📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 বস্তুসমূহের মৌলিকতা

📄 বস্তুসমূহের মৌলিকতা


অনেক সাধারণ মানুষকে এবং কিছু আলেমকে বস্তুসমূহের মৌলিকতা নিয়ে সীমাহীন তর্ক-বিতর্ক করতে দেখি। অথচ এগুলো এমন ইলম—যার বাস্তবতা নিয়ে সাধারণভাবে আলোচনা করা চলে না। যেমন, রুহ। আল্লাহ তাআলা এর বিষয় গোপন রেখে বলেছেন,
(قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي)

আপনি বলুন, রুহ আমার প্রতিপালকের আদেশমাত্র। [সুরা ইসরা: ৮৫]

কিন্তু আল্লাহ তাআলার এই সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় তারা সন্তুষ্ট নয়। তারা রুহের গঠন-প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করতে থাকে। তর্ক-বিতর্ক করে। কিন্তু কোনো সমাধানে আসতে পারে না। যা দাবি করে, তার পক্ষে কোনো প্রমাণ আনতে পারে না।

আরেকটি আলোচনার বিষয় হলো ‘আকল’ বা বিবেক। রুহ যেমন আছে, নিঃ সন্দেহ আকলও আছে। দুটিকেই চেনা যায় তাদের কর্ম ও প্রভাব দেখে; চাক্ষুষ সত্তা দেখে চেনা যায় না। দেখার উপায়ও নেই।

এখন কেউ যদি বলে বসে তবে এগুলো গোপন রাখার মধ্যে কী রহস্য লুকিয়ে আছে?

উত্তরে আমি বলি, রুহ বা আত্মা প্রতিমুহূর্তে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তিত হয়। তুমি যদি এগুলোর রহস্য জেনে যাও তবে তার স্রষ্টার প্রকৃতিও কিছুটা জানা হয়ে যাবে। সুতরাং অন্যদের নিকট তিনি এটি গোপন রেখেছেন। এটি তার মর্যাদাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। কারণ, সৃষ্টির সাধারণ স্বভাব হলো, যখন সে কোনো জিনিসের সম্পূর্ণটা না জানে, সেটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় ও মহান মনে হয়। আর কোনো জিনিসের পূর্ণ রহস্য জানা হয়ে গেলে তা তার কাছে আকর্ষণহীন তুচ্ছ বিষয়ে পরিণত হয়।

আবার কেউ যদি বলেন, বজ্র, বিদ্যুৎ, ভূমিকম্প- এগুলো কী?

তার উত্তরে আমরা বলব, এগুলো খুবই অশান্ত ও গতিশীল কিছু জিনিস। এর মধ্যে যে রহস্য, আল্লাহ তাআলাই তা ভালো জানেন। তবে কখনো যদি এগুলোর বাস্তবতা প্রকাশিত হয় তবুও তা আল্লাহর বড়ত্ব ও ক্ষমতার পরিচয়। আরও বাড়িয়ে দেবে। এগুলো যেহেতু তারই সৃষ্টি, তাই অনর্থক তর্ক-বিতর্ক না করে এগুলোর আসল রহস্য উদ্ঘাটনের প্রমাণ প্রাপ্তি পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা উচিত।

রিসালাত বা নবীদের সত্যতা নিয়েও তর্ক-বিতর্ক করা হয়। অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুলদের পাঠানোর সম্ভাব্যতা নিয়ে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।

এরপর আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলি নিয়ে বিভিন্ন তর্কের আসর জমানো হয়। এসকল সিফাতের কথা আমরা বিভিন্ন আসমানি কিতাব ও রাসুলদের বর্ণনা থেকে জানতে পেরেছি। কিন্তু বিস্তারিত নয়। কিন্তু মানুষ নিজেদের বিচিত্র মত অনুযায়ী তার গুণাবলি নিয়ে আলোচনা করে। অথচ এগুলো আলোচনার দায়িত্ব তো কাউকে দেওয়া হয়নি। সুতরাং যারা মূর্খতার সাথে এগুলোর অনুচিত আলোচনা করে, এর ক্ষতি ও ভয়াবহতা তাদের ওপরই বর্তাবে।

