📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 রজমের আয়াত বিলোপের রহস্য

📄 রজমের আয়াত বিলোপের রহস্য


শাব্দিকভাবে রজমের আয়াত রহিত হওয়া এবং সর্বসম্মতিক্রমে বাস্তবে তার হুকুম বাকি থাকার রহস্য নিয়ে চিন্তা করলাম- এমনটি কেন করা হলো? আমার কাছে মনে হলো, এর দুটি কারণ হতে পারে-

১. বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলার সূক্ষ্ম এক মমতার কারণে এই সর্বোচ্চ শাস্তিটি তাদের মুখোমুখি রাখেননি। দেখুন, তিনি বেত্রাঘাতের কথা স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন; কিন্তু রজমের কথা আড়াল করেছেন। ঠিক এ বিষয়টার দিকে ইঙ্গিত করে কিছু আলেম বলেন, আল্লাহ তাআলা তার অতি উচ্চ রুচি ও সূক্ষ্ম মমতার কারণে অতি কষ্টকর কিংবা অতি অপ্রিয় বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেন না। যেমন, ﴾كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصَّيَامُ

তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হলো। [সুরা বাকারা: ১৮৩]

এখানে ফরজকারীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। অথচ আমরা সবাই জানি, আল্লাহ তাআলাই হলেন এই ফরজকারী।

অথচ যেখানে রহম ও দয়ার কথা এসেছে, সেখানে তিনি নিজের নাম সরাসরি উল্লেখ করেছেন। যেমন, ﴾كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ

তোমাদের প্রতিপালক নিজের ওপর রহম করাকে আবশ্যক করে নিয়েছেন। [সুরা আনআম: ৫৪]

২. আল্লাহ তাআলা এর দ্বারা এই উম্মতের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি ইশারা করেছেন। এই উম্মতের একটি দলিলের নাম- ইজমা। আলেমদের সর্বসম্মতি। রজমের বিষয়টি এভাবেই নির্ধারিত হয়েছে এবং এই উম্মত প্রাণ-বিয়োগান্তক বিষয়টির ক্ষেত্রে শরিয়তের এই দলিলের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে যখন সকলের সর্বসম্মতি এসে গেছে, তখন এটি দলিলে পরিণত হয়ে গেছে। অথচ ইজমা আল্লাহ তাআলার নিজের আয়াতের মতো সর্বোচ্চ প্রনিধানযোগ্য অকাট্য দলিল নয়। তবু ইজমা একটি দলিলে পরিণত হয়েছে এবং এই উম্মত সেটা মেনেও নিয়েছে।

ঠিক এ ধরনের বিষয়ই ঘটেছিল আল্লাহর খলিল হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে। ঘুমের মধ্যে পাওয়া নির্দেশকে তিনি প্রকৃত নির্দেশ হিসেবেই নিয়েছিলেন। অনর্থক স্বপ্ন না ভেবে একটি দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্যের বিষয় এমনই হয়- সাধারণ কথাও নির্দেশ বলে মানতে মন চায়।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 উপকরণ ও উপকরণদাতা

📄 উপকরণ ও উপকরণদাতা


একবার আমি একটি জটিলতার মধ্যে আপতিত হলাম। আমি আমার অন্তর নিয়ে একক আল্লাহ তাআলার দিকে ধ্যানমগ্ন হলাম। জানি, তিনি ছাড়া আমার উপকারের কেউ নেই এবং তিনি ছাড়া আমার বিপদ দূর করারও কেউ নেই।

এরপর আমি আমার উপকরণগুলোর বাহ্যিক কার্যকারিতার কথা ভেবে সেগুলোর সাহায্য গ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করলাম। কিন্তু আমার ‘ইয়াকিন’ বা বিশ্বাস দাঁড়িয়ে বলল, এটি তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে একটি বড় কলঙ্ক। তাকওয়ার পরিপন্থী।

আমি বললাম, না, বিষয়টা এমন নয়। আল্লাহ তাআলা এগুলোকে একটি হিকমত হিসেবে তৈরি করেছেন। অর্থাৎ আমি বিশ্বাস করছি, আমি দুনিয়ার যে উপকরণ প্রস্তুত করেছি, এটা কোনো উপকার করতে পারবে না। এর অবস্থান না থাকার মতোই। আল্লাহর হুকুম ছাড়া কিছুই হবে না।

তবে শরিয়ত এই উপকরণগুলোর বৈধতা দিয়েছে। এগুলো ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا كُنْتَ فِيهِمْ فَأَقَمْتَ لَهُمُ الصَّلَاةَ فَلْتَقُمْ طَائِفَةٌ مِنْهُمْ مَعَكَ وَلْيَأْخُذُوا أَسْلِحَتَهُمْ)

