📄 কারি এবং বস্তার আপদ
চিন্তা করে দেখলাম, ওয়াজের মজলিসে এমন অনেক কিছুই চলে, যেগুলোকে সাধারণ মানুষ- এমনকি জাহেল আলেমগণও সঠিক ও সওয়াবের কাজ মনে করে- অথচ সেগুলো বর্জনীয় পরিত্যাজ্য ও বিদআত।
কারি সাহেব কখনো কখনো অতি উল্লাসের সাথে তেলাওয়াত শুরু করে এবং গানের মতো সুর করে পড়তে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভুল উচ্চারণ করে। এদিকে বক্তাগণও আনন্দ-বেদনায় উদ্বেলিত হয়ে সুর করে লাইলি-মজনুর কবিতা বলতে থাকে। কেউ বাহ্বা দেয়... কেউ তালি দেয়... আবেগে কেউ আবার নিজের জামা ছিঁড়ে ফেলে। আর ধারণা করে- এগুলো বুঝি সওয়াবের কাজ। অথচ জানা বিষয় যে, ভুল উচ্চারণে এভাবে পড়া তো একজন গায়কের মতো হয়ে গেল, যে তার গানের সুর দিয়ে মানুষের অন্তর মজায়, নেশায় আপ্লুত করে এবং আনন্দ জোগায়। সুতরাং এভাবে তেলাওয়াত করা- যা ফাসাদ সৃষ্টি করে, তা কখনো সঠিক পদ্ধতি হতে পারে না।
এক্ষেত্রে বক্তাদেরও একটু হিসাব করে চলা এবং বলা উচিত।
এমনই আরেকটা বিষয় হলো লাশ দাফনকারীদের কর্ম। তারা লাশ দাফন করতে গিয়ে নিজেদের বেদনাদায়ক বিভিন্ন কথার মাধ্যমে আত্মীয়দের ব্যথা-বেদনা ও শোককে আরও উসকে দেয়- যাতে মহিলারা আরও বেশি ক্রন্দন করে। এভাবে তাদের অন্তর বিগলিত করে ফেলে- যাতে তাদেরকে আরও বেশি হাদিয়া ও তোহফা প্রদান করে। কিন্তু তারা যদি এটা না করে, আত্মীয়দেরকে ধৈর্য ও সবরের নির্দেশ দিত, তাহলে আর মহিলারা এমন ব্যাকুলভাবে ক্রন্দন করত না এবং তাদেরকে এত পরিমাণ হাদিয়াও দিত না। এ কারণেই তারা এটা করে না। অথচ দ্বীনের নির্দেশনা এমনই- আত্মীয়দেরকে ধৈর্যের কথা বলা। এটা না করে তাদের শোককে আরও উসকে দেওয়া দ্বীনের স্পষ্ট বিরোধিতা এবং অবৈধভাবে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির পায়তারা।
ইবনে আকিল একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, একবার আমাদের নিকট এক লোকের শোকসংবাদ এলো যে তার পুত্র মারা গিয়েছে। শোনামাত্র আমাদের মাঝের এক কারি সাহেব বলে উঠলেন, يا أسفى على يوسف হায়, ইউসুফের ওপর আফসোস!
আমি বললাম, এটা তো ঠিক হলো না। এর দ্বারা কোরআনের সাথে ঠাট্টা করা হলো। আর লোকটির আফসোসকে আরও বাড়িয়ে দেওয়া হলো।
বক্তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার গভীর মারেফাত ও মুহাব্বাতের ওয়াজ করেন। তখন তুমি দেখবে, সেই পরিচালক বা আয়োজনকারী, যে হয়তো নামাজের ফরজটাও ঠিকমতো জানে না, ওয়াজ শুনে সেও আল্লাহর মুহাব্বাতের দাবিতে তার শরীরের কাপড় ছিঁড়তে থাকে, বুক চাপড়াতে থাকে।
কোনো সুফির অবস্থা এমনও হয় নিজের ধারণামতো কল্পনায় কোনো সত্তাকে উপস্থিত করে—যেমন স্রষ্টাকে, এরপর তার যে বড়ত্ব রহমত ও সৌন্দর্যের কথা শুনেছে, সে কারণে তাকে পাওয়ার আগ্রহে ক্রন্দন করতে থাকে। অথচ তারা কল্পনায় যাকে উপস্থিত পায়— তিনি তো মাবুদ নন। কারণ, মাবুদ কখনো কল্পনায় ধরা দেন না। ধরা যায় না।
