📄 উপকরণ ও উপায়
দুনিয়া দারুল আসবাব। এখানে স্বাভাবিকভাবেই দুনিয়াবি উপায়-উপকরণের দরকার হয়।
আরেফদের অন্তরও কখনো কখনো পার্থিব উপকরণের দিকে আকৃষ্ট হয়- কিন্তু কখনোই সেগুলোর ওপর লেগে থাকে না। কারণ, যখনই তারা এগুলো সম্পর্কে একাকী নির্জনে চিন্তা করে, এগুলোর অক্ষমতা সম্পর্কে অবগত হয়ে পড়েন। তাই যখনই তারা বাহ্যিক উপকরণ দ্বারা পরীক্ষায় উপনীত হন, তখন তারা উপকরণের সকল প্রভাব একেবারে মুছে ফেলেন। আল্লাহ তাআলা কোরআনে ইরশাদ করেন,
﴿ وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا ﴾
স্মরণ করো সেদিনের কথা, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের মুগ্ধ করে তুলেছিল। অনন্তর তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি। [সুরা তাওবা: ২৫]
আয়াতের বর্ণনায় দেখা যায়-কিছু সময় সাহাবিদের অন্তরও বাহ্যিক উপকরণের দিকে ধাবিত হয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পরীক্ষা আসার পর তারা আবার সংশোধন হয়ে গিয়েছেন।
এভাবে হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
﴿ وَقَالَ لِلَّذِي ظَنَّ أَنَّهُ نَاجٍ مِنْهُمَا اذْكُرْنِي عِنْدَ رَبِّكَ ﴾
সেই দু-জনের মধ্যে যার সম্পর্কে তার ধারণা ছিল যে, সে মুক্তি পাবে, ইউসুফ তাকে বলল, নিজ প্রভুর কাছে আমার কথাও বলো। [সুরা ইউসুফ: ৪২]
এভাবে কথাটা বলার কারণে আল্লাহ তাআলা তাকে জেলখানায় সাত বছর অবস্থান করালেন। যদিও ইউসুফ আলাইহিস সালাম খুব ভালোভাবেই জানেন ও জানতেন, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া তার মুক্তি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর বাহ্যিক উপকরণের আশ্রয় নেওয়া শরিয়তেও বৈধ। তাই তিনি এভাবে বলেছেন।
কিন্তু এখানে আদবেরও একটি বিষয় রয়েছে। আল্লাহ চান, তার প্রিয় বান্দাগণ সবচেয়ে প্রিয় পথ ও পদ্ধতি অনুসরণ করবেন। অন্যদের জন্য আদর্শ ও অনুসরণীয় হবেন। একারণে অনেক সময় বৈধ বিষয়েও আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আদব শিখিয়েছেন।
নতুবা উপকরণ হলো একটি পদ্ধতি। মানুষের জন্য তার ব্যবহার অপরিহার্য। তবে আরেফগণ কখনো এগুলোর দিকে ভ্রুক্ষেপ করেন না। কারণ, এগুলোর যে বাস্তবতা, আরেফদের সামনে তা যেমনভাবে প্রকাশিত, অন্য কারও নিকট তা সেভাবে প্রকাশিত নয়। সে কারণে যদিও তারা কখনো পুরোপুরি উপকরণের দিকে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন না, কিন্তু কখনো কখনো তাদেরও এদিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে তাদেরকে তাদের অবস্থান অনুপাতে শাস্তি প্রদান করা হয়। কারণ, এটা আদবের খেলাফ। যেমন, আমরা হজরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের বিষয়টি চিন্তা করে দেখতে পারি। ঘটনাটি ছিল এমন- তিনি একবার কথাপ্রসঙ্গে বললেন, আজ রাতে আমি আমার এক শ স্ত্রীর সাথে মিলিত হব। আর তাদের প্রত্যেকেই একটি করে পুত্র সন্তান প্রসব করবে।... কিন্তু এ কথা বলার সময় তিনি ‘ইনশাআল্লাহ' বলেননি কিংবা বলতে ভুলে গেলেন। সে কারণে পরে দেখা গেল, মাত্র একজন স্ত্রী গর্ভবতী হয়েছে। এবং সেই স্ত্রীও একটি বিকলাঙ্গ সন্তান প্রসব করল।
