📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ধৈর্যধারণ

📄 ধৈর্যধারণ


আমার মতে, হঠাৎ আপতিত বিপদের ওপর ধৈর্যধারণ হলো সবচেয়ে কষ্টকর কর্ম। তবে এর মাধ্যমে অর্জিত শ্রেষ্ঠ সন্তুষ্টিও আর কিছুতে নেই। ধৈর্যধারণ হলো ফরজ আর অর্জিত সন্তুষ্টি তার পুরস্কার।

আপতিত বিপদে ধৈর্যধারণ করা কঠিন কেন?

কারণ, ভাগ্যের লিখনে হঠাৎ করে যে বিপদটি ঘটে, নফস সাধারণত তার জন্য প্রস্তুত থাকে না। নফস তার অসুস্থতা কিংবা শারীরিক কোনো কষ্ট সহ্য করতে চায় না। সে চায় সীমাহীন সুস্থতা আর বিলাস-ব্যসন। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত আকস্মিক বিপদে তার মস্তিষ্ক যেন হতভম্ব হয়ে পড়ে, অস্থির হয়ে পড়ে। ভাগ্যের এই হিকমতকে সে মেনে নিতে চায় না।

যেমন, তুমি অনেক দুনিয়াদারকে দেখো, তার জীবনের দু-কূল ছেপে সম্পদের নহর বইছে। এত এত সম্পদ—সে যেন নিজেই বুঝতে পারে না এত সম্পদ দিয়ে সে কী করবে! স্বর্ণ ও রূপার এই অর্থগুলো দিয়ে সে বিভিন্ন পাত্র তৈরি করে ব্যবহার করে। অথচ জানা কথা, কাঞ্চন মণি আকিক ও মুক্তার জিনিসপত্র দেখতে এগুলোর চেয়েও সুন্দর। কিন্তু সে দ্বীনের বিধি-নিষেধের কোনো তোয়াক্কা করে না। স্বর্ণ-রূপার জিনিস ব্যবহার করে। রেশমি কাপড় পরিধান করে। মানুষের ওপর জুলুম করে। বিলাস-ব্যসনে ডুবে থাকে। সম্পদের কোনো অভাব নেই। দুনিয়া যেন তার ওপর উপুড় করে ঢেলে দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে দেখা যায়, আলেম-ওলামা, ধার্মিক ব্যক্তি, ইলমের শিক্ষার্থী—আল্লাহর এসকল প্রিয় ব্যক্তিই দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত। বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ ও বিপদাপদে আপতিত। এমনকি ধনবান জালেমদের অধীনে কষ্ট সহ্য করে চলছে তাদের অনেকের জীবন।

ঠিক এই ক্ষেত্রগুলোতে এসে শয়তান ধোঁকা দেওয়ার সুযোগটা পেয়ে যায়—ভাগ্যের এই হিকমতের মধ্যে সে কদর্যতা আনয়নের চেষ্টা করে। মনের মধ্যে বিভিন্ন রকম অনুচিত প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করে।

সুতরাং একজন মুমিনের উচিত হবে, দ্বীনের পথে চলতে গিয়ে দুনিয়াতে যে কষ্টগুলোর মুখোমুখি হতে হয় এবং এই নিয়ে শয়তানের সাথে লড়াই করতে গিয়ে মানসিক যে কষ্টের শিকার হতে হয়- সবগুলোর ওপর ধৈর্যধারণ করা। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিমদের ওপর কাফেরদের যেই অত্যাচার ও নিপীড়ন, ধার্মিকদের ওপর অধার্মিক ফাসেকদের যেই অনাচার ও দুর্ব্যবহার- সেগুলোর ওপরও ধৈর্যধারণ করা। তাদের অত্যাচারের সবচেয়ে অমানবিক ও নিকৃষ্টতম উদাহরণ হলো, তারা নির্বিচারে মানুষকে কষ্ট দেয়, শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করে। তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে। নারীদের ওপর অত্যাচার করে। সম্পদ-সম্পত্তি বিনষ্ট করে ইত্যাদি।

ঠিক এই জায়গাটাতে এসে ঈমান টলমল করে ওঠে। বিভিন্ন কুমন্ত্রণা এসে বিশ্বাসের ভিতকে টলিয়ে দিতে চায়। আর ঠিক এখানেই তো প্রকৃত ঈমানের পরীক্ষা।

