📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 নফসের সঙ্গে জিহাদ

📄 নফসের সঙ্গে জিহাদ


নফসের জিহাদ সম্পর্কে চিন্তা করলাম। দেখলাম, এটিই সবচেয়ে বড় জিহাদ। কিন্তু দেখি, আলেম এবং জাহেদদের মধ্যে একটি শ্রেণি এর ভুল অর্থ বোঝে। কারণ, তাদের কেউ কেউ নফসকে তার সকল চাহিদার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে বিরত রাখে। এটা দুটি কারণে ভুল।

১. প্রথম কারণ নফসের বিরোধিতাকারী কিছু ব্যক্তি খাহেশাত থেকে বিরত থাকতে গিয়ে আরও বেশি খাহেশাত বা 'নাফসানিয়াত'-এর মধ্যে আপতিত হয়। যেমন, কোনো বৈধ জিনিস থেকে নফসকে বিরত রাখা। এর মাধ্যমে সে লোকদের মাঝে প্রসিদ্ধি লাভ করতে চায়। তখন নফস এই বিরত রাখার ওপরই অধিক সন্তুষ্ট হয়ে পড়ে। কারণ, সে এর পরিবর্তে অগণিত মানুষের প্রশংসা প্রাপ্ত হচ্ছে। এর চেয়েও আরও গোপন ভয়াবহতা হলো, যারা নফসকে এর থেকে বিরত রাখছে না, তাদের ওপর সে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভেবে নেয়। এটা হলো এমন এক গোপন রোগ, ইলম ও বুঝের বাটালি দিয়ে যাকে ছেঁটে পরিশুদ্ধ করা উচিত।

২. দ্বিতীয় কারণ আমাদের ওপর নফস বা আত্মাকে সংরক্ষণের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। আর তাকে সংরক্ষণের মাধ্যম হলো, তার জন্য এমন জিনিসের ব্যবস্থা করা, যা তাকে প্রতিষ্ঠিত রাখবে এবং সংরক্ষণ করবে। আর এর অধিকাংশ কিংবা মোটটাই হলো, সে যা চায় তা সরবরাহ করা। আমরা তাকে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে উকিল বা দায়িত্বশীলের মতো। এটি আমাদের রবের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে আমানত। তাই সর্বক্ষণ তার সকল আগ্রহের বিষয় থেকে তাকে বিরত রাখা অবশ্যই ক্ষতিকর।

তাছাড়া কিছু কিছু কঠোরতা তাকে খুব বেশি অবসাদগ্রস্ত করে তোলে। আর কিছু সংকীর্ণতা তাকে একেবারে ধ্বংসই করে দেয়।

বরং তার সাথে জিহাদ হবে বুদ্ধিমান রোগীর শুশ্রুষার মতো। নিশ্চিতভাবেই তার কিছু আগ্রহের বিষয়ে বাধা দেওয়া হবে। কারণ, সে অসুস্থ। এটা তাকে সাময়িক কষ্ট দিলেও স্থায়ী উপকার হবে। আবার এটাও ঠিক, তার এই তিক্ত জিনিসের মধ্যে সামান্য কিছু মিষ্টি বুলিয়ে দেওয়া উচিত। তার সাথে আচরণ হবে খুবই কোমলতার সাথে, তবে নির্দিষ্ট ছক মেনে।

একজন বুদ্ধিমান মুমিনও ঠিক তেমনই। সে নফসের লাগাম একেবারে ছেড়ে দেবে না, আবার পরিচর্যার ক্ষেত্রে কমতিও করবে না। বরং কখনো কখনো সামান্য ঢিল দেবে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণের লাগাম থাকবে তার হাতেই। যতক্ষণ ঠিকভাবে চলছে, তার ওপর কোনো চোটপাট করবে না। কিন্তু যখন দেখবে খারাপের দিকে ঝুঁকছে, সহানুভূতির সাথে সেদিক থেকে ফিরিয়ে আনবে। এরপরও যদি অলসতা দেখায়, অবাধ্য হয়, তাহলে সে-ও কঠোরতার পথ অবলম্বন করবে- তার স্থায়ী উপকারের জন্যই।