এবার নিজের ঘটনার কথা বলি- একবার আমার একটি বিষয়ে কিছু জিনিসের প্রয়োজন পড়ল। কিন্তু সেই উপকরণগুলো জোগাড় করতে হলে এক জালেম ব্যক্তির সাথে দেখা করতে হয় এবং তার সাথে তোষামোদের ভাষায় কথা বলতে হয়। আমি বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম-কী করা যায়? এমন সময় আমার নিকট একজন ক্বারী সাহেব এলেন। কোরআন থেকে পড়তে শুরু করলেন। এবং তিনি এমন কিছু আয়াত পড়লেন, যা নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী হয়ে উঠলাম। আমি যেন আমার পথ পেয়ে গেলাম। কারি সাহেব পড়ছিলেন-
﴿وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ ثُمَّ لَا تُنْصَرُونَ)
এবং (হে মুসলিমরা,) তোমরা ওই জালেমদের দিকে একটুও ঝুঁকবে না, অন্যথায় জাহান্নামের আগুন তোমাদেরকেও স্পর্শ করবে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো রকমের বন্ধু লাভ হবে না আর তখন কেউ তোমাদের সাহায্যও করবে না। [সুরা হুদ: ১১৩]
এমন আকস্মিকভাবে আমার অন্তরের উত্তর প্রাপ্ত হয়ে আমি যেন বিস্ময়ে হতবুদ্ধ হয়ে গেলাম। আমি আমার নফসকে বললাম, খুব ভালোকরে শুনে রাখ, আমি এই জালেমের তোষামোদ করে সাহায্য প্রার্থনার ইচ্ছা করেছিলাম, তখন কোরআন আমাকে শিক্ষা দিয়েছে, আমি যদি কোনো জালেমের নিকট নত হই কিংবা ঝুঁকে পড়ি, তাহলে যেই সাহায্যের জন্য আমি ঝুঁকলাম সেটা থেকে আমি বঞ্চিত হব।
ওই ব্যক্তির জন্যই কতই না সৌভাগ্য, যিনি আসল দাতাকে চিনিছেন এবং তাঁকেই সর্বক্ষণ ধরে আছেন। কারণ, সেটিই হলো মূল গন্তব্য। আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা—তিনি যেন আমাদের উত্তম রিজিক দান করেন। তিনিই একমাত্র দাতা।
📄 মুমিন ও গোনাহ
মুমিন কখনো গোনাহের ওপর বাড়ন্ত হতে পারে না। কারণ, এটি গোনাহের প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কামনার আগুনকে প্রজ্বলিত করে। এবং পরিণামে অধঃপতিত করে।
কারণ, এর রয়েছে একটি দীর্ঘ পরিক্রম প্রবণতা—একজন মুমিন কিছুতেই তাতে আপতিত হতে পারে না। সে কখনো গোনাহ থেকে ফারেগ হয়ে তাতে আবার ফিরে যেতে পারে না। সে রাগান্বিত হলে, কিছুতেই প্রতিশোধে সীমালঙ্ঘন করে না। আর অক্ষমতার আগেই তাওবা করে নেয়।
তুমি একবার ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের কথা চিন্তা করে দেখো—তারা মূলত ইউসুফকে রেখে আসার আগেই তাওবার নিয়ত করেছিল। তারা প্রথমে বলল, اقتلوا يوسف — তোমরা ইউসুফকে হত্যা করো। কিন্তু এরপর এটাকে তাদের নিকট অনেক নিষ্ঠুর মনে হলো। এ কারণে তারা এবার বলল, أو اطرحوه أرضا — কিংবা তাকে কোনো দূরবর্তী জায়গায় ফেলে এসো। এরপর তারা তখনই ভালো হওয়ার প্রতি দৃঢ় ইচ্ছা ব্যক্ত করল। তারা বলল, وتكونوا من بعده قوما صالحين —এরপর তোমরা খুব ভালো দল হয়ে থাকবে।
