📄 আঁধারাবিদ অন্তরের গল্প
আমি আমার তারুণ্যের সূচনাকালে মোজাহাদার পথ অনুসরণের দিকে ধাবিত হয়েছিলাম। দীর্ঘ রোজা ও নামাজে অভ্যস্ত ছিলাম। নির্জনতা ছিল আমার কাছে খুবই প্রিয়। তখন আমার মধ্যে একটি পূত-পবিত্র অন্তরের উপস্থিতি অনুভব করতাম। আমার দূরদর্শিতার চোখ প্রান্ত ছাড়িয়ে দূর-বহুদূরে স্থান করে নিত। আমি যেন আখেরাত দেখতে পেতাম। যে সময়টুকু আনুগত্য ছাড়া অতিবাহিত হতো, তার জন্য আফসোস করতাম। আনুগত্যের গনিমতের আশায় সর্বক্ষণ ব্যাকুল হয়ে থাকতাম। আল্লাহর সাথে কেমন যেন একপ্রকার প্রীতি অনুভব করতাম এবং তার নিকট নির্জন মোনাজাতে এক অপার্থিব মিষ্টতা অনুভব করতাম।
কিন্তু একদিন এর সবকিছুর অবসান ঘটল। সব হারিয়ে ফেললাম। আর এই মহা সর্বনাশের সূচনা হলো এইভাবে—
প্রশাসনের কিছু লোকের নিকট আমার কথা-বক্তব্য ভালো লাগল। বহু চেষ্টা-তদবির করে আমাকেও প্রশাসনের কিছু কাজে তাদের সাথে যুক্ত করে নিল। ভালো মনে করে আমিও যুক্ত হলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে আমার স্বভাব-মেজাজও সেদিকে ঝুঁকতে থাকল। ব্যস্ত হতে থাকলাম এবং একসময় অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, আমি আমার আগের সেই নির্জনতার মিষ্টতা হারিয়ে ফেলেছি।
শুধু তা-ই নয়; ঘটনা আরও ভয়াবহতার দিকে এগোতে থাকল। খাবারে হারামের সন্দেহের কারণে প্রথমে তো তাদের সাথে মেলামেশা ও একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া থেকে বেঁচে থাকতাম। কিন্তু আস্তে আমার অবস্থাও তাদের নিকটবর্তী হতে থাকল। হৃদ্যতা বাড়তে থাকল। মেলামেশাও বাড়তে থাকল। অনাকাঙ্ক্ষিত বিভিন্ন পরিস্থিতি সামনে আসতে থাকল।
নিজেকে রক্ষা করার জন্য এ অবস্থায় কী করা যায়, তা-ই চিন্তা করতে লাগলাম। অবশেষে নিজের থেকেই একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ফেললাম। যেগুলো বৈধ, বেছে বেছে আমি শুধু সেগুলোর দিকে হাত বাড়ালাম। অন্য বিষয় ও সঙ্গ এড়িয়ে যেতে লাগলাম। কিন্তু কোনো ফল হলো না। আমার মনের মধ্যে আগে যেই উজ্জ্বলতা ও প্রশান্তি ছিল, তা সব কোথায় উধাও হয়ে গেল। অবশেষে এই মেলামেশা আমার অন্তরের মধ্যে অন্ধকারের সৃষ্টি করতে লাগল এবং একসময় আমার অন্তর পুরোপুরি আলোশূন্য অন্ধকারে পরিণত হলো।
আগের সেই শান্তি, স্বস্তি ও মিষ্টতা থেকে বঞ্চিত তো হলামই, সেই সাথে হৃদয়ের আলো হারানোর কারণে ইসলাহি মজলিসগুলোর ক্ষেত্রে আমি বিরক্ত ও অনাগ্রহী হয়ে উঠতে থাকলাম। অন্যদের সাথে যদিও আমি বিভিন্ন মজলিসে যেতাম; কিন্তু অবস্থার উন্নতি হতো না। লোকজন তাওবা করে। ক্রন্দন করে। নিজেদের সংশোধন করে। কিন্তু আমার অবস্থার কোনো পরিবর্তন হতো না। যেন আমার সাথে এগুলোর কোনো সংযোগ-সম্পর্কই নেই।