একজন স্ত্রীকে যত্ন ও নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো নফসের সাথেও খুব খোশামদের সাথে আচরণ করবে। স্ত্রী যদি অন্যায় অবাধ্যতা করে, তবে প্রথমে সহানুভূতির সাথে ভালো উপদেশ দেবে। তারপরও যদি ঠিক না হয়, তবে বিছানা আলাদা করবে। এতেও যদি কাজ না হয়, তবে হালকা প্রহার করবে। তবে সদিচ্ছা ও দৃঢ় সংকল্পের চেয়ে শ্রেষ্ঠ চাবুক আর কিছু হতে পারে না। নিজেরও সদিচ্ছা থাকা চাই।

এতক্ষণ যা বর্ণনা করলাম, এগুলো হলো কর্মের মাধ্যমে মোজাহাদা। কিন্তু নফসের জন্য উপদেশ ও তিরস্কারের পদ্ধতিও প্রয়োগ করতে হবে। যেমন, কেউ দেখল তার নফস কোনো মাখলুকের দিকে ঝুঁকছে, চারিত্রিক নীচতার প্রতি আকর্ষিত হয়ে পড়ছে, তাহলে নফসকে তার প্রতিপালকের বড়ত্ব মহত্ব ও অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। নফসকে বলবে, তুমিই তো সেই প্রাণ, যাকে তোমার প্রতিপালক নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। ফেরেশতা দিয়ে তোমাকে সেজদা করিয়েছেন। তার পৃথিবীতে তোমাকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছেন। এবং জমিনে পাঠিয়েছেন। তোমার সবকিছুই তিনি করজ নিয়ে নিয়েছেন এবং জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। এখন তার অনুগত হওয়া ছাড়া তোমার উপায় কী!

আর যদি দেখো, নফস অহংকারী হয়ে উঠছে তাহলে তাকে বলো, 'তুমি তো সামান্য নিকৃষ্ট একফোঁটা পানি থেকে সৃষ্ট। রোদ-শীত তোমার সহ্যের বাইরে। সামান্য কীটও তোমাকে কষ্ট দেয়। সামান্য অনিয়মও তোমার শরীর ও শক্তি বিনষ্ট করে দেয়। তাহলে তোমার কী এমন বাহাদুরি?

এরপর কোনো কাজে যদি কমতি দেখো, নফস যদি ইবাদত করতে না চায় তাহলে তাকে বান্দার ওপর তার প্রতিপালকের অধিকার ও হকগুলোর কথা বলো।

আর যদি আমলের ক্ষেত্রে অলসতা করে তাহলে তাকে প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অজস্র অগণিত পুরস্কারগুলোর কথা বলো।

আর যদি খারাপ প্রবৃত্তির দিকে ধাবিত হয় তবে তুমি তাকে বড় বড় শাস্তির কথাগুলো বলো। এরপর তাকে তাৎক্ষণিক শারীরিক শাস্তি ও কষ্টের কথাগুলোও বলো। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ أَخَذَ اللَّهُ سَمْعَكُمْ وَأَبْصَارَكُمْ﴾

(হে নবী, তাদেরকে) বলো, তোমরা বলো তো, আল্লাহ যদি তোমাদের শ্রবণশক্তি এবং তোমাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেন! [সুরা আনআম: ৪৬]

এবং এভাবে তাকে অভ্যন্তরীণ শাস্তির কথাও বলো। যেমন আল্লাহ বলেছেন, ﴿سَأَصْرِفُ عَنْ آيَاتِيَ الَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ﴾

পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে অহংকার প্রকাশ করে, তাদেরকে আমি আমার নিদর্শনাবলি হতে বিমুখ করে রাখব। [সুরা আরাফ: ১৪৬]

এগুলো হলো কথার মাধ্যমে জিহাদ ও নিয়ন্ত্রণ। পূর্বে যেগুলো বলা হলো, সেগুলো ছিল কর্মের মাধ্যমে জিহাদ ও নিয়ন্ত্রণ।

নফসের সাথে এই দু-ভাবেই জিহাদ করতে হবে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 দুআ কবুলের বিলম্বতা