এরপর তারা যখন হজরত ইউসুফকে সাথে নিয়ে মরুভূমির দিকে বের হলো, তাদের অন্তরের হিংসার কারণে প্রথমে তারা তাকে হত্যা করারই ইচ্ছা করল। কিন্তু তাদের বড়ভাই বললেন, لَا تَقْتُلُوا يُوسُفَ وَأَلْقُوهُ فِي غَيَابَتِ الْجُبِّ তোমরা তাকে হত্যা করো না। বরং তোমরা তাকে কুয়ার অন্ধকারে ফেলে রেখে এসো।
আর ফেলে রাখার মাধ্যমে তাকে হত্যা করার ইচ্ছা তিনি করেননি। বরং ইচ্ছা করেছেন যে, কোনো মুসাফির দল তাকে তুলে নিয়ে যাবে। এবার সকলেই বড় ভাইয়ের কথাকেই মেনে নিল।
মানুষের ঈমান ও কর্মের মধ্যে এই ভিন্নতার কারণ হলো, অন্তরের কুঠুরির মধ্যে ঈমান তার শক্তি অনুযায়ী ঘুরতে থাকে। কখনো তা শক্তিশালী হয়ে সংকল্পে সুদৃঢ় হয়। কখনো দুর্বল হয়ে গোনাহের দিকে ধাবিত হয়। কখনো ভালো কাজ করে। কখনো আবার ছেড়ে দেয়। কিন্তু এভাবে যখন উদাসীনতা ও গাফিলতি প্রাধান্য বিস্তার করে, অব্যাহতভাবে গোনাহ সংঘটিত হতে থাকে, তখন মেজাজ ও স্বভাবও নষ্ট হয়ে যায়।
অতএব, এখনই... এখনই ঈমানকে আমলের জন্য জাগ্রত করে তোলো। গোনাহের জন্য তাওবা করো। তাহলে দেখবে, এই অনুশোচনাতেও এমন মজা ও আনন্দ পাবে- সেই গোনাহে লিপ্ত হওয়ার সময়ও যা তুমি পাওনি।
📄 ইলমের ক্ষেত্রে প্রবঞ্চনা
আমার মতে- পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয় হলো ইলমের মধ্যে প্রবৃদ্ধি লাভ করা। কারণ, যে ব্যক্তি যতটুকু জেনেছে, তার ওপরই যদি সে সীমাবদ্ধ থাকে এবং এটাকেই যথেষ্ট মনে করে, তাহলে সে তার সিদ্ধান্তে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে এবং নিজের প্রতি নিজের শ্রেষ্ঠত্ববোধের কারণে অন্যের থেকে তার উপকৃত হওয়ার রাস্তা রুদ্ধ হয়ে পড়ে। বিভিন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা তার ভুলকে প্রকাশ করে তোলে, কিন্তু নিজের ব্যাপারে আত্মগর্বী হওয়ার কারণে সে কখনো সেই ভুল থেকে ফিরে আসার সৎসাহস দেখায় না।
কিন্তু সে যদি অন্যের থেকে উপকৃত হওয়ার মানসিকতা পোষণ করত, তবে এটা তাকে সকলের সমপর্যায়ে এনে দিত। এবং সেই ভুল থেকে ফিরে আসা তার জন্য সহজ হতো।
অপূর্ণ ইলমের একটি উদাহরণ বর্ণনা করেছেন ইবনে আকিল রহ.। তিনি বলেন, আবুল মাআলি আল জুওয়াইনি রহ. বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَعْلَمُ جُمَلَ الْأَشْيَاءِ وَلَا يَعْلَمُ التَّفَاصِيلَ.
নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সকল কিছু সামগ্রিকভাবে জানেন, কিন্তু প্রতিটি বিষয় বিস্তারিত খুঁটে খুঁটে জানেন না।’
আমি জানি না, ইলমের মাঝে কতটা কমতি ও মূর্খতা থাকলে এমন কথা বলা যায়!
এভাবে আরও অনেকেই তাদের অজ্ঞতা, মূর্খতা ও একগুঁয়েমির কারণে সকলের সর্বসম্মত মতকে বর্জন করে ভিন্ন মত পোষণ করেছে। এবং এক্ষেত্রে তাদের কোনো শক্তিশালী দলিলও নেই। তাদের মুক্তির কি কোনো পথ আছে?