এবং হে নবী, তুমি যখন তাদের মধ্যে উপস্থিত থাকো ও তাদের নামাজ পড়াও, তখন (শত্রুর সাথে মোকাবিলার নিয়ম এই যে,) মুসলিমদের একটি দল তোমার সাথে দাঁড়াবে এবং নিজেদের অস্ত্র সাথে রাখবে। [সুরা নিসা: ১০২]

এবং আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ﴿فَمَا حَصَدْتُمْ فَذَرُوهُ فِي سُنْبُلِهِ﴾ তোমরা যে শস্য সংগ্রহ করবে, তা তার শীষসহ রেখে দিয়ো। [সুরা ইউসুফ: ৪৭]

এছাড়াও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের ময়দানে বর্ম পরেই বের হতেন, চিকিৎসকদের সাথে পরামর্শ করতেন। যখন তিনি তায়েফ থেকে বের হলেন, মক্কায় প্রবেশ করতে পারছিলেন না, তখন মুতঈম ইবনে আদির নিকট বলে পাঠালেন, 'আমি তোমার নিরাপত্তায় মক্কায় প্রবেশ করতে চাই।' পরে এমনটিই হয়েছিল। কিন্তু তিনি তো ইচ্ছা করলে, আল্লাহর ওপর ভরসা করে কোনো মাধ্যম ছাড়াই মক্কায় প্রবেশ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।

এভাবে শরিয়তই যখন দুনিয়ার কোনো কাজকে উপকরণের ওপর নির্ভরশীল করে দিয়েছে, তখন উপকরণ ত্যাগ করা হিকমতের বিপরীত কাজ।

এ কারণে আমি ডাক্তারের চিকিৎসা গ্রহণকে উত্তম মনে করি। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, عَنْ عَبْدِ اللهِ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ دَاءً إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ دَوَاءٌ.

আবদুল্লাহ রা. থেকে থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা যে রোগই পাঠিয়েছেন, তিনি আবার তার ওষুধও পাঠিয়েছেন। ৬৩ অন্য বর্ণনায় এসেছে, عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللَّهَ أَنْزَلَ الدَّاءَ وَالدَّوَاءَ وَجَعَلَ لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ فَتَدَاوَوْا وَلَا تَدَاوَوْا بِحَرَامِ.

হজরত আবু দারদা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলাই রোগ ও ওষুধ পাঠিয়েছেন এবং প্রত্যেক রোগের ওষুধ সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কিন্তু হারাম জিনিস দিয়ে চিকিৎসা নিয়ো না। [সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৭৬]

হজরত আয়েশা রা. বলতেন, تعلّمت الطبّ من كثرة أمراض رسول الله صلى الله عليه وسلم وما ينعت له.

আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রোগের আধিক্য ও তার বর্ণনা থেকে চিকিৎসা শিখেছি। [মুসতাদরাকে হাকিম: ৪/১৯৭]

আর যারা বলেন, ডাক্তারি চিকিৎসা না করানোই উত্তম। তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদিস দিয়ে দলিল প্রদান করেন। হাদিসে এসেছে, حَدَّثَنَا ابْنُ عَبَّاسٍ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ... قِيلَ هَذِهِ أُمَّتُكَ وَيَدْخُلُ الْجَنَّةَ مِنْ هَؤُلَاءِ سَبْعُونَ أَلْفًا بِغَيْرِ حِسَابٍ ... هُمُ الَّذِينَ لَا يَسْتَرْقُونَ وَلَا يَتَطَيَّرُونَ وَلَا يَكْتَوُونَ وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ.

হজরত ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে বলা হবে, এটা আপনার উম্মত। তাদের মধ্য থেকে ৭০ হাজার কোনো হিসাব ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তারা হলো সেই সকল ব্যক্তি, যারা ঝাড়ফুঁক করায় না, কোনো অশুভ লক্ষণ মনে করে না, সেঁক দেয় না আর তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে। [সহিহ বোখারি: ৫২৭০]

এ হাদিস চিকিৎসা গ্রহণের বিপরীত কথা বলে না। কেননা, তখন কিছুলোক সেঁক দিত, যাতে তারা অসুস্থ না হয়। ঝাড়ফুঁক করত, যাতে কোনো বিপদে আপতিত না হয়। এবং অনেক ক্ষেত্রে এই ঝাড়ফুঁকের মধ্যে শিরকি কথা থাকত। এ কারণে এগুলো নিষেধ করা হয়েছে।

নতুবা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে ইবনে যুরারাকে সেঁক দিয়েছেন এবং বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, তিনি ঝাড়ফুঁকের অনুমোদন দিয়েছেন। সুতরাং ওপরে বর্ণিত হাদিসের যথার্থ ব্যাখ্যা তা, যা আমরা আগে বর্ণনা করেছি।