📄 দুআ কবুলের বিলম্বতা


আমি দেখেছি, একজন মুমিন ব্যক্তি তার কোনো বিপদের জন্য দোয়া করে, কিন্তু অনেক সময় বাহ্যিকভাবে তাতে সাড়া দেওয়া হয় না। লোকটি দোয়া করতেই থাকে। সময় দীর্ঘায়িত হতে থাকে। কিন্তু দোয়া কবুলের কোনো আলামত পাওয়া যায় না। এ ধরনের ব্যক্তির তখন বোঝা উচিত, তাকে তো আসলে এই বিপদের মাধ্যমে ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। এখন ধৈর্যধারণ করাটাই তার উচিত।

এমন দোয়া কবুলের বিলম্বে অনেকের মনেই যে ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা আসে, সেটা এমন এক রোগ, অনতিবিলম্বে যা দূর করা দরকার। আমার নিজের ক্ষেত্রেও একবার এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটে। আমি একটি বিপদে আক্রান্ত হই। আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম। কিন্তু দোয়া কবুলের কোনো আলামত দেখতে পেলাম না। তখন ইবলিস শয়তান তার কুমন্ত্রণার সকল দড়িরশি দিয়ে আমাকে টানতে লাগল। সে বলল, দোয়া তো অনেক করা হলো। প্রতিপালকও তো কৃপণ নয়। তাহলে এই সাড়াদানে বিলম্বে তার কী উপকার?

আমি বললাম, হে বিতাড়িত অভিশপ্ত, তোকে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। তোকে আমি আমার উকিল বানাইনি। তোর কোনো যুক্তিই আমি শুনতে চাই না।

এরপর আমি আমার নফসের দিকে ফিরে বললাম, তুমি কিছুতেই ইবলিসের ওয়াসওয়াসায় কান দেবে না। নিশ্চয় এই দোয়া কবুলের বিলম্বে প্রভু তোমাকে শয়তানের ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে পরীক্ষা করছেন নতুবা অবশ্যই এতে তাঁর অন্য কোনো হিকমত রয়েছে।

নফস বলল, 'তাহলে বিলম্বিত সাড়াদানের এই বিপদ থেকে আমাকে রক্ষা করবে কে? আমাকে বাঁচাও।' আমি তখন নফসকে কয়েকটি কথা বললাম। কথাগুলো এমন-

১. বিভিন্ন রকম অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা হলেন আমাদের মালিক ও প্রভু। আর প্রভুর জন্য অধিকার রয়েছে, তিনি দিতেও পারেন, না-ও দিতে পারেন। এর জন্য বান্দার পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ-অনুযোগ করার সুযোগ নেই।

২. প্রতিপালকের হিকমতের কথাও বিভিন্ন দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়েছে। হয়তো কোনো বিষয় আমি কল্যাণকর মনে করছি। কিন্তু প্রভুর হিকমতে সেটা কল্যাণকর নয়। যেমন, ডাক্তারের অনেক কাজের মধ্যে তার হিকমত বোঝা যায় না। বাহ্যিকভাবে তার কিছু কাজে প্রথমে কষ্ট হয়, ব্যথা হয়; কিন্তু তিনি এর দ্বারা কল্যাণ ইচ্ছা করেন। আল্লাহ হয়তো এটার ক্ষেত্রে তেমনই চেয়েছেন। তাই অভিযোগের কিছু নেই।

৩. কখনো কখনো বিলম্বিত সাড়া প্রদানই বান্দার জন্য কল্যাণকর হয়, আর ত্বরান্বিতটা হয় ক্ষতিকারক। হাদিসে এসেছে-
عَنْ أَنَسٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهِ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا يَزَالُ الْعَبْدُ بِخَيْرٍ مَا لَمْ يَسْتَعْجِلْ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَيْفَ يَسْتَعْجِلُ قَالَ يَقُولُ دَعَوْتُ رَبِّي فَلَمْ يَسْتَجِبْ لِي.

হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যতক্ষণ সে তাড়াহুড়া না করবে। সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সে কীভাবে তাড়াহুড়া করবে? উত্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে বলবে, আমি আমার প্রতিপালককে ডেকেছি, কিন্তু তিনি আমার ডাকে সাড়া দেননি।' ৫২

৪. কখনো কখনো দুআ কবুল না হওয়াটা তোমার কারণে হতে পারে। তোমার কৃতকর্মের কারণে। তোমার খাবারে হারামের সন্দেহ রয়েছে। কিংবা দুআ করার সময় তোমার অন্তর ছিল উদাসীন। কিংবা যে গোনাহের ক্ষেত্রে তুমি সত্য তাওবা করোনি, তার শাস্তিস্বরূপ তোমার দুআতে সাড়া প্রদান করা হচ্ছে না, প্রয়োজন মেটানো হচ্ছে না। এমন আরও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চিন্তা করে দেখো, তাহলেই তুমি দুআ কবুল না হওয়ার আসল কারণ সম্পর্কে জানতে পারবে।

যেমন, হজরত মুআবিয়া রা. থেকে বর্ণনা করা হয়, একবার এক বেদুইন তার বাড়িতে আগমন করে। তার আচরণ ছিল সন্দেহপূর্ণ; যেন কোনো ক্ষতি করতে চায়।

হজরত মুআবিয়া রা. তার কথা শুনে বাইরে এলেন। পরিস্থিতি বুঝলেন। এরপর তিনি তার বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে কিছু লোককে নির্দেশ দিলেন, অমুক স্থানের মাটি সরিয়ে স্থানটি নতুন মাটি দিয়ে যেন লেপে দেওয়া হয়।

তার নির্দেশ পালন করা হলো। কিছুক্ষণ পরই বেদুইনটি দাঁড়িয়ে গেল এবং ঘর থেকে বের হয়ে চলে গেল।

পরে হজরত মুআবিয়াকে এর রহস্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, আগের মাটিটি ছিল সন্দেহযুক্ত। তাই যখন সন্দেহযুক্ত মাটি দূর করে দেওয়া হলো, তখন সন্দেহযুক্ত মানুষও চলে গেল।

ইবরাহিম আল-খাওয়াস রহ. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি একবার সমাজের একটি গোনাহের কাজ নির্মূলের জন্য বের হলেন। হঠাৎ তার কুকুরটি ঘেউ-ঘেউ করতে শুরু করে দিলো এবং তাকে চলতে বাধা দিতে থাকল। এ অবস্থা দেখে তিনি ফিরে এলেন। মসজিদে গেলেন। নামাজ পড়ে আবার বের হলেন। কুকুরটি খুশিতে লেজ নাড়তে লাগল। এবার তিনি নির্দিষ্ট স্থানে গেলেন এবং অন্যায়টাকে নির্মূল করলেন।

পরে তাকে এই অবস্থা নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, 'আমার নিজের মধ্যেই একটি অন্যায় বিদ্যমান ছিল। সে কারণে কুকুরটি আমাকে যেতে বাধা প্রদান করেছে। কিন্তু পরে আমি যখন মসজিদে ফিরে গিয়ে নামাজ পড়ে তাওবা করলাম এবং এরপর বের হলাম তখন আর সে বাধা দেয়নি। ফলে আমি কাজটি করতে সক্ষম হলাম।

৫. তোমার একটু চিন্তা করা দরকার, এই দুআর মাঝে কাঙ্ক্ষিত বিষয় দ্বারা তোমার উদ্দেশ্য কী? কখনো তো এমন হয় যে, দুআকারীর প্রার্থিত বিষয়টি অর্জিত হলে তার জন্য গোনাহের দরজা আরও বেশি করে খুলে যায়। গোনাহ আরও বেশি হতে থাকে। কিংবা তার মর্যাদার হানি হয়। সে ক্ষেত্রে প্রার্থিত বিষয়টি প্রদান না করাই তো উত্তম।

৬. কখনো কখনো এই বিপদ বা বঞ্চনাটাই তোমার প্রতিপালকের দরজায় দাঁড়ানো এবং তার নিকট তোমার আশ্রয় প্রার্থনার উপলক্ষ্য হয়। প্রার্থিত বিষয় অর্জিত হয়ে গেলে তুমি আবার তার স্মরণ এবং তার আশ্রয় ও প্রার্থনা থেকে বিরত হয়ে যাও। তোমার এই অবস্থাই প্রমাণ করে, বিপদটি যদি তোমার সংঘটিত না হতো তাহলে তোমাকে কিছুতেই প্রভুর দরজায় এভাবে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে দেখা যেত না।