যেমন, আমরা যখন বলি, তিনি মাওজুদ বা অবস্থিত এবং আমরা তার কালাম থেকেই জেনেছি যে তিনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বদ্রষ্টা। জীবন্ত। সক্ষম। তাঁর গুণাবলির পরিচয়ের ক্ষেত্রে এতটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আমরা এর বেশি কিছু নিয়ে আলোচনায় মগ্ন হতে চাই না।

এভাবে আমরা যখন বলি, তিনি মুতাকাল্লিম, কোরআন তাঁর কালাম বা বাণী। এর বেশি কিছু বলা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নয়। আমাদের সালাফে সালেহীন এর বেশি কিছু বলেননি, تلاوة ومتلو এবং قراءة و مقروء —এসব কথা তারা বলেননি। এবং তারা বলেননি, استوى على العرش بذاته —তারা এ কথাও বলেননি, ينزل بذاته । বরং কোরআনে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, ঠিক সেভাবেই তারা বলেছেন। এর থেকে কিছু বৃদ্ধি করে বলেননি।

উদাহরণ হিসেবে সংক্ষেপে এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হলো। এর সাথে আল্লাহ তাআলার অন্য গুণাবলির কথা কিয়াস করে নাও। তাহলেই তুমি বাড়াবাড়ির বিপদ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। সাদৃশ্য প্রদানের খারাবি থেকে দূরে থাকতে পারবে। এই বাড়াবাড়ির যুগে এটাই বা কম কী!

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মূর্খেরও কিছু উপকার রয়েছে

📄 মূর্খেরও কিছু উপকার রয়েছে


আমি দেখি, পৃথিবী-ভরতি অসংখ্য মানুষ। কত দেশ পরিবার ও সন্তানাদি। মুসলিম এবং অমুসলিম। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে মানুষের অধিকাংশের অস্তিত্বই না থাকার মতো। এদের মধ্যে কেউ তো স্রষ্টাকেই চেনে না। কেউ আবার স্রষ্টাকে নিজের ইচ্ছেমতো একটি আকার-আকৃতি ও ক্ষমতা দিয়ে নিজের মতো গড়ে নিয়েছে। কেউ শিরিক করছে। কেউ অস্বীকার করছে। কেউ আবার নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কেও খবর রাখে না। কত যে তাদের ধরন!

আবার মুসলমানদের মধ্যে দেখতে পাবে- লোক দেখানো কিছু সুফি-পির অব্যাহত কিয়াম-সুজুদ করে যাচ্ছে। প্রবৃত্তির সকল চাহিদা বর্জন করছে। এর মাধ্যমে প্রসিদ্ধি লাভের যে প্রবৃত্তির সৃষ্টি হচ্ছে, তাকে ভুলে থাকছে। হাতে হাতে চুমো খাচ্ছে।

কিন্তু কেউ যখন তাদের এই দোষের কথা বলতে যাচ্ছে, তাকে বলে উঠছে, أ لمثلي يقال هذا؟—আমার ক্ষেত্রে কি এ কথা খাটে? ومن فلان الفاسق কান ফাসেক আমার ক্ষেত্রে এমন কথা বলে?

এরা মূলত দ্বীনের আসল উদ্দেশ্যটিই বোঝে না। এভাবে অনেক আলেমও অন্যদের অবজ্ঞার চোখে দেখে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এবং নিজেদের ব্যাপারে অহংকারে লিপ্ত হয়।

আমি আশ্চর্য হই, কীভাবে এসকল মানুষ সত্যের অনুসারী হবে এবং জান্নাতের অধিবাসী হবে!

পরে ভেবে দেখলাম, দুনিয়াতে সব ধরনের মানুষেরই প্রয়োজন রয়েছে। এবং আখেরাতের ক্ষেত্রেও তা-ই। দুনিয়াতে প্রয়োজনীয়তার কারণ, যারা আরেফ বিল্লাহ, অভিজ্ঞ আলেম-তারা অন্যদের নিকট আল্লাহ তাআলার নিয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেন। দ্বীনের কথা শোনান। দ্বীনের যে বিষয়গুলো তাদের নিকট অস্পষ্ট ছিল, সেগুলো জানিয়ে দেন। ঈমান ও আমলের কথা বলেন। এভাবে সকল মানুষের অস্তিত্বই পৃথিবীতে অর্থময় হয়ে ওঠে।

