📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মানুষ ও ফেরেশতার

📄 মানুষ ও ফেরেশতার


যারা মনে করে, নবী ও ওলিদের চেয়ে ফেরেশতাদের মর্যাদা বেশি, তাদের কথায় আমি আশ্চর্য হই। তারা এটা কীভাবে বলে? কী কারণে তাদের বেশি মর্যাদা হবে?

শারীরিক গঠনের জন্য যদি মর্যাদা হয় তবে ডানাওয়ালা ফেরেশতাদের চেয়ে আদমের আকৃতি ও গঠনই বেশি বিস্ময়কর ও সুন্দর। আর যদি মানুষের শরীরের মধ্যকার ময়লা আবর্জনার জন্য মর্যাদার কমতি ধরা হয় তবে এগুলো বাদ দিলে তখন আর আদমের আকৃতি থাকবে না; সেটা হয়ে যাবে অন্য কিছু। এছাড়া মানুষের অনেক অপছন্দনীয় জিনিসও বিভিন্ন সময়ে ভালো ধরা হয়। যেমন, রোজাদারের মুখের গন্ধ, শহিদের রক্ত, নামাজের মধ্যে ঘুম।

তাছাড়া ফেরেশতাদের কি এই মর্যাদা আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন? অথচ মানুষের ক্ষেত্রে তা-ই বলা হয়েছে। মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসে। আল্লাহও মানুষকে ভালোবাসেন।

কিংবা এই মর্যাদা কি ফেরেশতাদের আছে যে, আল্লাহ তাদের নিয়ে অহংকার করেন? অথচ মানুষের জন্য তা-ই বলা হয়েছে। মানুষের ভালো কাজ ও জিকিরের মজলিস দেখিয়ে আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মাঝে অহংকার প্রকাশ করেন।

তাছাড়া বিষয়টা চিন্তা করে দেখো, আল্লাহ তাদের দিয়ে আমাদের সেজদা করিয়ে নিয়েছেন। এটা তাদের ওপর আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের স্পষ্ট প্রমাণ।

আর যদি ইলমের দিক দিয়ে ধরো তবে তুমি নিশ্চয় সেই ঘটনার কথা জানো। হজরত আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করার পরের ঘটনা। যখন ফেরেশতাগণ বলেছিলেন, لا علم لنا - আমাদের কোনো জ্ঞান নেই। আর আল্লাহ আদমকে বললেন, يَا آدَمُ أَنْبِئْهُمْ -হে আদম, তুমি তাদের জানিয়ে দাও।

ফেরেশতাদের অস্তিত্ব হলো 'জাওহার'। এ কারণে যদি তাদেরকে শ্রেষ্ঠ বলতে হয়, তবে তো আমাদের রুহও 'জাওহার'।

কিংবা ফেরেশতাগণ কি ইবাদতের আধিক্য দ্বারা শ্রেষ্ঠ? না, তাদের কেউ মানুষের মতো ততদূর আরোহণ করতে সক্ষম নয়, মানুষ যতদূর আরোহণ করে পৌঁছেছে। হ্যাঁ, তাদের কিছু ভিন্নতা আছে। তাদের মধ্যে কেউ কখনো মানুষের মতো 'ইলাহ' হওয়ার দাবি করে বসেনি। অথচ তাদের মধ্যে প্রচণ্ড রকমের অলৌকিক শক্তি রয়েছে। এর কারণ হলো, আল্লাহ তাদের থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিয়েছেন। যেমন আল্লাহ ইরশাদ করেন-
وَمَنْ يَقُلْ مِنْهُمْ إِنِّي إِلَهُ مِنْ دُونِهِ فَذَلِكَ نَجْزِيهِ جَهَنَّمَ)

তাদের মধ্যে কেউ যদি এমন কথা বলে (যদিও সেটা অসম্ভব) যে, 'আল্লাহ ছাড়া আমিও একজন মাবুদ' তবে আমি তাকে জাহান্নামের শাস্তি দেবো। [সুরা আম্বিয়া: ২৯]

আর যেহেতু শাস্তির বাস্তবতা সম্পর্কে তারা সম্যক অবহিত, সে কারণে তারা এ থেকে খুব বেশি সতর্ক থাকে। তাই তারা কখনো নাফরমানি করে না। আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হয় না।

