📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা

📄 আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা


প্রাজ্ঞজনরা প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে, তার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে যে সকল কথা বলেছেন, আমি সেগুলোর ব্যাপারে দৃষ্টি প্রদান করলাম। এগুলো নিয়ে আমি একটি কিতাবও রচনা করেছি। কিতাবটির নাম দিয়েছি - ذم الهوى প্রবৃত্তির নিন্দা।

সেখানে আমি ভালোবাসা নিয়ে অনেক প্রাজ্ঞজনের মন্তব্য উল্লেখ করেছি। যেমন, কেউ বলেছেন, ভালোবাসার সৃষ্টি হয় বেকার মনের চঞ্চলতা থেকে। কিন্তু এ মতটি সকলে মেনে নেননি। এ কারণে কেউ বলেন, ভালোবাসার উদ্ভব ঘটে মানুষের সৌন্দর্য-প্রীতির কারণে।

অন্যরা বলেন, যারা বাস্তবতার চিন্তা ছেড়ে অলীক কল্পনায় হাবুডুবু খায়, তারাই শুধু ভালোবাসায় আপতিত হয়।

তবে এসব আলোচনা-পর্যালোচনার পর আমার অন্তরে এক আশ্চর্য রকমের চিন্তা এসেছে। চিন্তাটা হলো, প্রেমাস্পদের স্থির স্থিরতা ব্যতীত কোনো ভালোবাসাই স্থায়ী হওয়া সম্ভব নয়।

কারণ হলো, হৃদয়ের উদ্বেল আবেগ হয়তো কারও জন্য ভালোবাসার প্রাসাদ বানায়। সামান্য সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন নৈকট্য অর্জন হয়, তখন হয়তো ভিন্ন মানসিকতা, ভিন্ন জীবনবোধ কিংবা দীর্ঘ মেলামেশার কারণে প্রকাশিত হওয়া তার বিভিন্ন দোষ-ত্রুটি দেখে অন্তর এসে হোঁচট খায়- ভালোবাসার প্রাসাদ যায় ভেঙে এবং খুব অল্পতেই সে অন্য কারও দিকে ধাবিত হতে চায়।

সুতরাং স্থির ও অপরিবর্তিত সত্তা ব্যতীত ভালোবাসার এমন কোনো আশ্রয় নেই, যে অবস্থাটির সাথে ত্রুটিহীনভাবে ভালোবাসা স্থির থাকতে পারে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সকল মানব-মানবীর অস্তিত্বই ধ্বংসশীল এবং ত্রুটিযুক্ত এবং প্রতিনিয়ত তার মধ্যে পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। তাই কোনো বন্ধনই তাদেরকে একটি অবস্থায় বেঁধে রাখতে সক্ষম নয়। একারণে তাদের স্বভাব বা হৃদয়ের আবেগ যদি কোনো ব্যক্তির ভালোবাসার সাথে জড়িয়ে পড়ে, তারপরও তারা এটিকে একটি স্থির ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় না। কারণ, প্রথমে বেশি আবেগ এবং কম জানাশোনার কারণে দোষত্রুটিগুলো অগোচরে থেকে যায়। নির্ভাবনায় পারস্পরিক ভালোবাসায় নিমগ্ন হয়। কখনো বা হৃদয়কে আকর্ষণকারী কিছু গুণাবলির কারণেও দু-জন ব্যক্তির মাঝে ভালোবাসার সৃষ্টি হয়ে পড়ে। যেমন, সৌন্দর্য, স্বভাবের নৈকট্য, মেজাজের সম্মিলন, সহানুভূতি, হৃদয়ের কোমলতা ইত্যাদি। এগুলোও পরস্পরের মাঝে ভালোবাসার সৃষ্টি করে।