কেউ যদি মনে করে তার কিতাবের মধ্যে কিছু ভুল-ভ্রান্তি থাকতে পারে এবং সেগুলো সীমাহীন নয়, তবে তার জন্য উচিত হলো, সমসাময়িক গ্রহণযোগ্য আলেমদের সেটা দেখানো। এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্ববোধকে বর্জন করা। তাহলে আশা করা যায়, তিনি সঠিক পথে থাকতে পারবেন। নতুবা ইলমের ওপর ব্যক্তির এই সীমাবদ্ধতা যদি নিজেকে প্রদর্শনের জন্য হয়ে থাকে, তবে তার বিশুদ্ধতার পথ চির রুদ্ধ হয়ে পড়বে।
এমন অবস্থা থেকে আল্লাহ তাআলার নিকট আশ্রয় চাই।
📄 ইবাদতের মাধ্যমে অনুগ্রহ
আল্লাহ তাআলা কোরআনে ইরশাদ করেন-
يَمُنُّونَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوا قُلْ لَا تَمُنُّوا عَلَيَّ إِسْلāmَكُمْ بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَاكُمْ لِلْإِيمَانِ)
তারা ইসলাম গ্রহণ করে তোমার উপকার করেছে বলে মনে করে। তাদেরকে বলে দাও, তোমরা তোমাদের ইসলাম দ্বারা আমাকে উপকৃত করেছ বলে মনে করো না; বরং তোমরা যদি বাস্তবিকই (নিজেদের দাবিতে) সত্যবাদী হও, তবে (জেনে রেখো) আল্লাহই তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তোমাদেরকে ঈমানের হেদায়াত দান করেছেন। [সুরা হুজুরাত : ১৭]
আমি এই আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এক আশ্চর্যতম অর্থের সন্ধান পেলাম। আর সেটা হলো, যেহেতু তাদেরকে মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি দান করা হয়েছে এবং এই জ্ঞান-বুদ্ধি দ্বারা চিন্তা-ভাবনা করে মূর্তিপূজার দোষ-ত্রুটিগুলো তারা ধরতে পেরেছে এবং তারা বুঝতে শিখেছে যে, এগুলো কিছুতেই ইবাদত বা উপাস্যের উপযুক্ত সত্তা নয়, তাই তারা তাদের ইবাদত বা উপাসনাকে ফিরিয়েছে এমন সত্তার দিকে- যিনি সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন।
তাদের এই বুঝ-বুদ্ধি বা উপলব্ধিটা হয়েছে মানুষের স্বাভাবিক সেই বুদ্ধি- বিবেকের প্রতিফলে- যার দ্বারা মানুষ চতুষ্পদ জন্তু থেকে ভিন্নতার দাবিদার। তারা তো মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধি-বিবেকের নির্দেশানুসারে ঈমান আনল, কিন্তু যিনি এই জ্ঞান দান করেছেন- তার সম্পর্কেই থেকে গেল বেখেয়াল।
ঠিক এই একই ব্যাপার ঘটে প্রতিটি ধর্মানুসারী ইবাদতকারী ও ইলমে ইজতেহাদকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে। তারা তো সচেতনতার সাথে, বুঝ-বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার সাথে সঠিক পথটি বেছে সেদিকে ধাবিত হয় এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। কিন্তু এই বুঝ-বুদ্ধি ও জ্ঞান-প্রজ্ঞা দিয়েছেন কে? বহু মানুষের অজ্ঞতা ও মূর্খতার মধ্য থেকে যিনি তাকে নির্বাচন করেছেন এবং যোগ্যতা প্রদান করেছেন- শুকরিয়া তো শুধু তারই করা উচিত। এগুলো তো তার নিজের ক্ষমতার বলে হয়নি—স্রষ্টাই তাকে প্রদান করেছেন। কিন্তু মানুষের দৃষ্টি সব সময় নিজের কর্মের দিকেই ধাবিত হয়। সকল কর্মে নিজের কৃতিত্ব দেখতে পাই।