সব জায়গাতেই মানুষের অবস্থানের মধ্যে একটি তারতম্য রয়েছে। যারা ইবাদতের শুধু বাহ্যিকতা নিয়ে চলে, আরেফগণ তাদের সাথে মেলামেশার মাধ্যমে সময় নষ্ট করেন না। আর জাহেদগণ থাকেন নিজেদের ইবাদতে ব্যস্ত। আর আলেমগণ হলেন বাচ্চাদের তারবিয়াতকারীদের মতো। সাধারণ মানুষদের হেদায়াতের পথ দেখানোই তাদের কাজ। আর আরেফগণ হলেন হিকমত বিতরণকারীদের মতো। আল্লাহ যদি চান, চেষ্টা-সাধনার মাধ্যমে যে-কেউ ‘আরেফ বিল্লাহ’ হতে সক্ষম।

মানুষের মাঝে এত তারতম্যের পেছনে হিকমত কী?

আমার মনে হয়- যেমন, কোনো সম্রাট বা বাদশাহর পাশ ঘেঁষে যদি কিছু সভাসদ না থাকে, সৈনিক ও বাহিনী না থাকে, জৌলুস না থাকে তবে তার বিলাসিতা পূর্ণতা পায় না। ঠিক এভাবেই জান্নাতে ‘আরেফ’ ব্যক্তিদের বিলাস-ব্যসন পূর্ণ করার জন্য অন্য মানুষগুলোকে তাদের অবস্থার তারতম্য অনুযায়ী ব্যবহার করা হবে।

কেউ যখন আরেফের যোগ্যতায় পৌঁছে যায় তখন তার সকল প্রতিবন্ধকতা উঠিয়ে নেওয়া হয়। তখন তার আমল হবে সর্বোচ্চ পরিমাণ পরিশুদ্ধ। আর কেউ যদি সে পর্যন্ত পৌঁছুতে না পারে, তবে সে দুনিয়াতে অবস্থান করবে আরবি কথাবার্তায় অনেক সময় অতিরিক্ত হিসেবে ব্যবহৃত ১ শব্দটির মতো। শব্দটি অতিরিক্ত। তা পূর্বেরটিকে সুদৃঢ় করে।

এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে বসে, ধরো, এটা না-হয় দুনিয়ার জন্য হলো, কিন্তু জান্নাতে এটার ধরন কেমন হবে?

উত্তর: দুনিয়াতে আমরা কী দেখি? প্রতিবেশীর সঙ্গ সব সময়ই একটি কাম্য জিনিস। কারণ, অপূর্ণ ব্যক্তিদের দর্শন পূর্ণ ব্যক্তিদের সুখ ও তৃপ্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। জান্নাতেও তা-ই হবে। তবে প্রত্যেকের জন্যই তাদের মর্যাদানুপাতে একটি প্রাপ্য থাকবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা তাদের এই অপূর্ণতার বিষয়ে জানতে পারবে না। তাই তারা কোনো দুঃখ বা কষ্টও পাবে না।

এ কথাগুলো দিয়ে আমি মানুষের বিশেষ কিছু অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করেছি, কেউ যদি গভীরভাবে চিন্তা করে তবে সে আমার ইশারা বুঝতে সক্ষম হবে। বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখি না।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 একক আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া

📄 একক আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া


আমি আমার রিজিকের ক্ষেত্রে স্রষ্টার পরিচালনার বিষয় নিয়ে চিন্তা করলাম। যেমন, মেঘমালাকে ভাসিয়ে আনা। বৃষ্টি বর্ষানো। আর যে বীজ রয়েছে জমিনের মধ্যে বপিত। একেবারে মৃতের মতো। পচে গলে গেছে। অপেক্ষায় রয়েছে জীবনের শিঙায় একটি উষ্ণ ফুঁৎকারের। এবং সেই জীবন-পানি যখন তাতে স্পর্শিত হয়, তখন সেটা সবুজ হয়ে মাথা তোলে। পানিহীন হয়ে পড়লে, প্রার্থনায় দু-পাতার দু-হাত বাড়িয়ে অনুনয়-বিনয় করে। বিনয়ে মাথা নত করে দেয়। বিবর্ণ হয়ে যায়। এখন সে আমার মতো মুহতাজ। তারও সূর্যের উষ্ণতা প্রয়োজন। পানির আদ্রতা প্রয়োজন। মৃদুমন্দ বাতাস প্রয়োজন। আমারও যেমন প্রয়োজন।