কেন? এই সময়গুলোতেও আমাদের ধৈর্যধারণ করতে হবে কেন? ধৈর্যের সাথে অবস্থার মোকাবিলা করতে হবে কেন? কারণ, আমাদের এভাবেই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। কোরআন ও হাদিসে এভাবেই নির্দেশনা এসেছে।

তবে কোরআনের নির্দেশনা এখানে দুভাবে এসেছে। যেমন-
১. কাফের এবং অবাধ্যদের সম্পদ, শক্তি ও সুযোগ প্রদানের কারণ বর্ণনা করা হয়েছে।

যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন, (وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ خَيْرٌ لِأَنْفُسِهِمْ إِنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ لِيَزْدَادُوا إِثْمًا وَلَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ)

যারা কুফর অবলম্বন করেছে, তারা যেন কিছুতেই মনে না করে, আমি তাদেরকে যে অবকাশ দিয়েছি, তাদের পক্ষে তা ভালো। প্রকৃতপক্ষে আমি তাদেরকে অবকাশ দিই কেবল এ কারণে যে, যাতে তারা পাপাচারে আরও অগ্রগামী হয় এবং পরিশেষে তাদের জন্য আছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি। [সুরা আল ইমরান: ১৭৮]

অন্য আয়াতে এসেছে, (وَلَوْلَا أَنْ يَكُونَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً لَجَعَلْنَا لِمَنْ يَكْفُرُ بِالرَّحْمَنِ لِبُيُوتِهِمْ سُقْفًا مِنْ فِضَّةٍ وَمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُونَ ۝ وَلِبُيُوتِهِمْ أَبْوَابًا وَسُرُرًا عَلَيْهَا يَتَّكِثُونَ وَزُخْرُفًا وَإِنْ كُلُّ ذَلِكَ لَمَّا مَتَاعُ الْحَيَاوةِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ عِنْدَ رَبِّكَ لِلْمُتَّقِينَ)

সমস্ত মানুষ একই মতাবলম্বী (অর্থাৎ কাফের) হয়ে যাবে- এই আশঙ্কা না থাকলে, যারা দয়াময় আল্লাহকে অস্বীকার করে, আমি তাদের ঘরের ছাদও করে দিতাম রুপার এবং তারা যে সিঁড়ি দিয়ে চড়ে তাও।

আর তাদের ঘরের দরজাগুলি এবং সেই পালঙ্কগুলিও, যাতে তারা হেলান দিয়ে বসে।

বরং সোনার তৈরি করে দিতাম। প্রকৃতপক্ষে এসব পার্থিব জীবনের সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়। আর তোমার প্রতিপালকের নিকট মুত্তাকিদের জন্য আছে আখেরাত। [সুরা যুখরুফ : ৩৩-৩৫]

আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ نُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا﴾

যখন কোনো জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন তাদের বিত্তবান লোকদেরকে (ঈমান ও আনুগত্যের) হুকুম দিই, ফলে তারা তাতে নাফরমানি করে, যার পরিণামে তাদের ব্যাপারে কথা চূড়ান্ত হয়ে যায় এবং আমি তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলি। [সুরা ইসরা : ১৬]

কোরআনে এ ধরনের আরও অনেক বর্ণনা এসেছে।

২. দ্বিতীয় কারণ, বিপদের মাধ্যমে মুমিনদের পরীক্ষা করা। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ﴾ নাকি তোমরা মনে করো, তোমরা এমনিতেই জান্নাতে পৌঁছে যাবে, অথচ আল্লাহ এখনো পর্যন্ত তোমাদের মধ্য হতে সেই সকল লোককে যাচাই করে দেখেননি, যারা জিহাদ করবে এবং তাদেরকেও যাচাই করে দেখেননি, যারা অবিচল থাকবে। [সুরা আল ইমরান: ১৪২]