সুতরাং সক্ষমতা সত্ত্বেও আমার শরীরের সাথে যা উপযোগী হবে, তা আমি খাব না, আর আল্লাহর দরবারে হাত তুলে বলতে থাকব, হে আল্লাহ, তুমি আমাকে সুস্থ করে দাও—এটা হিকমতের চাহিদা নয়। হিকমত তো আমাকে বলে, তুমি কি হাদিসের কথা শোনোনি- اعقلها و توكل -’আগে তা [বাহন] বাঁধো, এরপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ এভাবে উপযুক্ত জিনিস খাও, এরপর বলো, আল্লাহ, আমার অসুখ সারিয়ে দাও। কিন্তু সেই ব্যক্তির মতো হয়ো না, যার শস্যক্ষেত ও পানির নহরের মাঝে হয়তো হাতখানিক দূরত্ব। কিন্তু সে অলসতা করে সেটুকু ছুটিয়ে না দিয়ে পানি প্রার্থনার নামাজে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করল—আল্লাহ, আমার ক্ষেতে পানি দাও... পানি দাও...।

ঠিক এরকম অবস্থা হলো তার, যে ব্যক্তি কোনো পাথেয় ছাড়াই সফরে বের হয়। সে যেন তার প্রতিপালককে পরীক্ষা করছে—তিনি তাকে রিজিক দেবেন, নাকি না? এটা কত বড় মূর্খতা! অথচ আল্লাহ তাআলা বলেই দিয়েছেন, وتزودوا -তোমরা পাথেয় গ্রহণ করো।

আর সে ব্যক্তি বলল, না, আমি পাথেয় নেব না। এটা এমন এক অবস্থা—তাকে ধ্বংস করার আগেই যেন সে ধ্বংস হয়ে আছে। সুতরাং কিছু মানুষ বেশি বাড়াবাড়ি করে। তারা এভাবে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় বের করে মূলত দ্বীন-ইসলামের বাইরে পা বাড়িয়েছে। তাদের এসকল কর্ম থেকে সতর্ক থাকতে হবে। তারা ধারণা করে, মানবিক স্বভাবের সম্পূর্ণ বাইরে গিয়ে দ্বীনের ইবাদত এবং সকল উপকরণের বিরোধিতাই হলো তাওয়াক্কুল।

ইলম ও ইলমের গভীরতা দিয়ে এই বিষয়টি বুঝতে হবে। সুতরাং আমি যে বিষয়গুলোর দিকে ইশারা করলাম, সেগুলো ভালোভাবে বুঝে নাও। অনেক ধরনের বিভ্রান্তকর কথা, যেগুলো মূর্খদের থেকে শুনে থাকো, সেগুলোর থেকে এটাই তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। আর প্রজ্ঞাবানদের সাথে থাকো; মূর্খদের দলভুক্ত হয়ো না।

টিকাঃ
৬৩. ইমাম বোখারি রহ. 'কিতাবুত তিব্ব' এ হজরত আবু হুরাইরা রা.-এর বর্ণনায় এই হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। ফাতহুল বারি-১০/৫৬৭৮।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ইসলাম ও পরিচ্ছন্নতা

📄 ইসলাম ও পরিচ্ছন্নতা


আমি একবার মানুষের পরিচ্ছন্নতার বিষয় নিয়ে চিন্তা করলাম। দেখলাম- অনেক মানুষই তাদের শরীর ও জায়গার পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে অবহেলা করে। কেউ হয়তো খাওয়ার পর ঠিকভাবে তার মুখ পরিষ্কার করে না। কেউ তার দু-হাতের তেল-চর্বি পরিষ্কার করে না। কেউ কেউ তেমন একটা মিসওয়াকই করে না। কেউ হয়তো চোখে সুরমা লাগায় না। বগল ও অন্যান্য স্থানের অবাঞ্ছিত পশমগুলো পরিষ্কার করে না, পরিচ্ছন্ন থাকে না। এভাবে এই অবহেলাগুলো তাদের দ্বীন ও দুনিয়া- উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

অথচ শরীয়ত মুমিনকে পরিচ্ছন্ন থাকার আদেশ দিয়েছে। লোকজনের অধিক সমাগম হওয়ার কারণে জুমার দিনে গোসলের আদেশ দিয়েছে। রসুন-পেঁয়াজ বা গন্ধউদ্রেককারী খাদ্য গ্রহণের পর পরিচ্ছন্ন হওয়া ছাড়া মসজিদে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছে। নখের ময়লা পরিষ্কার করতে আদেশ দিয়েছে। মোচ ছোট করতে বলেছে। মিসওয়াক করতে বলেছে। এবং নির্ধারিত কিছু জায়গার লোম পরিষ্কার করতে নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়াও শরিয়তে আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন এগুলোর ক্ষেত্রে অবহেলা দেখানো মানে দ্বীনের পালনীয় সুন্নত বর্জন করা। এমনকি কখনো কখনো এই অবহেলা ইবাদতও নষ্ট করে দিতে পারে। যেমন, কারও হয়তো নখ বড় হয়ে গেছে। তার নিচে ময়লা জমেছে। অজু করার সময় সেখানে পানি না পৌঁছানোর কারণে তার অজু হলো না। পরিণামে নামাজও হলো না।