কিন্তু আমরা সেই বাস্তব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে দূরে রয়েছি এবং শেষ পরিণাম সম্পর্কে আমাদের ঈমানের দুর্বলতা ও উদাসীনতা রয়েছে। সেই সাথে আমাদের ওপর আমাদের প্রবৃত্তি-বাসনার প্রভাব রয়েছে। এসকল কারণে মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেকেই 'ইলাহ' কে অস্বীকার করে বসেছে আর কেউ কেউ নিজেই 'ইলাহ' হওয়ার দাবি করে বসেছে। কিন্তু ফেরেশতাদের মাধ্যমে এ ধরনের কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি।

তবুও কথা হলো, তাদের শ্রম ও পরিশ্রমের চেয়ে আমাদের বহুগুণে শ্রম-পরিশ্রম ও কষ্ট স্বীকার করতে হয়। আল্লাহর কসম, আমরা যেই পরীক্ষার মধ্যে আপতিত রয়েছি, ফেরেশতাদের মধ্যে কাউকে যদি এই পরীক্ষায় ফেলা হতো তাহলে তাদেরকেও এমন অবিচলিত পাওয়া যেত না।

মনে করো, আমাদের কারও ওপর যখন একটি ভোর উদিত হলো, অমনি শরিয়ত তার সামনে এসে বলল, নামাজ আদায় করো। খুজু-খুশুর সাথে। শীতের সময় হলেও অজু করো। এরপর বলল, তোমার পরিবারের জন্য উপার্জন করো। শুধু তা-ই নয়; উপার্জনের মধ্যে সতর্ক থাকো। হারাম যেন না হয়- আরও কত কী!

তাছাড়া মানুষ তার এই সংক্ষিপ্ত একটি জীবনে একসঙ্গে যত কাজ করে, ফেরেশতাদের দিয়ে তা কিছুতেই সম্ভব নয়। যেমন, নিজের শরীর ঠিক রাখা। উপার্জন করা। নিজে দ্বীনের পথে চলা এবং অন্যকে দাওয়াত দেওয়া। নিজের পরিবার-আত্মীয়কে ভালোবাসা। মা-বাবার হক আদায় করা। স্ত্রী-সন্তানের হক আদায় করা। নারী হলে স্বামীর হক আদায় করা। সন্তানের বিভিন্ন আবদার অনুযায়ী তার পছন্দনীয় জিনিসগুলো এনে দেওয়া। প্রবৃত্তির কুপ্রস্তাবনা থেকে বেঁচে থাকা। বন্ধুত্ব-শত্রুত্ব দেখে-শুনে চলা ইত্যাদি। অথচ ফেরেশতাদের এর কোনো বালাই নেই।

এভাবে মানুষকে অনেক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে। যেমন, আল্লাহর খলিল ইবরাহিম আ.-কে বলা হচ্ছে, 'তুমি নিজ হাতে তোমার সন্তানকে জবাই করো, তোমার কলিজার ধন নিজ হাতে কেটে ফেলো। এদিকে মুসা আলাইহিস সালামকে বলা হচ্ছে, একমাস দিনে-রাতে রোজা রাখো।

কোনো ক্রোধান্বিত ব্যক্তিকে বলা হচ্ছে, তোমার ক্রোধ দমন করো। চক্ষুষ্মানকে বলা হচ্ছে, তোমার চক্ষু অবনত করো। কথককে বলা হচ্ছে, চুপ থাকো। ঘুমকাতর ব্যক্তিটিকেও বলা হচ্ছে, ওঠো, তাহাজ্জুদ পড়ো। যে ব্যক্তির প্রিয় কেউ মারা গিয়েছে, তাকে বলা হচ্ছে, ধৈর্যধারণ করো। যার শরীরে কোনো আঘাত লেগেছে, তাকেও বলা হচ্ছে, শোকর আদায় করো। জিহাদে দণ্ডায়মান ব্যক্তিকে বলা হচ্ছে, পলায়ন করো না। অবশেষে মৃত্যুর মতো কঠিন ও কষ্টকর বিষয় তাকে সহ্য করতে হবে এবং তার রুহ বের করে আনা হবে, এ সময়ও তাকে বলা হচ্ছে, অবিচল থাকো। যদি অসুস্থ হয়ে পড়ো, মাখলুকের কাছে প্রার্থনা করো না ইত্যাদি।

এভাবে মানুষকে যত পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়, তার কোনোটাই কি ফেরেশতাদের সহ্য করতে হয়? হয় না। তাদের ইবাদত করাটাও সহজ। সেই ইবাদতের মধ্যে স্বভাবের দৃঢ়তা নেই। প্রবৃত্তির সাথে লড়াইয়ের তীব্রতা নেই। তাদের ইবাদত তো শুধু আকৃতিগতভাবে রুকু, সেজদা ও তাসবিহ পড়া। তাদের সেই ইবাদতে আমাদের ইবাদতের মতো অভ্যন্তরীণ অর্থময় খুজু ও খুশু কোথায়?