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُمْ مَثَلُ الَّذِينَ خَلَوْ مِنْ قَبْلِكُمْ مَسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا ) (হে মুসলিমগণ,) তোমরা কি মনে করেছ, তোমরা জান্নাতে (এমনিতেই) প্রবেশ করবে, অথচ এখনো পর্যন্ত তোমাদের ওপর সেই রকম অবস্থা আসেনি, যেমনটা এসেছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর? তাদেরকে স্পর্শ করেছিল অর্থ-সংকট ও দুঃখ-কষ্ট এবং তাদেরকে করা হয়েছিল প্রকম্পিত...। [সুরা বাকারা: ২১৪]

আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে আরও বলেন, أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تُتْرَكُوا وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ) তোমরা কি মনে করেছ তোমাদেরকে এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে, অথচ আল্লাহ এখনো দেখে নেননি, তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ [সুরা তাওবা: ১৬] করে।

কোরআনে এ ব্যাপারে আরও অনেক আয়াত এসেছে। ধৈর্যধারণের এই ব্যাপারটি হাদিসেও এসেছে। অবস্থার বর্ণনা এসেছে। কথার বর্ণনাও এসেছে। যেমন, عُمَرُ بْنُ الْخَطَابِ قَالَ .... فَدَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ مُضْطَجِعُ عَلَى حَصِيرٍ فَجَلَسْتُ فَأَدْنَى عَلَيْهِ إِزَارَهُ وَلَيْسَ عَلَيْهِ غَيْرُهُ وَإِذَا الْحَصِيرُ قَدْ أَثَرَ فِي جَنْبِهِ فَنَظَرْتُ بِبَصَرِي فِي خِزَانَةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَإِذَا أَنَا بِقَبْضَةٍ مِنْ شَعِيرٍ نَحْوِ الصَّاعِ وَمِثْلِهَا فَرَظًا فِي نَاحِيَةِ الْغُرْفَةِ وَإِذَا أَفِيقُ مُعَلَّقٌ قَالَ فَابْتَدَرَتْ عَيْنَايَ قَالَ مَا يُبْكِيكَ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ قُلْتُ يَا نَبِيَّ اللَّهِ وَمَا لِي لَا أَبْكِي وَهَذَا الْحَصِيرُ قَدْ أَثَرَ فِي جَنْبِكَ وَهَذِهِ خِزَانَتُكَ لَا أَرَى فِيهَا إِلَّا مَا أَرَى وَذَاكَ قَيْصَرُ وَكِسْرَى فِي الثِّمَارِ وَالْأَنْهَارِ وَأَنْتَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَصَفْوَتُهُ وَهَذِهِ خِزَانَتُكَ فَقَالَ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ أَلَا تَرْضَى أَنْ تَكُونَ لَنَا الْآخِرَةُ وَلَهُمْ الدُّنْيَا قُلْتُ بَلَى.

হজরত ওমর রা. বলেন, এরপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কামরায় প্রবেশ করলাম। তখন তিনি একটি চাটাইয়ের ওপর কাত হয়ে শুয়ে ছিলেন। আমি তাঁর নিকটে গিয়ে বসলাম। তিনি তার কাপড় গুটিয়ে নিলেন। এটিই ছিল তখন তার একমাত্র পরিধেয়। তাছাড়া চাটাইয়ের রুক্ষতা তার শরীরে দাগ বসিয়ে দিয়েছিল। এবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গচ্ছিত জিনিস-পত্রের দিকে দৃষ্টি দিলাম। দেখলাম, কামরার একপ্রান্তে স্বল্প পরিমাণ কিছু যব। আর অনুরূপ ছাতু। এটা দেখে আচমকাই আমার চোখে পানি চলে এলো।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ইবনে খাত্তাব, কাঁদছ কেন?

আমি বললাম, আমি কাঁদব না কেন? এই যে শক্ত চাটাই- যা আপনার শরীরে দাগ ফেলে দেয়! আর এই যে আপনার সামান্য কিছু সঞ্চিত খাদ্য! অথচ কায়সার-কিসরা কত সম্পদ-সম্পত্তি, খাদ্য-খাবার ও আরাম-আয়েশে চলে! আর আপনি হলেন আল্লাহর রাসুল ও তাঁর বন্ধু- অথচ এই হলো আপনার খাদ্য-সামান!

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ইবনে খাত্তাব, তুমি কি এই বণ্টনে সন্তুষ্ট নও যে, তাদের জন্য শুধু দুনিয়া আমাদের জন্য আখেরাত?