এভাবে আমার রোগের দৌরাত্ম্য বাড়তেই থাকল। আমি আমার অন্তরের চিকিৎসার ব্যাপারে অক্ষম হয়ে পড়লাম। পরিশেষে একদিন বুজুর্গদের কবরস্থানে গমন করলাম। সেখানকার নির্জনতায় দীর্ঘক্ষণ আমার পরিশুদ্ধি নিয়ে দুআ করতে থাকলাম। ক্রন্দন করলাম। অবশেষে আমার পলায়ন সত্ত্বেও প্রতিপালকের অনুগ্রহ আমার জীবনে যুক্ত হলো। আমার অবাধ্যতা সত্ত্বেও আমার অন্তরকে যেন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হলো। আমি এতদিন যে বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছি, ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে নিয়েছে- সেগুলোর ত্রুটি আমাকে দেখিয়ে দেওয়া হলো।
এভাবে আমি আমার উদাসীনতার রোগ থেকে রক্ষা পেলাম। আমি আমার সেই নির্জন প্রার্থনার মধ্যেই বলতে থাকলাম, হে আমার প্রভু, আমি তো আপনার শুকরিয়া আদায় করে শেষ করতে পারব না। কোন ভাষায় আমি আপনার প্রশংসা আদায় করব? কত বড় রহম আপনি আমার প্রতি করেছেন! আমার উদাসীনতার সময় আপনি আমাকে পাকড়াও করেননি। আপনি আমাকে অজ্ঞতার ঘুম থেকে জাগ্রত করেছেন। আমার অবস্থার সংশোধন করেছেন- আমার স্বভাবের অনিচ্ছা সত্ত্বেও। সকল শুকরিয়া, সকল প্রশংসা আপনারই।
এতদিনের বঞ্চনার কত উত্তম প্রতিদানই না আপনি আমাকে দিয়েছেন, যার প্রতিফলে আমি আপনার নিকট আজ আশ্রয় নিতে সক্ষম হয়েছি। আমার অনাকাঙ্ক্ষিত মেলামেশার বদলে কী সুন্দর সঙ্গ দ্বারাই না আপনি আমার শূন্যতা পূরণ করে দিয়েছেন, যার প্রতিফলে আজ আপনার নিকট এই নির্জন প্রার্থনায় দাঁড়িয়েছি। আমাকে ধনী করেছেন, যেহেতু প্রার্থনার হাত তুলেছি আপনারই কাছে। কত মধুর সান্নিধ্য আজ প্রাপ্ত হয়েছি, যেহেতু আপনি এভাবে লোকদের সঙ্গ থেকে আমাকে মুক্ত করে আপনার দরবারে আশ্রয় দিয়েছেন।
হায়! সেই সময়গুলোর জন্য আফসোস, যেগুলো আপনার ইবাদত ছাড়া নষ্ট হয়েছে। সেই সময়গুলোর জন্য অনুশোচনা, যেগুলো আপনার আনুগত্য ছাড়া অতিবাহিত হয়েছে।
এভাবেই আমার রোগমুক্তি হয়।
আগে যখন ফজরের সময় ঘুম থেকে জাগ্রত হতাম, রাতের দীর্ঘ বিনিদ্রা আমাকে কষ্ট দিত না। যখন দিনটা শেষ হয়ে আসত, দিনের এই অনর্থক নষ্ট হয়ে যাওয়াটা আমাকে উদ্বিগ্ন করত না। অন্তরের তীব্র রোগের কারণেই যে এই অনুভূতিহীনতা, তা তখন বুঝতে পারতাম না। কিন্তু আজ আমার ওপর দিয়ে আমার প্রতিপালকের ক্ষমার প্রভাতী বাতাস অতিবাহিত হয়েছে। তাই আজ এই রাত ও দিনের অনর্থক অতিবাহিত হওয়া আমাকে কষ্ট দেয়। আর এটিই আমার রোগমুক্তির প্রধান আলামত।
হে পরম দয়াময় প্রভু, মহান অনুগ্রহদাতা, আমার প্রতি আপনার ক্ষমাকে পূর্ণ করুন; আমি যেন পরিশুদ্ধ হতে পারি।
হায়, আফসোস সেই মত্ত নেশার, যার দৌরাত্ম্যের ভয়াবহতা শুধু জাগ্রত হওয়ার পরেই অনুভব করা যায়। সে এমনভাবে জীবনের নৌকার পাল ছিন্নভিন্ন করে ছাড়ে, পুনরায় যা মেরামত করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সেই সম্পদের জন্য আফসোস, যা নষ্ট হয়ে গেছে। আফসোস সেই অবিশ্রান্ত শ্রমের উপর, যে মাঝি দীর্ঘক্ষণ উত্তরীয় বায়ুর বিপরীতে জাহাজ টেনে টেনে গন্তব্যে এনেছে, এরপর ঘুমের প্রাবল্যে গিয়েছে ঘুমিয়ে। অবশেষে জাগ্রত হয়ে দেখে, জাহাজ সেই আগের জায়গায় এসে উপনীত হয়েছে।
