📄 মুমিন ও গোনাহ
মুমিন কখনো গোনাহের ওপর বাড়ন্ত হতে পারে না। কারণ, এটি গোনাহের প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কামনার আগুনকে প্রজ্বলিত করে। এবং পরিণামে অধঃপতিত করে।
কারণ, এর রয়েছে একটি দীর্ঘ পরিক্রম প্রবণতা—একজন মুমিন কিছুতেই তাতে আপতিত হতে পারে না। সে কখনো গোনাহ থেকে ফারেগ হয়ে তাতে আবার ফিরে যেতে পারে না। সে রাগান্বিত হলে, কিছুতেই প্রতিশোধে সীমালঙ্ঘন করে না। আর অক্ষমতার আগেই তাওবা করে নেয়।
তুমি একবার ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের কথা চিন্তা করে দেখো—তারা মূলত ইউসুফকে রেখে আসার আগেই তাওবার নিয়ত করেছিল। তারা প্রথমে বলল, اقتلوا يوسف — তোমরা ইউসুফকে হত্যা করো। কিন্তু এরপর এটাকে তাদের নিকট অনেক নিষ্ঠুর মনে হলো। এ কারণে তারা এবার বলল, أو اطرحوه أرضا — কিংবা তাকে কোনো দূরবর্তী জায়গায় ফেলে এসো। এরপর তারা তখনই ভালো হওয়ার প্রতি দৃঢ় ইচ্ছা ব্যক্ত করল। তারা বলল, وتكونوا من بعده قوما صالحين —এরপর তোমরা খুব ভালো দল হয়ে থাকবে।
এরপর তারা যখন হজরত ইউসুফকে সাথে নিয়ে মরুভূমির দিকে বের হলো, তাদের অন্তরের হিংসার কারণে প্রথমে তারা তাকে হত্যা করারই ইচ্ছা করল। কিন্তু তাদের বড়ভাই বললেন, لَا تَقْتُلُوا يُوسُفَ وَأَلْقُوهُ فِي غَيَابَتِ الْجُبِّ তোমরা তাকে হত্যা করো না। বরং তোমরা তাকে কুয়ার অন্ধকারে ফেলে রেখে এসো।
আর ফেলে রাখার মাধ্যমে তাকে হত্যা করার ইচ্ছা তিনি করেননি। বরং ইচ্ছা করেছেন যে, কোনো মুসাফির দল তাকে তুলে নিয়ে যাবে। এবার সকলেই বড় ভাইয়ের কথাকেই মেনে নিল।
মানুষের ঈমান ও কর্মের মধ্যে এই ভিন্নতার কারণ হলো, অন্তরের কুঠুরির মধ্যে ঈমান তার শক্তি অনুযায়ী ঘুরতে থাকে। কখনো তা শক্তিশালী হয়ে সংকল্পে সুদৃঢ় হয়। কখনো দুর্বল হয়ে গোনাহের দিকে ধাবিত হয়। কখনো ভালো কাজ করে। কখনো আবার ছেড়ে দেয়। কিন্তু এভাবে যখন উদাসীনতা ও গাফিলতি প্রাধান্য বিস্তার করে, অব্যাহতভাবে গোনাহ সংঘটিত হতে থাকে, তখন মেজাজ ও স্বভাবও নষ্ট হয়ে যায়।
অতএব, এখনই... এখনই ঈমানকে আমলের জন্য জাগ্রত করে তোলো। গোনাহের জন্য তাওবা করো। তাহলে দেখবে, এই অনুশোচনাতেও এমন মজা ও আনন্দ পাবে- সেই গোনাহে লিপ্ত হওয়ার সময়ও যা তুমি পাওনি।
📄 ইলমের ক্ষেত্রে প্রবঞ্চনা
আমার মতে- পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয় হলো ইলমের মধ্যে প্রবৃদ্ধি লাভ করা। কারণ, যে ব্যক্তি যতটুকু জেনেছে, তার ওপরই যদি সে সীমাবদ্ধ থাকে এবং এটাকেই যথেষ্ট মনে করে, তাহলে সে তার সিদ্ধান্তে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে এবং নিজের প্রতি নিজের শ্রেষ্ঠত্ববোধের কারণে অন্যের থেকে তার উপকৃত হওয়ার রাস্তা রুদ্ধ হয়ে পড়ে। বিভিন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা তার ভুলকে প্রকাশ করে তোলে, কিন্তু নিজের ব্যাপারে আত্মগর্বী হওয়ার কারণে সে কখনো সেই ভুল থেকে ফিরে আসার সৎসাহস দেখায় না।
কিন্তু সে যদি অন্যের থেকে উপকৃত হওয়ার মানসিকতা পোষণ করত, তবে এটা তাকে সকলের সমপর্যায়ে এনে দিত। এবং সেই ভুল থেকে ফিরে আসা তার জন্য সহজ হতো।
অপূর্ণ ইলমের একটি উদাহরণ বর্ণনা করেছেন ইবনে আকিল রহ.। তিনি বলেন, আবুল মাআলি আল জুওয়াইনি রহ. বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَعْلَمُ جُمَلَ الْأَشْيَاءِ وَلَا يَعْلَمُ التَّفَاصِيلَ.
নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সকল কিছু সামগ্রিকভাবে জানেন, কিন্তু প্রতিটি বিষয় বিস্তারিত খুঁটে খুঁটে জানেন না।’
আমি জানি না, ইলমের মাঝে কতটা কমতি ও মূর্খতা থাকলে এমন কথা বলা যায়!
এভাবে আরও অনেকেই তাদের অজ্ঞতা, মূর্খতা ও একগুঁয়েমির কারণে সকলের সর্বসম্মত মতকে বর্জন করে ভিন্ন মত পোষণ করেছে। এবং এক্ষেত্রে তাদের কোনো শক্তিশালী দলিলও নেই। তাদের মুক্তির কি কোনো পথ আছে?
কেউ যদি মনে করে তার কিতাবের মধ্যে কিছু ভুল-ভ্রান্তি থাকতে পারে এবং সেগুলো সীমাহীন নয়, তবে তার জন্য উচিত হলো, সমসাময়িক গ্রহণযোগ্য আলেমদের সেটা দেখানো। এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্ববোধকে বর্জন করা। তাহলে আশা করা যায়, তিনি সঠিক পথে থাকতে পারবেন। নতুবা ইলমের ওপর ব্যক্তির এই সীমাবদ্ধতা যদি নিজেকে প্রদর্শনের জন্য হয়ে থাকে, তবে তার বিশুদ্ধতার পথ চির রুদ্ধ হয়ে পড়বে।
এমন অবস্থা থেকে আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় চাই।
📄 ইবাদতের মাধ্যমে অনুগ্রহ
আল্লাহ তাআলা কোরআনে ইরশাদ করেন-
يَمُنُّونَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوا قُلْ لَا تَمُنُّوا عَلَيَّ إِسْلāmَكُمْ بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَاكُمْ لِلْإِيمَانِ)
তারা ইসলাম গ্রহণ করে তোমার উপকার করেছে বলে মনে করে। তাদেরকে বলে দাও, তোমরা তোমাদের ইসলাম দ্বারা আমাকে উপকৃত করেছ বলে মনে করো না; বরং তোমরা যদি বাস্তবিকই (নিজেদের দাবিতে) সত্যবাদী হও, তবে (জেনে রেখো) আল্লাহই তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তোমাদেরকে ঈমানের হেদায়াত দান করেছেন। [সুরা হুজুরাত : ১৭]
আমি এই আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এক আশ্চর্যতম অর্থের সন্ধান পেলাম। আর সেটা হলো, যেহেতু তাদেরকে মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি দান করা হয়েছে এবং এই জ্ঞান-বুদ্ধি দ্বারা চিন্তা-ভাবনা করে মূর্তিপূজার দোষ-ত্রুটিগুলো তারা ধরতে পেরেছে এবং তারা বুঝতে শিখেছে যে, এগুলো কিছুতেই ইবাদত বা উপাস্যের উপযুক্ত সত্তা নয়, তাই তারা তাদের ইবাদত বা উপাসনাকে ফিরিয়েছে এমন সত্তার দিকে- যিনি সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন।
তাদের এই বুঝ-বুদ্ধি বা উপলব্ধিটা হয়েছে মানুষের স্বাভাবিক সেই বুদ্ধি- বিবেকের প্রতিফলে- যার দ্বারা মানুষ চতুষ্পদ জন্তু থেকে ভিন্নতার দাবিদার। তারা তো মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধি-বিবেকের নির্দেশানুসারে ঈমান আনল, কিন্তু যিনি এই জ্ঞান দান করেছেন- তার সম্পর্কেই থেকে গেল বেখেয়াল।
ঠিক এই একই ব্যাপার ঘটে প্রতিটি ধর্মানুসারী ইবাদতকারী ও ইলমে ইজতেহাদকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে। তারা তো সচেতনতার সাথে, বুঝ-বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার সাথে সঠিক পথটি বেছে সেদিকে ধাবিত হয় এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। কিন্তু এই বুঝ-বুদ্ধি ও জ্ঞান-প্রজ্ঞা দিয়েছেন কে? বহু মানুষের অজ্ঞতা ও মূর্খতার মধ্য থেকে যিনি তাকে নির্বাচন করেছেন এবং যোগ্যতা প্রদান করেছেন- শুকরিয়া তো শুধু তারই করা উচিত। এগুলো তো তার নিজের ক্ষমতার বলে হয়নি—স্রষ্টাই তাকে প্রদান করেছেন। কিন্তু মানুষের দৃষ্টি সব সময় নিজের কর্মের দিকেই ধাবিত হয়। সকল কর্মে নিজের কৃতিত্ব দেখতে পাই।