আমি বললাম, জি, অবশ্যই আমি সন্তুষ্ট। ৬৫

অন্য হাদিসে এসেছে-
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَوْ كَانَتْ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةً مَاءٍ

হজরত সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলার নিকট এই দুনিয়া যদি একটি মাছির ডানার পরিমাণও মূল্য রাখত, তবে তিনি দুনিয়া থেকে কোনো কাফেরকে এক ঢোক পানিও পান করাতেন না। [সুনানে তিরমিজি: ২২৪২]

এখন আমরা যৌক্তিকভাবে ধৈর্যধারণের বিষয়টা ভেবে দেখতে পারি। এটাকে আমরা কয়েকভাবে বিবেচনা করতে পারি। যেমন-

১. যেহেতু অকাট্য প্রমাণাদির মাধ্যমে ভাগ্যের হিকমত [তাকদির] আমাদের কাছে সাব্যস্ত হয়ে আছে, সুতরাং এই মূলনীতিটা বর্জন করা সম্ভব নয়। তাকদিরে যেভাবে আছে, ঘটনাবলি সেভাবেই সংঘটিত হবে। কিন্তু অনেক সময় মূর্খরা এটাকে ভুল বুঝে অস্থিরতা প্রকাশ করতে থাকে।

২. বাহ্যিকভাবে অবাধ্যদের যে ছাড় দেওয়া হচ্ছে, সেটার মাধ্যমে আসলে তাদেরকে পাকড়াও করা হচ্ছে। আর বাহ্যিকভাবে আনুগত্যকারীদের যে কষ্টের বোঝা চেপে ধরছে, প্রকৃত অর্থে তাদেরকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। কারণ, অবাধ্যদের এই ছাড়ের পরেই রয়েছে দীর্ঘ শান্তি ও কষ্ট। আর আনুগত্যকারীদের এই কষ্টের পরেই রয়েছে সীমাহীন প্রতিদান, পুরস্কার ও শান্তি। দুই দলেরই সময় অতি দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। জীবনের সফর সমাপ্ত হচ্ছে। এরপরই তাদের সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়বে আখেরাতের পর্দা। অচিরেই সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে দুনিয়ার সুখ কিংবা দুঃখের। তাহলে এত অভিযোগের কী আছে!

৩. এটাও প্রমাণিত যে, মুমিন বান্দা হলো আল্লাহর তাআলার দাস- তার শ্রমিকের মতো। আর বান্দার শ্রমের সময় হলো দুনিয়ার জীবন নামক এই দিনগুলো। সুতরাং যে শ্রমিক মাটির মধ্যে কাজ করবে, তার জন্য শুভ্র পরিষ্কার কাপড় পরিধান করা উচিত নয়; বরং সে এই কাজের সময়গুলোতে জান-প্রাণ পরিশ্রম করবে। কষ্ট স্বীকার করবে। ধৈর্যধারণ করবে। এরপর যখন সে কাজ থেকে বিরত হবে, তখন সে পরিচ্ছন্ন হয়ে তার সবচেয়ে ভালো কাপড়টি পরিধান করবে। পারিশ্রমিক নিয়ে বিলাস-ব্যসন করবে।

কিন্তু যে ব্যক্তি কাজের সময় বিলাসিতা করে, কাজ না করে আরাম-আয়েশ করে, সে তো কাজ শেষে প্রতিদান প্রাপ্তির সময় আফসোস করবে। তখন তাকে কোনো পুরস্কার প্রদান করা হবে না। বরং কাজের সময় তাকে যে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল, সেক্ষেত্রে অবহেলা করার কারণে তাকে শাস্তি প্রদান করা হবে।

নিশ্চয় এই দৃষ্টিভঙ্গিটি আমাদের ধৈর্যের সংকল্পকে আরও শক্তিশালী করবে।

৪. এটা কি আমরা ভেবে দেখি না, কোরআনে বলা হয়েছে, তোমাদের থেকে কিছু ব্যক্তিকে শহিদ হিসেবে গ্রহণ করা হবে? তাহলে দুনিয়ায় সব সময় এমন কিছুলোক থাকবেই- যারা মুমিনদের দিকে অত্যাচার ও হত্যার হাত বাড়িয়ে দেবে।