কিন্তু ভালোবাসার প্রকৃতি কখনো তার প্রাথমিক প্রচণ্ড আবেগ ও গতিময়তার সময় বোঝা যায় না। যেমন কর্তনের মুহূর্তে অনুভূত হয় না ব্যথার অস্তিত্ব। মানুষের স্বভাবের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এমন এক অস্থির বাসনা- পূর্ণতার বাসনা। ত্রুটিহীন প্রাপ্তির বাসনা। কিন্তু এটা সে দুনিয়াতে প্রাপ্ত হয় না। কারণ, সে এমন কিছু কামনা করে, যা কোনো মানুষের মধ্যে পূর্ণভাবে পাওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে আবেগমথিত প্রাথমিক উত্তেজনা যখন কেটে যায়, একে একে তার সামনে নির্দিষ্ট মানব বা মানবীর ত্রুটি ও অপূর্ণতাগুলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে- তখন অন্তর দমে যায়। প্রবল উদ্ধত উদ্বেলিত ভালোবাসাও তখন ধীরে ধীরে নত করে আনে তার ক্লান্ত শ্রান্ত ডানা। এরপর যা বাকি থাকে- তা হলো অভ্যাস, প্রয়োজন ও লোকদেখানো আচরণ।

এই হলো মানুষ ও মাখলুকের ভালোবাসার ইতিহাস।

কিন্তু স্রষ্টার সাথে মানুষের অন্তরের ভালোবাসার বিষয়টি ভিন্ন রকম। এখানে তার সাথে আর কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর অবস্থিতি নেই। কোনো পরিবর্তন নেই। দোষ-ত্রুটির কোনো বালাই নেই। তাই স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা কোনো সৃষ্টিজীবের ভালোবাসার মতো নয়। এটা শুধু বলে বোঝানোর জিনিস নয়।

স্রষ্টার প্রতি এই মারেফাতের ভালোবাসা কখনো এতটাই প্রবল ও প্রতাপী হয়ে ওঠে যে, স্রষ্টার ভালোবাসা তাদেরকে অন্য সকল ভালোবাসা ভুলিয়ে দেয়। অন্তরের নৈকট্য ও মারেফাতের শক্তিমত্তার কারণে পুরো মন-প্রাণ একেবারে তার ভালোবাসায় নিমজ্জিত হয়ে যায়। তখন তার ভালোবাসার অবস্থাটি হয় তেমন, যেমনটি হজরত রাবেয়া বসরি রহ. এই কবিতায় বলেছেন। তিনি বলেন,
أحب حبيبا لا أعاب بحبه وأحببتهم من في هواه عيوب

আমি এমন প্রিয়কে ভালোবাসি, যার ভালোবাসায় কোনো নিন্দা-মন্দ নেই। আর তুমি তাদেরকে ভালোবেসেছ, যেখানে শুধু দোষ আর দোষ।

এবার এক দরিদ্র জাহেদের ঘটনা বলি। তিনি একবার এক নারীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। হঠাৎ মেয়েটি তার চোখে ধরে। তিনি বিমুগ্ধ হন। তিনি মেয়েটির বাবার কাছে গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব প্রদান করলেন। মেয়েটির বাবা প্রস্তাবে রাজি হলেন। তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার পর খুবই নতুন ও চমৎকার একটি কাপড় পরিধান করিয়ে দিলেন।

এরপর যখন রাত হলো। রাত নীরব ও গভীর হলো। এটা ছিল মূলত জাহেদ ব্যক্তির নির্জন ইবাদতের সময়। রাতের কাঙ্ক্ষিত সময়। স্রষ্টার সাথে নির্জন সান্নিধ্যের সময়। একারণে হঠাৎ জাহেদ ব্যক্তিটি সকল কিছু ছেড়েছুড়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন- আমার কাপড় কোথায়? আমার কাপড় কোথায়? যা পেয়েছিলাম তা তো আমি হারিয়েছি। এই সুন্দর কাপড় আর নারী আমার জন্য নয়। এখানে আর এক মুহূর্তও নয়।

এটি ছিল সেই জাহেদের রাস্তায় এমন একটি হোঁচট, যা তাকে বুঝিয়েছে যে, রাস্তা থেকে সে বিচ্যুত হয়েছে।

আল্লাহর মারেফাতের ক্ষেত্রে অনেকের ক্ষেত্রে এই অবস্থা সংঘটিত হয়। আর ধ্বংসশীল মানুষের ক্ষেত্রে হয় এর উল্টো।

হজরত ইবনে মাসউদ রা. বলেন, তোমাদের কাউকে যদি কোনো নারী বিমুগ্ধ করে, তবে সে যেন তার মূত্রাশয়ের কথাও চিন্তা করে।

মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের আকর্ষণ ও বিকর্ষণ কেন ঘটে?