মাটির আদরে লালিত-পালিত এই যে বীজটির বেড়ে ওঠা-যা আল্লাহ তাআলা আমাকে দেখালেন-আমার লালিতপালিত হওয়াটাও তো এমনই। এমনকি আমার অসহায়ত্ব ছিল আরও কত বেশি! আরও কত দীর্ঘ!

সুতরাং হে নফস, আজ কিছু এদিক-সেদিক চোখ ফিরিয়ে জ্ঞান শিখে অন্য মাখলুকের দিকে ধাবিত হও, এটা তোমার জন্য কত বড় নিকৃষ্ট কাজ! এছাড়া তুমি কীভাবে সেই সৃষ্টিজীবের কাছে তোমার প্রার্থনার হাত বাড়াও, যে ঠিক তোমার মতোই অক্ষম ও মুহতাজ। তোমার মতোই তারও প্রয়োজন রয়েছে, প্রার্থনায় নত হওয়ার দরকার রয়েছে!

হে বিহঙ্গ আমার, তুমি অচিরেই তোমার প্রথম ও একমাত্র পালনকর্তার কাছে ফিরে এসো। বিনয় অবনত হয়ে প্রধান দাতার কাছে তোমার প্রার্থনার কথা বলো।

তুমি যদি তাকে যথার্থভাবে চিনতে পারো, এটা তোমার জন্যই হবে কল্যাণকর। জেনে রেখো, তাকে চিনতে পারা মানেই দুনিয়া ও আখেরাতের রাজত্ব পাওয়া। এটাই তোমাকে সফলতার সবকিছু এনে দেবে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 আঁধারাবিদ অন্তরের গল্প

📄 আঁধারাবিদ অন্তরের গল্প


আমি আমার তারুণ্যের সূচনাকালে মোজাহাদার পথ অনুসরণের দিকে ধাবিত হয়েছিলাম। দীর্ঘ রোজা ও নামাজে অভ্যস্ত ছিলাম। নির্জনতা ছিল আমার কাছে খুবই প্রিয়। তখন আমার মধ্যে একটি পূত-পবিত্র অন্তরের উপস্থিতি অনুভব করতাম। আমার দূরদর্শিতার চোখ প্রান্ত ছাড়িয়ে দূর-বহুদূরে স্থান করে নিত। আমি যেন আখেরাত দেখতে পেতাম। যে সময়টুকু আনুগত্য ছাড়া অতিবাহিত হতো, তার জন্য আফসোস করতাম। আনুগত্যের গনিমতের আশায় সর্বক্ষণ ব্যাকুল হয়ে থাকতাম। আল্লাহর সাথে কেমন যেন একপ্রকার প্রীতি অনুভব করতাম এবং তার নিকট নির্জন মোনাজাতে এক অপার্থিব মিষ্টতা অনুভব করতাম।

কিন্তু একদিন এর সবকিছুর অবসান ঘটল। সব হারিয়ে ফেললাম। আর এই মহা সর্বনাশের সূচনা হলো এইভাবে—

প্রশাসনের কিছু লোকের নিকট আমার কথা-বক্তব্য ভালো লাগল। বহু চেষ্টা-তদবির করে আমাকেও প্রশাসনের কিছু কাজে তাদের সাথে যুক্ত করে নিল। ভালো মনে করে আমিও যুক্ত হলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে আমার স্বভাব-মেজাজও সেদিকে ঝুঁকতে থাকল। ব্যস্ত হতে থাকলাম এবং একসময় অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, আমি আমার আগের সেই নির্জনতার মিষ্টতা হারিয়ে ফেলেছি।