আমরা কেন বুঝতে চাই না, উমর রা.-এর হত্যার জন্য আবু লুলু'র দরকার। হজরত আলি রা.-এর হত্যার জন্য ইবনে মুলজিম। আর হজরত ইয়াহইয়া ইবনে জাকারিয়া আলাইহিমাস সালামকে হত্যার জন্য বড় কাফেরদের দরকার।

এভাবে যখন বুঝ, বোধ ও চিন্তার আলোকবর্তিকা আমাদের রাতের পর্দা সরিয়ে দেবে, তখন বুঝে আসবে এগুলোর পেছনে রয়েছে আসল স্রষ্টার হিকমত। এখানে সৃষ্টির কোনো হাত নেই।

সুতরাং আমরা তার পরীক্ষাগুলোর ওপর সব সময় ধৈর্যধারণ করব। তিনি যা চান- সেটাকেই প্রাধান্য দিয়ে। তাহলেই শুধু তার পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হব- ইনশাআল্লাহ।

এবার একটি ঘটনার কথা বলি। একবার এক বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট দুআর কথা বলা হলো। উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহ যাতে সন্তুষ্ট, আমার সন্তুষ্টি লেগে আছে তার সাথেই।

টিকাঃ
৬৫. সহিহ মুসলিম: ৭/২৭০৪, পৃষ্ঠা: ৪৪১- মা. শামেলা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 সন্তুষ্টি

📄 সন্তুষ্টি


ধৈর্য সম্পর্কে পূর্বের অধ্যায়টি যখন শেষ করলাম, তখন আমার অভ্যন্তর থেকে একটি আওয়াজ এলো। বলা হলো, কদর বা ভাগ্যলিপির ওপর ধৈর্যধারণের কিছু ব্যাখ্যা করার সুযোগ দাও। সেখানে শুধু কিছু উদাহরণ দিয়েই আলোচনার সমাপ্ত করেছ।

আর সন্তুষ্টির অবস্থা নিয়েও কিছু বর্ণনা দাও। কারণ, সন্তুষ্টি যেন এমন এক প্রভাতী মৃদুমন্দ বাতাস, যার কথা শুনলেও আত্মার আরাম হয়।

আমি বললাম, তবে হে আওয়াজকারী, উত্তর শুনে নাও। এর সঠিকতাও বুঝে নাও।

পরিচয় ও নৈকট্যের প্রতিফলে আহৃত এক বোধের নাম হলো সন্তুষ্টি। তুমি যদি আল্লাহকে যথার্থভাবে চিনতে পারো, তবে তার সকল ফয়সালায়ই সন্তুষ্ট হবে। ভাগ্যের ফয়সালায় অনেক সময় কিছু তিক্ততা ও অপ্রিয়তা থাকে, কিন্তু আনুগত্যকারী বান্দা নিজের কষ্ট সত্ত্বেও এগুলোতে সন্তুষ্ট থাকে। আর যারা আরেফ- আল্লাহর পরিচয়ে পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী, তাদের কাছে পরিচিতি ও নৈকট্যের মিষ্টতার কারণে আল্লাহ তাআলার কোনো ফয়সালাই আর তিক্ত থাকে না। খোদার সকল ফয়সালাতেই তাদের সন্তুষ্টি। তাদের আনন্দ ও সম্মতি।

এভাবেই পরিচিতির মাধ্যমে তারা মুহাব্বত ও ভালোবাসার দিকে ধাবিত হয়। অবশেষে জীবনের সকল তিক্ততাই মিষ্টিতে পরিণত হয়। যেমন এক কবি বলেন,
عذابه فيك عذب وبعده فيك قرب وأنت عندي كروحي بل أنت منها أحب حسبي من الحب أني لما تحب أحب

তার শাস্তিও তোমার কাছে মিষ্ট, তার দূরত্বও তোমার কাছে আনে নৈকট্য।

তুমি আমার কাছে আমার আত্মার মতোই, বরং তোমাকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসি।

