদের থেকে কোনো কিছু শুনলে আর কোনো যাচাই ছাড়া তার অনুসরণ করা শুরু করে দিলে- এটা উচিত নয়। কখনো যদি এমন ব্যক্তিদের থেকে এমন কিছু শোনো, যা বিশুদ্ধ মূলনীতির বিপরীত, তাহলে ধরে নাও, এটা বর্ণনাকারীর পক্ষ থেকে ভুল হয়েছে। কারণ, ইতিমধ্যেই তোমার অভিজ্ঞতায় সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি নিজের পক্ষ থেকে কোনো ভুল মত ও মন্তব্য করেন না।
কিন্তু তারপরও যদি আমরা দেখি- এটি আসলে তিনিই বলেছেন এবং তা যদি দ্বীনের স্পষ্ট বিশুদ্ধ মূলনীতির বিপরীত হয়, তাহলে কিছুতেই তার অনুসরণ করা যাবে না- এমনকি তিনি যদি হজরত আবু বকর, হজরত উমর রাযিআল্লাহু আনহুমাও হন!
এটি এমন এক মূলনীতি-যার ওপর শক্তিমত্তার সাথে অটল ও অনড় থাকা আবশ্যক। এক্ষেত্রে মনের মাঝে সম্মানের স্থানে অধিষ্ঠ ব্যক্তিও যেন তোমাকে সামান্যতম টলাতে না পারে।
এগুলোর বিস্তারিত বর্ণনার উদ্দেশ্য হলো, এ কথাগুলো ভালোভাবে বুঝে রাখা যে, আমাদের দ্বীন-ধর্ম সর্বদিক দিয়ে নিরাপদ ও সংরক্ষিত। তবুও এর মাঝে কিছু সম্প্রদায় বাইরের কিছু প্রবেশ করাতে চায়- যা আমাদের কষ্ট দেয়। দ্বীনের ক্ষতি করে।
কিছু মূর্খ জাহেদ ব্যক্তি দ্বীনের মধ্যে এমন আজগুবি কিছু প্রবেশ করিয়েছে- যা মানুষের স্বভাবের বিরুদ্ধ। তাদের এই কাজগুলো দেখে দেখে মানুষরা দ্বীনের পথকে বড় কঠিন ও অসম্ভব ভাবতে শুরু করেছে।
আর এ ধরনের কথা ও কাজের অধিকাংশই ছড়িয়েছে ওয়াজের কেচ্ছা- কাহিনির মাধ্যমে। কারণ, সাধারণ ব্যক্তিরা তাদের ওয়াজের মজলিসে যায়, লোকগুলো হয়তো ভালোভাবে অজুও করতে পারে না, অথচ তাদের সামনে বর্ণনা হতে থাকে হজরত জুনায়েদ রহ.-এর সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কথাগুলো, হজরত শিবলী রহ.-এর মারেফতি বাক্যগুলো- তখন এই সাধারণ ব্যক্তিটিও ভেবে বসে, তাহলে দ্বীনের সঠিক পদ্ধতি হলো, লোকালয় বর্জন করা, পরিবার- পরিজনের জন্য উপার্জনের পেছনে না পড়া। নির্জনে একাকী আল্লাহর সাথে প্রার্থনায় মগ্ন হওয়া ইত্যাদি।
অথচ বাস্তবতা হলো, এই লোকটির নামাজের রোকনসমূহের জ্ঞান নেই। বিশুদ্ধভাবে কোরআন পড়তে পারে না। ইসলামের মৌলিক ধারণা নেই। কিন্তু তাকে সেই আলেম বা ওয়ায়েজ এই ইলমগুলোর কথা শিক্ষা দেয় না।
আর কেউ কেউ শরীরের স্বাভাবিক আহার গ্রহণ না করতে করতে শরীর শুকিয়ে ফেলে। অবশেষে তার শরীরের শক্তি নিঃশেষ হয়ে পড়ে। মস্তিষ্কে বিকৃতি আসে। দুর্বল অবসন্ন কল্পনায় আজগুবি অনেক কিছু দেখে। এমন অনেককে দেখেছি, যারা লোকালয় ছেড়ে নির্জনে বসবাস করছে। ক্লান্তিতে অবসন্ন। তাদের কাউকে যদি বলা হয়, কোনো অসুস্থকে দেখতে যাও। তখন সে বলে, এটা আমার অভ্যাস নয়।
আমরা বলি, আল্লাহ এমন অভ্যাসের প্রতি লানত বর্ষণ করুন, যা শরিয়তের বিপরীত। এমন আরও অনেক কেচ্ছা-কাহিনি ও শরিয়তবিরোধী উদ্ভট কাজগুলোকেই সাধারণ মানুষ শরিয়ত মনে করে বসছে। আর ভাবছে- আলেম ফকিহগণ যার ওপর রয়েছে, সেটা শরিয়ত নয়। এভাবেই তারা বিভ্রান্ত হচ্ছে।
অথচ মূর্খ জাহেদদের দিকে কেউ ভ্রুক্ষেপই করছে না- সে যা করছে তা শরিয়তে বৈধ কি না?