শুধু তা-ই নয়; ঘটনা আরও ভয়াবহতার দিকে এগোতে থাকল। খাবারে হারামের সন্দেহের কারণে প্রথমে তো তাদের সাথে মেলামেশা ও একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া থেকে বেঁচে থাকতাম। কিন্তু আস্তে আমার অবস্থাও তাদের নিকটবর্তী হতে থাকল। হৃদ্যতা বাড়তে থাকল। মেলামেশাও বাড়তে থাকল। অনাকাঙ্ক্ষিত বিভিন্ন পরিস্থিতি সামনে আসতে থাকল।

নিজেকে রক্ষা করার জন্য এ অবস্থায় কী করা যায়, তা-ই চিন্তা করতে লাগলাম। অবশেষে নিজের থেকেই একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ফেললাম। যেগুলো বৈধ, বেছে বেছে আমি শুধু সেগুলোর দিকে হাত বাড়ালাম। অন্য বিষয় ও সঙ্গ এড়িয়ে যেতে লাগলাম। কিন্তু কোনো ফল হলো না। আমার মনের মধ্যে আগে যেই উজ্জ্বলতা ও প্রশান্তি ছিল, তা সব কোথায় উধাও হয়ে গেল। অবশেষে এই মেলামেশা আমার অন্তরের মধ্যে অন্ধকারের সৃষ্টি করতে লাগল এবং একসময় আমার অন্তর পুরোপুরি আলোশূন্য অন্ধকারে পরিণত হলো।

আগের সেই শান্তি, স্বস্তি ও মিষ্টতা থেকে বঞ্চিত তো হলামই, সেই সাথে হৃদয়ের আলো হারানোর কারণে ইসলাহি মজলিসগুলোর ক্ষেত্রে আমি বিরক্ত ও অনাগ্রহী হয়ে উঠতে থাকলাম। অন্যদের সাথে যদিও আমি বিভিন্ন মজলিসে যেতাম; কিন্তু অবস্থার উন্নতি হতো না। লোকজন তাওবা করে। ক্রন্দন করে। নিজেদের সংশোধন করে। কিন্তু আমার অবস্থার কোনো পরিবর্তন হতো না। যেন আমার সাথে এগুলোর কোনো সংযোগ-সম্পর্কই নেই।

এভাবে আমার রোগের দৌরাত্ম্য বাড়তেই থাকল। আমি আমার অন্তরের চিকিৎসার ব্যাপারে অক্ষম হয়ে পড়লাম। পরিশেষে একদিন বুজুর্গদের কবরস্থানে গমন করলাম। সেখানকার নির্জনতায় দীর্ঘক্ষণ আমার পরিশুদ্ধি নিয়ে দুআ করতে থাকলাম। ক্রন্দন করলাম। অবশেষে আমার পলায়ন সত্ত্বেও প্রতিপালকের অনুগ্রহ আমার জীবনে যুক্ত হলো। আমার অবাধ্যতা সত্ত্বেও আমার অন্তরকে যেন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হলো। আমি এতদিন যে বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছি, ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে নিয়েছে- সেগুলোর ত্রুটি আমাকে দেখিয়ে দেওয়া হলো।

এভাবে আমি আমার উদাসীনতার রোগ থেকে রক্ষা পেলাম। আমি আমার সেই নির্জন প্রার্থনার মধ্যেই বলতে থাকলাম, হে আমার প্রভু, আমি তো আপনার শুকরিয়া আদায় করে শেষ করতে পারব না। কোন ভাষায় আমি আপনার প্রশংসা আদায় করব? কত বড় রহম আপনি আমার প্রতি করেছেন! আমার উদাসীনতার সময় আপনি আমাকে পাকড়াও করেননি। আপনি আমাকে অজ্ঞতার ঘুম থেকে জাগ্রত করেছেন। আমার অবস্থার সংশোধন করেছেন- আমার স্বভাবের অনিচ্ছা সত্ত্বেও। সকল শুকরিয়া, সকল প্রশংসা আপনারই।