আমার ভালোবাসার জন্য এটাই যথেষ্ট— তুমি যা ভালোবাসো, আমিও তা-ই ভালোবাসি।

কিন্তু আমার অভ্যন্তর চিৎকার করে বলে উঠল, তুমি আমাকে বলো, আমি আসলে কিসের ওপর সন্তুষ্ট হব? তুমি আমার জন্য নির্ধারণ করে দাও— আমি কি তার পক্ষ থেকে অসুস্থতা ও দরিদ্রতার প্রতি সন্তুষ্ট হব? আমি কি তার ইবাদতে অলসতার প্রতি সন্তুষ্ট হব? আমি তার প্রতি ভালোবাসা পোষণকারী ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকার প্রতি সন্তুষ্ট হব? তুমি আসলে আমার জন্য নির্ধারণ করে দাও, কোনগুলোর প্রতি আমার সন্তুষ্টি থাকবে আর কোনগুলোর প্রতি থাকবে না।

আমি বললাম, তুমি যে প্রশ্ন করেছ, তা খুবই সুন্দর প্রশ্ন। তাহলে এবার শোনো—

স্রষ্টার পক্ষ থেকে যা আসে, তার সকল কিছুর প্রতিই সন্তুষ্ট থাকবে। কিন্তু অলসতা, উদাসীনতা ও ইবাদতে পশ্চাৎপদতা— এগুলো সবই তোমার পক্ষ থেকে। সুতরাং তোমার এই অনুচিত কাজের প্রতি তুমি কিছুতেই সন্তুষ্ট থাকবে না। তোমার ওপর তাঁর যে হকগুলো রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে সর্বদা সচেতন থাকবে। যে কাজগুলো তাঁর নৈকট্য অর্জনে সহজ হয়, সেগুলোর ওপর অটল ও অনড় থাকবে। কিন্তু চেষ্টা-পরিশ্রমের বিষয়ে কোনো ধরনের অবহেলার প্রতি কখনো সন্তুষ্ট থাকবে না।

যা শুধু স্রষ্টার পক্ষ থেকেই হয়, যেখানে তোমার কোনো অংশ নেই, তেমন সকল বিষয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। যেমন একটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়— হজরত রাবেয়া বসরি রহ.-এর নিকট একজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হলো, লোকটি ময়লার স্থান থেকে খাবার খুঁটে খায়। তাঁর সম্পর্কে বলা হলো, ‘সে কি আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করতে পারে না যে, আল্লাহ যেন তার জন্য সুন্দরভাবে খাদ্যের সংস্থান করে দেন।’

এ কথা শুনে হজরত রাবেয়া বসরি রহ. বললেন, সন্তুষ্ট ব্যক্তি কখনো বিকল্প খোঁজে না। যে ব্যক্তি মারেফাতের স্বাদ পেয়ে গেছে, সে ব্যক্তি তার মাঝে ভালোবাসার স্বাদ পেয়ে গেছে। তাই সে তাঁর যেকোনো কাজের প্রতিই সন্তুষ্টি ও সম্মতি প্রকাশ করে।

সুতরাং প্রথমে ইলমের দলিলের মাধ্যমে মারেফাত অর্জনে চেষ্টা-পরিশ্রম করতে হবে। এরপর মারেফাতের চাহিদা অনুযায়ী ইবাদতের মধ্যে মোজাহাদা করতে হবে। আশা করা যায়, এটিই তার মধ্যে মুহাব্বত ও ভালোবাসার সৃষ্টি করবে। আর বান্দার জন্য তখন তা কতই না সুন্দর ও মজাদার হবে।

হাদিসে কুদসিতে এসেছে— عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللَّهَ قَالَ ... وَمَا تَقَرَّبَ إِلَيَّ عَبْدِي بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ ...

হজরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, বান্দা যে কাজের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করে, তার মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় হলো আমি তার ওপর যে ফরজ অর্পণ করেছি, তা আদায় করা। এমনিভাবে সে নফলগুলোর মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে- একপর্যায়ে আমি তাকে ভালোবাসি। আর আমি যখন তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার শ্রবণেন্দ্রিয় হয়ে যাই, যা দ্বারা সে শোনে। আমি তার দৃষ্টি হয়ে যাই, যা দ্বারা সে দেখে। [সহিহ বোখারি: ৬০২১]

বান্দার জন্য এর চেয়ে বড় খুশি ও আনন্দের আর কী হতে পারে!

