📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি

📄 শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি


নিচের এই আয়াতটি যখন পড়লাম,
قُلْ أَرَاَيْتُمْ إِنْ أَخَذَ اللهُ سَمْعَكُمْ وَأَبْصَارَكُمْ وَخَتَمَ عَلَى قُلُوْبِكُمْ مَّنْ إِلَهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بِهِ)

(হে নবী, তাদেরকে) বলো, তোমরা বলো তো, আল্লাহ যদি তোমাদের শ্রবণশক্তি এবং তোমাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেন এবং তোমাদের অন্তরে মোহর করে দেন, তবে আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ আছে, যে তোমাদেরকে এগুলো ফিরিয়ে দেবে? [সুরা আনআম : ৪৬]

আয়াতটি পড়ে আমার দৃষ্টিতে এমন একটি ইঙ্গিত উদ্ভাসিত হলো, যা আমি আগে কখনো অনুধাবন করিনি। আর সেটা হলো, এই আয়াত দিয়ে যদি আল্লাহ তাআলা বাস্তব কান ও চোখ উদ্দেশ্য নেন, তাহলে তো বলতে হয়, কান হলো চারপাশের শব্দ ও আওয়াজ শ্রবণের একটি উপকরণ। আর চোখ হলো দর্শনীয় বিষয়াবলি দেখার একটি উপকরণ। এই দুটি উপকরণ তাদের শক্তিকে কলব বা অন্তরে পৌঁছে দেয়- আর এর দ্বারা অন্তর অনুভব করে ও ধারণ করে। অর্থাৎ সৃষ্টিজগতের যা কিছুই শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তির নিকট উপস্থাপিত হয়, সেটাকেই তারা কলব বা অন্তরের নিকট পৌঁছে দেয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যখন নিষেধ করবেন, তখন আর এগুলো তাদের কাজ করবে না। অন্তর বা মস্তিষ্কের নিকট তাদের খবর পৌঁছে দেবে না।

এর দ্বারাও স্রষ্টার অস্তিত্বের ওপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ এগুলো তাদের স্রষ্টার আনুগত্যের প্রকাশ ঘটায় এবং তার বিরোধিতার ব্যাপারে শাস্তির ভয় করে।

আর যদি এর দ্বারা আল্লাহ অভ্যন্তরীণ শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির কথা উদ্দেশ্য নেন, তখন শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হবে- আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রবৃত্তির অনুসরণের মাধ্যমে সত্য দেখবে না- সত্য শুনবে না। অর্থাৎ তখন ব্যক্তির শাস্তিটা হবে অভ্যন্তরীণ। তার অন্তর্দৃষ্টি ও অন্তচোখের শক্তি কেড়ে নেওয়া হবে। তখন সে ব্যক্তি কিছু দেখবে, কিন্তু আসলে যেন সে কিছুই দেখেনি। সে শুনবে, কিন্তু আসলে সে যেন কিছুই শোনেনি। সে কী করবে-সে সম্পর্কে সে উদাসীন। তার থেকে কী চাওয়া হচ্ছে, সে সম্পর্কে বেখেয়াল। কোনো পরীক্ষাই তখন তার মাঝে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কোনো উপদেশই তার মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে না।

তার এমনই পরিণতি হবে যে- সে জানে না, সে কোথায় আছে? আবার কোথায় যাবে, জানে না তা-ও। তার কী উদ্দেশ্য, তা সে জানে না। প্রবৃত্তির অনুসরণে তাৎক্ষণিক লাভের দিকে সে অগ্রসর হয়। কিন্তু তার স্থায়ী ক্ষতি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে না। সে তার সঙ্গীর দ্বারা শিক্ষা নেয় না। সে তার বন্ধুর দ্বারা উপদেশ গ্রহণ করে না। সর্বোপরি সে তার দীর্ঘ সফরের জন্য কোনো পাথেয় সংগ্রহ করে না।