অপরিচ্ছন্ন থাকলে পার্থিব সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রেও অসুবিধা হয়। এরকম অনেক উদাসীন মানুষকে দেখি, কারও সাথে খুব কাছ ঘেঁষে কথা বলছে। কিন্তু তার শারীরিক অপরিচ্ছন্নতার কারণে তার শরীর, মুখ বা পোশাকের দুর্গন্ধ নিকটের মানুষটিকে কষ্ট দিচ্ছে। কিন্তু তার নিজের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই!

যখন কথা বলে, দুর্গন্ধ ছড়ায়। আর যদি গোপন কথা বলার জন্য একেবারে নিকটে এসে যায়, তখন তার মুখের গন্ধ নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কষ্ট দেয়। হয়তো যখন তার হাই ওঠে, মুখে হাত দেয় না। হাঁচি বা শ্লেষ্মা এলে একটু আড়াল করে না।

এই আচরণগুলো স্ত্রীদের নিকটও ভীষণ অপছন্দ। হয়তো ভদ্রতা করে কখনো এগুলো পুরুষের কাছে উল্লেখ না-ও করতে পারে; কিন্তু এর পরিণামে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর স্বতঃস্ফূর্ত আকর্ষণ কমে যেতে পারে।

হজরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, إني لأحب أن أتزين للمرأة كما أحب أن تتزين لي. 'আমি আমার স্ত্রীর জন্য তেমন পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকা পছন্দ করি, যেমন আমি ভালোবাসি সে আমার জন্য পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকুক।'

মানুষদের মধ্যে কেউ কেউ বলে, এগুলো নিছক লৌকিকতা ও কৃত্রিমতা। কিন্তু বিষয়টি কিছুতেই তেমন নয়। এটি একটি সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনের অপরিহার্য অংশ। জীবনের সৌন্দর্য। আল্লাহ তাআলা যখন আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিজেও আমাদের সৌন্দর্যমণ্ডিত করে সৃষ্টি করেছেন। কারণ, দৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে চোখেরও শান্তি-স্বস্তির অধিকার রয়েছে। যে ব্যক্তি মানুষের চোখ, ভ্রু এবং অন্যান্য গাঠনিক সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তা করবে, সেই বুঝবে, আল্লাহ আসলে কত সুন্দর করে মানুষ জাতিকে সৃষ্টি করেছেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি ও সুগন্ধময়। তিনি নিয়মিত মিসওয়াক করতেন। তার থেকে কোনো অপ্রিয় ঘ্রাণ পাওয়া যাবে- এটা তিনি পছন্দ করতেন না। পণ্ডিত ব্যক্তিগণ বলেন,
من نظف ثوبه قل همه ومن طاب ريحه زاد عقله. যে তার কাপড় পরিচ্ছন্ন রাখবে, তার দুশ্চিন্তা কম হবে। আর যার ঘ্রাণ সুন্দর হবে, তার বুদ্ধি বৃদ্ধি পাবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার কিছু সাহাবির ব্যাপারে বলেছেন,
ما لكم تدخلون علي قلحا، استاكوا.

তোমাদের কী অবস্থা বলো তো, অপরিচ্ছন্ন দাঁত নিয়ে তোমরা আমার নিকট এসো! তোমরা মিসওয়াক করে আসবে। ৬৪

মিসওয়াক না করে নামাজ পড়ার চেয়ে মিসওয়াক করে নামাজ পড়ার সওয়াব বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এভাবে পরিচ্ছন্ন ব্যক্তি নিজেকে সুন্দর রাখে এবং তার অবস্থান থেকে আরও মর্যাদাবান হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞজনরা আরও বলেন,
من طال ظفره قصرت يده، ثم إنه يقرب من قلوب الخلق وتحبه النفوس، لنظافته و طيبه.

যার নখ লম্বা হয়ে যায়, তার হাত খাটো হয়ে পড়ে। অন্যদিকে মানুষের পরিচ্ছন্নতা ও সুঘ্রাণতার কারণে সবাই তাকে পছন্দ করে এবং নৈকট্য দান করে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আতর বা সুঘ্রাণকে ভালোবাসতেন। এরপর কথা হলো, স্ত্রীগণ এই সুঘ্রাণ অবস্থাতেই স্বস্তি বোধ করে। কারণ, নারীরাও রুচিবোধের ক্ষেত্রে পুরুষদের মতোই। পুরুষ যেমন নারীদের থেকে কোনো কুঘ্রাণকে পছন্দ করে না, তেমনি নারীরাও পুরুষদের থেকে কোনো দুর্গন্ধ পছন্দ করে না। বরং অনেক সময় পুরুষরা একটু ধৈর্যধারণ করে চললেও, নারীরা এক্ষেত্রে তা করতে চায় না।