এই জাতীয় একটি ঘটনা হলো সেই তিন ব্যক্তির ঘটনা—যারা একটি গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। হঠাৎ একটি প্রকাণ্ড পাথর তাদের গুহার মুখে এসে পড়ে এবং বের হওয়ার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তখন তারা নিরুপায় হয়ে বলে, এসো, আমরা আমাদের ভালো কাজের ওসিলা দিয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করি। এরপর তারা একে একে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে বলতে লাগল—আমি এটা করেছি... আমি এটা করেছি... আমি এটা করেছি... এই ওসিলায় খোদা হে, আমাদের এই বিপদ থেকে মুক্ত করো।
কিন্তু তারা যদি নির্ভুলভাবে নিয়ামতদাতার নিয়ামতের প্রতি লক্ষ করত এবং তিনি অন্যদের চেয়ে তাদের প্রতি সেই নিয়ামতগুলো প্রদানের মাধ্যমে যে অনুগ্রহ করেছেন, সে অনুগ্রহের ওসিলা দিত, তাহলে তাদের এই ওসিলা প্রদান আরও সুন্দর হতো।
কিন্তু তারা প্রার্থনা করছে নিজেদের কাজের ওসিলা দিয়ে। তারা এই ধারণা করছে যে, এগুলো তারাই করেছে তাদের শক্তিতে। এ কারণে তাদের প্রতিদান পাওনা হয়েছে।
এক্ষেত্রে তারা আসলে সঠিকতায় ছিল না। আর তাদের প্রার্থনায় যে সাড়া দেওয়া হয়েছে, তা তো তাদের প্রতি আল্লাহ তাআলার অব্যাহত অনুগ্রহের ধারাবাহিকতা হিসেবেই। তাদের সেই আমলের ওসিলা এখানে মুখ্য নয়।
কোনো মুত্তাকি ব্যক্তির তাকওয়ার বিষয়টিও এমনই। অথচ কেউ কেউ তার তাকওয়ার কারণে নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভেবে চলতে থাকে। ফাসেক গোনাহগারদের হেয় জ্ঞান করে এবং তাদের ওপর নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করে। এটা আসলে আত্মশুদ্ধির পথে খুবই বিপর্যয়কর একটি অবস্থা। এমনকি এটি তাকে তাকওয়া থেকে বের করে দেয়।
অবশ্য আমি তোমাকে এটা বলি না যে, তুমি পাপাচারী-পাপিষ্ঠদের সামনে নিজেকে হেয়জ্ঞান করে চলাফেরা করো; বরং বলতে চাই, তুমি ভেতরে ভেতরে তাদের ব্যাপারে ক্ষুব্ধ থাকবে। বাহ্যিকভাবে উপেক্ষা করে চলবে। এরপর তাদের ‘তাকদির’-এর বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দেবে। তাদের ব্যাপারে অহংকারী হবে না। কারণ, তাদের অধিকাংশই জানে না—তারা কার অবাধ্যতা করছে। তাদের একটি বড় অংশ মূলত অবাধ্যতার ইচ্ছাও করে না। তারা আসলে প্রবৃত্তির খপ্পরে পড়ে আছে। প্রবৃত্তির অবাধ্য হওয়া তাদের জন্য অসাধ্যের মতো হয়ে গেছে। এবং তাদের মধ্যে এমনও কেউ আছে, যে আল্লাহ তাআলার ক্ষমার বিষয়টাকেই প্রাধান্য দিয়ে বসে আছে। ক্ষমার ক্ষেত্রে তার দৃঢ় বিশ্বাস থাকার কারণে সে তার গোনাহগুলোকে হালকা করে দেখছে। এটা ঠিক, তাদের এই কর্মগুলো এবং তাদের এই ধারণা তাদের কোনো ওজর বা আপত্তি হিসেবে গ্রহণীয় হবে না।
কিন্তু তুমি—হে তাকওয়ার দাবিদার, জেনে রেখো, তাদের বিপক্ষে দলিল থাকার চেয়ে তোমার বিপক্ষে দলিল রয়েছে বেশি এবং অবধারিতভাবে। কারণ, তুমি খুব ভালোভাবেই জানো, তুমি কার অবাধ্যতা করছ এবং ভালোভাবেই জানো, তুমি কী করছ!