যেমন এক কবি বলেন,
الناس في غفلة والموت يوقظهم وما يفيقون حتى ينفذ العمر

মানুষ রয়েছে উদাসীনতার মধ্যে। অথচ মৃত্যু তাকে প্রতিদিন সতর্ক করছে। অথচ সজাগ ও সতর্ক হতে না হতেই জীবন হয়ে পড়ছে সমাপ্ত।

يشيعون أهاليهم بجمعهم وينظرون إلى ما فيه قد قبروا

সে একে একে তার সকল আত্মীয়-পরিজনকে বিদায় দিয়ে আসছে। তাদেরকে কীভাবে কবরে দাফন করা হচ্ছে, দেখছে সেগুলোও।

ويرجعون إلى أحلام غفلتهم كأنهم ما رأوا شيئا ولا نظروا

এরপর তারা আবার তাদের উদাসীন মিথ্যা স্বপ্নের মধ্যে নিমগ্ন হচ্ছে। যেন তারা কিছুই দেখেনি। যেন তারা কিছুই দর্শন করেনি।

এটাই হলো অধিকাংশ মানুষের প্রকৃত অবস্থা। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের অন্তরের অনুধাবনের শক্তি ছিনিয়ে না নেন। আমরা তার নিকটেই আশ্রয় প্রার্থনা করি। কারণ, এটি মানুষের অবস্থাসমূহের সবচেয়ে ভীতিকর একটি অবস্থা। অনুধাবনহীনতার কারণে মানুষের সত্যে ফিরে আসার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়。

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা

📄 আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা


প্রাজ্ঞজনরা প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে, তার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে যে সকল কথা বলেছেন, আমি সেগুলোর ব্যাপারে দৃষ্টি প্রদান করলাম। এগুলো নিয়ে আমি একটি কিতাবও রচনা করেছি। কিতাবটির নাম দিয়েছি - ذم الهوى প্রবৃত্তির নিন্দা।

সেখানে আমি ভালোবাসা নিয়ে অনেক প্রাজ্ঞজনের মন্তব্য উল্লেখ করেছি। যেমন, কেউ বলেছেন, ভালোবাসার সৃষ্টি হয় বেকার মনের চঞ্চলতা থেকে। কিন্তু এ মতটি সকলে মেনে নেননি। এ কারণে কেউ বলেন, ভালোবাসার উদ্ভব ঘটে মানুষের সৌন্দর্য-প্রীতির কারণে।

অন্যরা বলেন, যারা বাস্তবতার চিন্তা ছেড়ে অলীক কল্পনায় হাবুডুবু খায়, তারাই শুধু ভালোবাসায় আপতিত হয়।

তবে এসব আলোচনা-পর্যালোচনার পর আমার অন্তরে এক আশ্চর্য রকমের চিন্তা এসেছে। চিন্তাটা হলো, প্রেমাস্পদের স্থির স্থিরতা ব্যতীত কোনো ভালোবাসাই স্থায়ী হওয়া সম্ভব নয়।

কারণ হলো, হৃদয়ের উদ্বেল আবেগ হয়তো কারও জন্য ভালোবাসার প্রাসাদ বানায়। সামান্য সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন নৈকট্য অর্জন হয়, তখন হয়তো ভিন্ন মানসিকতা, ভিন্ন জীবনবোধ কিংবা দীর্ঘ মেলামেশার কারণে প্রকাশিত হওয়া তার বিভিন্ন দোষ-ত্রুটি দেখে অন্তর এসে হোঁচট খায়- ভালোবাসার প্রাসাদ যায় ভেঙে এবং খুব অল্পতেই সে অন্য কারও দিকে ধাবিত হতে চায়।