হায়, আমার এই সতর্কতার কথা যে ব্যক্তি পড়ছ, তুমি তো আমার কথা ও অবস্থা দিয়েই সতর্ক হতে পারছ। তুমি কত সৌভাগ্যবান! কিন্তু আমাকে তো আমার জীবন দিয়ে সতর্কতার শিক্ষা লাভ করতে হয়েছে। সুতরাং হে ভাই, যেখানে ফাসাদের আশঙ্কা রয়েছে, তার থেকে বেঁচে থাকার জন্য কখনো নম্রতা অবলম্বন করো না। এখানে কঠোরই হও। কোমরে রশি বেঁধে দাঁড়িয়ে যাও।
শয়তানের পদ্ধতি হলো, প্রথমে বৈধতাকেই সুশোভন করে উপস্থাপন করে। এরপর আস্তে আস্তে পাখা বিস্তার করে। সুতরাং তোমার গন্তব্যস্থলের দিকে দৃষ্টি রাখো। অবস্থা বুঝে চলো। কিছুতেই সন্দেহজনক বিষয়ের দিকে ধাবিত হয়ো না।
আবার কখনো কখনো শয়তান সমুখে একটি সুন্দর লক্ষ্য দেখাতে থাকে। কিন্তু রাস্তার মধ্যে কোথাও রয়েছে ষড়যন্ত্র- বিশাল ফাঁদ। আমরা আমাদের বাবা হজরত আদম আলাইহিস সালামের সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। শয়তান তাকে বলেছিল,
﴿فَوَسْوَسَ إِلَيْهِ الشَّيْطَانُ قَالَ يَا آدَمُ هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكٍ لَا يَبْلَى)
তারপর শয়তান তার অন্তরে কুমন্ত্রণা দিলো। সে বলল, হে আদম, তোমাকে কি এমন একটা গাছের সন্ধান দেবো, যার দ্বারা অর্জন করা যায় অনন্ত জীবন ও অক্ষয় রাজত্ব? [সুরা তোয়াহা: ১২০]
এখানে হজরত আদম আলাইহিস সালাম চিন্তা করলেন শেষ লক্ষ্য বা গন্তব্যের দিকে। আর তা হলো চিরন্তনতা। এটা তো ভালো। কিন্তু সমস্যা হলো লক্ষ্যে পৌঁছানোর রাস্তার মধ্যে। এটাই হলো ইবলিসের ভালো সুরতে খুবই শক্তিশালী এক ষড়যন্ত্র, যার দ্বারা অনেক আলেমকেও সে ঘায়েল করে ছাড়ে।
কারণ, আলেমরাও অনেক সময় শেষ পরিণাম দিয়ে কোনো জিনিসকে ব্যাখ্যা করে এবং শুরুতেই কিংবা মাঝপথে সমস্যায় আক্রান্ত হয়। যেমন ধরো, 'ইবলিস কোনো আলেমকে বলল, যাও এই জালেমকে ধরো এবং মাজলুমের প্রতিকার করো।'
আলেম উত্তেজিত হয়ে ছুটে গেল জালেমের এলাকায় কিংবা জালেমের দরবারে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর চারপাশের বিভিন্ন হালত, আকর্ষণীয় দৃশ্য ও চেহারা দেখে আলেমের নিজের দ্বীনই যায় যায় অবস্থা। এখন সে আর জালেমের প্রতিকার করবে কী, নিজের নফসই এখন তার ওপর কর্তৃত্ব করে।
কিংবা কখনো সেই প্রতিবাদী আলেম এমন লোকদের সাথে মিলে জুলুম প্রতিরোধ করতে যায়, যারা নিজেরাই আরও বেশি জালেম।
সুতরাং যে ব্যক্তি নিজের দ্বীন ও চারিত্রিক দৃঢ়তার ওপর একশভাগ আস্থাশীল নয়, তার এসকল ফাঁদ ও অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করা উচিত নয়। এই ধরনের দুর্বল চরিত্রের ব্যক্তিদের জন্য বিচ্ছিন্ন থাকাই উত্তম। একাকী নিজের আমল ও কর্ম নিয়ে থাকাই উত্তম। বিশেষ করে এ যুগে, যখন সব জায়গায় ভালোর মৃত্যু ঘটেছে আর খারাবি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।
এ ব্যাপারে একটি মূলনীতি হলো, أنفع نفسي وحدي، خير لي من أن أنفع غيري وأتضرر.