বরং সতর্কতার সাথে আল্লাহ তাআলার কর্মপদ্ধতির দিকে লক্ষ রেখো—কখন তার করুণা কোন দিকে ধাবিত হয় এবং তার ক্রোধ কার ওপর আপতিত হয়—কেউ জানে না। হয়তো তুমিই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে আর কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক জুড়ে নিল! (আল্লাহ হেফাজত করুন)।
সুতরাং এটা খুব আশ্চর্যের কথা, কেউ তার অর্জিত ইলম দ্বারা অন্যদের উদ্বুদ্ধ করে, অন্যদের শেখায়—অথচ যিনি এই নিয়ামতগুলো তাকে দিয়েছেন, তাঁকেই সে ভুলে থাকে। এই যোগ্যতা যিনি দিয়েছেন, তাঁর কথাই সে স্মরণে রাখে না।
📄 বিদআত ও সাদৃশ্যপন্থিদের কাণ্ড
জেনে রাখো, আমাদের শরিয়তের মূল ভিত্তিগুলো খুবই মজবুত এবং এর নিয়ম-নীতিগুলো খুবই সুগঠিত ও সুশৃঙ্খলিত। এর মধ্যে কোনো দুর্বলতা ও অস্পষ্টতা নেই। এবং আগের আসমানি প্রতিটি শরিয়ত বা ধর্মও এমনটিই ছিল। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে বিপর্যয় ঘটিয়েছে মূর্খ এবং দ্বীনের ক্ষেত্রে নব উদ্ভাবনকারীরা অর্থাৎ বিদআতিরা।
যেমন খ্রিষ্টধর্মে... তারা দেখল যে, হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের হাতে মৃত ব্যক্তি জীবিত হচ্ছে, তখন তারা এই অলৌকিক ঘটনাকে ধারণা করল, এটি মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়। এ কারণে তারা তাকে ইলাহ বা উপাস্যের পর্যায়ে নিয়ে বসাল।
কিন্তু তারা যদি হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের সত্তা ও ব্যক্তি-প্রকৃতি সম্পর্কে একটু চিন্তা-ভাবনা করে দেখত, তাহলে তারা জানতে পারত- তিনি নিজেই অনেক অসম্পূর্ণতা, প্রয়োজন ও পরনির্ভরতার সমন্বয়ে গঠিত। অন্তত এতটুকু তো কারও ইলাহ বা উপাস্য না হওয়ার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ দলিল। তাহলে তার হাতে যা সংঘটিত হয়েছে, নিশ্চয় তা অন্যের কাজ। অন্য কোনো ক্ষমতাশালী সত্তা এগুলো তার মাধ্যমে সংঘটিত করেছেন। কিন্তু তারা এই সঠিক পথে চিন্তা না করায় বিভ্রান্ত হয়েছে।
এমনিভাবে তারা ধর্মের আরও বহু শাখা-প্রশাখাগত বিষয়েও বিকৃতি সাধন করেছে। যেমন বর্ণিত আছে, তাদের রোজা ছিল একমাস। কিন্তু তারা এর সাথে ২০ দিন বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। এরপর আরও বিকৃতি ঘটিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো এটিকে বছরে চার মাসে উত্তীর্ণ করেছে।
ঠিক একইভাবে ইহুদিরাও তাদের দ্বীনের মূল ও শাখাগত বিষয়ে বিকৃতি সাধন করেছে। এবং এই উম্মতের মধ্যে পদ্ধতিগত বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ভ্রষ্টতার মধ্যে নিপতিত হয়েছে এই জাতিটি। যদিও একসময় তাদের অধিকাংশ ব্যক্তিই শিরক, সন্দেহ ও বড় ধরনের প্রকাশ্য বিরোধিতা থেকে মুক্ত ছিল। কেননা, তারা ছিল জাতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ও বুদ্ধিমান। কিন্তু শয়তান যখন তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হয়েছে, তারাও শয়তানি চক্রান্তে নিমজ্জিত হয়েছে। এরপর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে শয়তানেরও এখন আর তাদেরকে বিভ্রান্ত করতে হয় না। তারা নিজেরাই এক-একটি আস্ত শয়তান হয়ে অন্যদের ভ্রষ্টতার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করে চলেছে।
বিকৃতির ঠিক এই অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাঁর শেষ নবীর ওপর সর্বশেষ কিতাব অবতীর্ণ করলেন। সেখানে এই কিতাবের পরিচয় সম্পর্কে বলা হলো,
﴿مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ আমি এই কিতাবে কিছুমাত্র ত্রুটি রাখিনি। [সুরা আনআম: ৩৮]
এছাড়া যে বিষয়গুলো বুঝতে কষ্টকর, ব্যাখ্যার প্রয়োজন, সেগুলো বর্ণনা করা হয়েছে রাসুলের সুন্নাতের মাধ্যমে। যেমন আল্লাহ তাআলা নিজেই এ বিষয়টি বর্ণনা করে বলেন,
﴿وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ (হে নবী,) আমি তোমার প্রতিও এই কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষের সামনে সেইসব বিষয়ের ব্যাখ্যা করে দাও, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে। [সুরা নাহল : ৪৪]