সুতরাং স্থির ও অপরিবর্তিত সত্তা ব্যতীত ভালোবাসার এমন কোনো আশ্রয় নেই, যে অবস্থাটির সাথে ত্রুটিহীনভাবে ভালোবাসা স্থির থাকতে পারে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সকল মানব-মানবীর অস্তিত্বই ধ্বংসশীল এবং ত্রুটিযুক্ত এবং প্রতিনিয়ত তার মধ্যে পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। তাই কোনো বন্ধনই তাদেরকে একটি অবস্থায় বেঁধে রাখতে সক্ষম নয়। একারণে তাদের স্বভাব বা হৃদয়ের আবেগ যদি কোনো ব্যক্তির ভালোবাসার সাথে জড়িয়ে পড়ে, তারপরও তারা এটিকে একটি স্থির ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় না। কারণ, প্রথমে বেশি আবেগ এবং কম জানাশোনার কারণে দোষত্রুটিগুলো অগোচরে থেকে যায়। নির্ভাবনায় পারস্পরিক ভালোবাসায় নিমগ্ন হয়। কখনো বা হৃদয়কে আকর্ষণকারী কিছু গুণাবলির কারণেও দু-জন ব্যক্তির মাঝে ভালোবাসার সৃষ্টি হয়ে পড়ে। যেমন, সৌন্দর্য, স্বভাবের নৈকট্য, মেজাজের সম্মিলন, সহানুভূতি, হৃদয়ের কোমলতা ইত্যাদি। এগুলোও পরস্পরের মাঝে ভালোবাসার সৃষ্টি করে।

কিন্তু ভালোবাসার প্রকৃতি কখনো তার প্রাথমিক প্রচণ্ড আবেগ ও গতিময়তার সময় বোঝা যায় না। যেমন কর্তনের মুহূর্তে অনুভূত হয় না ব্যথার অস্তিত্ব। মানুষের স্বভাবের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এমন এক অস্থির বাসনা- পূর্ণতার বাসনা। ত্রুটিহীন প্রাপ্তির বাসনা। কিন্তু এটা সে দুনিয়াতে প্রাপ্ত হয় না। কারণ, সে এমন কিছু কামনা করে, যা কোনো মানুষের মধ্যে পূর্ণভাবে পাওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে আবেগমথিত প্রাথমিক উত্তেজনা যখন কেটে যায়, একে একে তার সামনে নির্দিষ্ট মানব বা মানবীর ত্রুটি ও অপূর্ণতাগুলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে- তখন অন্তর দমে যায়। প্রবল উদ্ধত উদ্বেলিত ভালোবাসাও তখন ধীরে ধীরে নত করে আনে তার ক্লান্ত শ্রান্ত ডানা। এরপর যা বাকি থাকে- তা হলো অভ্যাস, প্রয়োজন ও লোকদেখানো আচরণ।

এই হলো মানুষ ও মাখলুকের ভালোবাসার ইতিহাস।

কিন্তু স্রষ্টার সাথে মানুষের অন্তরের ভালোবাসার বিষয়টি ভিন্ন রকম। এখানে তার সাথে আর কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর অবস্থিতি নেই। কোনো পরিবর্তন নেই। দোষ-ত্রুটির কোনো বালাই নেই। তাই স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা কোনো সৃষ্টিজীবের ভালোবাসার মতো নয়। এটা শুধু বলে বোঝানোর জিনিস নয়।

স্রষ্টার প্রতি এই মারেফাতের ভালোবাসা কখনো এতটাই প্রবল ও প্রতাপী হয়ে ওঠে যে, স্রষ্টার ভালোবাসা তাদেরকে অন্য সকল ভালোবাসা ভুলিয়ে দেয়। অন্তরের নৈকট্য ও মারেফাতের শক্তিমত্তার কারণে পুরো মন-প্রাণ একেবারে তার ভালোবাসায় নিমজ্জিত হয়ে যায়। তখন তার ভালোবাসার অবস্থাটি হয় তেমন, যেমনটি হজরত রাবেয়া বসরি রহ. এই কবিতায় বলেছেন। তিনি বলেন,
أحب حبيبا لا أعاب بحبه وأحببتهم من في هواه عيوب