কারণ, ক্ষুধার্ত মানুষের আকর্ষিত খাবার গ্রহণের সময় মুখের ভেতর নাড়াচাড়া করা ও গলধঃকরণ করার কষ্ট সম্পর্কে কোনো ভাবনা থাকে না। প্রচণ্ড উত্তেজনার কারণে সহবাসের মুহূর্তে আপতিত অসুবিধা ও অপছন্দনীয় বিষয়ের কথাও মনে থাকে না। এমনকি নিজের থুথুকে গিলে ফেলার সময়ও কারও মনে থাকে না যে এটি খাদ্য নয়। অবশ্য এই মুহূর্তগুলোতে এই অসুবিধাগুলোর অবগুণ্ঠনের মধ্যেই রয়েছে কল্যাণ- নতুবা মানুষ তার স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারত না।

কিন্তু সচেতন অবস্থায়, উত্তেজনাহীন অবস্থায়- এগুলোর মধ্যে আর কোনো চাহিদা থাকে না। তখন জীবনের এই স্বাদ চাখা তার জন্য বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। প্রবৃত্তির এই নীচতার ওপর তার বিতৃষ্ণা জেগে ওঠে। দোষগুলো ভেসে উঠতে থাকে। দোষগুলো বড় হয়ে উঠতে থাকে। কান্তিমান দেহ বিবর্ণ হয়ে আসে। ঠিক এভাবেই প্রেমাস্পদের দোষগুলোর ওপর দৃষ্টিপাতের তারতম্য অনুযায়ী প্রেমিকের অন্তর হতে প্রেম উধাও হতে থাকে। আর ঠিক একইভাবে মস্তিষ্কের স্থিরতা অনুযায়ী প্রেমের পারদও বাড়তে থাকে।

কবি মুতানাব্বি বলেন, لو فكر العاشق في منتهى حسن الذي يسبيه لم يسبه

যে সৌন্দর্য প্রেমিককে ব্যাকুল বিমোহিত করে, সে যদি সেই সৌন্দর্যের শেষ পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করত, তবে আর এই সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করত না।

দুনিয়ার প্রেমিকদের অবস্থা এমনই। কিন্তু আরেফদের অন্তর সর্বদা আল্লাহর মারেফাতের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ক্রমান্বয়ে আরও বেশি নৈকট্য ও ভালোবাসার দিকে ধাবিত হতে থাকে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ভীত বান্দার প্রার্থনা

📄 ভীত বান্দার প্রার্থনা


একবার এক সমস্যার কারণে আল্লাহ তাআলার নিকট আকুলভাবে দুআ ও প্রার্থনা করলাম। প্রার্থনার সময় আমার সাথে এক নেকবান্দাও শরিক হয়েছিলেন। পরে আমি এই দুআ কবুলের বাস্তব প্রভাব আমার মাঝে দেখতে পেলাম। সমস্যা থেকে মুক্ত হলাম।

তখন নফস আমাকে ডেকে বলল, এটা ওই সৎ বান্দার প্রার্থনার কারণে হয়েছে; তোমার প্রার্থনার কারণে নয়।