এছাড়াও আল্লাহ রাব্বুল আলামিন খুব ভালো করেই জানেন, কোন জিনিস মানুষদের ভালো কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। সুতরাং বিভিন্ন নিয়ামতের সাগরে ডুবে থাকার পর মাঝে মাঝে এমন কিছু বিপদাপদ তিনি প্রদান করেন, যাতে তারা তার কাছে কাকুতি-মিনতি করে প্রার্থনা করে। বিপদের আকৃতিতে এটিও এক ধরনের নিয়ামত। নতুবা বান্দা যেন আল্লাহর কথা ভুলেই গিয়েছিল!

আর তোমার প্রকৃত বিপদ তো সেটাই, যা তোমাকে প্রভুর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সুতরাং যে বাহ্যিক বিপদ তোমাকে তোমার প্রভুর সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তাতে তোমার কল্যাণ ছাড়া আর কিছু নেই।

ইয়াহইয়া ইবনে বাক্কা রহ. ৫৪ থেকে বর্ণিত, তিনি একবার ঘুমের মধ্যে আল্লাহ তাআলাকে দেখলেন। তিনি বললেন, 'হে আমার প্রভু, আমি আপনাকে কতবার ডাকি, কিন্তু আপনি তো আমার ডাকে সাড়া দেন না!' আল্লাহ বললেন, 'হে ইয়াহইয়া, আমি তোমার এই প্রার্থনার আওয়াজ শুনতে ভালোবাসি।'

তুমি যদি এই কথাগুলো চিন্তা-ভাবনা করে দেখো তাহলে তুমি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিপদ মুসিবত এবং প্রার্থনা ও দুআর মূল রহস্য সম্পর্কে অনুধাবন করতে সক্ষম হবে। তখন তুমি সকল অভিযোগ-অনুযোগ বর্জন করে আরও ভালো ও কল্যাণকর কাজের দিকে অগ্রসর হতে উৎসাহ পাবে।

টিকাঃ
৫২. মুসনাদে আহমদ: ২৬/১২৫৩৮, পৃষ্ঠা:৮৫- মা. শামেলা। এছাড়া একটু ভিন্ন শব্দে সহিহ বোখারি ও মুসলিমেও বর্ণিত হয়েছে।
৫০. পুরো নাম: ইবরাহিম ইবনে আহমদ বিন ইসমাইল আলখাওয়াস। উপনাম: আবু ইসহাক। তিনি ছিলেন ইরাকে জন্মগ্রহণকারী। কিন্তু বসবাস করেছেন রাই শহরে এবং এখানেই ইন্তেকাল করেন। তিনি ২৯১ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। صفة الصفوة : ৪/৯৪।
৫৪. তার পুরো নাম: ইয়াহইয়া ইবনে মুসলিম বা সুলাইমান আলবাক্কা। কেউ বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে খালিদ। তিনি ১৩০ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। হজরত নাসাঈ রহ. বলেন, সে ছিল 'মাতরুকুল হাদিস'। কিন্তু ইয়াহইয়া রহ. বলেন, না, তিনি এমনটি ছিলেন না। তবে হাফেজ যাহাবি বলেন, সে ছিল মুনকিরুল হাদিস। সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৫/৩৫০।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 বিপদের প্রতিকার

📄 বিপদের প্রতিকার


কারও ওপর যখন কোনো বিপদ আসে, সেই বিপদ থেকে মুক্তি ও স্বস্তি পাওয়ার একটি পদ্ধতি হলো, সে যেন বিপদটাকে আরও বড় কোনো বিপদে আপতিত হওয়ার চেয়ে ছোট মনে করে। সে হয়তো এর চেয়ে আরও বড় বিপদে আপতিত হতে পারত। তার আরও বেশি ক্ষতি হতে পারত। তারপর বিপদে ধৈর্যধারণের প্রতিদানের কথা স্মরণ করবে। আর আশা করা যায়, বিপদটি অতি দ্রুত চলেও যাবে। জীবনে বিপদ আসেই। জীবন কখনো নিরবচ্ছিন্ন সুখের দ্বারা ভরে থাকে না। সুখ ও দুখের এই পর্যায়ক্রমিক ধারাবাহিকতা না থাকলে শান্তি ও সুখ অনুভব করাও সম্ভব হতো না।

