📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ইলম ও আমল

📄 ইলম ও আমল


একদিন আমি লক্ষ করে দেখলাম, আমার নফস ইলমে মশগুল থাকাকে ভালো মনে করে এবং এটাকে সে অন্য সকল জিনিসের ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এটাকে সে দলিল মনে করে। অন্য কোনো নফল কাজের চেয়ে ইলমে মশগুল থাকার সময়গুলোকে সে শ্রেষ্ঠ মনে করে।

নফস বলে, নফল ইবাদতের চেয়ে ইলমের শ্রেষ্ঠত্বের ক্ষেত্রে আমার নিকট সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল এই যে, ইলমচর্চা বাদ দিয়ে যারা নামাজ ও রোজার নফল নিয়ে মশগুল রয়েছে, তাদের অধিকাংশের বিশ্বাসের ভিত্তি নড়বড়ে, ভুলত্রুটিতে ভরা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি একটি খুবই সোজা পথ এবং সঠিক মতের ওপর রয়েছি।

আমি দেখলাম, নফস যা বলছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু আমি দেখি, সে তো শুধু বাহ্যিক ইলম নিয়ে মশগুল রয়েছে। আমি তাকে চিৎকার করে ডেকে বললাম, তোমার এই ইলম তোমার কী উপকার করবে? এখানে খোদাভীতি কোথায়? গোনাহের দুশ্চিন্তা কোথায়? হারাম থেকে বেঁচে থাকার সতর্কতা কোথায়? কিংবা পূর্ববর্তীদের থেকে শুনে আসা সেই আকুলকরা ইবাদত ও মোজাহাদা কোথায়?

অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সকলের নেতা, ইলমের ভান্ডার। তিনি এমন দীর্ঘ নামাজ পড়তেন যে দু-পা ফুলে যেত!

হজরত আবু বকর রা. ছিলেন দ্বীনের তরে ব্যথিত হৃদয়, অধিক ক্রন্দনকারী। কান্নার দমকে তার বুকের মধ্যে ঘড় ঘড় শব্দ বের হতো।

আর হজরত উসমান রা. রাতের নামাজে কোরআন খতম করতেন!

আর হজরত আলি রা. রাতে তার নামাজের জায়গায় এমনভাবে ক্রন্দন করতেন যে, তার দাড়ি অশ্রুধারায় ভিজে যেত। এবং দুনিয়ার প্রতি আঙুল দেখিয়ে বলতেন,
يا دنيا غري غيري.

হে দুনিয়া, তুমি অন্য কাউকে ধোঁকায় ফেলার চিন্তা করো। (আমার ক্ষেত্রে কোনো লাভ হবে না)

এদিকে হজরত হাসান বসরি রহ. আখেরাতের ব্যাপারে নিজের সীমাহীন দুশ্চিন্তা নিয়ে মানুষের সামনে লজ্জিত বোধ করতেন।

সাইদ ইবনে মুসাইয়িব রহ. সর্বক্ষণ যেন মসজিদেই থাকতেন। চল্লিশ বছরে তার একদিনও জামাতের সাথে নামাজ ছোটেনি বা তরক হয়নি।

আসওয়াদ ইবনে ইয়াজিদ রহ.৫৫ এত বেশি রোজা রাখতেন যে, তার চেহারা সবুজ ও হলুদবর্ণ হয়ে গিয়েছিল!

রাবি ইবনে খাইসামের এক মেয়ে একবার তাকে বলল, ‘বাবা, কী হলো, আমি সকল মানুষকে ঘুমাতে দেখি, আর তুমি ঘুমাও না?

উত্তরে রাবি ইবনে খাইসাম রহ. বললেন, তোমার বাবা অপ্রয়োজনীয় ঘুমে সময় কাটানোতে আজাবের ভয় পায়!