আমি তাকে বললাম, আমি স্বীকার করি আমার যত গোনাহ ও আমলের কমতি রয়েছে, তাতে দুআ কবুল না-ও হতে পারে। তবে আমি বলি কী- আমার কারণেই তো দুআটি কবুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, আমার সাথের সৎ ব্যক্তিটি আমার ধারণায় আমার চেয়ে বেশি ভালো, নিষ্কলুষ, পবিত্র। কিন্তু এদিকে নিজের গোনাহের অনুশোচনা নিয়ে আমার ছিল ভগ্ন হৃদয় এবং কম আমলের হীনম্মন্যতা। আর তিনি তার আমলে ছিলেন সন্তুষ্ট।

কখনো কখনো নিজের এই কমতি ও নিঃস্বতা প্রকাশই দুআ কবুলের জন্য অধিক কার্যকর হয়। কারণ, আমি এবং তিনি- আমরা কেউ-ই আমাদের আমলের দোহাই দিয়ে আল্লাহর করুণা প্রার্থনা করিনি। সুতরাং আমি যখন আমার সমূহ গোনাহ স্বীকার করে ভগ্ন হৃদয় নিয়ে আল্লাহর দরবারে বলেছি, হে মাওলা, তুমি তোমার অনুগ্রহে আমাকে দাও, তখন আমার প্রার্থনার মধ্যে এমন কিছু নেই, যা এটিকে বিনষ্ট করে দিতে পারে। বরং কখনো কখনো দুআর মধ্যে নিজের সৎ আমলের দিকে দৃষ্টিপাতই দুআ কবুলের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

সুতরাং হে আমার নফস, তুমি আমাকে আর নিরাশ করতে চেয়ো না। কারণ, আমি তো আমার আমলের কমতি নিয়ে ভগ্নহৃদয় হয়েই আছি। তাছাড়া আমার ইলমের কারণে আমার যে আদব, নিজের কমতির কথা স্বীকার করা, নিজের বিপদে আমার যে আকুলকরা প্রার্থনা, কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে আল্লাহর অনুগ্রহের ক্ষেত্রে আমার যে দৃঢ় বিশ্বাস- নিশ্চয় এগুলো সেই বান্দার সাথে ছিল না (আল্লাহ তার ইবাদতের মধ্যে আরও বরকত বাড়িয়ে দিন)। এভাবে কখনো কখনো নিজের কমতি স্বীকার করে নেওয়াটাই দুআ কবুলের জন্য অধিক উপযুক্ত ও কার্যকরী হয়।

টিকাঃ
৬৬. পুরো নাম: আবুত তীব আহমদ বিন হুসাইন বিন হাসান আলজুফি আলকুফি। তিনি ছিলেন বিখ্যাত কবি। যুগের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। শ্রেষ্ঠ মেধাবী। ‘মুতানাব্বি’ নামে অধিক প্রসিদ্ধ। ৩৫৪ হিজরি সনে তিনি নিহত হন। সিয়ারু আ’লামিন নুবালা : ১৬/১৯৯।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 চিত্তার শীর্ষচূড়া

📄 চিত্তার শীর্ষচূড়া


নিজের সীমাহীন পাণ্ডিত্যের দাবি করে- এমন এক স্বঘোষিত পণ্ডিতের নিকট আমি একবার আমার কিছু রচনা পড়ে শোনালাম। তিনি শুনলেন। কিন্তু একসময় খেয়াল করলাম- তিনি আমার লেখার প্রতি তেমন একটা আকর্ষণ বোধ করছেন না, মন দিয়ে শুনছেন না। বিষয়গুলোর গভীরতা বোঝারও চেষ্টা করছেন না। পরিণামে আমার বাকি রচনাগুলো তাকে শোনানো বন্ধ করে দিলাম এবং মনে মনে বললাম, এটা হলো এমনই এক অমীয় সুধা, এ ব্যাপারে পিপাসার্ত ব্যক্তিই শুধু তা পান করতে সক্ষম হবে।

এ ঘটনায় আমি একটি নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম। যেমন, তিনি যদি আমার রচনাগুলো শুনতেন, বুঝতেন এবং লেখার কারণে আমার প্রশংসা করতেন, তাহলে আমার নিকট তার গুরুত্ব বেড়ে যেত এবং আমি আমার আরও সুন্দর রচনাগুলো তাকে দেখাতাম। কিন্তু আমি যখন দেখলাম, তিনি এর প্রতি ততটা আগ্রহী নন এবং এর উপযুক্তও নন, তখন আমি সেগুলো তার থেকে ফিরিয়ে নিলাম এবং আমার মনোযোগও তার থেকে সরিয়ে নিলাম।