আমি এমন প্রিয়কে ভালোবাসি, যার ভালোবাসায় কোনো নিন্দা-মন্দ নেই। আর তুমি তাদেরকে ভালোবেসেছ, যেখানে শুধু দোষ আর দোষ।

এবার এক দরিদ্র জাহেদের ঘটনা বলি। তিনি একবার এক নারীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। হঠাৎ মেয়েটি তার চোখে ধরে। তিনি বিমুগ্ধ হন। তিনি মেয়েটির বাবার কাছে গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব প্রদান করলেন। মেয়েটির বাবা প্রস্তাবে রাজি হলেন। তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার পর খুবই নতুন ও চমৎকার একটি কাপড় পরিধান করিয়ে দিলেন।

এরপর যখন রাত হলো। রাত নীরব ও গভীর হলো। এটা ছিল মূলত জাহেদ ব্যক্তির নির্জন ইবাদতের সময়। রাতের কাঙ্ক্ষিত সময়। স্রষ্টার সাথে নির্জন সান্নিধ্যের সময়। একারণে হঠাৎ জাহেদ ব্যক্তিটি সকল কিছু ছেড়েছুড়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন- আমার কাপড় কোথায়? আমার কাপড় কোথায়? যা পেয়েছিলাম তা তো আমি হারিয়েছি। এই সুন্দর কাপড় আর নারী আমার জন্য নয়। এখানে আর এক মুহূর্তও নয়।

এটি ছিল সেই জাহেদের রাস্তায় এমন একটি হোঁচট, যা তাকে বুঝিয়েছে যে, রাস্তা থেকে সে বিচ্যুত হয়েছে।

আল্লাহর মারেফাতের ক্ষেত্রে অনেকের ক্ষেত্রে এই অবস্থা সংঘটিত হয়। আর ধ্বংসশীল মানুষের ক্ষেত্রে হয় এর উল্টো।

হজরত ইবনে মাসউদ রা. বলেন, তোমাদের কাউকে যদি কোনো নারী বিমুগ্ধ করে, তবে সে যেন তার মূত্রাশয়ের কথাও চিন্তা করে।

মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের আকর্ষণ ও বিকর্ষণ কেন ঘটে?

কারণ, ক্ষুধার্ত মানুষের আকর্ষিত খাবার গ্রহণের সময় মুখের ভেতর নাড়াচাড়া করা ও গলধঃকরণ করার কষ্ট সম্পর্কে কোনো ভাবনা থাকে না। প্রচণ্ড উত্তেজনার কারণে সহবাসের মুহূর্তে আপতিত অসুবিধা ও অপছন্দনীয় বিষয়ের কথাও মনে থাকে না। এমনকি নিজের থুথুকে গিলে ফেলার সময়ও কারও মনে থাকে না যে এটি খাদ্য নয়। অবশ্য এই মুহূর্তগুলোতে এই অসুবিধাগুলোর অবগুণ্ঠনের মধ্যেই রয়েছে কল্যাণ- নতুবা মানুষ তার স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারত না।

কিন্তু সচেতন অবস্থায়, উত্তেজনাহীন অবস্থায়- এগুলোর মধ্যে আর কোনো চাহিদা থাকে না। তখন জীবনের এই স্বাদ চাখা তার জন্য বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। প্রবৃত্তির এই নীচতার ওপর তার বিতৃষ্ণা জেগে ওঠে। দোষগুলো ভেসে উঠতে থাকে। দোষগুলো বড় হয়ে উঠতে থাকে। কান্তিমান দেহ বিবর্ণ হয়ে আসে। ঠিক এভাবেই প্রেমাস্পদের দোষগুলোর ওপর দৃষ্টিপাতের তারতম্য অনুযায়ী প্রেমিকের অন্তর হতে প্রেম উধাও হতে থাকে। আর ঠিক একইভাবে মস্তিষ্কের স্থিরতা অনুযায়ী প্রেমের পারদও বাড়তে থাকে।