আমি কিছু লোককে জানি, তারা দাবি করে যে, তারা ইবাদতগুজার জাহেদ- কিন্তু তারা মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে নোংরা। এটা আসলে তাদের ইলমহীনতার পরিণাম।

নতুবা যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচার-আচরণ, জীবনপদ্ধতি ও বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে চিন্তা করবে, সে দেখতে পাবে- তিনি ছিলেন কত স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন। কত সুন্দর ও পরিপাটি। সুতরাং আমাদের অনুসরণ করতে হবে তাঁকেই। সকল মানুষের জন্য তিনিই আমাদের একমাত্র আদর্শ ও অনুসরণীয়।

টিকাঃ
* মুসনাদে আহমদ: ১/২১৪/১৮৩৫। শাইখ শাকের রহ. বলেন, এর সনদ দুর্বল।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ধৈর্যধারণ

📄 ধৈর্যধারণ


আমার মতে, হঠাৎ আপতিত বিপদের ওপর ধৈর্যধারণ হলো সবচেয়ে কষ্টকর কর্ম। তবে এর মাধ্যমে অর্জিত শ্রেষ্ঠ সন্তুষ্টিও আর কিছুতে নেই। ধৈর্যধারণ হলো ফরজ আর অর্জিত সন্তুষ্টি তার পুরস্কার।

আপতিত বিপদে ধৈর্যধারণ করা কঠিন কেন?

কারণ, ভাগ্যের লিখনে হঠাৎ করে যে বিপদটি ঘটে, নফস সাধারণত তার জন্য প্রস্তুত থাকে না। নফস তার অসুস্থতা কিংবা শারীরিক কোনো কষ্ট সহ্য করতে চায় না। সে চায় সীমাহীন সুস্থতা আর বিলাস-ব্যসন। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত আকস্মিক বিপদে তার মস্তিষ্ক যেন হতভম্ব হয়ে পড়ে, অস্থির হয়ে পড়ে। ভাগ্যের এই হিকমতকে সে মেনে নিতে চায় না।

যেমন, তুমি অনেক দুনিয়াদারকে দেখো, তার জীবনের দু-কূল ছেপে সম্পদের নহর বইছে। এত এত সম্পদ—সে যেন নিজেই বুঝতে পারে না এত সম্পদ দিয়ে সে কী করবে! স্বর্ণ ও রূপার এই অর্থগুলো দিয়ে সে বিভিন্ন পাত্র তৈরি করে ব্যবহার করে। অথচ জানা কথা, কাঞ্চন মণি আকিক ও মুক্তার জিনিসপত্র দেখতে এগুলোর চেয়েও সুন্দর। কিন্তু সে দ্বীনের বিধি-নিষেধের কোনো তোয়াক্কা করে না। স্বর্ণ-রূপার জিনিস ব্যবহার করে। রেশমি কাপড় পরিধান করে। মানুষের ওপর জুলুম করে। বিলাস-ব্যসনে ডুবে থাকে। সম্পদের কোনো অভাব নেই। দুনিয়া যেন তার ওপর উপুড় করে ঢেলে দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে দেখা যায়, আলেম-ওলামা, ধার্মিক ব্যক্তি, ইলমের শিক্ষার্থী—আল্লাহর এসকল প্রিয় ব্যক্তিই দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত। বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ ও বিপদাপদে আপতিত। এমনকি ধনবান জালেমদের অধীনে কষ্ট সহ্য করে চলছে তাদের অনেকের জীবন।

ঠিক এই ক্ষেত্রগুলোতে এসে শয়তান ধোঁকা দেওয়ার সুযোগটা পেয়ে যায়—ভাগ্যের এই হিকমতের মধ্যে সে কদর্যতা আনয়নের চেষ্টা করে। মনের মধ্যে বিভিন্ন রকম অনুচিত প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করে।

সুতরাং একজন মুমিনের উচিত হবে, দ্বীনের পথে চলতে গিয়ে দুনিয়াতে যে কষ্টগুলোর মুখোমুখি হতে হয় এবং এই নিয়ে শয়তানের সাথে লড়াই করতে গিয়ে মানসিক যে কষ্টের শিকার হতে হয়- সবগুলোর ওপর ধৈর্যধারণ করা। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিমদের ওপর কাফেরদের যেই অত্যাচার ও নিপীড়ন, ধার্মিকদের ওপর অধার্মিক ফাসেকদের যেই অনাচার ও দুর্ব্যবহার- সেগুলোর ওপরও ধৈর্যধারণ করা। তাদের অত্যাচারের সবচেয়ে অমানবিক ও নিকৃষ্টতম উদাহরণ হলো, তারা নির্বিচারে মানুষকে কষ্ট দেয়, শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করে। তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে। নারীদের ওপর অত্যাচার করে। সম্পদ-সম্পত্তি বিনষ্ট করে ইত্যাদি।