এতদিনের বঞ্চনার কত উত্তম প্রতিদানই না আপনি আমাকে দিয়েছেন, যার প্রতিফলে আমি আপনার নিকট আজ আশ্রয় নিতে সক্ষম হয়েছি। আমার অনাকাঙ্ক্ষিত মেলামেশার বদলে কী সুন্দর সঙ্গ দ্বারাই না আপনি আমার শূন্যতা পূরণ করে দিয়েছেন, যার প্রতিফলে আজ আপনার নিকট এই নির্জন প্রার্থনায় দাঁড়িয়েছি। আমাকে ধনী করেছেন, যেহেতু প্রার্থনার হাত তুলেছি আপনারই কাছে। কত মধুর সান্নিধ্য আজ প্রাপ্ত হয়েছি, যেহেতু আপনি এভাবে লোকদের সঙ্গ থেকে আমাকে মুক্ত করে আপনার দরবারে আশ্রয় দিয়েছেন।

হায়! সেই সময়গুলোর জন্য আফসোস, যেগুলো আপনার ইবাদত ছাড়া নষ্ট হয়েছে। সেই সময়গুলোর জন্য অনুশোচনা, যেগুলো আপনার আনুগত্য ছাড়া অতিবাহিত হয়েছে।

এভাবেই আমার রোগমুক্তি হয়।

আগে যখন ফজরের সময় ঘুম থেকে জাগ্রত হতাম, রাতের দীর্ঘ বিনিদ্রা আমাকে কষ্ট দিত না। যখন দিনটা শেষ হয়ে আসত, দিনের এই অনর্থক নষ্ট হয়ে যাওয়াটা আমাকে উদ্বিগ্ন করত না। অন্তরের তীব্র রোগের কারণেই যে এই অনুভূতিহীনতা, তা তখন বুঝতে পারতাম না। কিন্তু আজ আমার ওপর দিয়ে আমার প্রতিপালকের ক্ষমার প্রভাতী বাতাস অতিবাহিত হয়েছে। তাই আজ এই রাত ও দিনের অনর্থক অতিবাহিত হওয়া আমাকে কষ্ট দেয়। আর এটিই আমার রোগমুক্তির প্রধান আলামত।

হে পরম দয়াময় প্রভু, মহান অনুগ্রহদাতা, আমার প্রতি আপনার ক্ষমাকে পূর্ণ করুন; আমি যেন পরিশুদ্ধ হতে পারি।

হায়, আফসোস সেই মত্ত নেশার, যার দৌরাত্ম্যের ভয়াবহতা শুধু জাগ্রত হওয়ার পরেই অনুভব করা যায়। সে এমনভাবে জীবনের নৌকার পাল ছিন্নভিন্ন করে ছাড়ে, পুনরায় যা মেরামত করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সেই সম্পদের জন্য আফসোস, যা নষ্ট হয়ে গেছে। আফসোস সেই অবিশ্রান্ত শ্রমের উপর, যে মাঝি দীর্ঘক্ষণ উত্তরীয় বায়ুর বিপরীতে জাহাজ টেনে টেনে গন্তব্যে এনেছে, এরপর ঘুমের প্রাবল্যে গিয়েছে ঘুমিয়ে। অবশেষে জাগ্রত হয়ে দেখে, জাহাজ সেই আগের জায়গায় এসে উপনীত হয়েছে।

হায়, আমার এই সতর্কতার কথা যে ব্যক্তি পড়ছ, তুমি তো আমার কথা ও অবস্থা দিয়েই সতর্ক হতে পারছ। তুমি কত সৌভাগ্যবান! কিন্তু আমাকে তো আমার জীবন দিয়ে সতর্কতার শিক্ষা লাভ করতে হয়েছে। সুতরাং হে ভাই, যেখানে ফাসাদের আশঙ্কা রয়েছে, তার থেকে বেঁচে থাকার জন্য কখনো নম্রতা অবলম্বন করো না। এখানে কঠোরই হও। কোমরে রশি বেঁধে দাঁড়িয়ে যাও।

শয়তানের পদ্ধতি হলো, প্রথমে বৈধতাকেই সুশোভন করে উপস্থাপন করে। এরপর আস্তে আস্তে পাখা বিস্তার করে। সুতরাং তোমার গন্তব্যস্থলের দিকে দৃষ্টি রাখো। অবস্থা বুঝে চলো। কিছুতেই সন্দেহজনক বিষয়ের দিকে ধাবিত হয়ো না।