এভাবে কোরআন ও সুন্নাহের ব্যাখ্যার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দ্বীন সম্পর্কে বলেছেন,
تركتكم على بيضاء نقية. আমি তোমাদের একটি স্বচ্ছ শুভ্র ও স্পষ্ট দ্বীনের ওপর রেখে গেলাম। ৬১
কিন্তু এরপর এমন একটি দলের আগমন ঘটল, তারা যেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বর্ণনা ও ব্যাখ্যার প্রতি পরিতৃপ্ত নয়। তারা তাঁর সাহাবিদের পথ-পদ্ধতির অনুসরণে সন্তুষ্ট নয়। তারা নিজেরা বিভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুরু করল। এবং নিজেরাও বিভিন্ন দলে ও মতে বিভক্ত হয়ে পড়ল।
তাদের মধ্যে একটি দল, দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে শরিয়ত যা মানুষের অন্তরে প্রতিষ্ঠা করেছে, সেগুলো মানুষের অন্তর থেকে মুছে দিতে লাগল।
কোরআন ও হাদিস বিভিন্নভাবে আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর গুণাবলি মানুষের অন্তরে প্রতিষ্ঠা করেছে। সেখানে কিছু সাদৃশ্যপূর্ণ শব্দও ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন,
ثم استوى على العرش، بل يداه مبسوطتان، ينزل إلى السماء الدنيا، ويضحك ويغضب ...ইত্যাদি।
যদিও এই অভিব্যক্তিগুলো বাহ্যিকভাবে কোনো সাদৃশ্যের কল্পনাকে আবশ্যক করে তোলে; কিন্তু এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রথমে অস্তিত্ব প্রমাণ করা। এরপর শরিয়ত যখন দেখল এগুলো শোনার সময় অন্তরের মধ্যে সাদৃশ্যের এক ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, তখন এটাকে একবারে রহিত করে দেওয়া হলো এই বাণীর মাধ্যমে-
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ তার মতো কিছুই নেই। [সুরা শুরা: ১১]
এরপর মানুষের অন্তরে তার সাদৃশ্যহীনতা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। যতই কল্পনা আসুক—বাস্তবে তিনি কারও মতো নন। কিছুর মতো নন। এবং কোনো কিছুই তার মতো নয়। এভাবে মানুষেরা এই বিস্ময়কর কিতাব কোরআনের দিকে মনোনিবেশ করেছে। সাদৃশ্য থেকে মুক্তি পেয়েছে।
কিন্তু একটি সম্প্রদায় এগুলো নিয়ে তৃপ্ত থাকেনি। তারা বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও সাদৃশ্যের পেছনে পড়েছে। তারা কেউ কোরআনের ব্যাপারে বলেছে, এটা ‘মাখলুক’ বা ‘সৃষ্ট’। এটা বলে মানুষের অন্তর থেকে তার সমীহ সম্মান নষ্ট করেছে। আবার বলেছে এটার অবতীর্ণ হওয়া কল্পনা করা যায় না। কারণ, কীভাবে গুণান্বিত সত্তা থেকে গুণ বিচ্ছিন্ন হবে। আমাদের সমুখে লিখিত কোরআন নিছক কিছু কালির আঁচড়। এভাবে তারা একে একে শরিয়ত যা প্রতিষ্ঠা করে গেছে, সেগুলো মুছে ফেলতে শুরু করেছে। তারা বলতে শুরু করেছে, আল্লাহ আসমানে নেই। আবার আরশে রয়েছে—সে কথাও বলা যাবে না। আবার কেউ বলেছে, না, আরশেই আছেন। যেহেতু কোরআনে আছে আরশে থাকার কথা।
এভাবে তারা বিভিন্ন ব্যাখ্যায় আপতিত হয়েছে। শরিয়তের সীমা অতিক্রম করেছে। তারা আল্লাহর কথা- ثم استوى على العرش -এই কথার ওপর সীমিত থাকেনি। বরং এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে গিয়েছে। আর তাতেই তারা বিভ্রান্তিতে আপতিত হয়েছে।
কেউ আবার শুধু বাহ্যিক অর্থ ধরেই বসে আছে। এটাও বিভ্রান্তিকর। আল্লাহর হাত, মুখ, রাগ, হাসি ইত্যাদি বাহ্যিক অর্থেই গ্রহণ করেছে। যেন এটা সেই বোকা আরব জোহার গল্পের মতো। গল্পটি এমন—ছেলেটির নাম জোহা। ভীষণ বোকা। একবার তার মা দূরে কোথাও যাবার সময় তাকে বলে গেল, 'احفظ الباب - দরজা সংরক্ষণ করে রেখো'। এ কথা বলে মা বাইরে বেরিয়ে গেল। মা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তারও কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলো। মায়ের কথামতো সে ঘর থেকে দরজা উঠিয়ে সাথে নিয়ে হাঁটা দিলো। এদিকে চোর-চামারেরা ঘরের সকল মূল্যবান জিনিস হাতিয়ে নিল।
মা কিছুদিন পর বাড়ি ফিরে অবস্থা দেখে ছেলেকে তিরস্কার করে বললেন, বাবা, তুমি এটা কী করেছ? ঘরে চোর ঢুকল কীভাবে?
জোহা সরলভাবে বলল, কেন, তুমিই তো আমাকে দরজা সংরক্ষণ করার কথা বলেছ। তুমি তো ঘর সংরক্ষণের কথা বলোনি!