আবু মুসলিম খাওলানি রহ.৫৬ মসজিদে একটি চাবুক ঝুলিয়ে রাখতেন। ইবাদত করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলে নিজেকে সেই চাবুক দ্বারা আঘাত করতেন। নিজেকে আবার চাঙ্গা করে নিতেন।

ইয়াজিদ আল-কুরাশি রহ.৫৭ একাধারে চল্লিশ বছর রোজা রেখেছেন (নিষিদ্ধ দিনগুলো বাদে)। তিনি বলতেন, আগের ইবাদতকারীরা তো আমাকে ছাড়িয়ে গেছে। আমাকে পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে।

হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ. জাহান্নামের ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিই যেন নিঃশেষ করে ফেলেছিলেন। শেষে চোখ থেকে রক্তধারা প্রবাহিত হতো।

এছাড়াও তুমি শ্রেষ্ঠ চার ইমাম—আবু হানিফা রহ., মালেক রহ., শাফেয়ি রহ. এবং আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর মোজাহাদা ও ইবাদতের প্রাচুর্য সম্পর্কে কি জানো না?

এবার তাহলে আমলহীন এই বাহ্যিক ইলমের বিষয়ে চিরদিনের জন্য সতর্ক হয়ে যাও। আমলহীন ইলম তো শুধু অলস অথর্ব ও দুনিয়াভোগীদের বিষয়。

টিকাঃ
৫৫. পুরো নাম: আবু আমর আসওয়াদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে কায়েস আননাখঈ। তিনি জাহেলি এবং ইসলাম- দুটি যুগই প্রাপ্ত হয়েছিলেন। ইবনে আউন রহ. বলেন, একবার শাআবীকে আসওয়াদ ইবনে ইয়াযিদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, তিনি ছিলেন অধিক রোজাদার, অধিক নামাজি এবং অধিক হজকারী। তিনি ৭৫ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৫০।
৫৬. পুরো নাম: আবু মুসলিম আলখাওলানি আদদারানি। তিনি ছিলেন তাবেঈদের সরদার। যুগের শ্রেষ্ঠ জাহেদ। ইয়ামান থেকে আগমন করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেন। আর হজরত আবু বকর রা. এর যুগে মদিনায় আগমন করেন। তিনি ৬২ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। সিয়ারু আলামিন নুবালা : (৪/৯)-১৪১।
৫৭. পুরো নাম: আবু আমর ইয়াযিদ ইবনে আব্বান আররকাশি আলবসরি। ভালো কথক ছিলেন। জাহেদ ছিলেন। তবে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাকে দুর্বল রাবী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সূত্র: তাহযিবুত তাহযিব: ১১/২৭০।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ইলম ও ইবাদত

📄 ইলম ও ইবাদত


আগের অধ্যায়ে আমলের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমলের জন্য ইলম মূলত লাগবেই।

আমার নিকট ইলমের শ্রেষ্ঠত্বের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যেমন, যারা ইলম ছাড়া ইবাদতে মশগুল হয়, তারা দ্বীনের উসুল ও মৌলিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে দুর্বল থাকে তাদের জ্ঞান থাকে একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের। যেমন, আমাদের পূর্ববর্তী এক আবেদ জাহেদ ব্যক্তি থেকে বর্ণিত আছে, তিনি একবার এক ব্যক্তিকে বললেন, 'হে আবুল ওয়ালিদ, তুমি যদি আবুল ওয়ালিদ (অর্থাৎ ওয়ালিদের বাবা) না হয়ে থাকো তবে এই উপনাম রাখা থেকে বিরত থাকো।' এ কথা বলার কারণ হলো, লোকটির আসলে 'ওয়ালিদ' নামে কোনো সন্তানই ছিল না।

আমি বলি, তার কাছে যদি এটি অনুচিত মনে হয় তবে তার জানা থাকা উচিত স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত সুহাইব রুমিকে 'আবু ইয়াহইয়া' উপনাম দিয়েছিলেন। অথচ তিনি 'ইয়াহইয়া' নামক কোনো সন্তানের বাবা ছিলেন না।

এমনকি ছোট্ট এক বালককে তিনি উপনাম নিয়ে ডেকে বলেছিলেন,
يا أبا عمير، ما فعل النغير؟
হে আবু উমাইর, তোমার নুগাইরের কী হলো? [বাচ্চাটির একটি পাখি ছিল। তাকেই 'নুগাইর' বলা হচ্ছে।]

এক জাহেদ ব্যক্তি বলেন, আমাকে একবার বলা হলো, এই দুধটুকু খাও। আমি বলেছিলাম, 'এটা আমাকে ক্ষতি করবে।'