এ কারণে তার নিকট বিপদের অবস্থানকে সে যেন একজন মেহমানের অবস্থানের মতো মনে করে। এটা তো সাময়িক ও তাৎক্ষণিক। এর আগে সে কত কত সময় আনন্দে ও উল্লাসে কাটিয়েছে। কত কত মজলিস উৎসব ও সুখের জায়গায় গিয়েছে। এখন এই কষ্টের মেহমানকে একটু সয়ে নিতেই হবে।

এভাবে বিপদের সময় মুমিন তার অন্য সময়গুলোর কথাও স্মরণ করা উচিত। খুব ধৈর্যের সাথে আঘাত সয়ে নেবে। সামান্য অসতর্কতায় যেন মুখ থেকে কোনো খারাপ কথা বের না হয়। অন্তরে যেন কোনো ক্ষোভ বা ক্রোধের সৃষ্টি না হয়। এই বিপদ চলে যাবে। এই তো আবার ফজর উদিত হলো বলে, তখন রাতের এই অন্ধকার মিলিয়ে যাবে। অন্ধকার কেটে রাতের এই ভ্রমণকারী বেদনার অবসান হবে। এবং ধৈর্যের প্রতিদানের সূর্য উদিত হতেই সবাই নিরাপত্তার গৃহে আশ্রয় নেবে।

📘 হৃদয়ের দিনলিপি > 📄 ইলম ও আমল

📄 ইলম ও আমল


একদিন আমি লক্ষ করে দেখলাম, আমার নফস ইলমে মশগুল থাকাকে ভালো মনে করে এবং এটাকে সে অন্য সকল জিনিসের ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এটাকে সে দলিল মনে করে। অন্য কোনো নফল কাজের চেয়ে ইলমে মশগুল থাকার সময়গুলোকে সে শ্রেষ্ঠ মনে করে।

নফস বলে, নফল ইবাদতের চেয়ে ইলমের শ্রেষ্ঠত্বের ক্ষেত্রে আমার নিকট সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল এই যে, ইলমচর্চা বাদ দিয়ে যারা নামাজ ও রোজার নফল নিয়ে মশগুল রয়েছে, তাদের অধিকাংশের বিশ্বাসের ভিত্তি নড়বড়ে, ভুলত্রুটিতে ভরা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি একটি খুবই সোজা পথ এবং সঠিক মতের ওপর রয়েছি।

আমি দেখলাম, নফস যা বলছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু আমি দেখি, সে তো শুধু বাহ্যিক ইলম নিয়ে মশগুল রয়েছে। আমি তাকে চিৎকার করে ডেকে বললাম, তোমার এই ইলম তোমার কী উপকার করবে? এখানে খোদাভীতি কোথায়? গোনাহের দুশ্চিন্তা কোথায়? হারাম থেকে বেঁচে থাকার সতর্কতা কোথায়? কিংবা পূর্ববর্তীদের থেকে শুনে আসা সেই আকুলকরা ইবাদত ও মোজাহাদা কোথায়?

অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সকলের নেতা, ইলমের ভান্ডার। তিনি এমন দীর্ঘ নামাজ পড়তেন যে দু-পা ফুলে যেত!

হজরত আবু বকর রা. ছিলেন দ্বীনের তরে ব্যথিত হৃদয়, অধিক ক্রন্দনকারী। কান্নার দমকে তার বুকের মধ্যে ঘড় ঘড় শব্দ বের হতো।

আর হজরত উসমান রা. রাতের নামাজে কোরআন খতম করতেন!

আর হজরত আলি রা. রাতে তার নামাজের জায়গায় এমনভাবে ক্রন্দন করতেন যে, তার দাড়ি অশ্রুধারায় ভিজে যেত। এবং দুনিয়ার প্রতি আঙুল দেখিয়ে বলতেন,
يا دنيا غري غيري.