ঠিক এমনই তাদের বুদ্ধির জোর।
এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের কথা এই বোকা জোহার চেয়েও নিম্নতম। আল্লাহ দাঁড়িয়ে আছেন না বসে আছেন— তারা সেই ঝগড়া বাঁধায় এবং মত প্রকাশ করে যে, আল্লাহ দাঁড়িয়েই আছেন। প্রমাণ কী? প্রমাণ হলো, কোরআনে ইরশাদ হয়েছে—
(قَائِمًا بِالْقِسْطِ)
তিনি ন্যায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। [সুরা আলে ইমরান: ১৮]
কিন্তু তাদেরকে কে বোঝাবে এই 'দাঁড়ানো' তো নিছক 'দাঁড়িয়ে থাকা' নয়।
এসকল ব্যাপারে আমাদের গ্রহণ করতে হবে 'সালাফে সালেহিনের' পথ ও পদ্ধতি। হজরত আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন,
من ضيق علم الرجل أن يقلد في دينه الرجال.
কোনো ব্যক্তির ইলমের অনুপস্থিতির প্রমাণ হলো সে দ্বীনের ক্ষেত্রে লোকদের অনুসরণ করে।
সুতরাং আমি তোমার ব্যাপারে বলি, তুমি যাদের ব্যাপারে অন্তরে বড় ধারণা রাখো, যাদেরকে সম্মান করো, ধরো, তুমি তাদের থেকে কোনো কিছু শুনলে আর কোনো যাচাই ছাড়া তার অনুসরণ করা শুরু করে দিলে- এটা উচিত নয়। কখনো যদি এমন ব্যক্তিদের থেকে এমন কিছু শোনো, যা বিশুদ্ধ মূলনীতির বিপরীত, তাহলে ধরে নাও, এটা বর্ণনাকারীর পক্ষ থেকে ভুল হয়েছে। কারণ, ইতিমধ্যেই তোমার অভিজ্ঞতায় সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি নিজের পক্ষ থেকে কোনো ভুল মত ও মন্তব্য করেন না।
কিন্তু তারপরও যদি আমরা দেখি- এটি আসলে তিনিই বলেছেন এবং তা যদি দ্বীনের স্পষ্ট বিশুদ্ধ মূলনীতির বিপরীত হয়, তাহলে কিছুতেই তার অনুসরণ করা যাবে না- এমনকি তিনি যদি হজরত আবু বকর, হজরত উমর রাযিআল্লাহু আনহুমাও হন!
এটি এমন এক মূলনীতি-যার ওপর শক্তিমত্তার সাথে অটল ও অনড় থাকা আবশ্যক। এক্ষেত্রে মনের মাঝে সম্মানের স্থানে অধিষ্ঠ ব্যক্তিও যেন তোমাকে সামান্যতম টলাতে না পারে।
এগুলোর বিস্তারিত বর্ণনার উদ্দেশ্য হলো, এ কথাগুলো ভালোভাবে বুঝে রাখা যে, আমাদের দ্বীন-ধর্ম সর্বদিক দিয়ে নিরাপদ ও সংরক্ষিত। তবুও এর মাঝে কিছু সম্প্রদায় বাইরের কিছু প্রবেশ করাতে চায়- যা আমাদের কষ্ট দেয়। দ্বীনের ক্ষতি করে।
কিছু মূর্খ জাহেদ ব্যক্তি দ্বীনের মধ্যে এমন আজগুবি কিছু প্রবেশ করিয়েছে- যা মানুষের স্বভাবের বিরুদ্ধ। তাদের এই কাজগুলো দেখে দেখে মানুষরা দ্বীনের পথকে বড় কঠিন ও অসম্ভব ভাবতে শুরু করেছে।
আর এ ধরনের কথা ও কাজের অধিকাংশই ছড়িয়েছে ওয়াজের কেচ্ছা- কাহিনির মাধ্যমে। কারণ, সাধারণ ব্যক্তিরা তাদের ওয়াজের মজলিসে যায়, লোকগুলো হয়তো ভালোভাবে অজুও করতে পারে না, অথচ তাদের সামনে বর্ণনা হতে থাকে হজরত জুনায়েদ রহ.-এর সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কথাগুলো, হজরত শিবলী রহ.-এর মারেফতি বাক্যগুলো- তখন এই সাধারণ ব্যক্তিটিও ভেবে বসে, তাহলে দ্বীনের সঠিক পদ্ধতি হলো, লোকালয় বর্জন করা, পরিবার- পরিজনের জন্য উপার্জনের পেছনে না পড়া। নির্জনে একাকী আল্লাহর সাথে প্রার্থনায় মগ্ন হওয়া ইত্যাদি।
অথচ বাস্তবতা হলো, এই লোকটির নামাজের রোকনসমূহের জ্ঞান নেই। বিশুদ্ধভাবে কোরআন পড়তে পারে না। ইসলামের মৌলিক ধারণা নেই। কিন্তু তাকে সেই আলেম বা ওয়ায়েজ এই ইলমগুলোর কথা শিক্ষা দেয় না।
আর কেউ কেউ শরীরের স্বাভাবিক আহার গ্রহণ না করতে করতে শরীর শুকিয়ে ফেলে। অবশেষে তার শরীরের শক্তি নিঃশেষ হয়ে পড়ে। মস্তিষ্কে বিকৃতি আসে। দুর্বল অবসন্ন কল্পনায় আজগুবি অনেক কিছু দেখে। এমন অনেককে দেখেছি, যারা লোকালয় ছেড়ে নির্জনে বসবাস করছে। ক্লান্তিতে অবসন্ন। তাদের কাউকে যদি বলা হয়, কোনো অসুস্থকে দেখতে যাও। তখন সে বলে, এটা আমার অভ্যাস নয়।
আমরা বলি, আল্লাহ এমন অভ্যাসের প্রতি লানত বর্ষণ করুন, যা শরিয়তের বিপরীত। এমন আরও অনেক কেচ্ছা-কাহিনি ও শরিয়তবিরোধী উদ্ভট কাজগুলোকেই সাধারণ মানুষ শরিয়ত মনে করে বসছে। আর ভাবছে- আলেম ফকিহগণ যার ওপর রয়েছে, সেটা শরিয়ত নয়। এভাবেই তারা বিভ্রান্ত হচ্ছে।
অথচ মূর্খ জাহেদদের দিকে কেউ ভ্রুক্ষেপই করছে না- সে যা করছে তা শরিয়তে বৈধ কি না?