এরপর অনেক সময় গিয়েছে। একদিন আমি কাবার নিকট দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করে বলছিলাম, হে দয়াময় আল্লাহ, তুমি তো জানো, আমি আমার জীবনে চোখের একটি পলকের জন্যও তোমার সাথে কাউকে শরিক করিনি।... এসময় আমাকে একটি আওয়াজ দিয়ে বলা হলো, সেই দুধের ঘটনার দিনেও নয়! অর্থাৎ সেদিনও কি তুমি শিরক করনি? অর্থাৎ করেছ।

এই ঘটনা যদি সত্যি হয় তবে এটা হয়ে থাকবে তাকে আদব শেখানোর জন্য; যাতে সর্বক্ষেত্রে মূল কর্তাকে ভুলে উপকরণের দিকে মন না যায়। নতুবা নিজের শরীরের জন্য ক্ষতিকর কোনো জিনিসের ক্ষেত্রে এ ধরনের কথা বলা নাজায়েয নয়। শিরকও নয়। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বলেছেন,
ما زالت أكلة خيبر تعاودني حتى الآن قطعت أبهري.

খায়বারের সেই এক লুকমা আমাকে এখনো পর্যন্ত অনবরত কষ্ট দিয়েই যাচ্ছে। তা আমার মহাধমনী ছিঁড়ে ফেলেছে। ৫৯

জাহেদদের মধ্যে একটি দল মনে করে, জীবনযাপনের সকল উপকরণ নিঃশেষ করে তবেই হবে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা। এটা তারা বলে থাকে ইলম না থাকার কারণে। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শত্রু থেকে নিরাপদ থাকার জন্য গুহায় আশ্রয় নিয়েছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন, বর্ম পরিধান করেছেন, খন্দক খনন করেছেন, মুতঈম ইবনে আদির নিরাপত্তায় মক্কায় প্রবেশ করেছেন- অথচ মুতঈম তখন কাফের ছিল। তিনি সাদ রা.কে বলেছেন,
لأن تترك ورثتك أغنياء خير من أن تتركهم عالة يتكففون الناس.

তুমি তোমার পরিবারকে নিঃস্ব অবস্থায় রেখে যাবে আর তারা মানুষের দুয়ারে চেয়ে বেড়াবে-তার চেয়ে তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদের স্বচ্ছল রেখে যাওয়াই ভালো। ৬০

হ্যাঁ, মূল কর্তা আল্লাহকে ভুলে শুধু আসবাব বা উপকরণের ওপর নির্ভর করা ভুল, শিরকি কাজ। আর এ ধরনের সকল অন্ধকার ইলমের আলোয় দূরীভূত হয়ে যায়। যে ব্যক্তি অজ্ঞতার অন্ধকারে হেঁটে যায়, সে-ও ভ্রষ্ট। আর ভ্রষ্ট সে-ও, যে জেনে শুনে প্রবৃত্তির সংকীর্ণ গলি দিয়ে পথ চলে।

টিকাঃ
৫৮ ইমাম বোখারি এটাকে 'কিতাবুল আদাব' এ উল্লেখ করেছেন। ফাতহুল বারি- ১০/৬১২৯।
৫৯. ইমাম বোখারি হাদিসটিকে 'কিতাবুল মাগাযি'-এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন। ফাতহুল বারি-৭/৪৪২৮।
৬০. পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 মানুষ ও ফেরেশতার

📄 মানুষ ও ফেরেশতার


যারা মনে করে, নবী ও ওলিদের চেয়ে ফেরেশতাদের মর্যাদা বেশি, তাদের কথায় আমি আশ্চর্য হই। তারা এটা কীভাবে বলে? কী কারণে তাদের বেশি মর্যাদা হবে?