আবার কখনো কখনো শয়তান সমুখে একটি সুন্দর লক্ষ্য দেখাতে থাকে। কিন্তু রাস্তার মধ্যে কোথাও রয়েছে ষড়যন্ত্র- বিশাল ফাঁদ। আমরা আমাদের বাবা হজরত আদম আলাইহিস সালামের সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। শয়তান তাকে বলেছিল,
﴿فَوَسْوَسَ إِلَيْهِ الشَّيْطَانُ قَالَ يَا آدَمُ هَلْ أَدُلُّكَ عَلَى شَجَرَةِ الْخُلْدِ وَمُلْكٍ لَا يَبْلَى)

তারপর শয়তান তার অন্তরে কুমন্ত্রণা দিলো। সে বলল, হে আদম, তোমাকে কি এমন একটা গাছের সন্ধান দেবো, যার দ্বারা অর্জন করা যায় অনন্ত জীবন ও অক্ষয় রাজত্ব? [সুরা তোয়াহা: ১২০]

এখানে হজরত আদম আলাইহিস সালাম চিন্তা করলেন শেষ লক্ষ্য বা গন্তব্যের দিকে। আর তা হলো চিরন্তনতা। এটা তো ভালো। কিন্তু সমস্যা হলো লক্ষ্যে পৌঁছানোর রাস্তার মধ্যে। এটাই হলো ইবলিসের ভালো সুরতে খুবই শক্তিশালী এক ষড়যন্ত্র, যার দ্বারা অনেক আলেমকেও সে ঘায়েল করে ছাড়ে।

কারণ, আলেমরাও অনেক সময় শেষ পরিণাম দিয়ে কোনো জিনিসকে ব্যাখ্যা করে এবং শুরুতেই কিংবা মাঝপথে সমস্যায় আক্রান্ত হয়। যেমন ধরো, 'ইবলিস কোনো আলেমকে বলল, যাও এই জালেমকে ধরো এবং মাজলুমের প্রতিকার করো।'

আলেম উত্তেজিত হয়ে ছুটে গেল জালেমের এলাকায় কিংবা জালেমের দরবারে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর চারপাশের বিভিন্ন হালত, আকর্ষণীয় দৃশ্য ও চেহারা দেখে আলেমের নিজের দ্বীনই যায় যায় অবস্থা। এখন সে আর জালেমের প্রতিকার করবে কী, নিজের নফসই এখন তার ওপর কর্তৃত্ব করে।

কিংবা কখনো সেই প্রতিবাদী আলেম এমন লোকদের সাথে মিলে জুলুম প্রতিরোধ করতে যায়, যারা নিজেরাই আরও বেশি জালেম।

সুতরাং যে ব্যক্তি নিজের দ্বীন ও চারিত্রিক দৃঢ়তার ওপর একশভাগ আস্থাশীল নয়, তার এসকল ফাঁদ ও অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করা উচিত নয়। এই ধরনের দুর্বল চরিত্রের ব্যক্তিদের জন্য বিচ্ছিন্ন থাকাই উত্তম। একাকী নিজের আমল ও কর্ম নিয়ে থাকাই উত্তম। বিশেষ করে এ যুগে, যখন সব জায়গায় ভালোর মৃত্যু ঘটেছে আর খারাবি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।

এ ব্যাপারে একটি মূলনীতি হলো, أنفع نفسي وحدي، خير لي من أن أنفع غيري وأتضرر.

যাতে অন্যের উপকার, নিজের ক্ষতি, তার চেয়ে সেটাই উত্তম, যাতে শুধু নিজের উপকার, অন্যের কোনো ক্ষতি নেই।

সুতরাং অবশ্যই ভ্রান্ত ব্যাখ্যা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। অপছন্দনীয় কাজকর্ম থেকে দূরে থাকতে হবে। এভাবে তুমি যদি শুধু তোমার প্রভুর জন্য একাকী হয়ে যাও তবে তিনিই তোমার জন্য তার মারেফাতের দরজা খুলে দেবেন। তখন সকল কঠিনতাই সহজ হয়ে যাবে। সকল তিক্ততা সুন্দর হবে। সকল কষ্টই সুখে রূপান্তরিত হবে। এবং সকল উদ্দেশ্যই সাধিত হবে।

আল্লাহ তাআলাই সকল কিছুর তাওফিকদাতা। তাঁর সাহায্য ছাড়া আমাদের কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00