কেউ কেউ নিজের ভাব-মর্যাদা রক্ষার জন্য না জেনে, না বুঝেই বিভিন্ন ফতোয়া ও নির্দেশনা দিচ্ছে। যাতে কেউ বলতে না পারে 'শাইখ কিছু জানে না'।
শাইখ আবু হাকিম রহ. আমার কাছে একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, আমি একবার শরিফ দাহালাতির সাথে দেখা করতে তার নিকট উপস্থিত হই। সে সময় কেউ একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করে, তিন তালাকপ্রাপ্তা এক মহিলা, যার একটি ছেলে সন্তান আছে, সে কি তিন তালাকের পর তার এই স্বামীর জন্য বৈধ হবে?
আমি বললাম, না, আল্লাহর কসম, বৈধ হবে না।
এ সময় শরিফ আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠল, আপনি চুপ করুন। আমি তো এখান থেকে বসরা পর্যন্ত সকল মানুষকে ফতোয়া দিয়ে আসছি, সে মহিলা বৈধ হবে!
শাইখ আবু হাকিম রহ. আমার কাছে আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করেন। এক কামার লোক নিজেকে ভীষণ পণ্ডিত ভাবত। একবার তার নিকট একটি মেয়ে আসে। মেয়েটির বিয়ের প্রয়োজন। লোকটি তাকে এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে করিয়ে দেয়। কিন্তু তার ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার ব্যাপারে তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করে না।
কিন্তু বিষয়টি যখন বিচারকের দরবারে উপস্থাপিত হয় এবং প্রমাণিত হয় যে, মেয়েটির ইদ্দত শেষ হয়নি, তখন বিচারক তাদের বিয়ে বাতিল করে দেয় এবং বিবাহ সম্পন্নকারীকে তিরস্কার করে।
এরপর মেয়েটি সেই লোকটির কাছে এসে বলে, আমি তো এসবের কিছু জানি না। কিন্তু আপনি আমাকে এ অবস্থায় বিয়ে করিয়ে দিলেন কীভাবে?
লোকটি বলল, তুমি রাখো এসকল বাহ্যিক জ্ঞানের লোকদের কথা। তুমি নিশ্চয় মনের দিক থেকে পবিত্র—তাতেই তো পবিত্র!