কেউ কেউ নিজের ভাব-মর্যাদা রক্ষার জন্য না জেনে, না বুঝেই বিভিন্ন ফতোয়া ও নির্দেশনা দিচ্ছে। যাতে কেউ বলতে না পারে 'শাইখ কিছু জানে না'।
শাইখ আবু হাকিম রহ. আমার কাছে একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, আমি একবার শরিফ দাহালাতির সাথে দেখা করতে তার নিকট উপস্থিত হই। সে সময় কেউ একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করে, তিন তালাকপ্রাপ্তা এক মহিলা, যার একটি ছেলে সন্তান আছে, সে কি তিন তালাকের পর তার এই স্বামীর জন্য বৈধ হবে?
আমি বললাম, না, আল্লাহর কসম, বৈধ হবে না।
এ সময় শরিফ আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠল, আপনি চুপ করুন। আমি তো এখান থেকে বসরা পর্যন্ত সকল মানুষকে ফতোয়া দিয়ে আসছি, সে মহিলা বৈধ হবে!
শাইখ আবু হাকিম রহ. আমার কাছে আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করেন। এক কামার লোক নিজেকে ভীষণ পণ্ডিত ভাবত। একবার তার নিকট একটি মেয়ে আসে। মেয়েটির বিয়ের প্রয়োজন। লোকটি তাকে এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে করিয়ে দেয়। কিন্তু তার ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার ব্যাপারে তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করে না।
কিন্তু বিষয়টি যখন বিচারকের দরবারে উপস্থাপিত হয় এবং প্রমাণিত হয় যে, মেয়েটির ইদ্দত শেষ হয়নি, তখন বিচারক তাদের বিয়ে বাতিল করে দেয় এবং বিবাহ সম্পন্নকারীকে তিরস্কার করে।
এরপর মেয়েটি সেই লোকটির কাছে এসে বলে, আমি তো এসবের কিছু জানি না। কিন্তু আপনি আমাকে এ অবস্থায় বিয়ে করিয়ে দিলেন কীভাবে?
লোকটি বলল, তুমি রাখো এসকল বাহ্যিক জ্ঞানের লোকদের কথা। তুমি নিশ্চয় মনের দিক থেকে পবিত্র—তাতেই তো পবিত্র!