তাছাড়া তাদের অধিকাংশই মানুষের বিভিন্ন খেদমতে ব্যস্ত রয়েছে। আমাদের হিসাব-নিকাশ লিখছে। কেউ আমাদের বিপদ থেকে রক্ষার কাজে নিয়োজিত। কেউ বাতাস ও বৃষ্টি প্রবাহের কাজে। কেউ খাদ্য উৎপাদনে। আরেকটি বড় অংশ আমাদের গোনাহ মাফ করার জন্য ‘ইস্তিগফার’-এ নিয়োজিত। তাই কীভাবে তারা আমাদের ওপর শ্রেষ্ঠ হতে পারে- কোনো কারণ ছাড়া?

এছাড়া আমাদের আচরণ নিয়ে আল্লাহর নিকট ফেরেশতাদের যে অভিযোগ ছিল। সেই প্রেক্ষিতে দুনিয়াতে হারুত ও মারুত নামে দুজন ফেরেশতা পাঠানোর যে ঘটনা বর্ণনা করা হয়, তাতে দেখা যায়, তারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয় না। খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে। ৬১

তবে এমন ধারণা করা যাবে না যে, আমি ফেরেশতাদের ইবাদত বা উবুদিয়‍্যাতের মধ্যে কোনো কমতির কথা বলছি। কারণ, তারা সর্বোচ্চ পরিমাণে আল্লাহকে ভয় করে ও ইবাদত করে। কারণ, তারা সরাসরি আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত। তবে ফেরেশতাদের ঈমান হলো ‘ইতমিনানি’ বা আস্থাপূর্ণ ঈমান। নিশ্চিত এবং স্থির। কিন্তু আমাদের ঈমান গতিশীল। ভয় ও ইবাদতের সাথে এটা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে সক্ষম।

সুতরাং আমার ভাইগণ, তোমরাই মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ। তবে তোমরা তোমাদের সত্তাকে গোনাহের পঙ্কিলতায় নিকৃষ্ট করা থেকে বিরত থাকো। তাহলে তোমরাই ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ থাকবে। কিন্তু নিজেদেরকে যদি গোনাহ ও অবাধ্যতার মাধ্যমে পঙ্কিল করে তোলো তাহলে তোমরাই হবে চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ারের মতো কিংবা তারচেয়েও নিকৃষ্ট। আল্লাহই আমাদের সহায়। তিনি আমাদের হেফাজত করুন। আমিন।

টিকাঃ
৬১ এই প্রচলিত কথার পক্ষে ইসরাইলি বর্ণনা পাওয়া গেলেও কোনো সহিহ ও বিশুদ্ধ প্রমাণ পাওয়া যায় না। সুতরাং এই দুই ফেরেশতা সম্পর্কে উপরিউক্ত বিশ্বাস লালন করা সংগত হবে না।-সম্পাদক

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 বস্তুসমূহের মৌলিকতা

📄 বস্তুসমূহের মৌলিকতা


অনেক সাধারণ মানুষকে এবং কিছু আলেমকে বস্তুসমূহের মৌলিকতা নিয়ে সীমাহীন তর্ক-বিতর্ক করতে দেখি। অথচ এগুলো এমন ইলম—যার বাস্তবতা নিয়ে সাধারণভাবে আলোচনা করা চলে না। যেমন, রুহ। আল্লাহ তাআলা এর বিষয় গোপন রেখে বলেছেন,
(قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي)

আপনি বলুন, রুহ আমার প্রতিপালকের আদেশমাত্র। [সুরা ইসরা: ৮৫]

কিন্তু আল্লাহ তাআলার এই সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় তারা সন্তুষ্ট নয়। তারা রুহের গঠন-প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করতে থাকে। তর্ক-বিতর্ক করে। কিন্তু কোনো সমাধানে আসতে পারে না। যা দাবি করে, তার পক্ষে কোনো প্রমাণ আনতে পারে না।

আরেকটি আলোচনার বিষয় হলো ‘আকল’ বা বিবেক। রুহ যেমন আছে, নিঃ সন্দেহ আকলও আছে। দুটিকেই চেনা যায় তাদের কর্ম ও প্রভাব দেখে; চাক্ষুষ সত্তা দেখে চেনা যায় না। দেখার উপায়ও নেই।

এখন কেউ যদি বলে বসে তবে এগুলো গোপন রাখার মধ্যে কী রহস্য লুকিয়ে আছে?