যাতে অন্যের উপকার, নিজের ক্ষতি, তার চেয়ে সেটাই উত্তম, যাতে শুধু নিজের উপকার, অন্যের কোনো ক্ষতি নেই।
সুতরাং অবশ্যই ভ্রান্ত ব্যাখ্যা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। অপছন্দনীয় কাজকর্ম থেকে দূরে থাকতে হবে। এভাবে তুমি যদি শুধু তোমার প্রভুর জন্য একাকী হয়ে যাও তবে তিনিই তোমার জন্য তার মারেফাতের দরজা খুলে দেবেন। তখন সকল কঠিনতাই সহজ হয়ে যাবে। সকল তিক্ততা সুন্দর হবে। সকল কষ্টই সুখে রূপান্তরিত হবে। এবং সকল উদ্দেশ্যই সাধিত হবে।
আল্লাহ তাআলাই সকল কিছুর তাওফিকদাতা। তাঁর সাহায্য ছাড়া আমাদের কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই।
📄 ভ্রান্ত ব্যাখ্যা
আমি একবার আমার জন্য এমন বৈধ কিছু বিষয়ে নরম ব্যাখ্যার কথা চিন্তা করছিলাম, যার মাধ্যমে পার্থিব কিছু সুবিধা অর্জিত হতে পারত।
কিন্তু গভীরভাবে ভেবে দেখলাম, এগুলো পরহেজগারিতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের কলংক। লক্ষ করে দেখেছি, এ ধরনের বিষয়ে প্রথমে দ্বীনের দুগ্ধ বন্ধ হয়। পরিণামে আল্লাহ তাআলার সাথে নির্জন প্রার্থনার মিষ্টতা দূরীভূত হয়। এরপরও যদি কাজটি অব্যাহত থাকে তাহলে তখন দ্বীনের ওলানও কর্তিত হয়ে যায়। তখন আমল-ইবাদত সব বিনষ্ট হয়ে যায় আর ইবাদতের মিষ্টতা তো আগেই হারিয়েছে।
অতএব আমি আমার নফসকে বললাম, এমন কাজের ক্ষেত্রে তোমার দৃষ্টান্ত হবে এমন এক জালেম বাদশাহর মতো, যে অন্যায়ভাবে বহু সম্পদ জমা করেছে। এরপর একদিন তার রাজত্বে আগ্রাসী আক্রমণ হলো। বাদশাহ হলো বন্দি। এতদিন সে যা কিছু জমা করেছিল, সব ছিনিয়ে নেওয়া হলো। এবং যা তার কাছে নেই, সেগুলোর কথা বলে সেগুলোর স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাকে শাস্তি প্রদান করা হতে লাগল।
এ কারণে ভ্রান্ত ব্যাখ্যা থেকে সতর্ক থাকো। আল্লাহ তাআলাকে কখনো ধোঁকা দেওয়া বা প্রতারিত করা সম্ভব নয়। জেনে রেখো, তার নিকট যা রয়েছে, তা তো তার অবাধ্য হয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়।
📄 বিচ্ছিন্নতার ক্ষতগুলো