এই জাতীয় একটি ঘটনা হলো সেই তিন ব্যক্তির ঘটনা—যারা একটি গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। হঠাৎ একটি প্রকাণ্ড পাথর তাদের গুহার মুখে এসে পড়ে এবং বের হওয়ার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তখন তারা নিরুপায় হয়ে বলে, এসো, আমরা আমাদের ভালো কাজের ওসিলা দিয়ে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করি। এরপর তারা একে একে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে বলতে লাগল—আমি এটা করেছি... আমি এটা করেছি... আমি এটা করেছি... এই ওসিলায় খোদা হে, আমাদের এই বিপদ থেকে মুক্ত করো।
কিন্তু তারা যদি নির্ভুলভাবে নিয়ামতদাতার নিয়ামতের প্রতি লক্ষ করত এবং তিনি অন্যদের চেয়ে তাদের প্রতি সেই নিয়ামতগুলো প্রদানের মাধ্যমে যে অনুগ্রহ করেছেন, সে অনুগ্রহের ওসিলা দিত, তাহলে তাদের এই ওসিলা প্রদান আরও সুন্দর হতো।
কিন্তু তারা প্রার্থনা করছে নিজেদের কাজের ওসিলা দিয়ে। তারা এই ধারণা করছে যে, এগুলো তারাই করেছে তাদের শক্তিতে। এ কারণে তাদের প্রতিদান পাওনা হয়েছে।
এক্ষেত্রে তারা আসলে সঠিকতায় ছিল না। আর তাদের প্রার্থনায় যে সাড়া দেওয়া হয়েছে, তা তো তাদের প্রতি আল্লাহ তাআলার অব্যাহত অনুগ্রহের ধারাবাহিকতা হিসেবেই। তাদের সেই আমলের ওসিলা এখানে মুখ্য নয়।
কোনো মুত্তাকি ব্যক্তির তাকওয়ার বিষয়টিও এমনই। অথচ কেউ কেউ তার তাকওয়ার কারণে নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভেবে চলতে থাকে। ফাসেক গোনাহগারদের হেয় জ্ঞান করে এবং তাদের ওপর নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করে। এটা আসলে আত্মশুদ্ধির পথে খুবই বিপর্যয়কর একটি অবস্থা। এমনকি এটি তাকে তাকওয়া থেকে বের করে দেয়।
অবশ্য আমি তোমাকে এটা বলি না যে, তুমি পাপাচারী-পাপিষ্ঠদের সামনে নিজেকে হেয়জ্ঞান করে চলাফেরা করো; বরং বলতে চাই, তুমি ভেতরে ভেতরে তাদের ব্যাপারে ক্ষুব্ধ থাকবে। বাহ্যিকভাবে উপেক্ষা করে চলবে। এরপর তাদের ‘তাকদির’-এর বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দেবে। তাদের ব্যাপারে অহংকারী হবে না। কারণ, তাদের অধিকাংশই জানে না—তারা কার অবাধ্যতা করছে। তাদের একটি বড় অংশ মূলত অবাধ্যতার ইচ্ছাও করে না। তারা আসলে প্রবৃত্তির খপ্পরে পড়ে আছে। প্রবৃত্তির অবাধ্য হওয়া তাদের জন্য অসাধ্যের মতো হয়ে গেছে। এবং তাদের মধ্যে এমনও কেউ আছে, যে আল্লাহ তাআলার ক্ষমার বিষয়টাকেই প্রাধান্য দিয়ে বসে আছে। ক্ষমার ক্ষেত্রে তার দৃঢ় বিশ্বাস থাকার কারণে সে তার গোনাহগুলোকে হালকা করে দেখছে। এটা ঠিক, তাদের এই কর্মগুলো এবং তাদের এই ধারণা তাদের কোনো ওজর বা আপত্তি হিসেবে গ্রহণীয় হবে না।
কিন্তু তুমি—হে তাকওয়ার দাবিদার, জেনে রেখো, তাদের বিপক্ষে দলিল থাকার চেয়ে তোমার বিপক্ষে দলিল রয়েছে বেশি এবং অবধারিতভাবে। কারণ, তুমি খুব ভালোভাবেই জানো, তুমি কার অবাধ্যতা করছ এবং ভালোভাবেই জানো, তুমি কী করছ!
বরং সতর্কতার সাথে আল্লাহ তাআলার কর্মপদ্ধতির দিকে লক্ষ রেখো—কখন তার করুণা কোন দিকে ধাবিত হয় এবং তার ক্রোধ কার ওপর আপতিত হয়—কেউ জানে না। হয়তো তুমিই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে আর কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক জুড়ে নিল! (আল্লাহ হেফাজত করুন)।
সুতরাং এটা খুব আশ্চর্যের কথা, কেউ তার অর্জিত ইলম দ্বারা অন্যদের উদ্বুদ্ধ করে, অন্যদের শেখায়—অথচ যিনি এই নিয়ামতগুলো তাকে দিয়েছেন, তাঁকেই সে ভুলে থাকে। এই যোগ্যতা যিনি দিয়েছেন, তাঁর কথাই সে স্মরণে রাখে না।