এসব বিভ্রান্তি ও ভুল ছড়ানোর পর সঠিক জিনিসটা জানা সাধারণ মানুষদের জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়ে। এসব চিত্তাকর্ষক বর্ণনা শোনার পর তারা আর সত্যের তিক্ততা গ্রহণ করতে চায় না। দ্বীনের ক্ষেত্রে আর উপকৃত হতে পারে না। এটাই হলো বক্তাদের আপদ।
কিন্তু যে বক্তা সত্যের ওপর রয়েছেন, তিনি লোকদেরকে বিভ্রান্তিকর কথা বলেন না। বরং হিকমত প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার সাথে তাদেরকে সত্যের দিকে উৎসাহিত করেন। এ ধরনের বক্তা ও বক্তব্য প্রশংনীয়।
আর মূলত বক্তৃতা হলো একটি বিশেষ শিল্প। স্থান ও পাত্রের ভিন্নতায় এটাকে যতটা সুন্দর ও উপযোগী করা যায়, ততই কার্যকর উপকার বয়ে আনে। কিছু শ্রোতা ভালোবাসে সুন্দর উপস্থাপনা ও ভাষামাধুর্য। আর কিছু শ্রোতা পছন্দ করে সংক্ষিপ্ততা, ইঙ্গিত ইশারা এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা। আর কোনো কোনো শ্রোতা ভালোবাসে সুর শের কবিতার ছন্দ এবং সুললিত কণ্ঠ।
কিন্তু এখন আসলে প্রয়োজন, মানুষকে দ্বীনের প্রতিটি মৌলিক বিষয়ে সঠিকভাবে জানানো ও উজ্জীবিত করা- সুন্দর ভাষায় এবং উপযোগী পদ্ধতিতে। একজন বক্তা অবশ্যই তার প্রধান কর্তব্য ও লক্ষ্যের প্রতি খেয়াল রাখবেন, নির্দিষ্ট বিষয়েই আলোচনা করবেন এবং প্রয়োজন হলে খাবারে সামান্য লবণ মেশানোর মতো বৈধ কিছু হাসি-মজাক বা চিত্তাকর্ষক কথাও বলতে পারেন। এভাবেই তিনি শ্রোতাদেরকে ইবাদতের সংকল্পের দিকে উৎসাহিত করবেন। তাদেরকে সত্যের পথ চেনাবেন।
একবার আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. একটি মজলিসে আগমন করলেন। সেখানে তিনি হারেস মুহাসাবির আলোচনা শুনে অনেক ক্রন্দন করলেন। এরপর তিনি বললেন, হৃদয়ের গভীরে কোনো বিগলন আমাকে এভাবে কাঁদায়নি। কিন্তু পরিবেশটাই এমন হয়ে উঠেছিল যে, ক্রন্দনকে আবশ্যক করেছে।
কোনো কোনো মানুষের পরিবেশ কায়েম করার এই এক আশ্চর্য ক্ষমতা আল্লাহ তাআলা দিয়ে থাকেন। তাদেরকে সেটা সঠিক কাজে ব্যবহার করা উচিত।
সালাফে সালেহিনের কেউ কেউ ওয়াজ বা বক্তৃতার মাঝে ঘটনার মিশ্রণকে দূষণীয় মনে করতেন এবং যারা এমনটি করে, তাদের মজলিসে উপস্থিত হতে নিষেধ করতেন। অবশ্য আজকের দিনে সেটা আর সর্বক্ষেত্রে দূষণীয় নয়। কেননা, তখনকার সময়ে মানুষ ইলমচর্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকত। সেখানে ঘটনা- কাহিনির উপস্থিতি তাদের জন্য ছিল একটি প্রতিবন্ধকতা। আর আজ ইলমের প্রতিবন্ধকতা অনেক বেড়ে গেছে। সুতরাং আজ ওয়াজের মজলিস- মানুষদের অধিক উপকার করে, তাদেরকে গোনাহ থেকে বিরত রাখে এবং তাওবার দিকে ধাবিত করে। তাই ওয়াজের মধ্যে প্রাসঙ্গিক ঘটনা ও কাহিনি বলতেও কোনো অসুবিধা নেই।
আসলে কী-ঘটনার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হলো ঘটনা বর্ণনাকারীর মধ্যে তিনি যেন মিথ্যা বা বানানো কাহিনি না বলেন। আল্লাহকে ভয় করে চলেন-তাহলেই চলবে।
📄 আল্লাহ তাআলার গুণাবলি সাব্যস্ত করা
সাধারণ মানুষের ওপর সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হলো তাবিলকারীদের কথা, আল্লাহর বিভিন্ন গুণ এবং তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়কে নাকচকারীদের কথা। সকল নবী আলাইহিমুস সালাম জীবনভর মানুষের অন্তরে আল্লাহর গুনাবলি প্রতিষ্ঠার জন্য মেহনত করেছেন- যাতে মানুষের অন্তরে আল্লাহর অস্তিত্ব সাব্যস্ত হয়। কারণ, অন্তর হ্যাঁ-বাচক বিষয়ের সাথে বেশি একাত্মতা বোধ করে।
কিন্তু আল্লাহ তাআলার গুণাবলি নিয়ে আমাদের আজকের এই ভুলচর্চার কারণে সাধারণ মানুষ এমন শব্দ-বাক্য-কথা শোনে, যেগুলো তাদেরকে না-বাচকতার দিকে ঠেলে দেয়, তাদের অন্তর থেকে তখন হ্যাঁ-বাচকতার বোধই উঠে যায়। এটি তাদের জন্য খুবই ক্ষতিকর একটি বিষয়। অবশ্য আলেমদের কেউ কেউ ধারণা করেন, এই না-বাচকতা নবীগণ যেই হ্যাঁ-বাচকতা প্রচার করেছেন, সেটাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং সাধারণ মানুষ যে সমস্যার মধ্যে আপতিত হয়, তা থেকে উদ্ধার করবে।
আল্লাহ তাআলা নিজেও এমনটি করেছেন। প্রথমে হ্যাঁ-বাচকতা বর্ণনা করে পরে না-বাচকতা বর্ণনা করেছেন।
যেমন, আল্লাহ তাআলা তাঁর আরশের ওপর 'ইসতিওয়া' সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে অন্তরসমূহ আল্লাহ তাআলার অবস্থিতি ও তার অস্তিত্বে বিষয়ে একাত্মতা বোধ করে ওঠে। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন, وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ -তোমার প্রতিপালকের 'চেহারা' অবশিষ্ট থাকবে। [সুরা রহমান: ২৭]। আরও বলেন, بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ বরং তার দু-হাত প্রশস্ত। [সুরা মায়েদা : ৬৪]। তিনি আরও বলেন, غَضِبَ اللهُ عَلَيْهِمْ -আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর রাগান্বিত হয়েছেন। [সুরা আল ফাতহ : ৬]। আরও বলেন, رَضِيَ اللهُ عَنْهُم - আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। [সুরা মায়েদা : ১১৯]। একইভাবে তাঁর দুনিয়ার আসমানে অবতরণের বিষয়ে সংবাদ দিয়েছেন। আরও বলেছেন, বান্দাগণের অন্তর তাঁর দু-আঙুলের মাঝে। আরও বলেছেন, তাওরাত তিনি নিজ হাতে লিখেছেন। আরও বলেন, তিনি একটি কিতাব লিখেছেন, সেটা তার নিকট আরশের ওপর রয়েছে। এমনই আরও বিভিন্ন বিষয় রয়েছে, যার তালিকা অনেক দীর্ঘ।
এধরনের হ্যাঁ-বাচক কথার মাধ্যমে সাধারণ থেকে সাধারণ, বাচ্চা-কাচ্চা সবার অন্তর হ্যাঁ-বাচকতায় ভরে গেছে। এগুলোকে যখন তারা ইন্দ্রিয় অনুভবের জাগতিক গুণাবলির কাছাকাছি ধরে নিয়েছে, তখন আল্লাহ তাআলা বর্ণনা করে দিয়েছেন না-বাচক এই কথা— তাঁর মতো কোনো কিছু নেই। [সুরা শুরা : ১১]
এখন মানুষের অন্তরে যতসব কল্পনা-জল্পনা সৃষ্টি হয়েছিল আল্লাহ তাআলার গুণ সম্পর্কে, সবকিছু তিনি মুছে দিলেন। এবার শুধু হ্যাঁ-বাচকতার বিষয়গুলো নিঃষ্কলুষভাবে শুধু তাঁর জন্যই অবশিষ্ট রয়ে গেল। এ কারণেই শরিয়ত প্রথমে হ্যাঁ-বাচক এবং পরে অসংগত বিষয়ে না-বাচকতা সাব্যস্ত করেছে।
কিন্তু মানুষ শুধু উল্টা পথে চলেছে। হয়তো না-বাচকতা বেশি লাগিয়েছে কিংবা নিজেদের পক্ষ থেকে আল্লাহ তাআলার সত্তার সাথে অনুচিত গুণ আরও সংযুক্ত করেছে।
যেমন এক কবি বলেন, وفوق العرش رب العالمين، فضحك.
আরশের ওপর রয়েছেন আমাদের মহান প্রতিপালক। অনন্তর তিনি হেসেছেন।
এ কবিতা শুনে অন্য আরেকজন বলে বসল, আমাদের প্রতিপালক কি হাসেন? কবি বলল, অবশ্যই। নিশ্চয় তিনি আরশের ওপর এভাবে রয়েছেন। এমন রয়েছেন। এগুলো সে বলল, মানুষের অন্তরের মধ্যে হ্যাঁ-বাচকতা সুদৃঢ় করার জন্য।
এভাবে সৃষ্টির অধিকাংশ মানুষ আল্লাহ তাআলার গুণাবলির হ্যাঁ-বাচকতার বিষয়টি অবিমিশ্রভাবে অনুধাবন করতে পারে না। তারা তাদের প্রত্যক্ষ বিষয়াদির সাথে আল্লাহর গুণাবলিকেও গুলিয়ে ফেলে। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে এই না-বাচকতার মাধ্যমে কামনা করা হয়- তারা যেন অন্তত তার অনুচিত বিশেষণগুলো বুঝতে পারে।
কিন্তু যে ব্যক্তির মস্তিষ্ক হ্যাঁ-বাচকতার বোধ থেকে মুক্ত, তার ক্ষেত্রে যদি না-বাচকতার বিষয়গুলো দিয়ে শুরু করা হয়-যেমন আমরা যদি বলি, তিনি আসমানে নেই, আরশেও নেই, তার হাতের কোনো বর্ণনা সম্ভব নয়, তার কথা তার এমন একটি গুণ- যা তার সত্তার সাথে সংলগ্ন, আমাদের নিকট আসল কালামের কিছুই অবশিষ্ট নেই- এটা শুধু শব্দ। তার অবতরণ কল্পনা করা যায় না। তিনি এদিকে নন, ওদিকেও নন ইত্যাদি কথা যদি আমরা ক্রমাগত বলতে থাকি, তবে তার অন্তর থেকে কোরআনের মহত্ব মুছে যাবে এবং তার এই সীমাহীন না-বাচকতার রহস্যের মাঝে আল্লাহ তাআলার হ্যাঁ-বাচকতা প্রতিষ্ঠিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আমাদের জন্য এটি একটি বড় অপরাধ। নবীগণ জীবনভর কষ্টক্লেশ করে যে বর্ণনাগুলো মানুষের অন্তরে প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেগুলোকে এভাবে না-বাচকতার প্রাধান্যের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত করা অপরাধ ছাড়া আর কী! এ কারণে কোনো আলেমের জন্য হ্যাঁ-বাচকতায় প্রতিষ্ঠিত সাধারণ প্রচলিত কোনো বিশ্বাসের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা উচিত নয়। তাহলে সে এই বিশ্বাসটাকে আরও নষ্ট করবে এবং তার সংশোধন হয়ে পড়বে কঠিন।
একজন আলেম তো নিরাপদ থাকবে। কারণ, সে জানে, আল্লাহ তাআলার গুণাবলির মধ্যে নতুন কোনো গুণ যুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। নিজের মধ্যে 'ইসতিওয়া' বলতে যে ধরনের আকার ভাসে, আল্লাহ তাআলার 'ইসতিওয়া' এমন নয়। তার গুণের কোনো রূপান্তর হয় না, স্থানান্তর হয় না। তা স্পর্শও করা যায় না।
আর তিনি এটাও জানেন, বান্দাদের অন্তর দুই আঙুলের মাঝে থাকার অর্থ হলো, অন্তরের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ থাকা। আর কোনো ব্যাখ্যায় যাওয়া উচিত নয়।
আর সাধারণ লোকদের ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো, কোরআন ও হাদিসে এই বিষয়গুলো ঠিক যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, তোমরা সেভাবেই বিশ্বাস করে নাও। এর ব্যাখ্যার দিকে ধাবিত হয়ো না। আশা করা যায়, এর মাধ্যমে যেকোনো প্রান্তিকতা ছেড়ে মানুষের অন্তরে একটি মৌলিক বিষয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। সালাফে সালেহিন সব সময় এই পদ্ধতিই গ্রহণ করেছেন।
এর সাথে আমাদের শরিয়তের নির্ধারণটাও বুঝতে হবে। নবীদের উদ্দেশ্যটাও অনুধাবন করতে হবে। শরিয়ত যেটাকে গুণ্ঠিত করে রেখেছে, সেটাকে বিভিন্ন ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রকাশ করাকে তারা নিষেধ করেছেন। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কদর বা ভাগ্যলিপি নিয়ে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। এবং এ ব্যাপারে মতানৈক্য করতেও নিষেধ করেছেন। কারণ, এগুলোর ফলাফল দু-পক্ষকেই কষ্টের মধ্যে ফেলে দেবে। কারণ, এ সম্পর্কে আলোচনাকারী যখন পরিণামে এই সিদ্ধান্তে এসে যাবে যে, সবকিছু আল্লাহ তাআলাই নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং শাস্তিও নির্ধারিত হয়ে আছে। তখন আল্লাহ তাআলার ন্যায়-ইনসাফ নিয়ে তার ঈমান নড়বড়ে হয়ে উঠতে পারে।
আবার যদি আলোচনা শেষে সে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, তিনি নির্ধারণ করেননি এবং তিনি ফয়সালা করেন না। এবার সে আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নিয়েই সন্দেহের মধ্যে পড়ে যাবে। সুতরাং উত্তম হলো, এই সকল বিষয়ে আলোচনায় লিপ্ত না হওয়া।
এক্ষেত্রে হয়তো কেউ বলে বসতে পারে, এটা তো আমাদের প্রকৃত বাস্তবতা বুঝতে নিষেধ করার নামান্তর। বিশ্লেষণহীন বিশ্বাসের সাথে অবস্থানের আদেশ।
উত্তরে আমি বলব, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তোমার নিকট চাহিদা হলো সামগ্রিকতার ওপর ঈমান আনা। খুঁটে খুঁটে সকল কিছু বুঝে তার ওপর ঈমান আনার আদেশ তোমাকে দেওয়া হয়নি এবং এটা তোমার দায়িত্বও নয়। তাছাড়া তোমার বুঝশক্তিও এটা পুঙ্খানুপুঙ্খ বুঝতে সক্ষম নয়।
আল্লাহর খলিল হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলার কাছে আবেদন করেছিলেন, أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِ الْمَوْتَى -আপনি কীভাবে মৃতকে জীবিত করবেন, আমাকে একটু দেখান। [সুরা বাকারা: ২৬০]
আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা তাকে মৃত প্রাণীকে জীবিত অবস্থায় দেখিয়েছেন। তা ছিল বাহ্যিক দেখা। কিন্তু কীভাবে জীবিত করেছেন- তার অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া তিনি দেখাননি। কারণ, মানব নবীর ক্ষমতা সেটা অনুধাবন করতে অক্ষম।
আর আমাদের নবী- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যাকে পাঠানোই হয়েছে নিজের ওপর অবতারিত বিধি-বিধান মানুষের নিকট পৌঁছানোর জন্য, তিনি মানুষের শুধু স্বীকারোক্তি ও সামগ্রিক বিশ্বাসের ওপরই সন্তুষ্ট থেকেছেন। সাহাবিগণও ছিলেন এমন। তাদের থেকে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না যে, তারা تلاوة و متلو এবং قراءة و مقروء নিয়ে আলোচনা করেছেন। এবং তারা কখনো বলেননি استولى অর্থ إستوى এবং يرحم অর্থ ينزل । তারা বরং সেই সামগ্রিক হ্যাঁ-বাচকতার ওপর সন্তুষ্ট থেকেছেন, যা মানুষের অন্তরের মধ্যে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিয়ে বিরাজ করে। এরপর ليس كمثله شيء -তার মতো কিছু নেই-আল্লাহ তাআলার এই কথার মাধ্যমে তারা তাদের সকল ধরনের খেয়াল, কল্পনা-জল্পনার লাগাম টেনে ধরেছেন।
আমাদের স্মরণ রাখা দরকার- কবরে আমাদের নিকট যে 'মুনকার' ও 'নাকির' ফেরেশতার আগমন ঘটবে, তারা তো আমাদের দ্বীনের শুধু মৌলিক নীতি সম্পর্কেই জিজ্ঞাসা করবেন। কোনো সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মারপ্যাঁচ সেখানে নেই। তারা বলবেন, তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? তোমার নবী কে?
এই অধ্যায়টি যে ব্যক্তি ভালোভাবে বুঝে নেবে, সে সকল ধরনের প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। তাশবিহ, তাজসিম ও তাতিল (আল্লাহকে নিষ্ক্রিয় ভাবা) ধরনের ভ্রান্তি থেকে মুক্ত থাকবে। এবং অবস্থান করতে পারবে আমাদের সালাফে সালেহিনের মত ও পথের উপর। আল্লাহ আমাদের তাওফিকদাতা।
📄 শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি
নিচের এই আয়াতটি যখন পড়লাম,
قُلْ أَرَاَيْتُمْ إِنْ أَخَذَ اللهُ سَمْعَكُمْ وَأَبْصَارَكُمْ وَخَتَمَ عَلَى قُلُوْبِكُمْ مَّنْ إِلَهُ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بِهِ)
(হে নবী, তাদেরকে) বলো, তোমরা বলো তো, আল্লাহ যদি তোমাদের শ্রবণশক্তি এবং তোমাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেন এবং তোমাদের অন্তরে মোহর করে দেন, তবে আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ আছে, যে তোমাদেরকে এগুলো ফিরিয়ে দেবে? [সুরা আনআম : ৪৬]
আয়াতটি পড়ে আমার দৃষ্টিতে এমন একটি ইঙ্গিত উদ্ভাসিত হলো, যা আমি আগে কখনো অনুধাবন করিনি। আর সেটা হলো, এই আয়াত দিয়ে যদি আল্লাহ তাআলা বাস্তব কান ও চোখ উদ্দেশ্য নেন, তাহলে তো বলতে হয়, কান হলো চারপাশের শব্দ ও আওয়াজ শ্রবণের একটি উপকরণ। আর চোখ হলো দর্শনীয় বিষয়াবলি দেখার একটি উপকরণ। এই দুটি উপকরণ তাদের শক্তিকে কলব বা অন্তরে পৌঁছে দেয়- আর এর দ্বারা অন্তর অনুভব করে ও ধারণ করে। অর্থাৎ সৃষ্টিজগতের যা কিছুই শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তির নিকট উপস্থাপিত হয়, সেটাকেই তারা কলব বা অন্তরের নিকট পৌঁছে দেয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যখন নিষেধ করবেন, তখন আর এগুলো তাদের কাজ করবে না। অন্তর বা মস্তিষ্কের নিকট তাদের খবর পৌঁছে দেবে না।
এর দ্বারাও স্রষ্টার অস্তিত্বের ওপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ এগুলো তাদের স্রষ্টার আনুগত্যের প্রকাশ ঘটায় এবং তার বিরোধিতার ব্যাপারে শাস্তির ভয় করে।
আর যদি এর দ্বারা আল্লাহ অভ্যন্তরীণ শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির কথা উদ্দেশ্য নেন, তখন শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নেওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হবে- আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রবৃত্তির অনুসরণের মাধ্যমে সত্য দেখবে না- সত্য শুনবে না। অর্থাৎ তখন ব্যক্তির শাস্তিটা হবে অভ্যন্তরীণ। তার অন্তর্দৃষ্টি ও অন্তচোখের শক্তি কেড়ে নেওয়া হবে। তখন সে ব্যক্তি কিছু দেখবে, কিন্তু আসলে যেন সে কিছুই দেখেনি। সে শুনবে, কিন্তু আসলে সে যেন কিছুই শোনেনি। সে কী করবে-সে সম্পর্কে সে উদাসীন। তার থেকে কী চাওয়া হচ্ছে, সে সম্পর্কে বেখেয়াল। কোনো পরীক্ষাই তখন তার মাঝে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কোনো উপদেশই তার মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে না।
তার এমনই পরিণতি হবে যে- সে জানে না, সে কোথায় আছে? আবার কোথায় যাবে, জানে না তা-ও। তার কী উদ্দেশ্য, তা সে জানে না। প্রবৃত্তির অনুসরণে তাৎক্ষণিক লাভের দিকে সে অগ্রসর হয়। কিন্তু তার স্থায়ী ক্ষতি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে না। সে তার সঙ্গীর দ্বারা শিক্ষা নেয় না। সে তার বন্ধুর দ্বারা উপদেশ গ্রহণ করে না। সর্বোপরি সে তার দীর্ঘ সফরের জন্য কোনো পাথেয় সংগ্রহ করে না।
যেমন এক কবি বলেন,
الناس في غفلة والموت يوقظهم وما يفيقون حتى ينفذ العمر
মানুষ রয়েছে উদাসীনতার মধ্যে। অথচ মৃত্যু তাকে প্রতিদিন সতর্ক করছে। অথচ সজাগ ও সতর্ক হতে না হতেই জীবন হয়ে পড়ছে সমাপ্ত।
يشيعون أهاليهم بجمعهم وينظرون إلى ما فيه قد قبروا
সে একে একে তার সকল আত্মীয়-পরিজনকে বিদায় দিয়ে আসছে। তাদেরকে কীভাবে কবরে দাফন করা হচ্ছে, দেখছে সেগুলোও।
ويرجعون إلى أحلام غفلتهم كأنهم ما رأوا شيئا ولا نظروا
এরপর তারা আবার তাদের উদাসীন মিথ্যা স্বপ্নের মধ্যে নিমগ্ন হচ্ছে। যেন তারা কিছুই দেখেনি। যেন তারা কিছুই দর্শন করেনি।
এটাই হলো অধিকাংশ মানুষের প্রকৃত অবস্থা। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের অন্তরের অনুধাবনের শক্তি ছিনিয়ে না নেন। আমরা তার নিকটেই আশ্রয় প্রার্থনা করি। কারণ, এটি মানুষের অবস্থাসমূহের সবচেয়ে ভীতিকর একটি অবস্থা। অনুধাবনহীনতার কারণে মানুষের সত্যে ফিরে আসার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়。
📄 আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা
প্রাজ্ঞজনরা প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে, তার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে যে সকল কথা বলেছেন, আমি সেগুলোর ব্যাপারে দৃষ্টি প্রদান করলাম। এগুলো নিয়ে আমি একটি কিতাবও রচনা করেছি। কিতাবটির নাম দিয়েছি - ذم الهوى প্রবৃত্তির নিন্দা।
সেখানে আমি ভালোবাসা নিয়ে অনেক প্রাজ্ঞজনের মন্তব্য উল্লেখ করেছি। যেমন, কেউ বলেছেন, ভালোবাসার সৃষ্টি হয় বেকার মনের চঞ্চলতা থেকে। কিন্তু এ মতটি সকলে মেনে নেননি। এ কারণে কেউ বলেন, ভালোবাসার উদ্ভব ঘটে মানুষের সৌন্দর্য-প্রীতির কারণে।
অন্যরা বলেন, যারা বাস্তবতার চিন্তা ছেড়ে অলীক কল্পনায় হাবুডুবু খায়, তারাই শুধু ভালোবাসায় আপতিত হয়।
তবে এসব আলোচনা-পর্যালোচনার পর আমার অন্তরে এক আশ্চর্য রকমের চিন্তা এসেছে। চিন্তাটা হলো, প্রেমাস্পদের স্থির স্থিরতা ব্যতীত কোনো ভালোবাসাই স্থায়ী হওয়া সম্ভব নয়।
কারণ হলো, হৃদয়ের উদ্বেল আবেগ হয়তো কারও জন্য ভালোবাসার প্রাসাদ বানায়। সামান্য সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন নৈকট্য অর্জন হয়, তখন হয়তো ভিন্ন মানসিকতা, ভিন্ন জীবনবোধ কিংবা দীর্ঘ মেলামেশার কারণে প্রকাশিত হওয়া তার বিভিন্ন দোষ-ত্রুটি দেখে অন্তর এসে হোঁচট খায়- ভালোবাসার প্রাসাদ যায় ভেঙে এবং খুব অল্পতেই সে অন্য কারও দিকে ধাবিত হতে চায়।
সুতরাং স্থির ও অপরিবর্তিত সত্তা ব্যতীত ভালোবাসার এমন কোনো আশ্রয় নেই, যে অবস্থাটির সাথে ত্রুটিহীনভাবে ভালোবাসা স্থির থাকতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সকল মানব-মানবীর অস্তিত্বই ধ্বংসশীল এবং ত্রুটিযুক্ত এবং প্রতিনিয়ত তার মধ্যে পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। তাই কোনো বন্ধনই তাদেরকে একটি অবস্থায় বেঁধে রাখতে সক্ষম নয়। একারণে তাদের স্বভাব বা হৃদয়ের আবেগ যদি কোনো ব্যক্তির ভালোবাসার সাথে জড়িয়ে পড়ে, তারপরও তারা এটিকে একটি স্থির ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় না। কারণ, প্রথমে বেশি আবেগ এবং কম জানাশোনার কারণে দোষত্রুটিগুলো অগোচরে থেকে যায়। নির্ভাবনায় পারস্পরিক ভালোবাসায় নিমগ্ন হয়। কখনো বা হৃদয়কে আকর্ষণকারী কিছু গুণাবলির কারণেও দু-জন ব্যক্তির মাঝে ভালোবাসার সৃষ্টি হয়ে পড়ে। যেমন, সৌন্দর্য, স্বভাবের নৈকট্য, মেজাজের সম্মিলন, সহানুভূতি, হৃদয়ের কোমলতা ইত্যাদি। এগুলোও পরস্পরের মাঝে ভালোবাসার সৃষ্টি করে।
কিন্তু ভালোবাসার প্রকৃতি কখনো তার প্রাথমিক প্রচণ্ড আবেগ ও গতিময়তার সময় বোঝা যায় না। যেমন কর্তনের মুহূর্তে অনুভূত হয় না ব্যথার অস্তিত্ব। মানুষের স্বভাবের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এমন এক অস্থির বাসনা- পূর্ণতার বাসনা। ত্রুটিহীন প্রাপ্তির বাসনা। কিন্তু এটা সে দুনিয়াতে প্রাপ্ত হয় না। কারণ, সে এমন কিছু কামনা করে, যা কোনো মানুষের মধ্যে পূর্ণভাবে পাওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে আবেগমথিত প্রাথমিক উত্তেজনা যখন কেটে যায়, একে একে তার সামনে নির্দিষ্ট মানব বা মানবীর ত্রুটি ও অপূর্ণতাগুলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে- তখন অন্তর দমে যায়। প্রবল উদ্ধত উদ্বেলিত ভালোবাসাও তখন ধীরে ধীরে নত করে আনে তার ক্লান্ত শ্রান্ত ডানা। এরপর যা বাকি থাকে- তা হলো অভ্যাস, প্রয়োজন ও লোকদেখানো আচরণ।
এই হলো মানুষ ও মাখলুকের ভালোবাসার ইতিহাস।
কিন্তু স্রষ্টার সাথে মানুষের অন্তরের ভালোবাসার বিষয়টি ভিন্ন রকম। এখানে তার সাথে আর কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর অবস্থিতি নেই। কোনো পরিবর্তন নেই। দোষ-ত্রুটির কোনো বালাই নেই। তাই স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা কোনো সৃষ্টিজীবের ভালোবাসার মতো নয়। এটা শুধু বলে বোঝানোর জিনিস নয়।
স্রষ্টার প্রতি এই মারেফাতের ভালোবাসা কখনো এতটাই প্রবল ও প্রতাপী হয়ে ওঠে যে, স্রষ্টার ভালোবাসা তাদেরকে অন্য সকল ভালোবাসা ভুলিয়ে দেয়। অন্তরের নৈকট্য ও মারেফাতের শক্তিমত্তার কারণে পুরো মন-প্রাণ একেবারে তার ভালোবাসায় নিমজ্জিত হয়ে যায়। তখন তার ভালোবাসার অবস্থাটি হয় তেমন, যেমনটি হজরত রাবেয়া বসরি রহ. এই কবিতায় বলেছেন। তিনি বলেন,
أحب حبيبا لا أعاب بحبه وأحببتهم من في هواه عيوب
আমি এমন প্রিয়কে ভালোবাসি, যার ভালোবাসায় কোনো নিন্দা-মন্দ নেই। আর তুমি তাদেরকে ভালোবেসেছ, যেখানে শুধু দোষ আর দোষ।
এবার এক দরিদ্র জাহেদের ঘটনা বলি। তিনি একবার এক নারীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। হঠাৎ মেয়েটি তার চোখে ধরে। তিনি বিমুগ্ধ হন। তিনি মেয়েটির বাবার কাছে গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব প্রদান করলেন। মেয়েটির বাবা প্রস্তাবে রাজি হলেন। তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার পর খুবই নতুন ও চমৎকার একটি কাপড় পরিধান করিয়ে দিলেন।
এরপর যখন রাত হলো। রাত নীরব ও গভীর হলো। এটা ছিল মূলত জাহেদ ব্যক্তির নির্জন ইবাদতের সময়। রাতের কাঙ্ক্ষিত সময়। স্রষ্টার সাথে নির্জন সান্নিধ্যের সময়। একারণে হঠাৎ জাহেদ ব্যক্তিটি সকল কিছু ছেড়েছুড়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন- আমার কাপড় কোথায়? আমার কাপড় কোথায়? যা পেয়েছিলাম তা তো আমি হারিয়েছি। এই সুন্দর কাপড় আর নারী আমার জন্য নয়। এখানে আর এক মুহূর্তও নয়।
এটি ছিল সেই জাহেদের রাস্তায় এমন একটি হোঁচট, যা তাকে বুঝিয়েছে যে, রাস্তা থেকে সে বিচ্যুত হয়েছে।
আল্লাহর মারেফাতের ক্ষেত্রে অনেকের ক্ষেত্রে এই অবস্থা সংঘটিত হয়। আর ধ্বংসশীল মানুষের ক্ষেত্রে হয় এর উল্টো।
হজরত ইবনে মাসউদ রা. বলেন, তোমাদের কাউকে যদি কোনো নারী বিমুগ্ধ করে, তবে সে যেন তার মূত্রাশয়ের কথাও চিন্তা করে।
মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের আকর্ষণ ও বিকর্ষণ কেন ঘটে?
কারণ, ক্ষুধার্ত মানুষের আকর্ষিত খাবার গ্রহণের সময় মুখের ভেতর নাড়াচাড়া করা ও গলধঃকরণ করার কষ্ট সম্পর্কে কোনো ভাবনা থাকে না। প্রচণ্ড উত্তেজনার কারণে সহবাসের মুহূর্তে আপতিত অসুবিধা ও অপছন্দনীয় বিষয়ের কথাও মনে থাকে না। এমনকি নিজের থুথুকে গিলে ফেলার সময়ও কারও মনে থাকে না যে এটি খাদ্য নয়। অবশ্য এই মুহূর্তগুলোতে এই অসুবিধাগুলোর অবগুণ্ঠনের মধ্যেই রয়েছে কল্যাণ- নতুবা মানুষ তার স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারত না।
কিন্তু সচেতন অবস্থায়, উত্তেজনাহীন অবস্থায়- এগুলোর মধ্যে আর কোনো চাহিদা থাকে না। তখন জীবনের এই স্বাদ চাখা তার জন্য বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। প্রবৃত্তির এই নীচতার ওপর তার বিতৃষ্ণা জেগে ওঠে। দোষগুলো ভেসে উঠতে থাকে। দোষগুলো বড় হয়ে উঠতে থাকে। কান্তিমান দেহ বিবর্ণ হয়ে আসে। ঠিক এভাবেই প্রেমাস্পদের দোষগুলোর ওপর দৃষ্টিপাতের তারতম্য অনুযায়ী প্রেমিকের অন্তর হতে প্রেম উধাও হতে থাকে। আর ঠিক একইভাবে মস্তিষ্কের স্থিরতা অনুযায়ী প্রেমের পারদও বাড়তে থাকে।
কবি মুতানাব্বি বলেন, لو فكر العاشق في منتهى حسن الذي يسبيه لم يسبه
যে সৌন্দর্য প্রেমিককে ব্যাকুল বিমোহিত করে, সে যদি সেই সৌন্দর্যের শেষ পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করত, তবে আর এই সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করত না।
দুনিয়ার প্রেমিকদের অবস্থা এমনই। কিন্তু আরেফদের অন্তর সর্বদা আল্লাহর মারেফাতের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ক্রমান্বয়ে আরও বেশি নৈকট্য ও ভালোবাসার দিকে ধাবিত হতে থাকে।