কবি মুতানাব্বি বলেন, لو فكر العاشق في منتهى حسن الذي يسبيه لم يسبه

যে সৌন্দর্য প্রেমিককে ব্যাকুল বিমোহিত করে, সে যদি সেই সৌন্দর্যের শেষ পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করত, তবে আর এই সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করত না।

দুনিয়ার প্রেমিকদের অবস্থা এমনই। কিন্তু আরেফদের অন্তর সর্বদা আল্লাহর মারেফাতের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ক্রমান্বয়ে আরও বেশি নৈকট্য ও ভালোবাসার দিকে ধাবিত হতে থাকে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ভীত বান্দার প্রার্থনা

📄 ভীত বান্দার প্রার্থনা


একবার এক সমস্যার কারণে আল্লাহ তাআলার নিকট আকুলভাবে দুআ ও প্রার্থনা করলাম। প্রার্থনার সময় আমার সাথে এক নেকবান্দাও শরিক হয়েছিলেন। পরে আমি এই দুআ কবুলের বাস্তব প্রভাব আমার মাঝে দেখতে পেলাম। সমস্যা থেকে মুক্ত হলাম।

তখন নফস আমাকে ডেকে বলল, এটা ওই সৎ বান্দার প্রার্থনার কারণে হয়েছে; তোমার প্রার্থনার কারণে নয়।

আমি তাকে বললাম, আমি স্বীকার করি আমার যত গোনাহ ও আমলের কমতি রয়েছে, তাতে দুআ কবুল না-ও হতে পারে। তবে আমি বলি কী- আমার কারণেই তো দুআটি কবুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, আমার সাথের সৎ ব্যক্তিটি আমার ধারণায় আমার চেয়ে বেশি ভালো, নিষ্কলুষ, পবিত্র। কিন্তু এদিকে নিজের গোনাহের অনুশোচনা নিয়ে আমার ছিল ভগ্ন হৃদয় এবং কম আমলের হীনম্মন্যতা। আর তিনি তার আমলে ছিলেন সন্তুষ্ট।

কখনো কখনো নিজের এই কমতি ও নিঃস্বতা প্রকাশই দুআ কবুলের জন্য অধিক কার্যকর হয়। কারণ, আমি এবং তিনি- আমরা কেউ-ই আমাদের আমলের দোহাই দিয়ে আল্লাহর করুণা প্রার্থনা করিনি। সুতরাং আমি যখন আমার সমূহ গোনাহ স্বীকার করে ভগ্ন হৃদয় নিয়ে আল্লাহর দরবারে বলেছি, হে মাওলা, তুমি তোমার অনুগ্রহে আমাকে দাও, তখন আমার প্রার্থনার মধ্যে এমন কিছু নেই, যা এটিকে বিনষ্ট করে দিতে পারে। বরং কখনো কখনো দুআর মধ্যে নিজের সৎ আমলের দিকে দৃষ্টিপাতই দুআ কবুলের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

সুতরাং হে আমার নফস, তুমি আমাকে আর নিরাশ করতে চেয়ো না। কারণ, আমি তো আমার আমলের কমতি নিয়ে ভগ্নহৃদয় হয়েই আছি। তাছাড়া আমার ইলমের কারণে আমার যে আদব, নিজের কমতির কথা স্বীকার করা, নিজের বিপদে আমার যে আকুলকরা প্রার্থনা, কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে আল্লাহর অনুগ্রহের ক্ষেত্রে আমার যে দৃঢ় বিশ্বাস- নিশ্চয় এগুলো সেই বান্দার সাথে ছিল না (আল্লাহ তার ইবাদতের মধ্যে আরও বরকত বাড়িয়ে দিন)। এভাবে কখনো কখনো নিজের কমতি স্বীকার করে নেওয়াটাই দুআ কবুলের জন্য অধিক উপযুক্ত ও কার্যকরী হয়।