হে দুনিয়া, তুমি অন্য কাউকে ধোঁকায় ফেলার চিন্তা করো। (আমার ক্ষেত্রে কোনো লাভ হবে না)

এদিকে হজরত হাসান বসরি রহ. আখেরাতের ব্যাপারে নিজের সীমাহীন দুশ্চিন্তা নিয়ে মানুষের সামনে লজ্জিত বোধ করতেন।

সাইদ ইবনে মুসাইয়িব রহ. সর্বক্ষণ যেন মসজিদেই থাকতেন। চল্লিশ বছরে তার একদিনও জামাতের সাথে নামাজ ছোটেনি বা তরক হয়নি।

আসওয়াদ ইবনে ইয়াজিদ রহ.৫৫ এত বেশি রোজা রাখতেন যে, তার চেহারা সবুজ ও হলুদবর্ণ হয়ে গিয়েছিল!

রাবি ইবনে খাইসামের এক মেয়ে একবার তাকে বলল, ‘বাবা, কী হলো, আমি সকল মানুষকে ঘুমাতে দেখি, আর তুমি ঘুমাও না?

উত্তরে রাবি ইবনে খাইসাম রহ. বললেন, তোমার বাবা অপ্রয়োজনীয় ঘুমে সময় কাটানোতে আজাবের ভয় পায়!

আবু মুসলিম খাওলানি রহ.৫৬ মসজিদে একটি চাবুক ঝুলিয়ে রাখতেন। ইবাদত করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলে নিজেকে সেই চাবুক দ্বারা আঘাত করতেন। নিজেকে আবার চাঙ্গা করে নিতেন।

ইয়াজিদ আল-কুরাশি রহ.৫৭ একাধারে চল্লিশ বছর রোজা রেখেছেন (নিষিদ্ধ দিনগুলো বাদে)। তিনি বলতেন, আগের ইবাদতকারীরা তো আমাকে ছাড়িয়ে গেছে। আমাকে পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে।

হজরত সুফিয়ান সাওরি রহ. জাহান্নামের ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিই যেন নিঃশেষ করে ফেলেছিলেন। শেষে চোখ থেকে রক্তধারা প্রবাহিত হতো।

এছাড়াও তুমি শ্রেষ্ঠ চার ইমাম—আবু হানিফা রহ., মালেক রহ., শাফেয়ি রহ. এবং আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর মোজাহাদা ও ইবাদতের প্রাচুর্য সম্পর্কে কি জানো না?

এবার তাহলে আমলহীন এই বাহ্যিক ইলমের বিষয়ে চিরদিনের জন্য সতর্ক হয়ে যাও। আমলহীন ইলম তো শুধু অলস অথর্ব ও দুনিয়াভোগীদের বিষয়。

টিকাঃ
৫৫. পুরো নাম: আবু আমর আসওয়াদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে কায়েস আননাখঈ। তিনি জাহেলি এবং ইসলাম- দুটি যুগই প্রাপ্ত হয়েছিলেন। ইবনে আউন রহ. বলেন, একবার শাআবীকে আসওয়াদ ইবনে ইয়াযিদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, তিনি ছিলেন অধিক রোজাদার, অধিক নামাজি এবং অধিক হজকারী। তিনি ৭৫ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/৫০।
৫৬. পুরো নাম: আবু মুসলিম আলখাওলানি আদদারানি। তিনি ছিলেন তাবেঈদের সরদার। যুগের শ্রেষ্ঠ জাহেদ। ইয়ামান থেকে আগমন করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেন। আর হজরত আবু বকর রা. এর যুগে মদিনায় আগমন করেন। তিনি ৬২ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। সিয়ারু আলামিন নুবালা : (৪/৯)-১৪১।
৫৭. পুরো নাম: আবু আমর ইয়াযিদ ইবনে আব্বান আররকাশি আলবসরি। ভালো কথক ছিলেন। জাহেদ ছিলেন। তবে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি তাকে দুর্বল রাবী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সূত্র: তাহযিবুত তাহযিব: ১১/২৭০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00