ঠিক এই জায়গাটাতে এসে ঈমান টলমল করে ওঠে। বিভিন্ন কুমন্ত্রণা এসে বিশ্বাসের ভিতকে টলিয়ে দিতে চায়। আর ঠিক এখানেই তো প্রকৃত ঈমানের পরীক্ষা।

কেন? এই সময়গুলোতেও আমাদের ধৈর্যধারণ করতে হবে কেন? ধৈর্যের সাথে অবস্থার মোকাবিলা করতে হবে কেন? কারণ, আমাদের এভাবেই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। কোরআন ও হাদিসে এভাবেই নির্দেশনা এসেছে।

তবে কোরআনের নির্দেশনা এখানে দুভাবে এসেছে। যেমন-
১. কাফের এবং অবাধ্যদের সম্পদ, শক্তি ও সুযোগ প্রদানের কারণ বর্ণনা করা হয়েছে।

যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন, (وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ خَيْرٌ لِأَنْفُسِهِمْ إِنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ لِيَزْدَادُوا إِثْمًا وَلَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ)

যারা কুফর অবলম্বন করেছে, তারা যেন কিছুতেই মনে না করে, আমি তাদেরকে যে অবকাশ দিয়েছি, তাদের পক্ষে তা ভালো। প্রকৃতপক্ষে আমি তাদেরকে অবকাশ দিই কেবল এ কারণে যে, যাতে তারা পাপাচারে আরও অগ্রগামী হয় এবং পরিশেষে তাদের জন্য আছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি। [সুরা আল ইমরান: ১৭৮]

অন্য আয়াতে এসেছে, (وَلَوْلَا أَنْ يَكُونَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً لَجَعَلْنَا لِمَنْ يَكْفُرُ بِالرَّحْمَنِ لِبُيُوتِهِمْ سُقْفًا مِنْ فِضَّةٍ وَمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُونَ ۝ وَلِبُيُوتِهِمْ أَبْوَابًا وَسُرُرًا عَلَيْهَا يَتَّكِثُونَ وَزُخْرُفًا وَإِنْ كُلُّ ذَلِكَ لَمَّا مَتَاعُ الْحَيَاوةِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ عِنْدَ رَبِّكَ لِلْمُتَّقِينَ)

সমস্ত মানুষ একই মতাবলম্বী (অর্থাৎ কাফের) হয়ে যাবে- এই আশঙ্কা না থাকলে, যারা দয়াময় আল্লাহকে অস্বীকার করে, আমি তাদের ঘরের ছাদও করে দিতাম রুপার এবং তারা যে সিঁড়ি দিয়ে চড়ে তাও।

আর তাদের ঘরের দরজাগুলি এবং সেই পালঙ্কগুলিও, যাতে তারা হেলান দিয়ে বসে।

বরং সোনার তৈরি করে দিতাম। প্রকৃতপক্ষে এসব পার্থিব জীবনের সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়। আর তোমার প্রতিপালকের নিকট মুত্তাকিদের জন্য আছে আখেরাত। [সুরা যুখরুফ : ৩৩-৩৫]

আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ نُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا﴾

যখন কোনো জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন তাদের বিত্তবান লোকদেরকে (ঈমান ও আনুগত্যের) হুকুম দিই, ফলে তারা তাতে নাফরমানি করে, যার পরিণামে তাদের ব্যাপারে কথা চূড়ান্ত হয়ে যায় এবং আমি তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলি। [সুরা ইসরা : ১৬]

কোরআনে এ ধরনের আরও অনেক বর্ণনা এসেছে।

২. দ্বিতীয় কারণ, বিপদের মাধ্যমে মুমিনদের পরীক্ষা করা। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ﴾ নাকি তোমরা মনে করো, তোমরা এমনিতেই জান্নাতে পৌঁছে যাবে, অথচ আল্লাহ এখনো পর্যন্ত তোমাদের মধ্য হতে সেই সকল লোককে যাচাই করে দেখেননি, যারা জিহাদ করবে এবং তাদেরকেও যাচাই করে দেখেননি, যারা অবিচল থাকবে। [সুরা আল ইমরান: ১৪২]

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُمْ مَثَلُ الَّذِينَ خَلَوْ مِنْ قَبْلِكُمْ مَسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا ) (হে মুসলিমগণ,) তোমরা কি মনে করেছ, তোমরা জান্নাতে (এমনিতেই) প্রবেশ করবে, অথচ এখনো পর্যন্ত তোমাদের ওপর সেই রকম অবস্থা আসেনি, যেমনটা এসেছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর? তাদেরকে স্পর্শ করেছিল অর্থ-সংকট ও দুঃখ-কষ্ট এবং তাদেরকে করা হয়েছিল প্রকম্পিত...। [সুরা বাকারা: ২১৪]

আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে আরও বলেন, أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تُتْرَكُوا وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ) তোমরা কি মনে করেছ তোমাদেরকে এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে, অথচ আল্লাহ এখনো দেখে নেননি, তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ [সুরা তাওবা: ১৬] করে।

কোরআনে এ ব্যাপারে আরও অনেক আয়াত এসেছে। ধৈর্যধারণের এই ব্যাপারটি হাদিসেও এসেছে। অবস্থার বর্ণনা এসেছে। কথার বর্ণনাও এসেছে। যেমন, عُمَرُ بْنُ الْخَطَابِ قَالَ .... فَدَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ مُضْطَجِعُ عَلَى حَصِيرٍ فَجَلَسْتُ فَأَدْنَى عَلَيْهِ إِزَارَهُ وَلَيْسَ عَلَيْهِ غَيْرُهُ وَإِذَا الْحَصِيرُ قَدْ أَثَرَ فِي جَنْبِهِ فَنَظَرْتُ بِبَصَرِي فِي خِزَانَةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَإِذَا أَنَا بِقَبْضَةٍ مِنْ شَعِيرٍ نَحْوِ الصَّاعِ وَمِثْلِهَا فَرَظًا فِي نَاحِيَةِ الْغُرْفَةِ وَإِذَا أَفِيقُ مُعَلَّقٌ قَالَ فَابْتَدَرَتْ عَيْنَايَ قَالَ مَا يُبْكِيكَ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ قُلْتُ يَا نَبِيَّ اللَّهِ وَمَا لِي لَا أَبْكِي وَهَذَا الْحَصِيرُ قَدْ أَثَرَ فِي جَنْبِكَ وَهَذِهِ خِزَانَتُكَ لَا أَرَى فِيهَا إِلَّا مَا أَرَى وَذَاكَ قَيْصَرُ وَكِسْرَى فِي الثِّمَارِ وَالْأَنْهَارِ وَأَنْتَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَصَفْوَتُهُ وَهَذِهِ خِزَانَتُكَ فَقَالَ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ أَلَا تَرْضَى أَنْ تَكُونَ لَنَا الْآخِرَةُ وَلَهُمْ الدُّنْيَا قُلْتُ بَلَى.

হজরত ওমর রা. বলেন, এরপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কামরায় প্রবেশ করলাম। তখন তিনি একটি চাটাইয়ের ওপর কাত হয়ে শুয়ে ছিলেন। আমি তাঁর নিকটে গিয়ে বসলাম। তিনি তার কাপড় গুটিয়ে নিলেন। এটিই ছিল তখন তার একমাত্র পরিধেয়। তাছাড়া চাটাইয়ের রুক্ষতা তার শরীরে দাগ বসিয়ে দিয়েছিল। এবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গচ্ছিত জিনিস-পত্রের দিকে দৃষ্টি দিলাম। দেখলাম, কামরার একপ্রান্তে স্বল্প পরিমাণ কিছু যব। আর অনুরূপ ছাতু। এটা দেখে আচমকাই আমার চোখে পানি চলে এলো।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ইবনে খাত্তাব, কাঁদছ কেন?

আমি বললাম, আমি কাঁদব না কেন? এই যে শক্ত চাটাই- যা আপনার শরীরে দাগ ফেলে দেয়! আর এই যে আপনার সামান্য কিছু সঞ্চিত খাদ্য! অথচ কায়সার-কিসরা কত সম্পদ-সম্পত্তি, খাদ্য-খাবার ও আরাম-আয়েশে চলে! আর আপনি হলেন আল্লাহর রাসুল ও তাঁর বন্ধু- অথচ এই হলো আপনার খাদ্য-সামান!

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ইবনে খাত্তাব, তুমি কি এই বণ্টনে সন্তুষ্ট নও যে, তাদের জন্য শুধু দুনিয়া আমাদের জন্য আখেরাত?

আমি বললাম, জি, অবশ্যই আমি সন্তুষ্ট। ৬৫

অন্য হাদিসে এসেছে-
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَوْ كَانَتْ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةً مَاءٍ

হজরত সাহল ইবনে সাদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলার নিকট এই দুনিয়া যদি একটি মাছির ডানার পরিমাণও মূল্য রাখত, তবে তিনি দুনিয়া থেকে কোনো কাফেরকে এক ঢোক পানিও পান করাতেন না। [সুনানে তিরমিজি: ২২৪২]

এখন আমরা যৌক্তিকভাবে ধৈর্যধারণের বিষয়টা ভেবে দেখতে পারি। এটাকে আমরা কয়েকভাবে বিবেচনা করতে পারি। যেমন-