টিকাঃ
৬৬. পুরো নাম: আবুত তীব আহমদ বিন হুসাইন বিন হাসান আলজুফি আলকুফি। তিনি ছিলেন বিখ্যাত কবি। যুগের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। শ্রেষ্ঠ মেধাবী। ‘মুতানাব্বি’ নামে অধিক প্রসিদ্ধ। ৩৫৪ হিজরি সনে তিনি নিহত হন। সিয়ারু আ’লামিন নুবালা : ১৬/১৯৯।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 চিত্তার শীর্ষচূড়া

📄 চিত্তার শীর্ষচূড়া


নিজের সীমাহীন পাণ্ডিত্যের দাবি করে- এমন এক স্বঘোষিত পণ্ডিতের নিকট আমি একবার আমার কিছু রচনা পড়ে শোনালাম। তিনি শুনলেন। কিন্তু একসময় খেয়াল করলাম- তিনি আমার লেখার প্রতি তেমন একটা আকর্ষণ বোধ করছেন না, মন দিয়ে শুনছেন না। বিষয়গুলোর গভীরতা বোঝারও চেষ্টা করছেন না। পরিণামে আমার বাকি রচনাগুলো তাকে শোনানো বন্ধ করে দিলাম এবং মনে মনে বললাম, এটা হলো এমনই এক অমীয় সুধা, এ ব্যাপারে পিপাসার্ত ব্যক্তিই শুধু তা পান করতে সক্ষম হবে।

এ ঘটনায় আমি একটি নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম। যেমন, তিনি যদি আমার রচনাগুলো শুনতেন, বুঝতেন এবং লেখার কারণে আমার প্রশংসা করতেন, তাহলে আমার নিকট তার গুরুত্ব বেড়ে যেত এবং আমি আমার আরও সুন্দর রচনাগুলো তাকে দেখাতাম। কিন্তু আমি যখন দেখলাম, তিনি এর প্রতি ততটা আগ্রহী নন এবং এর উপযুক্তও নন, তখন আমি সেগুলো তার থেকে ফিরিয়ে নিলাম এবং আমার মনোযোগও তার থেকে সরিয়ে নিলাম।

এর দ্বারা যে শিক্ষাটা পেলাম সেটা হলো, আল্লাহ তাআলা এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন। এগুলোর মাঝে বিস্ময়কর অসাধারণ চমৎকার বিন্যাস দিয়েছেন। সুগঠিত শৃঙ্খলা দিয়েছেন। তারপর এগুলো মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছেন। এখন বুদ্ধিমান ব্যক্তিই শুধু এটার দিকে দৃষ্টি দেয়, চিন্তা করে। এর শোভা-সৌন্দর্য দেখে এবং নিজের বুঝ ও অনুধাবনের পরিমাণ অনুপাতে সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা করে। তখন স্রষ্টাও তাকে ভালোবাসেন। তার দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখেন।

একইভাবে তিনি কোরআন অবতীর্ণ করেছেন- যা অনেক মূল্যবান হিকমত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বর্ণনা করে। সুতরাং যে ব্যক্তি এটা বোঝার জন্য চেষ্টা করে, আগ্রহ রাখে এবং নীরবে-নিভৃতে এগুলো নিয়ে চিন্তা করে, সে এই বাণীর মালিকের সন্তুষ্টি অর্জন করে এবং তার নিকট বিশেষ মর্যাদা প্রাপ্ত হয়।

কিন্তু যে ব্যক্তি তার সকল চিন্তা-চেতনা শুধু বস্তুগত বিষয়ে নিবদ্ধ রাখে, আল্লাহর বাণী ও সংবাদের দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করে না, এটার কোনো গুরুত্ব দেয় না- আল্লাহ তাআলা তাকে এই মর্যাদা অর্জনের পথ থেকে বঞ্চিত করেন। তার থেকে এটিকে সরিয়ে রাখেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
﴿سَأَصْرِفُ عَنْ آيَاتِيَ الَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ

পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে অহংকার প্রকাশ করে, তাদেরকে আমি আমার আয়াত বা নিদর্শনাবলি হতে বিমুখ করে রাখব। [সুরা আরাফ : ১৪৬]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00