একবার একজন ফিকাহবিদ আমার কাছে একজন আবেদ ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা করে বলেন। লোকটি বহু বছর নামাজে ‘সাহু সিজদা’ দিয়ে আসছে। এবং সে মনে মনে বলে, হে আল্লাহ, আমি তো ভুল করিনি। কিন্তু এই ‘সাহু সিজদা’ দিই সতর্কতাস্বরূপ।
ফিকাহবিদ লোকটিকে বললেন, তোমার এভাবে পড়া সকল নামাজ নষ্ট হয়ে গেছে। কারণ, তুমি ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজের মধ্যে এমন অতিরিক্ত সিজদা দিয়েছ, শরিয়তে যার বৈধতা নেই।
এভাবে আমাদের দ্বীনে অতিরিক্ত যে বিষয়টি প্রবেশ করেছে—তা হলো সুফিতন্ত্র। তারা এমন সব পদ্ধতি অনুসরণ করছে, যার অধিকাংশই শরিয়তবিরোধী।
সাধারণ ধার্মিক মানুষও অনেক সময় অনেক বাড়াবাড়ি করে। আমাদের প্রায় সমসাময়িক এক ব্যক্তির ঘটনা বলি—আমরা তাকে চিনি। লোকটি একদিন জামে মানসুরে প্রবেশ করল এবং বলল, আমি আল্লাহর সাথে একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম; কিন্তু সেটা রক্ষা করতে পারিনি। এর শাস্তিস্বরূপ আমার নফসের ওপর এটা আবশ্যক করলাম যে, আমি ৪০ দিন কিছু খাব না।
এভাবে সে খাওয়া বন্ধ করে দিলো। দশদিন না খেয়ে অতিবাহিত হয়ে গেল। শরীর দুর্বল হয়ে গেল। তবুও সে খাবার গ্রহণ করল না। অনেকের চাপাচাপি সত্ত্বেও সে খাবার গ্রহণ করে না। এরপর আরও কিছুদিন অতিবাহিত হয়। মৃত্যুর কাছাকাছি উপনীত হয়। তবুও খাবার গ্রহণ করে না। এর কিছুদিন পর লোকটি মারাই গেল।
এই লোকটির কাণ্ড দেখো। সে যা করেছে, পুরো মূর্খতার বশে করেছে।
আবার কিছু সাধক ব্যক্তি নিজের চাহিদার সকল নিয়ামত ও স্বাদ-আস্বাদন থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখে। আর তাসাওউফ বলতে বোঝে অমসৃণ জামা, গামছা, প্যাঁচানো পাগড়ি- অথচ কোথা থেকে খাচ্ছে আর কোথা থেকে পান করছে, সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।
কেউ আছে, নিজের সম্পদ ও সম্মান সংরক্ষণের জন্য আমির-উমারা, কর্তৃত্বশীলদের সাথে মেলামেশা করছে, রেশমি কাপড় পরিধানকারীদের সাথেও মিশছে, মদখোরদের সাথেও চলছে।
আর কেউ আছে, বছরের পর বছর এমন কথার ওপর আমল করে আসছে, যার অধিকাংশের কোনো ভিত্তি নেই।
কেউ আবার গান-বাজনা, নৃত্য ও খেলাধুলার প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। এবং এর পেছনে বিভিন্ন যুক্তি দিতে শুরু করছে। কেউ বলছে, এর মধ্যে 'এশক'-এর ঝলক রয়েছে। কেউ বলছে, এতে করে মাহবুবের 'পরম সান্নিধ্য' প্রাপ্ত হওয়া যায়।
এই সকল পথই নষ্ট বিনষ্ট ও বিভ্রান্ত পথ। এতে করে সাধারণ লোকদের আরও নষ্ট করা হচ্ছে।
এ বিষয়গুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত বর্ণনার প্রয়োজন। আমি এ বিষয়ে একটি কিতাব লিখেছি। সেখানে সুন্দরভাবে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। তুমি সেখান থেকে দেখে নিতে পার। কিতাবটির নাম تلبيس ابليس 'ইবলিসের চক্রান্ত'।
এ ব্যাপারে এখানেও বিস্তারিত আলোচনার উদ্দেশ্য হলো, তুমি যেন স্মরণ রাখো, আমাদের দ্বীন হলো পূর্ণাঙ্গ, পরিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ। তুমি যদি এর সঠিক বুঝটি লাভ করতে পারো, তবে তুমি শুধু অনুসরণ করবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং তার সাহাবিদেরকে। এবং বর্জন করবে সকল নবোদ্ভাবিত মিথ্যা পথ ও পদ্ধতি। তুমি তোমার দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনো লোকের অনুসারী হবে না। আর এতটুকু যদি করতে পারো- তোমার জন্য আর কোনো নসিহত প্রয়োজন হবে না- ইনশাআল্লাহ।
তুমি বর্ণনাকারীদের বিভ্রান্তি থেকে সতর্ক থাকো। সতর্ক থাকো মুতাকাল্লিমিনদের অনুচিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থেকে, মূর্খ জাহেদদের দল থেকে, প্রবৃত্তির অনুসারীদের লোভ-লালসা থেকে। আমলহীন আলেমদের মত ও মন্তব্য থেকে। এবং ইলমহীন আবেদের কর্মকাণ্ড থেকে।
জেনে রেখো, আল্লাহ তাআলা যাকে তার অনুগ্রহ দ্বারা শক্তিশালী করেছেন, বুঝ-বুদ্ধি দান করেছেন, অন্যের অনুসরণের বন্ধন থেকে মুক্ত করেছেন এবং তার সময়ের কর্মবীর বানিয়েছেন, তিনি কখনো বাধাকে ভ্রুক্ষেপ করেন না। মানুষের মন্দ-নিন্দার দিকে তাকান না। তিনি তার শক্তিশালী দলিলের মাধ্যমে নিজের লাগাম বাঁচিয়ে স্পষ্ট পথে চলতে থাকেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এবং তোমাদেরকে মনের মাঝে সম্মানিত ব্যক্তিদের অন্ধ অনুসরণ থেকে মুক্ত করুন এবং তিনি আমাদেরকে তাঁর রাসুল ও তাঁর রাসুলের সাহাবিদের অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
৬৯. * ঠিক এই শব্দে হাদিসটি এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।