শারীরিক গঠনের জন্য যদি মর্যাদা হয় তবে ডানাওয়ালা ফেরেশতাদের চেয়ে আদমের আকৃতি ও গঠনই বেশি বিস্ময়কর ও সুন্দর। আর যদি মানুষের শরীরের মধ্যকার ময়লা আবর্জনার জন্য মর্যাদার কমতি ধরা হয় তবে এগুলো বাদ দিলে তখন আর আদমের আকৃতি থাকবে না; সেটা হয়ে যাবে অন্য কিছু। এছাড়া মানুষের অনেক অপছন্দনীয় জিনিসও বিভিন্ন সময়ে ভালো ধরা হয়। যেমন, রোজাদারের মুখের গন্ধ, শহিদের রক্ত, নামাজের মধ্যে ঘুম।

তাছাড়া ফেরেশতাদের কি এই মর্যাদা আছে যে, আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন? অথচ মানুষের ক্ষেত্রে তা-ই বলা হয়েছে। মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসে। আল্লাহও মানুষকে ভালোবাসেন।

কিংবা এই মর্যাদা কি ফেরেশতাদের আছে যে, আল্লাহ তাদের নিয়ে অহংকার করেন? অথচ মানুষের জন্য তা-ই বলা হয়েছে। মানুষের ভালো কাজ ও জিকিরের মজলিস দেখিয়ে আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মাঝে অহংকার প্রকাশ করেন।

তাছাড়া বিষয়টা চিন্তা করে দেখো, আল্লাহ তাদের দিয়ে আমাদের সেজদা করিয়ে নিয়েছেন। এটা তাদের ওপর আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের স্পষ্ট প্রমাণ।

আর যদি ইলমের দিক দিয়ে ধরো তবে তুমি নিশ্চয় সেই ঘটনার কথা জানো। হজরত আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করার পরের ঘটনা। যখন ফেরেশতাগণ বলেছিলেন, لا علم لنا - আমাদের কোনো জ্ঞান নেই। আর আল্লাহ আদমকে বললেন, يَا آدَمُ أَنْبِئْهُمْ -হে আদম, তুমি তাদের জানিয়ে দাও।

ফেরেশতাদের অস্তিত্ব হলো 'জাওহার'। এ কারণে যদি তাদেরকে শ্রেষ্ঠ বলতে হয়, তবে তো আমাদের রুহও 'জাওহার'।

কিংবা ফেরেশতাগণ কি ইবাদতের আধিক্য দ্বারা শ্রেষ্ঠ? না, তাদের কেউ মানুষের মতো ততদূর আরোহণ করতে সক্ষম নয়, মানুষ যতদূর আরোহণ করে পৌঁছেছে। হ্যাঁ, তাদের কিছু ভিন্নতা আছে। তাদের মধ্যে কেউ কখনো মানুষের মতো 'ইলাহ' হওয়ার দাবি করে বসেনি। অথচ তাদের মধ্যে প্রচণ্ড রকমের অলৌকিক শক্তি রয়েছে। এর কারণ হলো, আল্লাহ তাদের থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিয়েছেন। যেমন আল্লাহ ইরশাদ করেন-
وَمَنْ يَقُلْ مِنْهُمْ إِنِّي إِلَهُ مِنْ دُونِهِ فَذَلِكَ نَجْزِيهِ جَهَنَّمَ)

তাদের মধ্যে কেউ যদি এমন কথা বলে (যদিও সেটা অসম্ভব) যে, 'আল্লাহ ছাড়া আমিও একজন মাবুদ' তবে আমি তাকে জাহান্নামের শাস্তি দেবো। [সুরা আম্বিয়া: ২৯]

আর যেহেতু শাস্তির বাস্তবতা সম্পর্কে তারা সম্যক অবহিত, সে কারণে তারা এ থেকে খুব বেশি সতর্ক থাকে। তাই তারা কখনো নাফরমানি করে না। আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হয় না।

কিন্তু আমরা সেই বাস্তব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে দূরে রয়েছি এবং শেষ পরিণাম সম্পর্কে আমাদের ঈমানের দুর্বলতা ও উদাসীনতা রয়েছে। সেই সাথে আমাদের ওপর আমাদের প্রবৃত্তি-বাসনার প্রভাব রয়েছে। এসকল কারণে মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেকেই 'ইলাহ' কে অস্বীকার করে বসেছে আর কেউ কেউ নিজেই 'ইলাহ' হওয়ার দাবি করে বসেছে। কিন্তু ফেরেশতাদের মাধ্যমে এ ধরনের কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি।