আমি প্রায়ই আমার নফসের একটি বিষয় খেয়াল করে দেখি- যখন তার চিন্তা পরিশুদ্ধ থাকে কিংবা কোনো বিলুপ্ত জাতি বা এলাকার মাধ্যমে উপদেশ প্রাপ্ত হয় অথবা পূর্ববর্তীদের কবরের নিকট উপনীত হয় তখন তার হিম্মত সকল মানুষ থেকে বিচ্ছিন্নতার আকর্ষণে ছটফট করতে থাকে এবং আল্লাহ তাআলার সাথে নির্জন প্রার্থনার প্রতি ধাবিত হয়।
একদিন যখন নফসের এমন অবস্থার সৃষ্টি হলো, আমি সেদিন তাকে ডেকে বললাম, 'তুমি আমাকে বলো, এভাবে বিচ্ছিন্ন বৈরাগ্যের প্রতি ঝোঁকার দ্বারা তোমার উদ্দেশ্য কী? তোমার চাওয়ার শেষ সীমা কোনটি? তুমি কি চাও আমি নিঃস্ব ফকির হয়ে বসবাস করি, যাতে আমি অভ্যস্ত নই? তুমি কি চাও আমার জামাতের সাথে নামাজ ছুটে যাক? যে ইলম শিখেছি তা বিনষ্ট হয়ে যাক এবং তার ওপর আমল ছুটে যাক? তুমি আসলে কী চাও? আমি কি পানিতে মেশানো নিম্নমানের খাবার খাব, যাতে আমি অভ্যস্ত নই? তাহলে তো আমি দু-দিনেই জীর্ণ ও কাহিল হয়ে পড়ব।
তুমি কি চাও, আমি অমসৃণ খুষ্ক কাপড় পরিধান করে বেড়াব, যা আমাকে পীড়া দেয়? এবং শরীরকে এক অদ্ভুত জামার আস্তরণে ডুবিয়ে নিজেকেই হয়তো প্রশ্ন করে বসব, এ আবার কে?
আর সন্তান কামনার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমি কি সন্তান কামনা করব না, যারা আমার পরে ইবাদত করতে পারবে?
তোমার এ কথাগুলো যদি আমি মেনে চলি তাহলে বুঝতে হবে, জীবনভর আমার অর্জিত ইলম আমাকে কোনো উপকার করতে পারেনি। তোমার কথা শোনলে চলবে না। আমার অনেক কাজ রয়েছে। বরং আমি আমার ইলম দ্বারা বুঝতে পারছি, তোমার এই প্ররোচনাগুলো ভুল ও ভ্রান্ত। জেনে রেখো, শরীর হলো এক জীবন্ত বাহন। আর বাহনকে যদি তার যথার্থ খাদ্য প্রদান না করা হয় তবে সে তার আরোহীকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে না। আর আমি যথার্থ খাদ্য বলতে প্রবৃত্তির সকল চাহিদা পূরণের কথা বলছি না। আমি বলতে চাই, আমি আমার শরীরের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ভালো খাদ্য গ্রহণ করব। এতে আমার শরীর ভালো থাকবে। চিন্তা পরিশুদ্ধ হবে, আকল সুস্থ থাকবে এবং মস্তিষ্ক শক্তিশালী হবে।
তুমি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসে মস্তিষ্কের পরিশুদ্ধির প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি লক্ষ করোনি?
হাদিসে এসেছে,
لا يقضى القاضي بين اثنين وهو غضبان.