একবার একজন ফিকাহবিদ আমার কাছে একজন আবেদ ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা করে বলেন। লোকটি বহু বছর নামাজে ‘সাহু সিজদা’ দিয়ে আসছে। এবং সে মনে মনে বলে, হে আল্লাহ, আমি তো ভুল করিনি। কিন্তু এই ‘সাহু সিজদা’ দিই সতর্কতাস্বরূপ।
ফিকাহবিদ লোকটিকে বললেন, তোমার এভাবে পড়া সকল নামাজ নষ্ট হয়ে গেছে। কারণ, তুমি ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজের মধ্যে এমন অতিরিক্ত সিজদা দিয়েছ, শরিয়তে যার বৈধতা নেই।
এভাবে আমাদের দ্বীনে অতিরিক্ত যে বিষয়টি প্রবেশ করেছে—তা হলো সুফিতন্ত্র। তারা এমন সব পদ্ধতি অনুসরণ করছে, যার অধিকাংশই শরিয়তবিরোধী।
সাধারণ ধার্মিক মানুষও অনেক সময় অনেক বাড়াবাড়ি করে। আমাদের প্রায় সমসাময়িক এক ব্যক্তির ঘটনা বলি—আমরা তাকে চিনি। লোকটি একদিন জামে মানসুরে প্রবেশ করল এবং বলল, আমি আল্লাহর সাথে একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম; কিন্তু সেটা রক্ষা করতে পারিনি। এর শাস্তিস্বরূপ আমার নফসের ওপর এটা আবশ্যক করলাম যে, আমি ৪০ দিন কিছু খাব না।
এভাবে সে খাওয়া বন্ধ করে দিলো। দশদিন না খেয়ে অতিবাহিত হয়ে গেল। শরীর দুর্বল হয়ে গেল। তবুও সে খাবার গ্রহণ করল না। অনেকের চাপাচাপি সত্ত্বেও সে খাবার গ্রহণ করে না। এরপর আরও কিছুদিন অতিবাহিত হয়। মৃত্যুর কাছাকাছি উপনীত হয়। তবুও খাবার গ্রহণ করে না। এর কিছুদিন পর লোকটি মারাই গেল।
এই লোকটির কাণ্ড দেখো। সে যা করেছে, পুরো মূর্খতার বশে করেছে।
আবার কিছু সাধক ব্যক্তি নিজের চাহিদার সকল নিয়ামত ও স্বাদ-আস্বাদন থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখে। আর তাসাওউফ বলতে বোঝে অমসৃণ জামা, গামছা, প্যাঁচানো পাগড়ি- অথচ কোথা থেকে খাচ্ছে আর কোথা থেকে পান করছে, সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।
কেউ আছে, নিজের সম্পদ ও সম্মান সংরক্ষণের জন্য আমির-উমারা, কর্তৃত্বশীলদের সাথে মেলামেশা করছে, রেশমি কাপড় পরিধানকারীদের সাথেও মিশছে, মদখোরদের সাথেও চলছে।
আর কেউ আছে, বছরের পর বছর এমন কথার ওপর আমল করে আসছে, যার অধিকাংশের কোনো ভিত্তি নেই।
কেউ আবার গান-বাজনা, নৃত্য ও খেলাধুলার প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। এবং এর পেছনে বিভিন্ন যুক্তি দিতে শুরু করছে। কেউ বলছে, এর মধ্যে 'এশক'-এর ঝলক রয়েছে। কেউ বলছে, এতে করে মাহবুবের 'পরম সান্নিধ্য' প্রাপ্ত হওয়া যায়।
এই সকল পথই নষ্ট বিনষ্ট ও বিভ্রান্ত পথ। এতে করে সাধারণ লোকদের আরও নষ্ট করা হচ্ছে।
এ বিষয়গুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত বর্ণনার প্রয়োজন। আমি এ বিষয়ে একটি কিতাব লিখেছি। সেখানে সুন্দরভাবে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। তুমি সেখান থেকে দেখে নিতে পার। কিতাবটির নাম تلبيس ابليس 'ইবলিসের চক্রান্ত'।
এ ব্যাপারে এখানেও বিস্তারিত আলোচনার উদ্দেশ্য হলো, তুমি যেন স্মরণ রাখো, আমাদের দ্বীন হলো পূর্ণাঙ্গ, পরিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ। তুমি যদি এর সঠিক বুঝটি লাভ করতে পারো, তবে তুমি শুধু অনুসরণ করবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং তার সাহাবিদেরকে। এবং বর্জন করবে সকল নবোদ্ভাবিত মিথ্যা পথ ও পদ্ধতি। তুমি তোমার দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনো লোকের অনুসারী হবে না। আর এতটুকু যদি করতে পারো- তোমার জন্য আর কোনো নসিহত প্রয়োজন হবে না- ইনশাআল্লাহ।
