📄 জীবিকা অর্জনের পথ ও পদ্ধতি
অধিকাংশ আলেমের কৈশোর ও যৌবনের শুরুর সময় ইলম অন্বেষণে মগ্ন থাকায় জীবিকা অর্জনের কাজ থেকে তাদের বিরত থাকতে হয়। কিন্তু শিক্ষা সমাপ্তির পর তাদেরও জীবিকার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু এখন আর বায়তুল মাল থেকে তাদের কাছে কিছু আসে না; আবার পরিচিত-আহবাব-বন্ধুদের থেকেও যা আসে, তা তাদের জন্য যথেষ্ট হয় না। তখন বাধ্য হয়েই তাদেরকে বিভিন্ন লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার মুখোমুখি হতে হয়।
এটার মধ্যে আমি দুটি হিকমত দেখতে পাই।
১. এই অপদস্থতার মাধ্যমে নিজেদের অহংকারকে দমিয়ে রাখার শিক্ষা নেওয়া।
২. সওয়াবের মাধ্যমে নিজেদের উপকৃত করা।
📄 অন্তরকে স্বস্তিতে রাখা
জাহেদদের মধ্যে একটি দল আছে, যারা আলেমদের বৈধ জিনিসের দিকে অগ্রসর হওয়াকে দোষারোপ করে। তারা তাদের মূর্খতার কারণেই এমনটি বলে। তাদের কাছে যদি ইলমের দৌলত থাকত, তাহলে তারা এভাবে আলেমদের দোষারোপ করত না।
আরেকটি কারণ হতে পারে—মানুষের মেজাজ ও স্বভাব এক রকম নয়। কিছু মানুষ কঠিন ও সংগ্রামী জীবনযাপন করতে পারে। কেউ আবার কঠোর জীবন সইতে পারে না। সুতরাং কারও জন্য নিজের সক্ষমতার মানদণ্ড দিয়ে অন্যকে পরিমাপ করা উচিত নয়।
তবে হ্যাঁ, আমাদের একটি মানদণ্ড রয়েছে—আর তা হলো শরিয়ত। শরিয়তের মধ্যে কিছু বিধানে সহজতা রয়েছে, আবার সহজতার সুযোগ গ্রহণ না করে কঠিনতার ওপর আমল করার বৈধতাও রয়েছে। সুতরাং কেউ যদি কোনো বিধানের ক্ষেত্রে সহজতার ওপর আমল করে, তাহলে তাকে মন্দ বলা বা তিরস্কার করা উচিত নয়। কারণ, কখনো কখনো কঠোরতা বাদ দিয়ে সহজতার ওপর আমল করাই উত্তম—সার্বিক উপকারিতার বিষয় প্রাধান্য দিয়ে।
জাহেদরা যদি জানত, ইলমের দ্বারা আল্লাহর যে মারেফাতের সৃষ্টি হয়, তার কারণে অন্তরসমূহ তার ভয়ে সচেতন থাকে, তাহলে তারাও শরীর সংরক্ষণের দিকে মনোযোগী হতো- যাতে শরীর নামক বাহনটি আরও শক্তিশালী হয়।
ইলম ও আমলের মাধ্যম হলো অন্তর ও চিন্তা-ফিকির। যখন মাধ্যম স্বাচ্ছন্দ্য ও যথার্থ হবে, তখন আমলও শ্রেষ্ঠভাবে আদায় হবে। এটি এমন এক বিষয়- যা ইলম ছাড়া বোঝা যাবে না।
ইলম সম্পর্কে অজ্ঞ ও মূর্খ থাকার কারণে, তারা যেগুলো জানে না, সেগুলোকে অস্বীকার করে বসে। অন্যায় মনে করে। এবং ধারণা করে- ইবাদতের মূল লক্ষ্যই বুঝি শরীরকে ক্লান্ত করা এবং খাদ্য-উপকরণ না থাকা। অথচ তারা বোঝে না, সচেতনভাবে ভয় করার জন্য একটি স্থির অন্তর ও সুস্থতারও প্রয়োজন আছে।
যেমন, জনৈক ব্যক্তি বলেন, روجوا القلوب تعي الذكر -অন্তরকে স্বস্তি দাও, সেই জিকিরকে বাঁচিয়ে রাখবে।
📄 সুফিতত্ত্ব এবং মূর্খতার প্রসার