বিচারক রাগান্বিত অবস্থায় দুজন বিচারপ্রার্থীর মাঝে বিচার করবে না।
আলেমগণ এ হাদিসের ওপর কিয়াস করে বলেছেন, বিচারক ক্ষুধা, প্রস্রাবের বেগ কিংবা মনের ওপর বিরূপ প্রভাব বিস্তারকারী কোনো অবস্থা নিয়ে বিচারের ফয়সালা দেবে না।
একটি সুস্থ সুন্দর বিশ্বাস, চিন্তা ও মেজাজের জন্য শারীরিক সুস্থতারও প্রয়োজন রয়েছে। তাই ভালো থাকা আর ভালো খাওয়া থেকে দূরে থাকার মধ্যে কোনো উপকারিতা নেই।
হ্যাঁ, মন্দ থেকে দূরে থাকা হবে; কল্যাণ থেকে নয়। আর এভাবে মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার মধ্যে যদি কোনো কল্যাণ থাকত তাহলে অবশ্যই এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিদের থেকে কোনো বর্ণনা থাকত।
আমি কিছু লোকের কথা জানি, অব্যাহত কম খাওয়ার কারণে এবং শুধু শুকনো খাবার খাওয়ার কারণে যাদের শরীর জীর্ণ হয়ে গেছে, চিন্তা পরিবর্তন হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে চিন্তার বিভ্রান্তি বেড়ে গেলে মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নির্জনে বসবাস শুরু করেছে। এদের মধ্যে কারও মধ্যে পাগলামির ভাব এসে পড়েছে। হয়তো একদিন.. দুইদিন... তিনদিন কিছু খায়নি। ভাবতে থাকে, এভাবে থাকতে পারা বুঝি অলৌকিক শক্তির প্রকাশ। কিন্তু এভাবে দিন যেতে যেতে বদহজম সৃষ্টি হয়েছে। পেট খারাপ হয়েছে। শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। চিন্তার বিভ্রান্তি আরও বেড়ে চলেছে। অবশেষে অতি দুর্বলতার কারণে চোখে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রম শুরু হয়েছে। আর এটাকেই মনে করতে শুরু করেছে, এই বুঝি আলোর ফেরেশতাদের আগমন।
মানুষ ইলম দিয়েই আল্লাহকে চেনে। মানুষ আকল দিয়েই আল্লাহকে বোঝে। এ কারণে আকলের আলোকে কিছুতেই নিভিয়ে দেওয়া উচিত নয়। ইলমের ধারকে কমিয়ে ফেলতে পারে-এমন কাজ করাও উচিত নয়। এই ইলম ও আকলকে যখন রক্ষা করা হবে, তখন এ দুটিই যুগের কর্তব্যগুলোকে রক্ষা করবে। কষ্টকে লাঘব করবে। কল্যাণকর জিনিসকে আনয়ন করবে। একই সঙ্গে খাদ্য-খাবার, চলাফেরা ইবাদাত-বন্দেগি ও পরহেজগারিও অক্ষুণ্ণ থাকবে।
নফস আমাকে বলল, তাহলে আমার জন্য একটি নির্ধারিত ওজিফা নির্দিষ্ট করে দাও। একজন রোগীর মতো আমাকেও একটি ব্যবস্থাপত্র লিখে দাও।
আমি বললাম, আমি এতক্ষণ যে ইলমের কথা বললাম, সেটাই হলো তোমার সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষক ও চিকিৎসক। প্রত্যেক মুহূর্তে সব ধরনের অসুখের চিকিৎসাও সে দিতে সক্ষম। ইলমই হলো তোমার 'ওজিফা'।
মোটকথা, তুমি তোমার সর্বক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করে চলবে—তোমার কথাবার্তায় চাল-চলনে, দর্শনে, খাদ্য-খাবারে। আর যা কল্যাণকর, সেদিকেই শুধু ধাবিত হবে। যা ক্ষতিকর, তা থেকে বিরত থাকবে। এবং প্রতিটি কাজ করার আগে নিয়তকে শুদ্ধ ও সুদৃঢ় করে নেবে।
আর বেশি চঞ্চলতা ও লঘুকথা বর্জন করবে। এগুলো মূর্খতার প্রকাশ; ইলমের নয়। অনর্থক কথাবার্তা বর্জন করবে—অমুক এটা খায়, তমুক সেটা করে। অমুক রাতে ঘুমায় না। তমুক খুব চালাক। এ ধরনের অনর্থক কথা ও গিবত বর্জন করে চলবে।