১. যেহেতু অকাট্য প্রমাণাদির মাধ্যমে ভাগ্যের হিকমত [তাকদির] আমাদের কাছে সাব্যস্ত হয়ে আছে, সুতরাং এই মূলনীতিটা বর্জন করা সম্ভব নয়। তাকদিরে যেভাবে আছে, ঘটনাবলি সেভাবেই সংঘটিত হবে। কিন্তু অনেক সময় মূর্খরা এটাকে ভুল বুঝে অস্থিরতা প্রকাশ করতে থাকে।

২. বাহ্যিকভাবে অবাধ্যদের যে ছাড় দেওয়া হচ্ছে, সেটার মাধ্যমে আসলে তাদেরকে পাকড়াও করা হচ্ছে। আর বাহ্যিকভাবে আনুগত্যকারীদের যে কষ্টের বোঝা চেপে ধরছে, প্রকৃত অর্থে তাদেরকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। কারণ, অবাধ্যদের এই ছাড়ের পরেই রয়েছে দীর্ঘ শান্তি ও কষ্ট। আর আনুগত্যকারীদের এই কষ্টের পরেই রয়েছে সীমাহীন প্রতিদান, পুরস্কার ও শান্তি। দুই দলেরই সময় অতি দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। জীবনের সফর সমাপ্ত হচ্ছে। এরপরই তাদের সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়বে আখেরাতের পর্দা। অচিরেই সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে দুনিয়ার সুখ কিংবা দুঃখের। তাহলে এত অভিযোগের কী আছে!

৩. এটাও প্রমাণিত যে, মুমিন বান্দা হলো আল্লাহর তাআলার দাস- তার শ্রমিকের মতো। আর বান্দার শ্রমের সময় হলো দুনিয়ার জীবন নামক এই দিনগুলো। সুতরাং যে শ্রমিক মাটির মধ্যে কাজ করবে, তার জন্য শুভ্র পরিষ্কার কাপড় পরিধান করা উচিত নয়; বরং সে এই কাজের সময়গুলোতে জান-প্রাণ পরিশ্রম করবে। কষ্ট স্বীকার করবে। ধৈর্যধারণ করবে। এরপর যখন সে কাজ থেকে বিরত হবে, তখন সে পরিচ্ছন্ন হয়ে তার সবচেয়ে ভালো কাপড়টি পরিধান করবে। পারিশ্রমিক নিয়ে বিলাস-ব্যসন করবে।

কিন্তু যে ব্যক্তি কাজের সময় বিলাসিতা করে, কাজ না করে আরাম-আয়েশ করে, সে তো কাজ শেষে প্রতিদান প্রাপ্তির সময় আফসোস করবে। তখন তাকে কোনো পুরস্কার প্রদান করা হবে না। বরং কাজের সময় তাকে যে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল, সেক্ষেত্রে অবহেলা করার কারণে তাকে শাস্তি প্রদান করা হবে।

নিশ্চয় এই দৃষ্টিভঙ্গিটি আমাদের ধৈর্যের সংকল্পকে আরও শক্তিশালী করবে।

৪. এটা কি আমরা ভেবে দেখি না, কোরআনে বলা হয়েছে, তোমাদের থেকে কিছু ব্যক্তিকে শহিদ হিসেবে গ্রহণ করা হবে? তাহলে দুনিয়ায় সব সময় এমন কিছুলোক থাকবেই- যারা মুমিনদের দিকে অত্যাচার ও হত্যার হাত বাড়িয়ে দেবে।

আমরা কেন বুঝতে চাই না, উমর রা.-এর হত্যার জন্য আবু লুলু'র দরকার। হজরত আলি রা.-এর হত্যার জন্য ইবনে মুলজিম। আর হজরত ইয়াহইয়া ইবনে জাকারিয়া আলাইহিমাস সালামকে হত্যার জন্য বড় কাফেরদের দরকার।

এভাবে যখন বুঝ, বোধ ও চিন্তার আলোকবর্তিকা আমাদের রাতের পর্দা সরিয়ে দেবে, তখন বুঝে আসবে এগুলোর পেছনে রয়েছে আসল স্রষ্টার হিকমত। এখানে সৃষ্টির কোনো হাত নেই।

সুতরাং আমরা তার পরীক্ষাগুলোর ওপর সব সময় ধৈর্যধারণ করব। তিনি যা চান- সেটাকেই প্রাধান্য দিয়ে। তাহলেই শুধু তার পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হব- ইনশাআল্লাহ।

এবার একটি ঘটনার কথা বলি। একবার এক বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট দুআর কথা বলা হলো। উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহ যাতে সন্তুষ্ট, আমার সন্তুষ্টি লেগে আছে তার সাথেই।

টিকাঃ
৬৫. সহিহ মুসলিম: ৭/২৭০৪, পৃষ্ঠা: ৪৪১- মা. শামেলা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00