উত্তরে আমি বলি, রুহ বা আত্মা প্রতিমুহূর্তে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তিত হয়। তুমি যদি এগুলোর রহস্য জেনে যাও তবে তার স্রষ্টার প্রকৃতিও কিছুটা জানা হয়ে যাবে। সুতরাং অন্যদের নিকট তিনি এটি গোপন রেখেছেন। এটি তার মর্যাদাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। কারণ, সৃষ্টির সাধারণ স্বভাব হলো, যখন সে কোনো জিনিসের সম্পূর্ণটা না জানে, সেটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় ও মহান মনে হয়। আর কোনো জিনিসের পূর্ণ রহস্য জানা হয়ে গেলে তা তার কাছে আকর্ষণহীন তুচ্ছ বিষয়ে পরিণত হয়।

আবার কেউ যদি বলেন, বজ্র, বিদ্যুৎ, ভূমিকম্প- এগুলো কী?

তার উত্তরে আমরা বলব, এগুলো খুবই অশান্ত ও গতিশীল কিছু জিনিস। এর মধ্যে যে রহস্য, আল্লাহ তাআলাই তা ভালো জানেন। তবে কখনো যদি এগুলোর বাস্তবতা প্রকাশিত হয় তবুও তা আল্লাহর বড়ত্ব ও ক্ষমতার পরিচয়। আরও বাড়িয়ে দেবে। এগুলো যেহেতু তারই সৃষ্টি, তাই অনর্থক তর্ক-বিতর্ক না করে এগুলোর আসল রহস্য উদ্ঘাটনের প্রমাণ প্রাপ্তি পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা উচিত।

রিসালাত বা নবীদের সত্যতা নিয়েও তর্ক-বিতর্ক করা হয়। অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুলদের পাঠানোর সম্ভাব্যতা নিয়ে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।

এরপর আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলি নিয়ে বিভিন্ন তর্কের আসর জমানো হয়। এসকল সিফাতের কথা আমরা বিভিন্ন আসমানি কিতাব ও রাসুলদের বর্ণনা থেকে জানতে পেরেছি। কিন্তু বিস্তারিত নয়। কিন্তু মানুষ নিজেদের বিচিত্র মত অনুযায়ী তার গুণাবলি নিয়ে আলোচনা করে। অথচ এগুলো আলোচনার দায়িত্ব তো কাউকে দেওয়া হয়নি। সুতরাং যারা মূর্খতার সাথে এগুলোর অনুচিত আলোচনা করে, এর ক্ষতি ও ভয়াবহতা তাদের ওপরই বর্তাবে।

যেমন, আমরা যখন বলি, তিনি মাওজুদ বা অবস্থিত এবং আমরা তার কালাম থেকেই জেনেছি যে তিনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বদ্রষ্টা। জীবন্ত। সক্ষম। তাঁর গুণাবলির পরিচয়ের ক্ষেত্রে এতটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আমরা এর বেশি কিছু নিয়ে আলোচনায় মগ্ন হতে চাই না।

এভাবে আমরা যখন বলি, তিনি মুতাকাল্লিম, কোরআন তাঁর কালাম বা বাণী। এর বেশি কিছু বলা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নয়। আমাদের সালাফে সালেহীন এর বেশি কিছু বলেননি, تلاوة ومتلو এবং قراءة و مقروء —এসব কথা তারা বলেননি। এবং তারা বলেননি, استوى على العرش بذاته —তারা এ কথাও বলেননি, ينزل بذاته । বরং কোরআনে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, ঠিক সেভাবেই তারা বলেছেন। এর থেকে কিছু বৃদ্ধি করে বলেননি।

উদাহরণ হিসেবে সংক্ষেপে এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হলো। এর সাথে আল্লাহ তাআলার অন্য গুণাবলির কথা কিয়াস করে নাও। তাহলেই তুমি বাড়াবাড়ির বিপদ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। সাদৃশ্য প্রদানের খারাবি থেকে দূরে থাকতে পারবে। এই বাড়াবাড়ির যুগে এটাই বা কম কী!