তবুও কথা হলো, তাদের শ্রম ও পরিশ্রমের চেয়ে আমাদের বহুগুণে শ্রম-পরিশ্রম ও কষ্ট স্বীকার করতে হয়। আল্লাহর কসম, আমরা যেই পরীক্ষার মধ্যে আপতিত রয়েছি, ফেরেশতাদের মধ্যে কাউকে যদি এই পরীক্ষায় ফেলা হতো তাহলে তাদেরকেও এমন অবিচলিত পাওয়া যেত না।

মনে করো, আমাদের কারও ওপর যখন একটি ভোর উদিত হলো, অমনি শরিয়ত তার সামনে এসে বলল, নামাজ আদায় করো। খুজু-খুশুর সাথে। শীতের সময় হলেও অজু করো। এরপর বলল, তোমার পরিবারের জন্য উপার্জন করো। শুধু তা-ই নয়; উপার্জনের মধ্যে সতর্ক থাকো। হারাম যেন না হয়- আরও কত কী!

তাছাড়া মানুষ তার এই সংক্ষিপ্ত একটি জীবনে একসঙ্গে যত কাজ করে, ফেরেশতাদের দিয়ে তা কিছুতেই সম্ভব নয়। যেমন, নিজের শরীর ঠিক রাখা। উপার্জন করা। নিজে দ্বীনের পথে চলা এবং অন্যকে দাওয়াত দেওয়া। নিজের পরিবার-আত্মীয়কে ভালোবাসা। মা-বাবার হক আদায় করা। স্ত্রী-সন্তানের হক আদায় করা। নারী হলে স্বামীর হক আদায় করা। সন্তানের বিভিন্ন আবদার অনুযায়ী তার পছন্দনীয় জিনিসগুলো এনে দেওয়া। প্রবৃত্তির কুপ্রস্তাবনা থেকে বেঁচে থাকা। বন্ধুত্ব-শত্রুত্ব দেখে-শুনে চলা ইত্যাদি। অথচ ফেরেশতাদের এর কোনো বালাই নেই।

এভাবে মানুষকে অনেক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে। যেমন, আল্লাহর খলিল ইবরাহিম আ.-কে বলা হচ্ছে, 'তুমি নিজ হাতে তোমার সন্তানকে জবাই করো, তোমার কলিজার ধন নিজ হাতে কেটে ফেলো। এদিকে মুসা আলাইহিস সালামকে বলা হচ্ছে, একমাস দিনে-রাতে রোজা রাখো।

কোনো ক্রোধান্বিত ব্যক্তিকে বলা হচ্ছে, তোমার ক্রোধ দমন করো। চক্ষুষ্মানকে বলা হচ্ছে, তোমার চক্ষু অবনত করো। কথককে বলা হচ্ছে, চুপ থাকো। ঘুমকাতর ব্যক্তিটিকেও বলা হচ্ছে, ওঠো, তাহাজ্জুদ পড়ো। যে ব্যক্তির প্রিয় কেউ মারা গিয়েছে, তাকে বলা হচ্ছে, ধৈর্যধারণ করো। যার শরীরে কোনো আঘাত লেগেছে, তাকেও বলা হচ্ছে, শোকর আদায় করো। জিহাদে দণ্ডায়মান ব্যক্তিকে বলা হচ্ছে, পলায়ন করো না। অবশেষে মৃত্যুর মতো কঠিন ও কষ্টকর বিষয় তাকে সহ্য করতে হবে এবং তার রুহ বের করে আনা হবে, এ সময়ও তাকে বলা হচ্ছে, অবিচল থাকো। যদি অসুস্থ হয়ে পড়ো, মাখলুকের কাছে প্রার্থনা করো না ইত্যাদি।

এভাবে মানুষকে যত পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়, তার কোনোটাই কি ফেরেশতাদের সহ্য করতে হয়? হয় না। তাদের ইবাদত করাটাও সহজ। সেই ইবাদতের মধ্যে স্বভাবের দৃঢ়তা নেই। প্রবৃত্তির সাথে লড়াইয়ের তীব্রতা নেই। তাদের ইবাদত তো শুধু আকৃতিগতভাবে রুকু, সেজদা ও তাসবিহ পড়া। তাদের সেই ইবাদতে আমাদের ইবাদতের মতো অভ্যন্তরীণ অর্থময় খুজু ও খুশু কোথায়?