এর দ্বারা যে শিক্ষাটা পেলাম সেটা হলো, আল্লাহ তাআলা এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন। এগুলোর মাঝে বিস্ময়কর অসাধারণ চমৎকার বিন্যাস দিয়েছেন। সুগঠিত শৃঙ্খলা দিয়েছেন। তারপর এগুলো মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছেন। এখন বুদ্ধিমান ব্যক্তিই শুধু এটার দিকে দৃষ্টি দেয়, চিন্তা করে। এর শোভা-সৌন্দর্য দেখে এবং নিজের বুঝ ও অনুধাবনের পরিমাণ অনুপাতে সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা করে। তখন স্রষ্টাও তাকে ভালোবাসেন। তার দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখেন।

একইভাবে তিনি কোরআন অবতীর্ণ করেছেন- যা অনেক মূল্যবান হিকমত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বর্ণনা করে। সুতরাং যে ব্যক্তি এটা বোঝার জন্য চেষ্টা করে, আগ্রহ রাখে এবং নীরবে-নিভৃতে এগুলো নিয়ে চিন্তা করে, সে এই বাণীর মালিকের সন্তুষ্টি অর্জন করে এবং তার নিকট বিশেষ মর্যাদা প্রাপ্ত হয়।

কিন্তু যে ব্যক্তি তার সকল চিন্তা-চেতনা শুধু বস্তুগত বিষয়ে নিবদ্ধ রাখে, আল্লাহর বাণী ও সংবাদের দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করে না, এটার কোনো গুরুত্ব দেয় না- আল্লাহ তাআলা তাকে এই মর্যাদা অর্জনের পথ থেকে বঞ্চিত করেন। তার থেকে এটিকে সরিয়ে রাখেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
﴿سَأَصْرِفُ عَنْ آيَاتِيَ الَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ

পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে অহংকার প্রকাশ করে, তাদেরকে আমি আমার আয়াত বা নিদর্শনাবলি হতে বিমুখ করে রাখব। [সুরা আরাফ : ১৪৬]

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 উচ্চাকাঙ্ক্ষা

📄 উচ্চাকাঙ্ক্ষা


আমি একদিন দু'আয় প্রার্থনা করে বললাম, হে আল্লাহ, আপনি আমাকে ইলম ও আমলের শীর্ষচূড়ায় পৌঁছে দিন। এবং আমার জীবন এতটা দীর্ঘ করে দিন, আমি যেন আমার সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারি।

তখন ইবলিসের পক্ষ থেকে একটি ওয়াসওয়াসা এলো। সে বলল, এরপর কী? এরপরেও তো মৃত্যুই এসে যাবে—না-কি? তবে আর এই দীর্ঘ জীবন প্রার্থনা করে লাভ কী?

আমি তাকে বললাম, দূর হ! তুই যদি বুঝতি আমার প্রার্থনার আড়ালে কী রয়েছে, তাহলে তো বুঝতি জীবনের এই দীর্ঘতা কিছুতেই অনর্থক নয়। এটি অনেক মূল্যবান।

আমি যদি জীবিত থাকি, প্রতিদিন কি আমার ইলম ও মারেফাত বাড়বে না? তাহলে আমার শস্যের ফলও বাড়তে থাকবে। তা আহরণের দিন শুকরিয়াও ব্যাপক হবে। আমি যদি আমার ২০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করতাম— সেটা কি আমাকে আনন্দিত করত? আল্লাহর কসম, কিছুতেই না। কারণ, আজ আমার প্রতিপালকের সম্পর্কে যতটুকু আমার পরিচয় ও মারেফাত রয়েছে, ২০ বছর বয়সে মারা গেলে আজকের দশভাগের এক ভাগও আমার জানা হতো না।