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মূর্খেরও কিছু উপকার রয়েছে

📄 মূর্খেরও কিছু উপকার রয়েছে


আমি দেখি, পৃথিবী-ভরতি অসংখ্য মানুষ। কত দেশ পরিবার ও সন্তানাদি। মুসলিম এবং অমুসলিম। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে মানুষের অধিকাংশের অস্তিত্বই না থাকার মতো। এদের মধ্যে কেউ তো স্রষ্টাকেই চেনে না। কেউ আবার স্রষ্টাকে নিজের ইচ্ছেমতো একটি আকার-আকৃতি ও ক্ষমতা দিয়ে নিজের মতো গড়ে নিয়েছে। কেউ শিরিক করছে। কেউ অস্বীকার করছে। কেউ আবার নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কেও খবর রাখে না। কত যে তাদের ধরন!

আবার মুসলমানদের মধ্যে দেখতে পাবে- লোক দেখানো কিছু সুফি-পির অব্যাহত কিয়াম-সুজুদ করে যাচ্ছে। প্রবৃত্তির সকল চাহিদা বর্জন করছে। এর মাধ্যমে প্রসিদ্ধি লাভের যে প্রবৃত্তির সৃষ্টি হচ্ছে, তাকে ভুলে থাকছে। হাতে হাতে চুমো খাচ্ছে।

কিন্তু কেউ যখন তাদের এই দোষের কথা বলতে যাচ্ছে, তাকে বলে উঠছে, أ لمثلي يقال هذا؟—আমার ক্ষেত্রে কি এ কথা খাটে? ومن فلان الفاسق কান ফাসেক আমার ক্ষেত্রে এমন কথা বলে?

এরা মূলত দ্বীনের আসল উদ্দেশ্যটিই বোঝে না। এভাবে অনেক আলেমও অন্যদের অবজ্ঞার চোখে দেখে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এবং নিজেদের ব্যাপারে অহংকারে লিপ্ত হয়।

আমি আশ্চর্য হই, কীভাবে এসকল মানুষ সত্যের অনুসারী হবে এবং জান্নাতের অধিবাসী হবে!

পরে ভেবে দেখলাম, দুনিয়াতে সব ধরনের মানুষেরই প্রয়োজন রয়েছে। এবং আখেরাতের ক্ষেত্রেও তা-ই। দুনিয়াতে প্রয়োজনীয়তার কারণ, যারা আরেফ বিল্লাহ, অভিজ্ঞ আলেম-তারা অন্যদের নিকট আল্লাহ তাআলার নিয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেন। দ্বীনের কথা শোনান। দ্বীনের যে বিষয়গুলো তাদের নিকট অস্পষ্ট ছিল, সেগুলো জানিয়ে দেন। ঈমান ও আমলের কথা বলেন। এভাবে সকল মানুষের অস্তিত্বই পৃথিবীতে অর্থময় হয়ে ওঠে।

সব জায়গাতেই মানুষের অবস্থানের মধ্যে একটি তারতম্য রয়েছে। যারা ইবাদতের শুধু বাহ্যিকতা নিয়ে চলে, আরেফগণ তাদের সাথে মেলামেশার মাধ্যমে সময় নষ্ট করেন না। আর জাহেদগণ থাকেন নিজেদের ইবাদতে ব্যস্ত। আর আলেমগণ হলেন বাচ্চাদের তারবিয়াতকারীদের মতো। সাধারণ মানুষদের হেদায়াতের পথ দেখানোই তাদের কাজ। আর আরেফগণ হলেন হিকমত বিতরণকারীদের মতো। আল্লাহ যদি চান, চেষ্টা-সাধনার মাধ্যমে যে-কেউ ‘আরেফ বিল্লাহ’ হতে সক্ষম।

মানুষের মাঝে এত তারতম্যের পেছনে হিকমত কী?

আমার মনে হয়- যেমন, কোনো সম্রাট বা বাদশাহর পাশ ঘেঁষে যদি কিছু সভাসদ না থাকে, সৈনিক ও বাহিনী না থাকে, জৌলুস না থাকে তবে তার বিলাসিতা পূর্ণতা পায় না। ঠিক এভাবেই জান্নাতে ‘আরেফ’ ব্যক্তিদের বিলাস-ব্যসন পূর্ণ করার জন্য অন্য মানুষগুলোকে তাদের অবস্থার তারতম্য অনুযায়ী ব্যবহার করা হবে।