তাছাড়া তাদের অধিকাংশই মানুষের বিভিন্ন খেদমতে ব্যস্ত রয়েছে। আমাদের হিসাব-নিকাশ লিখছে। কেউ আমাদের বিপদ থেকে রক্ষার কাজে নিয়োজিত। কেউ বাতাস ও বৃষ্টি প্রবাহের কাজে। কেউ খাদ্য উৎপাদনে। আরেকটি বড় অংশ আমাদের গোনাহ মাফ করার জন্য ‘ইস্তিগফার’-এ নিয়োজিত। তাই কীভাবে তারা আমাদের ওপর শ্রেষ্ঠ হতে পারে- কোনো কারণ ছাড়া?

এছাড়া আমাদের আচরণ নিয়ে আল্লাহর নিকট ফেরেশতাদের যে অভিযোগ ছিল। সেই প্রেক্ষিতে দুনিয়াতে হারুত ও মারুত নামে দুজন ফেরেশতা পাঠানোর যে ঘটনা বর্ণনা করা হয়, তাতে দেখা যায়, তারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয় না। খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে। ৬১

তবে এমন ধারণা করা যাবে না যে, আমি ফেরেশতাদের ইবাদত বা উবুদিয়‍্যাতের মধ্যে কোনো কমতির কথা বলছি। কারণ, তারা সর্বোচ্চ পরিমাণে আল্লাহকে ভয় করে ও ইবাদত করে। কারণ, তারা সরাসরি আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত। তবে ফেরেশতাদের ঈমান হলো ‘ইতমিনানি’ বা আস্থাপূর্ণ ঈমান। নিশ্চিত এবং স্থির। কিন্তু আমাদের ঈমান গতিশীল। ভয় ও ইবাদতের সাথে এটা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে সক্ষম।

সুতরাং আমার ভাইগণ, তোমরাই মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ। তবে তোমরা তোমাদের সত্তাকে গোনাহের পঙ্কিলতায় নিকৃষ্ট করা থেকে বিরত থাকো। তাহলে তোমরাই ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ থাকবে। কিন্তু নিজেদেরকে যদি গোনাহ ও অবাধ্যতার মাধ্যমে পঙ্কিল করে তোলো তাহলে তোমরাই হবে চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ারের মতো কিংবা তারচেয়েও নিকৃষ্ট। আল্লাহই আমাদের সহায়। তিনি আমাদের হেফাজত করুন। আমিন।

টিকাঃ
৬১ এই প্রচলিত কথার পক্ষে ইসরাইলি বর্ণনা পাওয়া গেলেও কোনো সহিহ ও বিশুদ্ধ প্রমাণ পাওয়া যায় না। সুতরাং এই দুই ফেরেশতা সম্পর্কে উপরিউক্ত বিশ্বাস লালন করা সংগত হবে না।-সম্পাদক

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 বস্তুসমূহের মৌলিকতা

📄 বস্তুসমূহের মৌলিকতা


অনেক সাধারণ মানুষকে এবং কিছু আলেমকে বস্তুসমূহের মৌলিকতা নিয়ে সীমাহীন তর্ক-বিতর্ক করতে দেখি। অথচ এগুলো এমন ইলম—যার বাস্তবতা নিয়ে সাধারণভাবে আলোচনা করা চলে না। যেমন, রুহ। আল্লাহ তাআলা এর বিষয় গোপন রেখে বলেছেন,
(قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي)

আপনি বলুন, রুহ আমার প্রতিপালকের আদেশমাত্র। [সুরা ইসরা: ৮৫]

কিন্তু আল্লাহ তাআলার এই সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় তারা সন্তুষ্ট নয়। তারা রুহের গঠন-প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করতে থাকে। তর্ক-বিতর্ক করে। কিন্তু কোনো সমাধানে আসতে পারে না। যা দাবি করে, তার পক্ষে কোনো প্রমাণ আনতে পারে না।

আরেকটি আলোচনার বিষয় হলো ‘আকল’ বা বিবেক। রুহ যেমন আছে, নিঃ সন্দেহ আকলও আছে। দুটিকেই চেনা যায় তাদের কর্ম ও প্রভাব দেখে; চাক্ষুষ সত্তা দেখে চেনা যায় না। দেখার উপায়ও নেই।

এখন কেউ যদি বলে বসে তবে এগুলো গোপন রাখার মধ্যে কী রহস্য লুকিয়ে আছে?