সব কিছুই এই জীবনের ফসল— এই দীর্ঘ যাপিত সময়ে আমি আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদ নিয়ে আরও বেশি জেনেছি। অন্ধ অনুসরণের হাত থেকে দূরদর্শিতার উচ্চভূমিতে আরোহণ করেছি। আরও এমন অনেক ইলম সম্পর্কে অবগত হয়েছি—যার মাধ্যমে আমার মূল্য বেড়েছে এবং আমার নিজেকে আরও বেশি পরিশুদ্ধ করতে পেরেছি।

এছাড়া আখেরাতের জন্য আমার শস্যরোপণ আরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষক হয়ে ছাত্রদের মাঝে ইলম বিতরণের মাধ্যমে আমার সওয়াবের ব্যবসাকেও করেছি লাভবান। এভাবে ইলম বাড়ানোর মতো শ্রেষ্ঠত্ব আর কী হতে পারে?

আল্লাহ তাঁর রাসুলকেও নির্দেশ দিয়েছেন, (وَقُلْ رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا)

(হে নবী!) তুমি বলো, হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমার ইলম বৃদ্ধি করে দিন। [সুরা তোয়াহা : ১১৪]

এবং হাদিসে এসেছে- حَدَّثَنَا أَبُو هُرَيْرَةَ ... قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَتَمَنَّى أَحَدُكُمْ الْمَوْتَ وَلَا يَدْعُ بِهِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَهُ إِنَّهُ إِذَا مَاتَ أَحَدُكُمْ انْقَطَعَ عَمَلُهُ وَإِنَّهُ لَا يَزِيدُ الْمُؤْمِنَ عُمْرُهُ إِلَّا خَيْرًا.

হজরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে কেউ যেন তার মৃত্যু কামনা না করে। এবং মৃত্যু তার নিকট আসার আগে সে যেন সে ব্যাপারে প্রার্থনাও না করে। কারণ, যখন তোমাদের কেউ মারা যায়, তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। আর মুমিনের দীর্ঘ জীবন তার শুধু কল্যাণই বৃদ্ধি করে। ৬৭

এছাড়া অন্য এক হাদিসে এসেছে- عَنِ الْحَارِثِ بْنِ أَبِي يَزِيدَ قَالَ سَمِعْتُ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ... وَإِنَّ مِنْ السَّعَادَةِ أَنْ يَطُولَ عُمْرُ الْعَبْدِ وَيَرْزُقَهُ اللَّهُ الإنابة.

হারেস ইবনে ইয়াজিদ রহ. বলেন, আমি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা.-কে বলতে শুনেছি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো বান্দার দীর্ঘ জীবন প্রাপ্ত হওয়াও তার জন্য একটি সৌভাগ্য। আল্লাহ তাআলা তখন তাকে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রদান করেন। ৬৮

সুতরাং হায়! আমার আফসোস, আমার যদি হজরত নুহ আলাইহিস সালামের মতো দীর্ঘ জীবন হতো! দুনিয়াতে ইলমের ভান্ডার কত বড় ও ব্যাপক। যখনই কেউ এখান থেকে কিছু অর্জন করে- সে আরও উচ্চ ও উন্নত হয়, মর্যাদাবান হয় এবং সে আরও বেশি উপকৃত হয়।

টিকাঃ
৬৭ সহিহ মুসলিম: ১৩/৪৮৪৩, পৃষ্ঠা ১৮১- মা. শামেলা • মুসনাদে আহমদ: ২৯/১৪০৩৭, পৃষ্ঠা: ৮৬- মা. শামেলা
৬৮. মুসনাদে আহমদ: ৩/১৮ এবং হাকেম ইবনে মুসতাদরাক: ১/৪৯৩। এবং ইমাম বোখারি রহ.ও এটি 'আলআদাবুল মুফরাদ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন-২/৭১০। ইমাম যাহাবি রহ. এবং তবারনি রহ. এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00