কেউ যখন আরেফের যোগ্যতায় পৌঁছে যায় তখন তার সকল প্রতিবন্ধকতা উঠিয়ে নেওয়া হয়। তখন তার আমল হবে সর্বোচ্চ পরিমাণ পরিশুদ্ধ। আর কেউ যদি সে পর্যন্ত পৌঁছুতে না পারে, তবে সে দুনিয়াতে অবস্থান করবে আরবি কথাবার্তায় অনেক সময় অতিরিক্ত হিসেবে ব্যবহৃত ১ শব্দটির মতো। শব্দটি অতিরিক্ত। তা পূর্বেরটিকে সুদৃঢ় করে।

এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে বসে, ধরো, এটা না-হয় দুনিয়ার জন্য হলো, কিন্তু জান্নাতে এটার ধরন কেমন হবে?

উত্তর: দুনিয়াতে আমরা কী দেখি? প্রতিবেশীর সঙ্গ সব সময়ই একটি কাম্য জিনিস। কারণ, অপূর্ণ ব্যক্তিদের দর্শন পূর্ণ ব্যক্তিদের সুখ ও তৃপ্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। জান্নাতেও তা-ই হবে। তবে প্রত্যেকের জন্যই তাদের মর্যাদানুপাতে একটি প্রাপ্য থাকবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা তাদের এই অপূর্ণতার বিষয়ে জানতে পারবে না। তাই তারা কোনো দুঃখ বা কষ্টও পাবে না।

এ কথাগুলো দিয়ে আমি মানুষের বিশেষ কিছু অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করেছি, কেউ যদি গভীরভাবে চিন্তা করে তবে সে আমার ইশারা বুঝতে সক্ষম হবে। বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখি না।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 একক আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া

📄 একক আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া


আমি আমার রিজিকের ক্ষেত্রে স্রষ্টার পরিচালনার বিষয় নিয়ে চিন্তা করলাম। যেমন, মেঘমালাকে ভাসিয়ে আনা। বৃষ্টি বর্ষানো। আর যে বীজ রয়েছে জমিনের মধ্যে বপিত। একেবারে মৃতের মতো। পচে গলে গেছে। অপেক্ষায় রয়েছে জীবনের শিঙায় একটি উষ্ণ ফুঁৎকারের। এবং সেই জীবন-পানি যখন তাতে স্পর্শিত হয়, তখন সেটা সবুজ হয়ে মাথা তোলে। পানিহীন হয়ে পড়লে, প্রার্থনায় দু-পাতার দু-হাত বাড়িয়ে অনুনয়-বিনয় করে। বিনয়ে মাথা নত করে দেয়। বিবর্ণ হয়ে যায়। এখন সে আমার মতো মুহতাজ। তারও সূর্যের উষ্ণতা প্রয়োজন। পানির আদ্রতা প্রয়োজন। মৃদুমন্দ বাতাস প্রয়োজন। আমারও যেমন প্রয়োজন।

মাটির আদরে লালিত-পালিত এই যে বীজটির বেড়ে ওঠা-যা আল্লাহ তাআলা আমাকে দেখালেন-আমার লালিতপালিত হওয়াটাও তো এমনই। এমনকি আমার অসহায়ত্ব ছিল আরও কত বেশি! আরও কত দীর্ঘ!

সুতরাং হে নফস, আজ কিছু এদিক-সেদিক চোখ ফিরিয়ে জ্ঞান শিখে অন্য মাখলুকের দিকে ধাবিত হও, এটা তোমার জন্য কত বড় নিকৃষ্ট কাজ! এছাড়া তুমি কীভাবে সেই সৃষ্টিজীবের কাছে তোমার প্রার্থনার হাত বাড়াও, যে ঠিক তোমার মতোই অক্ষম ও মুহতাজ। তোমার মতোই তারও প্রয়োজন রয়েছে, প্রার্থনায় নত হওয়ার দরকার রয়েছে!

হে বিহঙ্গ আমার, তুমি অচিরেই তোমার প্রথম ও একমাত্র পালনকর্তার কাছে ফিরে এসো। বিনয় অবনত হয়ে প্রধান দাতার কাছে তোমার প্রার্থনার কথা বলো।

তুমি যদি তাকে যথার্থভাবে চিনতে পারো, এটা তোমার জন্যই হবে কল্যাণকর। জেনে রেখো, তাকে চিনতে পারা মানেই দুনিয়া ও আখেরাতের রাজত্ব পাওয়া। এটাই তোমাকে সফলতার সবকিছু এনে দেবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00