তুমি বর্ণনাকারীদের বিভ্রান্তি থেকে সতর্ক থাকো। সতর্ক থাকো মুতাকাল্লিমিনদের অনুচিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থেকে, মূর্খ জাহেদদের দল থেকে, প্রবৃত্তির অনুসারীদের লোভ-লালসা থেকে। আমলহীন আলেমদের মত ও মন্তব্য থেকে। এবং ইলমহীন আবেদের কর্মকাণ্ড থেকে।
জেনে রেখো, আল্লাহ তাআলা যাকে তার অনুগ্রহ দ্বারা শক্তিশালী করেছেন, বুঝ-বুদ্ধি দান করেছেন, অন্যের অনুসরণের বন্ধন থেকে মুক্ত করেছেন এবং তার সময়ের কর্মবীর বানিয়েছেন, তিনি কখনো বাধাকে ভ্রুক্ষেপ করেন না। মানুষের মন্দ-নিন্দার দিকে তাকান না। তিনি তার শক্তিশালী দলিলের মাধ্যমে নিজের লাগাম বাঁচিয়ে স্পষ্ট পথে চলতে থাকেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এবং তোমাদেরকে মনের মাঝে সম্মানিত ব্যক্তিদের অন্ধ অনুসরণ থেকে মুক্ত করুন এবং তিনি আমাদেরকে তাঁর রাসুল ও তাঁর রাসুলের সাহাবিদের অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
৬৯. * ঠিক এই শব্দে হাদিসটি এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।
📄 সময়ের পরিক্রমা
জেনে রেখো, সময় কখনো একভাবে চলে না। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
﴿وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ﴾
এ তো দিন-পরিক্রমা, যা আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে বদলাতে থাকি। [সুরা আলে ইমরান : ১৪০]
সুতরাং কখনো দরিদ্রতা, কখনো সচ্ছলতা, কখনো সম্মান, কখনো অসম্মান। কখনো তুমি খুশি। কখনো খুশি শত্রুরা। কখনো কষ্ট, কখনো আনন্দ-সুখ। এর মধ্য থেকে সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে সকল সময় মৌলিক অবস্থায় অটল থাকে- আর তা হলো সর্বাবস্থায় তাকওয়া বা আল্লাহকে ভয় করে চলে। এভাবে চললে কী হবে?
সে যদি ধনী হয়, তার দ্বীনের শোভা-সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে। আর যদি গরিব হয়, ধৈর্যধারণ করবে। যদি সুস্থতা ও শান্তিতে থাকে, সকল নিয়ামতের শোকর আদায় করবে। আর যদি অসুস্থ বা কোনো বিপদে আপতিত হয়, তবে তা সহ্য করবে।
অর্থাৎ কোনো অবস্থায় তার কোনো ক্ষতি হবে না। যুগের ঢেউ যদি তাকে উঠায়-নামায়, তার অনুকূল বা প্রতিকূল হয়—কখনো ক্ষুধা কিংবা পেটপূর্ণ তৃপ্তি, কিছুই তাকে ক্ষতি করতে পারবে না।
কারণ, এসকল জিনিস সদা পরিবর্তনশীল। কখনো থাকে, কখনো থাকে না। কিন্তু 'তাকওয়া' হলো কোনো মানুষের মৌলিক সম্পদ—এটি তাকে সব সময় প্রহরীর মতো রক্ষা করে রাখে—সকল হোঁচট থেকে, পদস্খলন থেকে। এবং তাকে সকল সময় দ্বীনের সীমার মধ্যে সংরক্ষিত রাখে।
আর সাময়িক স্বাদ ও আনন্দ-উল্লাস যাকে বিভ্রান্ত করে, তাকওয়ার পথ ছেড়ে সাময়িক স্ফূর্তিতে যে গা ভাসায়, অচিরেই দেখা যায় তার অবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেছে। এই বিচ্যুতিই তাকে আরও বড় ক্ষতির মুখোমুখি করে ছাড়ে। আর তুমি যদি সর্বক্ষণ তাকওয়ার পথ অবলম্বন করে চলো, তবে সংকীর্ণতার মাঝেও প্রশস্ততা দেখতে পাবে, অসুস্থতার মধ্যেও সুস্থতার স্বাদ পাবে। এটি এমন এক ব্যাপার—তাড়াহুড়োকারীরা যার থেকে বঞ্চিত হয়। এবং ধৈর্যশীলদের জন্য এই পুরস্কার একেবারে নিশ্চিত ও নিরারুদ্ধ।