যা তুমি বহনে সক্ষম, সে রকম জিনিসই কেবল বহন করবে। শরীরে সাধ্যের বাইরে কিছু চাপাবে না। তুমি নিজেও লক্ষ করেছ—কোনো চতুষ্পদ জন্তু কোনো খাল বা ঝরনা পার হতে গেলে কিংবা পানি পান করতে গেলে, তুমি যদি লাফ দেওয়ার জন্য তাকে প্রহারও করো, তবুও সে লাফ দেবে না— যতক্ষণ না সে নিজের কাছে নিজে পরিমাণটা মেপে নিচ্ছে। সে যদি বোঝে— এখানে তার লাফ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে, তাহলেই শুধু সে লাফ দেবে। আর যদি বোঝে—সেই ক্ষমতা তার নেই, তবে তুমি যদি পিটিয়ে মেরেও ফেলো, তবুও সে লাফ দেবে না।
জেনে রেখো, সকল শরীরই সমান ক্ষমতা রাখে না। কিছু কিছু মানুষ তাদের অজ্ঞতার কারণে যৌবনে এমন কঠিন কঠিন কাজ করে, ভারি ভারি জিনিস বহন করে, যার কারণে তারা দ্রুতই অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে আর কোনো ভালো কাজ করতেও সক্ষম হয় না। এগুলোর কারণে তাদের অন্তরও বিষিয়ে ওঠে।
আবারও বলি, তুমি সব সময় ইলমের সাথে চলবে। এটিই তোমার সকল রোগের ওষুধ। আল্লাহ হলেন একমাত্র তাওফিকদাতা।
📄 সাদৃশ্যপূর্ণ জিনিস থেকে বেঁচে থাকা
এমন লোকদের বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করি, যারা ইলমের দাবি করে, অথচ হাদিসগুলোকে তার বাহ্যিক অর্থের ওপর ধরে সাদৃশ্য নিরূপণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু হাদিসে কথাগুলো যেভাবে এসেছে, ঠিক সেভাবেই যদি ধরে নিত, তাহলে তারা নিরাপদ থাকতে পারত। কারণ, যে ব্যক্তি এগুলোকে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেভাবেই রেখেছে এবং সেভাবেই এর অর্থ করেছে, তার ব্যাপারে আর কোনো অভিযোগ থাকে না। সে তো অন্যকিছু সাব্যস্ত করছে না। যা আছে, তাকে রহিতও করছে না।
এ কারণে যে ব্যক্তি কোরআন ও হাদিস পড়ে এবং সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়ে বাড়তি কিছু বলে না, তাকে আমি নিন্দা করি না। এটিই ছিল আমাদের 'সালাফে সালেহীন'-এর পথ ও পদ্ধতি। কিন্তু যে ব্যক্তি এগুলোর ক্ষেত্রে বলে, 'হাদিসটার চাহিদা এমন, এটিকে এই অর্থে ধরতে হবে-যেমন, আল্লাহ তাআলার আরশে 'ইসতিওয়া' নিয়ে কেউ বলল, استوى على العرش بذاته -তিনি আরশে নিজ সত্তায় সমাসীন হয়েছেন। কিংবা এমন বলল যে, ينزل إلى السماء الدنيا بذاته -তিনি দুনিয়ার আসমানে নিজ সত্তায় অবতরণ করেন- এভাবে অতিরিক্ত অর্থ লাগিয়ে বলা উচিত হয় কীভাবে? এটা তো নিজের অনুভব উপলব্ধি থেকে বলা হলো। এর পেছনে কোনো বর্ণিত দলিল-প্রমাণ নেই।
সত্যের সন্ধানে যারা আগ্রহী, তাদের জন্য বলি, আমাদের কাছে 'আকল' এবং 'নকল' দুটি মাধ্যমেই দুটি মৌলিক প্রমাণ রয়েছে, হাদিসের সকল বর্ণনা সেই ভিত্তিতে গ্রহণ করলেই আর কোনো সমস্যা থাকে না। নকল বা বর্ণিত প্রমাণ, যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী- তিনি বলেন,
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ
তার মতো কিছু নেই। [সুরা শুরা: ১১]
আর আকল বা বুদ্ধি-বিবেক দ্বারা আমরা জেনেছি যে, স্রষ্টা কিছুতেই তার সৃষ্টির মতো নয়। সৃষ্টি ধ্বংসশীল। আর স্রষ্টা চিরঞ্জীব। সৃষ্টির ধ্বংসশীলতার প্রমাণ হলো, তার মাঝে পরিবর্তন আসে।
তাই কীভাবে আমরা চিরঞ্জীব সত্তার সাথে তার সৃষ্টবস্তুর সাদৃশ্য করতে পারি! জগতের কিছুই তার মতো নয়, তিনিও কারও মতো নন। তিনি যেমন, ঠিক তেমনই- যেমনটা কোরআনে বর্ণিত হয়েছে।