উত্তরে আমি বলি, রুহ বা আত্মা প্রতিমুহূর্তে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তিত হয়। তুমি যদি এগুলোর রহস্য জেনে যাও তবে তার স্রষ্টার প্রকৃতিও কিছুটা জানা হয়ে যাবে। সুতরাং অন্যদের নিকট তিনি এটি গোপন রেখেছেন। এটি তার মর্যাদাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। কারণ, সৃষ্টির সাধারণ স্বভাব হলো, যখন সে কোনো জিনিসের সম্পূর্ণটা না জানে, সেটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় ও মহান মনে হয়। আর কোনো জিনিসের পূর্ণ রহস্য জানা হয়ে গেলে তা তার কাছে আকর্ষণহীন তুচ্ছ বিষয়ে পরিণত হয়।

আবার কেউ যদি বলেন, বজ্র, বিদ্যুৎ, ভূমিকম্প- এগুলো কী?

তার উত্তরে আমরা বলব, এগুলো খুবই অশান্ত ও গতিশীল কিছু জিনিস। এর মধ্যে যে রহস্য, আল্লাহ তাআলাই তা ভালো জানেন। তবে কখনো যদি এগুলোর বাস্তবতা প্রকাশিত হয় তবুও তা আল্লাহর বড়ত্ব ও ক্ষমতার পরিচয়। আরও বাড়িয়ে দেবে। এগুলো যেহেতু তারই সৃষ্টি, তাই অনর্থক তর্ক-বিতর্ক না করে এগুলোর আসল রহস্য উদ্ঘাটনের প্রমাণ প্রাপ্তি পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা উচিত।

রিসালাত বা নবীদের সত্যতা নিয়েও তর্ক-বিতর্ক করা হয়। অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুলদের পাঠানোর সম্ভাব্যতা নিয়ে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।

এরপর আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলি নিয়ে বিভিন্ন তর্কের আসর জমানো হয়। এসকল সিফাতের কথা আমরা বিভিন্ন আসমানি কিতাব ও রাসুলদের বর্ণনা থেকে জানতে পেরেছি। কিন্তু বিস্তারিত নয়। কিন্তু মানুষ নিজেদের বিচিত্র মত অনুযায়ী তার গুণাবলি নিয়ে আলোচনা করে। অথচ এগুলো আলোচনার দায়িত্ব তো কাউকে দেওয়া হয়নি। সুতরাং যারা মূর্খতার সাথে এগুলোর অনুচিত আলোচনা করে, এর ক্ষতি ও ভয়াবহতা তাদের ওপরই বর্তাবে।

যেমন, আমরা যখন বলি, তিনি মাওজুদ বা অবস্থিত এবং আমরা তার কালাম থেকেই জেনেছি যে তিনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বদ্রষ্টা। জীবন্ত। সক্ষম। তাঁর গুণাবলির পরিচয়ের ক্ষেত্রে এতটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আমরা এর বেশি কিছু নিয়ে আলোচনায় মগ্ন হতে চাই না।

এভাবে আমরা যখন বলি, তিনি মুতাকাল্লিম, কোরআন তাঁর কালাম বা বাণী। এর বেশি কিছু বলা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নয়। আমাদের সালাফে সালেহীন এর বেশি কিছু বলেননি, تلاوة ومتلو এবং قراءة و مقروء —এসব কথা তারা বলেননি। এবং তারা বলেননি, استوى على العرش بذاته —তারা এ কথাও বলেননি, ينزل بذاته । বরং কোরআনে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, ঠিক সেভাবেই তারা বলেছেন। এর থেকে কিছু বৃদ্ধি করে বলেননি।

উদাহরণ হিসেবে সংক্ষেপে এখানে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হলো। এর সাথে আল্লাহ তাআলার অন্য গুণাবলির কথা কিয়াস করে নাও। তাহলেই তুমি বাড়াবাড়ির বিপদ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। সাদৃশ্য প্রদানের খারাবি থেকে দূরে থাকতে পারবে। এই বাড়াবাড়ির যুগে এটাই বা কম কী!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00