📄 প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ
আমি একবার এক আশ্চর্য বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করলাম। ভাবলাম একটি মৌলিক বিষয়ে। বিষয়টা হলো, মুমিনের ওপর পরীক্ষার আবির্ভাব ঘটা। তাকে এমন বিষয়ে পরীক্ষা করা হয়, যে বিষয়ে তার সক্ষমতা রয়েছে এবং আস্বাদন ও আকর্ষণ রয়েছে। এবং যা অর্জনে বা সংঘটনে তার কোনো কষ্ট পোহাতে হয় না। যেমন, নিরাপদ নির্জনে এমন প্রিয় কোনো জিনিস সহজলভ্য হওয়া— যাতে লিপ্ত হওয়া শরিয়তে নিষেধ।
আমি মনে করি, এসব স্থানে ঈমান এমনভাবে প্রকাশ পায়, যা দু-রাকাত নামাজের ক্ষেত্রেও হয় না। আল্লাহর কসম, হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম ঠিক এই ধরনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই তো এমন শ্রেষ্ঠত্বের কাতারে শামিল হয়েছেন। হে আমার সাথিভাই, একবার সেই নির্জন নিরাপদ চিত্তাকর্ষক পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে দেখুন তো, এমন পরিস্থিতিতে তিনি যদি তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করতেন, তিনি কি আজ এই সীমাহীন মর্যাদা ও পবিত্রতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারতেন? এমনই হয়।
এ ধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ কাউকে এভাবেই এত উপরে তুলে ধরেন! তাই প্রতিটি সাময়িক স্ফূর্তি ও ভোগের সময় পরিস্থিতির অনুধাবন নিজের জন্য ঢাল বানিয়ে নাও। সাময়িক উত্তেজনায় লিপ্ত হয়ে যেয়ো না।
কারণ, এভাবেই মুমিনের সামনে অবৈধ আস্বাদনের বিষয়গুলো উপস্থাপিত হয়। এগুলোকে যেন সে নফসের যুদ্ধের ময়দান হিসেবে দেখতে পায়; কিন্তু যখনই সে পরিণামের চিন্তা-ভাবনার সৈন্য পাঠাতে বিলম্বিত করবে, তখনই সে পরাজিত হবে।
এগুলোর মুখোমুখি ব্যক্তিদের যেন আমি নিজ চোখে দেখতে পাই, পরিস্থিতির ভাষা তাকে যেন ডেকে বলে, বাছা, তুমি তোমার স্থানে দৃঢ় ও অটল থাকো, নতুবা সাময়িক উত্তেজনায় তুমি তোমার নফসের জন্য যা নির্বাচন করবে, তা পরিণামে তোমার আফসোস, ক্রন্দন ও অনুতাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
তাছাড়া এই গোনাহের গর্তে আপতিত হওয়ার পর বাহ্যিকভাবে কেউ আর নিরাপদে ফিরে আসতে পারে না। কেউ যদি ফিরে আসেও, তবুও তার গায়ে পঙ্কিলতার আবর্জনা লেগে যায়। কত ব্যক্তিই তো এরপর আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। কিংবা তার পদস্খলনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। ভেবে দেখো, ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল, অবস্থা এতটা স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছিল যে, হাত বাড়িয়ে প্রার্থনা করতে হয়েছিল- تصدق علينا - আমাদের কিছু দান করুন।
কিন্তু কেউ যদি তাদের অবস্থা আর নিজেদের অবস্থা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, তবে একটি পার্থক্য দেখতে পাবে। ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের তাওবা কবুল করা হয়েছিল। নবীর মাধ্যমে তারা তাদের দুআ কবুল করিয়েছে।
কিন্তু আমাদের অবস্থা!