জগতে অস্তিত্বশীল জিনিসের মধ্যে ইলমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কিছু নেই। আর এটা হবেই বা না কেন, এটাই হলো সকল কিছুর দলিল? ইলম না থাকা মানে অজ্ঞতা ও ভ্রষ্টতা।
শয়তানের গোপন চক্রান্তের মধ্যে একটি হলো, মানুষের অন্তরে সাধারণ ইবাদতকে সুশোভিত করে তোলা-যাতে করে সে যেন তাকে শ্রেষ্ঠ ইবাদত ইলম থেকে বিরত রাখতে পারে।
এমনকি আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে একটি দলকে শয়তান এই ধোঁকার মধ্যে ফেলেছিল। এ কারণে তাদের অনেকেই তাদের কিতাব মাটির নিচে দাফন করে দিয়েছিলেন। কেউ সমুদ্রে নিক্ষেপ করেছিলেন তাদের কিতাব।
যারা এমনটি করেছিলেন, আমি তাদের ব্যাপারে সুধারণা রেখে বলি, তাদের সে কিতাবগুলোর মধ্যে হয়তো কোনো অশুদ্ধ মত বা কথা ছিল, সে কারণে তারা এগুলোর প্রচার-প্রসার পছন্দ করেননি। নতুবা তার মধ্যে যদি বিশুদ্ধ ইলম থাকে, যার পরিণাম ভালো, তবে তো তা পুড়িয়ে ফেলা কিংবা সমুদ্রে নিক্ষেপ করার অর্থ সম্পদের বিনষ্ট করা—যা জায়েয নয়।
ইবলিস এমন চক্রান্তে কিছু সুফিকেও ফেলেছিল। এ কারণে তারা তাদের ছাত্রদের লেখার জন্য দোয়াত-কলম রাখতে নিষেধ করতেন। এ ব্যাপারে জাফর খুলদি একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, আমি এক মজলিসে বললাম, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য যদি আমার সুফিত্ব চলে যাওয়ার কথা বলা হয়, তবে আমি আমার সুফিত্বের অক্ষুণ্ণতার ক্ষেত্রে অঢেল প্রমাণ তোমাদের নিকট উপস্থিত করতে পারি, যা আমি আবুল আব্বাস আদ-দাওরির মজলিসে বসে লিখেছি।
তখন এক সুফি দাঁড়িয়ে বলল, 'এসব কাগুজে লেখার কথা ছাড়ো, তুমি আমাদের কাছে রুহানি ইলম নিয়ে এসো।
মজলিসের মধ্যে এ সময় আমি এক সুফির হাতেও একটি দোয়াত দেখতে পেলাম। হঠাৎ আরেক সুফি তার দিকে কটাক্ষ দৃষ্টি হেনে বলল, 'তোমার সতর ঢাকো' [দোয়াত-কলম]। এরপর তারা আমার নিকট শিবলীর কবিতা আবৃত্তি করে বলল,
إذا طالبوني بعلم الورق بزرت عليهم بعلم الخرق
তারা যখন আমার নিকট কাগজের ইলম অন্বেষণ করল, আমি তখন তাদের নিকট রুহানি ইলম নিয়ে আবির্ভূত হলাম।
এটা হলো ইবলিসের এক গোপন চক্রান্ত। তাদের ওপর ইবলিস তার ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করেছে। ইবলিস এটা করেছে দুটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। যেমন-
১. ইবলিস চেয়েছে তারা যেন এভাবেই অজ্ঞতার অন্ধকারের মধ্যেই হেঁটে চলে।
২. প্রতিদিন পৃথিবীতে যত ইলম বাড়ছে, তারা যেন সেগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা থেকে বিরত থাকে।
ইবলিস এভাবেই ইলমকে মানুষ থেকে গোপন রাখতে চায়। কারণ, ইলম মানুষের ঈমান ও মারেফাতকে শক্তিশালী করে। তার আমল-আখলাকের ভুলগুলো ধরিয়ে দেবে। বিশেষ করে, ইলম জানা থাকলে তখন সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবিদের পথ-পদ্ধতিকে পর্যবেক্ষণ করে ‘সিরাতে মুস্তাকিমে’ উঠে পড়বে। ইবলিসের হলো এই ভয়।
সুতরাং ইবলিস-শয়তান তার গোপন চক্রান্তের মাধ্যমে চেয়েছে, মুমিনের সামনে ইলমের এই সকল রাস্তা বন্ধ করে দিতে। মানুষের সামনে প্রকাশ করেছে যে, আসল উদ্দেশ্য হলো আমল; নিছক ইলম নয়। আর এই ধোঁকায় আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে এটাও লুকিয়ে রেখেছে—ইলমও যে এক প্রকার আমল এবং ইলম ছাড়া আমল হয় না।
সুতরাং ইবলিসের এই গোপন চক্রান্ত থেকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, ইলমই হলো মূল স্তম্ভ। সর্বোচ্চ আলো। কখনো কখনো ইলমের এই পাতাগুলো উল্টানো নফল রোজা ও নামাজ থেকেও উত্তম। হজ ও জিহাদ থেকেও শ্রেষ্ঠ কর্ম।
ইলম থেকে বিমুখ থাকার কারণে বহু মানুষ নিজের ইবাদতের মধ্যে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলেছে। অসংখ্য মানুষ নফল আদায় করতে গিয়ে নিজের অকাট্য ফরজকে নষ্ট করে ফেলছে। স্পষ্ট ওয়াজিবকে তরক করে নিজের ধারণাপ্রসূত উত্তম কাজে [অথচ শরিয়তে সেটা উত্তম নয়] নিমগ্ন রয়েছে। আহা! তার কাছে যদি ইলমের একটি আলোকবর্তিকা থাকত, তাহলে সে নিশ্চয় সঠিক পথটি পেত।
এতক্ষণ যা উল্লেখ করলাম, এগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করো। ইনশাআল্লাহ সঠিক পথটি পেয়ে যাবে।
📄 নফসের প্রতি সহজতা করা
একবার আমার পাশ দিয়ে এমন দুজন ব্যক্তি অতিক্রম করল—যারা একটি মোটা ভারি ডাল বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল। আর তারা গানের সুরে বিভিন্ন কবিতা ও রসাত্মক কথা বলছিল। প্রথমজন যে কথাটি বলছিল, দ্বিতীয়জন তার সেই কথাটিকে পূর্ণতা দিচ্ছিল কিংবা একই কথা সুরের মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছিল। দ্বিতীয় জনও তা-ই করছিল। এভাবে তারা কোরাস গাইতে গাইতে ভারি ডালটি নিয়ে চলছিল।
আমি বুঝলাম, তারা যদি এভাবে উৎফুল্লতার সাথে কোরাস গাইতে গাইতে না চলত, তবে এই বোঝা বহন করা তাদের জন্য বেশি কষ্টকর হয়ে উঠত। কিন্তু তারা যখন আনন্দের সাথে এটা করছে, তখন তাদের অনুভবে বোঝা বহন করাটা হালকা হয়ে গেছে।
আমি তাদের এই কষ্ট লাঘবের কারণটি নিয়ে চিন্তা করলাম। লক্ষ করলাম— প্রথমজন যা বলছে, অন্যজনের চিন্তাটি তার সাথে সংযুক্ত থাকছে এবং তাকে উৎফুল্ল রাখছে। দ্বিতীয়জনও ঠিক একই উত্তর বা বিষয় তার দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এভাবে প্রীতি ও নৈকট্যের সাথে তাদের রাস্তাও শেষ হলো—আবার বহনের কষ্টও তারা ভুলে থাকল।
এই ঘটনা থেকে আমি একটি আশ্চর্যজনক শিক্ষা গ্রহণ করলাম। আমি দেখি, মানুষ কখনো কখনো অনেক কঠিন ও ভারি কর্ম সম্পাদন করে। আর এ কঠিন কর্মগুলোর মধ্যে আরও কঠিনতর হলো, নফসকে তোষামোদ করে রাখা এবং সে যা পছন্দ করে কিংবা অপছন্দ করে, সে বিষয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখা। কিন্তু এখন আমি অনুধাবন করছি, ধৈর্যধারণের এই কষ্টকর পথ পাড়ি দিতে হবে নফসকে সান্ত্বনা ও আশ্বাস দিয়ে এবং কোমল আচরণ করে।
যেমন কবি বলেছেন, فإن تشكت فعللها المجرة من ضوء الصباح وعدها بالرواح ضحى
সে যদি আপত্তি করতে চায়, তবে তাকে প্রভাতের আলোর আশা দেখাও। আর তাকে ওয়াদা দাও সকালের সূর্যকিরণের উজ্জ্বলতার।
এ ধরনের একটি চমৎকার ঘটনা বর্ণনা করা হয় বিখ্যাত সুফি বিশর হাফি রহ.-এর। একবার তিনি এবং তার এক সঙ্গী সফর করছিলেন। পথিমধ্যে তার সঙ্গী পিপাসার্ত হয়ে গেল। লোকটি সামনে একটি কুয়া দেখে বিশর হাফিকে বলল, আমরা এই কুয়া থেকে পানি পান করে নিতে পারি না? বিশর হাফি বললেন, এটা না, একটু ধৈর্য ধরো। সামনে আরেকটি কুয়া থেকে পান করা যাবে।
চলতে চলতে তারা যখন আরেকটি কুয়ার নিকট এসে গেলেন এবং লোকটি পানি পান করতে চাইল। বিশর হাফি তখন তাকে বললেন, এটা নয়, সামনের আরেকটি থেকে পান করব।
এমনিভাবে একটির পর একটি কুয়া থেকে পানি পানের আশা দিয়ে দিয়ে আরও সামনে চলতে লাগলেন তারা। অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছার পর বিশর হাফি লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, বুঝলে, এভাবেই আশায় আশায় একদিন দুনিয়ার সফর শেষ হয়ে যাবে- দুনিয়ার আশা তবুও পূরণ হবে না।'
এর থেকে আমরা একটি মূলনীতি বুঝতে পারি- তুমি তোমার নফসকে আশা দিতে থাকো। তার সাথে কোমল আচরণ করো। তাকে সুন্দর প্রতিশ্রুতি প্রদান করো। তুমি তার ওপর যে কষ্টগুলো বহন করাবে, সেগুলো যেন সে সইতে পারে। কিংবা আশায় আশায় তার সয়ে নেওয়াটা যেন সহজ হয়। যেমন আমাদের এক সালাফে সালেহ তার নফসকে বলতেন,
والله ما أريد بمنعك من هذا الذي تحبين إلا الإشفاق عليك.
আল্লাহর কসম, তুমি যা পছন্দ করছ, তা থেকে তোমাকে বিরত রাখছি তোমার প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতার কারণেই। আমি তোমার শত্রু নই; বন্ধু।
হজরত মুআবিয়া রা. বলতেন,
ما زلت أسوق نفسي إلى الله تعالى وهي تبكي حتى سقتها وهي تضحك.
আমি যখনই নফসকে আল্লাহ তাআলার দিকে টেনে নিয়ে যেতে চেয়েছি, তখনই সে কাঁদতে শুরু করেছে। কিন্তু যখন তোষামোদ করে টেনে নিয়েছি, তখন সে হাসি-আনন্দের সাথে পথ চলেছে।
জেনে রেখো, এভাবে নফসকে তোষামদ করা এবং তার কষ্টের প্রতি কোমল আচরণ করা খুবই জরুরি একটি বিষয়। তুমি যদি এটি করতে পারো- আশা করা যায়, আশায় আশায় আমলের মধ্যে জীবনের সফর সে সমাপ্ত করতে পারবে। কষ্ট ও ক্লান্তিকে গায়েই মাখবে না।
মূলত এখানে কিছু ইশারা দেওয়া হলো। এর ব্যাখ্যা অনেক দীর্ঘ। আপাতত এটুকুর ওপরই আমল করে দেখো না!