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 জীবিকা অর্জনের পথ ও পদ্ধতি

📄 জীবিকা অর্জনের পথ ও পদ্ধতি


অধিকাংশ আলেমের কৈশোর ও যৌবনের শুরুর সময় ইলম অন্বেষণে মগ্ন থাকায় জীবিকা অর্জনের কাজ থেকে তাদের বিরত থাকতে হয়। কিন্তু শিক্ষা সমাপ্তির পর তাদেরও জীবিকার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু এখন আর বায়তুল মাল থেকে তাদের কাছে কিছু আসে না; আবার পরিচিত-আহবাব-বন্ধুদের থেকেও যা আসে, তা তাদের জন্য যথেষ্ট হয় না। তখন বাধ্য হয়েই তাদেরকে বিভিন্ন লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার মুখোমুখি হতে হয়।

এটার মধ্যে আমি দুটি হিকমত দেখতে পাই।

১. এই অপদস্থতার মাধ্যমে নিজেদের অহংকারকে দমিয়ে রাখার শিক্ষা নেওয়া।
২. সওয়াবের মাধ্যমে নিজেদের উপকৃত করা।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 অন্তরকে স্বস্তিতে রাখা

📄 অন্তরকে স্বস্তিতে রাখা


জাহেদদের মধ্যে একটি দল আছে, যারা আলেমদের বৈধ জিনিসের দিকে অগ্রসর হওয়াকে দোষারোপ করে। তারা তাদের মূর্খতার কারণেই এমনটি বলে। তাদের কাছে যদি ইলমের দৌলত থাকত, তাহলে তারা এভাবে আলেমদের দোষারোপ করত না।

আরেকটি কারণ হতে পারে—মানুষের মেজাজ ও স্বভাব এক রকম নয়। কিছু মানুষ কঠিন ও সংগ্রামী জীবনযাপন করতে পারে। কেউ আবার কঠোর জীবন সইতে পারে না। সুতরাং কারও জন্য নিজের সক্ষমতার মানদণ্ড দিয়ে অন্যকে পরিমাপ করা উচিত নয়।

তবে হ্যাঁ, আমাদের একটি মানদণ্ড রয়েছে—আর তা হলো শরিয়ত। শরিয়তের মধ্যে কিছু বিধানে সহজতা রয়েছে, আবার সহজতার সুযোগ গ্রহণ না করে কঠিনতার ওপর আমল করার বৈধতাও রয়েছে। সুতরাং কেউ যদি কোনো বিধানের ক্ষেত্রে সহজতার ওপর আমল করে, তাহলে তাকে মন্দ বলা বা তিরস্কার করা উচিত নয়। কারণ, কখনো কখনো কঠোরতা বাদ দিয়ে সহজতার ওপর আমল করাই উত্তম—সার্বিক উপকারিতার বিষয় প্রাধান্য দিয়ে।

জাহেদরা যদি জানত, ইলমের দ্বারা আল্লাহর যে মারেফাতের সৃষ্টি হয়, তার কারণে অন্তরসমূহ তার ভয়ে সচেতন থাকে, তাহলে তারাও শরীর সংরক্ষণের দিকে মনোযোগী হতো- যাতে শরীর নামক বাহনটি আরও শক্তিশালী হয়।

ইলম ও আমলের মাধ্যম হলো অন্তর ও চিন্তা-ফিকির। যখন মাধ্যম স্বাচ্ছন্দ্য ও যথার্থ হবে, তখন আমলও শ্রেষ্ঠভাবে আদায় হবে। এটি এমন এক বিষয়- যা ইলম ছাড়া বোঝা যাবে না।

ইলম সম্পর্কে অজ্ঞ ও মূর্খ থাকার কারণে, তারা যেগুলো জানে না, সেগুলোকে অস্বীকার করে বসে। অন্যায় মনে করে। এবং ধারণা করে- ইবাদতের মূল লক্ষ্যই বুঝি শরীরকে ক্লান্ত করা এবং খাদ্য-উপকরণ না থাকা। অথচ তারা বোঝে না, সচেতনভাবে ভয় করার জন্য একটি স্থির অন্তর ও সুস্থতারও প্রয়োজন আছে।

যেমন, জনৈক ব্যক্তি বলেন, روجوا القلوب تعي الذكر -অন্তরকে স্বস্তি দাও, সেই জিকিরকে বাঁচিয়ে রাখবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00