সুতরাং হে সাথিবৃন্দ, সাময়িক অবৈধ উৎফুল্লতার সময় নফসের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। নফসের লাগামকে দৃঢ়ভাবে আটকে ধরো।
📄 অক্ষম মানুষের প্রার্থনা
একটি আশ্চর্য বিষয় নিয়ে চিন্তা করলাম। আর তা হলো- মুমিনের ওপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের বিপদ আসে। এ জন্য সে দুআ করতে থাকে। বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য অনেক আকুতি-মিনতি করতে থাকে। কিন্তু হয়তো অনেক দিন এর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না, দুআ কবুলের কোনো আলামত পাওয়া যায় না। অবশেষে যখন সে একেবারে হতাশার কাছাকাছি উপনীত হয়ে যায়, তখন তার অন্তরের দিকে লক্ষ করা হয়, তখনো সে যদি 'তাকদির'-এর ওপর সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ না হয়, তখন দ্রুত তার ডাকে সাড়া প্রদান করা হয়। কেননা, বিপদের এই মুহূর্তে এসেই ঈমানের চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়া হয়। উত্তীর্ণ হতে পারলে শয়তান পরাজিত হয়। পরীক্ষার এই অবস্থাতে এসেই মানুষের মর্যাদার উন্নতি কিংবা অবনতি প্রকাশিত হয়।
আল্লাহ তাআলা এদিকে ইশারা করে বলেন,
حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرُ اللَّهِ قَرِيبٌ )
এমনকি রাসুল এবং তাঁর ঈমানদার সঙ্গীগণ বলে উঠেছিল, আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? জেনে রেখো, আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটেই। [সুরা বাকারা : ২১৪]
এমনটাই ঘটেছিল হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে। প্রথমে তার একটি সন্তান হারায়। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়। এরপর তার ছোট আরেকটি সন্তান বিনইয়ামিনও তার সান্নিধ্যহারা হয়। এ সময়ও তিনি তার প্রতিপালকের অনুগ্রহের আশা থেকে নিরাশ না হয়ে বলেছিলেন,
عَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَنِي بِهِمْ جَمِيعًا )
আল্লাহর প্রতি আশা, তিনি সকলকেই আমার কাছে আবার এনে দেবেন। [সুরা ইউসুফ : ৮৩]
এমনিভাবে হজরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম বলেছেন,
وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا )
হে আমার প্রতিপালক, আমি আপানাকে ডেকে কখনো ব্যর্থ হইনি। [সুরা মারইয়াম : ৪]
সুতরাং, তুমি কিছুতেই দুআ কবুলের সময়টাকে কখনোই বিলম্বিত ভেবো না। এটা স্মরণে রাখো, তিনি তোমার প্রতিপালক। সকল বিষয়ে সবচেয়ে বেশি প্রজ্ঞাবান। সর্বাধিক কল্যাণ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি তিনিই অবহিত।
আবার এদিকেও খেয়াল রাখতে হবে, হয়তো তিনি এর মাধ্যমে তোমার আন্তরিক ঈমানের পরীক্ষা নিতে চান। তিনি চান, তুমি যেন এই কারণে তার কাছে মিনতি করো, বিনয়ী হও। তিনি হয়তো এই বিপদে তোমার ধৈর্যধারণের প্রতিদান দিতে চান। কিংবা তিনি পরীক্ষা করতে চান, ঈমানের এই পরীক্ষায় ইবলিসের ওয়াসওয়াসার সাথে তুমি যুদ্ধ করে বিজয়ী হতে পারো কি না? আর যদি এগুলোই তিনি ইচ্ছা করে থাকেন, তবে এগুলো তার অনুগ্রহের ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করে। এ জন্য তোমার বরং শোকর আদায় করা উচিত।
কারণ, এই বিপদের মাধ্যমে তিনি তোমাকে তার কাছে প্রার্থনাকারীর উপযুক্ত করে তুলেছেন। তোমাকে তার দিকে ঝুঁকিয়ে নিয়েছেন। আর কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয়গ্রহণ করা—এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে!